“গল্পের এই অংশে যে ঘটনাগুলি তুলে ধরা হয়েছে তা কেবল কাল্পনিক ও কাহিনিচালিত। বাস্তব জীবনের আচরণে সম্মতি ও সীমারক্ষা অবশ্য পালনীয়। গল্পের চরিত্রগুলি বাস্তব ব্যক্তির প্রতিরূপ নয়।”
-----------------------
সরোয়ার বাড়ির ড্রয়িংরুমে এই মুহুর্তে রয়েছে অন্তিকের বাবা চাচারা। অতিথিদের সাথে গল্পগুজবে ব্যস্ত তারা।আর তার মা-চাচী রয়েছে কিচেনে। তারা অতিথিদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা করছেন। ছেলেমেয়েরা বাড়িতে নেই। কেউ ভার্সিটিতে তো কেউ কর্মক্ষেত্রে। অন্তিকের মা আয়েশা আমিনের ননদের ছেলের বিয়ে সামনে। অনেক দুরের সম্পর্ক যদিও। তবে অন্তিকের বাবা-চাচাদের পারিবারিক ব্যবসায় বিভিন্নভাবে যুক্ত তাদের পারিবারিক ব্যবসা। সেই খাতিরে দুরের সম্পর্ক হলেও দুই পরিবার খুব ঘনিষ্ঠ।
মাহমুদ সরোয়ার, মুনতাসির সরোয়ার আর তাদের মা শাইনা বেগম অতিথিদের সাথে কথা বলছেন। অতিথি বলতে তাহেরা আমিনের স্বামী(অন্তিকের খালু) আর বিয়ের পাত্র অর্থাৎ তাহেরা আমিনের ননদের স্বামী এসেছেন।
"ভাই সাহেব, আপনার বাড়ির ছেলেমেয়েদের বিয়ের ব্যাপারে কি ভাবছেন? বড় মেয়েতো যথেস্ট উপযুক্ত এখন, ছেলেরও বউ আনতে হবে। কার কথা ভাবছেন আগে?"
"ভাবছি ছেলেটার জন্যই আগে বউ আনবো। এরপর দিগন্তও তো আছে। দুজনেই স্যাটেল্ড আর উপযুক্ত বয়সী বলতে গেলে। তাই আগে অন্তিকের ব্যাপারেই ভাবছি। বড় মেয়েটাও গ্র্যাজুয়েশন শেষ করুক ততদিনে। লেখাপড়ার এমন মাঝামাঝিতে তো আর বিয়ে দিতে পারিনা। তার উপর মেয়ে আমার খুব চাপা স্বভাবের। এখন বিয়ের কথা যদি বলি তাহলে ওর অমত থাকলেও আমাদের বলবেনা। তাই আরেকটু সময় নিক।"
"তো মেয়ে দেখেছেন অন্তিকের জন্য? নাকি ছেলের কোনো পছন্দ আছে?"
"ছেলের কোনো পছন্দ আছে কিনা এটাতো বলতে পারবোনা। তবে বিয়ের কথাবার্তা যখন তুলবো তখন অবশ্যই মত নিবো ওর পছন্দের ব্যাপারে।"
"হ্যাঁ। তাছাড়া আজকালকার ছেলে পছন্দ থাকতেই পারে। আমিও আমার ছেলের বিয়ের কথা তোলার সাথে সাথেই বললো তার নাকি পছন্দ আছে। ব্যাস, সেখানেই গেলাম প্রস্তাব নিয়ে।"
"অন্তিকেরও পছন্দ থাকলে তো ভালোই। আমাদের আর কষ্ট করে মেয়ে খুজতে হবেনা।"
"ঠিক বলেছেন। তাহলে ভাই এখন উঠি। আর সামনের মাসের ১৫ তারিখ অবশ্যই পরিবারসমেত উপস্থিত হবেন ভেন্যু তে।"
"অবশ্যই অবশ্যই।"
তারা একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করে চলে গেলো। মিসেস আয়েশা আর মিসেস তাবিয়াও সার্ভেন্ট দিয়ে সব পরিস্কার করে গুছিয়ে যার যার রুমে চলে গেলেন।
_______________
"আপনার কি মনে হয়? ছেলের কোনো পছন্দ আছে? -আয়েশা আমিন।
"আমি কিভাবে জানবো সেটা। তোমার সাথে তো খুব ভাব ছেলের। তুমি-ই বলো।" -খুব স্বাভাবিক ভাবেই বললেন মাহমুদ সাহেব।
"এভাবে কেনো কথা বলছেন আপনি? -আয়েশা আমিন।
স্ত্রীর অভিমানী স্বর শুনে অবাক হয়ে বললেন-
"কিভাবে কথা বলেছি আমি?"
"মনে করে দেখুন।"
"ছেলের সাথে তোমার খুব ভাব এটাই তো বললাম। ভুল কি বলেছি। তাছাড়া ছেলে তোমার সাথে সব শেয়ার করে আর প্রেম কার সাথে করছে সেটা আমাকে এসে বলবে?"
"ওহ। ছেলে আমার সাথে সব শেয়ার করে বলে আপনার জ্বলছে। আমার ছেলে আমার সাথে সব শেয়ার না করে কি পাশের বাড়ির জমিলার সাথে শেয়ার করবে?"
"কি মুশকিল, আমি সেটা কখন বললাম। মেয়েমানুষের সবকিছুতে একটু বেশিবেশি। তাছাড়া পাশের বাড়িতে কোনো জমিলা নেই। সাফিনা, ওয়াসিকা ওরা আছে। প্রতিবেশী হয়েও পাশের বাড়িতে কে আছে সে খবর রাখোনা।"
"কি বললেন?"
"যেটা শুনেছ।"
"হ্যাঁ হ্যাঁ। বুঝি। নিজের ছেলের কার সাথে প্রেম করে সে খবর রাখেনা অথচ পাশের বাড়ির সাফিনা, ওয়াসিকার খবর ঠিক-ই রাখে। আপনি আসলে বলতে চেয়েছেন আমার সবকিছুতে বেশি বেশি। মেয়েমানুষের কথাটা বলে পার পেয়ে যাবেন ভেবেছেন?"
"আমিতো কিছুই ভাবিনা আয়েশা, বিশ্বাস করো। তাছাড়া বিবাহিত পুরুষদের সঠিক চিন্তা ভাবনা করার জন্য আলাদা একটা মাথা লাগে। যেটা থাকে ওটাতে যুক্তিযুক্ত ব্যাপার আনা যায়না। আমার ঘাড়ে কি অতটা মাথা আছে নাকি?"
"তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন আমার কারণে আপনি যুক্তিযুক্ত ব্যাপার মাথায় আনতে পারেননা।"
"ঠিক।"
"কি??"
"না না। আমি বুঝাচ্ছিলাম সংসারের চিন্তায়, ছেলেমেয়েদের চিন্তায় আর গরমে আমার মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছে।"
"অফিসে, গাড়িতে, বাড়িতে সবখানে এসি। গরম কোথায়?"
"আয়েশা রানী। ক্ষমা করো আমাকে।"
মিসেস আয়েশা আর স্বামী একটু বাঁকা চোখে দেখে চলে গেলেন।
_________
বিকেলে মিসেস আয়েশা আর মিসেস তাবিয়া ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছিলেন। অয়ন্তিকা ছিল সাথে। দিথী আর ইশিকা এসে বসলো তাদের পাশে।
"মা? বাবারা কখন আসবে?" -ইশিকা
"জানিনা। ফোন দিয়ে জেনে নে।" -মিসেস আয়েশা
"কিসের জন্য?" -মিসেস তাবিয়া
"শপিং এ যাবো আমরা।" -দিথী
"হ্যাঁ। দাদির কাছে শুনেছি বিয়ের দাওয়াত আছে আর বাড়ির সবাই যাবে।" -ইশিকা
"আজ দেরি হবে তোর বাবার যতদুর জানি। উত্তরার অফিসে যাওয়ার কথা ছিল আজ।" -মিসেস আয়েশা
"ওহ। ভাইয়ারও তো রাত ১২ টার আগে দেখা পাওয়া যাবেনা।" -মুখ কালো করে বললো ইশিকা
"পরে আরেকদিন যাস।" -মিসেস তাবিয়া
"পরে সময় পাবোনা দেখেই তো বললাম। গত সপ্তাহে অসুস্থ ছিলাম বলে যে এসাইনমেন্ট দেই নি। সেটা সামনের সপ্তাহে দিতে হবে। ওটা সহ দুইটা। সময় পাবোনা হয়তো।" -ইশিকা
"দিগন্ত কে কল দিয়ে জিজ্ঞেস কর ফ্রি আছে কিনা। থাকলে ওর সাথে যা।" -মিসেস তাবিয়া
"আমি মেসেজ দিয়ে জানিয়েছি দিগন্ত ভাইকে। আসছে বললো। তবে বেশি সময় দিতে পারবেনা।" -অয়ন্তিকা
"মানে? তাড়াহুড়ো করে শপিং করা যায় নাকি? -ইশিকা
"ঠিক আছে তুই যা ভাইয়ার সাথে। আমি আর অয়ন্তি আপু পরে সময় করে একদিন গিয়ে শপিং করে আসবো। আমাদের তো ব্যস্ততা নেই। তোর যেহেতু আছে তুই-ই চলে যা আজ ভাইয়ার সাথে।" -দিথী
সবাই সম্মতি জানালো। কিন্তু ইশি মুখ ভার করে চলে গেলো। তার দিগন্ত ভাইয়ের সাথে কোথাও যেতে ভালো লাগেনা। কেমন কেমন করে তাকায় আর কথায় কথায় লজ্জ্বা দেই।
______
দিগন্ত হসপিটাল থেকে সময় নিয়ে এসেছে ইশিকে নিয়ে শপিং এ যেতে। ভেবেছিলো তিনবোনকেই নিয়ে যেতে হবে। তার অতো সময় হবেনা বলে না করে দিয়েছিলো। কিন্তু পড়ে অয়ন্তি জানালো ইশি বিজি থাকবে সামনে তাই ওকেই যেন নিয়ে যায়। একথা শুনে আর না করেনি।
এখন গাড়িতে বসে অপেক্ষা করছে ইশির জন্য। হসপিটাল থেকে এসে ফ্রেশ হয়ে ফোনে জরুরী কথা বলতে বলতে বাড়ির বাইরে গাড়ির কাছে চলে এসেছে। অথচ ম্যাডামের এখনও দেখা নেই। মুখ দিয়ে 'চ' শব্দ বের করে বিরক্ত হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ডুকে নিউজফিড স্ক্রল করতে লাগলো। ৫ মিনিট পড়েই চলে এলো ইশি। ইশিকে আসতে দেখে দিগন্ত তাকায় ওর দিকে। তারপর তাকিয়েই ছিল ইশির দিকে। ইশি গাড়ির ভেতর বসতেই দিগন্ত চোখ সরিয়ে বলে -
"এতক্ষণ লাগে সামান্য রেডি হতে?"
"সরি।"
এটা শুনে দিগন্ত তাকায় ওর দিকে। দেখতে পায় ইশি সিটবেল্ট লাগায়নি। ওকে কিছু না বলে নিজেই হঠাৎ ওর দিকে ঝুঁকে। ইশি হচকচিয়ে যায়। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আশে। দিগন্ত তাকায় ওর দিকে। চোখে চোখ রাখে। ইশি হঠাৎ চোখ নামিয়ে নেই। কিন্তু নিঃশ্বাস ফেলেনা। দিগন্ত ওর অবস্থা বুঝতে পারে।
"শ্বাস নে।"
"হুম?"
"শ্বাস নে।"
ইশি শ্বাস নেই। শ্বাস নিয়ে আবার ফেলতেই দুজনের নিঃশ্বাস বারি খায়। তারপর আরেকটু ঝুঁকে দিগন্ত ওর সিটবেল্ট লাগিয়ে দেই সুন্দর করে। দিগন্ত আরেকটু ঝুঁকে যাওয়ায় ইশির শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়। বুক উঠানামা করে। দিগন্ত টের পায়। তারপর আস্তে করে নিজের সিটে ফিরে যায়। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ঠোঁট এ মৃদু হাসি ফুটে তার।
ইশির রাগ লাগছে নিজের উপর। কেনো সে সবার কথায় দিগন্ত ভাইয়ের সাথে আসতে রাজী হয়েছিল। মানুষটা হঠাৎ হঠাৎ এভাবে ওকে অপ্রস্তুত করে দেই। অস্বস্তিতে ফেলে। বোনের সাথে কেউ এমন করে? আগে দিগন্ত ভাই এমন ছিলোনা। বাইরে থেকে লেখাপড়া করে ডাক্তার হয়ে এসে অসভ্য হয়ে গিয়েছে। নাহলে আগে দিগন্ত ভাই ওর কাছে নিজের আপন ভাই অন্তিকের চেয়ে আলাদা ছিলোনা। ইশি এখন ভার্সিটিতে পড়ে। ফার্স্ট ইয়ারে। বয়স ১৯। দিগন্ত এক বছর আগে লন্ডন থেকে ডাক্তারি পড়া শেষ করে পূর্ণাঙ্গ ডাক্তার হয়ে এসেছে। ইশি তখন কলেজে নতুন নতুন। শুরুতে শুরুতে সম্পর্কটা স্বাভাবিক ছিল। দিগন্তও বেশ ভদ্র-সভ্য ছিল ইশির প্রতি। ইশি কলেজে নতুন নতুন বন্ধু পেয়ে তাদের সাথে ক্লোজ হয়ে গিয়েছিল। এখানে সেখানে যেতো। এই যেমন কারও বার্থডে হলে হুটহাট ক্যাফেতে যাওয়া, রেস্টুরেন্ট এ যাওয়া কিংবা পার্কে যাওয়া বন্ধুদের সাথে দেখা করতে, ঘুরতে। এসব করতে চাইতো।
দুই একবার বাবা ভাই এর অনুমতি নিয়ে গিয়েওছিল। কিন্তু দিগন্ত জানতোনা। একদিন ওর সামনে বের হতে গেলে দিগন্ত এটা সেটা জিজ্ঞেস করে। বন্ধুদের সবার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে। ছেলে বন্ধু গুলোর সাথে জোরপূর্বক বন্ধুত্ব ভাঙ্গিয়ে দেই। এরপর থেকে ওর নিজের বাবা ভাই এর চেয়ে বেশি রেস্ট্রিকশনস দিয়ে রাখতো। প্রথম প্রথম ভাই সুলভ শাসন ভেবে মেনে নিলেও আস্তে আস্তে বিরক্ত হয়ে পড়ে দিগন্তের প্রতি।
বড় ভাই হয় দেখে কিছু বলতেও পারেনা। ভয় পায় বলে। কিন্তু ইশি বুঝতে পারেনা বাকিদের থেকে বাঁচিয়ে রেখে নিজে অসভ্যতামি করাটা কোন ধরণের ভণ্ডামি। যত্তসব।
"আমাকে বললেই হতো সিটবেল্ট লাগানোর কথা। আমার কি হাত নেই?"
"তোকে বলে লাগিয়ে নিলে আমি তোর কাছাকাছি যেতাম কি করে?"
"তার মানে ইচ্ছে করে এমন করেছেন?"
"কোনো সন্ধেহ?"
"ছিঃ আমি আপনার ছোট বোন হই। বার বার ভুলে যান। অসভ্যের মতো কাজ করেন।"
"তুই আমার কি হোস আমার খুব ভালো করেই মনে আছে। বরং তুই ভুলে যাস আমি তোর বাবার ছেলে না চাচার ছেলে।"
"আপনি বাবা-চাচার মধ্যে পার্থক্য করছেন?"
"নেই বলছিস?"
"অবশ্যই। দুজনকেই আমি সমান চোখে দেখি। দুজনকেই সম্মান করি।"
"তো আমি কি বড় বাবাকে অসম্মান করি?"
"অসম্মান-ই তো হলো। বাবা-চাচার মধ্যে পার্থক্য করছেন।"
"বড় হ গাধী।"
"আমি বড়ই। আপনার চোখ ছোট।"
দিগন্ত চোখ ছোট ছোট করে ইশিকে দেখে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিলো।