প্রাণেশা আর মেহা সব ক্লাস করেনি, লাস্ট ক্লাসটা না করে চলে এসেছে। দুজনের কারোরই তেমন মন ভালো নেই তাই। ওরা দুজন কলেজের এক পাশের বাদাম গাছটার নিচে কিছুক্ষণ বসে, তারপর গল্পগুজব করে উঠে যায়। মেহা বাড়ি চলে যেতে চাচ্ছে। বাড়িতে একটার পর একটা ক্লাইম্যাক্স আসছে, এর মধ্যে ওর কলেজে আসার কোন ইচ্ছে ছিল না। বাান্ধবী একা পড়ে যাবে বলেই এসেছে। এখন যখন মন খারাপি নিয়ে কারো ক্লাস করার ইচ্ছে নেই, তখন বাড়ি চলে যাওয়াই বেস্ট হবে।
প্রাণেশা মেহার বোনের ব্যাপারটা খুব গভীরভাবে ভেবেছে। যা বুঝলো, মানুষ মাত্রই সৌন্দর্যের পূজারি। তাই তো মেহার বোনের শারীরিক একটা অপূর্ণতা থাকার কারণে সবাই কটাক্ষ করলেও, ঠিকই ওর রুপের কারণে আবার গ্রহণ করেছে। কিন্তু রুপের কারণে গ্রহণ করলেও ওদিকে ওর অক্ষমতার কারণে অপদস্ত করে। বহুমুখী মানুষে ভরা দুনিয়াটা। ওর স্বামীও বোধ হয় এই কারণে… কি জানি। ওদের কথা আর ভেবে লাভ নেই। নিজের কথা ভাবতে হবে।
নিজের কথা ভাবতে গিয়েও প্রাণেশার মাথায় ঐ কথাটাই আসে। তার স্বামীও সৌন্দর্যের পূজারি। তাকেও তার শারীরিক অপূর্ণতার কারণে প্রথমে মানতো না। পরে এই সৌন্দর্যের কারণেই হয়তো অক্ষমতার ব্যাপারটা আপোষ করে তাকে মেনে নিয়েছে। প্রাণেশা এই ব্যাপারে এখন নিশ্চিত। কারণ অন্তিক কিভাবে কথায় কথায় গাঁয়ের উপর উঠে আসতে চাইতো, তা তো একমাত্র সেই জানে। এখনো তেমনটা করে। কিন্তু রুপের কারণে যে মানুষ আকর্ষিত হয়, সে মানুষ কি কখনো মন ছুঁতে চাইবে?
মন না ছুঁলে ভালোবাসা হবে কি করে। ভালোবাসা না হলে মনের মিল ছাড়া শুধু শরীরের মিল দিয়ে সারাজীবন কাঁটাবে?
একথা ভেবে প্রাণেশার গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। না না, অন্তিক তাকে ভালো না বাসলেও সে বাসবে। তারপর সংসার করতে করতে একদিন নিশ্চয় অন্তিকের মনেও ভালোবাসা জন্মাবে তার জন্য!
দুজনে কলেজের এক পাশে একটা আইস্ক্রিম ভ্যান থেকে আইস্ক্রিম নেয়। আইস্ক্রিম মুখে দিয়ে প্রাণেশা ফোন বের করে, মাকে মেসেজ দিয়ে গাড়ি পাঠাতে বলবে। কিন্তু হঠাৎ দূর থেকে কেউ প্রাণেশা বলে ডেকে উঠল। মেহা প্রাণেশা দুজনেই তাকায়। কে ডেকেছে খুঁজে বের করবে তার আগেই ঐ ব্যক্তি নিজে সামনে আসে।
প্রাণেশা প্রথমে চিনতে পারেনি লোকটাকে, পরে মস্তিষ্কে একটু চাপ প্রয়োগ করতেই মনে পরে এটা শুভ স্যার। আরশি আপুর কলেজের সেই শুভ স্যার। যার সাথে তার বিয়ে ঠিক করতে এসেছিল, কিন্তু আরশি আপুর সাথে ঠিক হয়ে যায়। আর সে বিয়ে মেনে নিতে না পেরে নাহিদ ভাইয়ার সাথে পালিয়ে গিয়েছিল।
প্রাণেশা শুভ স্যারকে হঠাৎ এতদিন পর এখানে দেখে অবাক হয়। তার চেয়েও বেশি অবাক হয় স্যারটা মাঝরাস্তায় ওকে এভাবে ডাকছে দেখে। প্রাণেশার কথা এখনো মনে আছে এই স্যারের? আবার ডাকলোও। কি কারণ হতে পারে?
“কেমন আছ? তুমি এখানে? আমি খুব অবাক হয়েছিলাম তোমাকে এখানে দেখে।”
প্রাণেশা নিজের হতবম্ব ভাব কাটিয়ে উঠে। তবে দ্বিধা কাঁটাতে পারেনা। একটু ইতস্তত করে তাকায়, তারপর সালাম বোঝায়।
শুভ স্যার বুঝতে পেরে সামান্য হাসে।
“অনেকদিন পর তোমার দেখা পেলাম। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে? শুনলাম তোমার নাকি বিয়ে হয়ে গিয়েছে? তুমি তো আমাদের ইউনিভার্সিটির পাশের ঐ কলেজে পড়তে তাইনা? ওখানেও এখন পড় না। এই কলেজে ট্রান্সফার হয়েছ?”
এত এত প্রশ্নের বিপরীতে প্রাণেশা কি উত্তর দেবে খুঁজে পায়না। কেমন বোকা বোকা লাগছে নিজেকে।
শুভ স্যার ওর ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলে,
“কোথাও বসে কথা বলি, প্লিজ? আসলে অনেক কিছু জানার আছে। আরশি তো বিয়ে করবেনা বলে পালিয়ে গেল। এখন কোথায় মেয়েটা? আহ……আচ্ছা একটু বসে কথা বলি, ওকে? তোমাকে অনেক দিন ধরে খুজছি। না করো না প্লিজ”
প্রাণেশা বুঝতে পারে স্যারটার তাদের দুবোনকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। এই স্যারের দোষ ছিল প্রাণেশাকে পছন্দ করে বাড়িতে প্রস্তাব দেওয়া। আর কিছু না। বাকিটা বিনা কারণে ভুগেছে। এনগেজমেন্ট হয়ে যাওয়ার পর স্যারটার হবু বউ পালিয়ে গেল।
নিশ্চয় পারিবারের অনেক অসম্মান হয়েছে।
তবু সে কোথাও বসে কথা বলতে বলায় একটু ইতস্তত করে। মেহা এতক্ষণ আবুলের মতো শুনছিল ওদের কথা। প্রাণেশাকে গুতা দিয়ে ব্যাপার জানতে চাইলে, সে কোনভাবে বোঝায় এটা শুভ স্যার। যেহেতু মেহা প্রাণেশার সম্পর্কে সব জানে তাই চিনতে অসুবিধা হয়না। এর মধ্যে বাড়ি থেকে ফোন আসলে তাকে না চাইতেও চলে যেতে হয়।
মেহা চলে যাওয়ার পর প্রাণেশা একটু অসহায় বোধ করলেও শুভ স্যারকে না করেনা। উনার মনেও অনেক রকম প্রশ্ন থাকতে পারে। সেসব তার দূর করা উচিত। তার বোনের কারণেই তো লোকটার আর তার পরিবারের সম্মানহানি হলো। এটুকু তার দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তারা পাশের একটা ক্যাফেতে ঢুকে। কফি অর্ডার করে বসলে শুভ স্যারই আগে জানতে চান,
“তো প্রাণেশা, শ্বশুর বাড়ি থেকে এসেছো বোধ হয় কলেজে।”
প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
“হুম… তো বিয়েটা কিভাবে হলো হঠাৎ, জানতে পারি? আরশি পালিয়ে যাওয়ার পর তোমাদের খোঁজ নিয়ে দেখেছিলাম। তখনো তোমার বিয়ে হয়নি, মামা বাড়িতেই ছিলে। হঠাৎ আরেকদিন খবর নিতেই শুনলাম তুমি এখন শ্বশুর বাড়ি। কিন্তু এরপর বিয়ে কখন হলো, কিভাবে হলো বুঝতে পারছিনা।”
তারা আরশির শোক কাটিয়ে উঠলে আবার প্রাণেশার জন্য প্রস্তাব পাঠাতেই যে বার বার খোঁজ নিত, সে কথা উল্লেখ না করেই জানতে চায় শুভ। কারণ এখন আর প্রাণেশার প্রতি আলাদা কোন অনুভূতি নেই। এদিকে একটা কাজে আসার আগে, বাড়িতে যে মেয়েটা শাড়ি পরে সারাবাড়ি ঘুরঘুর করছিল নিজের মতো, শুভর সব জিনিস পত্র গুছিয়ে দিচ্ছিল, তাকেই ভালো লাগে এখন। তার মা কোথা থেকে ছোট একটা মেয়েকে ধরে এনে তার সাথে বিয়ে দিয়েছে দুমাস হবে। মেয়েটারও বিয়েতে আপত্তি ছিল। সৎ মায়ের উপর কথা বলতে পারেনি। সব ঠিকঠাকই ছিল শুরুতে। কিন্তু শুভ আগে অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চেয়েছিল জানার পর থেকে কেমন নীরব নীরব থাকে মেয়েটা। ওর সাথে তেমন কথা বলেনা। সে কথা না বলুক, কিন্তু শুভর এখন ওকেই ভালো লাগে। তার মনে মেয়েটার প্রতি ভালোলাগা আসতে বেশি সময় নেয়নি। নরম মনের একটা বউ সারাদিন তার সামনে থাকে, ভালোলাগা না এসে পারে?
আর এখন তো ভালোওবাসে।
সেদিন যখন শুভর আগে অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক হয়েছিল জানতে পেরে সারারাত বালিশ ভিজিয়েছে কেদে কেদে। তখন শুভ জেগে ছিল, সব বুঝেছে। ওর কান্না দেখে কি যে ভালো লেগেছে। সেরাতে নিজেকে সামলাতে পারেনি শুভ। পাগল হয়ে গিয়েছিল। তাইতো কাঁঁদতে থাকা মেয়েটাকে কোন কথাবার্তা ছাড়া ভালোবাসার যন্ত্রণা দিয়ে আরও কাদায়, সারাটারাত।
বেপরোয়া হয়ে সেরাতে ওকে ভালোবাসলেও, ওর মনের ক্ষত সারাতে পারেনি। বরং আরও বেড়েছে। শুভ প্রতিদিন একটু একটু ক্ষত সারানোর চেষ্টা করে। কিন্তু মেয়েটা টলছেইনা। তারপর আবার সেদিন জানতে পারলো বাচ্চা মেয়েটার পেটে নাকি তার বাচ্চা। শুভ তখন কাঁঁদবে নাকি হাসবে বুঝতে পারছিল না।
সেসব ভাবনা বাদ দিয়ে সে প্রাণেশার দিকে তাকায়।
প্রাণেশা ততক্ষণে মোবাইলে টাইপ করে নিয়েছে নিজের কথাগুলো। কারণ সে ইশারায় বললে শুভ স্যার কিছু বুঝতে পারবেনা নিশ্চিত। তাই মোবাইলে টাইপ করে।
ওর টাইপ করা হলে মোবাইলটা শুভর দিকে এগিয়ে দেয়।
“প্রথমত আমি দুঃখিত আপনার কাছে, আমার বোনের কারণে আপনার আর আপনার পরিবারের অসম্মান হলো। এসব সুন্দর ভাবে সমাধান করা যেত। কিন্তু আমার বোন হয়তো সেদিন হটকারিতাই কি করবে বুঝে উঠতে পারেনি। তাই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে। ওর হয়ে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ও এখন নিজের শ্বশুর বাড়িতে ভালো আছে। আর আমার বিয়ে হয়েছে একেবারেই হঠাৎ। কোন পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। আরশি আপু পালিয়ে যাওয়ার ১০/১৫ দিন পরেই আমার বিয়ে হয়ে যায়।
অপরিকল্পিত আর হঠাৎ বিয়ে হলেও, আমি এখন ভালো আছি। আমাকে আমার আগের কলেজ থেকে ট্রান্সফার করে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে অনেক আগেই। আমার শ্বশুর বাড়ি থেকে ঐ কলেজ দূরে হয় বলে। আপনি এতকিছুর পরেও আমার চিন্তা করেছেন, আমার বোনের চিন্তা করেছেন, এজন্য আপনার কাছে অনেক কৃতজ্ঞ।”
শুভ পুরো লেখাটা পড়ে। সে আসলে শুরুতে প্রাণেশাকে নিয়ে চিন্তিত থাকলেও পরে বউ পেয়ে ভুলেই গিয়েছিল। আজকে এদিকে একটা কাজে এসে হঠাৎ ওকে চোখে পড়ায় কৌতূহল থেকে কথা বলেছে মাত্র।
তবে এতকিছু না জানিয়ে সে সৌজন্যমূলক একটু হাসে। তারপর ওকে কফি শেষ করতে বলে। তারপর উঠবে দুজনে।
————————
ইরফান এদিক দিয়ে কোথাও একটা যাচ্ছিল। মাঝপথে কিছু খাবার নিতে নামে। প্রাণেশা যে রেস্টুরেন্টে বসেছে সেও ওটাতেই এখন। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস, সমোসা আর সফট ড্রিঙ্কস পার্সেল করে নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে বিল পে করছে।
হাতের ফোনটাতে অন্তিক ভিডিও কলে আছে। ওরা কথা বলছে। ক্যাশিয়ারের কার্ড স্ক্যান করা হলে সেটা ফেরত দেয়। ইরফান যে হাতে ফোন ছিল ঐ হাতেই দুটো আঙ্গুলের ফাঁকে কার্ডটা নেয়। হাত নাড়ানোতে ফোনটা একটু কাত হয়। আর সেখান থেকে ফোনের ওপাশে থাকা অন্তিক প্রাণেশাকে দেখতে পায়, যদিও শিউর না। ইরফানকে বলে,
“ইরফান, ওখানে প্রাণোকে দেখলাম মনে হলো আমার। একটু দেখ তো তোর পেছনে। প্রাণো ওখানে কি করছে? ওর তো কলেজে ক্লাস চলার কথা।”
অন্তিকের কথা শুনে ইরফান পেছনে তাকালে প্রাণেশাকে দেখতে পায়। সে ওকে দেখে এগিয়ে যায়।
“হেই বিউটিফুল, তুমি এখানে? তোমার তো ক্লাস চলার কথা এতক্ষনে। ক্লাস ফাকি দেওয়া হচ্ছে নাকি?”
প্রাণেশা ইরফানকে দেখে চমকায়। শুভও দেখে সামনের লোকটাকে। ছেলেটা প্রাণেশার পরিচিত বুঝতে পারে।
“ভাইয়া, আপনি এখানে?” সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ
ইরফান ওর ভাষা তেমন না বুঝলেও এই সহজ প্রশ্নটা বুঝতে পারে।
“হু, এদিকেই যাচ্ছিলাম। ক্ষুধার তাড়নায় কিছু খাবার নিতে এসেছিলাম। বুঝই তো, বউ ছাড়া থাকি। বাড়িতে রান্না বান্না এদিন হয় তো সেদিন হয়না। তুমি তো ভাইটার জন্য একটা বউও খুঁজে দিচ্ছনা।”
প্রাণেশা ইরফানের স্বভাব সম্পর্কে পরিচিত, তাই হাসে ওর কথা শুনে।
“বাই দা ওয়ে। ইনি কে?” শুভকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করে।
“উনি আমার আপুর স্যার হন। অনেক দিন পর দেখা হওয়ায় একটু কথা বলছিলাম।” সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ
তবে প্রাণেশার কথা ইরফান বুঝতে পারেনি। তাই শুভ নিজেই নিজের পরিচয় দেয়।
তারপর দুজনে হ্যান্ডশেইক করে ইরফানও নিজের পরিচয় দেয়। প্রাণেশার স্বামীর বন্ধু হয় জানায়। তারপর আরও কিছু কথা বলে নিজেদের মধ্যে পরিচিত হয়। কথায় কথায় প্রাণেশার স্বামী দেশের বিশিষ্ট তরুণ আইনজীবী অন্তিক সরোয়ার জানতে পারলে শুভ অবাক হয়। অন্তিক সরোয়ার তরুণ প্রজন্মের আইনজীবী হিসেবে পরিচিত হলেও বয়স ৩০+। বাচ্চা মেয়েটার বয়সে এত বড় কারো সাথে বিয়ে হলো? শুভ ভাবে সে আর তার বউ একা নয়। এ যুগে এসে সে টিচার হয়ে, আবার আরেকজন আইনজীবী হয়ে বাচ্চা মেয়ের সাথে সংসার করছে। তার মধ্যে বাচ্চা বউ নিয়ে যে দ্বিধা ছিল তা যেন হাল্কা হয়ে গেল নিমিষে। যদিও সে অন্তিকের চেয়ে বয়সে ছোট। আর তার বউও প্রাণেশার চেয়ে ছোট।
প্রাণেশাকে সাথে নিয়ে ইরফান বের হয়ে আসে। ওকে বাড়ি ড্রপ করে দিয়ে যায়।
—————
প্রাণেশার কিছু ভালো লাগছেনা। মেহেরিন অন্তিককে ভালোবাসে, তাকে বিয়ে করতে চাইতো। এসব জানার পর থেকে নানান রকম ইন্সিকিউরিটি কাজ করছে তার মধ্যে, নিজের আর অন্তিকের সম্পর্কটা নিয়ে। আবার মেহার কাছ থেকে বোনের বিষয়ে জানার পর থেকে সেসব চিন্তা-ভাবনা আর ইন্সিকিউরিটি বোধ হয় দ্বিগুন হলো এখন। মনে হচ্ছে যেন কোন ভিত্তি নেই তাদের সম্পর্কের। অন্তিক যেকোন সময় তাকে ছেড়ে দিতে পারে, এতে প্রাণেশার কিছু করার থাকবেনা। অন্তিক ছেড়ে দিতে চাইলে তাকে চুপচাপ মেনে নিতে হবে।
প্রাণেশা এসব কথা চিন্তা করতে করতে আবার নিজে নিজেই ভাবে,
না, তাকে ছেড়ে দেবে কেন? কোন কারণ ছাড়া কেউ কি কাউকে ছেড়ে দেয়? অবশ্যই না।
কিন্তু ছেড়ে দেবেনা কেন? অন্তিক তো তাকে ভালোবাসেনা। অন্তিক এখন প্রাণেশার কাছে থাকছে এর কারণ তো মোহ। আর এটা যেকোনো সময় কেটে যেতে পারে। তখন? ওকে ছুড়ে ফেলে দেবে? অন্য কাউকে নিয়ে থাকবে? কিন্তু সে তো তার বউ, বউকে চাইলেই ছেড়ে দিতে পারে নাকি?
এসব নানান আজগুবি চিন্তা করতে করতে প্রাণেশার মনে হচ্ছে মাথাটা বোধ হয় ফেটে যাবে।
সে ব্যাল্কনিতে দাড়িয়ে ছিল। ওখান থেকে বাগানের দিকটাই চোখ যায়। ওখানে কালো গোলাপ(বিশুদ্ধ কালো গোলাপের অস্তিত্ব নেই, এখানে কালো গোলাপ বলতে ডার্ক রেড কালারের গোলাপকে বোঝানো হয়েছে। আর শুধু এখানে না, সাধারণত কালো গোলাপ বলতে ডার্ক রেড গোলাপকেই বোঝায়। পিউর ব্ল্যাক যে গোলাপগুলো দেখা যায়, সেগুলো আর্টিফিশাল) গাছটা দেখা যাচ্ছে। দিথীর কাছে অবশ্য জেনেছে, অন্তিক ঐ গাছ থেকে কেউ ফুল নিক তা পছন্দ করেনা। কিন্তু একথা শুনে সেও পণ করেছিল একদিন লুকিয়ে একটা ফুল নিবে।
নিজেকে এসব মাথা নষ্ট করা চিন্তা ভাবনা থেকে দূরে রাখতে এই কাজটাই উত্তম বলে মনে হলো তার। সময় নষ্ট না করে সে চলে যায় বাগানে কালো গোলাপ গাছের নিচে।
প্রাণেশা কয়েক মুহূর্ত দাড়িয়ে সবচেয়ে নিচে যে ডালে গোলাপ দেখা যাচ্ছে সেখান থেকে একটা নিতে হাত বাড়ায়।
ঐ মুহূর্তে অন্তিক গাড়ি নিয়ে গেইটের ভেতর প্রবেশ করে। আজ কোর্টে কেইসের কারণে তার মেজাজ ভীষণ খারাপ ছিল। এর মাঝে ইরফান কল দেয়। ওর ফোনে প্রাণেশাকে দেখেছে একটা ছেলের সাথে ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছে। বিক্ষিপ্ত মেজাজ আরও বিগড়ানোর জন্য এটা যথেষ্ট ছিল। তবে অন্তিক বরাবরই ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। হুটহাট রেগে গেলেও তা যখন তখন প্রকাশ করার অভ্যাস নেই। একবার যখন রাগ ঝাড়বে, তখনই সামনের জনের হাঁল বেহাল করে সে।
কিন্তু আজকে প্রাণেশাকে একটা ছেলের সাথে ক্যাফেতে দেখেও নিজেকে যথেষ্ট ঠাণ্ডা রেখেছিল। এরপর নীলয়কে নিয়ে কেইসের সন্ধেহভাজন এক লোকের সাথে দেখা করতে যায়। সেখানে গিয়ে কেইসের জন্য ঐ লোকের সাথে গিয়ে দেখা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু পায়নি বলে নীলয়ের উপর রেগে যায়। তবে তাও নিজেকে শান্ত রাখে।
বাড়িতে চলে এসেছে সে, নীলয়কে আরও কিছু তথ্য সংগ্রহের কাজ দিয়ে। গাড়ি থেকে নেমে প্রাণেশাকে কালো গোলাপ গাছটা থেকে ফুল ছিড়তে দেখে সে। রাগ তখন আকাশচুম্বি অন্তিকের। এগিয়ে এসে পেছন থেকে ওর বাহু ধরে টেনে সামনে দাড় করায়।
“কলেজে গিয়ে ক্লাস বাদ দিয়ে কোন ছেলের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে?” শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করে প্রাণেশাকে
প্রাণেশা হঠাৎ অন্তিকের এমন আগমনে ভয় পেয়ে যায়। তার উপর খুব শক্ত করে বাহু ধরে রেখেছে। ব্যাথা লাগছে তার। কিন্তু অন্তিক এমন রুক্ষভাবে কথা বলছে কেন?
“কি হলো? উত্তর দিচ্ছ না কেন? কোন ছেলের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলে? কে হয় তোমার? নাকি প্রেমিক? হু… এটুকু বয়সে প্রেমিক জুটিয়ে বসে আছ, আর আমার সামনে ভোলেভালা সাজো? একটু ছুঁতে চাইলে কি চাচ্ছি বুঝতে পারো না, ছেলেদের সাথে ক্যাফেতে গিয়ে দেখা ঠিকই করতে পারো। নাটক করো?”
প্রাণেশা স্তব্দ হয়ে আছে। কোন কথার উত্তর দেয়না। বাহুর ব্যাথায় চোখ, মুখ লাল হয়ে এসেছে। একটা ঢোক গিলে নিজেকে সামলায়। অন্তিকের ধরে থাকা ঐ হাতের দিকে তাকায়।
অন্তিক ওর তাকানো বুঝতে পেরে নিজেও একপলক তাকায়। তারপর চেপে ধরা হাত আরও শক্ত করে কাছে টেনে আনে। প্রাণেশা ব্যাথায় চোখ খিচে নেয়। আকস্মিক কাছে টানায় পায়েও একটু হোঁচট লেগেছে।
“উত্তর দিচ্ছনা কেন তুমি হু? আর ঐ ছেলের সাথে দেখা করে এসে এখানে ফুল গাছের কাছে কি করছ? তুমি জান না আমার গাছের ফুল কেউ ছিড়ুক তা আমি পছন্দ করিনা? কাল আবার দেখা করে ফুল দেবে, তাইনা? বিশ্বাস করো প্রাণো, আমি খবর নিয়ে যদি ঐ ছেলের সাথে তোমার সম্পর্ক ছিল বা আছে এমন কিছু জানতে পারি তাহলে জাস্ট খু ন করে ফেলব ছেলেটাকে।”
কথাগুলো বলে ওকে ছুড়ে ফেলার মতো করে ছেড়ে দেয়। তারপর বিক্ষিপ্ত মেজাজে গলার টাই খুলতে খুলতে বাড়ির ভেতরে চলে যায়।
অন্তিক চলে যেতেই প্রাণেশার টকটকে লাল চোখ থেকে এক ফোটা পানি গড়ায়। তারপর আস্তে আস্তে গড়াতেই থাকে।
অন্তিক ওকে একটা ছেলের সাথে দেখেছে বলে ভুল বুঝেছে। তাই বলে এত খারাপ আচরণ? এত খারাপ আচরণ তার সাথে করতে পারলো? সে এখন বিবাহিতা। অন্য কারো সাথে কেন প্রেম করবে? কোন কিছু না জেনে শুনে তার চরিত্রে আঙ্গুল তুললো এত সহজে? অন্তিক তো এমন হটকারি সিদ্ধান্ত নিতনা আগে। হুট করে এত বেশি রেগেও যেত না। তাহলে এখন এত রেগে গেল কেন? নাকি তার প্রতি ভালো লাগা শেষ? তাই ওকে বুঝাতে এমন আচরণ করেছে?
প্রাণেশা স্তব্দ হয়ে এখনো অন্তিকের আচরণগুলো ভাবছে। এর আগেও অন্তিক ওকে অপমানজনক কথা বলেছে। সে কথা বলতে পারেনা এটা যে তার অক্ষমতা তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিল, সেবার যখন রিসোর্টে ছিল তখন। এর বাইরেও ভালো না বেসে, স্ত্রীর সম্মান না দিয়ে বার বার ওর কাছে আসতে চাওয়া, এসবও অপমানই। এত অপমান, অসম্মান পাওয়া সত্ত্বেও চার কুলে মামা-মামী ছাড়া কেউ নেই বলে, তার কোন অভিভাবক নেই বলে লোকটা বিয়ে মেনে নিয়েছে বলার পর আর তেমন আপত্তি করেনি। কারণ এত আত্মসম্মান দেখিয়ে গেলেও সে কোথায় যাবে? মামা-মামীর কাছে চলে গেলেও প্রতি ব ন্ধির সাথে সাথে ডিভোর্সি নামটাও জুড়ে যেত সারাজীবনের জন্য। এরপর যে ওর জীবন কতটা কঠিন হতো, সেসব ভেবেই তেমন আপত্তি দেখায়নি অন্তিক রিসিপশনের জন্য হ্যাঁ বলতে বলার পর। প্রাণেশা তো সকালেও ভাবছিল অন্তিক তাকে ভালো না বাসলেও সে বাসবে। তারপর একদিন না একদিন তার প্রতি মায়া জন্মালে ভালোবাসাটাও হয়ে যেত নিশ্চয়। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি মোহ কেটে গেল?
না, প্রাণেশার অন্তিকের মিষ্টি মিষ্টি কথায় না এসে তখনই ঘোর আপত্তি জানানো উচিত ছিল। তাহলে আজ জীবন সাজানোর নতুন সপ্ন দেখার পর গিয়ে সব ভাঙতো না। এত কষ্ট পেতে হতনা।
——————
অন্তিক স্টাডি রুমে কিছু ফাইল নিয়ে নতুন করে আজকের পুরো কেইসটা স্টাডি করছে। সারাদিন এত এত ঝামেলায় তার কোন পয়েন্ট মিস হয়েছে হয়তো। তাই ইনভেস্টিগেশনের হিসেব মিলছেনা।
ঘণ্টা লাগিয়ে সে প্রথম থেকে সব আবার বুঝতে শুরু করে। এর মধ্যে তার মা রাতের খাবার খেতে ডাকলে সে ডাইনিং এ সব রাখতে বলে। কাজ শেষ করে খাবে।
প্রাণেশাও খেয়ে নিয়েছে। সে রান্না বান্না শেষ করে সবাই যখন যার যার রুমে তখনই গিয়ে খেয়ে নিয়েছে, যাতে কারো সামনে পড়তে না হয়। খাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু মা না খেয়ে ঘুমাতে দেবে না। তাই আগে আগে খেয়ে শুয়ে পড়েছে সে।
এরপর কি করবে সে সিদ্ধান্ত প্রাণেশা নিয়ে নিয়েছে। মামা বাড়ি চলে যাবে কাল। আজকে অন্তিকের ভেতর বাহির-সবটা বুঝে যাওয়ার পর তার সাথে প্রতি মূহুর্তে ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কা নিয়ে সংসার করার মানে হয়না। এত অনিশ্চয়তার সুখী জীবন তার চাই না। এর চেয়ে মামা বাড়িতে পড়ে থাকলে অনেক ভালো হবে। তাদের এখন প্রাণেশাকে নিয়ে বিরুপ কোন মনোভাব নেই। তাই একেবারে ফেলে নিশ্চয় দেবে না!
অন্তিক নিজের সব কাজ শেষ করে নীলয়কে ফোন দিয়ে একটু বকা-ঝকা করে। সে নাহয় টেনশনে কিছু একটা মিস করলো। কিন্তু নীলয়ও এতটা ইরেস্পন্সিবল হয় কি করে। ছোট্ট একটা পয়েন্ট মিস করার কারণে আজকে নির্দোষ একজনকে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এসেছে তিন ঘণ্টার জার্নি করে। তবে একটা ব্যাপার সমাধান হলেও আরও নতুন নতুন প্যাচ সামনে এসেছে মনে হচ্ছে তার। নীলয়কে সব বুঝিয়ে সেগুলো নিয়ে স্টাডি করতে বলে, তারপর সব তথ্য মেইল করে পাঠিয়ে তারপর যেন আজকে ঘুমায় সে হুশিয়ারি দেয়। অবশ্য এসবের দরকার ছিল না। নীলয় কাজের প্রতি খুব ডেডিকেটেড একজন মানুষ। হয়তো কোন কারণে আজকে একটা ভুল হয়েছে।
অন্তিক নিজেও আরও কিছুক্ষণ সব ঘাটাঘাটি করে। তারপর ঘুমাতে চলে আসে।
প্রাণেশা শুয়ে আছে কাত হয়ে। কামিজ আর স্কার্ট পড়ে শুয়ে আছে সে। কাত হয়ে শুয়ে থাকায় পেছন থেকে ওর লতানো নারীদেহ ভীষণ আকর্ষণীয় লাগছে। অন্তিক নিজের দৃষ্টি সরায়না। বরং আরও গাঢ় করে।
আজকে না জেনে মেয়েটার উপর এত রাগ ঝাড়া একেবারেই উচিত হয়নি। কেইস নিয়ে ঝামেলা, কোর্টে বাকবিতণ্ডা, ওকে ক্যাফেতে ক্লাস টাইমে অন্য একটা ছেলের সাথে দেখা - সব মিলিয়ে আজ নিজেকে একেবারেই সামলাতে পারেনি। সব রাগ তখন মেয়েটার উপরেই ঝেড়ে দিয়েছে। নিশ্চয় অনেক কষ্ট পেয়েছে। কেদে কুটে হয়তো এভাবেই ঘুমিয়ে পড়েছে, নাহয় সাদা-সিদে কুর্তি আর পাজামা পরেই তো ঘুমায়। আজ স্কার্ট আর কামিজ পরে শুয়ে পড়েছে। স্কার্টটা নাড়াচাড়ায় হাঁটু অব্দি উঠে গিয়েছে। ফর্সা পা দৃশ্যমান। কামিজের উপর দিয়ে ভেতরে ইনারের ছাপ দেখা যাচ্ছে। অন্তিকের প্রাণেশাকে এভাবে দেখে হঠাৎ-ই কেমন সারা শরীর গরম গরম লাগছে।
সে ওকে দেখতে দেখতে নীরবে হাতের ঘড়িটা খুলে রেখে দেয়। গাঁয়ের শার্টটাও খুলে ফেলে। তারপর বিছানায় গিয়ে প্রাণেশার একদম কাছে গিয়ে কানের নিচে ঠোঁট ছোঁয়ায়। এক হাত কামিজের ফাকে গলিয়ে উদরে রাখে। অন্য হাতে প্রাণেশার মাথায় হাত বোলায়।
“ঘুমিয়ে পড়েছ?”
প্রাণেশা নিজের ভাবনায় মগ্ন ছিল। অন্তিক কখন রুমে এসেছে বুঝতে পারেনি। কাল কখন, কিভাবে মামা বাড়ি যাবে, ওদের কি বলবে সেসব ভাবছিল। নিজের একদম কাছে অন্তিকের আওয়াজ শুনে তার দিকে তাকায়।
অন্তিক ওর চেহারাটা দেখে। খুব কেদেছে মেয়েটা। কাঁঁদতে কাঁঁদতে চোখ, মুখ লাল করে ফেলেছে।
“আজকের জন্য সরি, ওভাবে বলা উচিত হয়নি। মন খারাপ করে থেকো না। আর কখনো এমন হবেনা, প্রমিস।”
প্রাণেশা কোন উত্তর দেয়না। মুখ ফিরিয়ে স্বাভাবিকভাবে রাখে বালিশে।
“কি হলো? কিছু বলো… আমি খুব দুঃখিত প্রাণো।”
প্রাণেশা ওভাবেই মাথা নাড়িয়ে ঠিক আছে বোঝায়।
অন্তিক ওর চেহারাটা ফিরিয়ে এক হাতের আজলায় রাখে। সারামুখে চোখ বুলিয়ে ধীমি স্বরে বলে,
“ক্ষমা করে দিয়েছ?”
প্রাণেশা না চাওয়া সত্ত্বেও মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝায়।
অন্তিক প্রাণেশার নিচের ঠোঁটে বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে স্লাইড করতে করতে বলে,
“সত্যি?”
প্রাণেশা অন্যদিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়।
“আজকে তাহলে তোমাকে একটু আদর করি?”
প্রাণেশা চমকে তাকায়।
“আজকে তোমাকে কাছে পেতে ইচ্ছে করছে। আস্তে আস্তে আদর করবো, ট্রাস্ট মি। একটুও কষ্ট দেব না।”
প্রাণেশা অন্তিকের লাল হয়ে উঠা চোখের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে যায়। নেশা করে আসলো নাকি? ততক্ষণে অন্তিক ওর কামিজে হাত দিয়েছে, ফিতা ছাড়িয়ে ওটা খুলে ফেলার চেষ্টায়।
প্রাণেশা বুঝতে পেরে মাথা নাড়ায়। অন্তিককে এসব না করতে বোঝায়।
“বলছি তো কষ্ট দেব না। আটকাবেনা প্লিজ, আজকে তোমাকে না পেলে আমি ম' রে যাবো।”
প্রাণেশার চোখ ছলছল করছে। অন্তিক হঠাৎ এসব চাচ্ছে কেন তা বুঝতে পারছেনা। সে অন্তিকের থেকে চিরতরে দূরে চলে যাওয়ার কথা ভাবছে, আর এই লোক ওর চলে যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টায় আছে। আবার আবদার করছে সে যেন না আটকায়। অন্তিক প্রাণেশার কামিজ খুলে ফেলেছে। ওর শরীরে ডুবতে শুরু করেছে। প্রাণেশা নিজের বুক থেকে তার মাথা সরিয়ে থেমে যেতে বোঝায়। কিন্তু অন্তিক ওর ইশারার তোয়াক্কা করেনা। প্রাণেশার শরীরের স্পর্শকাতর অঙ্গে নিজের ছোয়ার জানান দেয়।
প্রাণেশা ডুকরে কেদে উঠে। অন্তিক ওর ঠোঁটে নিজের আধিপত্য দেখিয়ে কান্না আটকাতে বেশি সময় নেয়না। প্রাণেশার নিজেকে গলা কাঁটা মুরগীর মতো মনে হচ্ছে। পা দিয়ে ধরফর করছে, নিজেকে অন্তিকের থেকে দূরে রাখতে চাইলে অন্তিক ওর দুই পা নিজের পায়ের মধ্যে আঁটকে নেয়।
অন্তিক আজ ভীষণ বেপরোয়া আচরণ করছে প্রাণেশার সাথে। তখন কালো গোলাপ গাছটার নিচেও এমন বেপরোয়া আচরণ করেছিল। এখন রাতের অন্ধকারে বিছানাতেও একই। প্রাণেশার মনে হচ্ছে এটাই অন্তিকের আসল রুপ। এত দিন নিজেকে যে শান্ত, ঠাণ্ডা মস্তিস্কের আর বোঝদার হিসেবে দেখাত! সেসব মিথ্যা। অন্তিক মূূলত একজন বেপরোয়া, নিয়ন্ত্রণহীন আর উগ্র মানুষ। প্রাণেশার শরীরে যেভাবে নিজেকে জাহির করছে, অন্তত তাতে তো প্রাণেশার এমনটাই মনে হচ্ছে। অথচ একটু আগে বলেছিল একটুও কষ্ট দেবেনা। প্রাণেশা হঠাৎ ব্যাথায় কিছুটা শব্দ করে কেদে উঠে। অন্তিক ওকে কাঁদতে দেখেও থামেনা। একটু আদুরে স্পর্শ দিয়ে আবারো বেপরোয়া হয়ে উঠে।
অন্তিকের প্রাণেশার সাথে করা আচরণে আফসোস হয়েছিল। কিন্তু বিছানায় লাস্যময়ী কোন নারীকে এভাবে দেখলে যে কারো মাথা ঠিক থাকবেনা। সেখানে মেয়েটা তো তার বউ।
তার উপর পুরুষ মানুষের কাজের ঝামেলা, বাইরের দুনিয়ার নানান ঝামেলা - সব চলমান থাকলেও, যে জিনিসটা এসবের মাঝেও একটু স্বস্তি দেয় তা হলো শারীরিক তৃপ্তি। অন্তিকও তাদের থেকে ব্যতিক্রম নয়।
কোর্টে বাক বিতণ্ডা, ঐ কেইস নিয়ে সারাদিনের খাটুনি, প্রাণেশাকে এসবের মাঝে অন্য কারো সাথে দেখা - সব মিলিয়ে সে ভীষণ আপসেট ছিল। তার মনে হচ্ছিল আজকে কোন ভাবে প্রাণেশাকে কাছে পেলেই মাথা ঠাণ্ডা হবে।
না, ব্যাপারটা এমন না বোধ হয়। একটু উল্টো… এত কিছুর মাঝে প্রাণেশাকে যে কাছে পেতে মন চাচ্ছিল, সেটা যদি না হয় তাহলে সব কিছু আরও বিগড়ে যাবে মনে হচ্ছিল তার কাছে।
তাই তো প্রাণেশার অসম্মতি সত্ত্বেও কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে নিজের চাওয়া পূর্ণ করছে সে।
প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিট পর প্রাণেশাকে ছেড়ে দেয় অন্তিক। বিছানায় গা এলিয়ে চাদরটা টেনে প্রাণেশাকে বুকে টেনে নেয়। তার কপালে আর গালে চুমু এঁকে দিয়ে আলতো স্বরে জানতে চায়,
“এখন গোসল করবে নাকি সকালে?”
প্রাণেশা জবাব দেয়না। সে কেমন অবশ হয়ে গিয়েছে, ক্লান্ত হয়ে আছে। অন্তিকের দিকে তাকাতে পারেনা সে। ঘৃণা লাগছে, লজ্জ্বা লাগছে - আরও কতরকম মিশ্র অনুভূতি। সে চাদরের ভেতর আরও ঢুকে যেতে চাইলে অন্তিক কোমরে একটা টাওয়েল পেছিয়ে চাদরসহ ওকে কোলে তুলে নেয়। কপালে আবার চুমু এঁকে বলে,
“আগে গোসল করে নি সোনা, তারপর ঘুমাবো দুজনে।”