অন্তিকের মা মিসেস অয়েশা আমিন বোনের বাড়ি থেকে ফিরে এসেছেন। সময়টা তখন বিকেল বেলা। তিনি এসে ফ্রেশ হলেন।
তারপর শাশুড়ি, স্বামী, দেবরসহ জা -সবাই মিলে ড্রয়িং রুমে বসেছেন। মিসেস আয়েশা আমিনের বোনের স্বামীর খোঁজখবর শেষে শাইনা বেগম অন্তিকের রুমে প্রাণেশাকে শিফট করার বিষয়ে কথা তুলেন।
"সবাই এখানে আছ, আমি কিছু বলতে চাচ্ছিলাম"
উনার কথা শুনে সবাই মনোযোগ দেন।
"বলছিলাম অন্তিক দাদুভাই আর নাতবউকে সময় তো অনেক দিলাম। এবার একটা সিদ্ধান্তে আসা হোক। আমার মনে হয় অন্তিক দাদুভাই এখন তার বউকে যথেষ্ট চায়। নাতবউকেও বুঝিয়েছি। আশা রাখছি সে বুঝেছে। কাল আসবে আমার দাদুভাই। আজ রাত থেকে নাতবউ তার রুমেই থাকুক। কাল এসে বউকে একেবারে নিজের রুমে পাক। দেখবে সে নিজেও দ্বিমত করবেনা। বরং খুশি হবে। তোমাদের কারো আপত্তি থাকলে এই সিদ্ধান্তে জানাও।"
মি. মাহমুদ হেসে বলেন,
"আপত্তি থাকবে কেন মা। ওদের জীবনটা সহজ হলেই তো আমরা খুশি। ছেলে মেয়েরা সুখে থাকুক সবসময়, এটাই তো চাই। কিন্তু আগে ওদের বিয়ের ব্যাপারটা আত্মীয় স্বজন, প্রতিবেশীদের জানালে ভালো হতো। তারপর নাহয় নতুন করে সব শুরু করুক।"
মি. মুনতাসিরও যোগ করেন,
"হ্যাঁ মা, আমারও মনে হয় আগে বিয়েটাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেই। তারপর ওরা সংসার শুরু করুক, এটাই ভালো হবে।"
"তোদের কথা আমি বুঝতে পারছি। সামাজিক স্বীকৃতিটা অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রিসিপশনের আয়োজন করে সবাইকে জানালে ভালো হবে। এটা আমিও ভেবে রেখেছি। কিন্তু বললেই তো আর আয়োজনটা হয়ে যাচ্ছেনা। একটু সময় অবশ্যই লাগবে। ততোদিন দাদুভাই আর নাতবউ একসাথেই থাকুক।"
মিসেস আয়েশা আমিন উনাদের সব কথা শুনে বলেন,
"মা, আপনি যখন বলছেন তখন নিশ্চয় কিছু বুঝেই বলছেন। কিন্তু আমার মনে হয় একবার প্রাণেশার মতামত নেওয়া দরকার। আর অন্তিক ও কোনো আপত্তি করবেনা এটাও শিউর না আমরা কেউ। ছেলেটার মতিগতি কখন কোনদিকে যায় আমিই কিছু বুঝতে পারছিনা আজকাল।"
"অতো চিন্তার কিছু নেই। বউ কাছে পেলে তোমার ছেলের সব স্বভাব ফিরে আসবে দেখে নিও। সে নিজে এতোদিন কোনো কারণে দ্বিধায় ছিল হয়তো। এখন আমার মনে হয় সব ঠিকঠাক আছে। আমার দাদুভাইকে আমি এতটুকু বুঝি। সে কোন আপত্তি করবেনা দেখে নিও।"
মিসেস আয়েশা আমিন শ্বাশুরির কথা শুনেন। তারপর একটু ভেবে বলেন,
"ঠিক আছে। আপনি যখন বলছেন তখন তাই হোক। কিন্তু আপনার নাতির চাওয়া না চাওয়া দিয়ে তো সবকিছু হবেনা। প্রাণেশার মতামতও গুরুত্বপূর্ণ। ওকে একবার জিজ্ঞেস করা উচিত।"
বড়দের কথার মাঝে প্রাণেশা আসে সবার জন্য চা নিয়ে। সে তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু জানেনা। খেয়াল করেনি সেভাবে। প্রত্যেকের হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে চলে যেতে নিলে অন্তিকের বাবা মি. মাহমুদ তাকে দাড়াতে বলেন।
প্রাণেশা শ্বশুরের কথা শুনে দাড়ায়।
মি. মাহমুদ চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে আস্তে ধীরে বলেন,
"শুনো মা। আমরা ভাবছি সামনে একটা রিসিপশনের মাধ্যমে তোমার আর অন্তিকের বিয়েটা সম্পর্কে সবাইকে জানাবো। তোমার কোনো আপত্তি থাকলে এতে নির্দ্বিধায় জানাও।"
প্রাণেশা শ্বশুরের কথা শুনে। তবে তৎক্ষণাৎ কোন উত্তর দিতে পারেনা। কারণ হঠাৎ এই ধরণের কথা সে আশা করেনি। প্রাণেশাকে কোন কিছু না বুঝাতে দেখে মি. মাহমুদ আবার বলেন,
"তুমি হয়তো হঠাৎ রিসিপশনের বিষয়টা শুনে অবাক হচ্ছো। তবে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমার মায়ের কোন কারণে মনে হচ্ছে অন্তিক শুরুতে না মানতে চাইলেও এখন তোমাকে সহ বিয়েটা খুব চায়। তাই আমরা যতো তাড়াতাড়ি পারি সব কিছু ঠিকঠাক করে দিতে চাচ্ছিলাম তোমাদের মাঝে। কিন্তু অন্তিকের চাওয়া না চাওয়া যতোটা গুরুত্বপূর্ণ আমাদের কাছে, তোমারটাও ঠিক ততোটাই। তাই এক্ষেত্রে তোমার মতামতটা আমাদের জানিয়ে একটু সহযোগিতা করো।"
প্রাণেশার স্পষ্ট উত্তর 'না'। কিন্তু সে এভাবে মুখের উপর বলে দিতে পারবেনা। তার দ্বিধা হচ্ছে ভীষন। আর না তো 'হ্যাঁ' বলতে চাই সে।
তাই সে কোনকিছুই বোঝায়না। দ্বিধান্বিত হয়ে একবার সবার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে নেই।
প্রাণেশার মৌনতা দেখে সবাই বুঝে নেই ওর উত্তর না। কিন্তু ভয়ে বলতে পারছেনা। তবে মিসেস আয়েশা আমিন বলেন,
"আচ্ছা, আমার মনে হয় ওকে একটু ভাবার সময় দেওয়া উচিত। এভাবে বললেই তো আর সিদ্ধান্ত একটা জানিয়ে দেওয়া যায়না। ওকে একটু ভাবার সময় দেওয়া দরকার।"
"ঠিক আছে, নাতবউ ভাবুক একটু। তবে রাতের মধ্যে নিজের সিদ্ধান্ত জানাবে বুঝেছ?"
প্রাণেশা হালকা করে মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়।
————————
মাহাদ এসেছে মামাবাড়িতে। অবশ্য নতুন কিছু নয়। দেশে থাকলে এমন সময়ে অসময়ে নানান কারণে কিংবা বিনা কারণেও আসা হয় তার। কিন্তু সবসময় খোশমেজাজে থাকা মাহাদ এবার তেমন একটা চিল মুড নিয়ে আসেনি।
সে এসে সবার আগে সোফায় বসে গা এলিয়ে। তার দুই মামীও তখন সোফাতেই বসে ছিল। সে এসে বসতেই তার বড় মামী জিজ্ঞেস করে,
"কি ব্যাপার মাহাদ। চেহারার এই অবস্থা কেন? কোন কারণে কি বিরক্ত নাকি?"
"তেমন কিছু না মামী। এমনিই ভালো লাগছেনা।"
"এমনি আবার ভালো লাগেনা? কারণ তো অবশ্যই আছে। মামিদের বলতে কিসের দ্বিধা? বলে দেখো। সমস্যা সমাধান করে দিলেও দিতে পারি"
মাহাদ তার বড় মামীর দিকে তাকায়। তার মামীরা বরাবরই তার সাথে খুব স্নেহসুলভ। তাকে মেহেরিনকে খুব ভালোবাসে। সে ছোটবেলা থেকেই খুব দূরন্ত আর চঞ্চল স্বভাবের। সবার সাথে খুব সহজেই মিশে যায়। কিন্তু অনেকের সাথে নানান ঝামেলায়ও জড়িয়ে যায় তার দুরন্তপনার কারণে। তখন মায়ের, বাবার কতোশত মার বকুনি থেকে বাচিয়েছে এই দুই মানবী।
বিশেষ করে বড় মামী। উনি নিজের সন্তানসহ জা আর ননদের সন্তানদেরও ছোট থেকে যেমন শাসনে রেখেছেন, তেমন সবচেয়ে বেশি ভালোবেসেছেন। সবচেয়ে বেশি আদর আহ্লাদে রেখেছেন।
আর এখনও কতো বন্ধুসুলভ ভাবে বলছে সমস্যা সমাধান করে দিবে। মামী যদি জানতে পারে ইদানিং তার মেয়েকে নিয়েই মাহাদের মনে আজেবাজে চিন্তা ভাবনা আসছে। মেহেরিন, ইশি আর দিথীর মতো বোনের চোখে দেখতে পারছেনা কোনোভাবেই। তাহলে মামী কেমন রিয়েকশন দেবে? তাকে কি মেয়ে জামাই হিসেবে মেনে নিবে? নাকি মামী তাকে ভুল বুঝবে তার মেয়েকে অন্য নজরে দেখেছে জেনে।
মাহাদ নিজের ভাবনায় নিজেই আশ্চর্য হয়। সে নিজেকে মাত্রই অয়ন্তির পাশে ভাবলো! নিজেকে অয়ন্তির স্বামী হিসেবে কল্পনা করলো! সিরিয়াসলি??
ভাবতেই সে চোখ মুখ কুচকে নেই। অধঃপতন হচ্ছে তার। ভীষণ রকম চারিত্রিক অ ধঃ প ত ন হচ্ছে। এতদিন অয়ন্তিকে নিয়ে নানান চিন্তা ভাবনা মনে এলেও নিজেকে ওর স্বামী কিংবা ওকে নিজের বউ রুপে ভাবেনি কখনো।
আর মাত্র সে ভাবনাটাও পূর্ণ হলো। চোখ মুখ কুচকে দুহাত দিয়ে মুখটা ডলে নিয়ে সে নিজেকে সামলায়।
"কি হলো? চুপ যে? বলে ফেলো সমস্যা। সমাধান করে দেবো।"
"উস্কে দিওনা তো মামী। কখন না জানি বলে ফেলি। তারপর আর চাকরি থাকবেনা।"
দুই মামী হাসে তার কথা শুনে।
"মাহাদ ভাই প্রেমে পড়েছে মা। এটাই তার সমস্যা।" অয়ন্তি সিড়ি দিয়ে নেমে আসতে আসতে বলে।
মাহাদ হঠাৎ অয়ন্তির গলা শুনে ঘাড় ফিরিয়ে তাকায়। কি সম্মোহনী আর প্রেমিক চাহনি তার। অয়ন্তি কি বুঝলো?
"আজ একটা ভিডিও দেখেছি সোশ্যাল মিডিয়ায়। প্রেমে পড়লেই মানুষের মধ্যে এমন পরিবর্তন আসে। মাহাদ ভাইয়েরও সেইম সমস্যা হবে দেখো।"
বুঝেনি। অয়ন্তি মাহাদের সেই চাহনির অর্থ বুঝেনি। মাহাদ আবার মাথাটা এলিয়ে দেই সোফায়। অয়ন্তি ততক্ষণে মাহাদের বরাবর সামনের সোফায় এসে বসেছে।
মিসেস আয়েশা আমিন আর মিসেস তাবিয়াও উঠে গিয়েছেন সেখান থেকে।
মাহাদ সোফায় যেভাবে বসে ছিল সেভাবেই অয়ন্তির দিকে কয়েক পল তাকিয়ে বলে,
"খুব বড় হয়ে গিয়েছিস তাইনা? প্রেমে পড়াও বুঝিস এখন।"
"বাহ রে... তুমি প্রেমে পড়তে পারো। আর আমি তা বুঝতে পারলেও দোষ।"
"পারিস বলছিস?"
"অবশ্যই পারি। দেখোনি দুই মিনিটে তোমার সমস্যাটা ধরে ফেললাম।"
মাহাদ ওর কথা শুনে কপাল কুচকায়। খুব বুঝতে পারে মহারানী। অথচ কার প্রেমে পড়েছে তাই বুঝতে পারলোনা।
সে বিরবিরিয়ে বলে, "কচু পারিস?"
"কিছু বললে?"
"বলিনি।" তারপর আবার বলে উঠে,
"আজ রেস্টুরেন্টে যাদের সাথে গিয়েছিলি ওরা কারা?"
অয়ন্তি ফোন বের করেছিলো। মাহাদের কথা শুনে তার দিকে তাকায়।
"তুমি দেখেছ?"
"দেখেছি বলেই জানতে চাইছি।"
"ওরা আমার ফ্রেন্ড। ইউনিভার্সিটির ফ্রেন্ড। অবশ্য ওখানের তিনজন আমার কলেজ লাইফ থেকেই ফ্রেন্ড। বাট বাকিরা ইউনিভার্সিটির ফ্রেন্ড। তুমিও ওখানে ছিলে নাকি আজ? দেখিনি তো"
"বন্ধুদের সাথে গাঁয়ের উপর ঢলে পড়ে পড়ে সারাক্ষণ হাসাহাসি করতে থাকলে, বাকিদের চোখে পড়বে কিভাবে।"
"হোয়াট? কিসব বলছো? গাঁয়ের উপর ঢলে পড়ে মানে?" অয়ন্তি অবাক হয়ে বলে।
মাহাদ কিছু বলেনা। ওর দিকে তাকিয়ে থাকে গম্ভীর দৃষ্টিতে।
অয়ন্তি ওর চেহারা দেখে আবার বলে,
"আমি কারো গাঁয়ের উপর পড়ে পড়ে হাসিনি"
"তুই পড়েছিস বলেছি? পাশের ঐ ছেলেটা কে ছিল? খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু তাইনা?"
অয়ন্তি কি বলবে খুঁজে পায়না। সে মোটেও তেমন মেয়ে নয় যে ছেলে বন্ধুদের গাঁয়ে পড়ে পড়ে হাসবে। তার ভীষণ খারাপ লাগছে। ভাইয়েদের কাছে এমন ধরণের শাসন পেতে হবে তা সে কখনো ভাবেনি।
নিজেকে ধিক্কার দেই। তার আরেকটু সচেতন হওয়া উচিত ছিল।
নিজেকে সামলে সে বলে, "মাহাদ ভাই! আমি ওভাবে খেয়াল করিনি। সত্যি বলছি। নাহলে কখনো লিমিট ক্রস করতামনা। বুঝতে পারিনি।"
অয়ন্তির চোখের পানি গড়িয়ে পড়বে পড়বে ভাব তখন। মাহাদ তা দেখে বলে,
"কাঁদছিস কেন? আমি তোকে বকেছি? গালি দিয়েছি?"
অয়ন্তি নিজেকে সামলে বলে,
"সামনের বার থেকে আর হবেনা। নিজেকে সংযত করবো।"
মাহাদ বুঝতে পারে অয়ন্তি সম্পূর্ণ ব্যাপারটা অন্য দিক থেকে ভেবে নিয়েছে। অথচ সত্যি বলতে তার হিংসা হচ্ছিলো বলে যতোটা না ঘটেছে ঘটনা, ততোটা বাড়িয়ে বলেছে। তবে সে অয়ন্তিকে আর কিছু বললোনা তা নিয়ে।
যেভাবে হোক, ছেলেদের থেকে দূরে থাকলে হলো।
———————
ইরফান এই মুহূর্তে বসে আছে তোশাদের বাড়িতে। তোশার বাবা, মা কিংবা পরিবারের কেউ এখনো জানেনা, যে কিছু মাস আগে তাদের মেয়ে মৃত্যু পথযাত্রী হয়েছিলো ইরফানের কারণেই।
তারা ইরফানকে এখনো সেই আগের মতো স্নেহ করে। পিকনিকের পর পুরো একটা দিন কেটে গিয়েছে।
ইরফান তোশাকে বেশ কয়েকবার ফোন করেছে কিন্তু রেস্পন্স বরাবরই শূন্য। ইরফান আরও আগেই যেভাবে হোক এই মেয়েকে দেশে আনতোই, নাহয় সে যেতো। কিন্তু সে অন্তিকরা পিকনিক প্ল্যান করেছে শুনে তা আর করেনি। কারণ ইরফান খুব ভালো করে জানে সবাই মিলে একটা পিকনিক প্ল্যান করেছে আর সেখানে অন্তিক তোশাকে আনবেনা এমন কখনোই হবেনা।
তাই সে অপেক্ষা করেছিলো। তোশার ব্যাপারে সবাই তাকে নিয়ে এতো ভয় পায় কেন তা সে নিজেই বুঝতে পারেনা।
বাবা তাকে বার বার কোথায় আছে নেই সেসব ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছে। তিনি নিশ্চিত স্পাইও লাগিয়ে রেখেছে তার পেছনে। অন্তিকতো আরও এক কাঠি উপরে, সেদিকে নায় যাক।
কিন্তু এই যে সেদিন রিসোর্টের ছাঁদে দাড়িয়ে নীলয়কে ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলো অন্তিক তোশাকে আনছে এখানে এটা সত্য কিনা, তখন সে তাকে নিশ্চয়তা দিয়ে জানায়নি। জানালে কি ক্ষতি হতো?
পিকনিকে আসলে কি সে দেখতনা? বোকা*দা শুধু শুধু তাকে না জানিয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য টেনশনে ফেলেছিল।
হ্যাঁ, ইরফান সবাই রিসোর্টে পৌছে যাওয়ার পরও যখন তোশা আসছেনা দেখে, তখন ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। তার ধারণা কি ভুল প্রমাণ হলো? এই ভেবে।
কিন্তু পরে ঠিকই এসেছে।
সে যায় হোক, তোশার সাথে যোগাযোগ করতে পারছেনা সে। মেয়েটা ফোন রিসিভ করছেনা। না টেক্সট এর রিপ্লাই করছে। তাই সে বাধ্য হয়ে বাড়ি চলে এসেছে। তার তোশার সাথে আরও সময় কাঁটাতে হবে। কতোগুলো দিন দূরে থেকেছে! এখন যেই একটু কাছাকাছি আছে তাও মেয়েটা সুযোগ দিচ্ছেনা।
তার ভাবনার মধ্যে তোশার মা তাকে তোশার রুমে যেতে বলে।
সে নিচে নামছেনা তাই। তোশাকে ডেকে পাঠিয়েছে ইরফান এসেছে তাই। মেয়েটা তাও নিচে নামছেনা।
তোশার বাবা মা এখনও ভয় পায় মেয়েকে নিয়ে। এমন কি সে যে ইরফানের সাথে দেখা করতে চাইছেনা সেটাও তারা ভাবছেন তাদের কারণে, তাদের প্রতি অভিমান থেকেই মেয়ে এখনো অমন করছে। ইরফানের সাথে দেখা করতে চাইছেনা।
তাই তারা ইরফানকে তোশার রুমে যেতে বলে। আর অনুরোধ করে যেন আগের মতো স্বাভাবিক করে দেই ওর সাথে কথা বলে। মেয়েটা আগের মতো আর কথা বলেনা তেমন। এতো থেরাপি, ওষুধ, কাউন্সিলিং - এতকিছুর পরেও এখনো গম্ভীর থাকে। তাই উনারা ভয়ে আছেন।
ইরফান তাদের কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উপরে যায়। মানুষ গুলো তাকে এতো ভরসা করে উপরে পাঠাচ্ছে। অথচ সে যে তাদের মেয়ের জন্য কতোটা ডেঞ্জারাস তা তাদের ধারণাতেও নেই।
এদিকে মেয়েটার এই অবস্থার জন্যও সেই দ্বায়ী। আবার তাকেই অনুরোধ করছে একটু সাড়িয়ে তুলতে। আগের মতো সবার মাঝে ফিরিয়ে আনতে।
ইরফান পুরো ব্যাপারটা ভাবে, তবে তার একটুও আফসোস হয়না। বরং আগ্রহ নিয়ে উপরে যায়।
তোশার রুমে ঢুকে সে দরজার পাশে আয়েশ করে দাড়ায়, হেলান দিয়ে। মেয়েটা শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে ফোন দেখছে। পরণে একটা টপ্স আর প্লাজু।
বেল স্লিভ আর ভি নেক যুক্ত ব্লু আর হোয়াইট ফ্লোরাল প্রিন্টের টপ্স পরে আছে সে। কোমর অব্দি টপ্সটা। কিন্তু মাঝখানে ডোরি দিয়ে টাই ওয়েস্ট করা যেটা কোমরের উপরে আর বক্ষাংশের নিচে সুন্দরভাবে ফিট করেছে।
তবে নাভীদেশ দৃশ্যমান। কারণ প্লাজুটা নাভীর নিচে পড়া। আর টপ্স টাও ডোরি দিয়ে টাই করা থাকায় সে বরাবর টপ্সটা একটু উপরে উঠানো।
ইরফানের চোখ সবার আগে ওখানেই আটকেছে। সে শি কা রি দৃষ্টিতে তাকায় ওর দিকে।
"আমাকে একা রুমে চাচ্ছিস বললেই হতো। আমি তোর আর আমার জন্য হোটেলে একটা রুম বুক করে নিতাম। এভাবে নিজের বাড়িতেই ইনডিরেক্টলি রুমে ডাকার কি দরকার।
অন্তিক আর ওর বউয়ের মতো আমাদেরও যদি হাতে নাতে ধরে বিয়ে পড়িয়ে দেই তখন কি করবি? তোর তো আবার আমাকে বিয়ে করতে সমস্যা। তাছাড়া এসবের জন্য বাড়ির চেয়ে হোটেল রুম বেস্ট।"
তোশা চট করে উঠে বসে। ইরফান তার রুমে… তার রুমে দাড়িয়ে তাকে সবচেয়ে ঘৃণ্যতম, নিকৃষ্টতম কথা বলছে।
সে তো মাকে বলেছিল যেন তাকে চলে যেতে বলে।
তা না করে বাবা মা ওকে এভাবে রুমে পাঠিয়ে দিলো? সিরিয়াসলি!
"মিনিমাম লজ্জ্বা নেই তোর? ফোন রিসিভ করছিনা মানে কথা বলতে চাইনা। বাড়ি বয়ে এসেছিস, তাও নিচে নামছিনা মানে দেখা করতেও চাচ্ছিনা। তাও ডিরেক্ট রুমে চলে এসেছিস। একটুও লজ্জ্বা নেই না তোর?"
"তোর বাপ, মা পাঠিয়েছে এখানে যত্নআত্তি করে। যেন তোকে এখানে এসে আমি বোঝায়, সেবাযত্ন করি। আর লজ্জ্বার কথা বলছিস?" কথাটা বলে সে নির্লজ্জ্বের মতো হাসে।
"তোর কসম মাই ওয়াইল্ড ডিসায়ার, ওটা এক ফোটাও নেই আমার মধ্যে। ট্রাস্ট মি, এক ফোটাও না। নাহলে কি আর বাড়ি বয়ে এসে রুমে ঢুকে আবার তোর সাথে বিছানা অব্দি চলে আসি?"
খুবই বিচ্ছিরি ইঙ্গিতে কথাটা বলে সে তোশার বেডে গা এলিয়ে দেই।
তোশা নিজেও বিছানাতেই বসে ছিল। ইরফানের বাজে ইঙ্গিতে বলা কথাটা শুনে সে উঠেই যেতো। কিন্তু ইরফান সত্যি সত্যি শুয়ে পড়েছে বিছানায়। ইরফানের সব কথাবার্তা থেকে শুরু করে কর্মকাণ্ড মিলিয়ে পুরো ব্যাপারটা কোথা থেকে কোথায় গিয়ে দাড়ালো ভেবে গা গুলিয়ে আসলো তার।
"প্রথমত এ ধরণের নামে আমাকে ডাকবিনা। তোর সাহস কম নয় তুই আমার বাড়ি এসে আমাকে এই ধরণের নামে সম্বোধন করিস। আর বিছা......" তোশা কথাটা বলতে গিয়ে বিরক্তি আর অস্বস্তিতে চোখ মুখ কুচকে ফেলে।
"ওখান থেকে নেমে আয়।"
ইরফান মাথার নিচে একহাত রেখে মন দিয়ে তোশার এক্সপ্রেশনই দেখছিল। ওকে নেমে আসতে বললে সে হেসে বলে উঠে,
"শুনতে অস্বস্তি লাগলেও তুই আমার ওয়াইল্ড ডিসায়ারই। আর হবু শ্বশুর শাশুড়ি নিচে একটু বেশি খাইয়ে ফেলেছে। এখন নড়ার শক্তি পাচ্ছিনা। পারলে একটু টেনে উঠা।"
তোশা সম্বোধনের দিকে আর যায়না। এই টপিক নিয়ে কথা বাড়াতে চায় না সে। তবে ইরফানকে খুব ভালো করে চেনে। সে এখন উঠাতে যাবে আর ইরফান টেনে ওকেও তার সাথে শুইয়ে দেবে। তারপর যা মন চায় তাই করবে।
তোশার খুব বিরক্ত আর অসহায় লাগে। ইরফানকে কি শুরু থেকে একটু একটু করে আজকের এই অধিকারবোধ সেই দেইনি? হ্যাঁ, সে নিজেই দিয়েছে।
বন্ধুত্বের নাম দিয়ে এতোটা জড়িয়ে যাওয়া তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। যেটা থেকে চাইলেও আর বেরিয়ে আসা সম্ভব হচ্ছেনা।
সে আফসোস নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে একটু সামলে নেই। তারপর ইরফানকে উঠাতে যায়। যদি আজকে কোনোভাবে তার ধারণা ভুল প্রমাণ হয় সেই আশায়।
কিন্তু না, তেমন কিছুই হয়নি। তোশা ওকে হাত ধরে টেনে উঠাতে চাইলে সাথে সাথে ইরফান টেনে ওকে নিজের গাঁ য়ে র উপর ফেলে।
তোশা একটুও অবাক হয়নি যদিও। কারণ এক পারসেন্ট বিশ্বাস নিয়ে সে এলেও বাকি ৯৯ পারসেন্ট জানতো এমনটাই হবে। তাই তেমন অবাক হয়না। তবে হতাশ হয়ে ওভাবেই ইরফানের বুকে মাথা ফেলে রাখে কপাল ঠেকিয়ে।
ইরফানের মনে হলো, ওর বুকে তোশা নিজের কপাল ঠুকেছে। কিন্তু খুব আফসোস হলে মানুষ তো দেয়ালে নিজেদের কপাল ঠুকে, জড় বস্তুর সাথে। তোশা বোধ হয় ওকে জড় বস্তুর সাথে তুলনা দিলো, ওকে হৃদয়হীন বোঝাতে চাইলো।
ইরফান আর ভাবেনা। তোশার কোমরে হাত রেখে ওকে নিজের সাথে জড়িয়ে নেই। অন্য হাত ওর পিঠে ছিল। সেই হাত তুলে সে তোশার মাথা জুড়ে থাকা চুল গুলো একপাশে সরায়। তারপর ঐ গালে ঠোঁট ছুইয়ে কানের কাছে মুখটা রেখে বলে,
"আবার বিশ্বাস রেখে উঠাতে চলে এলি?"
তোশা মাথা নাড়ায়।
"হুম, ঠকে গেলাম আবার"
"আমি বলেছিলাম আমাকে বিশ্বাস করতে?"
"ওটাই তো আমার এক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল"
ইরফান ওকে বুক থেকে নামিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেই। তারপর ওর দিকে ঝুকে বলে,
"ওসব সেন্টিমেন্টাল কথাবার্তা রাখ। আগে বল আমাকে এভয়ড করার সাহস কই পাস তুই?"
"তোকে এভয়ড করতে আমার সাহস লাগবে?"
ইরফান তোশার চোয়ালে হাত রেখে বলে,
"রাগিয়ে দিসনা। কন্সিকোয়েন্স তোর জন্যই খারাপ হবে। আমার কিছু না।"
"আচ্ছা"
এবার সে নরম হয়। তোশার গলদেশে মুখ গুঁজে। খুব শান্ত ভাবে বলে,
"ড্যাডকে বল রেখেছি যেকোনো সময় বাড়িতে বউ নিয়ে আসতে পারি”
তোশা কিছু বলেনা।
“ধুমধাম করে করতাম। কিন্তু তুই তো সোজা পথে হাঁটলে মানবিনা। বেকে বসবি। তাই আনপ্ল্যান্ড ভাবে করতে হবে।”
তোশা এবারও কোন শব্দ করেনা।
“চুপ করে আছিস কেন? কথা বল”
“তুই এখানে কোন কাজে এসেছিলি? হয়ে গেলে চলে যা। আমার তোকে ভালো লাগছেনা। তোর চেহারা দেখতে ইচ্ছে করছেনা”
ইরফান হাসে।
“অথচ আমার সাথেই লেপ্টে আছিস এখন”
“হুম, বাধ্য হয়ে”
ইরফান চুপচাপ তোশার হার্টবিট শুনতে থাকে।
“কি কাজে এসেছিস হয়ে গেলে চলে যা। প্লিজ” তোশা বিরক্ত হয়ে বলে।
“তোকে দেখতে এসেছি। তোর কাছাকাছি থাকতে ভালো লাগে। তোকে কাছে পেতে ভালো লাগে, তোর সাথে কথা বলতে ভালো লাগে। তাই এসেছি”
“কিন্তু তোকে আমার ভালো লাগেনা”
“আমার লাগলে হবে”
“আমার ইচ্ছের কোন মূল্য নেই?”
“আছে। তুই যদি এখন বিয়ে করবি বলিস, তাহলে আমি কোন প্রশ্ন না করে বর সেজে তোকেও বউ সাজিয়ে কাজী অফিস যাবো। এতটা গুরুত্বপূর্ণ তোর ইচ্ছে আমার কাছে”
“কিন্তু আমি তোকে বিয়ে করতে চাইনা”
“ওসব তোর জেদ, ইচ্ছে না। ইচ্ছে হলে মূল্য দিতাম”
“আমি আমার জেদ, ইচ্ছে সব কিছু প্রাধান্য দেবে এমন কাউকে চাই”
“আচ্ছা, একবার বিয়ে হয়ে গেলে তোর জেদ, ইচ্ছে সবকিছুর মূল্য দেবো”
তোশা বিরক্ত হয়, রাগ হয়, অস্থির লাগে তার। মিশ্র অনুভূতিতে সে ইরফানের পিঠে কি ল বসায়।
কিন্তু নিউটনের গতির তৃতীয় সুত্র অনুযায়ী, মহাবিশ্বের প্রতিটি ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। আর লক্ষ্যবস্তু ইরফানের মতো এবং সামনের ক্রিয়াপ্রদানকৃত বস্তু যদি তোশার মতো কেউ হয়, তাহলে মহাকর্ষ সূত্রও একটু বেশি কার্যকর হয়।