সময়টা ৯ টা বেজে ৩০ এর ঘরে। প্রাণেশার মাত্র ঘুম ভাঙলো। নিভু নিভু চোখ খুলে আলসেমী ভেঙে উঠে বসে সে। শরীরটা খুব ভার ভার লাগছে তার। মনে হচ্ছে যেনো রাতে ঘুমানোর সময় গায়ে কাথা জড়ায়নি, বরং ৫০ কেজি ওজনের চালের বস্তা জড়িয়েছে। বাহুতে, পেটে -ব্যাথা লাগছে। প্রাণেশা বুঝতে পারলোনা এমন লাগার কারণ।
গত রাতে জ্বর এসেছিলো তাই শরীর দুর্বল, আর ব্যথা অনুভব হচ্ছে -এমনটা ভেবে নিয়ে কোনো মতে উঠে দাড়ায় সে।
তারপর ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নেই। কিন্তু কাপড় চেঞ্জ করতে গেলে ভয় পেয়ে যায় সে। তার গাঁঁয়ে অন্য পোশাক এলো কিভাবে? সে তো উপরে কোনো টপ্স পড়েনি গতকাল। কামিজ পড়েছিল, তাহলে? এদিকে পেটে, বুকের উপরে কিছুর দাগ দেখা যাচ্ছে, জ্বলছেও খুব। খামচির আর কামড়ের দাগের মতো কিছুটা।
সে ভয় পেলেও হঠাৎ সময় খেয়াল হতেই আরও আতংকিত হয়ে পড়ে। ১০ টার কাছাকাছি প্রায়। এতো সময় ঘুমিয়েছে সে? নিচে কে কি মনে করলো কি জানি। আর কেউ ডাকলোওনা একবার?
সে তাড়াহুড়া করে তৈরি হয়ে নিচে নামল। একটু সংকোচ নিয়েই ড্রয়িংরুমে যেতেই দেখে সবাই যার যার কাজে ব্যস্ত। তবে মেয়েরা কেউই আজ ইউনিভার্সিটিতে যায়নি।
অথচ আজ ইশির যাওয়ার কথা ছিল। দিগন্ত ভাইয়াকেও তখন হাসপাতালের জন্য বের হতে দেখা যায়।
সে সবার মাঝে যেতেই দাদী জিজ্ঞেস করে,
“উঠেছ নাতবউ? এখন ভালো লাগছে?”
প্রাণেশা ধরে নেই কাল শরীর খারাপ লাগছে বলেছিল বলে দাদী এ প্রশ্ন করেছে। সে মাথা নাড়িয়ে সায় জানায়।
দিগন্তের মা বলে,
“তোমার এতো জ্বর উঠলো কাল। আমাদের একবার জানালে না কেন? তোমার শাশুড়িই সব, তাইনা? এতোদিনেও আমাদের আপন মনে করতে পারলেনা!”
চাচির কথা শুনে প্রাণেশা খানিকটা অবাক হলো। সবাই জানল কীভাবে যে তার জ্বর হয়েছিল?
তবে বেশি কিছু না ভেবে হেসে ইশারায় বোঝাল —
“তেমন কিছু না চাচি, সামান্য জ্বর ছিল। এখন দেখছেনই তো, ভালো আছি। আর তাছাড়া অতো রাতে আপনাদের ঘুম ভাঙাতে চাইনি।”
ওর ইশারাটা সবাই মোটামুটি বুঝল। তারপর প্রাণেশা আবার ইশারায় বোঝানোর চেষ্টা করল —
“আপনারা কি কেউ কি রাতে আমার রুমে এসেছিলেন?”
বাড়ির সবাই এখনো প্রাণেশার সব রকম সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ ধরতে পারেনা। বিশেষ করে প্রসঙ্গের বাইরে কোনো কথা হলে। তাই হঠাৎ রাতে কেউ রুমে গিয়েছিলো কিনা প্রশ্নটাও ওরা বুঝতে পারেনি।
প্রাণেশা ওরা বুঝতে পারেনি দেখে পাশে ইশিকে ওর হাতে থাকা ফোনটা একটু দিতে বলে। ফোনে টাইপ করে লিখে দেখালো -
“গত রাতে যখন আমার জ্বর এসেছিল, তখন কি আপনাদের কেউ আমার কাছে এসেছিলেন?”
ইশি, দিথী, অয়ন্তি, চাচি আর দাদী- সবাই ওর লেখাটা দেখে অবাক হয়। প্রাণেশা জানেই না রাতে তার সঙ্গে কে ছিল? অথচ তারা সবাই ভেবেছিল - অন্তিক আর তার দাম্পত্য জীবন শুরু হয়েছে।
কারণ আজ সকালে তারা অন্তিককে প্রাণেশার রুমেই দেখেছে। যতোটুকু বুঝেছে অন্তিক সারারাত ওর সাথেই ছিল।
তাছাড়া অন্তিকের গাঁয়ে তারা দাম্পত্যের চিহ্ন স্পষ্ট লক্ষ্য করেছে।
প্রাণেশার ঘুম থেকে উঠতে দেরি হচ্ছিলো বলে তারা বন্ধ দরজার ভেতর মেয়েটার কোন বিপদ হলোনা তো, ভেবে ভয় পেয়ে যায়। কারণ এ বাড়িতে এসেছে অব্দি প্রাণেশা একদিনের জন্যও দেরি করে ঘুম থেকে উঠেনি। আবার কালই বলছিল তার শরীর খারাপ লাগছে।
তাছাড়া যেকোন সমস্যায় চাইলেই কাউকে ডাকতে পারবেনা। তাই ভয় পেয়ে সবাই আসে কোনো সমস্যা হলো না তো দেখতে।
বেশ কিছুক্ষণ নক করার পর ঘুমজড়ানো চোখে অন্তিক দরজা খুলেছিল। তার গায়ে শুধু একটি সাদা ট্র্যাকপ্যান্ট ছিল, তাও ফিতাটা ঠিকমতো বাঁধা নয়। গলা ও বুকে স্পষ্ট নখের আঁচড় ছিল।
তাছাড়া দাদি নাকি ভেতরে দেখেছে প্রাণেশার গাঁয়ে বুক অব্দি কাথা জড়ানো। আর গলার খালি অংশে কাপড় ছিলোনা। ওটা দেখেই তিনি অন্তিককে “প্রাণেশার খোঁজ নিতে এসেছিলাম আমরা। এখন আসছি” - এই বলে বাকিদের নিয়ে ওখান থেকে চলে আসেন। নাতনিরা এভাবে চলে আসলো কেন জানতে চাইলে রসিকতা করে ব্যাপারটা বলেন।
তো তারা এরপর আর কি বা ভাববে!
কিন্তু এখন মেয়েটা ওদের জিজ্ঞেস করছে রাতে তারা কেউ ছিল কিনা ওর সাথে।
অয়ন্তি কনফিউজড হয়ে জানতে চায়,
"ভাবি তুমি জানোনা কাল রাতে তোমার সাথে কে ছিল?"
প্রাণেশা অবুঝ দৃষ্টিতে মাথা নাড়ায়। আর লিখে দেখায়,
"না, আমার আসলে মনে নেই তেমন কিছু। আর সকালে দেখলাম অন্য কাপড়ে আছি। তাই তোমাদের জিজ্ঞেস করছি।"
ওটা দেখে সবাই, একে অপরের দিকে তাকায়। হিসাব মিলছেনা।
উহুম, বুঝতে চাইলে হয়তো মিলছে। অন্তিক কাল প্রাণেশা অজ্ঞান থাকা অবস্থায় হয়তো ওর অনুমতি ছাড়া কিছুটা কাছাকাছি এসেছিল। আর প্রাণেশা জ্বরের ঘোরে থাকায় বুঝতে পারেনি। কিংবা তখন কিছুটা বুঝতে পারলেও এখন মনে করতে পারছেনা। ওদের হেলেদুলে থাকা একটা সম্পর্কে এই কাজটা অন্তিক মোটেও ঠিক করেনি। কিন্তু স্বামী স্ত্রীর ব্যাপারে নাক না গলানোই বেস্ট। এমন ভেবেই ওরা অন্তিকের দোষটা নজর আন্দাজ করে গেলো।
এর মধ্যে প্রাণেশা আবার লিখে দেখায়,
"তুমি ছিলে কি অয়ন্তি আপু? তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে গাঁ মুছিয়ে দেওয়ার দরকার ছিলনা। এরকম হুটহাট জ্বর আমার এমনিতেই কমে যায়।"
দিগন্তের মা ওখান থেকে চলে যায়। তারা দাদি, নাতনিরা থাকুক। কি একটা পরিস্থিতি শাশুড়ি আর বাচ্চাদের সামনে!! তার এখানে থাকার দরকার নেই।
অয়ন্তি কি বলবে খুঁজে পায়না। বোকার মতো শুধু একবার হেসে মাথা নাড়ায়।
দাদি কি যেন ভেবে প্রাণেশাকে কাছে এসে বসতে বলে হাতের ইশারায় ডেকে।
প্রাণেশা বসে।
"শুন নাতবউ। তোর স্বামী মাত্র বাড়ি থেকে বের হয়েছে। ব্যবসার কাজে দেশের বাইরে গিয়েছে সে। কাল পরশু চলে আসবে। সে দেশে ফিরলে তোর প্রথম কাজ হবে বউ সেজে তার জন্য অপেক্ষা করা। অনেক দিন তো কাটলো এভাবে হেলেদুলে। না আমার বুঝদার নাতি টা কিছু বলছে, আর না তুই সেভাবে চেষ্টা করছিস স্বামীর মন পেতে। এমন হলে তো চলবেনা। নিজ থেকে এক পা আগে বাড়াতে হবে। নাহলে স্বামীর সংসার আর করা হবেনা তোর। কারণ ছেলেদের মন একবার বাইরে গেলে সহজে আর তা ঘরে ফেরানো যায়না। যদিও আমার দাদুভাই এমন নয়। কিন্তু বউয়ের আদর না পেলে যেকোন পুরুষেরই মন বাইরে যাবে। তাই তোকে তোর স্বামীকে আচলে বেঁধে রাখতে হবে। বুঝেছিস?"
প্রাণেশা মাথা নিচু করে দাদীর সব কথা শুনে। কিন্তু কোনো প্রতি উত্তর করেনা। কারণ কি বলবে সে? যে তার স্বামীর মন ইতোমধ্যে বাইরে চলে গিয়েছে…..
অন্তিকের আলমারিতে মেয়েলি পোশাক দেখেছে সে। সাথে তাদের ডিভোর্স পেপার। এখন আর কোনো কিছু করা সম্ভব নয়।
কিন্তু দাদীর যুক্তির সাথে সে একমত হতে পারলোনা। একজনের সাথে বিবাহবন্ধনে থাকা অবস্থায় অন্য কোথাও মন কিভাবে দেই মানুষ? হোক সেটা ছেলে কিংবা মেয়ে। ছি!! দরকার পড়লে তার সাইন নিয়ে ডিভোর্স পেপারে, তারপর যা করার করতো।
কিন্তু উকিল সাহেব তার আগেই নিজের চরিত্র বিকিয়ে দিয়েছে। আর যায় হোক, সে কোনো চরিত্রহীনের মন পেতে ভালো মেয়ে হয়ে বউ সাঁজতে পারবেনা।
প্রাণেশার মনে হতো এসব অসভ্যতামি অন্তিক শুধু তার সাথেই করে। কিন্তু কাল সে নিশ্চিত হয়েছে অন্তিক এসব শুধু তার সাথেই করেনা। বরং বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ছে সে অন্য কারো সাথে।
কি জানি এটা তোশা আপু ছিল নাকি অন্য কেউ। তোশা আপুকে যতটুকু দেখেছে সে যথেষ্ট ভদ্র মেয়ে। উল্টে তাকে বুঝিয়েছে মন দিয়ে সংসার করতে। তাহলে অন্য কোন মেয়ে হবে হয়তো।
প্রাণেশার মনে ভীষণ কষ্ট হয়। আবার মস্তিষ্ক ধিক্কার দেই অন্তিককে। এক মনে কতোজনকে যে জায়গা দেই। ছি!!
দাদি আবার জিজ্ঞেস করে,
"কি হলো? কিছু বুঝতে পারছিস, কি বলছি? এবার থেকে আর আগের মতো চলবেনা কোন কিছু। স্বামীর দিকে মন দে। আর আজকে বড় বউমা আসলে তাকে আমি বলবো যেন তোর সবকিছু অন্তিক দাদুভাইয়ের রুমে শিফট করা হয়। তুই সব গুছিয়ে রাখবি।"
শাইনা বেগম এসব বলছেন কারণ তিনি নাতির হাভভাব কিছুটা আন্দাজ করতে পারছেন।
যতোই উপরে উপরে বিতৃষ্ণা দেখাক। পুরুষ মানুষ ঘরে বউ রেখে নিজেকে ধরে রাখবে, অসম্ভব ব্যাপার।
প্রাণেশা দাদি যা বলেছে সেসব কালকের আগে বললেও মেনে নিতো। কিন্তু অন্তিকের চরিত্রের নমুনা নিজের চোখে দেখার পর দাদির কথাগুলো তার শুনতে ইচ্ছে করছেনা। দাদি শুধু নিজের নাতির কথা ভাবছে।
তাকে স্বামীর মন জয় করতে বলছে।
নিজের নাতিকে যদি এসব বুঝাতো তাহলে আজ বিষয়টা অন্য রকম হতে পারতো। তবে স্বভাবতই সে বড়দের উপর কথা বলতে পারলোনা।
————————————
প্রাণেশা কিছু খেয়ে নিয়ে চাচীকে এসে সাহায্য করছে। তবে সে আপাদত খুব দ্বিধায় আছে। কি করা উচিত তার? মামা মামীর কাছে ফিরে যাবে?
দাদি যা বলছে তা তার পক্ষে করা সম্ভব না। যদি কারণ জানতে চায় হলে তাও জানাতে পারবে না। তাদের বাড়ির ছেলের চরিত্র নিয়ে তাদের কাছেই বিচার দেবে সে?
বিশ্বাস করবে তাকে? কিন্তু অন্তিককে মেনে না নিয়ে এই বাড়িতে পড়ে থাকা অসম্ভব। সে ডিভোর্সের পর উকিল সাহেব যতোই দয়া দেখিয়ে তার দায়িত্ব নিতে চাক না কেন, তাও সম্ভব না। কারণ, একবার এই সম্পর্ক থেকে বের হয়ে গেলে সেখান থেকে ফায়দা সে কখনো তুলতে পারবেনা। কিন্তু তাহলে সে যাবে কোথায়? মামা মামীর কাছে গেলে তারা যদি তাকে ফিরিয়ে দেয়?
এসব ভেবে প্রাণেশার ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে। কেন তার একটা নিজের বাড়ি হলোনা? যদি তার মা বাবার একটা সুস্থ সংসার হতো, তাহলে তাকে এমন অসহায়ের মতো থাকার জায়গা খুজে বেড়াতে হতোনা।
মায়ের নিজেরও একটা সংসার হলনা। আর না হলো তার। প্রাণেশা বাবা বাড়ি কখনো না গেলেও সে জানে তাদের সম্পর্কে সবকিছু। মায়ের ডায়েরিতে দেখেছে সে। যেটা প্রাণেশার মা প্রাণেশার জন্যই লিখে রেখেছিলেন। মেয়েকে সামনা সামনি বলতে না পারলে তবে ডায়েরিটা হলেও যদি কাজে আসে।
কিন্তু সেটা এভাবে মৃত্যুর পর কাজে আসবে হয়তো বুঝতে পারেনি।
সে যায় হোক। যে বাড়িতে তার মায়ের ঠায় হয়নি, সে বাড়িতে সে কখনো আশ্রয় নিতে যাবেনা।
প্রাণেশা যদি বাকিদের মতো অক্ষম না হতো। তাহলে সে নিজেই কোনো কাজ করে নিজের ব্যবস্থা করে নিতো। কিন্তু এখন সে কাউকে কিছু বোঝাতে গেলেও মানুষ ধাঁধায় পড়ে যায়। আবার কাজ দেবে কি? আর তার এমন কোন যোগ্যতাও নেই যে কাজ পাবে। সবে কলেজে পড়ে সে।
আচ্ছা শুধু লেখাপড়ায় কি সব? অন্য কিছু করা যায়না? তার কি অন্য কোন গুণ নেই?
একথা মাথায় আসতেই প্রাণেশার মুখে হাসি ফুটে। আঁকা আঁকি দিয়ে নিশ্চয় কিছু করা যাবে!
কিন্তু এতেও কারো সাহায্য লাগবে। সে আঁকা আঁকি কাজে লাগিয়ে কিভাবে নিজেকে সাবলম্বী করা যাবে তা জানেনা। কোন আইডিয়া নেই এ ব্যাপারে।
কার সাহায্য নিবে ভাবতে ভাবতে তার কলেজের বান্ধবী মেহার কথা মাথায় আসে।
সে তাড়াতাড়ি ফোন বের করে টেক্সট করে মেহাকে আঁকা আঁকি কাজে লাগিয়ে কোনভাবে সাবলম্বী হওয়া যাবে কিনা বা এ সম্পর্কে কিছু বলতে পারবে কিনা জানতে চায়।
মেহাও রিপ্লাই করে সাথে সাথে। কিন্তু নেগেটিভ উত্তর এসেছে।
প্রাণেশা হতাশ হয়। তবে এক মুহূর্ত কিছু একটা ভেবে অন্য একটা নাম্বারে টেক্সট পাঠায়।
“আসসালামুয়ালাইকুম ভাইয়া। আমি প্রাণেশা। চিনতে পেরেছেন কি?”
প্রাণেশা টেক্সটটা পাঠিয়ে দ্বিধান্বিত মনে রুমে যায়। মেসেজ তো পাঠিয়ে দিলো সে। কিন্তু আদৌ কি কোন কাজের কাজ হবে? নাকি আরও বিগড়ে যাবে সব – তা সে জানেনা।
তবে এসব চিন্তা করতে করতেই ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসে।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। চিনবোনা কেন? তোমার নাম্বারটা সেভ করাই ছিল। ভালো আছো তুমি?”
প্রাণেশা রিপ্লাই করে,
“জিহ আলহামদুলিল্লাহ। আপনি ভালো আছেন?”
“আমিও আলহামদুলিল্লাহ”
মেসেজটার পর প্রাণেশা আর কি লিখে কি শুরু করে করবে কিছু বুঝতে পারেনা। তার খুব সংকোচ লাগছে। কিন্তু অপরপাশের ব্যক্তিই তাকে যেকোনো প্রয়োজনে মনে কোন দ্বিধা না রেখে বড় ভাই ভেবে যোগাযোগ করতে বলেছিল। তবু এখন তার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। তবে প্রাণেশার বিষয়টা হয়তো সে জন বুঝতে পেরেছে।
তাই নিজ থেকেই জানতে চাইলো,
“কোন প্রয়োজন আছে কি প্রাণেশা? আমার কোন হেল্প লাগবে? লাগলে বলো। আমি শুনছি”
প্রাণেশা তার আস্বস্তবাণী পেয়ে কোনো ভাবে জানায়,
“ভাইয়া। বলছিলাম, আপনি তো জানেন আমার আঁকা আঁকি করা হয়। কতো ভালো আঁকি জানিনা, তবে খারাপ না। আমি আমার পেইন্টিং গুলো নিয়ে কি কোনভাবে নিজের জন্য কিছু করতে পারবো? আমি আসলে বুঝতে পারছিনা। আমার এই ব্যাপারে একেবারেই কোন আইডিয়া নেই। তবে আমি আমার এই ছোট খাটো গুণটা দিয়ে কিছু করতে চাইছি। আমি কি বুঝাতে চাচ্ছি আপনি নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। যদি এই ব্যাপারে একটু তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন। আমি খুব কৃতজ্ঞ থাকবো।”
ওপাশের ব্যক্তি হয়তো হঠাৎ প্রাণেশার নিজের জন্য কিছু করতে চাওয়ার কারণ বুঝার চেষ্টা করছে।
একটু সময় নিয়ে সে রিপ্লাই করলো,
“অবশ্যই সাহায্য করতে পারি। কিন্তু তোমার তো ভাইয়াকে বিস্তারিত জানাতে হবে। হঠাৎ এই চিন্তা মাথায় আনার কারণ? আমার বন্ধু কি তোমাকে বসে বসে খাও এমন কিছু বলে খোটা দিয়েছে নাকি?”
“না না। তেমন কিছু না। আমি আসলে ভাবছিলাম সবার নিজের জন্য কিছু করা উচিত। তাই”
প্রাণেশার এই কথা ইরফান কানেও নেইনা। সে লিখে,
“এভাবে বললে তো হবেনা। আমাকে জানাতে হবে কি কারণে এমন চিন্তা ভাবনা। বোন বলেছি তোমাকে। তোমাকে কে কি বললো আমাকে জানতে হবেনা?”
“সত্যি তেমন কিছু না ভাইয়া”
“বলছো না তাহলে?
প্রাণেশার মনে হলো ইরফান কথাটা খুব গম্ভীর ভাবে বলেছে। সে নিজেকে সামলে রিপ্লাই করে,
“উনার আলমারিতে ডিভোর্স পেপার দেখেছি কাল”
ইরফান হয়তো অবাক হয়। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পর রিপ্লাই করে,
“তুমি নিশ্চিত? ওটা তোমাদেরই? অন্তিক ডিভোর্স লয়ার না হলেও কেইসের নানান কারণে কিন্তু ক্লায়েন্টের ডিভোর্স এর বিষয় নিয়ে কাজ করতে হয়। ওসবও হতে পারে।”
“আমি ওখানে আমাদের নাম দেখেছি।”
ইরফান কিছুক্ষণ ভাবে। তারপর রিপ্লাই করে,
“অন্তিক তো শুরুতে একটু দ্বিমত করতো যতটুকু জানি। তখনের হবে হয়তো ওটা। এখন তোমাকে যথেষ্ট চায় সে।”
প্রাণেশা মানেনা।
“অভিনয়, সব। আপনার বন্ধু যে কতো অভিনয় করতে পারে তা আপনি আন্দাজও করতে পারবেন না।”
“আচ্ছা? উম, হুম হয়তো। তবে তুমি আপাদত রাগের মাথায় আছ তাই ভুল বুঝছো। একটু ঠাণ্ডা মাথায় ভাবো। অন্তিক এখন বিয়েটা খুব চায়। নিজেই ভেবে দেখো। তোমাকে খুব ভালোবাসে।”
“আমি উনার সম্পর্কে আর কিছু ভাবতে চাইছিনা ভাইয়া। ডিভোর্স পেপার দিয়ে যখন সাইন করে দিতে বলবে, আমি তখনই করে দেবো। উনি নিজের পছন্দ মতো কাউকে বিয়ে করে নিক তারপর। এটাই চায়। অবশ্য এখনই হয়তো ঠিক করা আছে মেয়ে।”
“বলতে চাচ্ছো অন্তিক কাউকে পছন্দ করে?”
“হ্যাঁ”
“কেন মনে হলো?”
“আমি জানি। বুঝতে পারি।”
“কোনো কারণ তো থাকবে এমনটা মনে হওয়ার।”
প্রাণেশা আর কিছু বলেনা। সে বেশ বুঝতে পারছে ইরফান ভাইয়ার কাছে কোন সাহায্য সে পাচ্ছেনা। বন্ধুর চেয়ে নিশ্চয় তাকে প্রায়োরিটি দেবেনা।
ইরফান প্রাণেশার কোন জবাব না পেয়ে নিজেই আবার বলে,
“আচ্ছা তোমাকে বলতে হবেনা কিছু। আমি অবশ্যই তোমাকে সাহায্য করবো। কিন্তু এসব যে আমাকে বললে, কাল তোমার স্বামীর রিয়েকশন কি হয় তা দেখো। বুঝে যাবে সে তোমাকে চায়, নাকি অন্য কাউকে ভালোবাসে।”
“মানে? আপনি সব কথা উনাকে জানিয়ে দেবেন?”
“আমার জানাতে হবেনা। তোমার স্বামী আমার উপর নজরদারি রাখে। এই যে ফোনে টেক্সট কথা বলছি? সব সুর সুর করে তার কাছে যাচ্ছে”
“কি?? আপনি আমাকে আগে জানাননি কেন?”
“আরে কিচ্ছু হবেনা। চিল!! বেশি কিছু করলে আয়েশা আন্টিকে গিয়ে বলবে জাস্ট। বাকিটা উনি দেখে নেবেন।”
প্রাণেশা আর কিছু রিপ্লাই করেনা। তার মাথা হ্যাং লাগছে। লোকটা যদি সত্যি সত্যি সব শুনে নেই তাহলে সেটা মোটেও ঠিক হবেনা। আর এটাও জেনে যাবে যে সে তার অনুপস্থিতিতে আলমারিতে হাত দিয়েছে। উফফ!!!! কি যে হবে।
——————
অয়ন্তি বিকালে ফ্রেন্ড দের সাথে বাইরে এসেছে। ইউনিভার্সিটির গ্রুপ প্রজেক্ট নিয়ে কিছু ডিসকাশনসহ নিজেরাও সময় কাটাচ্ছে। একটা রেস্টুরেন্টে আছে তারা এখন।
দুজন ছেলে আর তিনজন মেয়ে তারা।
রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে খেতে তারা গল্প গুজব করে একে অপরের উপর হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। মূলত ওদের তিন মেয়েদের মধ্যে এক বান্ধবী তাদের ইউনিভার্সিটির স্ট্রিক্ট একজন স্যারকে মিমিক্রি করছে। তাই দেখে ওরা হাসছে।
মাহাদও তার কয়েকজন বন্ধুর সাথে দেখা করতে রেস্টুরেন্টে এসেছে। বসে তারা খাবার অর্ডার করে।
“রোহানেরও তাহলে উইকেট পড়লো। বাকি আছি শুধু আমি আর মাহাদ। তোদের এসব দেখতে দেখতে আমরা না জানি কোন দিন ডিপ্রেশনে পড়ে একেবারে আউট হয়ে যায়।”
“তো করে নে বিয়ে। তোর তো চাচাতো প্রেমিকা আছে বাড়িতে। বিয়ে করে চাচাতো বউ বানিয়ে নে। কাহিনী খতম।”
“খতম না শালা। শুরু হবে। চাচী যদি জানে তার মেয়ের বিয়ের প্রস্তাবগুলো পড়ালেখার অযুহাত দেখিয়ে ভাগিয়ে নিজেই লাইন ক্লিয়ার করেছি। তাহলে বাড়িতে ক্ষুরক্ষেত্র হয়ে যাবে।”
“ভালো জব তো করিস। বউ ঠিক মতোই পালতে পারবি। তাও এতো কিসের আপত্তি?”
“দূর। একটা না। অনেক রকম ঝামেলা। চাচীর আমাদের পুরো গোষ্ঠী নিয়েই আপত্তি”
“কাজিন লাভে এই একটা সমস্যা। যখন তখন প্রেমিকা কাছে পাওয়া গেলেও বিয়ের সময় পরিবারকে মানাতেই জান প্রাণ বেরিয়ে যায়।”
মাহাদসহ তার আরও দুই বন্ধু কথা বলছিল। এর মধ্যে কিছু ছেলে মেয়ের অতিরিক্ত হাসা হাসির আওয়াজ কানে আসে তাদের। তবে বিশেষ পাত্তা দেয়না মাহাদের বন্ধুরা। কিন্তু, সে না দিয়ে পারছেনা। কারণ এই হাসাহাসির আওয়াজগুলোর একটি তার কানে খুব পরিচিত ঠেকলো।
মাহাদ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে। তারা বসে আছে শুরুর দিকে। আর রেস্টুরেন্টের একদম শেষ মাথায় অয়ন্তিকে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন ছেলে মেয়ের সাথে বসে হাসাহাসি করতে।
মাহাদ তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। পাশের ছেলেটা হাসতে হাসতে একদম গড়াগড়ি খেয়ে পড়তে চাইছে অয়ন্তির গাঁঁয়ে। ওদের বন্ধুত্ব কেমন তা সে জানেনা। কিন্তু ব্যাপারটা দেখে মাহাদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো। এতো রাগ উঠার কারণ সে নিজেই বুঝতে পারছেনা। কোনভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে। বন্ধুদের কথায় মনোযোগ দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু পারছেনা। কান, চোখ দুটোই বার বার ঐ টেবিলে যাচ্ছে। মাহাদের বিষয়টা ওর দুই বন্ধু খেয়াল করে।
একজন বলে,
“কলেজ ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট হবে হয়তো। আমারও আমাদের সময়ের কথা মনে পড়ছে। এভাবে কতো মজা করতাম। এখন সবাই একসাথে হওয়াও টাফ ব্যাপার।”
আরেকজন বলে,
“ব্যাপারটা বোধ হয় অন্য কিছু। তোর ওখানে কাউকে পছন্দ হয়েছে নাকিরে মাহাদ? বিদেশী পোলা তুমি। দেশী মেয়ে সইবে?”
মাহাদ তখনো কিছু বলেনা। তার খুব বিরক্ত লাগছে চারপাশ। ওদের দুইজনের কথাগুলোও বোধ হয় তার কানে ঢুকেনি। শুধু অয়ন্তির ঐ হি হি শব্দ ছাড়া। তবে মোটেও সুমধুর লাগছেনা তা তার কাছে। বরং বিরক্তিকর লাগছে। হেসে হেসে কোথাকার কোন ছেলে যে তার গাঁঁয়ে ঢলে পড়ছে সে খবর নেই মেয়েটার।
এর মধ্যে আবার ঐ ছেলেসহ অয়ন্তির হাসির আওয়াজ কানে এলে তার চোয়াল শক্ত হয়।
মাহাদের দুই বন্ধু ওকেই দেখছিল। ওরাতো ভেবেছিলো কিছু মিছু টাইপ ব্যাপার। কিন্তু এই ছেলে তো মনে হচ্ছে হাসির আওয়াজে বিরক্ত হচ্ছে।
“আরে চিল। ওদের ই সময় এখন। এই বয়সে বন্ধুরা মিলে হইহল্লা করবেনা তো কবে করবে? এতো বিরক্ত হওয়ার কিছু নেই। আমরা বরং উঠে যায়, তোর যখন ভালো লাগছেনা।”