সময়টা সেদিন রাত ৮ টার ঘরে। অন্তিক প্রাণেশার ঘটনার পর দুটো দিন কেটে গিয়েছে। অন্তিকের মা, চাচী আর দাদি মিলে রিসিপশনে কাদের ইনভাইট করা হবে সেসব ঠিকঠাক করলেও বাকি কোনকিছু নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, আর না এই ব্যাপারে কোন আলোচনা হয়েছে। কারণ অন্তিকের বাবা, চাচা সহ তারা দুই ভাইও নিজেদের কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত ছিল। বিশেষ করে অন্তিকের বাবা আর চাচা। বাড়ির দুই কর্তা যেহেতু ব্যস্ত, তাই আর কোনরকম সিদ্ধান্ত কেউ নিতে পারেন নি এই দুই দিন।
অন্তিকের দাদি শাইনা বেগমের রুমে বড়রা সকলে এই মুহূর্তে উপস্থিত রয়েছেন। সবার সুবিধা অসুবিধা তুলে ধরে রিসিপশনের ব্যাপারে সবরকম সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই মূলত এই বৈঠক। ছেলেমেয়েদের সকল সুবিধা অসুবিধাসহ বিবেচনা করে তারা সামনের সপ্তাহে রিসিপশনের আয়োজন করবে ঠিক করেন।
সকল গুরুত্বপূর্ণ কথা শেষে যে যার রুমে চলে গেলে, নিজেদের রুমে এসে অন্তিকের মা গলা ঝেড়ে কিছু বলার আবাস দেন তার স্বামীকে। উনার ইঙ্গিত পেয়ে মি.মাহমুদ তাকান। স্ত্রীকে সাধারণত তেমন একটা গম্ভীর হয়ে থাকতে দেখেন না। সবসময় হাসি খুশি থাকেন আর মিশুক ধরণের। যে কারো মন জয় করতে পটু। তার উপর স্বামীকে কোনো কিছু বলতে তিনি দ্বিধা করেন না। সেই বিয়ের শুরু থেকে- নিজের নিরাপদ আশ্রয়স্থল, অভিভাবক হিসেবে দেখে এসেছেন তাকে। সেই স্ত্রীকে ইতস্তত করতে দেখে তিনি গভীর ভাবে তাকান। মিসেস আয়েশা আমিন একপলক স্বামীর দিকে তাকিয়ে বলেন,
“বলছিলাম, বড় ছেলের চিন্তা তো শেষ হলো। কিন্তু এখনো উপযুক্ত ছেলে মেয়ে বাড়িতে আরো আছে। একজনের জীবন গুছিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো হবেনা। দিগন্ত, অয়ন্তি -ওদের নিয়েও ভাবতে হবে।”
উনার কথা শুনে মি মাহমুদের কপালের মিলিয়ে যায়। ভেবেছিলেন খুব সিরিয়াস কিছু হবে। তবে স্ত্রীর কথা শুনে চিন্তা কেটে যায়।
তাই মাথা নাড়িয়ে বলেন।
“হুম, ঠিক বলেছ। কিন্তু আগে রিসিপশনটা নাহয় হয়ে যাক। তারপর মুনতাসিরের সাথে কথা বলে দিগন্তের জন্যও মেয়ে দেখা শুরু করতে বলবো মাকে।”
স্বামীর কথা শুনে মিসেস আয়েশা আমিন বলেন,
“তা ঠিক আছে। কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম অয়ন্তির ব্যাপারে আগে এগোতে। আর তো ছোট নেই মেয়েটা। একে একে সম্বন্ধ আসতেই থাকে। সে উপযুক্ত মেয়ে বাড়ি থাকলে প্রস্তাব আসবেই। কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম এবার বিষয়টা নিয়ে ভাবতে।”
মি মাহমুদের কপালে আবার ভাজ পড়ে।
“কি বলতে চাচ্ছ আয়েশা। আমার মেয়েকে গ্র্যাজুয়েশন শেষে বিয়ে দেব বলেছিলাম। ভুলে গেছ?”
“কিছু ভুলিনি। কিন্তু গ্র্যাজুয়েশন শেষে দেবেন বললেও মেয়ের যে বয়স বাড়ছে সে খেয়াল আছে? ওর কথা বাদ দিলাম। আপনার আমার বয়স কি বাড়ছেনা? সেদিনও অসুস্থ হয়ে পড়লেন হঠাৎ। আমারও শরীর ঠিক ঠাক লাগেনা আজকাল। কখন না জানি কি হয়ে যায়। বড় মেয়েটাকে অন্তত বিয়ে দিয়ে সুখী সংসার দেখে যাই। আমার ভীষণ ভয় হয় আজকাল। বড় আপার বাড়িতেও হঠাৎ দুর্ভোগ নেমে এলো ভাইজান এক্সিডেন্ট করে।” কথা শেষে স্বামীর দিকে তাকান।
তারপর আবার বলেন,
বাড়িতে তিনটে মেয়ে আছে, একটারও কি সুখী সংসার দেখে যেতে পারবোনা? অয়ন্তির তো বিয়ের বয়স হয়নি এমন না। বিয়ের পর নাহয় পড়া লেখা করবে। আর তাছাড়া হাতে পায়ে বড় হলেও সংসারের কিছু বুঝেনা। সব শিখিয়ে পড়িয়ে দিতে হবে, বুঝ দিতে হবে অনেক- সংসার করতে গেলে। আমি না থাকলে সেসব কে করবে? আপনি আর লেখাপড়া লেখাপড়া করবেন না। সেসব বিয়ের পরও করা যায়। বিয়ের কথা ভাবুন এবার।”
মি. মাহমুদ বুঝতে পারেন স্ত্রীর চিন্তা। সেদিন বোন জামাইর এক্সিডেন্ট হলো, পরদিন আবার তিনি শরীর খারাপ হয়ে বিছানায় ছিলেন। তার স্ত্রীর নিজেরও নানান সমস্যা দেখা যায় আজকাল। তাই ভয় পাচ্ছেন। আর তাছাড়া স্ত্রীর ভয়ের কারণ শুনে তারও এখন মনে হচ্ছে বড় মেয়েটাকে নিয়ে ভাবা উচিত।
তিনি বলেন,
“তোমার সব কথা বুঝতে পারছি আয়েশা। কিন্তু বিয়ে একটা দেব বললেই তো দেওয়া যায় না। ভালো ছেলে, ভালো পরিবার, অয়ন্তির উপযুক্ত, ওকে বুঝবে -এমন কাউকে পেতে তো হবে। নাহলে যার তার হাতে তো তাড়াহুড়া করে মেয়ে তুলে দিতে পারিনা। আর অয়ন্তির এখন বিয়ে করাতে কোন আপত্তি আছে কিনা জানতে হবে, কিংবা ওর কোনো পছন্দ অপছন্দ আছে কিনা -সেই ব্যাপারেও খোঁজ নিতে হবে। বললেই তো আর মেয়ে বিয়ে দেওয়া যায় না।”
“মেয়ে এখনই বিয়ে দিতে আমিও বলছিনা। কিন্তু ছেলে দেখে কথা বার্তা সেরে রাখতে তো আর সমস্যা নেই।”
“বুঝতে পারছ না তুমি আয়েশা। মন মতো ছেলে তো পেতে হবে না কি?”
এবার মিসেস আয়েশা একপলক স্বামীকে দেখে বলেন,
“প্রস্তাব একটা এই মুহূর্তে হাতে আছে। আপনি চাইলে ভেবে দেখতে পারেন।”
“মানে? কে প্রস্তাব দিয়েছে এর মধ্যেই?”
“এর মধ্যেই না। মাস খানেক আগেই দিয়েছিল। কিন্তু আমি মানা করে দিয়েছিলাম। বড় ছেলের বিয়ে আগে দেব বলে। এখন যেহেতু হয়েই গিয়েছে তা। তাই তারাও আবার
চাচ্ছেন অয়ন্তিকে।"
"ছেলে কেমন? পরিবার কেমন? খোজ নিয়েছ কিছু?"
"ছেলেকে আপনি চেনেন।"
"কার কথা বলছো? স্পষ্ট করে বলো।"
“বড় আপার ছেলে, তুরাগের কথা বলছি। আপা অনেক আগে থেকেই অয়ন্তিকে ছেলের বউ করতে চান। আমাকে জানিয়েওছিলেন, তবে মানা করে দিয়েছিলাম আগে ছেলের বউ আনবো বলে। এখন অন্তিকের বিয়েও হয়ে গিয়েছে, আপাও ভাইজানের এক্সিডেন্টের পর থেকে ভয়ে থাকেন। ছেলেকে বিয়ে করিয়ে দিতে চাচ্ছেন তারা। আমাকে সেদিন বললো অয়ন্তি আর তুরাগের বিষয়টা আরেকবার ভেবে দেখতে। আমারও মনে হচ্ছে এবার কিছুটা ভাবা যেতেই পারে ওর বিয়ের ব্যাপারে। অতোটাও ছোট নেই।”
মি. মাহমুদ স্ত্রীর কথা মন দিয়ে শুনেন।
“তোমার সব কথা বুঝলাম। কিন্তু আগে অন্তিকের রিসিপশনটা হয়ে যাক, তারপর মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে ভাবা যাবে। এখন একটা অনুষ্ঠান সামনে রেখে অন্য একটা বিয়ের ব্যাপার বের করা তো সম্ভব না।”
“এখনই বিয়ের কথা বলতে হবে কেন? আগে একবার আসুক ওরা সবাই, এসে অয়ন্তিকে দেখে যাক। কিছু কথাবার্তা সম্পন্ন হোক। তারপর দুপক্ষ থেকেই সব ঠিক ঠাক থাকলে নাহয় রিং টা পরিয়ে রাখবে। বিয়ের কথা অন্তিকের রিসিপশন অনুষ্ঠানের পর ভাবা যাবে নাহয়। আপনি কি বলেন।”
মি. মাহমুদের স্ত্রীর পরিকল্পনা খারাপ মনে হয়নি। বরং এমনটা হলেই ব্যাপারটা সুন্দর ভাবে এগোবে বলে মনে হলো উনার। তাই তিনি সম্মতি দেন। স্ত্রীকে বলেন অয়ন্তিকে ডেকে পাঠাতে। ওর থেকে মতামত নিয়ে সম্মতি পেলে তারপর ওদের আসতে বলবেন, নয়তো না।
———————
আজ অন্তিক ফ্রি আছে। কাজের ব্যস্ততা কম। তাই মিসেস আয়েশা আমিন বলেছেন প্রাণেশাকে নিয়ে একবার তার মামা বাড়ি যেতে। উনাদের রিসিপসশনে ইনভাইটও করা হবে, সাথে প্রাণেশারও ভালো লাগবে। সেই যে অনাকাংঙ্ক্ষিতভাবে বিয়েটা হলো। এরপর থেকে প্রাণেশার মামা বাড়ি মুখো হওয়াই হয় নি।
অন্তিককে মিসেস আয়েশা আমিন বিয়ের শুরতে শুরুতে একবার অবশ্য বলেছিলেন যেন প্রাণেশাকে নিয়ে মামা বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসে।
কিন্তু কথাটা শুনে তখন অন্তিকের যা প্রতিক্রিয়া ছিল, এরপর না তিনি আর ছেলেকে জোর করেছেন সেখানে যেতে। আর না প্রাণেশা বলার সাহস করেছে কাউকে, যে সে মামা বাড়ি যেতে চায়।
এখন যেহেতু সব ঠিক ঠাক আছে, আর সামনে রিসিপশনের আয়োজন করা হচ্ছে -তাই তাদের জানানো টা দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। মা-বাবাহীন মেয়েটাকে যেমন ভাবেই হোক, তারাই ছোট থেকে বড় করেছে। তাদের ছাড়া নতুন জীবনের এমন সুন্দর সূচনাতে নিশ্চয় প্রাণেশার সবকিছু ফিকে লাগবে।
এজন্য অন্তিকের মা ছেলেকে আজ যেহেতু কাজের ব্যস্ততা কম, তাই ওখান থেকে ঘুরিয়ে আনতে বলেছেন।
মায়ের কথামতো অন্তিক প্রাণেশাকে নিয়ে সেখানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
মেয়েটার সাথে সব কিছু ঠিক ঠাক হওয়ার পর আর তেমন একটা ভালো সময় কাঁটাতে পারে নি সে, ব্যস্ততার কারণে। যার জন্য আফসোসের কমতি নেই তার। তাই এই সুযোগে ভালো একটা সময় কাঁটানো যাবে ভেবে সে খুশিই হয়।
———————
প্রাণেশা আর অন্তিক এখন গাড়িতে আছে। তারা প্ল্যান অনুযায়ী প্রাণেশার মামা বাড়ির উদ্দেশ্যেই বেরিয়েছে। অন্তিক ড্রাইভ করছে। তবে মনোযোগ প্রাণেশার দিকে। মেয়েটা ঘুমাচ্ছে। অন্তিক ভেবেছিল আইস্ক্রিম পার্লার, ফুচকা স্টল, ফুলের দোকান -এসবের সামনে দাঁড়াবে। প্রাণেশাকে নিয়ে যাবে সেসব জায়গায়। মেয়েরা তো এসব বিষয় খুব পছন্দ করে। সেবার সাহিল ফারদিনের সাথে দেখা করে চলে আসার সময় মেয়েটাকে কানে একটা ফুল গুঁজে ফুচকা খেতে দেখেছিল। খুব উপভোগ করছিল বিষয়টা, তা দেখেই বুঝা যাচ্ছিল। তারপর ঝাল ঝাল ফুচকা খাওয়া শেষে বান্ধবীর সাথে আইস্ক্রিমও খাচ্ছিল। এসব মাথায় রেখে সে ভাবে আজকে ওকে নিয়ে এই বিষয়গুলো আবার উপভোগ করবে সে।
প্রাণেশা ফুল গুজবে কানে, ঝাল ঝাল ফুচকা খাবে, আইস্ক্রিম খাবে -আর সে দেখবে।
কিন্তু কিসের কি। মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে গাড়িতে উঠে কয়েক মিনিটের মধ্যেই। অবশ্য এসব তারই দোষ। সে এই দুটো দিন ব্যস্ততার কারণে প্রাণেশাকে সময় দিতে না পারলেও, রাত গুলো খুব কাজে লাগিয়েছে। অন্তিক আসতে আসতে মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়তো। কিন্তু অতো রাতে এসে সে মেয়েটার শরীরের উপরেই নিজের সমস্ত ভার ছেড়ে দিতো। ওর বুকে মাথা রেখে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ঘুমিয়েছে সে এ দুটো দিন।
মেয়েটার ছোট্ট শরীর অতো ভার নিতে পারেনা। তাই সারা রাত নির্ঘুম কাটে বলতে গেলে। অন্তিক এসব বুঝেও দয়া দেখায় নি। জীবনের এতোগুলো বছর তো খুব শান্তিতে ঘুমিয়েছেই। এখন আর দরকার নেই।
দুটো মাস সে কতো যন্ত্রনায় ছিল, দ্বিধায় ছিল এই একটা মেয়েকে নিয়ে! এখন সে ঘুমাক শান্তিতে। প্রাণেশার ঘুমানোর দরকার নেই। সে মোটেও অনুতপ্ত নয় যা করেছে তার জন্য। বিয়ের পর এতো গুলো দিন সময় পেয়েছে সেটাই তো অনেক বেশি। এখন রাতে ঘুমানোর দরকার নেই।
গাড়ির ধাক্কায় প্রাণেশার মাথাটা হেলে গিয়েছিল। অন্তিক একহাতে সেটা ঠিক করে দিয়ে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দেয় এবার। লম্বা লম্বা চুলগুলো উড়ে এসে পড়ছে তার মুখে। সে সরায় না। ওর চুলের ঘ্রাণটা টেনে নেয়, উপভোগ করে সময়টা।
———
প্রাণেশা অন্তিকের সাথে মামা বাড়ির গেটের সামনে দাড়িয়ে আছে। তার ভীষণ খুশি লাগছে। কতোগুলো দিন পর এ বাড়িতে এলো সে। বাড়ির গাছপালা, আঙ্গিনা, চারপাশটা -সব, সবই তার খুব পছন্দের, শখের। এ বাড়ির মানুষগুলোকেও সে ভীষণ ভালোবাসে। দুটো মাস তাদের সাথে কোনোরকম যোগাযোগ ছিল না। কতোগুলো দিন পর দেখতে এসেছে। ভাবতেই প্রাণেশার চোখ দিয়ে এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
বাড়ির চারপাশটায় একবার চোখ বুলিয়ে অন্তিক দরজার বেল বাজায়।
কোনো শৌখিন মধ্যবিত্তদের বাড়ি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে। বেশ চিমচাম গড়নের, তবে চারপাশের পরিবেশটা খুব সুন্দর। চারপাশ দেখে বাড়ির দরজা সবসময় খোলা রাখার মতোই মনে হলো। অথচ বন্ধ করে রেখেছে। বাড়িতে কি কেউ নেই?
ভাবতেই কেউ তাদের জন্য দরজা খুলে দিল। অন্তিক তাকিয়ে দেখে একজন মধ্যবয়স্ক মহিলা। তার চাচীর বয়সী হবে হয়তো। কিংবা তারও কিছুটা কম। কিন্তু কেমন মলিন চেহারা।
এর মধ্যেই দেখে প্রাণেশা সেই মহিলার কাছে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। কাঁদছে মেয়েটা। যদিও সামান্য উহ, উহ ছাড়া তেমন কোনো শব্দ হচ্ছেনা। তবে সে বুঝে যায় মেয়েটা কাঁদছে। মহিলা প্রথমে হচকচিয়ে গেলেও কয়েক মিনিট পর হয়তো বুঝতে পারেন যে মেয়েটা প্রাণেশা। ওর মাথায় হাত রাখেন তিনি। তবে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখান না।
"প্রাণো নাকি? কেমন আছিস? অনেক দিন পর আসলি।"
প্রাণেশা মাথা তুলে উনার দিকে তাকায়।
মাথা নাড়িয়ে, হাতের ইশারায়সহ গালেও কিছুটা উম, উম শব্দ করে অনেক কিছু বলে সে মামীকে।
অন্তিক ওর জন্য সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখেছিল। প্রথম প্রথম কিভাবে জানি একটা দুইটা কথা বুঝে যেতো। কিন্তু তাও বেশ কিছু কথা না বোঝাই থেকে যেতো। মেয়েটার সেসব না বোঝা কথাগুলো তার খুব বুঝতে মন চাইতো।
তাই হঠাৎ একদিন ভাবে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখবে সে। ব্যাস, এরপর কেন তার ঐ মেয়েটার কথা বোঝার এতো আগ্রহ, কেন কি বলছে তা বোঝার এতো তৃষ্ণা -সেসব কিছু ভাবেনি সে। সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতে শুরু করে। ৩ দিনের মধ্যেই শিখে গিয়েছিল। এবং এ পর্যন্ত সব বুঝেওছে।
কিন্তু মাত্র মেয়েটা তার মামীকে এতো উত্তেজিত হয়ে কি বোঝালো, কি বললো তার কিছুই ধরতে পারলোনা সে। অন্তিক ভাবছে, এটা আবার কি ভাষা ছিল?
সাইন ল্যাঙ্গুয়েজের মধ্যেও বাংলা, ইংলিশ, চাইনিজ এসব ভাগ আছে নাকি? কয়েক মুহূর্ত কনফিউজড থাকে সে। তবে মহিলা আর প্রাণেশার মধ্যে কোন কথা বলেনা।
"আরেহ থাম, এতো উত্তেজিত হচ্ছিস কেন? কি বলতে কি বলছিস। ভেতরে আয়, একটু জিরিয়ে নে। তারপর শান্ত হয়ে কথা বল। এখনো বাচ্চা থেকে গেলি নাকি? এলো মেলো কথা বলছিস।"
প্রাণেশা দম নেয়। মামীর কথামতো ভেতরে আসে। অন্তিকও পেছন পেছন আসে।
গিয়ে সোফায় বসলে প্রাণেশার মামী জিজ্ঞেস করে,
"হুট করে চলে এলি। তোর মামাও বাড়িতে নেই। আরিভটাও স্কুলে। আমি আরিভের নানু বাড়ি থেকে এসেছি আজকেই। জামাইর জন্য তেমন কিছু করতেও পারছিনা। একটু জানিয়ে সময় সুযোগ করে আসলে তোর মামা আর আরিভের সাথে দেখা করতে পারতি।"
প্রাণেশার মামী কথাটা বললেও মনে মনে তিনি চিন্তিত, স্বামী বাড়ি এসে ওদের দেখলে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় তা নিয়ে। উনি নিজেও ওদের বিয়ের সেই ঘটনার পর বেশ কিছুদিন প্রাণেশার উপর নারাজ ছিলেন। ওর নামও শুনতে ইচ্ছে করতো না। মনে হতো এই মেয়েটা তার আরশি পালিয়ে যাবে জেনেও ইচ্ছে করে তাদের কিছু জানায়নি। ওকে সাহায্য করেছে। তারপর আবার নিজেও একই কাণ্ড ঘটিয়ে বিদায় হয়েছে। কিন্তু খনিকের রাগ বিরক্তি আর অসন্তোষ মেয়েটার উপর ঝেড়ে নিজেকে হালকা করছেন তিনি। এর বাইরে আর কিছুনা। মেয়েটা যে এসবে জড়িত নেই তা একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবলেই বুঝে যাওয়ার কথা।
আর সত্যি সত্যি এসব কিছু বুঝে উঠার পর তিনি আর প্রাণেশার উপর কোনো রাগ রাখেন নি। এমনকি সেদিনও, নিজের মেয়েটা এমন কেন করলো.. এই মেয়েটার সাথেও খারাপ কিছু হোক -অবচেতন মনের এই ভাসনা থেকে তিনি প্রাণেশাকে ইচ্ছে করে ভুল বুঝেছিলেন। এসব কিছু বুঝতে পারার পর মেয়েটার প্রতি কোন রাগ, বিরক্তি রাখার কোন মানেই হয় না। কিন্তু এই ব্যাপারে স্বামীর কি মনোভাব তা তিনি এখনো জানেন না। দুই মেয়ের একটার ব্যাপারেও তিনি কোনরকম কথা বলেন না। প্রাণেশার বিয়ের আগে আরশিকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে কথা বলেছিলেন কয়েক বার। কিন্তু যে মেয়ে নিজে থেকে পালিয়েছে তাদের কথা না ভেবে, সে মেয়ের কথাও তাদের ভেবে লাভ নেই। এমনটা বলে দিয়েছিলেন সাফ সাফ। আর প্রাণেশার বিয়ের পর তো মেপে ঝুপে কথা বলতে হয় মানুষটার সাথে।
আরশির সাথে তিনি অবশ্য ভাইয়ের সাহায্যে খোঁজ নিয়ে কথা বলেছেন। এখনো মাঝে মাঝে বলেন। কিন্তু স্বামীর সামনে এসব নিয়ে কথা তুলেন না। আরশি নিজের শ্বশুর বাড়িতে খুব ভালো আছে। ভয়ে বাবার সামনে আসতে চায় না মেয়েটা। প্রাণেশাও সেই যে বিয়েটা হলো। আর তাদের সাথে কোন যোগাযোগ করেনি। তিনি ভেবেছিলেন, মামার কাছে সেদিন অমন শক্ত শক্ত কথা শুনে মেয়েটা ইচ্ছে করেই আর সামনে আসছে না হয়তো।
তবে তিনি দুই মেয়ের কাছেই আরও আগে তাদের কাছে আসাটা আশা করেছিলেন। কিন্তু মেয়েগুলো শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ব্যস্ততায় হয়তো আর তাদের কথা ভাবার সময় পায় নি -এমন টা ভেবে নেন, আর ক্ষণে ক্ষণে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, আফসোস করেন। অভিমান হয় তাদের প্রতি। যা হয়তো কখনো প্রকাশ করা হবেনা।
অন্তিক প্রাণেশার মামীকে অন্যমনস্ক দেখে গলা ঝেড়ে বলে,
"আন্টি আমরা এসেছি একটা দাওয়াত নিয়ে। সামনের সপ্তাহের রবিবারে আমাদের বাড়িতে রিসিপশনের আয়োজন করা হয়েছে। আমার আর ওর বিয়ে নিয়েই রিসিপশন। আপনারা না থাকলে আপনাদের মেয়ের জীবনের নতুন সূচনাটাও অপূর্ণ লাগবে। আপনারা সবাই সেদিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকলে প্রাণেশা সহ আমারও খুব ভালো লাগবে। আর আমার বাবা, মা, দাদি -তারাও আপনাদের সাথে দেখা করতে আগ্রহী। আপনারা নির্দিষ্ট দিন প্রত্যেকে আসবেন প্লিজ।"
প্রাণেশার মামী অন্তিকের কথাগুলো শুনেন। তবে অবাক হয় এতোদিনেও ধুমধাম করে সবাইকে বিয়েটা সম্পর্কে জানানো হয় নি দেখে। তিনি ভেবেছিলেন সংসার নিয়ে ব্যস্ত আছে দুই মেয়েই। অথচ প্রাণেশার নাকি নতুন জীবন শুরু হবে সামনের সপ্তাহে। তার মানে এতদিন ওদের সম্পর্কটা অন্যরকম ছিল?
তবে সামনাসামনি কোনো প্রশ্ন করেন না। প্রাণেশার দিকে একপলক তাকিয়ে অন্তিককে বলে,
"অবশ্যই বাবা। ওর মামাকে বলে দেখবো। সম্ভব হলে অবশ্যই যাবো।"
মামীর কথা শুনে প্রাণেশা বলে,
"সম্ভব হলে মানে? সম্ভব হতেই হবে মামী। মামা আর আরিভকে নিয়ে অবশ্যই আসবে। আমি তোমাদের অপেক্ষায় থাকবো। অবশ্যই আসতে হবে।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
প্রাণেশা বাড়িটা ঘুরে ফিরে দেখছিল এতক্ষণ। কোনো কিছুর পরিবর্তন হয়নি, সেই আগের মতোই আছে প্রতিটা জিনিস। তবে অযত্নের ছাপ পড়েছে কিছুটা। মামীকেও খুব মলিন আর অসুস্থ দেখাচ্ছে। এর মধ্যেই অন্তিক রিসিপশনে আসার দাওয়াত দেয়। কিন্তু মামীর কথা শুনে সে নিজেও জোর দিয়ে আসতে বলে।
"মামী, তুমি কি অসুস্থ? মামা ভালো আছে? আরিভ? আরিভের কি খবর?" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
"আমরা সবাই কেমন আছি সেখবর পরে নিস। আগে জামাই কে একটু নাস্তা দেই। তোরা বস"
উনার কথা শুনে অন্তিক মানা করে। কিন্তু তিনি কোনো কথা শুনেন না। জামাই এসেছে বাড়িতে। খালি মুখে ফেরানো যায় না।
উনি চলে গেলে অন্তিক চার দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখে নেয়। প্রাণেশাকে বলে,
"তুমি কোথায় থাকতে? তোমার বোনের সাথে?"
প্রাণেশা অসম্মতি জানায়।
"না, আমার আর আরশি আপুর রুম আলাদা ছিল। তবে উপরে, দুতলায়। আরিভও ওখানেই অন্য একটা রুমে থাকে। আর মামা-মামী এখানে নিচে। ঐ যে বাম দিকের রুমটাতে।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
অন্তিক মাথা নাড়ায়।
"উম, তোমার মামা বাড়ি খুব সুন্দর।"
"এ তো কিছু না। আগে আরও সুন্দর ছিল। মামী হয়তো অসুস্থ, তাই সবকিছুর তেমন যত্ন নিতে পারেন না। আর আমার রুম দেখলে আপনি আরও সুন্দর বলবেন। অনেক পেইন্টিং ওখানে আমার। অনেক সুন্দর সুন্দর। ঐ যে ডান দিকের দেয়ালের ঐ গুলোও আমার করা।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
"আচ্ছা? বেশ সুন্দর তো। তোমার রুম কেমন দেখাবেনা?" প্রাণেশার চঞ্চল রুপ দেখে অন্তিকও ওর সাথে সেভাবেই কথা বলছে। সে মেয়েটার এই রুপ খুব উপভোগ করছে।
অন্তিকের কথা শুনে প্রাণেশা হঠাৎ উঠে রান্নাঘরের ওদিকে চলে যায়। মামীকে ইশারায় বোঝায় সে অন্তিককে নিয়ে উপরে তার রুমে যাচ্ছে। মামী যেন অপেক্ষা করে।
প্রাণেশার মামী ওর চঞ্চলতা দেখে হেসে সম্মতি দেন।
এরপর প্রাণেশা আবার অন্তিকের কাছে গিয়ে তাকে তার সাথে উপরে আসতে ডাকে। অন্তিক বাধ্য ছেলের মতো যায় ওর পিছু পিছু।
প্রাণেশার রুমটা ভীষণ সুন্দর। বিভিন্ন রকম ডেকোরেটিভ ভাইনস সহ ওর নিজের আর্ট করা পেইন্টিং এ চারপাশ ভর্তি।
অন্তিকের মনে হচ্ছে যেন সে কোন বোহেমিয়ান রুমে(একেবারে আর্টিস্টিক, আরামদায়ক, মুক্তস্বভাবী পরিবেশ) চলে এসেছে।
চারদিকে ঘুরে ঘুরে দেখে নিয়ে অন্তিক প্রাণেশাকে বলে,
"তোমার কি আমাদের বাড়িতে নিজের রুম এমন করে সাঁজাতে মন চায় না?"
প্রাণেশা নিজের পেইন্টিং গুলো দেখে নিয়ে আলমারি থেকে কিছু জিনিস বের করছিল। তার বিশেষ কিছু পেইন্টিং সে নিয়ে যাবে এখান থেকে। তার আর মায়ের পেইন্টিং, মায়ের ছবি -এসব সে এখানে কখনো এলে নিয়ে যাবে আগেই ঠিক করে রেখেছে। তার সাথে মায়ের স্মৃতি, শৈশবের ছবিগুলো, তার একটা বড় ভাই আছে, বাবার ছেলে। তারও ছোটবেলার ছবি মায়ের কাছে ছিল। মায়ের পর সেসব তার কাছে এসেছে। এসব নিয়ে যাবে সে।
সব বের করতে করতে অন্তিকের কথাটা শুনে সে। একপলক তাকায়। অন্তিকও ওকেই দেখছিল। এতো মনোযোগ দিয়ে কি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে মেয়েটা।
"ওয়াল হ্যাংগিং, লতাপাতার ঝাড় -এসব তো আমার কাছে ও বাড়িতে নেই। নাহলে আমি যেখানে থাকতাম ঐ রুমে সেখানে লাগিয়ে দিতাম। আর পেইন্টিং তো কয়েকটা লাগানো আছে শুধু। দুমাসে তেমন কই বানালাম পেইন্টিং? নাহলে ঠিকই লাগিয়ে দিতাম। আমার নিজের করা পেইন্টিং গুলো দেয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখতে অনেক ভালো লাগে। আজ অনেক গুলো নিয়ে যাবো এখান থেকে" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
প্রাণেশা খুশি মনে বোঝায়।
"হুম, বুঝলাম। তা এগুলো কি নিচ্ছো?"
"এগুলো অনেক কিছু। আপনি বুঝবেন না" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
অন্তিক প্রাণেশার পাশে এসে বসে। সম্মোহনী স্বরে বলে,
"আমাকে বুঝিয়ে দাও। বুঝবো।"
প্রাণেশা হঠাৎ অন্তিকের স্বর পাল্টে যাওয়ায় থমকায়।
ইতস্তত করে বোঝায়,
"বাড়ি গিয়ে দেখাব। এখন সব গুছিয়ে রাখছি, নিয়ে যাবো ও বাড়িতে।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
"সকাল থেকে পাত্তা দিচ্ছনা ম্যাডাম। আসার সময় গাড়িতে ঘুমিয়ে গেলে। জানো আমার কতো প্ল্যানিং ছিল?"
প্রাণেশা নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে বোঝায়,
"রাতে আমাকে ঘুমাতে দিয়েছেন? তাই তো ঘুমিয়েছি গাড়িতে। আমার সারা গায়ে ব্যাথা এখনো।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
অন্তিক প্রাণেশার ইশারা ইঙ্গিত করার সময় চোখ পিটপিট করা, ঠোঁট নাড়ানো এসব দেখছিল। প্রাণেশার কথা শুনে ওর দিকে সামান্য ঝুঁকে।
"সামান্য বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়েছি। এতেই এই অবস্থা হলে কিভাবে চলবে? সামনে তো আমাকে পুরোপুরি নিতে হবে।"
প্রাণেশার সারা গাঁয়ে ঝিম ধরে উঠে অন্তিকের কথা শুনে। তবে কোনোভাবে বোঝায়,
"শুধু বুকে মাথা রেখেছেন? মিথ্যুক। কিভাবে জড়িয়ে ছিলেন? আমার ব্যাথা লাগেনা? ঘুমাতে পারিনি।"
অন্তিক এবার প্রাণেশার চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
"আপনারই ভালো এতে। অভ্যাস করাচ্ছি। যাতে সামনে আমার সম্পূর্ণ ভার নিতে বেশি কষ্ট না হয়।"
তারপর আবার বলে,
"এখন এই যে, এখানে বুকে একটা টুপ করে চুমু খাও তো দেখি। তোমার গাড়িতে ঘুমিয়ে আমার প্ল্যান ক্যান্সেল করার শাস্তি এটা।" বুকের বাম দিকে আঙ্গুল ঠেকিয়ে বলে অন্তিক।
প্রাণেশা তার কথা শুনে তাকায়। বুকের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ে অন্তিকের শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা, যার কারণে কিছু অংশ উন্মুক্ত। তা দেখে প্রাণেশার ভেতরে কেমন অন্যরকম লাগে। অস্থির লাগে নিজেকে।
তবে সে মাথা নাাড়ায়। বোঝায় সে খাবেনা চুমু।
অন্তিক বলে,
"আমাকে না দিলে কিন্তু আমি তোমাকে দেবো।"
প্রাণেশা ভ্রু উচিয়ে কি জিজ্ঞেস করে।
"কি আবার, চুমু।" অন্তিক
প্রাণেশা পাত্তা দেয় না তার কথাই। নিজের মতো জিনিস গুছাতে থাকে।
"আমি কিন্তু এমনি এমনি বলছিনা। সত্যিই দেবো। তাও যে জায়গায় আমাকে দিচ্ছনা, আমি সে জায়গাতেই দেবো।"
প্রাণেশা চোখ তুলে তাকায়,
"মানে?" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
অন্তিক কোনোরকম দ্বিধা ছাড়া বলে,
"মানে তোমার বুকে চুমু খাবো।"
প্রাণেশা সাথে সাথে বুকে ক্রস আকারে দুই হাত দিয়ে রাখে, চোখ বড় বড় করে তাকায় অন্তিকের।
অন্তিক ওকে ভয় পেতে দেখে ঠোটঁ বাকিয়ে হাসে।
প্রাণেশা ইতস্তত করে বোঝায়,
"আপনি সবসময় এসব কথা বলেন কেন? এসব ভাবেন শুধু" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
অন্তিক ওর কথা বুঝে বলে,
"কেমন কথা বলি সবসময়? আর কি ভাবি?"
প্রাণেশা নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে বোঝায়,
"অশ্লীল"
সাথে সাথে অন্তিক প্রাণেশার কোমরে হাত দিয়ে ওকে উঠায়। নিজের কোমরে প্রাণেশার দুই পা পেচিয়ে ওকে কোলে বসিয়ে দেয়।
"আচ্ছা? অশ্লীল বলছ যখন, অশ্লীলতা তো করতেই হয়।"
প্রাণেশা বিস্ময়ের চরম পর্যায়ে। এমনটা কেউ করে? ছিহ!
"নামান প্লিজ। মামী চলে আসবে" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
"আসবেনা তোমার মামী, মেয়ে আর মেয়ে জামাই একা রুমে আছে। সেখানে উনি কখনোই আসবেন না। আর উনার তো আমাদের জন্য নাশ্তা বানানো শেষ হয়েছে অনেক আগেই। মেয়ে আর মেয়ে জামাই একা রুমে আছে। তাই ডাকতে লজ্জ্বা পাচ্ছেন বলে ডাকছেন না। তাই আর আসার প্রশ্নও আসেনা।"
"নামিয়ে দিন না, প্লিজ।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
প্রাণেশা অনুরোধ করে বোঝায়।
"উহুম, একটু অশ্লীলতা করি আগে।"
কথাটা বলে সে প্রাণেশার কোমরে রাখা হাত শক্ত করে আরেকটু কাছে টেনে নেয় ওকে। দুজন এই মুহূর্তে খুব কাছাকাছি।
অন্তিকের কোলে এভাবে বসায় প্রাণেশার বুক ধরফর করছিল। ওর দুহাত অন্তিকের গলা পেঁচিয়ে রেখেছে। যাতে ব্যালেন্স রেখে বসতে পারে।
অন্তিক এভাবে হঠাৎ আরও কাছে টেনে নেওয়ায় প্রাণেশা কেমন স্তব্দ হয়ে যায়। অন্তিকের গলায় থাকা এক হাত আরও শক্ত করে। অন্যহাত একটু উপরে অন্তিকের চুলে দাবিয়ে দেয়।
অন্তিক মাথা নামিয়ে ওর বুকে একটা গাঢ়, ভেজা চুমু খায়।
———————
প্রাণেশার মামা এসেছেন বাড়িতে। তিনি নিজের কাজ শেষে নিজের মতোই এসেছেন। প্রাণেশার আসার খবর তিনি এখনো জানেন না।
প্রাণেশার মামী মেয়ে আর জামাইকে রুমে গিয়ে ডেকে আনতে ইতস্তত করছিলেন ভীষণ। অনেক্ষণ ভাবনা চিন্তা করেও গিয়ে ডেকে উঠতে পারেন নি। এর মধ্যেই স্বামী আসেন।
শুরুতে স্বামীকে প্রাণেশার আসার খবর কিভাবে জানাবেন তা নিয়ে চিন্তিত থাকলেও সামনা সামনি খুব স্বাভাবিক ভাবেই জানান। প্রাণেশার মামা প্রথমে কিছুক্ষণ থমকে পড়লেও, পরে ওদের ডেকে পাঠাতে বলেন।
উনি বলতে বলতেই ওরা দুজন নেমে আসে। প্রাণেশা দূর থেকে মামাকে দেখে দৌড়ে ছুটে আসে। বুকে ঝাপিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ কেদে-রেধে মামার সাথে নানান কথা বলে ইশারায়। সেদিন ওর কোনো দোষ ছিলনা এসব বোঝাতে থাকে নানান ভাবে। ওর কোনো ভুল ছিল না। আর না তেমন বাজে কিছু হয়েছিল ঐ রুমে। মহিলা গুলো আর ঐ লোক গুলো কেন জানি বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলেছে। ওর কোনো দোষ নেই। এসব বোঝায় নানান ভাবে। একপ্রকার অস্থির হয়ে পড়ে মামাকে নিজের নির্দোষতার সাফাই দিতে।
তারপর ওর মামা আজমান আহমেদ মাথায় হাত বুলিয়ে ওকে শান্ত করেন। তিনি সেসব কিছুই আর মনে রাখেন নি, প্রাণেশাকেও ভুল বুঝেনি। তখন রাগের মাথায় মানুষের কথায় এসে হঠকারিতা করে ভুল করেছিলেন। এসব বলে ভাগ্নিকে শান্ত করেন।
বেশ অনেক্ষণ বুকে জড়িয়ে বসে থাকেন প্রাণেশাকে।
আজমান সাহেবের আজ ভীষণ ভালো লাগছে। বুকটা কিছুটা হলেও শান্ত লাগছে। এক মেয়ে নিজে ওদের ছেড়ে গিয়েছে, আরেক মেয়েকে তাদের ছেড়ে যেতে হয়েছে উনার নিজের ভুলের কারণে। ওদের বিয়ের ঘটনার কয়েক দিন পরই সব ঠাণ্ডা মাথায় ভেবে নিজের ভুল বুঝতে পারেন। মহিলা গুলো বলেছিল প্রাণেশা ঐ ছেলের সাথে খারাপ কাজ করেছে ঐ রুমে। কিন্তু তেমন কোনো আলামত দেখা যায় নি প্রাণেশাকে দেখে। আর তার চেয়ে বড় কথা প্রাণেশা ঐ রকম মেয়েই নয়। মহিলাগুলো যখন প্রাণেশা অন্তিককে প্রলুব্ধ করেছে এমন বলেছিল, তখন তিনি প্রাণেশার উপর খুব রেগে গিয়েছিলেন। ওকে ভুল বুঝেছিলেন। অথচ রেগে যাওয়া উচিত ছিল ঐ মহিলা গুলোর উপর, তার পবিত্র, নিষ্পাপ ভাগ্নির উপর এমন অভিযোগ আনার কারণে। কিন্তু তিনি উল্টো নিজের ভাগ্নিকেই ভুল বুঝে দূরে ঠেলে দিলেন। মেয়ের দুশ্চিন্তায় বোধ হারিয়েছিলেন হয়তো। পরবর্তীতে সব নিজের কাছে পরিষ্কার হওয়ার পর প্রাণেশার মুখোমুখি হওয়ার সাহস পান নি। তবে অন্তিকদের পরিবার সম্পর্কে খোঁজ নিয়েছিলেন নিজের বন্ধুর কাছে, যার মেয়ের বিয়েতে উনারা গিয়েছিলেন।
সেই বন্ধুর কাছে ওদের পরিবার আর অন্তিক -দুজনের ব্যাপারেই খুব ভালো ফিডব্যাক পেয়েছিলেন। যার কারণে ভাগ্নিকে নিয়ে চিন্তামুক্ত হন। তিনি এও জেনেছেন, প্রাণেশার লেখাপড়া এখনো চলছে। প্রাইভেট কলেজে পড়ছে মেয়েটা এখন। আগের ওখান থেকে ট্রান্সফার করা হয়েছে।
অন্তিকের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন ছেলেটাও ভালো। কোনো বাজে রেকর্ড শোনা যায় নি আজ অব্দি। অবশ্য অন্তিককে উনি আগে থেকেই একজন ভালো, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন উকিল হিসেবে জানতেন। বিভিন্ন টক শো আর নিউজপেপারের আর্টিকেলে দেখেছেন অন্তিকের ব্যাপারে। ক্যারিয়ারে কতো কি অর্জন করেছে সেসব টিভিতে, নিউজপেপারে আগে থেকেই দেখেছেন।
উনার আদরের বোনের মেয়েটা ঐ ছেলের কাছে সুখে থাকবে বলেই মনে হয়েছে।
এরপর তিনি আর কোনো চিন্তা রাখেননি ভাগ্নিকে নিয়ে।
তবে মেয়েটা কখন উনার কাছে আসবে, এসে বুকে মাথা রেখে তাকে কেন ভুল বুঝেছিল সেই অভিযোগ করবে। এই আশায় ছিলেন। মেয়েটা একটু দেরি করে হলেও আসলো। কিন্তু কোনো অভিযোগ করলোনা। বরং এখনো নিজেকে নির্দোষ বলে ক্ষমা চাচ্ছে।
উনি বুকে থাকা ভাগ্নির মাথায় হাত বুলিয়ে একটা চুমু খান।
———————
প্রাণেশা মামীকে সাহায্য করতে এসেছে রান্নাঘরে। নাশ্তা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু প্রাণেশার মামা আসার সময় কিছু বাজার এনেছেন। তাই মামী আরও কিছু আইটেম করতে চাচ্ছেন জামাইর জন্য। প্রাণেশা সাহায্য করছে মামীকে।
অন্তিক ড্রয়িং রুমে প্রাণেশার মামা আজমান সাহেবের সাথে কথা বলছে। মানুষটা ভীষণ ভদ্র আর শান্ত, বুঝদ্বার ধরণের। অন্তিকের সাথে তার পরিবার সম্পর্কে নানা কথাবার্তা বলেন। তারপর কর্মক্ষেত্র, রাজনীতি, দেশের পরিস্থিতি -এসব নানান কিছু নিয়ে তাদের কথোপকথন চলতে থাকে।
"হ্যাঁ রে প্রাণো। তোদের বিয়ের তো দুমাস হতে চললো। এতদিন পর কেন রিসিপশন? তোরা কি এতোদিন সংসার করিস নি? মানে বিয়েটা এতদিন পর কেন তুলে ধরছে সবার কাছে? আমিতো ভেবেছিলাম মন দিয়ে সংসার করছিস শ্বশুরবাড়ি।"
প্রাণেশা প্রথমে একটু ইতস্তত করে। তবে মামীকে মিথ্যা বলেনা।
"আসলে হঠাৎ করে বিয়ে হওয়ায় উনার মেজাজ খুব খারাপ ছিল শুরুতে। মেনে নিতে পারেনি তখন, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। বেশ অনেক গুলো দিন নামের সম্পর্ক ছিল আমাদের। তারপর হঠাৎ সেদিন উনি সব ঠিকঠাক করে নিতে চান। উনার দাদি আয়োজন করে বিয়েটা সবাইকে জানাতে চাইলে উনি সম্মতি দেন। আমি না করলে আমাকেও বলেন সম্মতি দিয়ে দিতে। উনি সব নতুন করে শুরু করতে চান। ব্যাস, সবাই ডেট ঠিক করলে মা, মানে উনার মা বলেন আমাকে নিয়ে যেন এখানে আসে। তো এলাম। এটুকুই।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
"কি বলছিস? এতগুলো দিন পর এসে ছেলেটা তোকে মেনে নিয়েছে? তাহলে এর আগে কেমন ছিলি ওবাড়িতে?"
"চিন্তা করোনা মামী। ভালোই ছিলাম। উনার মা সহ ও বাড়ির বাকিরা ভীষণ ভালো। আমাকে কখনো ছোট করে দেখেনি।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
প্রাণেশার মামী আর কিছু বলেন না। শ্বশুর বাড়িতে ভালো থাকলেই হলো। আগে যেমন থাকুক। এখন সব ঠিক হলে কোনো অসুবিধা নেই।