মৌনপ্রেম

পর্ব - ১৫

🟢

অন্তিক ব্যাল্কনিতে দাড়িয়ে অবিরত সিগারেটের ধোঁয়া উড়াচ্ছে। তার মনটা ভীষণ অশান্ত। অথচ বাইরে থেকে দেখে তা বুঝার উপায় নেই।

যা ঘটেছে তার গভীরতা তখন বুঝতে না পারলেও এখন বেশ পারছে। রাতের এই কালো আকাশের পানে চেয়ে সে ভাবছে, কি চেয়েছিল আর কি হয়ে গেলো।

অন্তিক তখন প্রাণেশাকে ডেকে বিছানায় তার পাশে বসিয়ে তার পরিবার সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলো। প্রাণেশা অন্তিকের হঠাৎ এসব জানতে চাওয়ায় অবাক হলেও ইশারায় তার মামা বাড়িতে কে কে ছিল সব বোঝায়। অন্তিক তার অন্য কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আছে কিনা জানতে চাইলে প্রাণেশা লিখে বলে,

"আমি ছোট থেকে নানা বাড়িতে ছিলাম। তারপর নানা নানী আর মা মারা গেলে মামা তার পরিবারসহ আমাকে নিয়ে এখানে শিফট হয়। তারপর থেকে এখানেই আছি। বাবার দিকের কোনো আত্মীয়কে চিনিনা। আমার মা নানা নানীর পালিত সন্তান ছিলেন, তাই মায়ের দিকের আত্মীয় বলতে মামার চাচা ফুফু, খালা মামা এসবই। আমার মা যেহেতু পালিত সন্তান ছিলেন তাই তারা মায়েরই তেমন কোনো খোঁজ নিতোনা, আমার নিবে তো পরের কথা। সবদিক থেকে দেখতে গেলে আমার একমাত্র আত্মীয় বলুন কিংবা আশ্রয়, সব মামাই। যাকে সেদিন আপনার জন্য হারিয়ে ফেলেছি।"

অন্তিক পুরো লেখাটা পড়ছিলো মনোযোগ দিয়ে। যা বুঝেছে তাতে দাড়ায়, প্রাণেশার দুকূলে ঐ মামা মামী ছাড়া আর কেউ নেই। একেতো শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, তার উপর পরিবারহীন। প্রাণেশার পরিস্থিতি বুঝে দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। কিন্তু শেষ লেখাটা পড়ে সে খুব অবাক হয়। সেদিনের ওসব ঘটনার জন্য সে দ্বায়ী?

অবাক স্বরে অন্তিক জিজ্ঞেস করে,

"সেদিনের ঘটনার জন্য তুমি আমাকে দ্বায়ী করছো?"

প্রাণেশা লিখে বলে,

"তা নয়তো কি? ঐ রুমে আগে থেকে আমি ছিলাম। আমার জ্বর ছিল বলে অস্বস্তি হচ্ছিলো খুব। একটু চোখে মুখে পানি দিয়ে রেস্ট নিতে গিয়েছিলাম। কনের বাবা মামার বন্ধু হয়, উনিই ব্যাবস্থা করে দিয়েছিলেন। যেখানে আগে থেকেই একজন ছিল সেখানে গিয়ে কাপড় চোপড় খুলে ফেলার মানে কি? আপনার কি পুরো রিসোর্টে অতো গুলো রুম ফেলে আমি যেখানে ছিলাম সেখানেই যেতে হবে? আর কোনো রুম ছিলোনা? শুধুমাত্র আপনার জন্য আমি আমার একমাত্র আশ্রয়টা হারিয়েছি। একটা মামাই ছিলো আমার মাথার উপর হাত রাখার মতো। সে এখন আমার চেহারাটাও দেখতে চায়না।"

"তোমার মামাকে আমি বলেছি? যাতে তোমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেই। তোমাকে ভুল বুঝে?"

প্রাণেশা আবার লিখতে থাকে,

"বলেননি। করে বুঝিয়েছেন। মামা মামী তখন এমনিতেও আরশি আপুর ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তাও নিজেদের শক্ত দেখাতে স্বাভাবিক আচরণ করছিলো। বিয়েতে এসেছিলো আমাকে আর আরিভ কে নিয়ে। এর মধ্যে এমন একটা ঘটনা। মামী তো মনে করে আরশি আপু পালাবে তা জেনেও তাদের জানায়নি আমি, সাথে আমারও কারো সাথে সম্পর্ক আছে ভাবে সে। ভাগ্যিস মামা তখন বিশ্বাস করেনি এসব। কিন্তু তখন মামীর কথায় কান না দিলেও আপনার সাথে আমাকে দেখে হয়তো আর বিশ্বাস রাখতে পারেনি আমার উপর।"

"তো সে দ্বায় আমার না। তোমার আরশি আপুর। সে পালানোর আগে তোমার যে এতে হাত নেই জানিয়ে যায়নি। তাহলে তোমার মামা মামীর তোমাকে ভুল বোঝার দ্বায়ভার আমার হয় কি করে?"

প্রাণেশা অন্তিকের কথা শুনে বিরক্তি চোখে তাকিয়ে লিখে

"আপনি কি পাগল? আরশি আপু পালাবে, আর পালানোর আগে বলে যাবে যে সে পালাবে, আর এতে আমার কোনো হাত নেই! তাইনা?? যত্তসব।"

"বিরক্তি দেখাচ্ছো কাকে তুমি? হিউম্যান সাইকোলোজি বুঝো? বাড়িতে দুবোন থাকলে তাদের একজন যদি পালায় তাহলে অন্য বোন এসব জানে, এমনটা যে কেউ ভাববে। বরং সবার আগে এটাই মাথায় আসবে। তাহলে তুমি যখন তাদের নিজের সন্তান না তখন তারা নিজেদের অবচেতন মনে তোমাকেই বার বার দোষী দেখিয়ে রাগ মেটাতে চাইবে, স্বাভাবিক। তাই তোমার বোনের কোনোভাবে নিজের বাবা মাকে এটা বুঝিয়ে যাওয়া উচিত ছিল যে তুমি নির্দোষ।"

অন্তিকের যুক্তি শুনে প্রাণেশা এবার একটু দমে যায়। সে তো ভুলেই গিয়েছিলো উকিল সাহেবের সাথে তর্কে জেতা অতো সহজ না। তবে এই লোক পুরো ঘটনায় নির্দোষ, এটা প্রাণেশা কিছুতেই মানেনা। আরশি আপুর কিছু ভুল আছে ঠিক। কিন্তু উকিল সাহেবেও মোটেও নির্দোষ না। তবে সে এসব আর লিখে দেওয়ার সাহস করতে পারেনা। তাই এসব ভেবে ভেবে অবচেতন মনে গাল বাকিয়ে একটা ভেংচি কাটে অন্তিককে।

কিন্তু অন্তিক আগে থেকেই প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে মনে মনে অনেক কিছুই ভাবছিলো। তার মোটিভ ছিল ডিভোর্স পেপারে সাইন নেওয়া। কিন্তু মেয়েটা যদি ডিভোর্স নিয়ে এ বাড়ি থেকে চলে যেতে চায় আত্মসম্মান দেখিয়ে, তাহলে কোথায় যাবে? তাই আগে তার কোনো নিকট আত্মীয় আছে কিনা জেনে নিতে চেয়েছিল যেখানে সে এ বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর যেতে পারে। কিন্তু এখন তো সব গরমিল হয়ে গেলো। এসব ভেবে চিন্তিত মুখে প্রাণেশার দিকে চোখ দিলে দেখতে পায় মেয়েটা তাকে আবার সেদিনের মতো ভেংচি কেটেছে। আচ্ছা বেয়াদব মেয়ে। তাকে ভয়ও পাচ্ছেনা। তার রুমে, তার পাশে বসে তাকেই ভেংচি কাটছে। সে রেগে প্রাণেশাকে বললো,

"তোমার এই স্বভাব এখনো যায়নি? স্টুপিড.."

প্রাণেশা হঠাৎ তার কথা শুনে ইশারায় বোঝায়, "আপনি ষ্টুপিড কাকে বলছেন?"

"এ বাড়িতে আর কয়জন ষ্টুপিড আছে?"

"তার মানে আমাকে? আপনি আমাকে ষ্টুপিড বলবেন কেন বার বার?" সে লেখাটা লিখে রাগী ভঙ্গিতে দেখায় অন্তিককে।

"চোখ রাঙিয়ে কথা বলছো কার সাথে তুমি?"

"আপনার সাথে। আপনি আমাকে বার বার অপমান করবেন, ষ্টুপিড ডেকে। আর আমি চোখ রাঙালেই দোষ।" - ইশারায়

অন্তিক তার কথা বুঝতে পেরে বলে, "তুমি আমাকে ভেংচি কাটবে বার বার আর আমি ষ্টুপিড ডাকলেই দোষ।"

"আমি আপনাকে কবে ভেংচি কেটেছি। নাকি এখনো সেদিনের ব্যাপার নিয়ে পড়ে আছেন। আমি কিন্তু সরি বলেছিলাম। তাই একটা ব্যাপার নিয়ে বারবার লাগতে আসবেননা।" - ইশারায়

"তোমার সাথে লাগতে আসার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আর মিথ্যাও তো বলতে জানো দেখছি বেশ।"

প্রাণেশা হাত নেড়ে বোঝায়, "কি মিথ্যা বলেছি আমি?"

"এই মাত্র ভেংচি কাটোনি আমাকে?"

"আপনাকে ভেংচি কাটুক আপনার মুখ।" এই বুঝিয়ে সে আবার ভেংচি কেটে চলে যেতে চাইলে অন্তিক তাকে ধরে ফেলে। কিন্তু প্রাণেশা মোটেও দমে যায়নি এবার। সে নিজের হাত ছাড়াতে নেই গাঁয়ের সমস্ত জোর দিয়ে। এভাবে দুজনের মধ্যে হাতাহাতি লেগে যায়। এক পর্যায়ে অন্তিক ওকে নিজেও জোরে একটা টান দিলে দুজনেই একসাথে বিছানায় পড়ে যায়।

প্রাণেশার গাঁয়ের উপর পড়েছে অন্তিক। কারণ প্রাণেশায় পড়তে নিচ্ছিলো, কিন্তু নিজেকে বাচাতে অন্তিককে ধরতে গেলে সেও প্রাণেশার গাঁয়ের উপর পরে। প্রাণেশা মুখে সরতে বলতে পারছেনা বলে অন্তিককে বার বার হাত দিয়ে ঠেলতে চায়।

অন্তিক নিজেকে ব্যালেন্স করবে তার আগেই এই মেয়ে এমন ভাবে তাকে ঠেলছে দেখে তার মাথা গরম গিয়েছে। সে ওভাবেই প্রাণেশার দুই বাহু ধরে শক্ত করে আর চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে বলে,

"এমন ভাব করছো যেন কোনো পরপুরুষ পড়েছে গাঁয়ের উপর।"

অন্তিকের এমনভাবে মুখের সামনে এসে কথাটা বলায় দুজনের ঠোঁট প্রায় কাছাকাছি এসে গিয়েছে। তার নিঃশ্বাস এসে পড়ছে প্রাণেশার মুখে। তাই সে অস্বস্তি নিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেই অন্যদিকে। অন্তিক এতে আরো রেগে যায়। ওর গাল ধরে আবার নিজের দিকে ফেরায়।

"আমাকে অবজ্ঞা করার সাহস দেখাও তুমি। অথচ ইউনিভার্সিটি গিয়ে ছেলে পেলেদের থেকে প্রেম পত্র তো ঠিকই নাও। আমার সামনে এতো ভালো সাঁজতে হবেনা। তোমাকে আমার বোঝা হয়ে গিয়েছে।"

প্রাণেশা অন্তিকের এমন কথা শুনে রেগে যায়। তাকে চরিত্রহীন বোঝাতে চাচ্ছে লোকটা? স্বামীকে অবজ্ঞা করে অন্যদের চিঠি নেই সে? দেখেছে ঐ চিঠিটা প্রাণেশা। কিন্তু সে খুজে খুঁজে চিঠি নেইনি, আবার বলছে তাকে বোঝা হয়ে গিয়েছে। হ্যাঁ। এতে দাড়ায় তার চরিত্রে প্রশ্ন তুলছে নিজে চরিত্রহীন হয়ে। তার স্বামী যদি এই লোক না হতো তাহলে বিয়েটা যেভাবেই হোক সে মেনে নিতো। কিংবা অন্তিক হলেও ভাবা যেতো যদি তাকে শুরু থেকে মানেনা মানেনা বলে মুখে ফেনা তুলতো। কিন্তু মানুষটা তাকে স্ত্রীর কোনো মর্যাদা দেইনি। তাহলে সে স্বামীকে অবজ্ঞা করবেনা তো কি করবে? আবার তার চরিত্রে প্রশ্ন তুলছে? সে রেগে কি করবে হুশ জ্ঞান খুইয়ে ফেলেছে।

হাত অন্তিকের কাছে বন্দি থাকায় হঠাৎ ওকে ঘাড়ে কামড় দিতে চায়। কিন্তু সফল হয়নি।

এতে অন্তিক ওকে ব্যাঙ্গ করলে রেগে আবার ঠোঁটে কামড় দেই। ব্যাস। এতেই যা ঘটার ঘটে গেলো।

——————

অন্তিক নিজের ভাবনা শেষে শেষ হওয়া সিগা/রেটটা ফেলে দিয়ে রুমে আসে আবার।

কিন্তু রুমে এসে প্রাণেশাকে এখনও ওভাবে শুয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়। সে তো ভেবেছিলো মেয়েটা চলে গিয়েছে। অন্তিক ওকে শান্ত হয়ে চলে যাওয়ার জন্যই ব্যাল্কনিতে গিয়ে স্পেস দিয়েছিলো। কিন্তু এখনো যায়নি। উপরন্তু যেভাবে ছিল এখনও সেভাবেই পড়ে আছে শরীরটা। সে কাছে আসে। না... এখনও কোনো হেলদোল নেই মেয়েটার। খেয়াল করে প্রাণেশার চোখ বন্ধ। এবার অন্তিক সন্দেহ নিয়ে একেবারে কাছে এসে ওকে গালে হাত দিয়ে ডাকতে চায়। কিন্তু তার আগেই বুঝে যায় মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে আছে।

অন্তিক বিরক্তিতে মুখ দিয়ে চ সূচক শব্দ বের করে। তারপর নিজে নিজে বলে,

"সামান্য একটা চুমু নিতে পারলোনা।" তারপর আবার ভাবে, না... সে তো চুমু দেইনি। দিয়েছে কামড়। কিন্তু কামড় খেয়েও অজ্ঞান হতে হবে? বিয়েটা স্বাভাবিক হলে এতদিনে.. অন্তিক আর ভাবেনা, শুধু প্রাণেশার সারা অঙ্গে একবার চোখ বোলায়।

এর মধ্যে দিথী অন্তিককে ডাকতে আসে রাতের খাবার খেতে। সবাই নিচে অপেক্ষা করছে। বাইরে থেকে চেচিয়ে এই কথা বলে প্রাণেশা ভাবি, মেহেরিন আপু আর অয়ন্তি আপুকে ডাকতে চলে যেতে নেই। কিন্তু অন্তিক ওকে ডাক দিয়ে ভেতরে আসতে বললে সে এসে দেখে ভাবি অন্তিক ভাইয়ের রুমে শুয়ে আছে। সে এই রুমে কেন? দিথী অবাক হয় খুব, কিন্তু কিছু জানতে চায়না। ভাইকে জিজ্ঞেস করবে ভাবি তার রুমে কেন!! কি লজ্জ্বার ব্যাপার। তবে প্রাণেশাকে নির্জীব ভাবে শুয়ে থাকতে দেখে তার অদ্ভুদ লাগে।

সে ইতস্তত করে বলে, "ভাই, বলছিলাম ভাবিকে ঠিক করে শুইয়ে দাওনা। এভাবে বিছানার মাঝে, তার উপর বালিশ নেই মাথার নিচে। ঘাড় ব্যাথা করবে। আর না খেয়ে ঘুমিয়ে গেলো যে?"

"তোর ভাবি ঘুমায়নি। অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে সে।"

দিথী আতকে উঠে অন্তিকের কথা শুনে। অজ্ঞান হয়ে আছে মানে? কি হলো ভাবির। সে জানতে চাইলে অন্তিক বলে,

"দিগন্তকে ডেকে আন, যা। কি হয়েছে ওর থেকেই জেনে নিস।"

দিথী তাড়াতাড়ি যায়। ও যেতেই অন্তিক প্রাণেশাকে বালিশের উপর শুইয়ে দিয়ে গাঁয়ের উড়না ঠিকঠাক করে দেই। ওর চেহারার দিকে তাকালে দেখতে পায় চোখের পাতা ভেজা। কেদেছে বোঝায় যাচ্ছে। বাড়ির সবাই আসলে ওকে অন্তিকের রুমে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে দেখলে এমনিতে বাবা মায়ের কাছে নানান রকম প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তার উপর যদি ওর এই কান্নাভেজা চোখ দেখে, তাহলে না জানি কি কি অপবাদ দেই। তাই সে চোখ দুটো মুছে দিতে হাত বাড়ালো।

কিন্তু তার আগেই বাড়ি শুদ্ধ সবাইকে নিয়ে দিথী উপস্থিত। সবাই হুরমুরিয়ে তার রুমে ডুকে। অন্তিক বলেছিল দিগন্তকে ডাকতে, কিন্তু সবাইকে এভাবে আসতে দেখে অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকায়। সবার চিন্তিত মুখ দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আস্তে আস্তে উঠে গাঁয়ে একটা শার্ট জড়ায়।

একেতো প্রাণেশা অন্তিকের রুমে অজ্ঞান হয়ে আছে, তার উপর সে উদাম গাঁয়ে ছিল এতক্ষণ। ব্যাপারটা খেয়াল করলেও কেউ আপাদত কিছু বললোনা। উপরন্তু অন্তিককে এভাবে দেখে প্রাণেশা অজ্ঞান হলো কিভাবে সেটা জিজ্ঞেস করতেও সংকোচ লাগছে তাদের।

——————

স্টেথোস্কোপ কানে লাগিয়ে দিগন্ত প্রাণেশার পালস চেক করছে। বাড়ির সবাই এখনো আছে। প্রথমে অয়ন্তি আর মেহেরিন ছিলোনা। এখন তারাও উপস্থিত। অন্তিক সবার দিকে একপলক তাকিয়ে আবার প্রাণেশার দিকে নজর দেই। সে বেশ বুঝতে পারছে পুরো ঘটনা বাড়ির সবাই অন্যভাবে নিয়েছে। কিন্তু সে কাউকে কিছু এক্সপ্লেইন করলোনা।

দিগন্ত প্রাণেশাকে পরখ করে নিয়ে কান থেকে স্টেথোস্কোপ নামিয়ে বলে,

"সাইকোজেনিক সিনকোপের কারণে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে।"

অন্তিকের মায়ের চেহারায় চিন্তা স্পষ্ট, কিন্তু তিনি শুরু থেকে খুব গম্ভীর হয়ে আছেন। ওভাবেই বললেন, "বুঝিয়ে বল দিগন্ত।"

দিগন্ত চোখের ইশারায় হ্যাঁ বুঝিয়ে বলতে শুরু করে,

"রাগ, জেদ, উত্তেজনা কিংবা কেউ কোনো ভাবে কথার মাধ্যমে যদি আঘাত করে তাকে উপযুক্ত জবাব দিতে না পারা এসবের কারণে মানুষ এভাবে হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। কিংবা তীব্র লজ্জা বা হতাশা, জোর করে স্পর্শ, নিজেকে দুর্বল মনে করা আরও নানান ছোট ছোট কারণ মানুষকে অনেকসময় কিছু সময়ের জন্য ব্ল্যাকআউট করে দেই। ফলে সাইকোজেনিক সিনকোপের কারণে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। আর যা যা উদাহরণ বললাম সেসব সাইকোজেনিক সিনকোপ হওয়ার কারণ। প্রাণেশারও তাই হয়েছে।"

দিগন্তের কথাগুলো বলার সাথে সাথে সবার মধ্যে থমথমে ভাব বিরাজ করে। কেউ কোনো শব্দ করলোনা, শুধু অন্তিকের মা মিসেস আয়েশা গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, "জ্ঞান কবে আসবে?"

"কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে আসবে জ্ঞান। না ফিরলে অন্য ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। টেনশনের কিছু নেই বড় মা। আর আপাদত সবার রুম খালি করা উচিত। জ্ঞান ফেরার পর চারপাশে সবাইকে দেখে ঘাবড়ে যেতে পারে, সংকোচ আর অনিরাপদ মনে করতে পারে। এতে প্যানিক বাড়ার সম্ভাবনা আছে।"

সবাই রুম থেকে চলে যায়। শুধু অন্তিকের মা আর অন্তিক আছে।

অন্তিক বুঝতে পারছে এবার তাকে মায়ের প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। সে বিছানার একপাশে বসে, মাকেও বসতে বলে।

"বলো, তোমার যা যা প্রশ্ন আছে।"

"ওর এই অবস্থার কারণ জানতে চাইলে বাখ্যা করতে পারবে?"

"দিগন্ততো বলেই গেলো।"

"হেয়ালি না করে এক্সাক্টলি কি করেছো ঐটুকু মেয়ের সাথে তা বলো।"

"আমি আবার কি করবো। তোমার ঐ টুকু মেয়ে তো নিজেই সবকিছু ভেবে নেই। নিজেই রাগে, নিজেই জেদ করে, নিজেই অপমানিত বোধ করে কথায় কথায় আবার নিজেই অজ্ঞান হয়। দেখছোনা, কেমন অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে এখনো।"

"তোদের মধ্যে কি কথা বা অন্য কিছু হয়েছে না হয়েছে তা আমি জানিনা। কিন্তু মনে রাখিস স্ত্রীর মর্যাদা না দিয়ে কোনো মেয়ের কাছে যাওয়া সে মেয়ের জন্য খুব লজ্জ্বাজনক, আত্মসম্মানে আঘাত করে এসব। মেয়েটার এমিনতেও অসহায়ত্বের শেষ নেই। ওকে আর দুর্বল করে দিসনা। আর আগে কি বলেছিস না বলেছিস সেসব ভুলে গিয়ে এখন যখন ওর প্রতি আগ্রহ জাগছে তখন পারলে সম্পর্কটাকে ঠিক করার চেষ্টা কর। তবে আজকের ঘটনায় বোঝায় যাচ্ছে যে প্রাণেশা তোকে তেমন একটা মন থেকে স্বামীর জায়গা দিতে পারেনি। তাই আস্তে আস্তে ওর মন বুঝে সম্মতি নিয়ে সামনে এগাস। কোনোকিছুতে চাপ সৃষ্টি করিসনা। আজকের মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে।"

অন্তিক মায়ের কথার বিপরীতে কিছু বলবে তার আগেই প্রাণেশার জ্ঞান ফিরে। দুজনে ওর দিকে তাকায়। মিসেস আয়েশা একদম প্রাণেশার কাছে গিয়ে বসেছে। তারপর অন্তিককে বলেন বাইরে যেতে। সাথে প্রাণেশার জন্য উপরে খাবার পাঠাতে বলতে বলে কাউকে দিয়ে। মেয়েটা জ্ঞান ফিরে সবার আগে শাশুড়িকে দেখতে পায়।

তিনি জিজ্ঞেস করেন, "এখন কেমন লাগছে মা? পানি খাবে?"

প্রাণেশা মাথা নাড়ায়, খাবেনা। কিন্তু আস্তে আস্তে তার কোলে মুখ গুঁজে দেই। অন্তিককে দেখেনি সে। সে যে এখনো অন্তিকের রুমে আছে তাও খেয়াল করেনি।

মিসেস আয়েশা সামনে তাকিয়ে অন্তিককে এখনো দাড়িয়ে থাকতে দেখে চলে যেতে বলে গম্ভীর স্বরে। প্রাণেশা অন্য কেউ রুমে আছে বুঝতে পেরে মাথা তুলতে চাইলে মিসেস অয়েশা তা করতে দেননা। মাথাটা কোলে নিয়ে হাত বুলাতে থাকেন। প্রাণেশাও স্নেহটুকু পেয়ে আরো মুখ গুঁজে দেই।

অন্তিককে বলেন, "গিয়ে খাবার পাঠাতে বল এখানে, আর আজকে দিগন্ত, মাহাদ ওদের কারো সাথে ঘুমা গিয়ে। এখানে আমি আর প্রাণেশা থাকবো।"

অন্তিক এতক্ষণ নিজের মা আর বউ এর কাণ্ড দেখছিলো। তার মাকে পেয়ে কিভাবে আদুরে ছানার মতো কোলে মুখ গুঁজেছে মেয়েটা। অন্য কাউকে চোখেও দেখছেনা।

যা বুঝলো, তার মা আর বউ এর মধ্যে বেশ ভাব। খুব স্নেহ করে তার মা মেয়েটাকে। আর মেয়েটাও কারো মধ্যে মায়ের ছায়া পেয়ে নিজেকে সপে দিয়েছে।

এসব ভাবতে ভাবতে যখন মায়ের কথাটা কানে আসে, সে অবাক বনে যায়। মানে? সে নিচে গিয়ে বলবে তার মা আর বউ এর জন্য খাবার পাঠাতে উপরে? আবার রুমটাও ছাড়তে হবে? অদ্ভুদ। আরও কতো কি সহ্য করতে হবে মেয়েটার জন্য। ভেবে সে প্রাণেশার দিকে তাকায়।

কিন্তু প্রাণেশাকে একবার দেখে নিয়ে কোনোভাবে নিজেকে দমিয়ে শাশুড়ি বউকে বিরক্ত চোখে আরেক পলক দেখে সে চলে গেলো।

——————

মেহেরিনের পুরো ঘটনাটা ভাবছে, আর ক্ষণে ক্ষণে সে অবাক হচ্ছে, সাথে হৃদয় ভাঙ্ছে। সে অয়ন্তির রুমে গিয়ে ইচ্ছেমতো কেদেছে। অয়ন্তির সান্ত্বনাবাণী শুনে চোখে মুখে পানি দিয়ে খেতে বের হলে প্রাণেশার ঘটনাটা জানতে পারে। দিগন্তের বলা সব কথা শুনেছে সে, সাথে বুঝেছে প্রাণেশার অজ্ঞান হওয়ার কারণ। অন্তিক ভাইয়ের মেয়েটার প্রতি এতো ভালোবাসা, প্রেম। যে জোর করে কাছে পেতে চায়। সবার কথা অনুযায়ী বোঝা যায় অন্তিক ভাই প্রথমে বিয়েটা মানতোনা। কিন্তু অনেকদিন তো কেটে গিয়েছে। এখন হয়তো ভালো লাগছে প্রাণেশাকে, হয়তো সুন্দরী মেয়েটার প্রেমে পড়ে গিয়েছে। অস্বাভাবিক কিছু না। এমন সুন্দরী বউ থাকলে যে কেউ গলে যাবেই।

তার প্রথম প্রণয় পুরুষও গলে গিয়েছে। সে তাচ্ছিল্য হাসলো। সে ডাইনিং এ সবার সাথে খাচ্ছে। খেতে খেতে দেখলো অন্তিক ভাই এসেছে বউ আর মায়ের জন্য উপরে খাবার পাঠাতে বলতে। সাথে শোবার আগের প্রতিদিনের কফি আজ স্টাডি রুমে এনে দিতে বলেছে। কারণ তার রুমে তার বউ আর মা থাকছে আজ।

মেহেরিন খাবার খেতে খেতে নির্লিপ্ত ভাবে সব শুনলো। অন্তিক বাড়ি আসার আগে কার সাথে জানি ডিনার সেরে এসেছে, তাই খাবেনা বলে চলে গেলো আবার উপরে।

সে চলে যেতেই নির্লিপ্তভাবে খাবার খেতে থাকা মেহেরিনের চোখ দিয়ে এক ফোটা পানি গড়ায়।

মৌনপ্রেম পর্ব ১৫ গল্পের ছবি