কাল মিসেস আয়েশা আমিনের বোনের ছেলে মেহেরিনকে পছন্দ করে বলে, শেষ মুহূর্তে এসে অয়ন্তিকে দেখতে মানা করে দিয়েছিল। এই বিষয়টা তখন সরোয়ার বাড়িতে উপস্থিত সকলে শুনতে পেলেও, তারা কেউ মেহমান আসার পর আর এই ব্যাপারে কোন কথা তুলেনি। মি. মাহমুদ আর মাহাদের বাবা মানা করে দিয়েছেন। উনারা কেউ যেন নিজ থেকে মেহমানরা আসলে তাদের সাথে এই বিষয়ে কথা না তুলে, এমনকি মিসেস আয়েশা আমিনকেও মানা করা হয়েছে। তখন ফোনে উনার বোনের কথা শুনে বোঝা গিয়েছে মহিলা ভীষণ চিন্তিত, সাথে লজ্জিত। এমনকি উনার স্বামীও। তারা যেন আগে ছেলের সাথে সবকিছু নিজেরা ক্লিয়ার করে কি সমস্যা তা নিয়ে আলোচনা করতে পারে সে সময় দিয়েছেন মূলত।
বাবা মা হিসেবে ছেলের মেহেরিনকে চাওয়ায় কোন সমস্যা আছে কি না, সেসব আগে নিজেরা ক্লিয়ার হোক, তারপর এই ব্যাপারে এগোতে ইচ্ছে করলে নাহয় নিজেরাই এসে প্রস্তাব দেবে -এমনটাই ভেবেছেন তারা। তাও যদি কোনোরকম দ্বিধা কাজ করে তাদের মধ্যে, তাহলে তখনের জন্য মিসেস আয়েশা আমিনতো আছেন। উনি মধ্যস্ততা করে সবার জন্য নাহয় বিষয়টা সহজ করে দেবেন। আর তাছাড়া সম্পূর্ণ ব্যাপারটা তারা নিজেরা জেনেছে মাঝরাস্তায়। ছেলের সাথে নিশ্চয় এখনো কোনোরকম বোঝাপড়া করতে পারেন নি। উনাদের সেই সময় টুকু দেওয়া দরকার। এজন্যই মূলত সবাইকে মানা করা হয়েছে এই বিষয়ে কথা না তুলতে।
মেহমানরা এসে সবার সাথে ভালো একটা সময় কাটিয়ে চলেও গিয়েছেন। কিন্তু সরোয়ার বাড়িতে এর মধ্যে আরেকটা ঘটনা ঘটে গিয়েছে।
মাহাদের বাবা আর অন্তিকের দাদি, অয়ন্তিকে সব জানিয়ে মাহাদের সাথে আজকেই কাজী ডেকে বিয়ে পড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছেন। মাহাদের বাবার যুক্তি - উনারা এখানে নতুন বিজনেস লঞ্চ করার প্ল্যান করেছেন। এমনকি কিছু বিষয় নিয়ে কাজ শুরুও হয়ে গিয়েছে। এর পর পুরো বিজনেস স্টার্ট করলে তাদের বাবা ছেলের ভীষণ ব্যস্ত সময় কাটবে। এই তো কালও সারাটাদিন বাবা ছেলের মিটিং আর ক্লায়েন্টদের সাথে ডিল করতে করতে কেটেছে। রাতেও মিটিং ছিল, ছেলেটা বাবাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে মাঝরাত অব্দি নিজে সব করেছে।
আজকের দিনটাতো এভাবেই কেটে গেলো। কাল একটা দিন সময় নিলেও পরশু থেকে আবার ব্যস্ত সময় কাটবে তাদের। তারপর সেসব শেষ হতে হতে দেখা যাবে উনাদের আবার লন্ডন ফিরে যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। চলে যাওয়ার আগে নাহয় ব্যস্ততার মধ্যেও একটা দিন সময় করে বাড়িতে রিসিপশন করবেন। যদিও তাদের সব বিজনেস পার্টনারসহ মাহাদের বাবার ভাই-বোনেরাও লন্ডনেই সেটেল্ড, তাদের নিয়ে চিন্তা নেই। ওখানে গিয়ে সময় করে আরেকটা অনুষ্ঠান করা যাবে।
এসব ভেবেই তিনি আজকে বিয়েটা পড়িয়ে রাখার আর্জি জানিয়েছেন। যদিও ছেলে যে শুরু থেকেই এমনটা চাচ্ছিল, তা তিনি বেশ জানেন। তবে ছেলের কথা মাথায় রেখে নয়, তিনি সার্বিক চিন্তা করেই এই প্রস্তাব রেখেছেন। শাইনা বেগমও এতে সায় দিয়েছেন। উনার মতে বাড়িতে জানা জানি হয়েছে, ছেলেও মেয়েটাকে ছোট বড় সকলের সামনে বিয়ে করবে বিয়ে করবে বলে লাফাচ্ছে। এদের বিয়ে না দিয়ে আর মিশতে দেওয়ার দরকার নেই। যেখানে বড় ছোট সবার মাঝে এসব জানা জানি হয়েছে সেখানে বিয়ে না দিয়ে এদের সামনা সামনি আসতে দিতেও উনার আপত্তি আছে।
দাদির কথার সাথে অন্তিক, দিগন্ত কিংবা তাদের বাবারা কেউ একমত হতে পারে নি। তবে মি. মাহমুদ বাকিদের চোখের ইশারায় কথা বলতে মানা করে নিজে মাকে বুঝিয়ে বলবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু অন্তিক সেই ইশারা মানেনি।
“দাদি, তোমার এই বিষয়ে চিন্তা করতে হবেনা। তুমি নিজের নাতিকে সামলে রেখো শুধু। আমার বোন তার সীমানা জানে, আর ওকে দেখে রাখার জন্য সবাই আছি। তুমি সমস্যা যার মধ্যে তাকে সামলাও।”
“চুপ থাক। না বুঝে কথা বলছিনা আমি। তোরা সবাই আমার নাতি, নাতনি। সবার ভালোই আমি চাই। তাই বিয়ের চিন্তা করছি। তুই নিজেকে দেখ। সামলাতে পেরেছিলি নিজেকে বউয়ের কাছে যেতে? তুই যেমন পুরুষ মানুষ, মাহাদও তেমন। সবাইকে উপেক্ষা করে এতো জটিলতার মধ্যেও তুই কতোটা সংযত রাখতে পেরেছিলি নিজেকে, যে মাহাদ পারবে? এক পাক্ষিক ভাবলে হবেনা। সব কিছু বুঝে কথা বল। আর এই ব্যাপারে আর কোন কথা শুনতে চাচ্ছিনা। বিয়ে না হলে আজকের পর মাহাদ নানুভাইয়ের আর এ বাড়িতে আসার দরকার নেই। যখন বিয়ে হবে তখন আসবে। অয়ন্তি দিদিভাইয়েরও ইউনিভার্সিটি বন্ধ রাখা হবে ততোদিন। কিংবা একেবারে বন্ধ না রাখলেও গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে যাবে।”
উনার কথা শুনে অন্তিক ভীষণ বিরক্ত হয়। এই দাদি কিছু কিছু সময় ভীষণ আধুনিক। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে সেকেলে চিন্তা ভাবনার পরিচয় দেয়। সে তার বউয়ের কাছে যাবেনা তো কার কাছে যাবে? যেভাবে হোক বিয়েটাতো হয়েছিল। এসব এমন সময়ে বলার কথা? কিসের সাথে কিসের তুলনা দিলো…
“তোমার এই যুক্তি গুলোর মতো অযৌক্তিক যুক্তি আর নেই বুড়ি, ট্রাস্ট মি। বিয়ের কথা ভাবতে হলে আঙ্কেলের কথা গুলো মাথায় রেখে ভাবো। তা না, সেকেলে ভাবনা নিয়ে আমার বোনকে প্রটেক্ট করতে পারবো না বলছ লেইম বিষয় একটা টেনে।”
প্রাণেশা নিজের আর অন্তিকের বিষয়টা এভাবে সবার সামনে তুলে ধরায় ভীষণ লজ্জ্বা পায়।
যদিও কেউ তাকে দেখতে পায়নি। ছোটরা কেউ নেই এখানে। বড়রাই আছে। সে কিচেনে যাচ্ছিল
একটু। এর মধ্যে এসব কথা কানে আসে। কি লজ্জ্বার বিষয়! অথচ অন্তিক তাও সকলের মাঝে দিব্বি দাড়িয়ে আছে, কথা বলছে। এদিকে তাকে কেউ দেখেনি, তাও তার এসব শুনে কোথাও ছুটে পালাতে ইচ্ছে করছে। সে কাজ সেরে সবার চোখের আড়ালে তাড়াতাড়ি পরাগপার হয়।
শাইনা বেগমের কথায় অন্তিকের কিছু যায় না আসলেও তার মা, চাচী সহ বাকিরা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়। তাই মি. মাহমুদ বলেন,
“অন্তিক, বিষয়টা এখানে থামুক। তোমার আঙ্কেলের কথাগুলো ভাবো। আমার মনে হয় উনি ঠিকই বলছেন। নতুন বিজনেস লঞ্চ করেছে, মোটেও সহজ সময় কাটবেনা সামনে। তার ধারণা তোমার আছে। আমার মনে হয় অয়ন্তিকে জানিয়ে ও কি বলছে দেখে বিয়েটা পড়িয়ে রাখাই উচিত হবে।”
এরপর সবাই একমত হলে অন্তিক আর দিগন্তের মা যায় অয়ন্তির কাছে। সেখানে চার মেয়েই ছিল। আজকের জন্য অয়ন্তি যা যা শপিং করেছিল সেসব দেখছিল। ইশি, দিথী কয়েকটা ভাগ করে নিয়েছে নিজেদের মধ্যে। অনুষ্ঠানই যখন হয়নি, এসব এতিম হয়ে পড়ে থাকবে কোন দুঃখে। তাই ওদের মধ্যে ভাগা ভাগি পর্যায় চলছিল। উনারা দুই জা গিয়ে ছোট মেয়ে দুইটার কাণ্ড দেখে ধমকে বের হতে বলেন। তারপর মেহেরিনকেও বাবা, মায়ের কাছে যেতে বলেন। মেহেরিন কিছু হয়েছে বুঝতে পেরে চলে যায়। ভাইয়ের থেকে জানতে হবে। অবশ্য কিছু যে হয়েছে তা সে আর অয়ন্তি আন্দাজ করেছিল অনেক আগে থেকে। কিন্তু কিছু জানতে পারেনি চেষ্টা করেও।
এবার অন্তত জানতে পারবে আশা নিয়ে সে চলে যায়।
সবাই চলে গেলে উনারা দুই জা অয়ন্তির পাশে বসেন। সে মা, চাচিকে দেখছিল। তার মনে হচ্ছে তার অগোচরে বাড়িতে সকাল থেকে গুরুতর কিছু ঘটছে। সে বারবার চেয়েও জানতে পারছেনা। এবার মা, চাচী কিছু বলবে বেশ বুঝতে পারে সে। তাকে নিয়ে কিছু হলো কিনা টেনশনে ছিল। তার উপর দেখতে আসার কথা ছিল, কতশত আয়োজন, কিন্তু তাকে দেখলো না- এই বিষয়টা সামান্য মন খারাপ হলেও টেনশন হচ্ছিল বেশি।
আর এখন মা, চাচির হঠাৎ এমন আবির্ভাব দেখে নিশ্চিত হয় তাকে নিয়েই কিছু ঘটেছে। খুব সরল মনের মেয়ে অয়ন্তি। মায়ের মতো হয়েছে একদম। ছোট বোনের চেয়ে সেন্সিটিভ সে। ছোট বোনটা ভাইয়ের মতো হয়েছে, ঠাণ্ডা মাথার বোঝদ্বার মেয়ে সে। কিন্তু অয়ন্তি তেমন না। বাড়িতে কিছু একটা ঘটেছে, আর তার কারণ সে -বিষয়টা বুঝতে পেরে সে ভয় পায়। দ্বিধাভরা চোখে তাকায় মা, চাচীর দিকে। মেয়েকে এমন ভয় পেতে দেখে মিসেস আয়েশা আমিন হাসেন। এই অবুঝপনা আর সরলতার জন্যই তিনি বড় মেয়েটাকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত ছিলেন। তাই বোন তুরাগের ব্যাপারটা বললে তিনি খুশিমনে রাজী হন। এখনও তিনি খুশি। বাইরে যাচ্ছেনা মেয়ে। ননদের কাছে গেলেও ততোটাই নিশ্চিন্ত থাকবেন, যতোটা বোনের কাছে গেলে থাকতেন। অয়ন্তির জায়গায় ইশি থাকলে তিনি কখনো এতোটা চিন্তিত হতেন না। এই ভোলেভালা আর অতি সরল বড় মেয়েটাকে নিয়েই উনার যতো চিন্তা ছিল।
“ভয় পাচ্ছিস কেন? তোকে বকেছি আমি?” মা
“বাড়িতে আজ কিছু হয়েছে তাইনা মা? আমি কি কিছু করেছি? আমার কারণে কিছু হয়েছে?” অয়ন্তি দ্বিধা নিয়ে জানতে চায়।
“তুই কিছু করবি কেন? আর বাড়িতে কিছু হয়েছে মনে হলো কেন? আমরা কি অস্বাভাবিক ব্যবহার করেছি নাকি কেউ তোর সাথে?” মা
“হ্যাঁ, তাছাড়া তুই কিছু করলেও কি? আমরা কি তোকে মারবো নাকি? এতো ভয় পাস কেন হ্যাঁ? এতো ভয় নিয়ে বাপের বাড়ি আদুরে আদুরে থাকলেও দুদিন বাদে শ্বশুর বাড়ি গেলে টিকতে পারবি? শ্বাশুরির সাথে, ননদের সাথে ঝগড়া করতে হবেনা পায়ে পা দিয়ে?” চাচী
অয়ন্তি শ্বশুর বাড়ির কথা তোলায় কিছুটা লজ্জ্বা পেলেও আজকের ঘটনা ভেবে মুখটা মলিন করে ফেলে।
মা, চাচী বিষয়টা ধরতে পারে।
“তুই কি আজ দেখতে আসবে বলেও ফাংশনটা হয়নি বলে মন খারাপ করেছিস মা? তুরাগকে পছন্দ ছিল তোর?” মা
অয়ন্তি মায়ের কথা শুনে মাথা তুলে তৎক্ষণাৎ বলে,
“না মা। আমার তো তুরাগ ভাইয়ার চেহারাটাও মনে নেই। পছন্দ হবে কি? কিন্তু তোমরা তো বলেছিলে দেখতে আসবে ওরা। কতো আয়োজন করলে। আমিও প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু কিছুই হলো না? তোমরা কি সব জেনে শুনে এগাওনি? যার কারণে শেষে কোন সমস্যা এসেছে, বা আমাকে নিয়ে কিছু হয়েছে কি? আমি কি কিছু করেছি?” শেষের কথাগুলো সে ভয়ে ভয়ে মিনমিন করে জানতে চায়।
উনারা বুঝতে পারেন মেয়ের তুরাগকে তেমন পছন্দ না হলেও আশা করে ছিল বলে কিছুটা হতাশ। যেটা স্বাভাবিক। প্রথম প্রথমকার এই বিষয়গুলো মেয়েদের জন্য খুব স্পেশাল হয়। সেখানে প্রথমবারেই কোন কারণে ব্যাঘাত অয়ন্তিকে চিন্তায় ফেলেছে। তার উপর সরল মেয়েটা নিজের কোন দোষে এমনটা হয়েছে ভেবে আরও চিন্তিত।
মিসেস আয়েশা আমিন বলেন,
“শোন মা। তুরাগের জন্য প্রস্তাব এসেছিল ঠিক। আমরাও মেনেছিলাম। যার কারণে আজকে নানান আয়োজনও করা হয়েছিল। কিন্তু তোর ফুফি আর ফুফা চান মাহাদের জন্য তোকে নিয়ে যেতে। আজকেই বিষয়টা জানিয়েছেন। আর এই কারণেই তুরাগের বিষয়টা হঠাৎ বাদ দিতে হয়েছে। কারণ মাহাদের জন্য প্রস্তাবটা আমাদের কাছে বেশি ভালো লেগেছে তুরাগের চেয়ে। আর তোর ভয় পাওয়ারও কোন দরকার নেই। এর কোন কিছু তোর কারণে হয় নি। তাই নিশ্চিন্তে থাক। তবে আমাদের ইচ্ছা মাহাদের সাথেই কথা এগোনোর। প্রত্যেকের সম্মতি আছে। শুধু তোর মতামত নেওয়া বাকি। আর আগের বিষয়টা আমাদের ভুল ছিল। ওটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেল। আমরা সবাই ভীষণ চাই যেন মাহাদের সাথে তোর বিয়েটা হয়। তুই বুঝতে পারছিস তো? আমরা ভীষণ চাই। অমত করিস না মা। মাহাদের সাথে খুব ভালো থাকবি।” মিসেস আয়েশা আমিন কথাগুলো বললে, দুই জা মেয়ের দিকে তাকান প্রতিক্রিয়া বুঝতে।
অয়ন্তি মায়ের সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। সে বাকরুদ্ধ। কি বললো মা? মাহাদ ভাইয়ের সাথে বিয়ে। মানে কিসের কি? মাহাদ ভাই? ছি ছি!! মা-বাবা, ফুফা-ফুফি, এসব ভাবে কিভাবে। কি লজ্জ্বার বিষয়। খালামনির ছেলের বিষয়টা আলাদা ছিল। তার সাথে দেখা সাক্ষাৎই ছিল না, যে ভাইয়ে বোনে কোন রকম বন্ধন থাকবে। কিন্তু মাহাদ ভাই?
ছোট থেকে তাকে অন্তিক ভাইয়া আর দিগন্ত ভাইয়ের থেকে এক ইঞ্চিও আলাদা চোখে দেখেনি। তাকে নাকি বিয়ে করবে। হায়!! ভাবতেই গায়ে কাটা দিচ্ছে তার। মাহাদ ভাইয়ের সাথে সংসার। কিভাবে কি? মাহাদ ভাইকে স্বামীর চোখে দেখবে সে? পারবে? লজ্জ্বায় তার সামনে দাড়াতে পারবে? প্রতিদিন তার সাথে এক রুমে কিভাবে থাকবে?
“কি বলছো? মাহাদ ভাই? মাথা খারাপ তোমাদের?” সে অস্থির আর হতবম্ব স্বরে বলে।
“বুঝতে পারছি মা তোর কথা। কিন্তু ভেবে দেখ আমাদের কথা গুলো। মাহাদ ভীষণ ভালো ছেলে। তুই ওর সাথে খুব ভালো থাকবি।”
“মাহাদ ভাই খুব ভালো আমি জানি মা। কিন্তু আমার সাথে মাহাদ ভাইকে কল্পনা করো কিভাবে? ছি!! আমি তোমাদের এসব ছেলেমানুষিতে সম্মতি দিয়েছে জানলে মাহাদ ভাই নিজে আমাকে ভেঙাবে। এখানেই থেমে যাও প্লিজ। আর বাড়িওনা এসব কথা। মাহাদ ভাইয়ের কানে গেলে আমি তোমাদের সাথে কথা বলবো না বলে দিলাম। এই বিষয়ে আর কথা তুলবেনা।”
মেয়ের কথা শুনে তাদের কিছুটা হাসি পায়। তবে চেপে যান। মেয়েটা তো আর তার মাহাদ ভাই তাকে বিয়ে করার জন্য বাড়ির সকলের সামনে কতো কি বলেছে, করেছে, কতো নির্লজ্জতার পরিচয় দিয়েছে -সেসব কিছুই জানে না, যে স্বাভাবিক ভাবে নিবে। উহু তাদের ভুল। সেসব জানলেও স্বাভাবিক ভাবে নিতোনা। আরও লজ্জ্বায় বুদ হয়ে যেতো বরং। কিন্তু জানলে এসব কথা বলতো না এতোটুকু নিশ্চিত।
“মাহাদের চিন্তা করতে হবেনা। সে তোকে বিয়ে করবে কি না, এটা তার মুখে শুনে নিয়ে তবেই এসেছি তোর কাছে। মাহাদের কোন আপত্তি নেই। তুই রাজী থাকলে সে তোকে বিয়ে করতে প্রস্তুত। বললাম না? আমাদের কারো কোন আপত্তি নেই। শুধু তোর মতামত নেওয়া বাকি।”
এরপরও অয়ন্তি অস্বস্তি আর লজ্জ্বায় দোনোমনা করলেও তার মা নানানভাবে বোঝায় বিয়ের কিছুদিন পর আপনা আপনি কেটে যাবে সব দ্বিধা। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জন্মালে কোন রকম অস্বস্তি আর কাজ করবেনা তাদের মধ্যে। এমন নানা কিছু বোঝাতে থাকলে অয়ন্তি লজ্জ্বায় আরও গুটিয়ে যায়। কিছু বলতে পারেনা। বলবেই বা কি? বাড়ির সবাই নাকি রাজী, তাই না করার উপায় নেই। বোঝায় যাচ্ছে মা, চাচী অনেক আশা নিয়ে তাকে বোঝাতে এসেছে। সে যদি এখন মুখের উপর না করে দেয় তাহলে প্রত্যেকের মন ভাঙা হবে। যা সে কখনো করতে পারবেনা। তাই তার নীরব সম্মতি পেলে তার মা, চাচী বিয়েটা যে সবাই আজই পড়িয়ে রাখতে চাইছে, সে বিষয়ে জানান। এ কথা শুনে যেন অয়ন্তির বিস্ময়ের শেষ নেই। সে মাত্রাতিরিক্ত বিস্ময়ে কথা বলতে ভুলে যায়। ওর অবস্থা বুঝতে পেরে মিসেস আয়েশা আমিন মাহাদ আর তার বাবার ব্যস্ততার বিষয়টা বুঝিয়ে বলেন। যার কারণে না চাইতেও তাদেরও হুট করে বিয়ে হওয়ার ব্যাপারে সম্মতি দিতে হয়েছে। আজকে বিয়ে হওয়া নিয়ে তার বাবা, ভাই, চাচা -সবার মত আছে শুনে অয়ন্তি চেয়েও আর কিছু বলতে পারেনা। আবার তাকে নীরব থেকে সম্মতি দিতে হয়। এর মধ্যে বাবাকে রুমে আসতে দেখে। সে লজ্জ্বা পায় বাবাকে দেখেও। বাবা, মা, চাচা, চাচী, ভাইয়া এরা প্রত্যেকে তাকে মাহাদ ভাইয়ের সাথে বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। তার এসব বিষয় মাথায় চলাকালীন বাবার সম্মুখীন হতেও লজ্জ্বা লাগছে। একটু পর বউ সেজে কিভাবে সবার সামনে যাবে? আর সবাই নাহয় বাদ। কিন্তু মাহাদ ভাই? তার সামনে সে কিভাবে বউ হয়ে দাড়াবে? এতো লজ্জ্বা সে কোথায় রাখবে?
মি মাহমুদ এসে মেয়ের পাশে বসেন। অয়ন্তি কোন কথা বলেনি। মি মাহমুদ মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে মায়ের সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনেছে কিনা জানতে চান। অয়ন্তি হ্যাঁ বললে উনি তার কি মতামত ছিল জানতে চান। অয়ন্তি নত মস্তিষ্কে মিন মিন করে আবার হ্যাঁ বলে।
মি. মাহমুদ মেয়ের মাথায় হাত রেখে বোঝান যেন তাদের উপর বিশ্বাস রেখে এগোয়। মাহাদ ভালো ছেলে। তার সাথে সুখে থাকবে, এমন আরও অনেক কিছু। অয়ন্তি সেসব মন দিয়ে শুনে একটা কথাই বুঝতে পারে, তা হলো বাবা মা খুব করে চায় তার আর মাহাদ ভাইয়ের বিয়ে হোক। কিন্তু হঠাৎ সবার মাথায় তাদের দুজনকে নিয়ে এই ভাবনা এসেছিল কি কারণে? মনে প্রশ্ন থাকলেও কাউকে জিজ্ঞেস করেনা।
সবাই চলে গেলে কিছুক্ষণ পর মেহেরিন আসে বিয়ের শাড়ি নিয়ে। তার মা বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল নাকি আজ। মাহাদ নিয়ে আসতে বলেছিল। যদিও মেহেরিন একথা তার হবু ভাবিকে জানায়না। তাকে তার মা সব জানিয়েছে। সে অবাক হলেও ভীষণ খুশি হয়। এমন কিছু তারা কেউ কখনো মাথাতেও আনেনি। কিন্তু হলে মন্দ হয়না। বরং খুব ভালো হবে। অয়ন্তি আর সে সবসময় প্রিয় বান্ধবীর মতো। তাই ভীষণ খুশি সে। সে অয়ন্তির ভাবি হতে না পারলেও অয়ন্তি তো তার ভাবি হলো। এসব ভেবে ভেবে সে খুশি মনে অয়ন্তির রুমে আসে। তার মা তাকে সব বুঝিয়ে এসব নিয়ে অয়ন্তিকে বউ সাজাতে পাঠিয়েছে। রুমে এসে অয়ন্তিকে কথায় কথায় ভাবি ডাকতে শুরু করলে অয়ন্তির লজ্জ্বার ষোলকলা পূর্ণ হয়। এটাই বাকি ছিল। না সইতে পারছে এই মেয়ের মুখে ভাবি ডাক, আর না কিছু বলতে পারছে। লজ্জ্বায় মাটির সাথে মিশে যেতে পারলে একটা কাজের কাজ হতো।
তারপর মেহেরিন নানা ঠাট্টা মজার সাথে সাথে তাকে বউ সাজাতে শুরু করে।
————————
অন্তিকের মা, চাচী যখন ইশি, দিথীকে রুম থেকে বেরুতে বলেছিল তখন তারা রুম থেকে বের হয়ে গেলেও একেবারে চলে যায়নি। সকাল থেকে একেকটা ধামাকা চলছে এ বাড়িতে। সেখানে মা, চাচির হঠাৎ এক সাথে আপুর রুমে আগমন নিশ্চয় স্বাভাবিক নয়। কোন কারণ তো অবশ্যই আছে। এসব ভেবে দিথী নতুন কি কাণ্ড হলো বাড়িতে তা জানতে মা, বড়মার কথা রুমে উকি দিয়ে শুনবে ঠিক করে। কিন্তু দিথীর এসব ছেলেমানুষি স্বভাব থাকলেও ইশির নেই। সে মানা করে দেয়। এসব আড়িপেতে কথা সে শুনতে পারবেনা জানিয়ে দেয়। দিথী যদিও মানেনি। জোর করে ওর সঙ্গ নিয়েছে। সে বলেছে তাকে আড়িপেতে শুনতে হবেনা। শুধু কেউ এদিকে আসছে কিনা নজর রাখলে হবে। আড়ি সে পাতবে। ইশি বিরক্ত হলেও বোনের কথা অনুযায়ী যায়।
সিঁড়ির কাছাকাছি গিয়ে নিচ থেকে কেউ আসছে কিনা নজর রাখে, আর দিথী কান পেতে উকি দিতে থাকে। কিন্তু বেচারি তেমন কিছু শুনতে পাচ্ছেনা। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ যাওয়ার পর, ইশি তার বাবাকে উপরে আসতে দেখলে দিথীকে ইশারা দেয়। দিথী তাড়াহুড়া করে চলে আসে। তার আবার মন সব সময় পুলিশ পুলিশ করে, কাউকে লুকিয়ে কিছু করলে। তাই ওখান থেকেই চলে যায়। যাতে বড় বাবার সামনে পরতে না হয়। কারণ তাকে দেখলে বড় বাবা বুঝে যাবে যে সে লুকিয়ে কিছু করেছে। যদিও এই বুঝে যাওয়ার কারণ সে নিজেই উল্টাপাল্টা কথা বলে বলে দেয়। মন পুলিশ পুলিশ থাকলে ভুলে ভুলভাল কথা বলে ফেলে সে। তাই ইশিকে বলে সে নিজের রুমে ঢুকে পড়ে তাড়াহুড়া করে।
ইশি ওর কাণ্ড দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মেয়েটা সবসময় এমন। খুব চঞ্চল। এর মধ্যে বাবাও তার পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে। তার মা, চাচী এখনো আপুর রুমে কিনা জানতে চাইলে সে হ্যাঁ বলেছিল। বাবা চলে গেলে সে আনমনে কিছু ভাবতে থাকে। মাহাদ ভাইয়ের সাথে আপুর বিয়ে। কতো কিছু হলো বাড়িতে আজ সকাল থেকে। অন্য জায়গায় আপুকে দেখানোর সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে গিয়েছিল। অথচ শেষে সব পাল্টে গেলো। মাহাদ ভাই আপুকে ভালোবাসে। আর বাড়ির সবাইকে বলে রাজী করিয়ে কি সুন্দর বিয়েও ঠিক করে ফেললো। অথচ আপু কিছু জানে না এসবের। এখন গিয়ে বাড়ির সবাই চাচ্ছে বলে মাহাদ ভাইয়ের সাথে তার বিয়ে হবে, এমনটাই জানবে হয়তো। বিষয়টা খুব ফিল্মি। আপু নিশ্চয় খুব সুখী হবে। মাহাদ ভাইয়ের যা ভালোবাসা দেখলো আজ আপুর প্রতি। নিশ্চয় খুব ভালো থাকবে। ভেবে সে মনে মনে হাসে।
“পাগল হয়ে গেলি নাকি? একা একা হাসছিস কেন?”
দিগন্তের আওয়াজ শুনে সামনে তাকায় সে। আনমনে হাটছিল বলে বাবার পেছন পেছন দিগন্ত ভাইও যে এসেছে তা দেখতে পায়নি সে।
“হু? হাসতেও পারবো না?”
“না হাসতে তো বলিনি। কিন্তু পাগলের মতো একা একা হাসছিস কেন? মনে খুব রং লেগেছে না?”
“লেগেছে তো। আমার বোনের বিয়ে, আর আমার মনে রং লাগবেনা?”
“বোনের বিয়ে, তোর তো না।”
“ঐ একই।”
দিগন্ত ভ্রু কুচকে ওকে দেখে নেয়। তারপর ফোনের দিকে তাকিয়ে অন্য দিকে চলে যেতে নেই। আর ভাবে, মনে রং লেগেছে নাকি মেয়েটার। এদিকে ভাইয়েদের সবাই বিয়ে করে নিচ্ছে, আর তার মনের রমণী এখনো তাকে বুঝে না, আফসোস। যদিও দিগন্তের ওকে বোঝানোর কোন তাড়াও নেই। বুঝলেও ইশি তার, না বুঝলেও ইশি তার। এখানে কোন ছাড় নেই।
কাল রাতে হসপিটাল থেকে এসে ইশিকে কফি নিয়ে তার রুমে যেতে বলেছিল। আর ও কফি নিয়ে গেলে দিগন্ত ওকে চুল টেনে দিতে বলেছিল কিছুক্ষণ, মাথা ব্যাথা করছিল বলে। দিয়েওছিল মেয়েটা। তাও সাধারণ ভাবে নয়। ওকে চুল টেনে দেওয়ার জন্য বিছানায় বসতে বলে দিগন্ত আস্তে করে ওর কোলে মাথা রেখে দেই। ইশি তখন ভীষণ অপ্রস্তুত হয়। ও বসে বসে চুল টেনে দিতে পারবে বললে দিগন্ত সে কথা উপেক্ষা করে ওর হাত নিজের চুলে রাখে। ব্যাস মেয়েটাও আর কিছু বলতে পারে নি। কিছুক্ষণ পর দিগন্ত নিজেকে সামলাতে না পেরে কামিজের উপর থেকে নীরবে ওর পেটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেই। ইশি মৃদু চিৎকার করে উঠলে দিগন্ত মুখ তুলে জানতে চায়,
“কি সমস্যা? সামান্য একটা কাজ দিয়েছি, তাতেও এতো চিৎকার, চেঁচামেচি করছিস কেন?”
ইশি দিগন্তের স্বাভাবিক কথা শুনে ভাবে ওসব তার মনের ভুল ছিল। মনে দ্বিধা নিয়ে শুকনো ঢোক গিলে। তবে কিছুনা বলে সে।
তারপর দিগন্ত আবার ওর কোলে মাথা রেখে আস্তে আস্তে পেটে মুখ গুজে দেয়। ইশি সেসব আর ধরতে পারেনি।
এসব মনে করে সে সামান্য হাসে। ইশিকে এভাবে একটু কাছে পেলে তার আরও কাছে টানতে মন চায়। অতীব জরুরী ভিত্তিতে বিয়ে করে নেওয়া দরকার তার। অথচ সারাজীবন নিজেকে সিঙ্গেল দাবি করে একদিনে ছক্কা হাকিয়ে দিল মাহাদ। দিগন্ত ভাবে, ইশিটা আরেকটু বড় হলে ভালো হতো।
“ভাইয়া, আপুর বিয়েটা কি আজই হয়ে যাবে নাকি মাহাদ ভাইয়ের সাথে? মেহেরিন আপু বিয়ের শাড়ি নিয়ে গেলো দেখলাম আমার আপুর রুমে……” দিগন্ত চলে যেতে নিলে ইশি তাড়াতাড়ি জানতে চায়।
দিগন্ত ‘ভাইয়া’ ডাক শুনে তাকায় ইশির দিকে। উত্তর জানতে উৎসুক চোখে চেয়ে আছে সে।
“আমি তোর ভাইয়া?”
ইশি প্রশ্নটা শুনে চোখ নামিয়ে নেয়। দ্বিধা নিয়ে মুখে সামান্য হাসি নিয়ে বলে,
“ঐ আরকি। ভাইয়া, ভাই - একই সব।”
“ভাইয়া না ডাকতে বলেছি না তোকে?”
“এমন করেন কেন দিগন্ত ভাই? ভাইয়া ডাকলে যা, ভাই ডাকলেও তা। শুধু শুধু এটা ডাকবি ওটা ডাকবি না করেন।” কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে ইশি।
দিগন্ত ওর সে কথার উত্তর না দিয়ে আজকেই অয়ন্তির বিয়ে হয়ে যাবে তা জানায়। ইশি তার কথা শুনে প্রথমে চোখ বড় বড় করে তাকায়। তারপর খুশি মনে এক দৌড়ে অয়ন্তির রুমের দিকে ছুটে, মাঝে দিথীর রুমের সামনে পড়লে ওকেও ব্রেকিং নিউজটা জানায় ডাক দিয়ে। তারপর হুরহুর করে দিথীকেও রুম থেকে বের হতে দেখা যায়।
দুজনের কাণ্ড দেখে দিগন্ত দুদিকে মাথা নাড়িয়ে চলে যায়।
——————
অয়ন্তিকে সাজিয়ে নিচে নামানো হচ্ছে। গাঢ় খয়েরি রং এর জর্জেট শাড়ি গায়ে। অয়ন্তির শাারীরিক গঠন এমনিতেও চোখে পড়ার মতো সুন্দর। শাড়ি পরলে ওর শরীরে তা ভীষণ ফুটে উঠে প্রত্যেকবার। আজও তেমন। ঠোঁটে লিপস্টিক, গালে ব্লাশ আর আইলাইনার, মাস্কারা ছাড়া তেমন বিশেষ কোন ব্রাইডাল সাজ নেই। অল্প সময়ে তেমন কোন সাঁজ দিতে পারেনি মেহেরিন। তবে যা সাজিয়েছে তাতে কোন খুত রাখেনি। দামি দামি নানান জুয়েলারি পড়ানো হয়েছে। এগুলো সাজানোর সময় মাহাদের মা গিয়ে দিয়ে এসেছে। সাথে অয়ন্তিকে অভয় দিয়ে নানান কিছু বুঝিয়ে সুঝিয়ে এসেছেন তিনি। যেন মেয়েটা সহজ হয় তাদের সাথে। সব মিলিয়ে সাধারণ সাঁজেও আভিজাত্য স্পষ্ট। অয়ন্তির দুই পাশে ওর মা আর মেহেরিনও আসছে, ওর সাথে সাথে।
ইশি, দিথী আর প্রাণেশাকেও পেছন পেছন আসতে দেখা যায়।
অয়ন্তি সেই যে চোখ নামিয়ে মাথা নত করে নিচে নেমেছে, তা আর তুলেনি। সবার সামনে মাহাদ ভাইয়ের জন্য বউ সেজে এসেছে সে, ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। এখানে কোথাও নিশ্চয় মাহাদ ভাইও আছে। তাকে এভাবে দেখে না জানি কি ভাবছে। অয়ন্তিকে খোঁচাবেনা তো বিয়েতে রাজী হয়েছে বলে! কিংবা যদি লজ্জ্বা দেয়? তাহলে সে কার কাছে বিচার নিয়ে যাবে? কাকে গিয়ে বলবে? এসব নানান ছেলেমানুষি চিন্তা অয়ন্তিকে একটুও স্বস্তি দিচ্ছেনা। হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে তার। আশেপাশের কিছু তার চোখে পড়ছেনা। কি হচ্ছে না হচ্ছে, কিছুনা। ইতোমধ্যে ওকে সোফায় বসানো হয়েছে। কাজী সাহেবও চলে এসেছেন। মাহাদের বাবা আর অয়ন্তির বাবার সাথে কি যেন কথা বলে বলে খাতায় কিছু লিখছেন তিনি। অন্তিকও আছে পাশে। দেখছে সব মনোযোগ দিয়ে।
“ঘামছিস কেন? এসির মধ্যেও তোর গরম লাগছে?”
অয়ন্তি সোফায় বসে অস্থির লাগছে বলে হাতে হাত ঘষছিল। পাশ থেকে কারো প্রশ্ন শুনে অয়ন্তি অন্যমনস্কভাবে “হু…” বলে চোখ তুলে তাকায়। মাহাদও ওর দিকে তাকিয়ে। দুজনের চোখে চোখে দৃষ্টি বিনিময় হয়। মাহাদ শুরু থেকে ওকে দেখছিল। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় থেকে এখন অব্দি ওর সব ভয়, অস্বস্তি, লজ্জ্বা, দ্বিধা -সব বুঝতে পেরেছে সে। কিন্তু পাত্তা দেয়নি। কারণ চোখ আটকেছে তার জন্য বউ বেশে আসা সেই অঙ্গে। মায়াবী ঐ চোখের রমণীর প্রেমে সে কবে পড়েছে নির্দিষ্ট করে, সেই হিসাব নেই তার। তবে সে ছাড়া অন্য কারো জন্য সামান্যতমও সাজবে এটা সে মানতে পারেনি। সব জালিয়ে পুড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করছিল যখন শুনেছে সেজে গুঁজে অন্য কাউকে নিজের রুপ দেখাবে এই মেয়ে। তারপর সারারাত নিজেকে শান্ত করার অনেক চেষ্টা করেও যখন পারেনা, তখন কোন কিছু না ভেবে বাবা, মাকে গিয়ে বলে ওকে বিয়ে করবে। কারণ সে বুঝে গিয়েছিল, সে ছাড়া অন্য কারো কাছে অয়ন্তি নিজেকে প্রদর্শন করবে, এই ব্যাপারটাই মূলত নিতে পারছিল না। ভালোবাসা বাসির চিন্তা তখনও মাথায় আসেনি তার। অথচ আজ সকালে নিজের অজান্তে মামীর কাছে তার মেয়েকে ভালোবাসবে প্রমিস করেছিল। তার মানে কি ভালোও বাসে সে? শুধু নিজে বুঝতে পারেনি? হয়তো… নাহয় হুট করে অজান্তে অনেক ভালোবাসবে বলে বসেছিল কেন? তবে আগে বুঝতে না পারলেও, বউ বেশে অয়ন্তিকে যেই মুহূর্তে দেখেছে মাহাদ, সেই মুহূর্তেই মেয়েটার প্রেমে পরে গিয়েছে সে। তার হার্ট এতো জোরে বিট করছিল তখন। নিজেও তা বুঝতে পেরেছে, যে প্রেমে পড়েছে। অয়ন্তির চোখের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবছিল মাহাদ। অয়ন্তিও নিজের হতবুদ্ধিতা কাটিয়ে উঠতে না পেরে মাহাদের চোখেই চোখ রেখে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ হুশে এলে মাহাদের অন্যরকম দৃষ্টি দেখে অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে নেয়। নিজেকে আরো গুটিয়ে নেয়। মাহাদের ঐ দৃষ্টি চোখে ভাসছে তার, বুক ধরফর করছে।
মাহাদ অয়ন্তির দ্বিধা বুঝতে পারে।
“হাপানি রোগীর মতো করছিস কেন? আমাকে প্রথম দেখছিস?” ভীষণ স্বাভাবিকভাবে মাহাদ কথাটা বলে অয়ন্তিকে।
অয়ন্তি ভাবছে মাহাদ ভাই কি নির্লিপ্তভাবে বসে আছে! কোন অস্বাভাবিক আচরণ দেখছেনা। যেন কিছুই হয়নি। এই যে বড়দের কথা শুনে তাকে বিয়ে করতে হচ্ছে, এতে কি কোন আপত্তি নেই তার? আর সে একদম বউ সেজে এসেছে বলে ক্ষেপালোও না একবারো। নাকি রেগে আছে তার সাথে? মাহাদ ভাই কি কোন ভাবে অয়ন্তি বিয়েতে মানা করে দেবে এই আশায় হ্যাঁ বলেছিল বড়দের? আর এখন ওকে রাজী দেখে রেগে আছে? আনমনে অহেতুক চিন্তা ভাবনা করে নিজে নিজেই মন খারাপ করে অয়ন্তি।
ততোক্ষণে কাজী সাহেবের সবকিছু রেডি করা হয়ে গিয়েছে। মি. মাহমুদ বিয়ে পড়ানো শুরু করতে বলেন উনাকে।
কাজী সাহেব দোয়া দরুদ পড়ে আল্লাহর নাম নিয়ে বিয়ে পড়ানো শুরু করেন।
অয়ন্তির তখন সব কিছু সপ্ন সপ্ন লাগছে। হুট করে কি থেকে কি হয়ে গেলো এই মুহূর্তে কিছু মেলাতে পারছেনা যেন। সকালে দেখতে আসবে বলেছিল। নিজেকে কতোভাবে প্রস্তুত করেছে। রূপচর্চা থেকে তাদের সামনে সুন্দরভাবে নিজের বাহ্যিক আচরণ প্রদর্শনের চর্চা - কোনকিছু বাদ রাখেনি। কিন্তু ওর এতো এতো প্রস্তুতি সব কোন কাজে এলোনা, কারণ হুট করে শুনলো মেহমান আসবে কিন্তু ওকে দেখতে নয়। মন খারাপ হলেও মনকে মানিয়ে নিয়েছিল। এর কারণ নিয়ে চিন্তিত থাকা সত্ত্বেও সবার সাথে হাসি খুশি থাকে। কারণ ওর মন খারাপ দেখলে বাবা মাও নিশ্চয় কষ্ট পাবে। তারপর সব ঠিক থাকলেও হঠাৎ শুনে মাহাদ ভাইয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক করতে চাচ্ছে সবাই। নানান দ্বিধা নিয়ে তাও মেনে নিলো। কিন্তু এতে থেমে নেই, আজই নাকি বিয়ে……
সবার মন রাখতে তাতেও রাজী হলো। কিন্তু মাহাদ ভাই কি এই সিদ্ধান্তে নারাজ?
অয়ন্তির আকাশ কুসুম ভাবনার মধ্যে কাজী সাহেব তাকে কবুল বলতে বলে। কিন্তু তার সেদিকে খেয়াল নেই। পর পর দুইবার বলতে বললে তার ধ্যান ভাঙে। চারদিকে তাকায়। মনে হয় বাস্তবতায় চলে এসেছে। শুকনো ঢোক গিলে সে। কিন্তু কবুল বলতে পারেনা। মা ওর মাথায় হাত রেখে দাড়িয়ে আছে। কবুল বলতে বলছে। সে তাও মুখ দিয়ে কোন শব্দ করতে পারছেনা। অসহায় লাগে অয়ন্তির।
বোনের অবস্থা বুঝে অন্তিক এসে বসে তার পাশে।
“এদিকে তাকা।”
অয়ন্তি তাকায় ভাইয়ের দিকে। ওর চোখের পাতা কাপঁছে। বার বার ঢোক গিলছে দেখে অন্তিক বোনের ভেতরটা বুঝে নেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে গালে হাত রেখে বলে,
“শোন, আমি জানি মাহাদকে তুই কখনো আমার আর দিগন্তের চেয়ে আলাদা চোখে দেখিসনি। তুই বল এই কারণটা ছাড়া কি বিশেষ অন্য কোন কারণ আছে যার জন্য এই বিয়েতে তোর আপত্তি থাকতে পারে? এটা ছাড়া অন্য যেকোনো কারণ, ভাইকে বল। খুব ছোট বা সামান্য কারণ হলেও বল। এখানে থামিয়ে দেবো বিয়ে, প্রমিস করছি।”
অয়ন্তি শুনে ভাইয়ের কথা। মনে মনে ভেবেও দেখে, কি কি কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সত্যি বলতে ভাই যে কারণটা বলেছে সেটা ছাড়া আর তেমন কোন কারণই নেই। তাই সে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়।
শেষ মুহূর্তে অন্তিকের এমন কথায় সবাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কারণ অয়ন্তি ছেলেমানুষি করে কোন কারণ দেখিয়ে দিলে সত্যি সত্যি অন্তিক বিয়েটা আটকে দিতো সবাই জানে।
অয়ন্তির না বোধক উত্তর পেয়ে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
বোনের জবাব পেয়ে অন্তিক ওর চোখের পানি মুছিয়ে দেয়। মেয়েটার অতিরিক্ত ভয় আর নার্ভাসনেসে চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।
“তাহলে তোর এতো ভয় পেতে হবেনা। বিয়ে দিয়েই তো আর এখন তোকে পাঠিয়ে দিচ্ছিনা ওর সাথে। এখানেই থাকবি। ততোদিনে নিজেকে মেন্টালি প্রিপেয়ার করতে পারবি। তাছাড়া প্রথম প্রথম ওসব অস্বস্তি কাজিন ম্যারেজ ছাড়া অন্যান্য বিয়েতেও হয়। তারপর আস্তে আস্তে দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। আর মাহাদ কতোটা ফ্রেন্ডলি তা তো জানিসই। তাহলে এতো ভয় কিসের তোর? আমরা সবাই আছি। ওবাড়িতে ফুফি থাকবে, মেহেরিন থাকবে। দেখবি ভালো লাগবে তোর। কাঁদতে হবেনা আর।”
অয়ন্তি ভাইয়ের কথাগুলো শুনে শুনে এতোক্ষণ ফুঁফিয়ে ফুঁফিয়ে কাঁদছিল। শেষে কাঁঁদতে হবেনা বললে নিজেকে আর আটকাতে পারেনা। অন্তিকের বুকে মাথা ঝুকিয়ে দেয় আস্তে করে। কান্না আটকানোর প্রচণ্ড চেষ্টা তার। কিন্তু কেন জানি পারছেনা। শব্দ করে না কাঁঁদলেও গা কেপে কেপে উঠছে। অন্তিক ওর মাথাটা বুকে আগলে নিয়ে স্বান্তনা দেয়। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। তারপর কিছুক্ষণ পর সবার কথায়, ভাইয়ের আদরে শান্ত হলে ঠিক হয়ে বসে আবার মাহাদের পাশে। সবাই বুঝতে পারে, মেয়েটা বিয়ে করতে চায় না বলে কাদঁছে এমন নয়। বরং বিয়ের সময় মেয়েদের যেমন নানান ভিন্ন-মিশ্র অনুভূতি হয়, সেই অনুভূতির কারণে না চাইতেও কাদঁছে।
সে শান্ত হয়ে বসলে কাজী সাহেব আবার বিয়ে পড়ানো শুরু করেন। এবার কবুল বলতে বললে সে নিজে একটু ধাতস্ত হওয়ার সময় নেয়। তবে এর মধ্যে নিজের হাতের মধ্যে অন্য একটা হাতের স্পর্শ পায়। তাকিয়ে দেখে মাহাদ ভাই নিজের হাতের মধ্যে ওর হাতটা নিয়েছে। ওর মনে হলো ভরসা দিচ্ছে। তার পাশে আছে বোঝাচ্ছে। চোখ তুলে তাকায়। হ্যাঁ, চোখে আশ্বস্ত করছে মাহাদ ভাই। যেন কবুল বলে দেয়। অয়ন্তি ঢোক গিলে। কেমন কেমন লাগছে। মাহাদ ভাইয়ের সাথে নির্দ্বিধায় কতো হাতাহাতি করেছে আগে, যখন তখন ঝগড়া লাগিয়ে। অথচ আজ সামান্য হাতের ছোঁয়ায় তার অস্থির লাগছে। গা শিরশির করছে। তবে সে হাতটা ছাড়িয়ে নেয় না। আর সে চাইলেও পারতো না। কারণ মাহাদ প্রথমে আলতো স্পর্শে ধরলেও পরে শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় ওর হাতটা নিয়ে রেখেছে। অয়ন্তি এমন অবস্থাতেও কেউ ব্যাপারটা দেখে নিলো কিনা বুঝতে অস্বস্তি নিয়ে সবার দিকে একপলক তাকায়। সবাই কবুল বলতে ইশারা করছে। সে আর সময় নষ্ট করেনা। ইতস্তত করে বলে দেয়,
“ক কবুল” তারপর আরও দুইবার বলতে বললে সে আস্তে আস্তে আবার উচ্চারণ করে,
“কবুল, ক… কবুল”
কাজী সাহেবের সাথে সবাই আলহামদুলিল্লাহ বলে উঠে। তারপর মাহাদকে বলতে বললে সে বেশি সময় নেয় না। শীতল স্বরে সেও কবুল বলে দেয়।