মৌনপ্রেম

পর্ব - ১৭

🟢

ইরফান ছেলেটা খুব বেপরোয়া স্বভাবের। তার যা মন চাইবে তাই করে এসেছে ছোটবেলা থেকে। এমনকি বাবা মায়ের সাথে সুন্দর একটা পারিবারিক জীবন যখন কাঁটাতো তখন থেকেই। বড়লোক বাবার ছেলে। বেপরোয়া, সাথে সামনের জনের ছোট ছোট স্বাভাবিক কথাও তার ইগোতে লেগে যায়, নিজে মানুষের বংশ তুলে মজা করবে অথচ তার সাথে কথা বলতে হবে ভেবে চিন্তে, যেখানে যাবে নিজের প্রভাব দেখাতে হবে - এমনই সে ছোটবেলা থেকে। আর পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর যেন এসব স্বভাব আরো ভয়াবহ হয়ে গিয়েছিলো।

অন্তিকের সাথে তার বন্ধুত্ব হয় হাই স্কুলে। অন্তিক ছিল শান্ত স্বভাবের। ইরফানের মতে, তার কাছ থেকে এক ধরণের মাস্টার মাইন্ড ভাইব আসে। যদিও তাদের সম্পর্কটা শুরুতে তেমন একটা ভালো ছিলনা।

কারণ ইরফান ক্লাসে খুব আধিপত্য বিস্তার করতে চাইতো। তার মতে, পুরো ক্লাসের স্টুডেন্ট তার কথায় চলবে, তাকে ভয় পাবে।

পেতোও তার সহপাঠিরা। কিন্তু ইরফান অন্তিককে মনে মনে হিংসা করতো। ছেলেটা সবসময় শান্ত হয়ে থাকে। অহেতুক ঝামেলায় জড়ায়না। টিচার্সদের পছন্দের স্টুডেন্ট।

সাথে তাদের ক্লাসের বাকি স্টুডেন্টরা অন্তিকের সাথে খুব আন্তরিক। খুব মানতো। যেখানে ইরফানকে মানতো তাকে ভয় পেয়ে, সেখানে অন্তিককে মানতো নিজেদের মন থেকে আন্তরিকতার সাথে।

এই ব্যাপারটা ইরফান নিতে পারতোনা। সে নীরব থেকেও যেনো সবচেয়ে লাউড। কিন্তু কখনো সেভাবে তাদের মধ্যে বড় কোনো ঝামেলা হয়নি।

বরং অন্তিক ইরফানকে বিভিন্নসময় নানান ভাবে বাঁচিয়েছে টিচার্সদের বকা, পানিশমেন্ট থেকে। ইরফানের গার্ডিয়েন কল আসতো মাসে ৫/৬ বার। প্রায় সময় অন্তিক বাঁচিয়ে নিতো। কারণ অন্তিকের মতে ইরফান যতোই উগ্র হোক, যা করে তার পদ্ধতি খারাপ হলেও কোনো ক্রাইম করেনি। এভাবে মাঝে মধ্যে ক্লাসে নানান বিপদে পড়লে প্রত্যক্ষ্যভাবে হোক কিংবা পরোক্ষভাবে একে অপরের সহায়তা করতো তারা। অথচ তা একে অপরকে বুঝতে দিতোনা।

তবে এমন নয় যে বুঝতে দেইনা বলে তারা আসলেই বুঝেনা।

তারপর তাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হয় যখন স্কুলে ক্লাস সেভেনে উঠে স্পোর্টস অ্যাক্টিভিটিজে একই টিম থেকে খেলে। তখন খেলা প্র্যাক্টিস করার জন্য একসাথে সময় কাঁটাতে কাঁটাতে একে অপরের সম্পর্কে জানে, নানান কারণে কথা বলে, প্র্যাক্টিসে সহায়তা করে -এভাবে দুইজনের নেতৃত্বে তাদের টিম জিতেও।

তারপর খেলা শেষে জেতার পর ইরফানই আগে বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। ব্যাস তারপর থেকে তারা দুইজন একে অপরের প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠে।

তারপর কলেজে উঠে বন্ধুত্ব হয় আরেকটা মেয়ের সাথে। নাম তোশা।(একদম প্রথম পর্বে তোশার কথা উল্লেখ করেছিলাম, মনে না থাকলে একবার চোখ বুলিয়ে আসতে পারেন)

তোশার সাথে বন্ধুত্বটা হয় একটু অন্যভাবে। ওদের কলেজে ভর্তির কিছুদিন পর অন্তিক আর ইরফান একসাথে কলেজের ক্যাম্পাসে হাঁটছিলো। তখন ইরফান খেয়াল করে একটা সুন্দর দেখতে মেয়ে একা একা এদিক সেদিক তাকিয়ে তাকিয়ে কিছু খুঁজছে। সে বুঝতে পারে কলেজে প্রথমবার এসেছে মেয়েটা।

মেয়েটাকে হঠাৎ ডাক দেই। তার সম্বোধনটা ছিলো,

"এই মেয়ে, কি খুজঁছো? এদিকে এসো..."

তোশা ডাক শুনে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করে তাকেই ডাকছে কিনা। তারপর শিউর হলে তাদের সামনে এসে দাড়ায়।

"আমাকে বলছো?"

"হ্যাঁ, এদিক ওদিক কি দেখছো, কলেজে নতুন নাকি? আর সিনিয়রদের সালাম দিতে হয় জানোনা?"

তোশা ইরফান আর অন্তিককে চোখ ঘুরিয়ে একপলক দেখে নেই। তারপর বলে,

"হ্যাঁ, নতুন বলতে আজকেই আমার প্রথম দিন কলেজে আসা।"

"আজকে প্রথম দিন কলেজে এসেছো আর আজকেই সিনিয়রদের সাথে বেয়াদবি। আমাদের আপনি না ডেকে তুমি ডাকছো। আর তুমি জানোনা সিনিয়র দেখলে সালাম দিতে হয়?"

"জিহ, জানি। তবে আপনাদের দেখে সিনিয়র মনে হয়নি, তাই সালাম দেওয়ার কথা মাথায় আসেনি। আপনারা কি সেকেন্ড ইয়ার? অনার্সের স্টুডেন্ট তো মনে হচ্ছেনা।"

ইরফান ভ্রু কুচকে বলে,

"তো তোমার কাছে সিনিয়র দেখাতে হলে কি ভাবে চলতে হবে বলতে চাইছো আমাদের?"

"আপনারা আসলেই যদি সিনিয়র হয়ে থাকেন তাহলে আমার কাছে প্রমাণ দিতে হবে কেন...যেমন আছেন তেমনই থাকুন।"

"চুপ করো। তুমি অনেক বেয়াদবি করেছো। এখন গিয়ে ঐ যে ব্লু স্কার্ফ মেয়েটাকে ডেকে দাও। আমাদের ফ্রেন্ড হয়। ওকে গিয়ে বলো আমরা ডাকছি।"

তোশা মাথা নাড়িয়ে ডেকে আনতে যায়। মেয়েটাকে পেছন থেকে ডেকে বলে,

"হ্যালো আপু, আপনাকে বোধ হয় আপনার ফ্রেন্ড ডাকছে। একটু গিয়ে দেখে আসুন প্লিজ।"

মেয়েটা পেছন ফিরে। তোশাকে দেখে নিয়ে বলে,

"আমার ফ্রেন্ড? কোন ফ্রেন্ড?"

তোশা হাত দিয়ে ইরফানদের দেখিয়ে দেই। কিন্তু না, ওখানে কেউ নেই। ওদের দেখতে না পেয়ে সে বলে,

"ওখানেই তো ছিল। বললো আপনি তাদের ফ্রেন্ড। যেন ডেকে দেই।"

মেয়েটা ওদিকে দেখে নিয়ে তোশাকে বলে,

"তুমি কি কলেজে নতুন?"

"হ্যাঁ, আজকেই প্রথম।"

"তার মানে তো তুমি কাউকে চেনোনা এখানে। তাহলে তোমাকে ডেকে দিতে বললো যে?"

"ওরা বললো সিনিয়র হয়। প্রথম দিনই সিনিয়র দের সাথে ঝামেলায় জড়াতে চাইনি। তাই ডেকে দিতে বললো যখন তাই করেছি। আপনি আপনার বন্ধুকে খুঁজে নিবেন কেমন? আমি আসি।"

"আরেহ দাড়াও। আমার কোনো বন্ধু নেই এখানে। আমি নিজেই আজ অনার্সে প্রথম ক্লাস করতে এসেছি। তোমাকে বোধ হয় ওরা র‍্যাগ দিতে চেয়েছে। আমাকে সিনিয়র দেখে আমার কাছে পাঠিয়ে কোনোভাবে তোমাকে বিপদে ফেলতে চেয়েছে হয়তো। তবে আমার জায়গায় এখানকার পুরনো কোনো সিনিয়র হলে ঠিকই সফল হতো। তোমার ভাগ্য ভালো, আমিও আজকে নতুন।"

"র‍্যাগ? ইশ... আরেকটু হলেই তার মানে বিপদে পড়তাম। আপনাকে ধন্যবাদ।"

"ধন্যবাদ পরে দিও। আগে বলো মাইক্রোবায়োলোজির ডিপার্টমেন্টটা কোন দিকে জানো কি?"

"হ্যাঁ হ্যাঁ..আমার ক্লাস খোঁজার সময় ঐ যে ওপাশে দেখেছিলাম। আপনি যান, উপরে লেখায় আছে। তবে আমার ক্লাসটা এখনো পেলামনা।"

"তুমি কি ফার্স্ট ইয়ার?"

"হ্যাঁ।"

"ওহ, তাহলে ঐ যে নর্থ সাইডে যাও। ২০৩ নাম্বার রুম"

"ওহ, থ্যাংক্স"

"মাই প্লেশার"

তোশা তার ক্লাস রুমে গিয়ে মাঝের একটা সিটে বসে পড়ে। তারপর বসে ব্যাগ থেকে বই বের করছিলো। হঠাৎ তার বসা বেঞ্চের সামনে এসে একটা ছেলে পরতে পরতে বেঁচে যায়। ছেলেটা হয়তো তার বন্ধুর সাথে মজা করে কিছু বলেছে। আর তার বন্ধু ক্ষেপে গিয়ে এক ধাক্কা দিয়েছে। কিন্তু ধাক্কা খেয়ে পড়েও ছেলেটা গাঁ দুলিয়ে হাসছে।

ছেলেটা হাসতে হাসতে ঠিক করে দাড়ালে, তার চেহারা তোশার কাছে স্পষ্ট হয়। এই তো, এই ছেলেটায় তাকে র‍্যাগ দিতে চেয়েছে বাইরে। কিন্তু সে এখানে কি করছে? সে তো সিনিয়র...

"আপনি আমাদের ক্লাসে কি করছেন? আপনি তো সিনিয়র?" তোশা রেগে বলে। কারণ সে বুঝতে পারছে এই দুইটা ছেলে কোনো সিনিয়র টিনিয়র নয়। তাকে একা পেয়ে মজা নিয়েছে।

ইরফান আর অন্তিক তার দিকে তাকায়। ক্লাসের বাইরের ঐ মেয়েটা।

"হেই, বিউটিফুল লেইডি..তুমি এতো তাড়াতাড়ি ক্লাস পেয়ে গেলে?"

"সে পরের কথা, আগে তোমরা বলো তোমরা জুনিয়রদের রুমে কি করছো?"

"একেবারে আপনি থেকে তুমি? নট ব্যাড.. "

তোশা রেগে বলে, "মিথ্যা বলেছো?"

ইরফান ওকে একটা চোখ মেরে বলে, "ইয়েস, এবার বলো ব্যাচম্যাটের কাছে হালকা করে র‍্যাগ হয়ে তোমার অনুভূতি কেমন?" কথাটা বলে ইরফান অন্তিকের গলার ব্লু কলেজ টাইটা টেনে হাতের মধ্যে ধরে তোশার মুখের সামনে মাইক্রোফোন ধরার স্টাইলে ধরে। যেন সে সাংবাদিক আর সে সিনেমা হলের কোনো দর্শকের কাছে সিনেমা দেখে তার অনুভূতি জানতে চাইছে।

অন্তিক এমনিতেই বাইরে মেয়েটাকে র‍্যাগ দিতে চেয়েছিলো বলে ইরফানের উপর বিরক্ত ছিল। সেটা নিয়েই তর্কাতর্কি দিয়ে নানান ফাজলামো করে করে ক্যান্টিন থেকে ঘুরে আসছিলো তারা। এই ছেলে আবার মেয়েটার সাথে ফাজলামো শুরু করেছে। সে বিরক্ত হয়ে নিজের গলার টাইটা টেনে ছাড়িয়ে নেই। তারপর ইরফানের মাথায় একটা গাট্টা মেরে "ভালো হয়ে যা ইরফান" বলে চলে যায়।

এখানে থাকলে সে এই অচেনা মেয়ের সাথে অহেতুক ঝামেলা নিতেও পারবেনা, আর না ইরফানকে থামাতে পারবে।

তার চেয়ে বরং সে সাইড হোক।

তোশা ইরফানের এমন জোক নিতে পারেনা।

সে রেগে বলে,

"সরো আমার বেঞ্চের সামনে থেকে। তোমার মতো মিথ্যুক আমি আর দেখিনি। যাও..."

"আসছে আমার সত্য মূর্তি। আর এই বেঞ্চে কি তোমার নাম লেখা আছে নাকি যে তোমার বেঞ্চ বলছো?"

"আমার নাম লেখা না থাকুক, আমি আগে বসেছি। তাই আজকের জন্য এই বেঞ্চ আমার। তুমি যাও।"

"আরেহ বিউটি এসব কয় কি? অন্তিক... আমার ব্যাগটা এদিকে ছুড়, আজকে ক্লাস এখান থেকে হবে মামা।" সে কথার মাঝে অন্তিককে ডাক দিয়ে বলে।

ইরফান কথাটা বলে একটুও জিরুতে পারেনি। ওমনি মুখের উপর ঐ বইপত্র ছাড়া শুধু একটা খাতা নেওয়া ব্যাগটা এসে পড়ে।

অন্তিক শুনার সাথে সাথে ছুড়ে মেরেছে। ইরফান মুখ থেকে ওটা নামিয়ে বিরক্তি নিয়ে বলে,

"শালা একটা মেয়ে পটাতে পারিনা তোর জ্বালায়। ঐ দূরে দূরে থেকে মেয়েরা এই থোবরাটা দেখেই যা একটু মুচকি মুচকি হাসে। সেটাও ধ্বংস করবি তুই। কামিনা......"

সেদিন ইরফান আর তোশা এক বেঞ্চে একপাশে বসে সবকটা ক্লাস করে। টানা চার ঘণ্টা একসাথে ছিলো ওরা। খুব একটা শান্তভাবে ছিল এমন মোটেও নয়। তোশা প্রথমে ইরফানকে বসতে দিতে চায়নি। ইরফান গাঁয়ের জোর খাটিয়ে বসে যায়। তারপর একে অপরকে ঠেলে, একজনের বই খাতা অপরজনের গাঁয়ে লাগলেই শুরু, বেঞ্চের নিচে একজনের পায়ে অন্যজনের পা লাগলেই শুরু- এভাবেই কাটায় সারাটা ক্লাস।

এরমধ্যে খাতায় নোট করার সময় স্কেল বের করলে কিছুক্ষণ পর কালার মিল থাকায় কোনটা কার গুলিয়ে ফেলে, একটু নতুন দেখতে ওটা নিয়ে নিজের বলে টানাটানি শুরু করে তারা। কিংবা কখনো নড়তে গিয়ে একজনের কনুইয়ের সাথে অপরজনের কনুই লাগলে কনুই কনুই গুতাগুতি শুরু করে। এভাবেই কেটেছে সেদিনের ক্লাস।

এরপর থেকে ইরফান মেয়েটার পেছনে লাগে। ক্লাসে, ক্লাসের বাইরে, ক্যান্টিনে, কলেজে আসতে-যেতে নানান ভাবে বিরক্ত করতে থাকে। তবে সেসব শুধুমাত্র ওকে জ্বালানোর উদ্দেশ্যে ছিলো। নানান ভাবে ছোট খাটো বিপদে ফেলা, আবার সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করা, কিংবা ফ্লার্ট করাও বাদ যেতোনা।

শেষমেশ তোশা না পেরে ইরফানকে সামনা সামনি জিজ্ঞেস করে যে তার সমস্যা কি, সে আসলে কি চাই, কেনো ওকে এতো জ্বালাতন করে...

ইরফান বলে সে তোশার সাথে বন্ধুত্ব করতে চাই। কিন্তু তোশা ফিরিয়ে দেই।

তোশা খুব সিরিয়াস নিজের জীবন নিয়ে। সে বন্ধু-বান্ধব ব্যাপার গুলোতে বিশ্বাসী নয়। তাই তার কোনো বন্ধু বান্ধবও নেই। ইরফানকে যতোটুকু দেখেছে, চিনেছে তাতে সে কেমন প্রকৃতির ছেলে তা খুব সহজেই বোঝা যায়।

জীবন নিয়ে এতো সিরিয়াসনেস তোশার যে সময় নষ্ট, আবেগ অপচয় এসব ভেবে সে কখনো কোনো মেয়ে বন্ধুই বানায়নি, সেখানে ইরফানের মতো একটা ছন্নছাড়া, বেপরোয়া ছেলের সাথে বন্ধুত্ব করে নিজের জীবনও ছন্নছাড়া করার কোনো মানেই হয়না। সে স্পষ্ট ভাবে ফিরিয়ে দেই।

কিন্তু নাছোড়বান্দা ইরফানকে সে চিনতে পারেনি। ইরফান যখন বলেছে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে হবে তার মানে বন্ধুত্ব করবেই। তবে সে সেদিন আর তোশাকে কিছু বলেনি। কারণ এবার তোশা নিজে আসবে তার সাথে বন্ধুত্ব করতে।

ক্লাসে নানান টিম ওয়ার্ক হয়, এটা সেটা নানান এক্টিভিটিস হয়। কয়েকজনকে টিম ঘোষণা করে তাদের দলীয় এসাইনমেন্ট দেওয়া হয়। এসবে টিমের সদস্যদের সাথে নানান কাজে যোগাযোগ করা লাগে। কিংবা কোনো টিমে তো ঢুকতেই হবে। নাহলে টিমওয়ার্ক করবে কি করে।

তো সেবার ক্লাসে একটা টিম এসাইনমেন্ট দিলো। যেটাতে কোন টিমে কারা কারা থাকবে সেটা তারা নিজেরা ঠিক করবে আলোচনা করে। কারণ টিম মেম্বাররা একে অপরের সাথে কম্ফোর্টেবল না হলে কাজ ঠিকঠাক হয়না। সেবার সবাই নিজেরা নিজেরা কে কোন টিমে থাকবে ঠিক করে ফেললো, অথচ তোশাকে কেউ নিলোনা। আর না কেউ তাকে জিজ্ঞেস করলো বা অফার করলো তাদের টিমে আসতে চায় কিনা।

তোশার খুব নেগ্লেক্টেড ফিল হয়েছে সেবার। সে কাউকে গিয়ে বলেনি যে সে তাদের টিমে যুক্ত হতে চাই। যেদিন স্যারের কাছে মেম্বারদের লিস্ট জমা দিবে সেদিন সে কলেজেই যায়নি।

এরপর দুইদিন কলেজে আসেনি - হতাশায়, লজ্জ্বায়।

প্রাইভেট প্রতিশ্ঠান হওয়ায় এসব টিমওয়ার্ক, এসাইনমেন্ট যেন নিত্য ব্যাপার। এভাবে পর পর ৩ বার এমন হলো তোশার সাথে। না কেউ তাকে অফার করে, আর না সে গিয়ে যুক্ত হতে চায়।

যখন কলেজে যায় তখন সাধারনত সে পাশের জনের সাথে টুকটাক কথা বলে কোনো কিছু না বুঝে থাকলে তা বুঝে নিতে। কিন্তু এখন সে কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেও কেউ উত্তর দেইনা। ক্লাস মিস গেলে সেই ক্লাসের নোট নিতে চাইলে কারো কাছে তারা হেল্প করেনা।

এর মধ্যে একদিন ইংলিশ টিচার জিজ্ঞেস করে সে ক্লাসে উপস্থিত থেকেও কেন সেদিন কোনো টিমে যুক্ত হয়নি? এটেন্ডেন্স খাতায় তো তার নাম ছিলো। অতোগুলো স্টুডেন্ট এর সামনে এসব জিজ্ঞেস করলে সে কোনো উত্তর দিতে পারেনা। কি বলবে? কেউ তাকে অফার করেনি তাই সেও লজ্জ্বায় কোথাও যুক্ত হয়নি?

এরপর আরেকটা টিম ওয়ার্ক এর ঘোষণা এলে সে দ্বিধা-লজ্জ্বা সব ভুলে নিজের যুক্ত হতে চাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু কোনো টিমে জায়গা নেই। শেষে একজন বলে,

"আইন্সটাইন টিমে একটা জায়গা প্রত্যেক বার খালি থাকে। ওরা ওদের টিমে কাউকে নেইনা লাস্ট কয়েকবার থেকে। এবারো খালি আছে। তুমি ওদের কাছে গিয়ে বলো যেন তোমাকে নেই। নিলে তো ভালো, না নিলে রিকুয়েস্ট করো।"

তোশা যায়, সে ছিল ক্লাসের পেছনের দিকে। আর ঐ টিমটার মেম্বাররা নাকি বসে সবসময় সামনে। গিয়ে দেখে ওটা ইরফানদের টিম। অন্তিক, ইরফানসহ আরো দুইটা মেয়ে আর একটা ছেলে।

সে যেহেতু ইরফানকেই মুটামুটি চেনে তাই ইরফানকেই বলে যেনো তাকে ওদের টিমে নেই। কিন্তু ইরফান জবাব দেই ওদের টিমে নিজেদের বন্ধু ছাড়া বাইরের কাউকে নেইনা।

একথা শুনে তোশার খুব রাগ হয়। সে চাইলে প্রফেসরের কাছে কমপ্লেইন করতে পারে। কিন্তু এতে লোক হাসানো ছাড়া কিছু হবেনা। তাই সে নিজেকে সামলে বলে,

"তুমি তো আমার সাথে সেদিন বন্ধুত্ব করতে চাইলে, আবার এখন আমাকে টিমে নিচ্ছোনা কেন?"

"আমি বন্ধুত্ব করতে চেয়েছি, কিন্তু তুমি কি তা গ্রহণ করেছিলে? তুমি তো আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছ। অর্থাৎ আমরা এখন বন্ধু না। তাই টিমেও আসা হচ্ছেনা। সো সরি চেরি লেইডি"

"তুমি এমনটা করতে পারোনা। টিমে না নেওয়ার অধিকার তোমার নেই। আমি প্রফেসরকে বলে দেবো।"

তোশার একথায় মেয়ে দুইটা সহ ছেলেটাও হেসে উঠে। ইরফান বলে,

"তুমি আমাকে প্রফেসরের ভয় দেখাচ্ছো? এখানের প্রিন্সিপাল আমার মামা হয় ইউ বিউটিফুল গার্ল। তাই ওসব লোক্লাস ভয় দেখানো বাদ দাও। তুমি বরং অন্য টিমে ঢুকতে পারো কিনা দেখো।"

"কিন্তু অন্য টিমে জায়গা নেই। শুধু তোমাদের এখানেই খালি আছে।"

"ওউউ.. দ্যাট্স রেলি স্যাড। তুমি বরং গতবারের মতো এবারো কলেজে এসোনা কেমন? কারণ কোনো টিমে না থাকলে তো কলেজ এসে লাভ নেই রাইট?"

তোশা কি করবে ভেবে পায়না। সে ভাবে এখন আর ইগো দেখানো উচিত হবেনা। ফ্রেন্ডশিপ করে নিলে হয়তো টিমে নেবে। আর সেতো শুধু ফ্রেন্ডশিপ করবে। বেস্ট ফ্রেন্ড তো আর হয়ে যাচ্ছে না যে তার সাথে মিশতে হবে সবসময়,

আর সেও উচ্ছন্নে যাবে।

বরং কোনো ভাবে যদি তাকে প্ররোচিত করে খারাপ দিকে যাওয়ার জন্য, তাহলে সে নাহয় তখন থেকে কথা বলা কিংবা তার সাথে মেশা কমিয়ে দিবে। এই ভেবে সে হঠাৎ তার কাছে প্রস্তাব রাখে বন্ধুত্ব করার।

"শুনো ইরফান"

"ইয়েস চেরি লেইডি, কিছু বলবে?"

"বলছিলাম, আমি যদি তোমার সাথে নতুন করে ফ্রেন্ডশিপ করতে চাই তুমি কি তা একসেপ্ট করবে? প্লিজ?"

"হায়য়য়য়য়..... এভাবে বলতে হয়না বিউটিফুল গার্ল। আমি সুন্দরীদের প্রপোজাল কখনো রিজেক্ট করিনা, বুঝেছো? এন্ড নো ও্যরিস, তুমি আমাদের সাথে আপকামিং প্রজেক্টে থাকছো টিম মেম্বার হিসেবে, আই প্রমিস।

নাও লেট্স শেইক আও্যার হ্যান্ডস।"

তোশা ইরফানকে মনে মনে হিপোক্রিট, পার্ভার্ট এসব বলে গালি দিলেও মুখে মেকি হাসি রেখে হ্যান্ডশেইক করে।

মৌনপ্রেম পর্ব ১৭ গল্পের ছবি