ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি জমে ওঠেনি। হালকা ধোঁয়াটে বাতাসে চারপাশ ঢাকা, যেন রাত আর ভোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে শহরটা। প্রাণেশা লাল-হলুদ মিশ্রণের একটা সালোয়ার কামিজ পড়ে আছে। উড়নাটি গলায় পেছনের দিকে ঝোলানো।
ঘন, কালো চুলগুলো খুব সুদর করে গুছিয়ে পেছনের দিকে ছাড়া। ধীরপায়ে হাঁটছে, পাশে আরশি। আরশির হাতে মোবাইল ফোন। ফোনে কিছু একটা করতে করতে হাঁটছে চুপচাপ। আর প্রাণেশা বরাবরের মতোই চুপ। ওর কাদের টোট ব্যাগে আঁকা আঁকির কিছু সরঞ্জাম।
প্রাণেশা চমৎকার আঁকতে পারে। তার আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়নি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াই ভার। মেয়েটার হাতে সত্যিই কোনো জাদু আছে। রং আর তুলির মাধ্যমে অনুভূতিকে যেন জীবন্ত করে তোলে। ওরা আজ এখানে এসেছে ভোরের ফ্রেশ হাওায়ায় পার্কে বসে আঁকা আঁকি করতেো। বাড়ি থেকে পার্কটি আধ ঘণ্টার পথ।
প্রাণেশা সাধারণত এত আয়োজন করে বাইরে গিয়ে আঁকাআঁকি করে না। নিজের ঘরের এক কোনাই তার চিরচেনা আশ্রয়, সেখানেই প্রকৃতির দৃশ্য হোক বা যেকোনো পরিস্থিতির —সব কিছুই ফুটে ওঠে তার ক্যানভাসে।
তবে আজকের দিনটা অন্যরকম। কারণ আছে এই পার্কে আসার। সেদিন একটা বড় ঝামেলা থেকে আরশিকে বাঁচিয়ে ছিল সে।
আরশি প্রেম করছে। বাড়িতে লুকিয়ে। সেই সম্পর্কের কথা পরিবারে কেউ জানে না। কিন্তু হঠাৎ কোনো একভাবে ব্যাপারটা নিয়ে সন্দেহ জেগেছিল আরশির বাবার মনে। ফলাফল, প্রচণ্ড রকমের ধমক-চোট-পাল্টা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে।
সে সময় প্রাণেশা ঠাণ্ডা মাথায় বুঝিয়ে ছিল, মামীকে পাশে রেখে মামাকে শান্ত করেছিল সে। না হলে আরশির প্রেমের কথা হয়তো সেদিনই ফাঁস হয়ে যেত। এই ঘটনার পর খুশি হয়ে আরশি কথা দিয়েছিল—একদিন সে প্রাণেশাকে একটা সুন্দর জায়গায় গিয়ে আঁকা আঁকির সুযোগ করে দেবে। ঠিক সেই কারণেই আজকের এই পার্কে আসা।
দুই বোন হেঁটে হেঁটে এসে পৌঁছায় পার্কে। ভোরের স্নিগ্ধ আলোর মনোরম এক পরিবেশ।
"তুই শুরু কর। আমি আছি, আশেপাশে হাঁটছি। দরকার হলে বলিস।" —আরশি
"ঠিক আছে, আমি ডাকবো দরকার পড়লে। কিন্তু তুমি আশেপাশেই থেকো।" — প্রাণেশা ইশারায় বোঝাল।
"আচ্ছা।" —আরশি বোনের কথা বুঝে জবাব দিয়ে অন্য সাইডে চলে গেলো।
প্রাণেশা আঁকতে শুরু করেছে। গত কালের ওটার বাকিটুকু বাড়িতেই সম্পূর্ণ করে ফেলেছিল রাতে। আজ তার তুলিতে ধরা পড়ছে একেবারে নতুন তবে বাস্তব এক দৃশ্য। ঐযে পার্ক এর বাইরে রাস্তার ধারে লোকটি প্রাইভেট কারের পাশে দাড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।
আর ছোট্ট একটি মেয়ে, না না!! ফুলওয়ালী ফুল নিবে নাকি জিজ্ঞেস করার জন্য মুখিয়ে আছে? সেই মনোরম দৃশ্যটি-ই প্রানেশা তার ক্যানভাস এ ফুটিয়ে তুলছে। সে দৃশ্য টুকু মস্তিস্কে ধারন করে ক্যানভাসে মনোযোগ দিলো।
_______________
অন্তিক এখন দাঁড়িয়ে আছে একটি পার্কের সামনে। আশেপাশে মানুষজন খুব কম। পড়ুয়াদের দেখা যাওয়ার কথা এই সময়। কিন্তু অফ-ডে হওয়াতে প্রায় জনশুন্য হয়ে আছে।
ফোনে কারো সঙ্গে কথা বলছে সে। খুব মনোযোগ দিয়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কিছু। ড্রাইভার কে সাথে নিয়ে আসেনি। নীলয়কে নিয়ে চলমান কেইসের বিষয়ে জরুরি কিছু কাজ সারতে এসেছে। তাদের কেইসের সঙ্গে সম্পর্কিত এক জনের সঙ্গে দেখা করার কথা এখানে। যার কাছ থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। নিলয় তার খুঁজেই এদিক-সেদিক ঘুরছে।
আর অন্তিক ফোনে কথা বলছে। এমন সময় সে খেয়াল করে পাশে ছোট একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো কিছু বলতে চাইছে। এই ভেবে কথা শেষ করে সে তার দিকে ফিরে তাকালো।
"কি চায় বাবু? কিছু বলবে?"
"ফুল নিবেন আংকেল?"
এটা শুনে অন্তিক চোখ ছোট ছোট করে তাকালো মেয়েটার দিকে। তারপর বললো—
"নিতে পারি। তবে তুমি আংকেল ডাকো যে? বেশি বুড়ো দেখায়? হুম?" —ব্রু ঊচিড়ে জিজ্ঞেস করলো অন্তিক।
"না তো, বুড়ো দেখাবে কেন? খুব ভালো দেখায়। বুড়ো দেখালে তো দাদু ডাকতাম, তাই না?" —এই কথা শুনে অন্তিক বেশ মজা পেল বলে মনে হলো।
সে খানিকটা হেয়ালি করে বললো -
"আচ্ছা?? বুড়ো দেখালে দাদু ডাকতে?? তা, ভাইয়া ডাকবে কেমন দেখালে?"
"আমার ভাইয়ের মতো ইস্কুলে গেলে ভাইয়া ডাকতাম। আপনাকে তো ইস্কুলে যাওয়ার মতো মনে হয় না। আপনাকে ইস্কুলে মাস্টারদের মতো মনে হয়।"
"বুঝলাম। ফুল কত করে দিবে?"
"পুরো গোছা ১০০ টাকা। একটা করে নিলে ১৫ টাকা।"
"ঠিক আছে, পুরোটা দাও।"
মেয়েটা পুরো গোছা দিলে অন্তিক তার হাতে একটা দুইশ টাকার নোট ধরিয়ে দেই। মেয়েটা বাকি টাকা ফেরত দিতে চাইলে অন্তিক মানা করে দেই। মেয়েটাও খুশি হয়ে চলে যায়। ততক্ষণে নীলয় এসে দাড়ায় পাশে। অন্তিক জিজ্ঞেস করে —
"পেলে?"
"না স্যার। লোকটা মাত্র কল দিয়ে বললো তার ছয় মাসের বাচ্চা মেয়ের নাকি সকালে হঠাৎ জ্বর উঠেছে। তাই আসতে দেরি হচ্ছে।
তবে এসে পড়বে দ্রুত। আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বললো।" তারপর আঙ্গুল দিয়ে পাশের পার্কটির দিকে ইশারা করে বললো — "স্যার, ঐ পার্কটাতে বসি?"
অন্তিক একটু বিরক্তিসুচক শব্দ প্রকাশ করে চোখ মুখ কুচকে বললো —
"এখন কি মেয়ে মানুষের মতো পার্কে গিয়ে বসে থাকবো? অদ্ভুদ কথা বলো নীলয়।"
নীলয় একটু লজ্জ্বা পেলো।
"স্যার, ওইদিকে একটা ছোট ক্যাফে আছে। ওখানে গিয়ে বসে অপেক্ষা করি তাহলে।"
"ঠিক আছে চলো।"
দুজনে যেতে নিলে হঠাৎ গাছপালার ফাক দিয়ে অন্তিকের চোখ যায় পার্কের ভেতরে এক কোণায় একটা রং তুলি দিয়ে আঁকা চিত্রের দিকে। পুরোপুরি আঁকা হয়নি যদিও, তবে দৃশ্যটা অন্তিকের কাছে খুব চেনা মনে হলো। সে অতো মাথা না ঘামিয়ে চলে গেলো নীলয় এর সাথে।
পাশেই ক্যাফেটি। কয়েক মিনিটের পথ। অন্তিক ভাবলো ভোরের এই সময়টাতে জায়গাটা খুব মনোরম। সুন্দর পার্ক, পাশেই ক্যাফে। ইন্ট্রেস্টিং লাগলো খুব।
_____
"প্রাণো, তোর হলে চল, পাশের ক্যাফেতে গিয়ে একটু বসি। নাহিদ আসবে। একটু দেখা করে আসি। সুযোগ যখন আছে।"
প্রাণেশা দ্বিমত করলোনা। সে বোনের সাথে গেলো সব গুছিয়ে। আরশির বয়ফ্রেন্ড নাহিদ আজমির। খুব ভালো ছেলে। আরশিকে খুব ভালোবাসে। প্রায় দুই বছরের সম্পর্ক ওদের। আরশি নতুন নতুন ভার্সিটিতে উঠে নাহিদের সাথে তার দেখা হয়। নাহিদ তখন ফাইনাল ইয়ার এর স্টুডেন্ট আর আরশি ফার্স্ট ইয়ার। সিনিয়র জুনিয়র প্রেম ওদের।
এক বছর চলে যায় আরশিকে ইম্প্রেস করতে করতে। তারপর যখন ভার্সিটি থেকে বিদায় এর পালা, তখন গিয়ে মন গলে আরশির। এখন আরশি থার্ড ইয়ারের ফাইনাল দিবে। আর নাহিদ মাস্টার্স শেষ করে জবে ডুকেছিল। এখন প্রমোশন হয়েছে।
ওরা ডুকলো ক্যাফেতে। নাহিদ এসে বসেছে ইতোমধ্যে। প্রাণেশা বুঝল ওদের দেখা করার প্ল্যান আগে থেকেই।
সে বুঝতে পেরে মৃদু হাসলো, লাভবার্ডদের মধ্যে ভালোবাসা বেশ এই ভেবে। নাহিদ যে টেবিলে আছে ওরা ওখানে গিয়ে বসছে।
নাহিদ সবার আগে আরশির সাথে হাগ করে প্রাণেশা কে বললো —
"প্রাণো, কেমন আছ?"
"আলহামদুলিল্লাহ বেশ আছি। আপনি কেমন আছেন ভাইয়া? — ইশারায় জিজ্ঞেস করলো প্রাণেশা।
"আমিতো বিন্দাস আছি। তোমার বোনের সাথে দেখা করতে পেরে আরও ভালো। দেখো তো, তোমার উসিলায় তোমার বোনের সাথে দেখা হয়ে গেলো। প্রাণোকে তো জবরদস্ত একটা ট্রিট দিতে হয়। কি বলো আরশি?"
"অবশ্যই। তবে তুমি ওকে ট্রিট দেওয়ার চেয়ে কিছু রং তুলি গিফট করে দিও। এতেই খুশি হয়ে যাবে আমার বোন।"
প্রাণেশা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে আবার বললো —
"আপনারা আগে থেকেই মিট করার প্ল্যান করে এসেছেন আর আমাকে এটা সেটা বলে লজ্জ্বা দিচ্ছেন। আমি বুঝি তো।"
"ইশ রে!! প্রাণো এখন সব বুঝে। বুঝলে আরশি তোমার বোন এখন তোমার আমার চেয়ে অনেক বুঝদ্বার হয়ে গিয়েছে। আমাদের বিয়ের আগেই ওকে বিয়ে পড়িয়ে দিতে হবে, কি বলো?" — নাহিদ রসিকতা করে বললো।
আরশিও হেসে সায় জানালো। এবার প্রাণেশা বেশ লজ্জ্বা পেয়ে ইশারায় বললো —
"আমি তো বিয়ে করবোনা এখন। আমি লেখাপড়া শেষ করে আপনার মতো জব করবো। তারপর আর বিয়ে করবোনা।"
প্রাণেশার কথা বুঝে আরশি চোখ ছোট ছোট করে তাকালো বোনের দিকে। তারপর কিছু বুঝতে পেরেছে এই ভঙ্গিতে দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে চুপ রইলো। তবে নাহিদ চুপ থাকলোনা —
"এ বাবা, বিয়ে না করলে কিভাবে হবে। মেয়েদের জন্ম-ই তো হয় শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার জন্য। ভুল বুঝোনা প্রাণো। তবে কি জানো? একটা ছেলে সারাজীবন বিয়ে না করে থাকতে পারলেও একটা মেয়ে সেটা পারেনা। আমাদের সমাজে মেয়েদের জন্য নানা রকম প্রতিবন্ধকতা থাকে। আরেকটু বড় হও। বুঝতে পারবে সব।"
প্রাণেশা হঠাৎ ইশারায় বলে উঠলো —
"আমিতো এমনিতেও প্রতিবন্ধী ভাইয়া।" —প্রাণেশার কথা বুঝে দুজনেই হঠাৎ থমকে গেলো।
"আচ্ছা এখন এসব কথা থাক। আমরা বরং কিছু একটা অর্ডার করি।" — আরশি।
তিন জনেই সায় জানালো। তারপর তিন জনের জন্য একটা করে স্যান্ডওইচ আর কোল্ড কফি অর্ডার করলো।
পুরোটা সময় অন্তিক পেছন থেকে ওদের তিনজনকে দেখল। বুঝলো মেয়েটি বাক প্রতিবন্ধি। মায়া হলো তার একটু। বয়স হবে হয়তো ১৮/১৯ বছর। মেয়েটির চুলগুলো খুব সুন্দর।
বোঝায় যাচ্ছে মেশিনের টর্চার/কৃত্রিমতার কোনো ছোঁয়া নেই। বেশ সুন্দরী বলে মনে হলো তার।
অন্তিক আর নীলয় লোকটার সাথে কথা শেষ করে চলেই যাচ্ছিল। হঠাৎ নীলয় বললো তার ওয়াশরুম যেতে হবে। তাই নীলয়ের জন্য অপেক্ষা করছিলো বসে বসে। ঠোঁটে রয়েছে সিগারেট।
চেয়ারে গা এলিয়ে স্মোক করতে করতে কিছু একটা ভাবছিল কেইসের ব্যাপারেই। হঠাৎ পাশের টেবিল থেকে আরশি আর নাহিদের কথোপকথন শুনে কথার মধ্যে অসঙ্গতি পেয়ে ওদিকে তাকিয়ে বুঝলো ওখানে তিনজন রয়েছে।
যার মধ্যে একজন বাক প্রতিবন্ধী বলে ওদের কথাগুলো অসঙ্গত লাগছিলো।