ভোরের আকাশ হালকা নীল আর একটু ফ্যাকাশে। দূরের গাছগাছালির ওপর দিয়ে মৃদু বাতাস বইছে। ঘাসের ওপর ছোট ছোট শিশিরবিন্দু ঝলমল করছে, সূর্যের প্রথম আলো যেন ধীরে ধীরে সবকিছুকে সোনালি আভায় ভরিয়ে দিচ্ছে। পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর একরাশ শান্তি।
এসবকিছুর মধ্যে সরোয়ার বাড়ির সকালটা আজ খুব ব্যস্ত আর চঞ্চল। প্রত্যেকে আজ অন্যান্য দিনগুলোর চেয়ে তাড়াতাড়ি উঠেছে।
কারণ আজ পিকনিক ডে। গোছগাছ হয়ে গিয়েছে আগেই। কিন্তু সবার তৈরি হয়ে বের হতেই যতো সময় লাগছে। বাড়ির ছেলেরা সব রেডি। তারা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গাড়িতে তুলছে। আর বাড়ির মেয়েদের তাড়াতাড়ি বের হওয়ার তাগড়া দিচ্ছে। মেয়েগুলো এতো সময় যে কিভাবে লাগায়, একমাত্র তারাই জানে।
ওহ হ্যাঁ, এর মধ্যে আরেকটা দুসংবাদ হচ্ছে বাড়ির বড়রা কেউ যাচ্ছেনা পিকনিকে। মিসেস আয়েশার বোনের হাসব্যান্ড এক্সিডেন্ট করেছেন গতকাল বিকেলে।
তারা স্বামী স্ত্রী আর অন্তিকের দাদী ওখানেই আছে এখনো। জা কে ফেলে দিগন্তের মা যাবেনা পিকনিকে। দুই ভাবিকে ফেলে মাহাদ-মেহেরিনের মাও যাবেনা কোনোভাবেই।
আর নিজেদের বউ বাড়িতে রেখে তাদের স্বামীদেরও যাওয়ার প্রশ্ন আসছেনা। তাই ঠিক করা হয়েছে বাড়ির ছেলেমেয়েরায় যাক নির্দিষ্ট সময়ে। কারণ এতোদিন ধরে করা প্ল্যান হঠাৎ করে ক্যান্সেল হলে তাদের কারো ভালো লাগবেনা। তাই বাড়ির ছেলে মেয়েরা যাবে এটাই ঠিক করা হয়েছে।
মাহাদ আর দিগন্ত দুজন সার্ভেন্ট নিয়ে গাড়িতে সব তোলা শেষ করে ড্রয়িং রুমে আসে। অন্তিকও ছিলো এতক্ষণ। মাত্র রুমে গিয়েছে ফোন নিতে। আসছে হয়তো।
"তোর কোন ভাই আসবে বলেছিলি বোধ হয়, আসবেনা?" -দিগন্ত
"আসবে বলেছিল, কাল বললো ওর কোন ফ্রেন্ড নাকি এক্সিডেন্ট করেছে। তাই আবার ক্যান্সেল করেছে।"
দিগন্ত শুনে মাথা নাড়ায়। তারপর বলে,
"বড়মার বোনের হাসব্যান্ডও এক্সিডেন্ট করেছে, দেখ কোথাও ওটাই কিনা?"
"হবে হয়তো। আমার নিউজ দেখা হয়নি, না ফোন করা হয়েছে। বলতে পারছিনা।"
দিগন্ত মাথা নাড়ায়। তারপর সোফায় গাঁ এলিয়ে বলে,
"কিরে ভাই। এরা একজনও এখনো বের হচ্ছেনা। এতক্ষণ লাগে? পিকনিকে যাচ্ছি নাকি বিয়েতে... অদ্ভুদ!"
মাহাদ ওর কথা শুনে হালকা হাসে।
ওরা দুজনেই শুধু রেডি আছে আপাদত। মাহাদ পড়েছে সাদা গেঞ্জি আর হালকা নীলসবুজ শর্ট স্লিভ শার্ট যার বোতাম খোলা, সাথে হাটু অব্দি খাকি বেজ শর্টস। দিগন্তও সাদা লম্বা স্লিভ শার্ট আর খাকি বেজ প্যান্ট।
দিগন্তের বাবা আর মা এসে বসে তাদের পাশে। উনারা বারবার সাবধান করছেন মেয়েদের দেখেশুনে রাখতে আর ড্রাইভ করার সময় সতর্ক থাকতে।
এর মধ্যে অন্তিককে নিচে নামতে দেখা যায়। সেও বাকি দুই ছেলের মতো সাদা শার্ট আর হালকা খাকি বেজ প্যান্ট পড়েছে। তবে শার্টের উপরের দিকে দুটো বোতাম খোলা।
সে ইরফানকে ফোন দিতে দিতে নামছে।
কাল অন্তিকের তৃণা জড়িত কেইসের শুনানি ছিলো। সকালে তার রুম থেকে প্রাণেশার যাওয়ার পর ঘুমিয়েছে অসময়ে। অনেকগুলো দিন পর শান্তির ঘুম দিয়েছে কি না...
তারপর কোর্টে দ্বিতীয় সেশনে তৃণার কেইসটার সমাপ্তি ঘটিয়ে এসেছে। উহুম, বাড়িতে না। নিজের ব্যক্তিগত ফ্ল্যাটে উঠেছিলো। তবে সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে পারেনি। কারণ এরমধ্যেই শুনে খালুর এক্সিডেন্ট হয়েছে। তবে সে গিয়ে দেখেই চলে এসেছে, ওখানে তার বাবা-মা ছিলো। তাই তার থাকার দরকার পড়েনি। তারপর একেবারে বাড়ি চলে আসে।
অন্তিক নেমে দুই ভাইয়ের পাশে বসে।
তারা বোনদের জন্য অপেক্ষা করছিলো। এর মধ্যে দিথী এসে তার মাকে জানায়, "ভাবি যেতে চাচ্ছেনা আমাদের সাথে পিকনিকে।"
মিসেস তাবিয়াসহ সকলে শুনে দিথীর কথা।
তিনি বলেন,
"যেতে চাচ্ছেনা মানে? তোকে বলেছে?"
"হ্যাঁ। আমারতো রেডি হওয়া শেষ। ভাবির হয়েছে কিনা দেখতে গিয়েছিলাম। দেখি কোনো রেডি হয়নি। তারউপর বলে বড়রা কেউ যাচ্ছেনা তাই তার যেতে ইচ্ছে করছেনা।"
দিথীর কথা শুনে দিগন্ত আর মাহাদ একে অপরের দিকে তাকায়। বুঝতেই পারছে অন্তিকের সাথে কোথাও যেতে ভয় পাচ্ছে মেয়েটা। তার উপর বড়রা কেউ সাথে নেই। তবে দিগন্ত কিছু না বললেও মাহাদ বলে,
"আরেহ মামী, বুঝতে পারছোনা? অন্তিক ভাই যাচ্ছে সাথে, তার উপর তোমরা বড়রা কেউ নেই। তাই ভয় পাচ্ছে বেচারি। কখন না জানি টেনে রুমে ঢুকিয়ে টাস করে দরজা লাগিয়ে দেই।"
মাহাদের কথা কেউ ধরতে পারেনি। কিন্তু অন্তিক বুঝে যায় কালকের ঘটনাটা এই বেয়াদবটা দেখে নিয়েছে। সে খুব বিরক্ত হয়।
এই ছেলের চোখ যেখানে সেখানে থাকবে। চোখ নয় যেন সিসিটিভি।
মিসেস তাবিয়া ছেলেমেয়েদের কথা শুনে বলেন,
"আচ্ছা তোরা বস। আমি ওর সাথে কথা বলে আসছি।"
প্রাণেশার ভয় করছে হঠাৎ এভাবে যাবেনা বলায় কোথাও তাকে বকা না খেতে হয় বড়দের কাছে। এমন হলে সে খুব লজ্জ্বায় পড়বে। কিন্তু যেখানে বড়রা কেউ নেই, সেখানে কালকের পর ঐ উকিল সাহেবের সাথে কোথাও যাওয়ার মতো ভুল সে করবেনা।
প্রথমত কাল লোকটা তার সাথে যা করেছে এরপর তার সামনে পড়তে তার অস্বস্তি হচ্ছে, দ্বিতীয়ত সে ওখান থেকে আসার আগে যা করে এসেছে তার জন্য ভয় করছে।
মানুষটা যদি এর জন্য তাকে আবার কোনো শাস্তি দিতে চায়?
মানা না মানা পড়ে আসছে। কিন্তু উকিল সাহেব তার স্বামী হয়। যা করেছে তার অধিকার আছে।
কিন্তু তাই বলে এমন একটা ঝুলে থাকা সম্পর্কের মধ্যেও এসব...
না তাকে পারিবারিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে, না সে নিজে মানে এটা স্বীকার করেছে, আর না তো সামাজিকভাবে এই বিয়ের অস্তিত্ব আছে।
তাহলে যতোই অধিকার থাকুক, সে যা প্রতিক্রিয়া দিয়েছে তাতে ভুল কিছু করেনি মোটেই। নিজের সুবিধা মতো তো বিয়ের ফায়দা তুলতে পারেনা চাইলেই। স্বীকৃতি দিলে সব ভাবেই দিতে হবে।
কিন্তু কালকের পর প্রাণেশার চোখে অন্তিক যেন আরো নিচে নেমে গেলো।
এর মধ্যে দিগন্তের মা প্রবেশ করে তার রুমে। তিনি এসে প্রাণেশার কাছে না যাওয়ার কারণ জানতে চান।
প্রাণেশা বোঝায় তার ভালো লাগছেনা, বড়রা কেউ নেই। তাই মন টানছেনা যেতে।
প্রাণেশার কথা বুঝে তিনি বলেন,
"তুমি যাওনি জানলে তোমার শাশুরি মা রাগ করবে। আমাকে জিজ্ঞেস করবে তার ছেলে বউকে পাঠালাম না কেনো। তুমি বরং তার সাথেই কথা বলে নাও।"
তিনি জা কে ফোন দেন। কয়েক সেকেন্ড পরই রিসিভ হয়।
"হ্যালো, ভাবি বলছো.."
"হ্যাঁ বল। আমিই। ছেলেমেয়েরা বের হয়ে পড়েছে?"
"বের হয়নি এখনো। তোমার ছেলে বউ বলছে সে যাবেনা পিকনিকে। তাই তোমাকে ফোন লাগালাম। পরে তো বলবে তোমাকে জানালাম না কেন...নাও এবার তুমি বোঝাও তাকে।"
"যাবেনা মানে? কি সমস্যা ওর? অসুস্থ বোধ করছে নাকি?"
"না, অসুস্থ না। তবে যতোটুকু বুঝতে পারছি আমরা বড়রা কেউ যাচ্ছিনা বলে সে তোমার ছেলেকে ভয় পাচ্ছে। তাই যেতে চাচ্ছেনা।"
একথা শুনে তিনি ফোন কেটে দেন। তারপর ২ সেকেন্ড পর আবার কল আসে, ভিডিও কল।
প্রাণেশা এতোক্ষণ দুই শাশুরির কথা শুনছিলো ভয়ে ভয়ে। শাশুরির হঠাৎ কল কেটে আবার ভিডিও কল দেওয়ায় তার ভয়টা দ্বীগুণ হয়। এবার বকা শুনবে নিশ্চিত।
"কি সমস্যা তোর? আমার ছেলেকে ভয় পাচ্ছিস?"
প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে অসহায় ভঙ্গিতে না বোঝায়। কিন্তু ওর মিথ্যা মিসেস আয়েশার কাছে লুকাতে পারেনা। তিনি বেশ বুঝতে পেরেছেন মেয়েটা এখনো তার ছেলেকে ভয় পাচ্ছে। কি ভাবে যে এই ভয় ভাঙাবেন তিনি বুঝতে পারেননা। তবে সেদিন তো বুঝিয়েছিলেন অন্তিককে। আর সেও শুনেছিলো সব। দ্বীমত করেনি যখন নিশ্চয় এখন আর মেয়েটার সাথে বাজে ব্যবহার করবেনা। উল্টে ছেলের চোখে তিনি অন্যকিছু দেখেছেন। এই সময়ে যদি সব ঠিক করে ফেলা যায় তো এর চেয়ে ভালো বোধ হয় আর কিছু হবেনা। কিন্তু মেয়েটা এভাবে অন্তিকের থেকে দূরে দূরে থাকলে সেটা কিভাবে সম্ভব...
ভয় কাঁটাতে হবে, দুজনকে কাছাকাছি থাকতে হবে। একে অপরকে জানলে বুঝলে তবেই না সম্পর্ক এগোবে।
তিনি বলেন,
"শোন, অন্তিক কিছু করবেনা তোকে। আমি তাকে বুঝিয়ে বলবো। আর তাছাড়া শুধু তোরা দুজন যাচ্ছিস এমন তো আর না.. অয়ন্তি, ইশি, দিথী ওরাও আছে। দিগন্ত, মাহাদ, মেহেরিন সবাই তো আছে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অয়ন্তিকে আমি বলে দেবো যাতে তোর সাথে সাথে থাকে। আর তোর বরের এক বন্ধুও যাবে। দেখবি সে তার বন্ধুর সাথেই ব্যস্ত থাকবে। তাই এতো ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আর আমার কথা শেষ কথা। কোনো বাহানা অযুহাত শুনতে চাচ্ছিনা। রেডি হয়ে নে।"
প্রাণেশা শাশুরির কড়া আদেশ শুনে আর কিছু বলতে পারেনা। কোনো উপায় না পেয়ে আলমারি থেকে একটা ড্রেস বের করে পড়ে নেই।
ততোক্ষণে মিসেস তাবিয়া ফোনে জার সাথে কথা বলতে বলতে চলে গিয়েছেন।
——————
ইরফান এসেছে সরোয়ার বাড়িতে। তাকে পেয়ে বাড়ির বড়রা সহ ছেলেমেয়েরাও খুব খুশি। দীর্ঘদিন পর দেখা কি না!!
সে এবার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে রিহ্যাবিটেশন থেকে। আগের মতো আর কথায় কথায় রেগে যাওয়ার স্বভাব, বেপরোয়া স্বভাব -এসব কোনো কিছুই তেমন একটা দেখা যায়না। বেশ পরিবর্তন এসেছে। তার এতো পরিবর্তন দেখে সবাই অবাক। আগে কথাবার্তায় একটা উগ্র ভাব ছিলো, অবশ্য এমন না যে এ বাড়ির বড়দের সাথে কিংবা বাকি ছেলেমেয়েদের সাথে উগ্র ভাবে কথা বলতো। কিন্তু মোটকথা এখন যে ডিসেন্ট ভাইবটা আসছে তার থেকে, এমনটা আগে কখনোই ছিলোনা।
তবে তারা সবাই ইরফানের এই পরিবর্তন দেখে খুব খুশি।
ওরা সবাই এখনো সোফাতেই বসে আছে। তবে এখন মেয়েদেরও দেখা যাচ্ছে।
বোনেরা রিহ্যাবিটেশনের পরিবেশ, খাবার-দাবার এসব কেমন ছিলো তা জানতে চাচ্ছে। ইরফানও খুব সুন্দর করে ধৈর্যের সাথে সবকিছুর উত্তর দিচ্ছে। এটা আগের ইরফান হলে বলতো,
"হে রো ই ন, কো কে ন এসব কিছুদিন খা। তারপর রিহ্যাবিটেশনে যা। সব জানতে পারবি প্র্যাক্টিক্যালি। এখন আমার মাথা খাসনা ময়দা সুন্দরীরা।"
অন্তিক তার বন্ধুকে দেখতে দেখতে এসব ভেবে মৃদু হাসে। তোশাকে এই মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে। সে দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
হঠাৎ দিথী বলে,
"ভাইয়া, তোমাকে এভাবে মানাচ্ছেনা। ত্যাড়া কথা ছাড়া ইরফান ভাই, উহুম কোনোভাবেই যাচ্ছেনা। তুমি ড্রা গ স নেওয়া ছেড়েছো অব্দি ঠিক আছে। বাট এভাবে বদলে গেলে কেনো?" দিথী হতাশ স্বরে বলে।
ওর কথা শুনে দিগন্ত, অন্তিক কড়া চোখে তাকালেও ইরফান খুব জোরে হেসে উঠে।
"শোন দিথীভরি, তোর ভাই আমাকে ওখানে পাঠিয়েছে ভালো হয়ে আসতে। তো ভালো না হয়ে এসে উপায় আছে? নাহলে আমাকে যদি আবার রিহ্যাবিটেশনে পুরে দেই? আমার বুঝি খারাপ লাগবেনা? নাকি তোরা খুশি হবি? আমি কিন্তু আবার তোর ভাইকে ভীষণ ভয় পায়। সত্যি বলছি..." শেষের কথাটা কণ্ঠনালিতে হাত ছুঁইয়ে বলে ইরফান।
ইরফান ভাইয়া কাউকে ভয় পায় এটাই অবাক হওয়ার মতো বিষয়। সেখানে আবার মুখে স্বীকারও করছে। সে যাকগে। ভাবিটা আসলেই রওনা দিবে সবাই - ভেবে দিথী চলে যায় প্রাণেশাকে ডেকে আনতে।
অন্তিক শুরু থেকেই ইরফানের কথাবার্তা, ভাবভঙ্গি সব খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো। এই ছেলে কয়েকমাস আগেও কতো জ্বালিয়েছে তাকে, তোশাকে। জ্বালিয়ে খেয়েছে বলতে গেলে। আর এখন কতো ইনোসেন্টভাবে তার ভাই বোনদের সাথে কথা বলছে, গল্প করছে। কখনো যে এই ছেলেটার মুখের ভাষা নর্দমার কীটের চেয়েও জগন্য ছিলো, তা বোঝার উপায় নেই। আসলেই কি এতোটা পরিবর্তন সম্ভব ইরফানের দ্বারা? নাকি তার কোথাও ভুল হচ্ছে...
দিথীকে বলা কথাটা শুনে তার কেন জানি মনে হলো তার বন্ধু মনে মনে তার প্রতি অভিমান-অভিযোগ পুষে রেখেছে। কিন্তু সে আর কিছু ভাববে তার আগে খেয়াল করে দুতলা থেকে মেনি বেড়ালটা আসছে। সেবার তাকে কিছু বলতে না পেরে ঠোঁটে কামড়ে দিয়েছিলো। আবার কালকে থুথু ছুড়ে পালিয়েছে।
সে কিছু করলে বাচ্চাদের মতো কামড়া-কামড়ি, থুথু ছুড়াছুড়ি করার সাহস রাখে, আবার নাকি তাকে ভয় পেয়ে পিকনিকে যেতে যাচ্ছিলোনা। একথা ভেবে অন্তিক বিদ্রুপ করে হাসে...
প্রাণেশা উপর থেকে একপলক অন্তিককে দেখে দিথীর পেছন বরাবর হাটঁতে থাকে। অন্তিক বুঝতে পারে, সে মেয়েটাকে দেখছে এটা বুঝতে পেরেই লুকিয়েছে।
এর মধ্যে সে খেয়াল করে তার কল্পনার মেনি বেড়ালের সাথে প্রাণেশার আজকের ড্রেসআপ খাপে খাপ যায়। সে সোফায় গাঁ এলিয়ে বসেছিলো। ওভাবেই মাথাটা ঘাড়ের দিকে সামান্য হেলিয়ে ওকে আপাদমস্তক দেখে। হু, আসলেই যায়। ওর কল্পনার আসল মেনি বেড়ালটা আর আজকের প্রাণেশা দেখতে একই।
দিথীর পেছন পেছন প্রাণেশা এসে ইশির পাশে গিয়ে দাড়ায়।
মিসেস তাবিয়া ইরফানের জন্য নাস্তা এনেছেন, ওসব না খাইয়ে ছাড়ছেননা। তাই সবাই বসে আছে আপাদত।
সবাই যার যার নিজস্ব কাজে আর গল্পে মগ্ন। ইশি, দিথী ছবি তুলতে সরে যায় প্রাণেশার পাশ থেকে। সে একা হয়ে পড়ে। অন্তিক যেন ওকে আপাদমস্তক আবার দেখার সুযোগ পেয়ে বসলো, তা মিসও দিলোনা। একেবারে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে উপর থেকে নিচ আপাদমস্তক আবার ওকেই দেখছে। এতে মেয়েটার যে অস্বস্তি হচ্ছে তাতে বিন্দুমাত্র সন্ধেহ নেই।
সে হোক, আজ সারাটাদিন তো পড়েই আছে। এতো তাড়াতাড়ি নুইয়ে পড়লে হবে?
———————
সবাই এখন গাড়িতে উঠেছে। ওরা কেও বাড়ির কার -এ যাচ্ছেনা। কার -এ হলে ২ টা লাগবে। তাও কোনো একটাতে গাদাগাদি হবে শিউর। আর পিকনিকে যাওয়ার সময় আলাদা আলাদা গেলে মজা লাগবেনা। তাই 9 সিটারের Toyota HiAce- ভাড়া করেছে দিগন্ত। ড্রাইভিং করছে অন্তিক আর তার পাশে ইরফান।
একদম পেছনের সিটগুলোতে আছে প্রাণেশা, ইশি, দিথী আর মেহেরিন। আর তার সামনে অয়ন্তি, মাহাদ আর দিগন্ত। পেছনে ইশি আর দিথী নানান গল্প করছে, ওখানে গিয়ে কি কি করবে, কিভাবে কিভাবে ছবি তুলবে, ছবি ঠিকঠাক তুলে না দিলে খবর আছে -এরকম আরো নানান কিছু হচ্ছে তাদের গল্পের বিষয়বস্তু। মাঝে মাঝে প্রাণেশা আর মেহেরিনকে এটা সেটা জিজ্ঞেস করছে। সামনে থেকে অয়ন্তিও যোগ দিচ্ছে ওদের সাথে।
দিগন্ত মাহাদের সাথে গল্প করছে, তবে ওর পুরো ধ্যান পেছনে ইশিতে।
"শোন, তোশা মেয়েটার সাথে কি এখন আর যোগাযোগ নেই ওদের? মানে এসেছে অব্দি একবারো মেয়েটার নাম মুখে নিতে শুনলামনা। কিন্তু ও এদের দুইজনের খুব ক্লোজ ছিলো যতোটুকু মনে পড়ে। আচ্ছা ওর কি বিয়ে হয়েছে, নাকি এখনো আনম্যারেড?" মাহাদ
"হ্যাঁ"
"বিয়ে হয়ে গিয়েছে?"
"হু? কিছু বলছিস?"
মাহাদ নিচু স্বরে দিগন্তকে জিজ্ঞেস করেছিলো কথাগুলো। দৃষ্টি সামনে রেখেই। কিন্তু বুঝলো মিস্টার মজনু লায়লাতে মগ্ন।
পেছনে ইশিকে একবার দেখে নিয়ে বলে,
"আমার বোনটাকে এবার রেহায় দে, মেয়েটা তোর নজর খেয়ে খেয়েই শুকিয়ে যাবে একদিন দেখে নিস। কার সামনে আছিস, কোথায় আছিস তার ঠিক নেই -চোখ শুধু ওখানেই। যত্তসব!! মানুষ আর কাউকে ভালোবাসেনা, শুধু তুই-ই বাসিস।"
ততোক্ষণে দিগন্তের ধ্যান ছুটেছে। মাহাদের কথা শুনে সে বলে,
"যেদিন ভালোবাসবি সেদিন বুঝবি, দেখে দেখেও কিভাবে তৃষ্ণা মেটানো যায়। বিশ্বাস কর চোখের সামনে পুরো দুনিয়া দেখার সুযোগ থাকলেও নজর শুধু ওতেই আটকাবে।"
"মজনু মার্কা কথা বলিসনা সিঙ্গেলদের সামনে। বুকে জ্বালা হয়।"
মাহাদের কথা শুনে সে মৃদু হাসে। আর কিছু বলেনা।
অয়ন্তি জানালা দিয়ে হাত বের করে হাতে হাওয়া লাগাতে চাচ্ছিল। কিন্তু হাতটা জানালাতে রাখবে তার আগেই মাহাদ ধরে নেই। সে বিরক্ত হয়ে তাকায় মাহাদের দিকে। মাহাদ ও তাকাতেই ভ্রু উচিয়ে কি জিজ্ঞেস করে?
ওর বিপরীতে অয়ন্তিও জিজ্ঞেস করে, "কি?"
"এই স্বভাব এখনো যায়নি?" মাহাদ
অয়ন্তি ওর কথা বুঝতে পারেনি। বোঝার চেষ্টাও করেনা আর। তার হাত ধরে নেওয়ায় সে যথেষ্ট বিরক্ত। মাহাদের কথা উপেক্ষা করে সে বলে,
"হাতটা ধরে নিলে কেন? কি সমস্যা?"
"এখনো বাচ্চা থেকে গিয়েছিস? দুইদিন পর বিয়ে হলে নিজেই বাচ্চার মা হবি।"
"কোথা থেকে কিসের কথা বলছো? হাতটা ছাড়োতো। আমাকে আর আমার বাচ্চাকে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবেনা।"
"এই হাত আর ছাড়ছিনা। গাঁয়ে হাওয়া লাগানোর শখ থাকলে ওখানে পৌছে তারপর লাগাস। এখন আমার পাশে ভদ্র হয়ে থাক। পরে কিছু হলে তোর বাপ ভাই আমাকে এসে বলবে আমি থাকার পরও তাদের মেয়ের হাত ভাঙে
কিভাবে? আমাকেও না জানি তারপর কোন রিহ্যাবিটেশনে ঢুকিয়ে নেই।"
অয়ন্তি মাহাদের কথা শুনে একবার সামনে তার ভাইয়া আর ইরফান ভাইকে দেখে নেই। ইরফান ভাই কানে হেডফোন গুঁজে চোখ বন্ধ করে আছে। আর তার ভাইয়া ড্রাইভিং করছে মনোযোগ দিয়ে। সে মাহাদের একটু কাছ ঘেষে তার ভাই যাতে শুনতে না পায় তাই নিচু স্বরে বলে,
"আমার ভাইয়া আর বাবাকে যে কথায় কথায় খোটা দাও, যেদিন বলে দেবো সেদিন বুঝবে। এখন আমার হাত ছাড়ো নাহলে দেখবে তোমার বিলেতি গার্লফ্রেন্ড আবার আমার হাত ধরেছো বলে ভ্যা ভ্যা শুরু করবে। তার তো আবার তোমার সাথে আত্মিক বন্ধন। তুমি কারো দিকে তাকালেও সে বুঝে যায়। টুরু লাভ কি না..."
মাহাদ অয়ন্তির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। মেয়েটা নিশ্চয় কাল ওর ফোনে এলাইনার সাথে কথা বলা শুনে নিয়েছে। তাই এভাবে ব্যাঙ্গ করছে।
"লুকিয়ে লুকিয়ে মানুষের কথা শুনিস। এতো বড় হলি অথচ ম্যানার্স শিখলিনা। তোর বাপ ভাই আর শিখিয়েছে কি এতো বছরে?"
"কথায় কথায় আমার বাবা আর ভাইয়াকে টানবেনা মাহাদ ভাই। তোমার কথা হচ্ছে আমার সাথে। আমাকে বলো যা বলার। আর তারা আমাকে ম্যনার্স না শেখালেও ফোনে ছেলেদের সাথে লুতুপুতু না করতে বেশ শিখিয়েছে। তাই ওদিকে তো নাই যাও।"
"তো তুই বলতে চাচ্ছিস তোর বাপ ভাইকে না টেনে তোকে টানতে। নে টানলাম।" বলে মাহাদ অয়ন্তির মাথার চুল গুলোতে হালকা টান দেই। অয়ন্তি চুলে টান খেয়ে ওর দিকে ঝুঁকে যায়। একহাত দিয়ে চুলগুলো ধরে মাথা উচিয়ে মাহাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
"তোমার ঐ বিলেতি শাকচুন্নির চুল টানো গিয়ে এতোই চুল টানতে ইচ্ছে করলে। আমার চুল কেনো টানছো?"
"ঐ বিলেতি শাকচুন্নি আমার গার্লফ্রেন্ড না। জাস্ট ফ্রেন্ড হয়।"
"হ্যাঁ, জাস্ট ফ্রেন্ড বলে বোনেদের সাথে পিক আপ দিলেও তার ভ্যা ভ্যা করে কাঁদে।"
"আমি জাস্ট ফ্রেন্ড ভাবলেও ও আমাকে ভালোবাসে। তাই এমন করেছে। আর ও কি জানে নাকি যে মেহেরিন ছাড়াও আরও বোন আছে আমার।"
"আমাকে উল্লু বানাতে আসবেনা। আমি সব শুনেছি মেয়েটা আমরা তোমার মামাতো বোন হই জেনে আরও বেশি হাইপার হয়ে গিয়েছিলো। আর কি কি বলেছেও শুনেছি।
"শুনেছিস ভালো কথা। এখন চুপ থাক। বলেছি তো আমি জাস্ট ফ্রেন্ড ভাবি ওকে।"
"তোমাদের ওখানে জাস্ট ফ্রেন্ডের নমুনা যে কেমন তা ভালোই জানা আছে। তাই আমার সাথে জাস্ট ফ্রেন্ড বলে ফ্লেক্স নিতে আসবেনা একদম। ফুফুকে জানিয়ে দিলে তারপর বুঝবে।"
"আচ্ছা দরিবাজ মেয়ে তো তুই..এখানে মায়ের কথা আসছে কেন? আর জাস্ট ফ্রেন্ডের নমুনা যে জানা আছে বলছিস, আমাকেও জানা কেমন নমুনা! আমিতো তোর মতো এতোকিছু বুঝিনা। চল আজকে থেকে তুই আর আমি জাস্ট ফ্রেন্ড। আমাকে তুই আমাদের ওখানে জাস্ট ফ্রেন্ডেরা কেমন হয় তা শেখাবি আজকে থেকে। রাজী?" অয়ন্তির চেহারায় চোখ রেখে কথাগুলো বলে মাহাদ।
তবে অয়ন্তি সামনের দিকে তাকিয়ে ছিলো। মাহাদের কথা শুনে তার গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠে। মাহাদ তা বুঝতে পারে। এরপর আর অয়ন্তি মাহাদের সাথে কথা বাড়ায়নি। তাদের কথাগুলো এতদূর অব্দি গড়ানো উচিত হয়নি। আর বেশি এগালে সীমা অতিক্রম হবে। তাই চুপ থাকায় ভালো। মাহাদও আর কথা বাড়ায়নি, তবে বুঝতে পেরেছে এরপর সারাটাপথ অয়ন্তির তার পাশে বসে জার্নি করতে অস্বস্তি হয়েছে।
মাহাদের আফসোস হয়। সে একটু অতিরিক্ত বলে ফেলেছে। মেয়েটাকে এভাবে অস্বস্তিকর কথা বলা তার উচিত হয়নি একেবারেই। অয়ন্তি হয়তো এবার থেকে আগের মতো আর তার সাথে স্বাভাবিক ভাবে কথাও বলতে পারবেনা।
মাহাদ ভাবে এই ট্রিপ শেষ হওয়ার আগেই তাকে অয়ন্তির সাথে কথা বলে সব স্বাভাবিক করতে হবে।
—————————
টানা ৩ ঘণ্টা জার্নি করে ওরা পৌছেছে একটা রিসোর্টে। বুক করে রেখেছিলো আগে থেকেই।
তবে যেহেতু রাত কাটানোর পরিকল্পনা নেই তাই মেয়েদের জন্য একটা আর ছেলেদের জন্য একটা রুম বুক করেছে শুধু। জার্নি করে এসে একটু রেস্ট নেওয়ার উদ্দেশ্যেই।
যাদের ফ্রেশ হওয়ার প্রয়োজন আছে তারা ফ্রেশ হয়ে নেই, আর বাকিরা রেস্ট নিচ্ছে তো কেউ রিসোর্ট ঘুরে দেখতে চাইছে।
অন্তিক ওয়াশরুম থেকে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বাইরে আসে। ভাইদের একটাকেও দেখা যাচ্ছেনা। রিসোর্ট ঘুরে দেখছে হয়তো। তবে ইরফান ওদের সাথে গিয়েছে কিনা জানতে সে কল লাগায়। রিসিভ হচ্ছেনা।
সে বাইরে এসে এদিক সেদিক মাথা ঘুরিয়ে কাউকে দেখতে পায় কিনা দেখার চেষ্টা করে। না, সে যাদের খুঁজছে তাদের কাউকে দেখতে পায়নি। তবে অন্য একজনকে পেয়েছে।
মেনি বেড়ালটা কারো সাথে ধাক্কা খেয়েছে। যদিও দোষ সামনের মহিলার, অন্তিক তা স্পষ্ট দেখেছে। তবে ঐ মহিলা মেনি বেড়ালকে দোষ দিচ্ছে। অন্তিক বিরক্ত হয়। সরি বলে চলে গেলেইতো হয়। এভাবে যার তার সাথে ঝগরা বাধিয়ে দেওয়া কোন ধরণের অসভ্যতা।
সে এগিয়ে যায়। যাওয়ার পথে একজন ওয়েটারকে জুসের ট্রে নিয়ে যেতে দেখা গেলে সেখান থেকে একটা গ্লাস সে নেই।
"দেখে চলতে পারোনা মেয়ে? চোখ কি হাতে নিয়ে ঘুরো। ড্রেসটা নষ্ট করে দিলে।"
প্রাণেশার বেশ রাগ লাগছে। ভদ্র মহিলা অহেতুক তাকে দোষ দিচ্ছে। কিন্তু বয়সে বড় দেখে কড়া জবাবও দিতে পারছেনা। সে কানে হাত দিয়ে সরি বুঝিয়ে চলে আসতে চায়।
কিন্তু মহিলা ভেবেছেন প্রাণেশা ন্যাকামি করে কানে হাত দিয়ে সরি বুঝিয়েছে।
"মুখ নেই তোমার? বাবা মা কথা বলতে শেখায়নি? ধাক্কা দিয়ে মুখে সরিটুকু বলতে পারছোনা। তোমার ঐ কানে হাত দিয়ে ন্যাকামোর সরি লাগবেনা আমার।"
প্রাণেশার এবার রাগে, খারাপ লাগায় কান্না চলে আসলো। তবে সে নিজেকে সামলে মহিলার সামনে থেকে চলে যায়, একপ্রকার তাকে উপেক্ষা করে।
মহিলা অপমানিত বোধ করেন। ক্ষেপে গিয়ে কিছু বলতে নিবে তার আগে অন্তিক উনার সামনে জুসের গ্লাস ধরে বলে,
"নিন খেয়ে নিন, তারপর মাথা ঠাণ্ডা করুন। এতো রাগ স্বাস্থের জন্য খারাপ।"
তিনি হঠাৎ অচেনা কাউকে জুস অফার করতে দেখে তাকান। অন্তিককে আপাদমস্তক দেখে বলেন,
"তুমি কে? আমাকে কি চেনো?"
"পার্সোনালিতো চিনিনা। তবে ব্যবহার বংশের পরিচয়। সে হিসেবে আপনি কেমন বংশ থেকে বিলং করেন তা অবশ্যই বুঝতে পারছি।"
"কি বলতে চাইছো?" তিনি খানিকটা রেগে বলেন।
"যেটা আন্দাজ করছেন সেটাই। প্রথমত মেয়েটা আপনাকে ধাক্কা দেইনি। আপনি ফোনে কথায় মগ্ন থেকে নিজের অসাবধানতার কারণে ওর সাথে ধাক্কা খেয়েছেন। তার উপর তাকে যা নয় তাই বলে অপমান করছেন, বাবা-মা তুলে
কথা বলছেন, এটাই তো আপনার বংশ পরিচয় দিতে যথেষ্ট। রাইট??"
তিনি অপমান বোধ করেন, তবে কিছু বলেন না। কারণ ২/১ জন তাদের বিষয়টা লক্ষ্য করছে। তাই নিজেকে দমিয়ে নেন।
অন্তিক উনার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বলে,
"নিজের মান অপমানের ভীষণ যত্ন অথচ অন্যের মান একদম ফেলনা তাইনা? মেয়েটা আপনাকে কিছু বলেছে? কানে হাত দিয়ে সরি বলেছে এটা ন্যাকামো মনে হচ্ছে। এদিকে কানে ফোন লাগিয়ে মানুষকে ধাক্কা দিয়ে আবার যেচে ঝগড়া করছেন, এসব? নাটক নয় কি?"
"তুমি কেন অন্যের বিবাদে ঢুকছো? যার সাথে সমস্যা সে কিছুই বললো না। অথচ তোমার হম্বিতম্বির শেষ নেই।"
"যার সাথে বিবাদ সে কথা বলতে পারেনা, তাই কিছু বলেনি। আর আমি তার হাসব্যান্ড। যেখানে সে আটকাবে, আমি অবশ্যই সেখানে শুরু হবো।"
মহিলা অন্তিককে মেয়েটার হাসব্যান্ড বলাতে দমে যান। যার দোষ হবে হোক, স্বামীর সামনে বউকে অপমান করলে চুপ থাকবেনা স্বাভাবিক। বরং ঝামেলা আরও বড় হতে পারতো। তাই তিনি নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ায় শ্রেয় মনে করেন। তবে অবাক হোন মেয়েটা আসলেই কথা বলতে পারেনা শুনে। সাথে একটু আফসোসও হয়।
মেয়েটা আসলেই কথা বলতে পারেনা, আর তিনি বাবা-মা কথা বলতে শেখায়নি বলে অপমান করলেন। তিনি অন্তিকের কাছে ক্ষমা চেয়ে চলে যান।
—————————
প্রাণেশা তাদের মেয়েদের জন্য যে রুমটা বুক করেছে সেখানে গিয়ে কিছুক্ষণ চোখের জল ফেলে এসেছে। কাদঁলে মন হালকা হয় তার।
এদিকে অন্তিক প্রাণেশাকে খুঁজতে খুজঁতে ওদেরই রুমের সামনে এসে দেখতে পায় রুম থেকে বেরুচ্ছে মেয়েটা। চোখ মুখ লাল, কেঁদেছে বোঝায় যাচ্ছে। প্রাণেশা আনমনে হাঁটতে হাঁটতে ঠিক অন্তিকের সামনে যায়। কিন্তু ধাক্কা খেতে নেবে তার আগেই সে সামনে কেউ আছে বুঝতে পেরে সরে আসে। অন্তিককে দেখে চোখ নামিয়ে নেই। খারাপ লাগা ভুলে গিয়ে এক মুহূর্তে ওর চোখে-মুখে ভয় আর লজ্জ্বা নেমে আসে।
"আমি কিছু করলেইতো সাথে সাথে অ্যাকশন নাও। কখনো কামড়া-কামড়ি করো তো কখনো থুথু ছুড়ো। আর অন্যদের বেলায় চুপ থাকা কেন?"
প্রাণেশা অন্তিক যে কিছুক্ষণ আগের ঘটনার কথা বলছে তা বুঝতে পারেনি। তবে অন্তিকের ১ম কথা শুনে সে ভাবে তাকে থুথু ছুড়েছে বলে শাস্তি দিতে এসেছে। সাথে কামড়া-কামড়ির কথা বলায় লজ্জ্বা পায়। সে অন্তিকের চোখে চোখ রাখেনা কোনোভাবেই। এদিক সেদিক করে।
অন্তিক ওর অবস্থা দেখে হঠাৎ ধিমি স্বরে জিজ্ঞেস করে,
"লজ্জ্বা পাচ্ছো নাকি ভয় পাচ্ছো?"
অন্তিকের এমন স্বর শুনে প্রাণেশার বুক ধড়াস করে উঠে,
সে কোনোভাবে বোঝায়,
"না"
"কি না? ভয় পাচ্ছোনা?"
প্রাণেশা মাথা নাড়ে।
"তাহলে নিশ্চিত লজ্জ্বা পাচ্ছো।"
প্রাণেশা তাড়াতাড়ি হাতের তালু সামনে দিয়ে নিচে জোর দিয়ে সরায়। যার অর্থ "মোটেই না"
"উহুম, তুমি মিথ্যা বলছো। নাহলে আমার চোখের দিকে তাকাচ্ছোনা কেন? তাকাও..."
প্রাণেশা মাথা নাড়িয়ে না বলে।
"উহুম তাকাও। তাহলে বুঝবো লজ্জ্বা পাচ্ছোনা।"
প্রাণেশা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে বোঝায়,
"আপনি যা ভাববেন ভাবুন, আমি লজ্জ্বা পাচ্ছিনা।"
"তাহলে তাকাও" বলে সে নিজে প্রাণেশার থুতনি ধরে ওর চোখ নিজের চোখে রাখে।
কয়েক সেকেন্ড তাকায় একে অপরের দিকে। তারপর হঠাৎ অন্তিক বলে,
"এবার বলো কাল থুথু ছুড়েছো কোন সাহসে।"
প্রাণেশা ভয় পায়, সাথে অবাক হয়। লোকটা তার মানে এতক্ষণ ওকে ফাঁদে ফেলেছে। আর সেও সুন্দর করে পা দিয়েছে। তবে দমে যায়না প্রাণেশা।
সে বোঝায়, "আপনি আমার সাথে বার বার অসভ্যতামী করবেন আর আমি একবার থুথু ছুড়লেই দোষ..."
এবার প্রাণেশার ইশারা বুঝতে কষ্ট হলেও সে অনুমান করে নেই।
"তোমার সাথে আমি বার বার অসভ্যতামী করেছি? কবে?"
"মনে করে দেখুন।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
"তুমি বলো"
"বলবোনা" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
"তাহলে আবার অসভ্যতামী করবো।"
প্রাণেশা চারদিকে তাকিয়ে বোঝায়,
"এমন জায়গায় আপনি অসভ্যতামী করতে পারেন না"
"ঠিক আছে, এখানে করবোনা। রুম বুক করাই আছে। চলো"
প্রাণেশা এবার বেশ রেগে যায়। লোকটা আবার বাজে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
"আপনার মতো বাজে লোক, অসভ্য লোক আমি আর দুটো দেখিনি।" (সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ)
"দেখবেওনা। তোমার সাথে সব অসভ্যতামী আমিই করবো। তবে যদি গত দুবারের ব্যাপার নিয়ে এই ডাকটা ডেকে থাকো। তাহলে বলবো ট্রাস্ট মি" প্রাণেশার দিকে ঝুঁকে ওর মুখের কাছে মুখ এগিয়ে বলে,
"তোমার ভাবনার চেয়েও অসভ্য হতে পারি আমি। তাই বাধ্য করোনা সত্যি সত্যি অসভ্যতামী করতে।"