প্রথম খন্ড


অয়ন্তির কবুল বলার পর পর কাজী সাহেবের সাথে সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে। তারপর মাহাদকে বলতে বললে সে বেশি সময় ন"> প্রথম খন্ড


অয়ন্তির কবুল বলার পর পর কাজী সাহেবের সাথে সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে। তারপর মাহাদকে বলতে বললে সে বেশি সময় ন">

মৌনপ্রেম

পর্ব - ৩২

🟢
প্রথম খন্ড



অয়ন্তির কবুল বলার পর পর কাজী সাহেবের সাথে সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে। তারপর মাহাদকে বলতে বললে সে বেশি সময় নেয় না। শীতল স্বরে সেও কবুল বলে দেয়।

ওদের বিয়েটা সম্পূর্ণ হলে সবাই নিজেদের মধ্যে কুশল বিনিময় করে। হঠাৎ -ই বাড়ির পরিবেশ ভীষণ খোশ আমেজপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মিসেস আয়েশা আমিন আর মিসেস তাবিয়া মিষ্টি নিয়ে আসেন। কাজী সাহবেকে মিষ্টিমুখ করিয়ে সবাই নিজেরাও একে অপরকে মিষ্টি খাওয়ায়। কাজী সাহেবকে নিজের সম্মানী যথাযথভাবে বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় করা হয়। অন্তিক নিজেদের গাড়ি নিয়ে ড্রাইভারকে বলে দেয় যেন সঠিকভাবে উনাকে বাড়ি পৌছে দেওয়া হয়।

মেহেরিন, ইশি, দিথী ওরা সবাই মাহাদ অয়ন্তির সাথে নানান রকম ছবি তুলছে। বিয়ের মুহূর্তগুলো ওরা ভিডিও করেছে, ছবি আকারে ধারন করে রেখেছে। সদ্য বিবাহিত দম্পতিকে পাশাপাশি বসিয়ে নানান রকম ভঙ্গিতে কাপল ছবি তুলছে। অয়ন্তি ভীষণ সংকুচিত হয়ে থাকলেও মাহাদ একেবারে সতঃস্ফূর্ত। তার মধ্যে অয়ন্তির সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসাতেও তেমন বিকার দেখা যাচ্ছেনা, অস্বস্তি তো না ই।

বড়রাও নিজেদের মধ্যে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনায় ব্যস্ত। ছোটরা হইহল্লরে ব্যস্ত। এর মধ্যে ইরফান আর তোশা আসে। ওদের অন্তিক খবর দিয়েছিল অনেক আগেই। বাড়ি আসার তলব করেছিল। ইরফান বের হয়ে তোশাকেও বাড়ি থেকে নিয়ে আসছিলই। কিন্তু তোশা পাশে থাকলে তার মনে, মস্তিষ্কে, শরীরে নানানরকম চুলকানি আসে। সেই চুলকানির কারণেই ওদের আসতে দেরি হয়েছে।

সে ভাবে বের হয়েছে যখন তোশাকে নিয়ে একটা লং ড্রাইভ দিলে কেমন হয়! যদিও তা তোশার অসম্মতিতে। সে ওর সম্মতি নিয়ে কোনো কাজ করেছে নাকি আজ অব্দি। নিজের যা ইচ্ছে তাই তো করেছে। সে যায় হোক, তোশা রেগে যাচ্ছিল দেখে ইরফান আরও এঞ্জয় করে পুরো রাইডটা। তোশা যতো রাগে, ইরফান ততো আত্মিক শান্তি পায়। রেগে মেগে কতো গা লাগা ল করেছে সে এই ছেলেটাকে। কিন্তু গন্ডারের শরীরের মতো কোন কথায় গাঁয়ে লাগায়না গোয়ারটা। তোশা জেদে চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। কিন্তু বেয়াদবটা নির্লজ্জ্বের মতো হেসে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছে। তারপর বেপরোয়াভাবে, ফুল স্পিডে ড্রাইভ করে পুরো শহর চক্কর দিয়ে এসেছে তোশাকে নিয়ে। তোশার আফসোস, মম ড্যাডের কথা শুনে সে কেন যে এই পা র্ভা র্টটার সাথে বের হয়েছিল?

তোশা পুরো জার্নিতে ভীষণ আতঙ্কে ছিল। মনে হচ্ছিল এই বুঝি কোনো গাড়িকে ধাক্কা দিয়ে উল্টিয়ে দিলো। নাহয় তাদের গাড়ির চাকা খুলে গিয়ে এই বোধ হয় তারা এক্সিডেন্ট করলো। অতিরিক্ত আতঙ্কে সে কয়েকবার অনুরোধ করেছে ইরফানকে, যেন গাড়ি আস্তে চালায়। কিন্তু ইরফান একে একে গাড়ি ওভারটেক করে করে উত্তর দিয়েছে ওর ভয় পাওয়া, আতঙ্কিত চেহারা দেখতে তার ভালো লাগছে, তাই এভাবে চালাচ্ছে সে। আর এভাবে না চালালে অন্তিকদের বাড়ি পৌছাতে দেরি হয়ে যাবে। তখন তোশা রেগে চলন্ত গাড়িতে ইরফানের ড্রাইভ করা অবস্থায় ওর বুকে, বাহুতে ঘুষি দিয়ে বলে,

“তুই দেরি হওয়ার চিন্তা থাকলে ওবাড়ির রাস্তা না ধরে অন্য রাস্তা ধরেছিস কেন? শা লা কুকুর, শুয়োর, তোর এখন দেরি হয়ে যাবে সে চিন্তা হচ্ছে। বেয়াদব কোথাকার। তোর শরীরে কিসের মাংস হ্যা? একটা কথাও গাঁয়ে লাগেনা তোর? কুত্তা, স্পিড কমা গাড়ির। যাব না আমি কারো বিয়েতে। তুই গাড়ি থামা। এখান থেকেই আমি বাড়িতে ব্যাক করবো। গাড়ি থামা বলছি।”

তারপর আরও দুই/একটা বিচ্ছিরি গালি দিয়ে ওর মাথার চুলগুলোও টেনে দিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে কোনরকম নিজেকে শান্ত করতে চায়। কিন্তু গাড়ির স্পিড তখনো কমায়নি ইরফান। তাই চাইলেও গাড়িতে ঐ ধাক্কাধাক্কি আর এলোমেলো অবস্থায় শান্ত হতে পারেনা। ইরফান মাথা ঝাকিয়ে চুলগুলো ঠিক করার প্রয়াস করে, তারপর চলন্ত গাড়ির শাঁ শাঁ আওয়াজের সাথে জোরে জোরে বলে,

“এই যে আমাকে থামাতে এতো বেকার পরিশ্রম করলি, এর চেয়ে যদি ঠোঁটে একটা চুমু খেয়ে সুন্দর করে বলতি তাহলে আমি টেম্পটেড হয়ে হলেও হয়তো গাড়ি থামিয়ে দিতাম। কিন্তু আফসোস, মেয়ে মানুষের স্বভাব কাজের কাজ না করে হাউকাউ করা। নে আবার জংলি বিড়ালের মতো না করে পানি খেয়ে শান্ত হ। নাহয় তোর লাল লাল গাল দুটো, আর ঠোঁট দুটো খেয়ে আমি নিজেকে শান্ত করবো।”

গাড়ির ডেস্ক থেকে এক হাতে পানির বোতল নিয়ে সেটা ওর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে ইরফান। তোশা টেনে নেয় বোতলটা। তারপর নিজে কিছুটা খেয়ে বাকিটা হঠাৎ ইরফানের দিকে ছুড়ে মারে। ইরফান ওর এমন আক্রমনে মাথাটা সামান্য হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। সাথে সাথে ভীষণ বিপজ্জনক ভঙ্গিতে বাক ঘুরিয়ে গাড়ি থামিয়ে দিয়েছে সে। এভাবে অপরিকল্পিতভাবে মাঝরাস্তা থেকে একদিকে এনে গাড়ি থামানোতে জোরে এক ধরণের আওয়াজ হয়। সে শব্দে যে কারো মনে হবে গাড়ি ওভারটেক করতে গিয়ে এ ক্সি ডেন্ট করেছে। কিন্তু গাড়িতে থাকা মানব মানবীর কিছু আসলো গেলনা তাতে, তারা শান্ত। ইরফান তখন চোখের ভেতর পানি ঢুকে পড়ায় হঠাৎ কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। গাড়ি সাইড করে থামিয়ে চোখ মুছে সে এক হাতে। তারপর মাথা ঝাকিয়ে তোশার দিকে তাকায়। ইরফানের চোখ লাল হয়ে আছে। বেশ বাজে ভাবে পানি ঢুকেছে তখন চোখের ভেতর, বোঝায় যাচ্ছে। তবে তোশার মনে হলো ইরফান রেগেও গিয়েছে। তার লাল চোখ দেখে কিছুটা আফসোস, আর রেগে গিয়েছে ভেবে কিছুটা ভয়ও হয়। কিন্তু সে কোন কথা বলেনা। শক্ত মুখেই বসে থাকে।

ইরফান ওর দিকে তাকিয়ে কিছু বলেনা, তবে ওর গাঁয়ের উর্ণাটা নিয়ে নিজের মাথা আর শার্টের ভেজা অংশ মুছতে থাকে। তোশা ওর উর্ণা নিয়ে নেওয়াই কিছু বলতে গিয়েও বলে না। পেছন থেকে চুলগুলো সামনে এনে দিয়ে আবার শক্ত মুখে সামনে তাকিয়ে বসে থাকে। তোশা যদিও সবসময় উর্ণা পরেনা। কিন্তু আজকে যে ড্রেসটা পরেছে সেটার গলা একটু বড় ধরণের, তাই উর্ণা নিয়েছিল। তবে রাগের মাথায় যে কাজ করেছে, তার পর আর উর্ণা নিয়ে নেওয়ার জন্য কথা বাড়ায়না সে।

তখন যদি এ ক্সি ডেন্ট হয়ে যেতো? তাহলে এই মুহূর্তে কি অবস্থায় থাকতো ওরা? এতক্ষণে গালে যে একটা থাপ্পর বসিয়ে দেয়নি সেটাই অনেক বেশি।

তাই সে চুপচাপ বসে থাকার চেষ্টা করে। কিন্তু খোলা রাস্তায় থাকায়, বাতাসের সাথে চুলগুলো ভীষণ উড়ছে। থাকছেনা ও যেভাবে দিয়েছিল সেভাবে। তাই কিছুটা অস্বস্তি হচ্ছে। আড় চোখে ইরফানের দিকে তাকিয়ে দেখে সে মনোযোগ দিয়ে চুল মুছছে। শাঁর্টের বোতাম খুলে দিয়েছে যাতে শুকিয়ে যায়। তাছাড়া ভেজা শাঁর্ট গাঁয়ে পরে থাকলে অস্বস্তি হবে স্বাভাবিক। তোশার উর্ণা দিয়ে চুল মুছে সেটা কোলে রাখে সে। তারপর হাতে চুলগুলো নেড়েচেড়ে তোশার দিকে তাকায়।

শান্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে আবার গাড়ি স্টার্ট দিতে নিবে, তখন হঠাৎ আবার ওর দিকে তাকায়। সোজা চোখ দেয় ওর বুকে। তোশা ইরফান গাড়ি স্টার্ট দিবে ভেবেছিল, তা না হওয়ায় সেদিকে তাকালে ওর দৃষ্টি দেখে শিউরে উঠে। তাড়াতাড়ি চুল আবার ঠিক করে দেয়। বিরক্ত হয়ে বলে,

“উর্ণা দে।”

ইরফান ওর উর্ণা কোল থেকে তুলে নিজের অপর সাইডে সিটের সাথে গুঁজে রাখে। অর্থাৎ প্রশ্নই উঠেনা। তোশা এমন কাণ্ড দেখে দাঁতে দাঁত চাপে। কোথায় ভেবেছিল ওকে পানি মারায় রেগে গিয়ে দুই/একটা কথা শুনাবে, তা না এর মধ্যে কোন বিকারই নেই সে বিষয়ে। এখনো স্বাভবতই আচরণ করছে। আজ যদি ওর বোকামির জন্য এক্সিডেন্ট হতো? ম রে যেতো? বা জীবিত থেকেও মৃ তের মতো অবস্থা হতো কোনপ্রকার প ঙ্গুত্ব নিয়ে? তাহলে? একটুও রাগ হচ্ছেনা ওর উপর এখনো? এ কেমন ছেলে?

“ওটা লুকিয়ে রেখেছিস কেন? দিতে বলেছি আমি?”

“ওটার দরকার নেই। চুপচাপ বসে থাক।” ইরফান গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে বলে।

তোশা আবার চুল ঠিক করতে করতে বলে,

“দরকার আছে নাকি নেই সেটা আমি বুঝব। তুই উর্ণা দে।”

ইরফান একবার ওর দিকে ফিরে কিছু বলতে। তবে চেহারার দিকে না তাকিয়ে উন্মুক্ত বুকের অংশেই তাকায়।

“তোর দরকারের চিন্তা করে আমার লাভ কি? আমিতো আমার চিন্তা করবো রাইট? আমি কতোটা সেলফিস জানিস না?”

ইরফানের বেহায়া দৃষ্টি দেখে তোশার রাগ হয়। ঘেন্না নিয়ে তাকায়, তবে কিছু বলেনা। নিজেকে সংযত করে সম্পূর্ণ জানালার দিকে মুখ করে বসে থাকে। ও যে এত ঘৃণা নিয়ে তাকালো তাতেও যে ছেলের কিছু যায় আসলোনা। সে ছেলেকে আর কি ই বা বলবে।

“এমন ভাব করছিস যেন প্রথমবার দেখছি। ওসব ইঞ্চি ইঞ্চি অংশ আমার দেখা, সাইজসহ জানা। এখনো চোখে ভাসে আমার।”

তোশা চোখ খিচে বন্ধ করে নেয় ইরফানের কথা শুনে।

সেসব দিনের কথাগুলো ভেবে চোখ দিয়ে এক ফোটা পানিও গড়িয়ে পরে।

“শরীরে খুব জ্বালা তাইনা তোর?” তোশা

ইরফান বুঝে যায় এর পর কি বলবে এই মেয়ে। তবে সেসব তোয়াক্কা না করে নিজের মতো বলে,

“হবে না? বয়সের একটা ব্যাপার আছে না? এটাইতো শরীর জ্বালা করার উপযুক্ত বয়স। সবারই তো ফিজিক্যাল নিডস থাকে রাইট? সেখানে আমি আছি খাপে খাপ একটা বয়সে।”

তোশা ইরফানকে চরম অপমান করে কিছু বলবে ভেবেছিল। কিন্তু ওর লাগামছাড়া কথা শুনে বিস্ময়ে কিছু বলতে পারেনা।

ইরফান আবার বলে,

“আচ্ছা, আমি নাহয় রোজ রাতে তোর আমার ঐ ফেক ভিডিও দেখে হলেও নিজেকে সামলায়। মাঝে মাঝে তোর ন্যু ডস গুলোও দেখি। কিন্তু তুই কিভাবে সামলাস নিজেকে? মেয়ে ছেলে সবারই তো ফিজিক্যাল নিডস থাকে তাইনা? তুই কিভাবে সামলাস জানার আমার ভীষণ ইচ্ছা ট্রাস্ট মি। পারলে একদিন ভিডিও কল দিস রাতে। ওয়েট! তোকে তো আমি ঐ ভিডিও টা পাঠিয়েছিলাম এনগেজমেন্টের দিন। তুইও কি ওটা দেখিস নাকি? মাই গড! তার মানে দুজন দুজনকে সেইমভাবে কল্পনা করে দুপ্রান্তে কাতরাচ্ছি। এর চেয়ে একসাথে হয়ে গেলেও হয়। বাস্তব ফিল পাবি। দুজনেরই লাভ।”

তোশা ইরফানের সব কথা শুনেনি। এর আগেই কাঁঁদতে শুরু করেছে অপমানে লজ্জ্বায়। লুকিয়ে লুকিয়ে না। খোলামেলাভাবেই কাঁদছে। কাকে লুকিয়ে কাঁঁদবে সে? পাশে বসা ছেলেটার থেকে? যার কাছে ওর কোন সম্মান নেই। কিছু লুকানোর নেই। মেয়ে হিসেবে নুন্যতম লজ্জ্বাটুকু যার কাছে উজাড় হয়ে আছে না চাইতেও। এই একটা ছেলেকে ভালোবেসে সে নিজের আত্মসম্মান, ইজ্জত সব হারিয়েছে। প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও অবুঝ কিশোরীদের মতো জী বন শেষ করতে গিয়েছিল। কিন্তু লাভ হয়নি। সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে চিকিৎসা করেছে, লাভ হয়নি বলে সাইকোলজিস্ট এর শরণাপন্ন হয়েছে। মৃ ত্যু কোন সমাধান নয় তাও বুঝে এখন। আর সে পথে যাওয়ার মানেও হয়না।

কিন্তু ওটা সমাধান না হলে এসবের আসল সমাধানটা ঠিক কি? কি করলে মুক্তি পাবে?

মুক্তি?? কিন্তু সে মুক্তি চাইনা। ইরফান কি করলে ওকে বুঝবে? সেই সমাধান চাই ওর। কারণ এই ছেলেকে ছাড়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। বছর বছরের ভালোবাসা, চাইলেই শেষ হয়না। শত আঘাত পেয়েও শেষ হয়নি? তাই আর শেষ করার চেষ্টাও করেনা এখন। কিন্তু ইরফান যদি ওকে বুঝতো একটু…… একটু ভালোবাসতে জানতো। তাহলে এক মিনিটও সময় নিতোনা সব ভুলতে। কিন্তু এতো টক্সিক একটা মানুষ। কিভাবে বদলাবে সে? রিহ্যাবিটেশন থেকে ফিরেও সে অপরিবর্তীত। ওর মৃ ত্যুর পদক্ষেপের কথা শুনেও সে অপরিবর্তীত। তাহলে কিভাবে বদলাবে সে? কিভাবে বুঝাবে ভালোবাসার মানুষকে কিভাবে আগলে রাখতে হয় তা…… কোন কথায় সে কষ্ট পায়, সেসব কিভাবে বোঝাবে? জোরে জোরে কাদঁছে সে। একটুও আটকানোর প্রয়াস নেই নিজেকে।

ইরফানও আটকাচ্ছেনা। কাদুক, ওর সামনে বসে বসে কাদুক। ওর কথায় কষ্ট পেয়ে কাদুক, ওর ভালোবাসার যন্ত্রণায় কাদুক। এসব মাতব্বরি করে দুনিয়া ছাড়তে চাওয়ার শাস্তি। মাসের পর মাস ওকে চার দেয়ালে বন্ধি রেখে বিদেশ ঘুরার শাস্তি। ওর কোন খবর না নেওয়ার শাস্তি। অন্য কারো সাথে এনগেজমেন্টে মত দেওয়ার শাস্তি। আর এ শাস্তি সেদিন শেষ হবে, যেদিন সুন্দরমতো তাকে বিয়ে করবে।

মুখে হাত দিয়ে অনবরত কাঁদতে থাকা তোশার দিকে তাকিয়ে মুখে শিষ বাজাতে বাজাতে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দেয় সে।

মাঝে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে দাড়ায়। উর্ণাটা ওর গাঁয়ে মেলে দিয়ে পাঠায় ফ্রেশ হয়ে আসতে। নিজেও ততক্ষণে ওকে পাহারা দিতে দিতে একটা সি গা রে ট টানে। তারপরে ফ্রেশ হয়ে আসলে হাত ধরে আবার নিয়ে এসে রওনা দেয়।

এখন তারা সরোয়ার বাড়িতে পৌছেছে। তোশাও নিজেকে সামলে নিয়েছে ততক্ষণে।

কান্নার ছাপ কিছুটা থাকলেও নিজেদের মধ্যকার হইহল্লরে আর ব্যস্ততায় সেসব আর কেউ খেয়াল করেনি। ওরা এলে নাস্তা করে বাকিদের সাথে যোগ দেয়। এতো দেরি করে এসেছে কেন জানতে চেয়েছিলেন অবশ্য অন্তিকের মা। কিন্তু ওরা কোনরকমে কাটিয়ে দিয়েছে সে কথা।

সময়টা রাত ৮ টার দিকে। নিচের হইহল্লর শেষে মেহেরিন, দিথী, ইশি সহ ছেলেরা মিলে ওদের বাসর সাজানোর প্ল্যান করে। দিগন্তকে দিয়ে ফুল আনিয়েছে। প্ল্যান মূলত ইরফানের। তার কথামতো হচ্ছে সব। কাউকে বুঝতে না দিয়ে এসব করছে তারা। মাহাদ আর অন্তিক বাবাদের সাথে বসেছে। অয়ন্তিকে কখন নিয়ে যাওয়া হবে, কিভাবে কি করলে ভালো হবে সেসব আলোচনা চলছে। অয়ন্তিকে এর মধ্যে দাদি উপরে নিয়ে যেতে বলেছিলেন, ফ্রেশ হয়ে নিতে। কিন্তু মেহেরিনরা ওকে নিজের রুমে না নিয়ে ইশির রুমে রেখে এসেছে। আর ফ্রেশ হতে তো একদম মানা। বউ হয়ে চুপটি করে বসে থাকার আদেশ আছে।

সেও বসে থাকে। এমনিতেও বাধ্য মেয়ে, তার উপর বিয়েটা হওয়ার পর তার মধ্যে লজ্জ্বার শেষ নেই ভাই বোনদের সবার সামনে। তাই যে যা বলছে চুপ করে শুনছে সে।

ইরফানের তদারকিতে অয়ন্তির রুমে বাসর সাঁজানো হয়। মেহেরিনকে অয়ন্তি একা বসে আছে বলে তার কাছে পাঠানো হয়। বাকিরা বাসর সাজায়।

অয়ন্তির সাথে মেহেরিন গল্প করছিল, ভাবি ডেকে লজ্জ্বায় ফেলছে। নানান দুষ্টুমি করছে। এর মধ্যে সে হঠাৎ বলে উঠে,

“বুঝলি অয়ন্তি? আমি তোর ভাবি হতে না পারলেও তুই আমার ভাবি হয়ে গেলি। কি সৌভাগ্য আমাদের তাইনা? আমাদের মধ্যে ননদ-ভাবি সম্পর্কটা আগে থেকে ঠিক করা ছিল। শুধু আমাদের কল্পনার একটু পরিবর্তনের সাথে। তাও ভালো, কি বলিস?”

অয়ন্তি মেহেরিনের কথা শুনে হাসে।

“আমি তোর ভাবি হলে আমাকে জ্বালাবি বলতি মনে আছে? এবার আমি শোধ তুলবো, দেখে নিস।” কথাটা বলে আবার হেসে উঠে মেহেরিন আর অয়ন্তি।

প্রাণেশা দরজায় দাড়িয়ে ওদের সে কথাগুলো শুনে। ভীষণ অবাক হয় সে। এসব কোন ধরণের কথা? মেহেরিন আপু অয়ন্তি আপুর ভাবি হতে চেয়েছিল মানে? তার স্বামীকে বিয়ে করতে চেয়েছিল? কিন্তু একথা তো সে কারো কাছে শুনেনি। তার মানে মেহেরিন আপুর মা প্রথম প্রথম যে ওকে কঠোরভাবে দেখতো সেসব এ কারণে? বাড়িতে কি সবাই ওদের বিয়ে ঠিক করে রেখেছিল? আর সেটা হয়নি বলে ওকে তেমন একটা পছন্দ করতোনা? নাকি মেহেরিন আপু আর উনার আগে থেকে প্রেমের সম্পর্ক ছিল?

প্রাণেশা শুরু থেকে ভাবে। অন্তিক ওকে পছন্দ করত না আগে। তবে বার বার কাছে আসতে চাইতো। কিন্তু হঠাৎ করেই সেদিন ওকে বিয়ে মেনে নিতে বলে। তখন ওর মধ্যে সব ভুল বোঝাবুঝি দূর হয়ে গেলেও, হঠাৎ ওকে মেনে নেওয়ার কারণ এখনো বলেনি। ওকে ভালোবাসে এমনটা বলেনি। আর শুরুতেই বা কেন মানতো না সেটাও না। যদি সে কথা বলতে পারেনা বলেই হতো, তাহলে এখন কেন মানলো? এখনো তো সে বোবাই। তার মানে এ কারণে মানতো না এটা ঠিক হলেও অন্য কারণও ছিল। আর সেটা মেহেরিন আপু হতেই পারে। সে নিজের মুখেই তো বলছে অয়ন্তির ভাবি হতে চেয়েছে, কিন্তু পারেনি। তার মানে উনারা একে অপরকে ভালোবাসতো? তাহলে এখন নিজের ভালোবাসা ভুলে ওকে মেনে নিলো কেন?

ওর ভাবনার মধ্যে মেহেরিনের চোখ পরে এদিকে। ওকে দেখে অপ্রস্তুত হয়। অয়ন্তিও দেখে। ওরা ভয় পেয়ে যায় কোথাও শুনে নিলো কিনা। কিন্তু প্রাণেশা তার হাতে থাকা খাবারটুকু নিয়ে রুমে প্রবেশ করে, শান্তভাবে সেসব খেয়ে নিতে বুঝিয়ে চলে যায়। মিসেস আয়েশা আমিন মেয়ের জন্য খাবার পাঠিছিলেন তাকে দিয়ে। কিন্তু এসে এমন কিছু শুনতে পাবে ভাবেনি।

ওকে কোন রিয়েক্ট করতে না দেখে তারা ভেবে নেয় প্রাণেশা কিছু শুনেনি।

—————————

অয়ন্তিকে রুমে পাঠানো হয়েছে। সে এখন বিছানায় বসে আছে। তখন প্রাণেশা কিছু শুনেনি ভাবলেও এখন কেন জানি মনে হচ্ছে সব শুনেছে মেয়েটা। ভাই ভাবির মধ্যে আবার এসব নিয়ে ঝামেলা না হয় তা নিয়ে টেনশন হচ্ছে তার। এই তো সেদিন সব ঠিক হলো।

আবার তাদের দোষে সেখানে কোনরকম ঝামেলা সৃষ্টি হলে সেটা মোটেও ভালো হবেনা।

এসব ভাবনার মধ্যে মাহাদ রুমে প্রবেশ করে। তবে অয়ন্তির সেদিকে খেয়াল নেই। তার তো রুমে যে ফুল দিয়ে বাসর সাজানো হয়েছে সেদিকেও খেয়াল নেই। সে এসেছিল রুমে বোনেদের সাথে। সবাই ওর সাথে দুষ্টুমি করে চলে গেলে সে বিছানায় বসে একটু আরাম করে। ভেবেছিল একটু বসে ফ্রেশ হয়ে নেবে। বসে ভাবির কথা ভাবছিল। এর মধ্যে মাহাদ এসেছে।

মাহাদকে আসতে অনেক কাঠখড় পুড়াতে হয়েছে। তারা সবাই খেয়েধেয়ে বসলে, নানী বলে সে যেন উপরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেয়। এখন উপরে বলতে কোন রুমে বুঝিয়েছে তাও সবাই বুঝতে পেরেছে। তাই সে খেয়ে সবাই যার যার রুমে চলে গেলে নিজেও বউয়ের রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। কিন্তু রুমের বাইরে ইরফান ভাই পুরো বাহিনী নিয়ে দাড়িয়ে ছিল। ভেতরে নাকি ফুলের বিছানায় সুন্দরী ললনা আছে। এতো সহজে ঢুকতে দেওয়া যাবেনা। মাহাদ এর মধ্যে এরা বাসর কবে সাজালো ভেবে অবাক হলেও মনে মনে খুশি হয়। কথা না বাড়িয়ে যা চাচ্ছে তা দিয়ে চলে এসেছে। এতে আবার তারা বিরক্ত। আরেকটু মজা করবে ভেবেছিল। কিন্তু সে কোন কথা না বাড়িয়ে দাবি পূরন করে দিয়েছে। এটা কোন কথা? বেশি কথা বাড়ালেও তাদের সমস্যা আবার কথা না বাড়িয়ে দিয়ে দিলেও তাদের সমস্যা।

মাহাদ রুমে ঢুকে বিছানায় বসে থাকা অয়ন্তির দিকে তাকিয়ে দরজা লাগায়। অয়ন্তি এখনো মাহাদের উপস্থিতি টের পায়নি। সে নিজ ভাবনায় মশগুল। দরজা লাগানোর শব্দে ঘাড় কাত করে তাকালে মাহাদকে দেখে থমকে যায়।

“ত তুমি? এখানে?”

মাহাদ কোন কথা বলেনা। ওর আতঙ্কিত মুখটা দেখে।

অয়ন্তি আবার বলে,

“তুমি এখানে কেন মাহাদ ভাই?”

মাহাদ ভ্রু তুলে বলে,

“তো কোথায় যাবো?”

অয়ন্তি ঘামছে।

“না মানে, তুমি এখানে এসেছ……ক কে আসতে বলেছে? বাবা, মা, ভাইয়া ওরা জানে?”

“তোর বাবা, ভাইকে জিজ্ঞেস করে তোর কাছে আসতে হবে এখন?”

“তাহলে তুমি কেন এসেছ?”

“একটু আগে নগদ বিশ লাখ টাকা কাবিন দিয়ে তোকে বিয়ে করেছি তোর বাপ ভাইয়ের অনুমতি নিয়ে তোর কাছে আসতে?”

“তোমার কথার ছিরি এমন কেন? সবসময় আমার বাবা আর ভাইয়াকে কথা শুনাও।” অয়ন্তি বিরক্ত হয়ে বলে।

“তো তোর বাবা, ভাইকে কি প্রণাম করবো? তোর ভাই শেষে এসে বিয়ে আঁটকে দেওয়ার ধান্দায় ছিল দেখিসনি? আমার তখন ইচ্ছে করছিল ভাবিকে তার মামার বাড়ি গিয়ে রেখে আসতে।” তারপর বিরক্ত ভঙ্গিতে হাতের ঘড়ি খুলতে খুলতে ভাবে মামাটাও সেইম। শুরু থেকে আপত্তি করতে চাচ্ছিল। মামী না থাকলে আজকে কি যে হতো।

“আর তখন যে তোমার নাম করলো, সেসব চোখে পড়েনা? আমার ভাই তোমার সামনে পেছনে নামই করে, তুমিই খালি ওদের দোষ খুঁজে খুঁজে পেছনে লাগো।”

মাহাদ বিরক্ত চোখে তাকায়। এই মেয়ে শুধু বাপ ভাইয়ের সাফাই গাইতে গাইতে থাকে। আর এখন থেকে সারাজীবন তাকে সেসব শুনেই কাঁটাতে হবে। সে ভাবে অভ্যাস করে নিতে হবে এখন থেকেই। মাহাদ কোন উত্তর না দিলে অয়ন্তি চোখ ফিরিয়ে নিবে তখন চোখ পরে দরজায়। লক করে দিয়েছে ভেতর থেকে।

তাকে এমন শক্ত হয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে মাহাদ চোখ তুলে তাকায়। অয়ন্তি আতঙ্কিত স্বরে বলে,

“দরজা বন্ধ করেছ কেন?”

মাহাদ পেছন ফিরে একবার বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বলে,

“করব না?”

অয়ন্তি উত্তর না দিলে মাহাদ আবার বলে,

“স্বামী স্ত্রী একসাথে রুমে থাকলে দরজা লাগিয়ে দিতে হয় জানিস না?”

অয়ন্তি স্বামী স্ত্রী শুনে কেপে উঠে।

“স্বামী স্ত্রী?” কাপা কাপা গলায় বলে।

“হ্যাঁ, একটু আগে কবুল বললি মনে নেই?”

অয়ন্তি লজ্জ্বায় চোখ নামিয়ে নিতেই চোখ পরে ফুলের বিছানায়। সে ভীষণ অসহায় বোধ করে এবার।

“ফুল কেন?” লজ্জ্বায় যেন কেদে দেবে এমন ভাব তার।

মাহাদ সামনে এগিয়ে আসতে আসতে বলে, “বাসরের খাট ফুল দিয়ে সাজানো হয়, তাও ভুলে গেছিস?”

“বাসর?? মাহাদ ভাই!!......” ভীষণ অসহায় কণ্ঠে ডেকে উঠে।

“কি?”

“এসব কথা কেন বলছ? আজকের রাতটা অন্য কোথাও থাকতে পারতে।” অয়ন্তির বুক ধরফর করছে। দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। সবাই যে বাসর সাঁজিয়েছে তাও সে জানতো না। রুমে এসেও খেয়াল করেনি। করলে এসব ফুল ঝেড়ে ফেলে দিত। কিন্তু বেখেয়ালে চোখ পরেনি সেদিকে। এখন অসহায় লাগছে। গা শিউরে উঠছে এসব দেখে।

মাহাদ অয়ন্তির অবস্থা বুঝতে পারে। ওর ভীষণ কাছে এসে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,

“আজকের রাতটাই তো একসাথে থাকার রাত আমাদের। অন্য কোথাও কেন থাকব?”

মাহাদের হঠাৎ এমন কাছে আসায়, চুমু খাওয়ায় অয়ন্তির শরীর অবশ অবশ লাগছে।

মাহাদের বুকে হাত দিয়ে শাঁর্ট আকড়ে ধরে বলে,

“কি করলে এটা…”

মাহাদ ওর গালে আরেকবার ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,

“কি করলাম?”

‘মাহাদ ভাইই…………”

মাহাদ শাড়ির ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে কোমরের উন্মুক্ত অংশে রাখে। ওকে কাছে টেনে বলে,

“একটু আগে বিয়ে হয়েছে আমাদের। বারবার ভাই ডাকবিনা”

“আমি দাড়াতে পারছিনা, মনে হচ্ছে পড়ে যাব।”

সাথে সাথে মাহাদ ওকে কোলে উঠিয়ে নেয়।

“পরবিনা, আমি আছি”

“তুমি এমন কেন করছ?” কাপা কাপা গলায় বলে অয়ন্তি।

“কারণ বউ তুই এখন আমার।”

“আমার ভয় লাগছে”

“কেন?”

“আমাকে নামিয়ে দাও। আমি ফ্রেশ হয়ে ঘুমাব।”

“আমি সব করে দিচ্ছি।”

“না, প্লিজ”

মাহাদ উত্তর দেয়না।

“আমি ম রে যাব। প্লিজ না।” অয়ন্তি

“হুশ!! আমি আছি, কিছু হবেনা। ট্রাস্ট মি।”

———————

মেহেরিন থেকে গেলেও সকাল সকাল এ বাড়ির দুই জামাইসহ এক মেয়ে চলে গিয়েছে। মাহাদ আর তার বাবার আজকের দিনটা ফ্রি থাকার কথা থাকলেও তা ছিল না। রাতেই আরেকটা মিটিং ফাইনাল হয়। আর সকাল সকাল চলে গিয়েছে দুজনে। মাহাদের মাও চলে গিয়েছেন স্বামী, ছেলের সাথে। রয়ে গিয়েছে শুধু মেহেরিন। অয়ন্তির উঠতে অনেক দেরি হয়। সে উঠে নিচে আসলে দেখে সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। কেউ তার দিকে তেমন মনোযোগ দেয়না। ইচ্ছে করেই, যাতে মেয়েটা অস্বস্তি বোধ না করে। সে নিচে আসতে আসতে সবাই নাস্তা করে নিয়েছে। এখন নিজেদের কাজে মগ্ন।

নীরবে ডাইনিং থেকে খেয়ে উঠে উপরে চলে যেতে নিলে সোফায় বসে থাকা দাদি ডেকে উঠে। সে ইতস্তত করে পাশে যায়। দাদি ওকে বসতে বলে।

“কেমন হলো অভিজ্ঞতা?”

অয়ন্তি মেকি রাগ দেখিয়ে লজ্জ্বা পেয়ে উঠে চলে যেতে চায়।

“আরে আরে বসো নাতনি। এতো লজ্জ্বা পেতে হবেনা আমার কাছে। সব জানি, বুঝি। তোমার সময় কাটিয়ে এসেছি।”

“বুড়ো বয়সে এসেছ, তাও শয়তানি যায়নি তোমার। তাছাড়া তোমরা সবাই মিথ্যুক। আমি আর কারো সাথে কথা বলব না।”

“এতো বড় অপবাদ? কি মিথ্যাচার করেছি আমরা, বলো বলো।”

“করো নি? আমাকে সময় দেবে। এখন কি সংসার শুরু হচ্ছে নাকি যে ভয় পাচ্ছিস? আরও কতো কি বলেছিলে। তাহলে কালকে মাহাদ ভাইকে আমার রুমে পাঠালে কেন?”

“আমার ভাইজান আদর সোহাগ বেশি দিয়ে ফেলেছে নাকি? এক রাতেই এতো অভিযোগ? দুদিন পর দেখবো বরকে ছাড়া বাপের বাড়ি থাকতেও আর ভালো লাগবেনা। এখন করে নাও যতো অভিযোগ করার। আর শুনো, বরকে ভাই ডাকতে নেই। আল্লাহ্‌ পাপ দেবেন।”

“তুমিও তোমার নাতির মতো অশ্লীল। তোমার সাথে কথা বলে লাভ নেই।”

“বাবা, সে অশ্লীল তাও জেনে গেলে এক রাতে?”

অয়ন্তি এবার উঠে চলে যেতে চাইলে দাদি হাত ধরে আবার বসান। তারপর সিরিয়াসভাবে বলেন,

“ওষুধ খেয়ে নিও, আজকে রাতে মাহাদ নানুভাই আবার আসবে। আমি বলে রেখেছি যাওয়ার সময়। তাকে নিয়ে আসতে বলবে। লজ্জ্বা লাগলে আমাকে বলো। আমি নিয়ে আসতে বলবো।”

“দাদি……” লজ্জায় আরক্ত অয়ন্তি কাতর স্বরে ডেকে উঠে

“আমি জানি আমি তোমার দাদি, নতুন কিছু জানাও। পারলে নানী শাশুড়ি ডাকো। আর শুনো, আমি মজা করছিনা। তোমাকে ওবাড়িতে যখন রিসিপশন হবে তখন তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বাচ্চা হয়ে গেলে তোমাদের জন্যই সমস্যা। অপ্রস্তুত হবে সবার সামনে। তাছাড়া এ বিষয়টা দেখতেও সুন্দর দেখায়না আমাদের সমাজে। যদিও আল্লাহর ইচ্ছার আগে কোন কথা নেই। কিন্তু আমি তোমার দাদি, তোমার ভালো চাই দেখে পরবর্তীতে যেন লজ্জ্বায় না পড়ো তাই আগে থেকে সাবধান করে রাখলাম।”

অয়ন্তির লজ্জ্বায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। তাও মিনমিন করে কোনভাবে বলে,

“ওসব কিছু হয়নি দাদি, তুমি ভুলভাল ভাবছ।”

“আচ্ছা?” অয়ন্তির দিকে ফিরে ওকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বলে

“হু”

“ঠিক আছে।”

অয়ন্তি আর দাড়ায়নি। আস্তে আস্তে উঠে পালিয়েছে কোনভাবে।

দ্বিতীয় খন্ড



বাড়িতে এ কদিনের টানা ব্যস্ততায় প্রাণেশা, দিথী, ইশি সবারই পড়া সব পিছিয়ে গিয়েছে। তাই আজ ওদের সবাইকে মিসেস আয়েশা আমিন যার যার কলেজ, ইউনিভার্সিটি যাওয়ার জন্য বলছেন বার বার। মেয়েগুলো সব এত এত পড়া মিস দিয়েও চুপচাপ। কারো কোন টেনশন নেই, উনাকেই বার বার বলে বলে পড়ার কথা স্মরন করিয়ে দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে প্রাণেশা সব চেয়ে পিছিয়ে আছে। নানান ঝামেলায় বেশ অনেক গুলো দিন কলেজ মিস দিয়েছে মেয়েটা। তাই ওর যাওয়া তো আবশ্যক মনে করছেন তিনি। দিথীও যাবে, তবে ইশির আজ পিরিয়ড হয়েছে। তাই সে যাবেনা। মেহেরিনও চলে যেতে চাচ্ছে বাড়ি। ওর ও নাকি কি কাজ আছে। তো সকাল সকাল মেহেরিন, দিথী, প্রাণেশা তিন জনেই এক সাথে বের হলো। দিথী তার ইউনিভার্সিটি নেমে গিয়েছে। মেহেরিনও মার্কেট নেমেছে। ওর কিছু কেনার আছে। তারপর এদিক থেকে বাড়ি চলে যাবে। আর প্রাণেশাও যথাযথভাবে তার কলেজ চলে গেল।

প্রাণেশা এখন ক্লাসরুমে বসে আছে। তার বান্ধবী মেহা এখনো আসেনি। কেন আসলনা কে জানে। আসার আগে তো যোগাযোগ করে এসেছিল। এতক্ষণে পৌছে যাওয়ার কথা। তাহলে?

ওর ভাবনার মধ্যেই ক্লাসরুমে প্রবেশ করতে দেখা যায় মেহাকে। সে হাত নাড়ায়। ওর ইশারায় মেহা এসে পাশে বসলে প্রাণেশা তার দিকে তাকায় । চোখ মুখ শুকনো লাগছে। মনে হচ্ছে সারারাত ঘুমায়নি। মেহা কি কোন সমস্যায় পড়েছে? একথা ভেবে সে জানতে চাই কি হয়েছে তার। চোখ, মুখ এমন লাগছে কেন?

ওর কথা শুনে মেহা বলে,

“আর বলিসনা বোন, বাড়িতে অনেক সমস্যা চলছে। কিভাবে যে আজকে কলেজে এসেছি আমিই জানি।”

প্রাণেশা ওর কথা শুনে ইশারায় কি সমস্যা জানতে চাই।

“আমার আপুকে নিয়ে। ওকে দুদিন হলো শ্বশুর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে আমার বাবা। ওর যে বরটা আছে? অদ্ভুদ মানুষ একটা। আমার আপুকে একটুও শান্তি দেয়না। আমার পরিবারের কাছে কতভাবে অনুরোধ করে ওকে বিয়ে করেছিল তখন। তবে আমার বাবা, ভাইয়া ওকে আগে নিজের পায়ে দাড় করাতে চেয়েছিল বলে মানাও করে দিয়েছিল। কিন্তু ওদের মিষ্টি মিষ্টি কথায় এসে বিয়ে দিয়েছে, আর এখন ভুগতে হচ্ছে।”

“মূল সমস্যা কি? নিয়ে এসেছে কেন? আর আপুকে কি ভালোবাসেনা ওর স্বামী?” সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ

“আল্লাহ্‌ মালুম, ভালোবাসে কি বাসেনা। বাসলেও বুঝতে পারিনা কেমন ভালোবাসা এসব। একটা মানুষ এত টক্সিক কি করে যে হয়। দুলাভাই আমাদের এক আত্মীয়ের বিয়েতে আপুকে দেখে পছন্দ করেছিল। প্রস্তাব পাঠালে আমার বাবা মা না করে দিলেও পরে ওদের নানান অযুহাত, কথাবার্তায় এসে বিয়ে না দিয়ে পারেনা। আমাদেরও মনে হতো ভাইয়া বোধ হয় আপুকে ভীষণ ভালোবাসে। তো বিয়ে হয় খুব ধুমধাম করে। আমার আব্বুর এক টাকাও খরচ হয়নি। সব ওরা করেছে স্বেচ্ছায়। আপুকে পেতে খুব বেগ পোহাতে হয়েছিল কিনা? তাই খুশি হয়ে তারাই সব করেছিল। এভাবে বিয়ের পর তিন বছর গেল। আস্তে আস্তে সব অন্যরকম হলো। আপুর স্বামী নাকি ছোটবেলা থেকে ভীষণ মেজাজি। তাই আপুর হাতে তিনটা আঙ্গুল না থাকা স্বত্তেও আপুকে বিয়ে করতে চাওয়ায় তার পরিবার তেমন আপত্তি করেনি, ছেলেকে ভয় পায় বলে। কিন্তু বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর ওর শ্বশুর বাড়ির লোকজন ওকে নানান ভাবে অপদস্ত করে ভাইয়ার অনুপস্থিতিতে। ভাইয়া জানতে পেরে সবাইকে সাবধান করে, বাবা মায়ের সাথে ঝামেলাও হয়। কিন্তু নিজেও আপুকে সবসময় নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়তো সে, আপু উনার উপর কোন কথা বলতে পারেনা। বললেই শাস্তি দেয় নানানভাবে। সাইকোদের মতো বিহেভ করে। এদিকে আপুকে মা রবে ধ রবে অপ মান করবে। আবার আপুকে ছাড়া থাকতে পারবেনা।”

তারপর একটু ইতস্তত করে মেহা আবার বলে,

“কিছুদিন আগে একবার আপু অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলে স্বামী স্ত্রীর অতিরিক্ত মেলামেশার কারণে এমন হয়েছে। কি লজ্জ্বার কথা!! এসব অবশ্য কেউ জানেনা। আমি তো এমন নানান গোপন খবর সংগ্রহ করে থাকি, সে হিসেবে জানি আরকি। তো এবার ভেবে দেখ। কত টা জালিম। আমার আপুকে সারাদিন কতভাবে নির্যাতন করে। তারপর আপু সুস্থ হলে আব্বুকে বলে বাড়ি আসতে চায় সে। আমার মনে হয় ভাইয়া আপুর মধ্যে কোন ঝামেলা চলছিল আগে থেকে, বা আপু কোন কারণে বেশি কষ্ট পেয়েছে। নাহয় আমার আপু ওর স্বামীর উপর তেমন কথা বলেনা। তো আব্বু নিয়ে এসেছিল। এরপর আর যেতে চাচ্ছেনা। দুলাভাই নিতে চাইলেও যেতে চাচ্ছেনা। তারপর আপু গতকাল আবার অসুস্থ হয়ে গেলে, আবার ডাক্তার দেখায়। তারপর সবাই জানতে পারি ও প্রেগন্যান্ট। সারারাত কারও ঘুম হয়নি খুশিতে। কিন্তু ও স্বামীর কাছে ফিরতে চাচ্ছেনা দেখে আবার সবাই টেনশনে আছে। কি জানি কি হবে। দুলাভাই নিয়ে যাবে আপুকে যেভাবে হোক, সেটা জানি। আর আপু প্রেগন্যান্ট জানলে তো কথায় নেই। কিন্তু ব্যাটা একটু শাস্তি পাক, এটাই চাচ্ছিলাম। আমার পরীক্ষার সময় আপু আর তার বিয়ের ডেট ফেলেছিল। একটুও মজা করতে পারিনি। আমার এখনো মনে পরে। শাস্তি পাক ঐ ব্যাটা, আমিন।”

প্রাণেশা জানতে চায় ওর আপুর হাতে আঙ্গুল নেই কেন?

“ছোট থাকতে একবার এ ক্সি ডেন্ট করেছিল। তখন আঙ্গুল কে টে গিয়েছিল তিনটা। সেই থেকে আরকি।”

————————

“মিস, আপনি সাদা ড্রেস পড়ে আছেন। এভাবে বৃষ্টিতে ভেজা উচিত হচ্ছেনা।”

মেহেরিন মার্কেট থেকে কিছু টুকটাক জিনিস কিনে বাড়ি ফিরবে ভেবেছিল। বাড়িতে ফোন করে বলেছে নিউ মার্কেটের ওখানে গাড়ি পাঠাতে। এতক্ষণে এসে যাওয়ার কথা। কিন্তু একটু আগে ড্রাইভার কাকা কল দিয়ে জানালো গাড়িতে কিছু সমস্যা হয়েছে, মাঝরাস্তায় আঁটকে পড়েছে হঠাৎ।

একথা শুনে মেহেরিন হাটতে শুরু করে। রিকশা নিয়ে চলে যেতেই পারত। কিন্তু ওপাশে ফুটপাতের উপর কিছু দোকান দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন কালারের ফুল, চুড়ি, দুল, চুলের ক্লিপসহ মেয়েদের আরও নানানরকম জিনিসপত্র দেখা যাচ্ছে। সে হাঁটতে হাঁটতে ওগুলো দেখতে যায়। কিন্তু এর মধ্যে বৃষ্টি চলে এসেছে। দোকানিরা নিজেদের মালপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে। সবাই বৃষ্টি থেকে বাচতে নানান জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। পুরো জায়গাটা এখন খালি বলতে গেলে। দোকানপাট তুলে নিয়েছে দেখে সে আরও কিছুটা দূরে চলে গেল হেঁটে হেঁটে। ওদিকে কেউ নেই। ওখানে দাড়িয়ে সে ভিজছে। ভালোই লাগছে। এভাবে হঠাৎ বৃষ্টি চলে আসবে আশা না করলেও এভাবে ভিজতে মন্দ লাগছেনা। ভেবে সে দুহাত মেলে দিয়ে বৃষ্টি বিলাস করছিল। হঠাৎ কারো কণ্ঠে ধ্যান ভাঙে। ছাতা হাতে দাড়ানো সুদর্শন এক যুবক। তাকেই বলেছে কথাটা। কিন্তু কি কারণে বললো তা বুঝতে না পেরে জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। যুবকটা আবার বলে,

“আপনি সাদা ড্রেস পড়েছেন।”

“তো?”

মেহেরিনের অবুঝ প্রশ্নে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যুবকটা তার শরীরে একবার চোখ বোলায়। মেহেরিন এতে হতবম্ব হয়। আজাইরা মানুষ। রাস্তায় অচেনা মেয়েকে হঠাৎ বলছে সে সাদা ড্রেস পড়েছে। আবার কারণ জিজ্ঞেস করলে বাজে দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। তবু মাথা ঠাণ্ডা রেখে আনমনে নিজের দিকে তাকায় সে। আর ওমনি হতবাক হয়। হায় আল্লাহ্‌! সে তো খেয়াল ও করেনি এত কিছু। মেহেরিন সংকুচিত হয়ে যুবকটার দিকে তাকায়। কি করবে বুঝতে পারছেনা এই মুহূর্তে। এমন বোকামো করা তার উচিত হয়নি। এদিকটাই বেশি মানুষ না থাকলেও সে খেয়াল করে দেখে, যে কজন আছে তারাই চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে ওকে। সে যুবকটিকে কোন ভাবে ধন্যবাদ জানিয়ে একটা রিকশা পাওয়ার আশায় এদিক ওদিক তাকায়।

“এই বৃষ্টির মধ্যে রিকশা বা গাড়ি কোনটাই পাবেন না। আমার গাড়িতে আসুন। কোথায় যাবেন আমি আপনাকে ড্রপ করে দিচ্ছি।”

অচেনা লোকটা যেচে ওকে সাহায্য করেছে ঠিক। কিন্তু এমন প্রস্তাবে সে সন্ধীহান চোখে তাকায়।

“এভাবে তাকানোর কিছু নেই। আমি কোন মেয়েধরা নই। আপনাকে সাহায্য করতেই বলা। আপনি উঠুন গাড়িতে। আশেপাশের মানুষের দৃষ্টি মোটেও সুবিধার নয়, আর না আপনার বাহ্যিক অবস্থা। তাড়াতাড়ি উঠুন।”

লোকটার কথা শুনে মেহেরিন। তবে কিছু বলবে তার আগে লোকটা তাকে ধমক দিয়ে বলে,

“উঠতে বলেছি না? এখানে এভাবে দাড়িয়ে থাকতে বেশি ভালো লাগছে? বাইরের মানুষকে দেখাতে হবেনা। গাড়িতে উঠো, আমি দেখবো।”

মেহেরিন ধমক শুনলেও এমন অপমানজনক কথার বিপরীতে কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু লোকটার রাগী চেহারা দেখে কেন জানি কিছু বলতে চেয়েও পারল না। লোকটার খুলে দেওয়া দরজা দিয়ে গাড়িতে ঢুঁকে গেল।

————————

গাড়িতে উঠে সবার আগে মেহেরিনকে একটা তোয়ালে দিয়ে লোকটা মাথা মুছে নিতে বলে। সে থমথমে মুখে নিয়ে মাথা না মুছে গাঁয়ের উপর জড়ায় ওটা।

“আগে মাথা মুছুন, তারপর গাঁয়ে দিয়েন।”

“লাগবেনা।”

“লাগবে, আগে মাথা মুছুন।”

মেহেরিন এবার বিরক্তি নিয়ে বলে,

“আপনার সমস্যা কি জানতে পারি? আপনি কে? আমাকে নিয়ে এত ভাবতে হবেনা আপনার। তখন আমাকে হেল্প করেছেন, এজন্য ধন্যবাদ। এবার আমাকে আমার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিন, তাহলেই হবে।”

তুরাগ শান্ত দৃ্ৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে।

“আপনার ঠাণ্ডা লেগে যাবে মেহেরিন। আগে মাথা মুছুন। আপনার শরীরে এতক্ষণ যখন অশ্লীল নজর দেইনি। এখনো দেবনা। নিশ্চিন্তে মাথা মুছুন।”

মেহেরিন বিস্ফোরিত চোখে লোকটাকে দেখছে।

“আপনি আমার নাম জানলেন কিভাবে?”

তুরাগ একবার ওর দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে বলে,

“সেটা আপনাকে ভাবতে হবেনা। আপনি মাথা মুছুন, আমি ঠিকভাবে আপনাকে বাড়ি পৌছিয়ে দিচ্ছি।”

“জানতে হবেনা কেন? আপনি আমার নাম জানেন কিভাবে?”

“বলেছি তো না জানলেও চলবে।”

“চলবেনা, বলুন। আপনার উদ্দেশ্য কি? আমাকে চিনেন কিভাবে? নাহলে আমি গাড়ি থেকে লাফ দেব।”

তুরাগ ওকে এমন করতে দেখে ভ্রু টানটান করে ঠাণ্ডা চোখে দেখে। তারপর কোন কথা না বলে ড্রাইভ করতে থাকে।

“আপনি বলছেননা কেন? আমি কিন্তু সত্যি সত্যি লাফ দেব।”

তুরাগ হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে দেয়। তারপর ওর দিকে ফিরে বিরক্ত মুখে বলে,

“আপনি তো আগে এমন বকবক করতেন না? অনেক পাল্টে গেছেন দেখছি। আমি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব বলেছি তো নাকি?”

“আপনি কে?” মেহেরিন ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে বলে। কারন লোকটার কোন কথা তার সুবিধার লাগছেনা। সে নাকি আগে বকবক করতো না। কিন্তু এই লোক এসব জানলো কিভাবে?

মেহেরিন কে ভয় পেতে দেখে তুরাগ দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

“আমাকে আপনি মনে করতে পরছেননা মেহেরিন?”

লোকটার কথায় কেমন এক ধরণের আক্ষেপ, অভিমানের সুর পেল মনে হচ্ছে তার। যদিও চোখে মুখে তেমন কিছুর আভাস নেই।

“আপনাকে আমার চেনার কথা?”

লোকটা হেসে বলে,

“ওহ, আপনিতো চিনতেও পারছেন না। মনে রাখবেন কিভাবে।”

মেহেরিন দ্বিধান্বিত চোখে তাকায়। একটু থেমে বলে,

“আ আপনি কে? আমার চেনার কথা কেন?”

“অন্তিককে তো চেনেন? মনেও আছে নিশ্চয়?”

মেহেরিন হঠাৎ অন্তিকের নাম আসায় একটু থমকায়। অন্তিক ভাইয়ের নামটা আজও তাকে অনেক জ্বালায়। শুনলেও কেমন নিজেকে ভগ্ন ভগ্ন লাগে। অন্তিকের নাম শুনতেই ওর চেহারার পরিবর্তন দেখে তুরাগ চোখ বন্ধ করে নেয়।

মেহেরিন নিজেকে সামলে বলে,

“অন্তিক ভাইয়ের কথা বলছেন? তাকে কিভাবে চেনেন?”

“হ্যাঁ, আপনার মামাতো ভাই অন্তিকের কথায় বলছি। আমি তার খালার ছেলে হই, তুরাগ।”

মেহেরিন হতবাক হয়ে তাকায়। তুরাগ? মানে যার জন্য অয়ন্তিকে দেখতে আসার কথা ছিল কাল? কিন্তু ভাইয়ার কারণে ক্যান্সেল করেছে সেটা সবাই……

“আ আপনি? মানে অন্তিক ভাইয়ের খালাতো ভাই? মানে কাল……” সে শেষের কথাটা বলতে গিয়ে থেমে যায়।

“হ্যাঁ, সেই। যার জন্য অয়ন্তিকে দেখতে যাচ্ছিল সবাই কাল।”

মেহেরিন সংকুচিত হয়ে যায়। কোন কথা বলেনা। সে ভাবে তার ভাইয়ের জন্য বেচারা কাল বউ দেখতে আসল না। অপমানিত বোধ করেছে হয়তো। আর তাই শাসাতে চাইছেনা তো মেহেরিন কে? এমন আজগুবি ভাবনা চলে আসে তার মাথায়। সেতো আর জানেনা, তুরাগ নিজেও আপত্তি করে দিয়েছিল শেষ মুহূর্তে অয়ন্তিকে দেখতে। তার জন্যই।

মেহেরিনকে তুরাগ আগে থেকে ভালোবাস তো। বড় হয়ে এই মেয়েটাকে সে দুই/তিন বার দেখেছে খালার বাড়িতে। প্রথম দেখা থেকেই ওকে ভালোবাসতো সে। কিন্তু তখন এটাও বুঝে গিয়েছিল, সে যাকে ভালোবাসে তার মনে অন্য কেউ। তুরাগ মেহেরিন কে তেমন কাছ থেকে কখনো সেভাবে পায়নি। সেই দুই কি তিনবার দেখার ভালোবাসা এই মেয়েটা। ছোট মেয়েটার মনে অন্তিক আছে জেনে সে আর কখনো নিজের মনের খবর ওকে জানানোর কথা ভাবেনি। আর না বলার জন্য দেখা পেয়েছে মেহেরিনের। সে তো এত বছর ভেবেছিল অন্তিকের সাথে মেয়েটা প্রেমের সম্পর্কে রয়েছে হয়তো এত দিনে। ওকে অনেক ভুলতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। তারপর সেবার জানতে পারে অন্তিকের বিয়ে হয়েছে। সে আর কিছু শুনেনি অন্তিকের বিয়ে হয়েছে কথাটা শুনার পর। মেহেরিনকেই বিয়ে করেছে ভেবেছিল। তারপর একদিন শুনে তার বাবা মা একটা মেয়ে দেখতে যাবে ঠিক করেছে তার জন্য। সে কোন রা করেনা। কারণ তার এসব নিয়ে তখন আর কোন অনুভুতিই নেই। যেদিন বাড়ির সবাই মেয়ে দেখতে যাবে সেদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে অন্য একটা গাড়িতে মেহেরিনকে দেখেছিল তুরাগ। হয়তো বাবা, মায়ের সাথে মামা বাড়িতেই যাচ্ছিল। ওকে দেখে পুরনো অনুভূতি কেমন তাজা তাজা লাগছিল। অস্থির হয়ে নিজেকে পাগল পাগল মনে হচ্ছিল। তারপর কথায় কথায় গাড়িতে ওর পাশেই বসে থাকা চাচাতো ভাইয়ের কাছে জানতে পারে আজকে অয়ন্তিকেই নাকি দেখতে যাচ্ছে সবাই। তার খালাতো বোন অয়ন্তিকে। সে ভীষণ অবাক হয়। তারপর তার চাচাতো ভাই আবার বলে,

“সেদিন তোর খালা ছোট মাকে বলেছে শুনলাম তোর খালাতো ভাই অন্তিক নাকি কোন বোবা মেয়ে একটাকে বিয়ে করেছে? সত্যি নাকি? এত বড় আইনজীবী হয়ে বোবা মেয়েকে বিয়ে করলো? দেখেছিস তুই?”

“বোবা মেয়ে? তোকে এসব কে বলেছে?” তুরাগ ভ্রু টানটান করে বলে।

“তোর খালায় তো বললো তার ছেলের বউ কথা বলতে পারেনা। তাই ওকে বাড়ি রেখে এসেছে বলে চিন্তা হচ্ছে। মেয়েটা নাকি কিছু মুখ ফুঁটে চায় না।”

তুরাগ অবাক হয়ে শুনে।

“তুই শিউর এসব শুনেছিস?”

“আমাকে কি বয়রা লাগে? যে উল্টাপাল্টা শুনবো।”

তারপর নিজে খোঁজ লাগিয়ে সব জানতে পারে সে। অন্তিকের বিয়ে মেহেরিনের সাথে হয়নি। অন্য কারো সাথে হয়েছে। মেহেরিন এখন কারো নয়। ওর বিয়ে হয়নি। একথা শুনে সে অনেক্ষন চোখ বন্ধ করে বসে থাকে। কি কি জানি ভাবছে, তারপর হঠাৎ মাকে ফোন দিয়ে অয়ন্তিকে দেখতে যেতে মানা করে দেয়। অথচ উনারা তখন সরোয়ার বাড়ির খুব কাছাকাছি চলে এসেছিলেন। তুরাগ কে অনেক বুঝালেও সে নিজের কথায় অনড়। তার মা এসবের কারণ জানতে চাইলে, সে বলে দেয় মেহেরিনের কথা। সে বিয়ে করলে ঐ মেয়েটাকে করবে। আর কাউকে না।

তুরাগ এসব ভেবে মেহেরিনের দিকে তাকায়।

“এখন মনে পরছে আমাকে?”

“হু? না মানে… সেভাবে মনে নেই। আপনার সাথে কি আগে কখনো দেখা হয়েছিল?”

“তিনবার দেখা হয়েছিল। ” তুরাগ মাথাটা সিটে এলিয়ে দিয়ে বলে।

“ওহ”

তুরাগ বিরবিরিয়ে বলে,

"হু, তিনবার দেখায় আপনি আমার মনে রাজ করে ফেললেন। অথচ আমাকে আপনি সামান্য মনের কোনেও জায়গা দিলেননা, যে জীবনে চলার পথে কখনো দেখা হলে চিনতে পারবেন।"

এরপর অনেক্ষণ কেউ আর কোন কথা বলেনা। মেহেরিন বলছেনা ভয়ে, দ্বিধায়। আর তুরাগ কি ভাবছে তা সেই জানে। সিটে মাথা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে ছিল সে। মেহেরিন কি বলবে খুজে পাচ্ছেনা। এদিক সেদিক তাকায়, আবার তুরাগ ঘুমিয়ে গেল নাকি দেখে, বুঝতে পারছেনা। তাই আবার বিরক্তি নিয়ে বসে থাকে। ভেজা কাপড়ে অস্বস্তি হচ্ছে তার।

“ব বলছিলাম, আপনার বেশি ঘুম পেলে বাড়িতে গিয়ে ঘুমাতে পারেন, এখানে আরাম পাবেন না। আমাকে একটু কষ্ট করে বাড়ি পৌছে দিয়ে বাড়ি গিয়ে ঘুমান প্লিজ।”

ওর কথা শুনেও তুরাগের কোন হেলদোল দেখা যায়না। এরপর আরও পাঁচ মিনিট কেটে গেলে তুরাগ হঠাৎ চোখ খুলে বলে,

“আমি এতক্ষণ নিজেকে প্রস্তুত করছিলাম। কিসের জন্য আপনি জানেন?”

মেহেরিন অবাক হয়ে তাকিয়ে মাথা নাড়ায়।

“আপনাকে প্রস্তাব দিতে। আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই মেহেরিন। আপনাকে ভালোবাসি অনেক বছর। কিন্তু আপনি তখন মামাতো ভাইয়ের প্রেমে মত্ত। আমি দূরে সরে গিয়েছিলাম আপনার মনে অন্য কেউ আছে জেনে। মনে মনে ভালোবেসে গেলেও কখনো আপনার সামনে আসিনি। তারপর আপনি বিদেশে চলে গেলেন। একদিন শুনলাম অন্তিক ভাই বিয়ে করেছেন। আমি ভেবেছিলাম আপনার সাথেই হয়েছে। তাই আর কিছু জানতে চাইনি ঐ ব্যাপারে। গতকাল জানলাম আপনার সাথে অন্তিক ভাইয়ের বিয়ে হয়নি। অন্য কারো সাথে হয়েছে। এতে আপনি কষ্ট পেলেও আমি ভীষণ খুশি হয়েছিলাম বিশ্বাস করুন। তাই আপনাকে আর ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্ন আসেনা। সৃষ্টিকর্তা আপনার ভালোবাসার পূর্ণতা না রেখে হয়তো আমার ভালোবাসার পূর্ণতা লিখে রেখেছিলেন। আমাকে ফিরিয়ে দেবেননা।”

এরপর মেহেরিন আর কোন কথা বলেনি। কেমন স্তব্দ হয়ে ছিল। বাড়ি গিয়ে সে এটা নিয়ে অনেক ভাবে। কিন্তু কোন কুল কিনারা পায়না। তারপর সেদিন রাতে হঠাৎ বাবা, মা ডেকে বলে তার জন্য নাকি একটা বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। যেটা তাদের সবার ভালো লেগেছে। এখন বিয়ে না দিলেও, মেহেরিনের মতামত পেলে তারা এনগেজমেন্ট করিয়ে রাখতে চায়।

তারপর আবার জানায়, ছেলে নাকি তুরাগই। একথা শুনে সে আর কিছু বলেনি। সম্মতি দিয়ে দেয়। মেহেরিন অনেক ভেবেছে। আর সব শেষে তার একটা কথায় মাথায় এসেছে। সেটা হলো “সৃষ্টিকর্তা আপনার ভালোবাসার পূর্ণতা না রেখে হয়তো আমার ভালোবাসার পূর্ণতা লিখে রেখেছিলেন। আমাকে ফিরিয়ে দেবেননা।”

মৌনপ্রেম পর্ব ৩২ গল্পের ছবি