মৌনপ্রেম

পর্ব - ১৪

🟢

রাত এখন ৮ টা বেজে ১৫ মিনিট। প্রাণেশা রুমে বসে সামনে একটা বই খুলে পড়ছে বিগত ২ ঘণ্টা ধরে। তার পড়া প্রায় শেষ। আর দুই/একটা টপিকে রিভাইস দিলেই হয়ে যাবে। ১৫ মিনিট পর সব পড়া শেষ করে সে বইটা বন্ধ করে রাখে। ব্যাল্কনিতে গিয়ে কিছুক্ষণ আকাশের পানে চেয়ে থাকে। এটা তার অভ্যাস। সময়ে অসময়ে কারণে অকারণে আকাশ দেখা। আকাশের দিকে তাকালে মনে হয় ওখান থেকে বোধ হয় তার মা তাকে দেখছে। সে তার মায়ের সাথে নানান কথা বলে ঐ দূর আকাশে চেয়ে চেয়ে। প্রাণেশা মনে করে তার সেসব কথা কেউ শুনতে পাক না পাক, তার মা ঠিকই শুনে। সে তার মাকে নানান অভিযোগ করে, আনন্দের সময় সব কারণ বলে, কষ্ট পেলে তাও বলে। নীরবে সব শুনবে বলেই না ওখানে গিয়েছে তার মা।

তার এই মুহূর্তে মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে। মাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মায়ের ছবিগুলো একটাও তার কাছে নেই। সব মামা বাড়িতে। সে মামা বাড়ি থেকে একটা জিনিসও নিয়ে আসার সুযোগ পায়নি। পাবে কি করে। বিয়ের পর থেকে আর মামা বাড়ি যাওয়াই হয়নি তার। একবার প্রাণেশার শ্বাশুড়ি তার ছেলেকে বলেছিলো নিয়ে যেতে বিয়ের দুই দিন পর। কিন্তু প্রাণেশার স্বামী তখন বিয়ের নাম টাও শুনতে পারতোনা। রেগে চোখ মুখ লাল করে এমনভাবে তাকাতো প্রাণেশার দিকে যে সে তার সামনে যেতেও ভয় পেত তখন। পরে অবশ্য আস্তে আস্তে মুটামুটি স্বাভাবিক আচরণ করেছে। মানুষের সহজাত প্রবৃতি, হঠাৎ কোনো ধাক্কা খেলে সেটা তৎক্ষণাৎ মেনে নিতে না পারলেও পরে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে চায় অবচেতন মন। তাই হয়তো এখন আর আগের মতো করেনা অন্তিক। উল্টে তার সাথে চিপকে থাকতে চায় বলে মনে হয় প্রাণেশার।

সে যায় হোক। পুরুষ মানুষ এমনিতেও বউ পেলে হুশ থাকেনা। সে যতোই উপরে উপরে বউ এর প্রতি অসন্তুষ্টি দেখাক না কেনো। অন্তিকেরও হয়তো একই অবস্থা।

প্রাণেশার আপাদত অলস সময় কাটছে। পরশু পিকনিক, কিন্তু তা নিয়ে প্রাণেশার মধ্যে কোনো উত্তেজনা কাজ করছেনা। তার মায়ের কথা মনে পড়ছে এখনো খুব। সে ভাবলো কিছু একটা আঁকা যাক। নাহয় এভাবে মন খারাপ করে থাকতে হবে সারাটা রাত। কারণ তার সবরকম মন খারাপি ভোলানোর ওষুধ ই হলো আঁকাআঁকি। বড় ক্যানভাসে এই মুহূর্তে আঁকা সম্ভব না। সময় নিয়ে বসতে হবে। আর্ট বুকটা নেওয়া যাক। কিন্তু আর্ট বুকের কথা ভাবতেই প্রাণেশার মনে পরলো ওটা অন্তিকের কাছে। কাল সে বলার পরেও প্রাণেশা আর্ট বুক না নিয়ে চলে এসেছিলো রাগে, জেদে। এখন নিজের বোকামির জন্য নিজের গালে থাপ্পর দিতে মন চাচ্ছে তার। ইশ!! আবার মানুষটার সামনে যেতে হবে। আবার তাকে অপমান করবে সে সবসময় অন্তিকের সামনে যায় ইচ্ছে করে এসব বলে। প্রাণেশা খুব বিপাকে পড়লো। কি করা যায়?

আরেহ! প্রাণেশাতো ভুলেই বসেছিল যে অন্তিক এই সময় বাড়ি থাকেনা।

সে বাড়ি আসে খুব রাত করে। এটাই পারফেক্ট সময় নিজের আর্ট বুক নিয়ে আসার। সে তাড়াতাড়ি গেলো।

অন্তিকের রুমের সামনে গিয়ে দাড়ালো এক মুহুর্ত সে। সে যে আসলেই নেই বাড়িতে, তা একেবারেই শিউর না হয়ে ঢুকা যাবেনা। নাহলে দেখা যাবে হঠাৎ কোনো কারণে বাড়িতে এসেছে, আর সে অন্তিক নেই ভেবে রুমে গেলে তখন আবার ফালতু কথাবার্তা শুরু।

প্রাণেশা রুমের বাইরে দাড়িয়ে উকিঝুঁকি দিলো। না.. কেউ নেই।

সে রুমে ঢুকে টেবিলে, ড্রয়ারে, ড্রেসিং টেবিলে সহ এখানে সেখানে অনেক খুঁজলো। কিন্তু পেলোনা। একটা ড্রয়ার খোলা যাচ্ছেনা। প্রাণেশার মনে হলো ওটাতেই আছে তার আর্ট বুক। সে খুব করে ওটা খোলার চেষ্টা করলো। ড্রয়ারের হাতল ধরে টানতে টানতে তার হাতের ব্রেসলেটাও পড়ে গিয়েছে। ওটা নিতে যেই ঝুকবে, ওমনি দেখলো ড্রয়ারটা লক করা। এটা দেখে প্রাণেশার ইচ্ছে করছে মাথাটা কোথাও বারি মেরে ফেটে ফেলতে। এতোক্ষণ কেন খেয়াল করলোনা। নিজেকে নিজে গাধী ডেকে গালি দিলো। অন্তিক ঠিকই বলে, তার বুদ্ধি হাঁটুর নিচে।

লোকটা বোধ হয় আন্দাজ করতে পেরেছিল যে, সে খাতার কথা মনে পড়লেই নিতে আসবে। বিশেষ করে যখন সে বাড়ি থাকবেনা। তাই এমন করেছে।

প্রাণেশার অন্তিকের উপর খুব রাগ হচ্ছে। মানুষটা সবসময় তাকে বিপাকে ফেলে। এখন যদি সে তার কাছে সামনা-সামনি আর্ট বুক চাইতে আসে, তাহলে তাকে এটা সেটা কথা শুনাতে আরও পেয়ে বসবে। কিন্তু তাও চাইতেই হবে সামনা-সামনি হলেও। কারণ ঐ আর্ট বুকটা ছাড়া প্রাণেশার চলবেনা।

—————————

রাতে সবাই ড্রয়িং রুমে বসেছে। একটু পর বাড়ির ছেলেরা সবাই আসলে তখন খেতে বসবে সবাই মিলে। দিগন্ত আগে চলে এসেছে। সে ইশির পাশে বসে আছে এখন।

প্রাণেশা তার দাদী শ্বাশুড়ির মাথা টিপে দিচ্ছে সোফায় বসে।

হঠাৎ কেউ কলিং বেল বাজালে প্রাণেশাই যায় দরজা খুলতে। অন্তিক এসেছে। প্রাণেশা ভেবেছিলো তার দুই শ্বশুর হবে হয়তো। তারাই তো আসে এ সময়। তার স্বামী আসবে জানলে সে কখনই দরজা খুলতোনা।

অন্তিক প্রাণেশাকে দরজা খুলতে দেখে ভ্রু কুচকে তাকায়। প্রতিদিন তো তার মা-ই দরজা খুলে। তারপর ভাবে আজ তাড়াতাড়ি এসেছে বলেই হয়তো একটু ব্যতিক্রম।

তবে বাড়ি এসেই এই মেয়েকে দেখে মন্দ লাগছেনা। বরং সে বাইরে থেকে এসেছে আর তার বউ দরজা খুলে দিয়েছে - ব্যাপারটায় অদ্ভুদ ভালো লাগা কাজ করছে।

অন্তিক কথাটা ভাবতেই নিজেই থমকে গেলো। বউ?

সে প্রাণেশাকে আরেকবার আপাদমস্তক দেখলো।

"আমিতো সেদিন মজা করে জিজ্ঞেস করেছিলাম বউ হতে চাও কিনা। তুমিতো দেখি সিরিয়াসলি নিয়ে নিলে। স্বামীর জন্য দরজা খুলে তার মন জয় করতে চাচ্ছো?"

প্রাণেশা অন্তিকের কথা শুনে অবাক হয়না। তার এ কদিনেই অভ্যাস হয়ে গিয়েছে অন্তিকের এই ধরণের কথাবার্তা শুনার। কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে তার এই রুপের সাথে প্রাণেশা ছাড়া আর কেউ পরিচিত না। সে যদি অন্তিকের তার প্রতি এসব আচরণ কাউকে বলতে যায় তাহলে তাকে কেউ বিশ্বাস করবেনা তা সে নিশ্চিত। সবার কাছে গম্ভীর আর শুদ্ধ চরিত্রের মানুষ কিনা। সে ফোনে টাইপ করে দেখালো নিজের কথা গুলো অন্তিককে,

"আপনার মন আপনি জয় করুন। আমিতো ভেবেছিলাম বাবারা এসেছেন। আপনি জানলে জীবনেও দরজা খুলতামনা।"

"আচ্ছা? মিথ্যা বলে পার পেয়ে যাবে ভেবেছো? তোমার হাবভাব আমি বুঝিনা?"

সে আবার টাইপ করে দেখায়,

"বুঝলে বুঝতে থাকুন, আমার সাথে কথা বলতে আসছেন কেন।"

ফোনটা অন্তিকের সামনে ধরে রেখেছিলো সে, তার পড়া হয়েছে বুঝতে পারার সাথে সাথে তাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ফোন নিয়ে চলে গেলো।

অন্তিক প্রাণেশার এটিটিউড দেখে তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়। তার সামনে ভাব দেখিয়ে চলে গেলো, দুদিনের এই মেয়ে। সামান্য রাগ হলেও নিজেকে সামলে ভেতরে আসলো সে।

তাকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে দেখে দাদী জিজ্ঞেস করলেন,

"দাদুভাইয়ের কাজ আজ তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেলো বোধ হয়।"

"হ্যাঁ। দাদী। হাতে যে কেসটা আছে ওটার ব্যাপারে সব মিটমাট। শুধু শুনানির অপেক্ষা। তাই ফ্রি আছি আপাদত।"

"হ্যাঁ, এবার নিজেকে একটু বিশ্রাম দাও। সবসময় শুধু কাজ এর কাজ। কাজ করতে করতে মেশিন হয়ে যাচ্ছো সবাই। এবার পরিবার, ব্যক্তিগত জীবন এসবের দিকে একটু মনোযোগ দাও।"

অন্তিক ভালোই বুঝতে পারছে দাদী কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছে তা। সে কিচেনে থাকা প্রাণেশার দিকে আবার তাকালো। প্রাণেশা তার দুই শ্বাশুরির হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিচ্ছিলো। মাঝেমাঝে ওদের কথা শুনেও হাসছেও। হাসতে হাসতে অন্তিকের দিকে চোখ গেলে দেখে সে তাকেই দেখছে। তাই সে হঠাৎ অন্তিকের দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে দাড়ায়।

অন্তিক তার সাহস দেখে অবাক না হয়ে পারছেনা। পদে পদে তাকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। সে চোয়াল শক্ত করে প্রাণেশাকে পেছন থেকে একপলক দেখে রুমের উদ্দেশ্যে যায়।

প্রাণেশা ভাবছে অন্তিককে ভাব দেখাতে গিয়ে দুই বার রাগিয়ে দিলো। কিন্তু এখন তো তাকে আর্ট বুকের জন্য যেতেই হবে। ইশ!! আবার বোকামি করলো সে।

তবুও সে দুই শ্বাশুড়িকে বলে কিচেন থেকে বেরিয়ে এলো। খাতাটা তার লাগবেই। দরকার পড়লে ক্ষমা টমা চেয়ে নিবে।

———————

অন্তিক রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে। বিছানায় থাকা ফোনটা বেজে উঠে।

তার পরনে শুধু একটা ট্রাওজার আর গলায় সাদা টাওয়েল। সে ওটার এক কোণা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে রিসিভ করে,

"হুম বলো।"

"স্যার। বিয়ের দিনের ঘটনাটা যে পূর্ব পরিকল্পিত ছিল আর আয়াজ খানের হাত আছে এতে তার সব প্রমাণ জোগাড় হয়ে গিয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজও হাতে আছে এখন। এবার মামলা টুকে দিলে ভালো হতোনা?"

"প্রমাণ? প্রমাণ দিয়ে কি হবে। বেশি তে বেশি ধারা ৩৬৩/৩৬৬ তে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও জরিমানা হওয়ার আইন আছে। কিন্তু তোমার মনে হয়, আয়াজ খানকে এভাবে আটকানো যাবে বলে? ওকে আমি অন্য উপায়ে দেখে নেবো।"

"আচ্ছা স্যার। আপনি যেমনটা ভালো মনে করেন।"

"হুম্‌...আর তুমি ঐ ফুটেজ গুলো আমাকে পাঠাও।"

"ওকে।"

অন্তিক ফোন কেটে আবার মাথা মুছতে মনোযোগী হয়। চুল মুছতে মুছতে হঠাৎ চোখ যায় নিচে পড়ে থাকা ব্রেসলেটে। সে ভাবে তার রুমে মেয়েদের ব্রেসলেট এলো কোত্থেকে? বোনেরা কেউ এসেছিলো কি? হয়তো।

এর মধ্যে আবার রুমের দরজার বাইরে দাঁড়ানো কাউকে চোখে পড়ে। কারো উড়নার কোণা দেখা যাচ্ছে। সে ভাবে ইশি, দিথীর কেউ হবে হয়তো। মাঝে মাঝেই তো এটা সেটা আবদার নিয়ে আসে, বাবা আর চাচাকে কোনো কারণে মানাতে না পারলে।

"ইশি নাকি? ভেতরে আয়।"

প্রাণেশা আস্তে আস্তে ভেতরে আসে। অন্তিক ওকে দেখে ভ্রু কুচকে তাকায়... এই মেয়ে হঠাৎ এখানে? এমনি এমনি তো অন্তিকের সামনে আসার পাত্রী সে নয়। তাহলে?

"বোকারানী হঠাৎ স্বামীর রুমে? কোনো দরকার?"

প্রাণেশার রাগ হলেও নিজেকে সামলালো। কিন্তু সে ইশারায় বোঝাতে যাবে যে তার দরকার আছে, তার আগেই অন্তিকের দিকে নজর যায়। খালি গাঁয়ে দাড়িয়ে আছে মানুষটা। শুধু একটা প্যান্ট পরে আছে আর গলায় টাওয়েল। পুরো উদাম-হালকা ভেজা শরীর। সে লজ্জ্বা পেয়ে মাথাটা ঘুরিয়ে নিলো। ইশ!!

লজ্জ্বায় তার কান দিয়ে ধোয়া বেরোচ্ছে। গালও লাল হয়ে আছে।

অন্তিক হঠাৎ ওর মুখ ফিরিয়ে নেওয়াতে চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। লাল লাল গাল দুটো দেখেই বুঝে নেই লজ্জ্বা পাচ্ছে। অন্তিক নিজের দিকে তাকায়।

উদাম শরীর। সারা দেহ হালকা ভেজা। ট্রাউজারটা নাভির অনেক নিচে। সে গাঁয়ে একটা টি-শার্ট জড়াতে যাবে তখনই খেয়াল হয় এই মেয়েটা তাকে বার বার নিচে কিভাবে ইগনোর করে যাচ্ছিলো। তখন ভাব দেখাচ্ছিলো, এখন নিশ্চয় কোনো দরকার আছে বলে এসেছে। এতো সহজে তো ছেড়ে দেওয়া যাচ্ছেনা। সে গাঁয়ে আর কিছুই নেইনা। উল্টো টাওয়েলটাও রেখে দেই। আর ওভাবেই প্রাণেশার দিকে এগিয়ে আসে।

মাথাটা খানিক নিচে করে প্রাণেশার কাছে দাড়ায়। ওর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলে,

"কিছু দরকার? আমার কাজ আছে। তাড়াতাড়ি বলো।" , অন্তিকের এমন সম্মোহনী দৃষ্টি আর কথা যেকোনো মেয়ের গায়েল হওয়ার জন্য যথেষ্ট। অথচ প্রাণেশা তার দিকে তাকাতেও পারছেনা লজ্জ্বায়।

সে আর তাকায়ওনা। ওভাবেই ফোনে কিছু টাইপ করে। অন্তিক ওর আপাদমস্তক দেখে নিয়ে কি টাইপ করছে তা বুঝতে ওভাবেই ফোনের দিকে তাকায়।

সে লিখেছে,

"আমার আর্ট বুকটা আপনার কাছে ছিলো। ওটা প্লিজ আমাকে ফিরিয়ে দিন। ওটা নিতেই এসেছি।"

প্রাণেশার আর ফোনটা আলাদা করে তাকে দেখাতে হয়না। সে টাইপ করতে করতে অন্তিক ওভাবেই লেখাগুলো পড়ে নিয়েছে মনে মনে।

সে বলে উঠে,

"ওটা তো আর পাবেনা। ঐ খাতার চিত্র গুলো আমার খুব ভালো লেগেছে। তাই আমার কাছেই থাকবে ওটা।"

প্রাণেশা অন্তিকের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকায়। তার আর্ট বুকটা আর দেবেনা? এভাবে নিয়ে নিবে ভালো লেগেছে বলে? তাকে বললে কি সে অন্য কোনো চিত্র এঁকে দিতোনা? পুরো আর্ট বুকটা-ই নিয়ে নেওয়ার কি দরকার?

অন্তিক প্রাণেশার ঐ অসহায় চোখজোড়ায় নিজের চোখও রাখে। কয়েক সেকেন্ড ওকে দেখে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোজা হয়ে দাড়ায়।

টাওয়েলটা বিছানা থেকে আবার নিয়ে মাথা সুন্দর করে মুছে নিয়ে বলে,

"দিতে পারি তোমার আর্ট বুক। তবে শর্ত আছে। যদি মানতে পারো, তবেই পাবে ঐ খাতা। নাহয় ভুলে যাও।"

প্রাণেশা এক মুহূর্ত ভাবে কি করবে। লোকটার যা স্বভাব। না জানি কি না কি শর্ত দেই। তাও কোনোমতে বুঝায় সে শর্ত মানবে।

অন্তিক তার হ্যাঁ সূচক উত্তর পেয়ে বলে,

"গ্রেট.. বিছানায় এসো।"

প্রাণেশা একথা শুনার সাথে সাথে বিস্ফোরিত চোখে তাকায়। বিছানায় এসো মানে? যেখানে অন্তিক নিজে বিছানায় বসে আছে সেখানে প্রাণেশার ওখানে কি কাজ।

ইশ!! কি বাজে শুনালো কথাটা।

তবু সে একটা ঢোক গিলে ইশারায় বোঝায় সে ওভাবেই ঠিক আছে। অন্তিক প্রাণেশা মনে মনে কি ভাবছে তা টাওর করতে পেরে বলে,

"তোমাকে বিছানায় এসে বসতে বলেছি শুধু। বিছানায় এসে আমার সাথে রোমান্স করতে হবে এমন কিছু বলিনি।"

প্রাণেশা অন্তিকের কথা শুনে থতমত খেয়ে যায়। সাথে লজ্জ্বাও পায় এমন কথা শুনে। সে মোটেও রোমান্স করতে হবে এমন কিছু ভাবেনি। তার তো অন্তিকের সাথে বিছানায় একসাথে বসতে হবে ভেবে লজ্জ্বা লাগছিলো।

একটু বেশি বেশি বুঝে সবসময়।

———————

মেহেরিন আর অয়ন্তি তার রুমের ব্যালকনিতে বসে আছে। ওরা দুজন ছোটবেলা থেকে খুব ঘনিষ্ট।

মেহেরিন যতোবার নানাবাড়ি আসে ততোবার অয়ন্তির সাথে তার রুমেই থাকে।

বিকেল থেকে অয়ন্তি খেয়াল করেছে মেহেরিনের ম্লান চেহারা। তখন সবাই কতো হৈহল্লা করছিলো। অথচ মেহেরিনের মধ্যে আনন্দের ছিটেফোটাও ছিলোনা। সে অবশ্য এর কারণ জানে।

কিন্তু সে করবেই বা কি। তখন কতো করে বলতো যেনো ভাইকে নিজের অনুভুতি জানিয়ে হলেও যেন রাখে। হ্যাঁ সূচক উত্তর আসুক কিংবা না সূচক।

জানিয়ে রাখলে অন্তত আজকে এতো বিষাদ নিয়ে গুমরে মরতে হতোনা। অন্তিক তাকে ভালোবাসেনা এটা হলেও বলে নিজেকে বুঝ দিতে পারতো। যে তাকে ভালোবাসেনা তার জন্য মনে এতো বিষাদ পুষে রেখে লাভ নেই।

কিন্তু মেয়েটা নিজের পক্ষ থেকে অনুভূতির কোনো জানান দেইনি কখনো। তাহলে অন্তিক কেন তার কথা ভাববে। ভাববে কি? সেকি আদো জানতো যে মেহেরিন তাকে ভালোবাসে। জানলে নাহয় মানা যেতো। এখন নিজের দোষে নিজের এই অবস্থা।

"এই একদম মনমরা হয়ে থাকবিনাতো এভাবে। আমার আর ভালো লাগছেনা। ভেবেছিলাম কতো আনন্দ করবো, কতো জায়গায় ঘুরে বেড়াবো এবার তোরা দেশে আসলে। কিন্তু বসে আছিস দেবদাসী হয়ে। তখন যদি আমার কথা শুনে ভাইয়াকে একবার হলেও মনের কথা জানাতি তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতোনা। অবশ্য দেখতে হতোনা এটাও ভুল। ওদের বিয়েটা যে পরিস্থিতিতে হয়েছে, সেটা ভাইয়া যদি তোর সাথে কোনোভাবে কমিটেড থাকতো তাহলেও হতোই। মোটকথা উপরওয়ালা প্রত্যেকের ঝুটি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছে। সেখানে এসব আবেগ টাবেগের কোনো কাজ নেই। তাই এসব ভুলে যা।"

"আমার ভালোবাসাকে তোর কাছে সামান্য আবেগ মনে হচ্ছে? কাউকে ভালোবাসিস না বলে এতো সহজে ভুলে যেতে বলতে পারছিস। আর আমি তোর ভাইকে মনের কথা বলার জন্য মনে হয় সবসময় কাছাকাছি পেয়েছি। যবে থেকে ভালোবাসতে শুরু করেছি তবে থেকেই তো এদেশ ওদেশ করে কাটিয়েছে অন্তিক ভাই। মনের কথা জানানোর সুযোগ পেলাম কই?"

"তাও ঠিক। কিন্তু তুই রাগ করিসনা আমার কথায় কেমন? বুঝিসই তো, আজকাল যা গরম। মানুষের মাথা ঠিক থাকেনা।"

অয়ন্তির কথা শুনে মেহেরিন বিরক্ত চোখে তাকায়। খালি ফাজলামো।

অয়ন্তি ওকে একটু স্বাভাবিক হতে দেখে মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে তাকায়।

"আচ্ছা। এককাজ করি, ছাঁদে চল। ছবি উঠাবো। অনেক দিন ইন্সটাতে কিছু পোস্ট করা হয়না। চল চল.."

অয়ন্তি ওকে টেনে নিয়ে বাইরে যায়।

"এইরে। ছবি তুলতে যাচ্ছি অথচ ফোন ছাড়া। পাবনা কনফার্ম আমাদের জন্য। তুই যা, আমি ফোন নিয়ে আসছি।"

মেহেরিন মাথা নাড়িয়ে হাটা ধরে। সে ভাবছে সত্যি কি একবার অন্তিককে জানালে আজ তাকে এতোটা পুড়তে হতোনা?

কিন্তু অন্তিক ভাইকে সে পেলোই কই যে মনের কথা জানাবে। তার মনে অন্তিক ভাইয়ের জন্য প্রথম অনুভুতি এসেছে ১৮ বছর বয়সে। অন্তিক ভাই তখন প্রথম প্রথম আইনচর্চা শুরু করেছে ঢাকা‑র প্রভাবশালী আইনফার্মে। এর আগে মাত্র ১৯ বছর বয়সে Grameen Bank‑এ ইন্টার্নশিপ ও BEI‑তে রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ শুরু করে। তখন তার দেখাও পেতোনা যে অনুভুতি জন্মাবে। যখন জন্মায়, তখনও সে ক্যারিয়ার শুরুর দিকে।

এর পর সে একবার জানাতে চেয়েছিল অবশ্য। কিন্তু জানানোর সুযোগ পাওয়ার আগেই সে লন্ডন চলে যায় আরেকটা গবেষনায়। ওটাই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল অবশ্য। মেহেরিন তখন কি যে খুশি হয়েছিলো।

ভেবেছিলো এবার দুজনে দেশে আসলেই জানাবে। কিন্তু অন্তিক দেশে আসলেও মেহেরিনের আসার আগেই অন্তিক ভাই অন্য কারো হয়ে গেলো।

ভাবতে ভাবতে সে অন্তিকের রুমের সামনে আসতেই একটু অন্তিক ভাই কি করছে তা দেখতে মন চাইলো। মনের মানুষকে উকিঝুঁকি দিয়ে দেখতে কার না ভালো লাগে। ভালো-খারাপ, পবিত্র-নিষিদ্ধ এসব মাথায় আসে নাকি?

মেহেরিনও অন্তিককে একপলক লুকিয়ে না দেখে থাকতে পারলোনা। সে দরজাটা একটু ফাঁক করে ভেতরে তাকালো।

প্রাণেশা বিছানায় শোঁয়া, তার শরীরের উপর অন্তিক খালি গাঁয়ে। প্রাণেশা ছটফট করছে। দুহাতে অন্তিককে সরাতে চাইলে সে প্রাণেশার হাত দুটো ধরে মাথার উপর চেপে ধরে। প্রাণেশা রেগে অন্তিকের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে অন্তিক জোর করে ওর গাল ধরে নিজের দিকে তাকাতে বাধ্য করে। তারপর অন্তিক কিছু একটা বললো নাকি জিজ্ঞেস করলো প্রাণেশাকে, কি জানি! সে মুখে কিছু বলতেও পারছেনা। হাতও বন্দি। পুরো শরীর অন্তিক কব্জা করে নিয়েছে।

অন্তিকের জিজ্ঞেস করা কিংবা বলার বিপরীতে সে কিছু বলতে না পেরে, মাথাটা হালকা উচু করে অন্তিকের ঘাড়ে কামড়ে দিলো। নাহহ... পারেনি বোধ হয়। ঘাড় অব্দি পৌঁছেছে। কিন্তু কামড়াতে পারেনি।

মেহেরিন আর দেখতে পারলোনা। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে বৃষ্টির ফোটার মতো অবিরত। দৌড়ে চলে গেলো সেখান থেকে। যাওয়ার পথে অয়ন্তির সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যেতে যেতে বেচেঁছে। কিন্তু মেহেরিনের সেদিকে হুশ নেই।

সে ছুটে আবার অয়ন্তির রুমে চলে গেলো। অয়ন্তি ওর এই হাল দেখে নিজেও ছুটলো পিছু পিছু।

—————

প্রাণেশা তাকে কামড়ে দিতে চেয়েছে এটা অন্তিক প্রথমে বুঝতে পারেনি। চোখ ছোট ছোট করে হঠাৎ মুখ উচিয়ে কি করতে চাচ্ছিলো মেয়েটা সেটাই বোঝার চেষ্টা করছিলো সে, ওভাবে চেপে ধরেই। তারপর যখন কিছু বলতে না পেরে কামড়ে দিতে চেয়েছে এটা বুঝতে পারে তখন ওকে বিদ্রুপ করে হাসে।

"এতো সহজ? বাচ্চাদের মতো কামড়ে দেওয়ার অভ্যাসও তো দেখছি এখনো যায়নি। আবার বড়োদের মতো এতো দেমাগ আসে কোত্থেকে হু?"

প্রাণেশার খুব অস্বস্তি হচ্ছিলো। লোকটার কি হুশ জ্ঞান নেই এই মুহূর্তে? সে কি বুঝতে পারছেনা প্রাণেশার সাথে তার শরীর খুব বাজে ভাবে স্পর্শ করছে।

লোকটা কি সব মেয়েদের সাথে এমন বাজে বিহেভ করে? নাকি সে বউ বলে তার সামনেই লাগাম টানতে চাইনা নিজের। প্রাণেশা এসব ভাবছিলো।

তার খুব রাগ হচ্ছে। কোনো উপযুক্ত জবাব দিতে পারছেনা নিজের প্রতিবন্ধকতার কারণে। তাকে যেভাবে কব্জা করে নিয়েছে ইশারায় জবাব দিবে তার সুযোগও নেই। আবার একটা কামড়ে দিয়ে মনে শান্তি পেতে চাইছিলো, সেটাও হলোনা। এর মধ্যে অন্তিকের বিদ্রুপ দেখে আর কথা শুনে নিজেকে আর সামলাতে পারলোনা। সে আবার নিজের মাথা তুললো, তবে এবার আর ঘাড়ে কামড় দিতে চেয়ে আবার ব্যার্থ হওয়ার রিস্ক নিলোনা।

একদম জোরে ওকে বিদ্রুপ করে হাসা ঐ ঠোঁট দুটো কামড়ে দিলো। তারপর আবার নিজের মাথাটা আগের অবস্থানে নিয়ে গেলো। মেয়েটা এখনো রেগে। রাগে, জেদে—জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে অন্তিককেই দেখছে।

অন্তিকও এখনো যা ঘটেছে তার গভীরতা উপলব্দি করতে পারেনি। তার হাতদুটো কামড় খাওয়ার সাথে সাথেই ছেড়ে দিয়েছে।

"তোমার সাহস কম নয়!! ভয় করলোনা একটুও?"

প্রাণেশা ওভাবেই শক্ত মুখে মাথা নাড়িয়ে বোঝায় তার ভয় করেনি।

অন্তিক দুই সেকেন্ডের মতো শক্ত চোখে ওর দিকে তাকায়। প্রাণেশা নিজেও ওভাবেই তাকিয়ে ছিল তার দিকে। তারপর অন্তিকের পরবর্তী পদক্ষেপ আন্দাজ করতে পেরে নিজের মাথাটা কাত করে নেই চোখ মুখ কুচকে। ঠোঁট দুটোও হাত দিয়ে চেপে ধরেছে।

অন্তিক আর তাকে জোর করে নিজের দিকে ফেরালোনা। সে সোজা তার গলায় মুখ গুঁজে দিয়েছে। জোরে কামড়ে দিলো নিজেও। প্রাণেশা দুহাত দিয়ে ধাক্কা দিতে চাইলেও লাভ হলোনা। সে হাত দুটো বিছানায় চেপে ধরে আরও একটা কামড় বসিয়ে দিয়েছে।

মেয়েটা এবার পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে গিয়েছে। আর লড়াই করার শক্তি নেই। একই জায়গায় পরপর দুটো শক্ত কামড় খেয়ে সে অবশ প্রায়। তার দুচোখের কোণা দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে অবিরত।

অন্তিক মাথা তুলে যখন মেয়েটার হাল দেখলো, তখন গিয়ে একটু নরম হয়েছে। ওকে ছেড়ে আস্তে আস্তে উঠে বসে।

কিন্তু প্রাণেশা ওভাবেই নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে চোখ বন্ধ করে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে কাঁদছে মেয়েটা। কিন্তু ওর কান্নার শব্দ হয়না। বোবাদের কান্নাও বোবা-ই হয়।

অন্তিক আস্তে আস্তে উঠে একটা সিগা/রেটে আ/গু/ন ধরিয়ে সেটা দুই ঠোঁটের মাঝে নেই। তারপর ওভাবেই বিছানায় নিস্তেজ হয়ে নিঃশব্দে কাদঁতে থাকা প্রাণেশাকে কয়েক সেকেন্ড দেখে সিগা/রেট টানতে টানতে ব্যালকনিতে চলে যায়।

মৌনপ্রেম পর্ব ১৪ গল্পের ছবি