মৌনপ্রেম

পর্ব - ২৯

🟢

মি. মাহমুদ আর মিসেস আয়েশা আমিন কালই অয়ন্তিকে তুরাগের ব্যাপারটা জানাবেন ভাবলেও জানানো হয়নি। তাদের মনে হয়েছে অয়ন্তিকে জানানোর আগে অন্তিককের সাথে বিষয়টা নিয়ে কথা বলা উচিত।

আত্মীয় হলেও, কিংবা তাদের পছন্দ হলেও—বোনের জন্য তুরাগকে অন্তিকের পছন্দ কি না তা জেনে নিয়ে এগোলে সব বিষয় ঠিকঠাক হবে। নাহয় আগে অয়ন্তিকে জানিয়ে দিলো, সে রাজিও হলো। কিন্তু বড় ভাই হিসেবে অন্তিকের পছন্দ হলো না বোনের জন্য তুরাগকে। তেমনটা হলে পুরো ব্যাপারটা ঘেঁটে গ হয়ে যাবে।

তাছাড়া বড় ভাই হিসেবে বোনের কাছে যেকোনো প্রস্তাব সম্পর্কে মতামত নিতে যাওয়ার আগে, অন্তিকের দৃষ্টিকোণ থেকে ঐ প্রস্তাব আদৌ বোনের জন্য উপযুক্ত কি না তা যাচাই করার এবং মতামত রাখার অধিকার রাখে সে।

তাই সেদিন অন্তিক আর প্রাণেশা মামা বাড়ি থেকে ফিরে আসলে তারপর অন্তিককে ধীরে সুস্থে জানান তারা। শাইনা বেগমসহ অন্তিকের চাচা-চাচী কেউ জানানো হয় তুরাগের জন্য অয়ন্তির প্রস্তাবটা সম্পর্কে। কেউ দ্বিমত করেনি, অন্তিক ছাড়া। সেও বাবার মতো চেয়েছিল গ্র্যাজুয়েশন শেষে বোনের বিয়ের ব্যাপারে ভাবতে বলে।

কিন্তু তার মা মানেন না। স্বামীর মতো ছেলেকেও বোঝান নিজের দুশ্চিন্তা।

অন্তিক তা শুনে মেজাজ বিগড়ে যায়। বাবা-মা না থাকলে কি সে নেই বোনের জন্য? বাড়ির এতোগুলো মানুষ নেই? ফেলনা নাকি তার বোন? অয়ন্তি, ইশি, দিথী—প্রত্যেকের সেফটির জন্য সেই কবে তাদের জায়গা, টাকা, সম্পত্তি সব আলাদা করে রেখে দেওয়া হয়েছে। টাকা-পয়সা বাদ। তারা দুই ভাই কি মরে গিয়েছে নাকি, যে বাবা-মা না থাকলে বোনেদের কি হবে সেই চিন্তা করছে!

অন্তিক ভীষণ রেগে যায়। তবে মিসেস আয়েশা আমিন শান্তভাবে ছেলেকে বোঝান। এখানে রেগে যাওয়ার মতো কোনো কথা তিনি বলেননি। বরং বড় মেয়েটার সংসার চোখের দেখা দেখে যেতে চান তিনি। তার মেয়ে সংসারে কি করবে, কেমন পারবে না পারবে সব—তাই তিনি দুশ্চিন্তায় থাকেন। দুলালি মেয়ে কি না! সংসার সম্পর্কে কোনো আইডিয়া নেই। আর সবথেকে বড় কথা, বোনের ছেলের জন্য আসা প্রস্তাব বলে তিনি ফেরাতে চাচ্ছেন না। কারণ মেয়ে বোনের কাছে গেলে তিনি কিছুটা চিন্তামুক্ত হন। এর চেয়ে বেশি আর কি চাইতে পারেন তিনি? মেয়ে বোনের ঘরে যাবে। এই সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে চান না। যদি অয়ন্তির আপত্তি না থাকে।

অন্তিক মায়ের কথা শুনে কিছুটা শান্ত হয়।

তুরাগ ছেলেটা খারাপ না। বরং ভীষণ ভদ্র-সভ্য ছেলে। অন্তিকের দুই বছরের ছোট। তাকে ভীষণ মানে ছোট থেকে।

বর্তমানে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত ছেলেটা, সফল ব্যবসায়ী বলতে গেলে। বোনের জন্য খারাপ নয় ছেলেটা। তাই তার বাবা ঠাণ্ডা মাথায় আরেকবার তার সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে সে সম্মতি দেয়।

এরপর অয়ন্তির কাছে বিষয়টা জানাতে যায় তার মা। অয়ন্তি তখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে সামনে একটা বই নিয়ে পড়ছিল। কাউকে নক করতে শুনে মাকে দেখলে ভেতরে আসতে বলে। মিসেস আয়েশা আমিন গিয়ে মেয়ের পাশে বসেন। মেয়ের এলোমেলো খোলা চুলগুলো একত্রে করে বিছানায় পড়ে থাকা ক্লিপ দিয়ে আটকে দেন। বিছানার এলোমেলো কম্ফোর্টারটাও ভাঁজ করে নেন।

"সবসময় এমন অগোছালো থাকিস। এবার একটু বড় হ। আজ বাদে কাল শ্বশুরবাড়ি গেলে লোকে এসব দেখে বলবে, এতো বড় মেয়ে এখনো অগোছালো। মা বোধ হয় কিছু শেখায়নি।”

“পাছে লোকে কিছু বলে, মা। ওদের কথার ধার ধারি নাকি?”

“শ্বশুরবাড়ি গেলে সামান্য কথাও কত লম্বা হয় জানিস? সেখানে পাঁচ জনের কথার ধার না ধরে পারবি?”

“সামান্য কথা লম্বা করবে এমন বাড়িতে বিয়েই করবো না তাহলে। আইডিয়াটা ভালো না?”

“আচ্ছা? কেমন বাড়িতে বিয়ে করবি তাহলে?”

“ওসব ভেবেছি নাকি আমি? যখন বিয়ে হবে তখন দেখা যাবে।”

“সবকিছু আগে থেকে ভেবেচিন্তে রাখা ভালো। মানুষের জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কখন কি ঘটে যায় তার কোনো ঠিক নেই।”

“হু, তাও ঠিক বলেছো। ভাইয়া আর ভাবিই তো তার প্রমাণ।”

“হু।”

মিসেস আয়েশা আমিন এবার মেয়ের দিকে তাকান।

মাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অয়ন্তি বলে,

“কিছু বলবে মা? এভাবে দেখছো যে?”

মিসেস আয়েশা আমিন তৎক্ষণাৎ জবাব দিতে পারেন না। তবে নিজেকে ধাতস্ত করে বলেন,

“তোর কি কোনো পছন্দ আছে মা? কাউকে ভালোবাসিস?”

অয়ন্তি অবাক হয় হঠাৎ মায়ের এমন প্রশ্নে।

“মানে? এসব জিজ্ঞেস করছো হঠাৎ?”

“করছি আরকি। থাকলে মাকে বল। আমি দেখি ছেলেটা কেমন। আমার মেয়ে কেমন ছেলে পছন্দ করে রেখেছে।”

“দূর কিসব বলো। আমার কোনো পছন্দ নেই। কিন্তু তুমি হঠাৎ এসব নিয়ে পড়লে কেন? ব্যাপার কি?”

অয়ন্তি ভাবছে মাহাদ ভাই সেদিন ক্যাফেতে বন্ধুদের সাথে ছিলো তখন দেখে নিয়েছিল। তাকে বাড়ি এসে বলেওছে। মাকে আবার বলে দেয়নি তো? তাই মা ওখানে ওর বয়ফ্রেন্ড ছিল ভেবে এসব জানতে চাচ্ছে না তো? সে মাহাদ ভাইয়ের থেকে এটা আশা করেনি। মন খারাপ হয় তার উপর। সে তো আর এমন হবেনা বলেওছে। তাহলে মাকে বলে দেওয়াটা কি খুব দরকার ছিল?

“সত্যি বলছিস? কোনো পছন্দ নেই?”

অয়ন্তি মুখ কালো করে বলে,

“না মা। কোনো পছন্দ নেই। কিন্তু তুমি এসব কেন জানতে চাইছো?”

এবার তিনি একটু নীরব থেকে আবার বলেন,

“আসলে একটা বিয়ের প্রস্তাব হাতে আছে। আমরা অনেক ভেবেচিন্তে সেটা গ্রহণ করবো সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোর বাবা-ভাইয়েরও পছন্দ হয়েছে। তোর দাদি আর চাচা-চাচীও ভালোই মতামত দিয়েছে। এখন শুধু তোর সম্মতির পালা। তুই যদি হ্যাঁ বলিস তাহলে আমরা ওদের কাল-পরশুর দিকে বাড়ি আসতে বলবো। তুই রাজি তো মা?”

কথাগুলো বলে তিনি আশাভরা চোখে মেয়ের দিকে তাকান।

এদিকে অয়ন্তি বিস্ময়ে বিমূঢ়। সে ভেবেছিল মাহাদ ভাই মাকে বন্ধুদের বিষয়টা জানিয়ে দিয়েছে বলে এসব জানতে চেয়েছে মা। কিন্তু এতো বিয়ের ঘটনা। সে বিয়ে নিয়ে তেমন কিছু ভাবেনি। হ্যাঁ, না কোনোটাই না। বাড়ি থেকে যেমন সিদ্ধান্ত নেবে তেমনই হবে, এমনটাই ভেবে এসেছে চিরকাল। তবে হঠাৎ মায়ের মুখে বিয়ের প্রস্তাবের কথা শুনে লজ্জা পায় ভীষণ। কিছু বলতে পারেনা।

মিসেস আয়েশা আমিন মেয়েকে চুপ থাকতে দেখে আবার বলেন,

“ছেলেকে তুই চিনিস মা। তোর বড় খালামণির ছেলে, তুরাগ। তোর খালাই প্রস্তাব দিয়েছেন। আমাদের সবার কাছে তা গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে। তুই তোর বড় খালামণির ঘরেই যাবি, এর চেয়ে আনন্দের আমার কাছে আর কিছু নেই। তোর সম্মতি আছে তো?”

অয়ন্তি তুরাগের নাম শুনে আরও অবাক হয়। তার বড় খালামণির ছেলে। ভাইয়ের চোখেই দেখে এসেছে তাকে সবসময়। যদিও অন্তিক, দিগন্ত কিংবা মাহাদ—ওদের মতো যেভাবে আপন চোখে দেখতো, সেভাবে না। কিন্তু খালাতো ভাইকে যেমন ভাবে তেমনই ভেবেছে সে সারাজীবন।

আলাদা কোনো ভাবনা ছিল না তাকে নিয়ে। তুরাগ ছোট থেকেই ইন্ট্রোভার্ট ধরণের। তাই কারো সাথে তেমন মিশতো না। তাদের বাড়িতেও তেমন আসেনি ছেলেটা। ছোটবেলায় মায়ের সাথে যা এসেছে তা। এরপর বড় হয়ে একবার কি দুইবার হয়তো। অয়ন্তির মনেও নেই ঠিকঠাক। সেও খালামণির বাড়ি গেলে তেমন থাকতো না বলে তাদের মধ্যে ভাব সাব একেবারেই কম।

সে যাই হোক, খালাতো ভাই বলে একটু অস্বস্তি লাগলেও পরিবারের সিদ্ধান্তের উপর দ্বিমত জানায় না সে।

মিসেস আয়েশা আমিন মেয়ের সম্মতি পেয়ে খুশিমনে চলে যান। স্বামীকে জানাতে হবে। অন্তিক, শাশুড়িসহ, বাকি সবাইকে জানাতে হবে। আজকে কালকের মধ্যেই বোনকে পরিবার সমেত আসতে বলবেন ঠিক করেন মনে মনে।

——————

রাত বাজে আড়াইটা। মাহাদ বাড়ির ছাঁদে দাড়িয়ে আছে। জীবনে প্রথমবারের মতো স্মোক করছে বাড়ির ছাঁদে দাড়িয়ে। সে বুঝতে পারছেনা, কি হচ্ছে আর সেই বা কি করবে।

তাদের দেশের বাইরে যে বিজনেস আছে, সেটা দেশেও গ্রোথ করার পরিকল্পনা করছিল বাবা ছেলে। সেই ব্যাপারেই একটা মিটিং এ ছিল তখন। অনেক রাত হয় মিটিং শেষ হতে হতে।

মিটিং টাইমে মোবাইল সাইলেন্ট রাখা বোধ হয় সব বিজনেসম্যানের অভ্যাস। মাহাদেরও তাই। সে মোবাইল সাইলেন্ট করে রেখেছিল। মিটিং শেষে যখন ফোন চেক দেই, তখন দেখতে পায় মেহেরিন একটা ভয়েস মেসেজ পাঠিয়েছে। তাকে মিটিং শেষ করে আবার অন্য কোথাও আঁটকে না যেতে বলছে। কারণ কাল সকাল সকাল মামা বাড়ি যাবে সবাই। আর ওর নিজের জন্য এটা সেটা নিয়ে আসতে বলছিল ভাইকে। আর সবশেষে বলে, অয়ন্তিকে কাল সাঁজাতে হবে। ওকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। মেহেরিনই সাঁঁজাবে। তাই একদম সকাল সকাল চলে যাবে তারা। সে যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

হাহ! ঘুম হারাম করা খবর দিয়ে বলছে তাড়াতাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে।

মেহেরিনের ভয়েস মেসেজটা শুনে মাহাদের যে কেমন লেগেছিল, তা সে নিজেও বলতে পারবেনা। মনে হচ্ছে চোখের সামনে যা আছে ভেঙেচুরে ফেলতে। কিন্তু কেন? এমন ইচ্ছে হবে কেন তার? অয়ন্তি বড় হয়েছে। প্রস্তাব আসবে, দেখতে আসবে, বিয়ে হবে -স্বাভাবিক।

হ্যাঁ?? স্বাভাবিক?? উফ!! মাহাদের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে।

হঠাৎ ফোনটা পকেট থেকে বের করে মেহেরিনকে রিপ্লাই টেক্সট করে। জানতে চায়,

“দেখতে আসছে মানে? হঠাৎ কোনো কথাবার্তা ছাড়া কিসের দেখাদেখি। কিছুই তো শুনলামনা এই ব্যাপারে।”

বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও মেহেরিনের রিপ্লাই আসেনা। তারপর বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে গাড়ি নিয়ে।

মাঝরাস্তায় ড্রাইভ করতে করতে টাইম দেখতে ফোনের স্ক্রিন অন করলে দেখে মেহেরিন রিপ্লাই করেছিল ২০ মিনিট আগে। তার ফোন সাইলেন্ট থাকায় বুঝতে পারেনি। মাহাদ ভয়েসটা শুনে।

“হ্যাঁ, সবকিছু হঠাৎ ই হলো। বড় মামীর বোনের ছেলের জন্য অয়ন্তিকে দেওয়ার কথা বলেছিল নাকি অনেক আগে। পিকনিকের আগের দিন যে উনার স্বামীর এক্সিডেন্ট হলো, সেই ভয়ে কখন না কি হয়ে যায় তাদের, তাই ছেলেকে নাকি বিয়ে করিয়ে দিতে চাচ্ছেন দেখে শুনে। অয়ন্তিকে যেহেতু পছন্দ তাই মামীর কাছে আবার প্রস্তাব দিয়েছে। মামী মামা, অন্তিক ভাই সবাইকে জানালে ওরা অয়ন্তি কি বলে জানতে চায়। অয়ন্তি না করেনি। তাই কাল দেখতে আসবে।”

ভয়েসটা শুনে মাহাদের মেজাজ বিগড়ে যায়। ভীষণ রকম বিগড়ে যায়। অয়ন্তি নাকি না করে নি। কেন করেনি? বিয়ে করার এতো শখ সেদিনের মেয়েটার?

মাহাদ কি থেকে কি ভাবছে তা সে নিজেও জানেনা। এরপর বাড়ি এলে চাবি দিয়ে দরজা খুলে, বাড়ির সবাই তখন ঘুমিয়ে পড়েছে।

রুমে গিয়ে সব চিন্তা বাদ দিয়ে ঘুমাতে চাইলে পারেনা। এদিক সেদিক পায়চারি করতে থাকলো কিছুক্ষণ। তাও অস্থিরতা না কমলে ছাঁদে চলে যায় সে।

মাহাদ এরপর সারাটারাত নানান কিছু ভেবে ছাঁদেই কাটাই।

—————

সময়টা সকাল ৬ টার দিকে। মাহাদের মা আর বাবা ভীষণ স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ। তারা খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠেন। আজও উঠেছেন। মাহাদের বাবা বাইরে হাঁটতে বের হবেন। তাই পোলো শার্ট, জগার, জুতাসহ অন্যান্য এক্সেসরিজ নিয়ে প্রস্তুত হচ্ছিলেন। মাহাদের মা কাপড় গুছাতে গুছাতে ফোনে কথা বলছে।

মিসেস আয়েশা আমিনের সাথেই বলছেন কথা। অতিথিদের জন্য কি কি আয়োজন করলে ভালো হবে সেসব পরামর্শ দিচ্ছেন ভাবিকে। এর মধ্যে দেখেন ছেলে এসেছে রুমে। তবে তিনি

ছেলেকে এখানে দেখে অবাক না হলেও ছেলের চোখ মুখের হাল দেখে ভীষণ অবাক হন। মাহাদের চোখগুলো ভীষণ লাল হয়ে আছে। চুল গুলোও ভীষণ এলোমেলো। মাহাদের মা ভয় পেয়ে যান, ছেলেটার শরীর খারাপ হলো নাকি ভেবে।

উনি তাড়াহুড়া করে কথা শেষ করেন। ফোন কেটে ছেলের কাছে এসে গালে হাত দিয়ে জানতে চান,

“কি হয়েছে বাবা? চোখ মুখের এই অবস্থা কেন তোর? অসুস্থ লাগছে?”

স্ত্রীর কথা শুনে মাহাদের বাবাও তাকান। ছেলেকে দেখে বলেন,

“এই অবস্থা কেন চোখ মুখের? রাতে ঘুমাও নি? নাকি ড্রিংক করেছ?”

মাহাদ সেসব কথার উত্তর না দিয়ে বলে,

“আমি বিয়ে করবো।” কথাটা বলে সে বাবা মা দুজনের দিকে তাকায়।

উনারা অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকান। চেহারার হাল বেহাল করে ছেলে এসে বলছে বিয়ে করবে। কি উত্তর দিবে বুঝতে পারলেন না তৎক্ষণাৎ।

“হঠাৎ এ কথা বলছিস কেন? কাউকে ভালোবাসিস?” মা

“এতো কথার তো দরকার নেই। বলছি বিয়ে করবো। তোমরা মেয়ের বাড়ি গিয়ে প্রস্তাব দেবে, ব্যাস।”

“মেয়ে কে? কার বাড়ি যাবো?” মাহাদের মা হতবম্ব স্বরে বলেন।

মাহাদ মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, “তোমার ভাইজি”

“মানে?” উনার অবাক হওয়া শেষ হয়না।

“মানে তোমার ভাইজির কথা বলছি, অয়ন্তি। ওকে আমি বিয়ে করবো। আজ তোমরা প্রস্তাব নিয়ে যাবে।”

মাহাদের কথা শুনে কিছুক্ষণ ছেলেটা কি বললো তা বুঝার চেষ্টা করেন তিনি। তারপর একপলক স্বামীর দিকে তাকান। যা শুনছে তা ঠিক কিনা বুঝার চেষ্টা করেন। সবকিছু মাথায় খেলে যেতেই দাঁতে দাঁত চেপে বলেন,

“মাথা খারাপ তোর? আজ ওকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে। আর তাছাড়া বোন হয় তোর। বোধ বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছিস নাকি?”

“বোধ ফিরে এসেছে। তোমাদের যা বলছি তা করো। অয়ন্তিকে আমি বিয়ে করবো।”

মাহাদের মা স্বামীর দিকে একপলক তাকিয়ে বলেন,

“পাগলে পেয়েছে আপনার ছেলেকে। কিছু বোঝান। আজ অয়ন্তিকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। এই ছেলে বলছে আজ নাকি আমি বাড়ি গিয়ে তার জন্য প্রস্তাব দিতাম। বড় ভাইয়ার সামনে, ভাবির সামনে আমি কোনমুখে দাড়াবো?”

“মাহাদ, তুমি কি বলছ বুঝতে পারছ? বোন হয় তোমার। এসব চিন্তা ভাবনা আনো কি করে? আর আজকে মেয়েটাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে। আবোল তাবোল বকবেনা এমন সময়ে।” -বাবা

“আমি কোন আবোল তাবোল বকছিনা বাবা। অয়ন্তিকে কি তোমরা জন্ম দিয়েছ যে বিয়ে করতে পারবো না? মামাতো বোন হয়। এখন বউ বানাতে চাচ্ছি। আমি এতো কিছু বুঝিনা, তোমরা আজ গিয়ে ওবাড়িতে প্রস্তাব দেবে অয়ন্তিকে আমার সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য। নাহয় আমি কি করবো নিজেও জানিনা”

“তুমি যা করবে করো। কিন্তু আমি আমার ভাইয়ের সামনে এসব ছেলেমানুষী প্রস্তাব নিয়ে যেতে পারবো না।”

“আচ্ছা? ঠিক আছে। অয়ন্তির বিয়ে আমার সাথে না হলে কিভাবে অন্য কারো সাথে হয় আমিও দেখে নেব। আমার উপায়ে আমি ওকে বিয়ে করবো। তখন তোমাদের কেন জানালাম না সেটা বলতে এসো না।”

মাহাদ তার মাকে অথৈ জলে ফেলে যায়। তিনি বুঝতে পারছেন না কি করবেন। স্বামীর দিকে তাকান।

“তোমার ছেলে বোধ হয় অয়ন্তিকে ভালোবাসে।” মাহাদের বাবা

“পাগল হয়ে গিয়েছে সে। ওদের মধ্যে ভালোবাসা বাসি হবে এমন কোনো ফাকা জায়গা ছিল নাকি? সারাজীবন আমার ভাইয়ের মেয়ে তিনটাকে মেহেরিনের চেয়ে কম করে না দেখতে শিখিয়ে এসেছি। আজ সে বলছে অয়ন্তিকে বিয়ে করবে। লজ্জ্বা করলো না আপনার ছেলের?”

“এখন সেসব বাদ দিয়ে কি করবে ভাব।” মাহাদের বাবা চিন্তিত মুখে বলেন।

“আপনার ছেলে তো হু ম কি দিয়ে গেলো। অয়ন্তির বিয়ে হতে দেবেনা, আমরা কিছু না করলে।”

“অন্য উপায়ে ওকে বিয়ে করবেও বললো। কোনো ঝামেলা না করে বসে আবার।”

“আমার ভীষণ ভয় করছে। আপনার ছেলে যদি সত্যি সত্যি তেমন কিছু করে আমি আমার মা, ভাই, ভাবি ওদের সামনে কোন মুখে দাড়াব ?”

——————

সরোয়ার বাড়ির মানুষগুলো আজ ভীষণ ব্যস্ত। বাড়ির বড় মেয়েকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। কোনকিছুর কমতি রাখছেন না তারা। বাড়ি নতুন করে সাজানো থেকে, অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য খাবার দাবার—কোন কিছুর কমতি নেই।

বাড়ির দুই গৃহিণী এখনো রান্নাঘরেই। তাদের রান্না বান্নার শেষ নেই। দিগন্ত, অন্তিকও আজ বাড়ি আছে।

কাল তারা দুভাই বাড়ির ইন্টেরিয়র ও অ্যাম্বিয়েন্স চেঞ্জ করিয়েছে। ডিজাইনার ল্যাম্প, আর্টওয়ার্ক, হালকা ওয়র্ম লাইটসহ আরও অনেক কিছু।

বাড়ির দুই কর্তাও বসে নেই। বাজার আরও অনেক বাকি। সেসব লিস্ট করছেন। আনতে যেতে হবে।

প্রাণেশা আর দাদিও রান্নাঘরে। দাদি বউমাদের দিক নির্দেশনা দিচ্ছেন। আর প্রাণেশা এটা সেটা যা লাগে এগিয়ে দিচ্ছে শ্বাশুরিদের।

দিথী আর ইশি ডাইনিং সাজাচ্ছে। প্লেটিং, কাটলারি, গ্লাস, সেন্টারপিস সব ঠিক ঠাক করে দুজনে মিলে। তবে তার আগে দিগন্তের সাহায্যে টেবিলের ঠিক উপরে হালকা ব্রোঞ্জ শেডের দুইটা মিনিমাল পেনড্যান্ট লাইট ঝুলিয়ে দেয়।

অন্তিক ছিল বোনের কাছে। তাকে আরেকবার নিজে গিয়ে জিজ্ঞেস করছিল বিয়ে নিয়ে মতামত কি তা।

অয়ন্তি যদি শেষ মুহূর্তে এসেও না করে দেয়। তাহলে সে এখানেই সব বন্ধ করে দেবে। এমন আশ্বাস দেয়। কিন্তু অয়ন্তি কোনো আপত্তি করেনা আজকের দেখতে আসা নিয়ে।

অয়ন্তি ছোটবেলা থেকে ভীষণ বাধ্য মেয়ে। বড়দের উপর কোনো দিন কথা বলেনি। সেখানে বিয়ের মতো বিষয় নিয়ে আপত্তি করবে এমনটা হতেই পারেনা, যদিনা বিশেষ কোনো সমস্যা থাকে। যেহেতু তেমন কোনো ব্যক্তিগত সমস্যা নেই তার, না বিয়ে করবেনা এমন কোনো পরিকল্পনা ছিল আগে থেকে, আর না যার সাথে বিয়ের কথা বলছে তাকে নিয়ে খারাপ কোন অভিজ্ঞতা আছে। তাহলে আপত্তি করার প্রশ্নই আসেনা।

অন্তিক দ্বিতীয়বারের মতো বোনের সম্মতি নিয়ে চলে যায়। রুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হতে হবে তার। কিন্তু তার আগে একবার নিচে গিয়ে রান্নাঘরের কাছাকাছি যায়। দূর থেকেই মাকে বলে,

“মা, ওকে একটু রুমে পাঠাও তো। দরকার আছে।” কথাটা বলে সে চলে যায়।

প্রাণেশা এভাবে সবার মধ্য থেকে ওকে রুমে ডাকায় লজ্জ্বা পায় ভীষণ। মাথা নিচু করে নেয়। দাদি, দুই শ্বাশুরি —সবাই কি ভাবলো!

ছেলের কথা শুনে মিসেস আয়েশা আমিন প্রাণেশার দিকে আড়চোখে একপলক তাকায়। মেয়েটা লজ্জ্বা পেয়েছে। উনার ভীষণ ভালো লাগলো। ছেলেটা এখন পুরোপুরি সংসারী হবে। আগে দেখতেও পারতো না মেয়েটাকে। এখন চোখে হারাচ্ছে। তিনি মনে মনে প্রশান্তি অনুভব করেন।

“কি হলো? দাড়িয়ে আছিস কেন? দাদুভাই ডেকেছে। তাড়াতাড়ি যা। এখানে তোর আর কোন কাজ নেই। স্বামীকে সন্তুষ্ট করবি শুধু। তাড়াতাড়ি যা।” -দাদি

দাদির কথা শুনে ইতস্তত করে প্রাণেশা একবার শ্বাশুরির দিকে তাকায়।

উনি নিজের মতো রান্না করছেন দেখে আস্তে আস্তে চলে যায়।

প্রাণেশা রুমে এসে দেখে অন্তিকের মোবাইলটা বিছানায় রাখা, রিং পড়ছে, কাউকে কল দিয়ে লাউড স্পিকার দিয়ে রেখেছে। সেদিকে চোখ রেখে অন্তিক গাঁয়ের শার্টের বোতাম খুলছে।

সে রুমে এসে দরজায় হাতের বারি দিয়ে অন্তিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ওপাশে ব্যক্তি কল রিসিভ করছেনা দেখে অন্তিক সেই কলটা কেটে দিয়ে শার্ট টা খুলে বিছানায় ফেলে রাখে। তারপর প্রাণেশা কে দেখে বলে,

“ঘুম থেকে উঠে তোমাকে দেখলাম না কেন? এতো তাড়াতাড়ি উঠে কোথায় গিয়েছিলে? বলেছি না প্রতিদিন উঠে যেন আমার পাশে পাই তোমাকে?”

“আজ বাড়িতে কতো কাজ। তাড়াতাড়ি উঠতে হবেনা?” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

“এতো তাড়াতাড়ি উঠার দরকার তো দেখছিনা। ওরা আসতে আসতে ১ টা ২ টা বাজবে। এখন বাজে মোটেও সাড়ে নয়টা। আরও অনেক সময় আছে। ভোরবেলা থেকে তাড়াহুড়া করার তো কোনো দরকার নেই। ঠাণ্ডা মাথায় করলে সব ঠিক ঠাক হয়ে যাবে সঠিক সময়ে।”

“আপনার মতো সবার মাথা ঠাণ্ডা থাকে নাকি তাড়াহুড়ার সময়? সময় লাগতেই পারে।” (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

“আচ্ছা? খুব বুঝেন দেখছি ম্যাডাম। তো এবার আমার কাপড় বের করুন। গোসল করবো। তারপর আবার বের হতে হবে।”

এমন না যে প্রাণেশা এই রুমে থাকা শুরু করেছে খুব বেশিদিন হচ্ছে। আর সে রুমের কোথায় কি আছে সব খুটিনাটি জানে। কিন্তু অন্তিক তার সব কাজকর্ম মেয়েটাকে দিয়ে করায়। ভালো লাগে তার।

বউ তার জন্য কাজ করলে ভীষণ ভালো লাগে।

সে একটা টাওয়েল নিয়ে ঢুকে পড়ে ওয়াশরুমে। ততক্ষণে প্রাণেশা অন্তিকের কাপড় হাতে নিয়ে দরজার পাশে দাড়িয়েছে। ওকে কাপড় বের করতে বলে, সেসব না নিয়েই লোকটা ঢুঁকে পড়েছে ওয়াশরুমে। তারপর শুধু একটা টাওয়েল পেঁচিয়ে বের হবে। আর তার লজ্জ্বার শেষ থাকবেনা। তাই অন্তিক বের হতে চাইলেই প্রাণেশা কাপড়গুলো এগিয়ে দেবে, আর ভেতর থেকে চেঞ্জ করে আসতে বলবে ঠিক করেছে সে।

ভাবনার মধ্যেই কট করে দরজা খোলার আওয়াজ হয়। অন্তিক প্রাণেশার ভাবনা মতো বের হতে চাইলে সে দরজাটা বাইরে থেকে টেনে ধরে কাপড় এগিয়ে দেয়। বোঝায় ভেতর থেকে চেঞ্জ করে আসতে।

অন্তিক প্রথমে একটু অবাক হলেও বুঝতে পারে প্রাণেশার এমন করার কারন। সে যতবার শুধু টাওয়েল পেঁচিয়ে রুমে গিয়েছে, ততবার এই মেয়েটা লজ্জ্বায় লাল নীল হয়েছে। তার দিকে তাকায়না অব্দি চোখ তুলে।

অন্তিক দরজার ফাঁক দিয়ে মাথা বের করে বলে,

“লজ্জ্বা পাচ্ছেন নাকি ম্যাডাম? গাঁয়ে কিন্তু টাওয়েল আছে, একেবারেই খালি গাঁয়ে নই। বাইরে আসি?”

প্রাণেশা তাড়াতাড়ি মাথা নাড়ায়। বোঝায় কাপড় পড়ে বাইরে আসতে।

“উহুম। আমার তো রুমে গিয়ে চেঞ্জ করার অভ্যাস। ওয়াশরুমে চেঞ্জ করতে ভালো লাগেনা। কি করা যায়?”

“প্লিজ” প্রাণেশা চোখের ইশারায় অনুরোধ করে বোঝায়।

“ঠিক আছে। আপনার অনুরোধ মানলাম। কিন্তু পরিবর্তে আমি যা চাই করতে হবে।”

প্রাণেশা হাত দেখিয়ে বোঝায়, “কি?”

ওমনি অন্তিক সেই হাত ধরে হ্যাঁচকা টানে ওকে ওয়াশরুমের ভেতর ঢুকিয়ে নেয়।

প্রাণেশা হতবম্ব!

অন্তিক ওর সেই হতবম্ব চেহারা উপেক্ষা করে বলে,

“এটাই চাই, আবার গোসল করবো। তুমি আমি একসাথে।”

বলেই প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে না করতে করতে সে শাওয়ার অন করে দেয়।

দুজনেই ভিজে একাকার। প্রাণেশার গাঁয়ে সাদা সালোয়ার কামিজ ছিল। ভিজে গিয়ে কাপড় গাঁয়ের সাথে লেপ্টে রয়েছে। কালো অন্তর্বাসের সাথে নারীকায়া স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সে অস্বস্তিতে গুটিয়ে যায়। বুকে হাত দিয়ে নিজেকে আড়াল করতে চাই। ভীষণ লজ্জ্বা লাগছে। চোখ তুলে তাকায়না অন্তিকের দিকে।

অন্তিকের চোখ প্রাণেশার উপরেই ছিল। প্রাণেশার মেয়েলী শরীর তার সামনে স্পষ্ট। ইচ্ছে করছে সেই মেয়েলী শরীরে ডুব দিতে। কিন্তু প্রাণেশা বোধ হয় প্রস্তুত নয় এখনো। তাই ওর শরীর থেকে নজর সরিয়ে চেহারার দিকে তাকায়। নিজেকে আড়াল করার চেষ্টাই মাথা নিচু করে দাড়িয়ে আছে সে। অন্তিক ওর চিবুকে হাত দিয়ে মুখটা উপরে তুলে। প্রাণেশার চোখ তাও নিচে। অন্তিক ওর কাঁপতে থাকা ঠোঁট, চোখ এসবে চোখ বুলিয়ে বলে,

“আমার দিকে তাকাও।”

প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে না বলে।

অন্তিক ওর কোমরে হাত দিয়ে টেনে একেবারে গাঁয়ের সাথে লাগিয়ে নেয়। চিবুকে থাকা ঐ হাত দিয়ে প্রাণেশার ঠোঁটে আঙ্গুল বুলাতে বুলাতে বলে,

“তাকাবেনা?” প্রাণেশা না ই বলতো। কিন্তু কোমরে থাকা ঐ হাত স্থির নেই, ভীষণ অবাধ্য। সাথে ঠোঁটে ঘষতে থাকা আঙ্গুলটাও।

তাই অস্থিরতায় সে হ্যাঁ না কিছু বলেনা। আস্তে আস্তে চোখ তুলতেই দেখে অন্তিকের চোখ কখনো ওর ঠোঁটে তো কখনো ওর বুকে।

তা দেখে সে আবার হাত দিয়ে বুক আড়াল করার চেষ্টা করে। এমন করতে দেখে অন্তিক ওর চোখের দিকে তাকায়। তারপর একটু হেসে বলে,

“যা ঢাকতে চাইছ, ঐ জায়গা আমার এক্সপ্লোর করা হয়ে গিয়েছে ম্যাডাম।”

প্রাণেশা দ্বিধান্বিত চোখে তাকিয়ে “মানে” জানতে চায়।

অন্তিক ওর বুকে দিয়ে রাখা হাত দুটো নামিয়ে দেয়। চোখ দিয়ে সেদিকে ইশারা করে বলে,

“মানে আপনার ওখানের রহস্য আমার কাছে উন্মোচন হয়েছে অনেক আগে। তাই আর ঢাকাঢাকি করার দরকার নেই।”

প্রাণেশা এভাবে বলায় লজ্জ্বা পেলেও প্রশ্নাত্মক চোখে তাকায়। যার অর্থ সে এখনো কিছু বুঝতে পারেনি।

অন্তিক ওকে হঠাৎ কোলে তুলে নেয়। গলায় চুমু খায় অনবরত। তারপর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে,

“সেদিন যে অসুস্থ হয়েছিলে, জ্বর বাধিয়েছিলে। সারারাত তো সেবা করলাম। তাই আমারও কিছু প্রাপ্য ছিল নিশ্চয়? ঐ প্রাপ্য টুকুই নিয়েছি।”

প্রাণেশার বুঝতে একটু সময় লাগলেও বিষয়টা ঠিক ই পরিষ্কার হয়। খুব লজ্জ্বা পায়। সেদিন সবার সামনে অয়ন্তি আপু ওর সেবা করেছিল ভেবে, ওর গা মুছিয়ে দিয়েছিল ভেবে -ধন্যবাদ জানিয়েছিল। অয়ন্তি আপুও হ্যাঁ, না কিছু বলেনি। লোকটা যে ওর সাথে ছিল সারারাত তা নিশ্চয় জানতো। কিন্তু সে ই অজ্ঞাত ছিল সবকিছুর ব্যাপারে। তাছাড়া সকাল সকাল সারা গাঁয়ে ভীষণ ব্যাথা করছিল। কামড়ের, খামচির মতো দাগও ছিল। বুকে ব্যাথা ছিল দুই/তিন দিন। নিশ্চয় এই কারণে। ওকে না জানিয়ে, ওর অনুমতি ছাড়া কাছে এসেছিল ভেবে রাগ হয়। সে অন্তিকের কোল থেকে নেমে যেতে চায়।

অন্তিক ও রেগে গিয়েছে বুঝতে পারে। তবে আফসোস হয়না। সে ওকে নামতে দেয় না। নিজের সাথে আরও জড়িয়ে নিয়ে বলে,

“রাগ করছ কেন? আমি কি তোমাকে একটু ছুঁতে পারিনা? আমার কি একটুও অধিকার নেই?”

প্রাণেশা জবাব দেয় না।

ওর নীরবতা দেখে অন্তিক ওকে আরেকটু শক্ত করে ধরে রুক্ষ ভাবে কাছে টানে। তারপর বলে,

“নাকি আমি ছুঁলে তোমার খারাপ লাগে? কোনটা?”

প্রাণেশা অন্তিকের দিকে তাকায়। বুঝে যায় লোকটা রেগে যাচ্ছে। কিন্তু ওর নিজেরও রাগ লাগছে। তাও কোনো ভাবে মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়।

“বেশ! তাহলে আজ আরেকটু ছুঁতে চাই তোমাকে।” ওর জবাব পেয়ে নাকে নাক ঘষে বলে অন্তিক।

প্রাণেশা অন্তিকের কথা উপলব্দি করে ওকে মানা করবে করবে, তার আগেই স্তব্দ হয়ে যায় শরীরে লোকটার অযাচিত স্পর্শে। চিন চিন ব্যাথায় চোখ দিয়ে এক ফোটা অশ্রু গড়ায়। অন্তিকের গলায় থাকা হাত দুটো আরও দৃঢ় হয়। অন্তিকের গলায় ঘাড়ে প্রাণেশার নখ দেবে যায়। অথচ অন্তিকের সেদিকে কোনো হুশ নেই। সে নিজের কাজ চালিয়ে যায়।

মৌনপ্রেম পর্ব ২৯ গল্পের ছবি