মৌনপ্রেম

পর্ব - ১৬

🟢

সরোয়ার বাড়ির পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। দিনটা প্রতিদিনের মতোই শুরু হয়েছে। অন্তিকের বাবা আর দাদী অন্তিকের উপর রেগে ছিলো প্রাণেশার ঘটনাটি নিয়ে।

কিন্তু অন্তিকের মা ছেলেকে বুঝিয়ে বলেছে দেখে উনারা আর কোনো রা করেননি। তার উপর কাল রাতটার জন্য অন্তিক নিজের রুম ছেড়ে দিয়েছিলো ওদের কারণে, এটা দেখেই মূলত তাদের রাগ পড়ে যায়।

কারণ অন্তিক কখনো তার রুম অন্যের জন্য ছেড়ে দিয়ে নিজে অন্য কোথাও থাকার ছেলে না। সে না অন্যের রুমে থাকতে পছন্দ করে, আর না নিজের রুমে অন্য কেউ থাকুক সেটা পছন্দ করে।

কাল যখন প্রাণেশা মেয়েটার জন্য ছেড়ে দিয়েছে তার মানে নিজের কাজে একটু হলেও অনুতপ্ত। যদিও তার চেহারা দেখে সে আসলেই অনুতপ্ত এমন কোনো কিছু বোঝার উপায় নেই।

উল্টে মনে হবে সে যা করেছে তা নিয়ে অথবা প্রাণেশার অজ্ঞান হওয়া নিয়ে তার তেমন কোনো মাথাব্যাথা নেই। মিসেস আয়েশা যখন কাল অন্তিকের সাথে কথা বলছিলেন তখনতো উনার মনে হয়েছে অন্তিক প্রাণেশার অজ্ঞান হওয়াকে খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে।

এদিকে কাল তাকে এতোগুলো কথা শুনানোর পরও তেমন কোনো জবাব দেইনি। এই ছেলের মতিগতি তিনি বুঝে উঠতে পারছেননা। প্রাণেশার জন্য তার মায়া হয়।

মেয়েটাকে বাড়ির তিন মেয়ের চেয়ে কোনোদিকে কম ভালোবাসেননা তিনি। উল্টে বাড়ির মেয়ে তিনটার চেয়ে এই মেয়েটার জন্যই ইদানিং চিন্তা বেশি হয় তার। বাড়ির মেয়েদের জন্য ভাবার মানুষের অভাব নেই। কিন্তু তার ছেলেটা যদি প্রাণেশাকে শেষ অব্দি গিয়ে অবহেলা-ই দিয়ে যায় তাহলে মেয়েটার দুঃখের অন্ত থাকবেনা। না আছে বাবা-মা আর না আছে মাথার উপর একমাত্র মামার হাত। নিজের ছোট জাঁ এর সাথে কিচেনে রান্না করতে করতে এসব ভাবছিলেন তিনি।

প্রাণেশাকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখেন ওখান থেকেই। তিনি নিশ্চিত মেয়েটা এখানেই আসবে। কিচেনে এসে তাদের দুই শাশুড়িকে এটা সেটা এগিয়ে দেওয়া সহ আরও নানান ভাবে সাহায্য করতে চাইবে।

মেয়েটা এখন এসব আন্তরিকতার সাথে করলেও আগে ভয় পেয়ে করতো। কখন না জানি বাড়ির কেও সে কাজ বাজ করেনা, শুধু বসে বসে খায়- এসব বলে দেই মুখের উপর, এমন ভেবে সে ভয় পেয়ে করতো। মিসেস আয়েশাসহ তারা বড়রা তা বেশ টের পেতেন। সামান্য ব্যাপারেও ভয় পেতো কেউ কোনো কটু কথা না শুনিয়ে দেই এই ভেবে।

সেবার তাকে এক কাপ চা নিয়ে অন্তিকের বাবার কাছে পাঠিয়েছিলো। ঐ সময় সামনে থেকে দিথী আসছিলো তাড়াহুড়া করে। বলতে গেলে একপ্রকার দৌড়েই আসছিলো। তার নাকি কি পার্সেল এসেছে গেটে ওটা রিসিভ করতে।

দিথীর অসাবধানতার কারণে প্রাণেশার সাথে তার ধাক্কা লাগে। চায়ের কাপটা নিচে পড়ে ভেঙে যায়। প্রাণেশা ভয় পেয়ে আশেপাশে সবার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছিলো।

সে ভেবেছে সবাই তাকে দোষারোপ করবে। তার দোষ ভাবছে সবাই, এই ভেবে প্রায় কেঁদে দিয়েছিলো। তারপর দিথীর মা যখন দিথীকে এসে সারাক্ষণ ডেই ডেই করে ঘুরে বেড়ায়, ঠিক ভাবে হাঁটতে পারেনা- এসব বলে বকতে থাকে, তখন গিয়ে একটু সস্তি পায় মেয়েটা। কিন্তু তারপর দুই মিনিট বাদেই কি যেন ভেবে আবার চেহারা অন্ধকার করে ফেলে।

তখন উনারা আর সেভাবে পাত্তা না দিলেও সেদিন বিকেল বেলা দিথী এসে হাসতে হাসতে বলে, ভাবি নাকি ভয় পেয়ে তার কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়েছে, কারণ সে ভাবির জন্য মায়ের কাছে বকা শুনেছে সকালে। প্রাণেশা ভেবেছিলো দিথী এ কারণে তার উপর রেগে থাকবে।

কিন্তু মেয়েটা না রেগে উল্টে তাকে সরি বলছিলো তার অসাবধানতার কারণে ধাক্কা লেগেছে বলে। প্রাণেশা তখন খুব খুশি হয়, সাথে বুঝে যায় এই বাড়ির মানুষগুলো অন্যরকম ভালো। নাহলে তাকে দোষ না দিয়ে উল্টো তাকে সরি বলছে তার ননদ, ভাবা যায়?

সেদিন প্রাণেশা আরো একটা কাণ্ড করেছিলো। চায়ের কাপ ভেঙে চা নষ্ট হয়ে গিয়েছে বলে আবার নিজে গিয়ে চা বানায় শ্বশুরের জন্য। ঐ চা খেয়েই তখন থেকে মি.মাহমুদ প্রাণেশার হাতের চা পাগল। এভাবে নিজের সরলতায় বারে বারে এ বাড়ির মানুষগুলোকে সে মুগ্ধ করেছে।

এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে অসাবধানতাবসত গরম চুলায় আগুনের জিলকায় হাত দিয়ে দিয়েছেন তিনি খেয়ালই করেননি। তবে বিপদটা ঘটতে গিয়েও ঘটেনি। প্রাণেশা এসে হাতটা সরিয়ে দিয়েছে ঝাড়া মেরে তাড়াতাড়ি।

মিসেস তাবিয়াও দেখেন ব্যাপারটা। উনি এসে সরাতে চাইবেন তার আগেই প্রাণেশা এসে সরিয়ে দিয়েছে। তেমন কিছু হয়নি হাতে। তাও ফ্রিজ থেকে এক টুকরো বরফ এনে সে ঐ হাতে ঘসে দিতে থাকে। তারপর ইশারায় হাত নেড়ে, উ..উ.. করে এদিকে ওদিকে দেখিয়ে আরো কি কি জানি বলে বকছে মেয়েটা তার শাশুড়িকে।

উনারা সেসব বকুনি বুঝতে না পারলেও মেয়েটা যে বকছে তা বেশ বুঝতে পেরেছেন। দুই জাঁ একে অপরের দিকে তাকায়। মিসেস তাবিয়া উনাকে প্রাণেশার দিকে দেখিয়ে ভ্রু নাচিয়ে কি যেন বুঝিয়ে মৃদু হাসলেন। উনার ইশারার মানে "ছেলের বউয়ের কাছে বকুনি খেয়ে কেমন লাগছে ভাবি?"

মিসেস আয়েশা তাকে মেকি বিরক্তিভাব দেখিয়ে প্রাণেশাকে বললো যেন অস্থির না হয়। সে তেমন ব্যাথা পায়নি, আর না পুড়েছে।

প্রাণেশার শাশুড়ির কথা শুনে শান্ত হয়।

কিন্তু মিসেস তাবিয়া হঠাৎ বলেন,

"তুমি তো দেখছি এখন থেকে শাশুড়িকে বকা-বকি শুরু করে দিয়েছো প্রাণেশা, কয়েক বছর পর না জানি আমরা দুই জাঁ আর এই সংসারে টিকে থাকতে পারবো কিনা। আমার দিগন্তের জন্য বউ আনলে সেও যদি এমন হয় তাহলে তো আমাদের দুইজনের সংসার কি তাও ভুলে যেতে হবে মনে হয়, তাই না ভাবি?"

প্রাণেশা চাচীর কথা শুনে আঁতকে উঠে।

সে তো শাশুড়ি মাকে আনমনা হয়ে কি যেন ভেবে ভেবে অঘটন ঘটাতে যাচ্ছিলো দেখে একটু বকেছে, যাতে পরের বার থেকে সাবধান হয়। কিন্তু উনারা ভুল বুঝে ফেললেন এতে?

সে তো এভাবে ভেবে দেখেনি। ইশ!! কষ্ট পেয়েছে দুইজনে। এই ভেবে সে কানে হাত দিয়ে সরি বোঝায়। আর কখনো এমনটা হবেনা। এই সেই বুঝিয়ে ক্ষমা চায়।

পরে দুই শাশুড়িকে হাসতে দেখে বুঝে মজা করেছে। সে লজ্জ্বা পেয়ে যায়। সবসময় একটু বেশি বেশি ভাবে। এই ভেবে গালে একটা মৃদু চড় দেই।

মাহাদ তখন অলসভাবে কিচেনে আসছিলো এক কাপ কফি খুঁজতে মামীদের কাছে। প্রাণেশার চড় খাওয়ার ব্যাপারটা তার চোখে পড়ে। সে হঠাৎ বলে উঠে,

"আরেহ, ভাবিজি নিজের গালে নিজে চড় খাচ্ছে। ব্যাপার কি? তোমরা দুই জাঁ মিলে আবার অন্তিক ভাইয়ের নিরীহ বউটাকে জালাচ্ছোনা তো?"

বলতে বলতে কিচেনের কেবিনেটের পাশে এসে হেলান দিয়ে দাড়ায় সে। পাশেই একটা ঝুড়িতে আপেল, কমলা, ডালিমসহ নানান ফলমূল ছিল। ওখান থেকে একটা আপেল নিয়ে কামড় বসায়। ওর কথায় তেমন একটা পাত্তা দেইনি কেউ। এই ছেলের স্বভাবই সবার সাথে মজা করা। যে কারো সাথে খুব সহজে মিশে যায় মাহাদ।

মিসেস আয়েশা আর তাবিয়া কি যেন রাঁধছে গ্যাসে, আর প্রাণেশা ওর কথায় সামান্য হেসে তাদের কাজে সাহায্য করছে। সেও অবগত মাহাদ ভাইয়ার স্বভাব সম্পর্কে।

মাহাদ আবার বলে, "মামী, তোমাদের থেকে এটা আশা করিনি। ধরা খেয়ে দুইজনেরই দেখি জবান বন্ধ। সমস্যা নেই, ভাবি যদি কেইস করতে চায় তোমাদের বিরুদ্ধে বধূ নির্যাতনের অভিযোগে, তো আমি স্বাক্ষী দেবো। টেনশন লেনেকা নেহি ভাবিজী।"

মিসেস তাবিয়া হাতের খুন্তি মাহাদের দিকে তাক করে বলেন,

"কি চাই বলে বিদায় হো, নাহলে এই খুন্তির মাইর খাবি। তোর বোনগুলোর জ্বালায় বাঁচিনা আর। মহারানীগুলোর একেক জনের একেক রকম পছন্দ। প্রতিদিন এতো এতো রাঁধতে বিরক্ত লাগে। এখানে এসে ঝামেলা করিসনাতো।"

"যা বাবা। ওরা ভালো কিছু করলে তোমাদের মেয়ে আর খারাপ কিছু করলে আমার বোন। বুঝেছি, সব দোষ মাহাদ ঘোষ।"

প্রাণেশা মাহাদকে হাত দেখিয়ে কিছু লাগবে কিনা জানতে চায়। মাহাদ মাথা নাড়িয়ে এক কাপ কফির কথা বলে।

মিসেস আয়েশা মাহাদকে বলে,

"তোর বাবা কাল পিকনিকে যেতে পারবে বলেছে?"

"হ্যাঁ, যাবে। সাথে আমার এক ফুফুর ছেলেও আসবে। সেও ইউএস থেকে দেশে এসেছে বিজনেসের কিছু কাজে। বাবার সাথে দেখা হয়েছিলো কাল। আমাদের সাথে পিকনিকে জয়েন করতে বলেছে বাবা।"

"তো সে দাওয়াত গ্রহণ করেছে? নাকি আন্দাজে বলছিস আসবে।"

"আরেহ আসবে। বাবাকে কনফার্ম করেছে। কালই তো আমাকে বললো।"

"আসলে ভালো। এদেশ সেদেশ থেকে থেকে আজকাল সবাই আত্মীয় স্বজনদের থেকে দূরে দূরে হয়ে যাচ্ছে। সম্পর্কগুলোও কেমন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সেখানে একসাথে যখন হয়েছিস, সবার সাথে ভালো একটা সময় কাঁটাতে পারলে মনে শান্তি আসবে।"

মাহাদ মাথা নাড়ায়। ততোক্ষণে প্রাণেশার কফি বানানো হয়ে গিয়েছে। সে মাহাদের হাতে কফিটা দিলে মিসেস আয়েশা বলেন,

"তুমিও যাও। এখানে আর তেমন কাজ নেই। যা আছে আমরা করে নিতে পারবো।"

প্রাণেশা শাশুড়ির কথায় চলে যেতে নেই। কিন্তু হঠাৎ অন্তিককে এদিকে আসতে দেখে সে থমকায়। কি করবে বুঝতে না পেরে দাড়িয়েই থাকে। অন্তিক এসে প্রাণেশার কাছে গিয়ে দাড়ায়। তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

"এক কাপ কফি দাও মা।"

প্রাণেশায় দাড়িয়ে ছিল কফি মেকারের পাশে। অন্তিকের কফি চাওয়ায় সে একবার শাশুড়ির দিকে তাকায়। উনি ইশারায় আস্বস্ত করলে সে কফি বানাতে শুরু করে আবার। অন্তিক প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে মাকে বলে,

"কফি যেন ৫ মিনিটের ভেতর আনা হয়?"

অন্তিকের মা প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে এমন কড়া গলায় কথা বলাতে বিরক্ত হন। এই ছেলে শুধ্রাবার নয়। কাল রাতেই কত সুন্দর করে বুঝিয়েছে মেয়েটার মন বুঝে সম্পর্কটা ঠিক করার চেষ্টা করতে। আর আজকেই ধমকা ধমকি শুরু করেছে।

কিন্তু সবার সামনে কিছু বলেননা। তবে মাহাদ চুপ থাকেনা, সে অন্তিক এখানে আসার পর থেকে এই দুই স্বামী-স্ত্রীকেই দেখছিলো। অন্তিক কিচেনে এসে কফি চাইবে এমন ছেলে তো নয়, যেখানে ড্রয়িং রুমে বোনেরা আছে। আবার এসেই প্রাণেশার দিকে দৃষ্টি সুবিধার ছিলোনা। যদিও কারণটা একটু আদটু আন্দাজ করতে পারছে সে। আর আন্দাজ করতে পেরেই তার খুব মজার লাগলো ব্যাপারটা।

নিজের কফি মগে এক চুমুক দিয়ে বলে বসে,

"অন্তিক ভাইয়ের বেজা আজ বোধ হয় গরম ভাবির উপর। সে পার্সোনাল ব্যাপার সেপার জেনে আমাদের লাভ নেই। কিন্তু ড্রয়িং রুমে অয়ন্তির থাকা সত্ত্বেও সোজা কিচেনে এসে কফি চাওয়ার সায়েন্সটা বুঝতে পারছিনা। জনস্বার্থে বুঝিয়ে বললে ভালো হতো।"

অন্তিক মাহাদের দিকে তাকায়। ৫ সেকেন্ডের মতো তাকিয়ে সে মাহাদকে ড্রয়িং রুমে আসতে বলে। তারপর আরেকবার প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে নিজেও চলে যায়।

মিসেস আয়েশাও মাহাদের কথায় অন্তিকের এখানে এসে কফি চাওয়ার বিষয়টা খেয়াল করেন। তারপর প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে তার চলে যাওয়াটাও নীরব চোখে দেখেন।

——————

অন্তিক মাহাদ, দিগন্তের সাথে সোফায় বসেছে। কাল পিকনিকে ইরফানও জয়েন করবে। তাকে আবার পাঠিয়ে দিয়েছিলো রিহ্যাবিটেশনে। সেখান থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরেছে ৪ দিন হলো। তাই সে নিজের বন্ধুকেও ডেকে নিয়েছে পিকনিকে। এমনিতেও ডক্টর বলেছে এই ধরণের ফ্যামিলি গেদারিং এ রাখতে ইরফানকে বেশি বেশি।

সেখানে তার নিজের পারিবারিক পিকনিকে প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে না আনার প্রশ্নই আসেনা। ইরফান আগেও এ বাড়িতে এসেছে। সকাল বিকাল প্রচুর এসেছে। এমনকি অন্তিক যখন ক্যারিয়ারের জন্য বিদেশে ব্যস্ত তখনো সে এ বাড়িতে এসেছে। এ বাড়ির প্রত্যেকের সাথে তার খুব সুন্দর বন্ডিং।

এমনকি তারা ইরফানের ড্রা/গ এডি/ক/শনের ব্যাপারটাও জানে। তারাও যথেষ্ট সাপোর্ট দিয়েছে ইরফানকে। ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলেটার একাকিত্বে তারা খুব সঙ্গ দিতে চাইতো, কিন্তু ছেলেটা স্বেচ্ছায় তেমন কোলাহলে যেতে চাইতোনা।

এই যে এই বাড়িতেও আসতো, সেসব এ বাড়ির মানুষগুলোর দিন রাত তার খোঁজখবর নেওয়া, তার কষ্টে পাশে থাকতে চাওয়া, অন্তিকের ভাই-বোন গুলোর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, এসব দেখে তাদের প্রতি করুনা দেখিয়ে আসতো বলতে গেলে।

তিন ভাই পিকনিকে পরিবারের সিকিউরিটি ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলছে।

এদিকে প্রাণেশা খুব দ্বিধায় আছে। তার অন্তিকের কফিটা নিজের হাতে নিয়ে যেতে ইচ্ছে করছেনা। ভয় করছে বলতে গেলে। কেনো সে জানেনা। কিন্তু অবচেতন মন অন্তিকের জন্য নিজের হাতে কফি নিয়ে যেতে ভয় পাচ্ছে। সাথে সংকোচও লাগছে তার। এতোগুলো মানুষের সামনে সে ঐ লোকটাকে সামনা সামনি নিজের হাতে কফি দিবে।

এটা তার কাছে কেন জানি অস্বস্তিকর লাগছে। এদিকে তার যাবে না যাবে ভাবনায় কফিটাও ঠাণ্ডা না হয়ে যায় সে ভয়ও পাচ্ছে মেয়েটা। ইশিকে ওখান থেকে উঠে এদিকে আসতে দেখে সে যেনো একটা উপায় পেলো। তাড়াতাড়ি তার সামনে গিয়ে দাড়ায় প্রাণেশা।

ইশি হঠাৎ প্রাণেশাকে এভাবে পথ আঁটকে দাড়াতে দেখে জিজ্ঞেস করে,

"কিছু বলবে ভাবি?"

প্রাণেশা মাথা উপর-নিচ ৩/৪ বার মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বোঝায়। ইশি জিজ্ঞেস করলে সে অনুরোধ করে কফিটা তার ভাইকে দিয়ে আসতে। কিন্তু ইশি নিজেই ওখান থেকে উঠে এসেছে দিগন্তের থেকে বাচঁতে।

সেখানে আবার যেতে হবে? নিজের বড় ভাইয়ের সামনে সে কারো অমন গাঁঢ় নজরে পড়তে চায়না। অস্বস্তি হয় তার। তার উপর ঐ বাঁকা নজর ওয়ালা যখন তারই চাঁচাতো ভাই। তার খালি মনে হয় এই বুঝি কেউ দিগন্ত ভাইয়ের তার প্রতি অমন নজর দেখে নিলো। সেখানে তার তীক্ষ্ণ বুদ্ধির বড় ভাইয়ের সামনে এসব চালাকি। তার খালি মনে হয় এই বুঝি তার ভাই, বড় বোন কিংবা বাড়ির বড় কেউ এসে বললো, "ইশি, তুই দিগন্তের থেকে দূরত্ব বজায় রাখবি আজ থেকে..." ইশ!! কি অস্বস্তিদায়ক ব্যাপার!

তাই সে তার ভাবিকে বললো, "সামান্য কফিই তো। দিয়েই আসোনা। কিছু বলবেনা আমার ভাইয়া দেখে নিও। কালকের জন্য সে যথেষ্ট অনুতপ্ত। দেখোনি কেমন মায়ের বকুনি খেয়েও কোনো জবাব দেইনি।"

প্রাণেশা জানেনা কিসের বকুনির কথা বলছে ইশি। কিন্তু সে অতো মাথা ঘামালোনা এতে। খুব রিকুয়েস্ট করলো ইশিকে কফিটা দিয়ে আসতে।

ইশি ওর এতো অনুরোধ দেখে না গিয়ে পারলোনা।

ইশি কফিটা নিয়ে যেতেই প্রাণেশা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

ভালোবাসার বাংলা রোমান্টিক গল্প - মৌনপ্রেম

অন্তিকদের আলোচনা শেষ। এমনিতেই বসে আছে তারা সোফায়। নিজেদের কর্ম জীবন নিয়ে, দেশের পরিস্থিতি নিয়ে এটা সেটা গল্প করছে তারা।

এর মধ্যে ইশি কফির মগটা তার ভাইকে দিতে এলে সে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। মেয়েটা কোথায়? কফি তো তার আনার কথা ছিলো।

"সে কই?"

ইশি ভ্যাবাচ্যাকা খায়। কাকে খুঁজছে ভাইয়া? ভাবিকে? কিন্তু এতোজনের মাঝে ভাবির কথা জিজ্ঞেস করবে বলে মনে তো হয়না। তাই সে জিজ্ঞেস করে,

"সে কে?"

অন্তিক বিরক্ত চোখে বোনকে দেখে। ইশি তাকে এভাবে তাকাতে দেখে বলে,

"মানে, তুমি কার কথা বলছো বুঝতে পারছিনা তো ভাইয়া।"

"তোর ভাবি কোথায়?"

"ভাবি? ভাবিতো আসলোনা। আমাকে দিয়ে পাঠিয়েছে কফিটা। তোমাকে বোধ হয় ভয় পাচ্ছে। সবসময় বকো তাই।"

"সে বলেছে আমি তাকে সবসময় বকি?"

"বলতে হবে কেনো? আমি কি বুঝিনা?"

"সবসময় বেশি বুঝলে কানের নিচে একটা লাগিয়ে দেবো। যা এখান থেকে।"

"হ্যাঁ। তোমরা তো পারো শুধু কানের নিচে লাগাতে। নিজেকে একটু শুধরে নাও সময় থাকতে। নাহলে বউ টিকবেনা দেখে নিও।" - সে যেতে যেতে বলে।

অন্তিক ওর কথায় পাত্তা না দিয়ে কফির স্বাদ নেই।

"ইশি কিন্তু ভুল কিছু বলেনি ব্রো। সময় থাকতে শুধরে যাও। একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে শেখো। পারলে দিগন্তের থেকে সামনে বসে শখের রমণীর ঝগড়া উপভোগ করার ট্রেনিং নাও। নাহলে বউ টিকবেনা।" - মাহাদ রসিকতা করে বলে।

অন্তিক মাহাদের কথা শুনে পাশে বসা দুই ভাইয়ের দিকে একপলক তাকিয়ে কফিটা শেষ করতে মনোযোগ দেই আবার।

দিগন্ত শান্ত চোখে মাহাদের দিকে তাকায়। বেয়াদবটা তাকে মারা খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। তা নাহলে এভাবে অন্তিকের সামনে এতো সলিড হিন্ট দেওয়ার কি দরকার। যদিও সে ইশির প্রতি নিজের অনুভূতি পরিবারকে জানাতে ভয় পাবে বা সংকোচবোধ করবে এমন নয় মোটেও। কিন্তু সবকিছুর একটা সময় থাকে।

——————

প্রাণেশা ইশিকে কফিটা ধরিয়ে দিয়ে আবার কিচেনে চলে গিয়েছিলো। ড্রয়িং রুমে সবার আওয়াজ কমতেই সে গুটি গুটি পায়ে সেখানে আসে। না, কেউ নেই। সবাই এখন যার যার রুমে। তারও এখানে আর কাজ নেই। যদিও শুরু থেকেই তেমন কাজ ছিলোনা, কিন্তু অন্তিকের সামনে পড়বেনা বলে সে পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়েছে এতক্ষণ।

এবার অন্তিক আশেপাশে নেই দেখে সে নিশ্চিন্ত মনে চললো নিজের রুমের দিকে। প্রাণেশা তার আর্ট বুক এখনো অন্তিকের থেকে নিয়ে আসতে পারেনি। আর কালকের ঘটনার পর আজকে গিয়ে আবার ওটা খোঁজার প্রশ্নই উঠেনা। এমনকি সে ভেবে রেখেছে সামনের বেশ কিছুদিনও সে অন্তিকের সামনে পড়বেনা আর।

সেখানে ঐ বেশ কিছুদিন তার আর্ট বুক পাওয়ারও প্রশ্ন উঠেনা। অবশ্য শাশুড়ি মাকে বললে ওটা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু উনাকে গিয়ে বললে যদি বলে যে "তুমি যাও, অন্তিক কিছু করবেনা আর। আমি বলছি।" - এমন বললে সে শাশুড়ির কথা অমান্য করে না গিয়ে পারবেনা। কারণ আজকে তার কথা অমান্য করে কফি দিতে যায়নি এতেই তার খারাপ লাগছে।

আবার শাশুড়ি মা তার ছেলে কিছু করবেনা এমনটা বললেও সে তো জানে উনার ছেলের আসল রুপ।

তাই কোনোভাবেই যাওয়া যাবেনা উনার কাছে এটা বলতে। আবার উনার কাছেই উনার ছেলের আসল রুপ দেখিয়ে দিতে চেয়ে বদনাম করবে, এমনটাও প্রাণেশার দ্বারা সম্ভব না কোনোকালেই। এতে যদি এখন যে মায়ের মতো স্নেহটা পায় সে , সেটা হারিয়ে ফেলে? না সে এই রিস্ক নেবেনা।

যেহেতু আর্ট বুক নেই। তাই সে ভাবলো বড় ক্যানভাসে কিছু আঁকবে সে। কি ফুটিয়ে তোলা যায় আজকে ক্যানভাসে তা ভেবে ভেবেই যাচ্ছে সে।

কিন্তু হঠাৎ অন্তিকের রুম ক্রস করে যাওয়ার সময় অন্তিক তাকে হাত ধরে আটকে নেই।

যদিও প্রাণেশা প্রথমে এটা যে অন্তিকের কাজ তা বুঝতে পারেনি। খুব ভয় পেয়ে যায় সে। তারপর অন্তিককে দেখে সে ভয় দ্বীগুণ হয়। সাথে কাল রাতের কথা মনে পড়তেই

অস্বস্তিরা দানা বাধে তার মনে।

সে হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়।

"একদম সোজা হয়ে দাঁড়াবে তুমি।"

কেউ দেখতে পাচ্ছে কিনা বুঝতে এদিক ওদিক তাকিয়ে সে আবার হাত ছাড়িয়ে নিতে চায়।

অন্তিক ওকে আরও শক্ত করে ধরে বলে, "এদিক ওদিক তাকানোর কোনো দরকার নেই। কেউ দেখছেনা আমাদের। আমার দিকে তাকাও তুমি।"

প্রাণেশা তাকায়না। অন্তিকের চোখে চোখ রেখে তাকানোর সাহস করতে পারছেনা কেনো জানি। লজ্জ্বা লাগছে, ভয় করছে।

"কাল তো একটু ছুঁতে না ছুঁতেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে। আজ এতো তিড়িং-বিড়িং করছো যে?" তারপর আরেকটু কাছে টেনে নিয়ে বলে, "আবার অজ্ঞান হওয়ার ব্যবস্থা করবো নাকি।"

প্রাণেশা লজ্জ্বায় গুটিয়ে যায়। আর নড়াচড়া করেনা। পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে সে এক দৃষ্টিতে।

অন্তিক ওকে শান্ত হতে দেখে বলে, "গুড। এভাবেই স্থির হয়ে থাকবে আমি ধরলে। এবার বলো আমি বলার পরও কফিটা নিজে নিয়ে না এসে ইশিকে দিয়ে পাঠিয়েছো কোন সাহসে?"

প্রাণেশা চুপ করে দাড়িয়ে আছে। কোনো উত্তর দিচ্ছেনা। অন্তিক ওর নীরবতা দেখে বলে,

"উত্তর দিচ্ছোনা কেনো?"

প্রাণেশা চোখ পিটপিট করে তার দিকে তাকায়। আর সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে বোঝায়,

"আর হবেনা, সরি।"

অন্তিক ওর উত্তর বুঝে একটু শান্ত হয়। তারপর বলে,

"কিচেনে মাহাদের সাথে এতো কিসের হাসাহাসি তোমার? মাহাদ জোক্স বলে?"

প্রাণেশা নির্বোধের মতো তাকায়। সে কবে মাহাদ ভাইয়ার সাথে হাসাহাসি করলো? আর কারো কথা শুনে হাসি পেলে হাসা যাবেনা? সেটা জোক্স হতে হবে?

মনের মধ্যে এসব প্রশ্ন এলেও সে প্রকাশ করলোনা। পাছে না আবার রেগে যায়। তারপর আবার জোরজবরদস্তি করে। তার চেয়ে যা বলবে তাতে সায় জানানো হবে বুদ্ধিমানের কাজ। কিন্তু তার এই প্রশ্নে সায় জানালেও সমস্যা। তাই সে নীরবতা পালন করলো।

"কি হলো, আবার চুপ করে গেলে যে? উত্তর নেই? নাকি আমার সাথে কথা বলতেই তোমার যতো সমস্যা?"

প্রাণেশা এবার অন্তিকের দিকে একপলক তাকিয়ে হাত দিয়ে সাইন ল্যাঙ্গুয়েজে বোঝায়, "আর হাসবোনা। সরি"

অন্তিক এবার বিরক্ত হয়, ভীষণ বিরক্ত। একেতো সে নিজের উপর বিরক্ত, কারণ সে কি করছে, কি বলছে তার পেছনে কোনো যুক্তি সে নিজেই দাড় করাতে পারছেনা।

আর এই মেয়েও এর কোনো বাখ্যা দেখাতে পারবেনা তাকে। কিন্তু বাখ্যা দেখাবে পরের কথা। এই মেয়ে এতো নির্বোধ, যে কোনো কিছু আচ ও করতে পারছেনা।

উফ..উফ.. তার ইচ্ছে করছে নিজের চুলগুলো ছিঁড়ে ফেলতে। সে কিছুক্ষণ বিরক্ত হয়ে এদিক ওদিক তাকায় অস্থির ভঙ্গিতে।

তারপর একপলক প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ ওকে টেনে রুমের ভেতর ঢুকিয়ে দরজা লাগিয়ে দেই।

প্রাণেশা কিছু বুঝতে পারবে তার আগেই তার পিঠ ঠেকে দেয়ালে। আর অধরের ভাজে অন্য এক অধরের অস্তিত্ব টের পায়।

ব্যাপারটা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলেও বোঝার সাথে সাথে তাকে দুহাতে ঠেলে সরাতে চায়। কিন্তু সামনের জনকে এতোটুকু টলাতে পারেনা। উল্টে অধরে অধরে মিলন আরো জোরালো হয়ে উঠে। সামনের জন নিজের অনুভূতি বুঝতে না পারার রাগ, বিরক্তি, অস্থিরতা, দ্বিধা সব একেবারে উগরে দিচ্ছে প্রাণেশার ঐ গোলাপের পাপড়ির মতো দেখতে অধরে। এভাবে কয়েক মিনিট চলতে থাকে।

তারপর অন্তিক মেয়েটার অধর ছেড়ে দেই, কিন্তু তাকে ছাড়েনা। মেয়েটা নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলছে, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। অন্তিক ওর মাথাটা নিজের বুকের সাথে লাগিয়ে হাত বুলিয়ে দেই। এভাবে কয়েক মিনিট কাঁটে। তারপর প্রাণেশা স্থির হলে অন্তিকের বুক থেকে মাথা তুলে তার দিকে হালকা থুথু ছুড়ে দৌড়ে দরজা খুলে চলে যায়।

অন্তিক প্রাণেশার তার দিকে থুথু ছুড়াতে মাথাটা হালকা কাত করে নিয়েছিলো। ও চলে যেতেই সোজা হয়ে গাল থেকে ঐ থুথু হাত দিয়ে মুছে নেই। তারপর স্বাভাবিক ভঙ্গিতে গাঁয়ের শার্টটা খুলে নিয়ে রুমের লাইট নিবিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে। সে এখন ঘুমাবে।

মৌনপ্রেম পর্ব ১৬ গল্পের ছবি