মৌনপ্রেম

পর্ব - ২১

🟢

পিকনিকের জন্য সবসময় সুন্দর একটা প্রকৃতির কাছাকাছি স্পটই মানানসই। অন্তিক দিগন্তরাও তাই এমন একটা স্পটই বেছে নিয়েছে। সবুজের মধ্যে আছে তারা এখন।

একটি মনোরম আউটডোর পিকনিক স্পট এটা, যা একটি হ্রদের তীরে অবস্থিত। চারপাশে সবুজ গাছপালা, নীল আকাশ এবং শান্ত পানি। আর তারা সেখানেরই একটা বড় গাছের নিচে নিজেদের বসার জায়গা সেট করেছে।

গাছের ছায়ায়, পানির ধারে একটি ঘাসযুক্ত জায়গা। অপর পারে সারি সারি গাছ এবং কয়েকটি ছোট কটেজ দেখা যাচ্ছে।

একটি গোলাপি-সাদা চেক প্রিন্টের পিকনিক মাদুর বিছিয়ে সেখানে তাজা স্ট্রবেরি ভর্তি বক্স, পপকর্নের বাটি, স্ট্রবেরি জুস, চকোলেট বার ভর্তি বাটি, বিভিন্ন ধরনের পেস্ট্রি, কুকি ও স্ন্যাকস, সবজি ও ফ্রাইড রাইস, পাই এসব রাখা আছে।

কিছু ছোট বাটিও আছে, যাতে সালাদ ও অন্য সাইড ডিশ রয়েছে।

সব মিলিয়ে এটি একটি আরামদায়ক ও সুস্বাদু খাবার-ভরা পিকনিক, সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের মাঝে।

মাহাদ আর ইরফান সবার আগে স্পিকারে গান লাগিয়ে দেই। মেহেরিন, অয়ন্তি আর প্রাণেশা মাদুরের উপর সবকিছু সাঁজাচ্ছে, ওরা স্পিকারে গান লাগিয়ে দিলে দিথী সবার আগে গানের তালে নাচতে শুরু করে।

"তোমার জন্য নীলচে তারার

একটু খানি আলো,

ভোরের রং রাতে মিশে কালো,

কাঠগোলাপের সাদার মায়া

মিশিয়ে দিয়ে ভাবি,

আবছা নীল তোমার লাগে ভালো,

ভাবনা আমার শিমুল ডালে

লাল যে আগুন জালে,

মহুয়ার মনে মাতাল হাওয়া খেলে,

এক মুটো রোদ আকাশ ভরা তারা,

ভিজে মাটিতে জলে নকশা ভরা,

মনকে শুধু পাগল করে ফেলে।"

গানের তালে দিথী নাচছে। তাদের ফ্যামিলি ফাংশনে নাচার অভ্যাস আছে। খুব ভালো নাচতে পারে। নাচার মাঝে সে ইশিকেও টেনে নেই। তারপর দুজন একসাথে নিজেদের মধ্যেই নাচে।

বাকিরা দেখছে, আর অয়ন্তি, মাহাদ ভিডিও করছে। ওদের নাচটা সম্পূর্ণ নিজেদের মধ্যে। গান শেষ হলে তারাও থেমে যায় আস্তে আস্তে।

বাকিরা তালি দেই।

"বাহ, ফাটিয়ে দিয়েছিস।" ইরফান

ওরা দুইজন দুজনের হাত ধরেছিলো। ওভাবেই এক পা একটু পেছনে নিয়ে মাথা হেলিয়ে দুজনে একসাথে বলে,

"ধন্যবাদ"

এসে বসে যায় তারা। একটু জুস নেই।

ইরফান অনুসন্ধানি চোখে চারদিকে তাকিয়ে দেখতে পায় অন্তিক একটু দূরে ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। সে একটু ঠোঁট বাকিয়ে হাসে।

তারপর ঠিক হয়ে বসে বলে,

"অয়ন্তি, তোর ভাইতো সেই যে লুকিয়ে লুকিয়ে বিয়ে করে নিলো না কাউকে জানালো, না আমাদের। তার উপর এসেছি অব্দি পরিচয়ও করিয়ে দিলোনা নিজের বউয়ের সাথে। তাই তোরা হলেও পরিচয় করিয়ে দেই পিচ্চি ভাবির সাথে।" ইরফান

প্রাণেশা ইরফান এসেছে অব্দি সেভাবে তার সাথে পরিচয় হয়নি। কিভাবে হবে? এখানে আসার আগে বাড়িতে পরিচয় হবে সে সুযোগ হয়নি সবার ব্যস্ততায়। তার শাশুরি থাকলে তিনি পরিচয় করিয়ে দিতেন। এখন উনার মতো চারদিক সামলাবে এমন তো আর বাকিরা পারেনা। কারো যখন মাথায় ছিলোনা, সে কি নিজে নিজে গিয়ে বলবে নাকি যে আমি আপনার বন্ধুর বউ হই.. আর যদি বলতেই হয় এভাবে তাহলেও তা সম্ভব হতোনা। কারণ সে তো কথাও বলতে পারেনা।

তবু ভাইয়াটা যখন পরিচিত হতে চাচ্ছে সে তার ডান হাতটিকে হালকা করে সামনে নামিয়ে, মুখে হাসি রেখে সালাম বোঝায়।

ইরফান তা দেখে একটু কনফিউজড হয়। মেয়েটা কি করতে চাইলো? সালাম দিলো নাকি? সে একটু চিন্তা করে মনে মনে ভাবে- হ্যাঁ, এভাবেই তো সালাম দেই।

কিন্তু মুখে না দিয়ে মেয়েটা তাকে হাতে সালাম বুঝাচ্ছে কেন? এভাবে সাধারণত ছেলেরা দিলে একটু কুল দেখায়। কিন্তু কোনো মেয়েকে প্রথমবার এমন নরম আর শালীন ভাবে হাতে সালাম বুঝাতে দেখেছে।

সে যায় হোক, ইরফান একটু হাসার চেষ্টা করে বাকিদের দিকে তাকিয়ে বলে,

"ভাবি বোধ হয় আমি কানে শুনতে পায়না ভেবেছে, তাই ইশারায় সালাম দিচ্ছে। সো আন্ডারস্ট্যান্ডিং শি ইস, আই লাইক ইট।"

ফলের ঝুড়ি থেকে একটা আপেল নিয়ে কামড় বসায় সে। তারপর আবার বলে,

"বাট সত্যি বলতে আমি ভেবেছিলাম ভাবি কথা বলতে পারেনা, এসেছি অব্দি একটা কথাও বলতে শুনলামনা। এখন দেখছি সে নিজেও আমাকে ডিফ ভেবে বসে আছে। দুজনের ভাবনা কাকতালীয় ভাবে মিলে গেলো।" শেষে একটু হেসে উঠলো ইরফান

প্রাণেশার হাসিমুখ একটু মলিন হয় ইরফানের কথা শুনে। তবে মন খারাপ করেনা। ভাইয়াটা তো আর জেনেবুঝে বলছেনা তার বন্ধুর মতো।

মানুষটা তখন তাকে মুখের উপর বোবা বলে দিয়েছিলো। তার খুব কষ্ট হয়েছে। প্রাণেশা এতোদিন মনে মনে ভাবতো তার এই প্রতিবন্ধকতার কারণেই তাকে তার স্বামী বউয়ের পরিচয় দিতে চাইতোনা।

এখন তা কোনোভাবেই ভুল কোনো ভাবনা বলে মনে হয়না। সে শতভাগ নিশ্চিত এই কারণেই এমন করে তার স্বামী।

তবে সে আপাদত ওসব ভাবনা ছেড়ে বাকিদের দিকে তাকায় যাতে তারা ইরফানকে বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলে সে আশায়।

ইরফানের কথা শুনে সবাই বিব্রত হলেও প্রাণেশার চাহনি দেখে তা স্বাভাবিক হয়। তারা বুঝে নেই মেয়েটা মন খারাপ করেনি, বরং সে জানেনা বলে তাকে জানিয়ে দিতে বলছে।

"ইরফান ভাই। তুমি ভুল ভাবছো। ভাবি আসলেই কথা বলতে পারেনা। আর তোমাকে ডিফ ভেবে ইশারায় সালাম দেইনি। সে ননভার্বাল।" দিগন্ত

ইরফান মাদুরায় কনুই ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে আপেলের কামড় বসিয়েছে। দিগন্তের কথা শুনে হেয়ালি ভাবে তার দিকে তাকায়। তার মুখভঙ্গি দেখে নেই।

মনে হচ্ছে সে সিরিয়াস। তাই নিজের মাথা সামান্য ঝুকিয়ে বোঝায় "আসলেই?"

দিগন্ত ওর কথা বুঝে মাথা না ঘুরিয়েই সবার দিকে একপলক গভীর দৃষ্টি বুলিয়ে বোঝায় হ্যাঁ।

ইরফান মাথা নাড়ায় দুই একবার কিছু একটা ভেবে ভেবে। তবে মুখভঙ্গি দেখে মনে হলো প্রাণেশার কথা বলতে পারেনা জেনে সামান্য খারাপ লেগেছে তার।

যদিও তা স্পষ্ট না।

তারপর প্রাণেশার দিকে তাকায়,

"সো সরি সিস্টার। আমি জানতামনা। দুঃখ পেয়ে থাকলে ভাই ভেবে মাফ করে দিও। ওকে?"

প্রাণেশা হালকা হেসে সম্মতি জানায়। তার ইরফানের বলার ধরণ খুব ভালো লেগেছে। না কোনোপ্রকার ব্যঙ্গ করেছে তার অক্ষমতা জেনে, আর না কোনো অযাচিত সহানুভুতি দেখিয়েছে, যেমন বাকিরা দেখায়।

বরং তার প্রতিক্রিয়া খুব স্বাভাবিক ছিলো। যেন এই ধরণের সমস্যা যে কারো থাকতে পারে। অস্বাভাবিকভাবে বা বাকা চোখে দেখার কিছু নেই।

পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করতে সবাই ব্যাডমিন্টন খেলার সিদ্ধান্ত নেই।

পাশেই ওদের আনা সব কিছু রাখা ছিলো একটি গাছের পাশে। ওখান থেকে র‍্যাকেট আর শাটলকক বের করে।

মাহাদ, দিগন্ত আর ইরফান এক পক্ষ আর বাকি পাঁচ মেয়ে অপর পক্ষ।

ওরা খেলেছে। ওদিক থেকে ছেলেরা খুব জোরে জোরে ছুড়ছে শাটলকক দুটো। যাতে একবার হলেও মেয়েদের মিস যায়। কিন্তু মেয়েগুলো হার মানছেনা। পড়ে যেতে যেতে র‍্যাকেট

ছুইঁয়ে উড়িয়ে দিচ্ছে। দিথী চেচিয়ে বলে,

"তোমরা এভাবে জোরে জোরে মারতে পারোনা। গাঁয়ের জোর আছে বলে এভাবে ছুড়তে হবে? এটা কিন্তু একপ্রকার চিটিং।"

"প্যানপ্যান না করে কক ছুড়। নাচতে না জানলে উঠান সবারই বাঁকা।" ইরফানও হাসতে হাসতে চেচিয়ে বলে।

"মোটেও না। কতো খেলেছি এসব।" ইশি

"হ্যাঁ, তাছাড়া শাটলকক মিস দিলে তারপর এসব বলবে। এখনো ফেলতে পারোনি। তাই আগে থেকে বড় বড় কথা বলবেনা।" অয়ন্তিও র‍্যাকেট নিয়ে এদিক ওদিক ছুঁটতে ছুঁটতে বলে।

সে কথাটা বলতে না বলতেই আরও জোরে শাটলকক দুটো একে একে ছুড়ে ইরফান আর মাহাদ। একটা কক মেহেরিন অপরপাশে ছুড়ে দেই। কিন্তু ইরফান যেটা ছুড়েছে ওটা ইশি একবার র‍্যাকেটে লাগিয়ে ওপাশে ছুড়তে চাইলে যায়না।

সামান্য দূরে গিয়ে পড়ে যেতে নেই।

অয়ন্তি নিজের র‍্যাকেট ছোঁয়ায় দৌড়ে গিয়ে, কিন্তু সামান্য ছুঁয়াতে পেরেছে শুধু। বেশিদূর পাঠাতে পারেনি। ওটা পরপর দুবার মিস গিয়েছে দেখে ছেলেরা ধরে নেই ওটা আর এপাশে আসছেনা।

কিন্তু নিচে পড়ার আগে প্রাণেশা কিভাবে জানি নিজের র‍্যাকেটে ওটা নিয়ে হঠাৎ ওপাশে ছুড়ে দেই।

ছেলেরা কক এপাশে আসবে সে আশা ছেড়েই দিয়েছিলো।

তাই হঠাৎ কক আসায় তারা র‍্যাকেট তুলে ওটা ক্যাচ করবে সেটুকুর সময় হয়ে উঠেনি। তার আগেই কক ফল করে। আর মেয়েরা জিতে যায়।

চিল্লিয়ে লাফিয়ে উঠে ওরা জেতার আনন্দে।

প্রাণেশা খুব খুশি হয় একবার কক উড়িয়েই জিতে যাওয়ায়। সে র‍্যাকেট হাতে নিলেও তেমন একটা সুযোগ পায়নি সবার ভীড়ে কক উড়ানোর। না সাহস করেছে। তার নিজের উপর বিশ্বাস ছিলোনা যে ওটা র‍্যাকেটে নিলেও ওপাশে পাঠাতে পারবে।

কারণ ব্যাডমিন্টন সে দেখলেও কখনো খেলেনি। আরিভকে তার সমবয়সীদের সাথে শীতের সময় পাড়ার মোডে খেলতে দেখেছে সে অনেক।

এমনকি তার ছোটবেলায়ও তার সমবয়সীরা খেলতো ব্যাডমিন্টন। কিন্তু তাকে কখনো নেইনি। ওকে চুপচাপ থাকতে হতো বিধায় যে কেউ তার সাথে খেলতে বিরক্তবোধ করতো।

খেলা মানে তো হইচই। সেখানে প্রাণেশার মতো নিশ্চুপ কাউকে নিয়ে মজা আছে?

কিন্তু তার খেলার ইচ্ছে জাগতোনা এমনটা মোটেও নয়। খুব ইচ্ছে জাগতো। কিন্তু কেউ না নিলে, তার সাথে না খেললে কিভাবে সম্ভব? কতো কেদেছে তাকে খেলায় নেইনা বলে কেউ।

বাইরে খেলতে যাওয়ার বয়সেই তার বাক শক্তি যায়। সাথে মাও হারায়। মামাকে বললে মামা ওকে এটা সেটা খেলনা দিয়ে বুঝ দিতেন। তিনিতো আর ছোটদের এসবে জোর জবরদস্তি করতে পারেননা।

মামা না থাকলে মামীর কাছে এসে কাঁদলে তিনি প্রথম প্রথম বুঝ দিতেন। কিন্তু কতোদিন পরের মেয়ের এসব সহ্য করবেন.. একসময় তারও বিরক্তি এসে যায়।

আর যখন তা প্রাণেশার প্রতি প্রকাশ করেন, তখন প্রাণেশার আবার আরও কাঁদা ছাড়া উপায় থাকতোনা।

আজ সবার সাথে খেলে, জিতে তার যে কি আনন্দ হচ্ছে। ইশ.. সে যদি বাকিদের মতো একবার খুশিতে চিল্লিয়ে উঠতে পারতো,

সবাইকে শুনিয়ে উল্লাস করতে পারতো, তাহলে আর এক জীবনে কিছু চাওয়ার থাকতোনা।

ওর এসব ভাবনার মধ্যে ইশি এসে ওর দুই বাহু ধরে চিল্লিয়ে উঠে, "গ্রেট ভাবি, ইউ আর গ্রেট।"

"আসলেই! কি শট দিলে তুমি" অয়ন্তিও তাল মেলায়

প্রাণেশা ওদের কথা শুনে হেসে উঠে। ধন্যবাদ বোঝায়।

ছেলেরা ক্লান্ত হয়ে কেউ কোমরে হাত দিয়ে তো কেউ ঘাসের উপর বসে চোখ মুখ কুচকে ওদের দেখছে।

মেয়েগুলো এমন করছে যেনো ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছে। সামান্য ব্যাডমিন্টনই তো। এতো উল্লাসের কি আছে।

"উল্লাস এমন করছিস যেন ওয়ার্ল্ড কাপ জিতেছিস। এতো চিল্লানোর কি আছে? সামান্য ব্যাডমিন্টনই তো।" ইরফান

অয়ন্তি ওর কথা শুনে চওড়া হয়।

"হ্যাঁ, আমরা জিতেছি বলে সামান্য। নিজেরা জিতলে ঠিকই ব্যাঙ্গাতে আমাদের। এখন আমরা জিতেছি বলে তোমাদের সামান্য লাগছে।"

"একটা কক তিন র‍্যাকেট ঘুরে পড়তে পড়তে বাঁচিয়েছিস। এমন কোনো হিরোইক মুভ ছিলোনা ওকে? মরতে মরতে বেচেছে ওটা" মাহাদ

"মরতে মরতে বেচেছে ওটাই হিরোইক মুভ ভাইয়া। উল্টাপাল্টা কথা বলবিনা" মেহেরিন

"হেরে গিয়ে মাহাদ ভাইয়ের মাথার তার ছিঁড়ে গিয়েছে রে মেহেরিন। তাই উল্টা পাল্টা বকছে।" অয়ন্তি

মাহাদ প্রতিউত্তরে আর কিছু বলেনা। বোনেদের কাছে হার মেনে নেই।

প্রাণেশা এসে মাদুরে বসে। ওখানে অন্তিকও আগে থেকে বসে আছে। প্রাণেশা তাকে অতো খেয়াল করেনি।

পানির বোতল নিয়ে পানি খেয়ে সুন্দর করে বসে সে।

অন্তিক ওখানে বসে ওদের খেলা দেখছিলো। প্রাণেশাকেই খেয়াল করেছে সে শুরু থেকে। মেয়েটা খুব উৎসুক ছিলো খেলা নিয়ে। তবে আগ বাড়িয়ে একবারো কক ছুড়েনি।

অন্তিক স্পষ্ট দেখেছে ওর চোখে মুখে দ্বিধা। র‍্যাকেট হাতে নিয়ে যখন আগ্রহী তবে দ্বিধাভরা চোখে তাকিয়ে ছিলো, হালকা পায়ে এদিক সেদিক ছুটতে চাইছিলো -তখন কি যে মিষ্টি দেখাচ্ছিলো মেয়েটাকে।

অন্তিকের কাছে কোনো পরীর চেয়ে কম লাগেনি। আকাশী রঙা গাউন পড়নে। ওটা ওর ফর্সা গাঁয়ে বেশ মানিয়েছে। কালো কালো লম্বা চুল, একটা আকাশী রঙের ফুলের ক্লিপও লাগিয়েছে পেছনে।

অন্তিক নিঃসন্ধেহে স্বীকার করতে বাধ্য, এমন সুন্দর দৃশ্য সে আগে কখনো দেখেনি।

"ব্যাডমিন্টন তো ভালোই পারো। আমাকে একদিন শেখাবে নাকি?" অন্তিক

প্রাণেশা অন্তিকের কথা শুনে তার দিকে তাকায়। সে কিছু বলেনা, অন্তিক তাকে ব্যাঙ্গ করছে নাকি আসলেই শিখতে চাইছে বোঝার চেষ্টা করে। কিন্তু তেমন কিছুই ধরতে পারেনা অন্তিকের মুখ দেখে।

তাই কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেবে তার আগেই অন্তিকের কাঁধের উপর দিয়ে তার পেছনে চোখ যায়। হ্রদটার একদম পাশ ঘেষে দাঁড়ানো একটা গাছে দোলনা বাঁধা আছে।

সে আস্তে আস্তে উঠে কিছুটা সামনে এগিয়ে দূর থেকে ওটা দেখে। তারা যেখানে নিজেদের পিকনিকের আসর সাজিয়েছে সেটা হ্রদের তীর থেকে কিছুটা উপরে। আর প্রাণেশা সেখানেরই শেষ প্রান্তে দাড়িয়েছে।

সে হঠাৎ হালকা পায়ে দৌড়ে নিচে নেমে ওখানে যেতে থাকে। গিয়ে গাছটা ডিঙিয়ে ওপাশে দোলনার কাছে যায়।

এখানে বসে দোল খেলে পেছন থেকে সামনে যাওয়ার সময় একদম হ্রদের উপর থেকে ঘুরে আসবে সেটা। ভেবেই তার ভয় লাগে। যদি সে পানিতে পড়ে যায় দোলনা ছিঁড়ে।

কিন্তু তাও তার ইচ্ছে করছে দোলনায় চড়তে। সে ওটাই বসে পড়ে। তবে পা মাটিতে লাগিয়ে মৃদু দোল খেতে খেতে বসে থাকে। বেশি জোরে দোল খায়না।

হালকা দোল খেতে খেতে চারপাশটা দেখে নেই। এতো সুন্দর আর মনোরম এই পরিবেশটা। যে কারো থেকে যেতে মন চাইবে। হালকা বাতাসে তার চুল উড়ছে। সে একহাতে মুখের উপর থেকে চুল সরায়,

কিন্তু হঠাৎ মনে হলো তাকে পেছন থেকে কেউ ধরে একদম নিজের সাথে আঁটকে রেখেছে। এতোক্ষণ যে মৃদু দোল খাচ্ছিলো সেটাও আর নেই। সে ভয় পেয়ে পেছনে তাকায়, ওমনি অন্তিকের মুখটা ভেসে উঠে চোখের সামনে।

অন্তিক ওকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে চোখের ইশারায় কি জিজ্ঞেস করে।

"ছাড়ুন" প্রাণেশা অন্তিককে হাতের ইশারায় দূরে ঠেলে বোঝায়।

অন্তিক ওকে উপেক্ষা করে বলে,

"আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে এখানে দোল খেতে চলে এসেছেন ম্যাডাম, এখন যদি আমি আপনাকে এই অপরাধে ঐ হ্রদের মাঝখানে ছেড়ে দেই দোলনাসহ? হুহ? কেমন লাগবে?" ভ্রু উচিয়ে বলে সে।

প্রাণেশা অন্তিকের কথা শুনে একবার সামনে ফিরে শান্ত হ্রদটার দিকে তাকায়। খুব গভীর হবে বোঝায় যাচ্ছে। যারা সাতার পারে তাদের জন্য এখানে কম গভীরতার ওদিকে সাতার কাটা কোনো বড় ব্যাপার না।

কিন্তু সে মোটেও সাতার পারেনা। এখানে একবার পড়লে পানি খেয়ে হাবুডুবু করে মরা ছাড়া কোনো উপায় নেই।

সে অন্তিকের দিকে ফিরে আবার তাকে ছাড়তে বলে।

অন্তিক ওকে ছাড়েনা, বরং আরেকটু শক্ত করে ধরে বলে,

"উত্তর না দিয়ে দোল খেতে আসা হচ্ছিলো কেন?"

"দুঃখিত তার জন্য। তবে আমি ব্যাডমিন্টন তেমন পারিনা। পারলে অবশ্যই শেখাতাম আপনাকে।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

অন্তিক তার এতো সোজা আর অনেস্ট উত্তর শুনে ভ্রু কুচকে তাকায়। তারপর একপলক সামনে গভীর পানির দিকে তাকিয়ে আবার প্রাণেশাকে বলে,

"ভয় পাচ্ছো নাকি? পড়ে যাবে বলে।"

প্রাণেশা অন্তিকের সামনে নিজের দুর্বলতা দেখাতে চাইনা, তাই মাথা নাড়িয়ে না বোঝায়। অন্তিক ওর উত্তর শুনে পেছন থেকে ওর কাঁধের দিকে মাথা নামিয়ে জিজ্ঞেস করে,

"আমার সামনে দুর্বলতা প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছেন ম্যাডাম? ফেলে দেবো বলে?"

প্রাণেশা অন্তিকের কথা শুনে ঘনঘন মাথা নাড়ায়। অন্তিক সেই উত্তরের পরোয়া করেনা। ওর কানের লতির নিচে গলার দিকে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,

"এখন দূর্বলতা জানাতে ভয় পাচ্ছো। কিন্তু একদিন দেখবে তোমার সবচেয়ে বড় দূর্বলতা হবো আমি।"

প্রাণেশা অন্তিকের সেই কথার পিঠে কোনো জবাব দেইনা। তার সারা শরীর শিউরে উঠেছে অন্তিকের সামান্য স্পর্শে।

অন্তিকের হাতদুটো তার কোমরে। পেচিয়ে রেখেছে নিজের সাথে।

সে প্রাণেশাকে হঠাৎ নিজের থেকে একটু আলগা করে বলে,

"তুমি দড়ি ধরে শক্ত করে বসো। আমি দোল দিচ্ছি। কিছু হবেনা, ট্রাস্ট মি।"

প্রাণেশা ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে দোল না দিতে বোঝায়।

কিন্তু অন্তিক ওকে শক্ত করে ধরতে বলে আস্তে করে দোল দেই। বেশি দূর যায়নি। কিন্তু হ্রদ অব্দি পৌছে গিয়েছে গাছটা একদম তীর ঘেষে থাকায়।

প্রাণেশা ভীষণ ভয় পায়। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনোপ্রকার চিৎকার কিংবা শব্দ বের করতে পারেনা নিজের অক্ষমতার কারণে।

অন্তিকও ওর কোনো সাড়া না পেয়ে ভেবে নেই ভয় কেটে গিয়েছে। দোলনাটা ফিরে আসলে সে আরো জোরে দোল দেই। প্রাণেশার মাথা ঘুরছে সামনে এতো পানি দেখে।

তার চোখে হঠাৎ একটা দৃশ্য ভেসে উঠে। সে তার মা আর নানা-নানীর সাথে গাড়িতে। নানাভাই সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে ঘুমাচ্ছে। নানুমনিও ঘুম। সে বাইরের গাড়ি আর গাছপালা গুলো যে দৌড়াচ্ছে তা দেখাচ্ছিলো তার মাকে।

ওমনি কিসের একটা ধাক্কা লেগে তাদের গাড়ি একটা গভীর খালে উল্টে পড়ে যায়। সে নিজেকে গাড়ির ভেতর সারা গাঁয়ে রক্তারক্তি অবস্থায় আবিষ্কার করে। নানুভাই আর নানুমনি সহ ঐ ড্রাইভার আঙ্কেল সিটে রক্তারক্তি অবস্থায় পড়ে আছে। কোনো নড়চড় নেই। তাকে তার মা কোনোভাবে গাড়ির জানালা দিয়ে বের করে গাড়ির উপর বসিয়ে দেই। সে তখন কথা বলতে পারছিলোনা। গলায় কি যেন হয়েছে, খুব ব্যাথা। মাকে তার সাথে উপরে উঠে আসতে বলতে পারেনি। আস্তে আস্তে পানিতে ডুবে যায় তার মা। তার চোখের সামনে।

আবার চোখের সামনে অনেক পানি। তার মা তো তখনই ডুবে গিয়েছিলো। এবার কি সেও ডুবে যাবে? সে তাকে বাচানোর মতো কেউ আছে কি না দেখে পেছনে, চোখ ভরা আকুতি নিয়ে।

অন্তিক ওর দৃষ্টি দেখে থমকে যায়। সে দোলনাসহ ফিরে আসলে থামিয়ে দেই। থামিয়ে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করবে তার আগেই নিজের বুকে ওর অস্তিত্ব বুঝতে পারে।

মেয়েটা কাদঁছে। শব্দ না হলেও ওর গাঁয়ের কাপুনিতে তা স্পষ্ট। অন্তিক ওর হঠাৎ কি হলো বুঝতে না পারলেও আগলে নেই।

"কি হয়েছে প্রাণো? কাঁদছো কেন?"

প্রাণেশা কিছু বলেনা। বলার মতো অবস্থায় নেই সে। কাঁদতে থাকে আরো।

অন্তিক অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে,

"আরেহ কি সমস্যা তোমার? কি হয়েছে? এভাবে কাদঁছো কেন? ভয় পেয়েছো? আমিতো এখানেই আছি, দেখো? ভয় পাওয়ার কি আছে।"

প্রাণেশা শান্ত হচ্ছেনা। অন্তিক ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দেই। নিজের সাথে আগলে নেই গভীরভাবে।

"বোকা মেয়ে। আমি তোমাকে পড়তে দিতাম নাকি? এভাবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কান্না থামাও।"

কিছুক্ষণের মধ্যে প্রাণেশা নিজেকে সামলে কান্না থামায়। কিন্তু অন্তিককে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ওর বাহু থেকে ছাড়িয়ে নেই।

লোকটাকে বারবার না করার পরও তাকে ভয় দেখাতে ওখানে পাঠিয়েছে। কি জানি মে রে ফেলতে চেয়েছে কিনা ঐ পানিতে ফেলে।

বারবার তাকে নানানভাবে শায়েস্তা করে শান্তি পায়। সে ঘৃণাভরা দৃষ্টিতে অন্তিকের দিকে তাকায়। রাগে ক্ষোভে ওর নরম নরম হাতে অন্তিকের বুকে দুই/তিন টা কিল-ঘুষি মেরে দেই।

অন্তিক প্রথমে হতবম্ব হলেও পরে ওকে হাত ধরে আঁটকে নেই।

"কি সমস্যা তোমার বলবে তো আমাকে। নাহলে কিভাবে বুঝবো আমি? এই কাঁদছ তো এই রাগছ।"

প্রাণেশা আবার ওর দিকে ঘৃণাভরা দৃষ্টি ছুড়ে ওখান থেকে চলে যেতে নেই।

কিন্তু অন্তিক ওর সেই দৃষ্টি নিতে পারেনা। ওর এক হাত ধরে আঁটকে নেই।

"এভাবে তাকাবেনা মেয়ে। কি হয়েছে বলো। ভয় পেয়েছ? নাকি অন্য কোনো সমস্যা আমাকে বলো। না বলে এখান থেকে এক পাও নড়বেনা।"

"আমার আপনার সাথে কোনো কথা নেই, ছাড়ুন।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)

অন্তিক ওর কথা বুঝতে পারে।

"তোমার সব কথা আমার সাথেই। একথা তাড়াতাড়ি মাথায় ঢুকিয়ে নাও।" তারপর প্রাণেশার গালে হাত রেখে বলে,

"এবার বলো কেঁদেছো কেন? ভয় পেয়েছো?"

অন্তিকের আদুরে স্বর শুনে প্রাণেশা তার দিকে তাকায়। তারপর চোখের পলক ফেলে বোঝায় "হ্যাঁ"

অন্তিক ওর ইশারা বুঝে আবার জিজ্ঞেস করে,

"আমি তোমাকে ইচ্ছে করে ভয় দেখিয়েছি, ফেলে দিতে চেয়েছি -এমনটা ভেবেছ?"

প্রাণেশার অতিরিক্ত কান্নার ফলে কিছুক্ষণ পর পর থেকে থেকে কান্নার হেচকি আসছে আপনা-আপনি। তাই সে ওভাবেই আবার চোখের পলক ফেলে হ্যাঁ বোঝায়।

অন্তিক প্রাণেশার জবাব পেয়ে ওকে কাছে টেনে নেই। তারপর ওর চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে সেখানে দুটো চুমু খায় আর বলে,

"সমস্যা নেই। আস্তে আস্তে এই ভাবনা পাল্টে যাবে। এখন আর কেদোনা।"

—————

ইরফান মাহাদরা সবাই প্রাণেশা যেখান থেকে দাড়িয়ে দোলনা পর্যবেক্ষণ করছিলো সেখানে লাইন হয়ে দাড়িয়ে অন্তিক প্রাণেশাকে দেখছে।

ইরফান একজনের আসার অধীর অপেক্ষায় আছে। যাকে অন্তিক এখানে আনার পরিকল্পনা করেছে, তা সে বেশ বুঝতে পেরেছে। তাই বারবার অন্তিকের উপর নজর রাখছিলো সে।

কিন্তু সবার মাঝে হঠাৎ অন্তিককে খুঁজে না পেলে চারদিকে অনুসন্ধানি চোখ বুলাতে গিয়ে এক জায়গায় গিয়ে তার চোখ উল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়।

অন্তিক তার বউয়ের কাছে মা র খাচ্ছে। অন্তিক এতো বড় একজন আইনজীবী হয়ে বউয়ের কাছে নি র্যা তি ত হচ্ছে। ছি ছি!! সে এই দৃশ্য বাকিদের দেখানো থেকে বঞ্চিত করেনা।

সবাইকে ডেকে নিয়ে দেখায়। কিন্তু হঠাৎ অন্তিক প্রাণেশাকে চুমু খেলে সবাই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। স্বামী স্ত্রীর পার্সোনাল মুহূর্ত সিনেমা দেখার মতো লাইন লাগিয়ে দেখলে এমন অপ্রস্তুত পরিস্থিতিতে পড়তে হবেই ইরফান তা জানতো। তাই তার মধ্যে তেমন বিকার দেখা যায়না।

তবে অন্যরা লজ্জ্বা পেয়ে আস্তে আস্তে যার যার মতো কেটে পড়ে। কারণ অন্তিক যদি একবার দেখে নেই ছোট ভাই বোনদের এই কাণ্ড

তাহলে মা র একটাও মাটিতে পড়বেনা।

তাই সবাই কেটে পড়লো সময় থাকতে। মেহেরিনের পাশে গিয়ে সুরসুর করে বসে পড়ে মেয়েরা। মেহেরিন শুরুতেই চলে এসেছিলো। সে শুধু অন্তিককে প্রাণেশা মা র ছে এই দৃশ্যটুকু দেখেই চলে এসেছে।

মেয়েরা চলে গেলে মাহাদ আর দিগন্তও অন্য পাশে চলে যায়।

এদিকে ইরফান দাড়িয়ে দাড়িয়ে ভাবছে, তার লাইন কেটে উকিলের বাচ্চা নিজের লাইন ঠিকই ক্লিয়ার করেছে। যদিও সে বিয়ের কাহিনী জানেনা। তবে শুনেছে তেমন একটা স্বাভাবিক বিয়ে ছিলোনা তার

বন্ধুর। নাহলে সে ছাড়া, তোশাকে ছাড়া, ওদের লাইফের এমন অসংলগ্ন সময়ে অন্তিক অবশ্যই বিয়ের কথা ভাবতোনা।

ইরফান যায় মাহাদ আর দিগন্তের কাছে। অন্তিকের বিয়ের ব্যাপারটা শুনতে।

মৌনপ্রেম পর্ব ২১ গল্পের ছবি