মৌনপ্রেম

পর্ব - ১৩

🟢

সরোয়ার বাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে বাড়ির ছেলেমেয়েরা পিকনিকে যাওয়ার প্ল্যানিং করছে।

মাহাদ আর মেহেরিনও আছে বলে অয়ন্তিরা খুব এক্সাইটেড। ওরা আগে থেকেই প্ল্যান করে রেখেছিলো দেশে আসলে একটা ফ্যামিলি ট্যুরে যাওয়ার। কিন্তু দিগন্ত আর অন্তিক ট্যুরে যাওয়ার টাইম ম্যানেজ করতে পারছেনা বলে ঠিক করেছে একদিনের একটা পিকনিকের প্ল্যান করা যাক।

তো সবাই মিলে ঠিক করলো পিকনিকটা হবে দুইদিন পর। কারণ ঐদিনই সবাই ফ্রি থাকবে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা শেষ করে যে যার যার কাজে যাচ্ছে। দিগন্ত যাবে হসপিটালে, যদিও তার আগে অন্য একটা কাজ করতে হবে। অন্তিক ছিলোনা এখানে। আর মাহাদও তার বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাচ্ছে। বেশ কয়েক বছর পর দেশে এসেছে বলে সবাই একত্রিত হয়ে আড্ডা দিবে। আর মেয়েরা যার যার রুমে যাচ্ছে।

ইশি রুমে ঢুকে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ভাবছে পিকনিকে যাওয়ার জন্য কি কি নিবে সব গুছিয়ে নেওয়া যাক এখন থেকেই। কারণ যাওয়ার আগে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে গুছাতে গেলে কিছুনা কিছু একটা নিতে ভুলে যাবে তা সে নিশ্চিত। তাই ভাবলো এখন থেকে শুরু করা যাক। সে উড়নাটা খাটে রেখে চুলগুলো ক্লিপ দিয়ে বেঁধে নেই। আলমারি থেকে ড্রেসগুলো বের করে কোনটা নিবে যাওয়ার সময় পড়বে ভাবতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই সিলেক্ট করতে পারছেনা।

তারপর ভাবলো দিথীর সাথে ম্যাচিং করে পড়া যাক।

এই ভেবে সে উড়নাটা আবার গাঁয়ে জড়িয়ে ছুটলো দিথীর রুমে। ওরা তিনবোন আলাদা আলাদা রুমে থাকে। কেউ সমবয়সী না, তাই যার যার প্রাইভেসির একটা ব্যাপার থাকে।

দিথীর রুমে গিয়ে দেখতে পায় সেও ইশির অবস্থায় পড়েছে। কোন ড্রেসটা পড়বে তা চুজ করতে পারছেনা। তারপর দুজন মিলে এটা সেটা ডিসকাস করে লাইট পিংক কালারের একটা ড্রেস চুজ করলো। ইশিরও সেইম কালারের মধ্যে একটু ডিফ্রেন্ট ডিজাইনের ড্রেস আছে। সে ওটাই পড়বে। সাথে ড্রেসের সাথে ম্যাচিং করে পুরো আউটফিটটা চুজ করলো। খুশি মনে সব ঠিকাঠাক করে সে নিজের রুমের উদ্দশ্যে বের হয়েছে। কিন্তু যেই রুমে ঢুকবে, হঠাৎ কারো বুকে ধাক্কা লাগে, সে চোখ মুখ কুচকে তাকায়। দেখে দিগন্ত ভাই।

"দেখে চলতে পারেননা দিগন্ত ভাই? কপালটা ফাটিয়ে দিলেন। কিভাবে ব্যাথা পেলাম। উফফ!!" - সে কপালে হাত দিয়ে ঢলতে ঢলতে বলে।

"সারাদিন এদিক সেদিক ছুটোছুটি করলে তো যার-তার সাথে ধাক্কা খেয়ে কপাল ফাটাবিই। স্থির থাকতে তো দেখিনা তোকে।"

"স্থির থাকিনা মানে? আপনি আমাকে ছুটোছুটি করতে দেখেছেন কবে?"

"আমি সেটাই বলছি। তুই ছুটোছুটি করিস, অথচ আমি দেখিনা। সমস্যা কি?"

ইশি বিরক্ত চোখে তাকায়।

"আপনার চোখের সমস্যা আপনি জানবেন। আমি কিভাবে বলবো? আজব!"

দিগন্ত কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকায়। তারপর বলে -

"এড়িয়ে চলছিস কেনো?"

ইশি থমকায়। সে এড়িয়ে চলছে? ওহ হ্যাঁ। সে তো দিগন্ত ভাইকে এড়িয়ে চলছিলো অনেক দিন ধরে। সেদিন বিয়েতে যখন দিগন্ত ভাইয়ের সামনে অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়ে তখন ইশির মনে হচ্ছিলো এই মুখ নিয়ে যেন দিগন্ত ভাইয়ের সামনে আর কখনো পড়তে না হয়। কি বিব্রতকর একটা ঘটনা। এখনো ভাবতেই তার গাঁ শিউরে উঠছে। এতক্ষণ নির্বিকারে সে সব ভুলে দিগন্তের চোখে চোখ রেখে কথা বললেও, এখন আর সে তার দিকে তাকাতেও পারছেনা।

খুব লজ্জ্বা লাগছে। সে কোনোমতে বলে,

"ক. কই? ইগনোর করছিনা তো।"

"আমার দিকে তাকা।"

ইশি তাকায়না। সে তাও এদিক-সেদিক করে করে বলে,

"আ আমি আপনাকে ইগনোর করছিনা দিগন্ত ভাই। সত্যি বলছি।"

"আমার দিকে তাকিয়ে বল সেটা।"

ইশি আর না পেরে অসহায় দৃষ্টিতে একপলক তার দিকে তাকিয়ে বলে,

"এমন করছেন কেন?" - কিন্তু দিগন্তের তার দিকে মাদকীয় দৃষ্টি দেখে আর বেশিক্ষণ তাকাতে পারেনা। চোখ সরিয়ে নেই। দিগন্ত তার দিকে তাকিয়ে ছিল। ইশির চুল বাঁধা। কলার বোন গুলো ওকে আফি/মের মতো টানছে।

কিন্তু সে নিজেকে সামলে নিলো। তারপর আবার ইশির চোখের দিকে তাকায়।

এই মেয়েটা ওকে বিগত একটা মাস ধরে খুব জ্বালাচ্ছে। না.. তার সামনে এসে উল্টা পাল্টা কিছু করে জ্বালাচ্ছেনা। বরং তাকে দেখা না দিয়ে জ্বালাচ্ছে।

বিগত একমাস ধরে ঠিকমতো দিগন্তের সামনেই আসেনা তেমন। সকাল বেলা ডাইনিং এ দেখা যায়না মেয়েটাকে। হয় ওর আগে খেয়ে নেই, নাহয় চলে যাওয়ার পর।

কতবার এই মেয়েকে একপলক দেখে যাবে বলে অপেক্ষা করতে করতে হসপিটাল যেতে দেরি হয়েছে দিগন্তের। কিন্তু তাও তার দেখা পায়নি। কখনো দূর থেকে একপলক দেখলে সামনে বা কাছাকাছি আসার আগে হাওয়া।

রাতে ডিউটি শেষ করে যখন বাড়ি আসে তখন বাড়ির রোজকার দৃশ্য হয় ওরা তিনবোন ড্রয়িংরুমে বসে টিভি দেখছে। নানান মুভি, সিরিজ এসব দেখে ওরা। দিগন্ত এসে তখন ইশির হাতে পানি খায় প্রত্যেকবার। টিভিতে মনোযোগ রেখেই ইশি কোনোভাবে একগ্লাস পানি এনে দেই তাকে। রোজকার দৃশ্য এসব। দিগন্তকে ইশিরই পানি এনে দিতে হয়। প্রথম প্রথম রোজ রোজ পানি এনে দিতে ট্যারামো করলেও, আস্তে আস্তে বুঝে যায় এসব করে লাভ নেই। দিগন্তকে তারই পানি এনে দিতে হবে। এরপর থেকে ইশিরও অভ্যাস হয়ে যায়।

দিগন্ত ফ্রেশ হয়ে এসে আবার প্রেয়সীর কাছে গিয়ে বসে,তাকে অনুভব করে। অথচ তার প্রেয়সী এসব কিছু বুঝতেও পারেনা। কখনো কখনো সবার অগোচরে তার চুল নিয়ে খেলে, হাতে হাত রাখে, আঙ্গুলের ভাঁজে আঙ্গুল নিয়ে কতো কি যে করে, ইশির মতো টিভির দিকেই দৃষ্টি রেখে।

মেয়েটা প্রথম প্রথম তেমন খেয়াল করতোনা। তারপর একদিন চোখে পড়লে তখন কেমন বরফের মতো জমে গিয়েছিলো। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে, কেউ দেখছে কি না। তারপর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে দেখে, সে মন দিয়ে টিভি দেখছে। ইশি তার চোখে-মুখে স্বাভাবিকতা দেখে মনে মনে ভাবে—হয়তো সে নিজেই একটু বেশি ভাবছে। তারপর আস্তে আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চায়, সামান্য দূরত্ব রেখে বসে। দিগন্ত টিভিতে চোখ রেখে বিরক্ত মুখে আবার ইশির হাত নিজের হাতের ভেতরে নেই। ভাব এমন যেন তার হাতটা নিজের হাতের ভেতর নিয়ে হালকা স্লাইড করতে করতে টিভি দেখতে তার আরাম লাগছে। আর এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই। অনেকটা পপকর্ন খেতে খেতে সিনেমা দেখা যেমন স্বাভাবিক, তেমন। ইশি ভাবে, দিগন্ত ভাই হয়তো তার মতো এত কিছু ভেবে এসব করছে না। ছোট বোন হিসেবে হাত ধরতেই পারে। এই ভেবে সে টিভিতে মনোযোগ দেয়। আর তখন থেকেই এসব রোজকার ব্যাপার হয়ে ওঠে।

দিগন্ত শুরু থেকেই ইশির প্রতিটি ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করেছে। ইচ্ছে করেই এমন স্বাভাবিকতা ধরে রেখেছিল চেহারায়। ও কি করে তা দেখতে। শেষে ইশির এই নীরব এডজাস্টমেন্ট, অজ্ঞাত সম্মতি দেখে মৃদু হাসে টিভির দিকে দৃষ্টি রেখেই।

ব্যাস, এভাবেই হসপিটাল যাওয়ার আগে প্রেয়সীর চেহারা দেখে যাওয়া, আবার এসে তার সান্নিধ্য—এসব রোজকার অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো। এরই মাঝে সে কখনো কখনো নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে ইশিকে নানান ভাবে লজ্জ্বায় ফেলে দিতো। তখন ইশি দুই/চারদিনের জন্য ওকে এড়িয়ে চলতো। আর দিগন্তও ওকে সেই স্পেসটুকু দিতো।

কারণ তার নিজেকে সামলানোর জন্যও তখন একটু ইশির থেকে দুরত্বের প্রয়োজন হতো। তারপর আবার সব স্বাভাবিক হলে আবার রোজকার নিয়ম।

কিন্তু এবার? এবার বিগত একমাস ধরে মেয়েটা ওকে এড়িয়ে চলছে। লজ্জ্বায় তার সামনে আসছেনা। এদিকে তার প্রেমিক মন যে প্রেয়সীকে দেখবে বলে তৃষ্ণার্ত হয়ে আছে সে খবর নেই।

দিগন্ত জানে ইশি তাকে আলাদা নজরে দেখেনা। বরং দিগন্তের দিক থেকে বার বার ইঙ্গিত পেয়েও নিজের মন আর চিন্তাভাবনা ন 'ষ্ট হয়ে গিয়েছে এই ভেবে জ্বিব কাটে।

কিন্তু আর কতোদিন এভাবে অবুঝ হয়ে থাকবে? কতোদিন সবকিছু দিগন্ত একপাক্ষিক ভাবে সহ্য করবে?

"লজ্জ্বা পাচ্ছিস কেন?"

"ক কই.. লজ্জ্বা পাচ্ছিনাতো।"

"কিন্তু আমিতো দেখতে পাচ্ছি তুই লজ্জ্বা পাচ্ছিস।"—তার গালে টোকা দিয়ে বলে, "দেখ কেমন লাল হয়ে আছে!!"

ইশি বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলে,

"গালে হাত দিচ্ছেন কেন দিগন্ত ভাই?"

"তো কোথায় হাত দিবো?"

ইশ!! আবার শুরু করছে।

"দিগন্ত ভাই, আপনার কথাবার্তা এমন কেন?"

সে ভ্রু উচিয়ে বলে,—"কেমন আমার কথাবার্তা?

"আপনি শুধু আমাকে লজ্জ্বায় ফেলতে চান কথায় কথায়।"

"তুই পড়িস, লজ্জ্বায়?"

সে উত্তর দিলোনা,

"আপনি এখানে কি করছিলেন? কিছু দরকার?"

"তোর রুমে আসতে গেলে দরকার থাকতে হবে? দেখছিলাম আরকি কোন গুহায় সারাদিন পড়ে থাকিস যে চোখের দেখাও পাওয়া যায়না।"

ইশি রেগে বলে, — "ওটা আমার রুম, কোনো গুহা না।"

"রিয়েলি? তুই না বললে জানতেই পারতামনা। দেখ অবস্থা..." — দিগন্ত রুমের দিকে ইশারা করে বলে কথাটা।

সেখানে সারাবিছানা জুড়ে কাপড়-চোপড় সহ ব্যাগ ট্যাগ অনেক কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। যদিও সে জানে, পিকনিকে যাওয়ার জন্য সব গুছাতে গিয়ে এই হাল হয়েছে।

দিথী আর অয়ন্তির রুমেও নিশ্চয় একই অবস্থা। বোনদের সে ভালো করেই চিনে। তবে সে ইশির সাথে কথা বাড়াবে বলে এটা বলেছে।

ইশি দিগন্তের ইশারা বুঝে ভেতরে তাকিয়ে নিজের রুমের হাল দেখে। কিছু বলতে যাবে তার আগেই চোখ আটকায় বিছানায় প্রতিটা ড্রেসের সেটের সাথে থাকা অন্তর্বাসগুলোতে।

তার বুক ধক করে উঠে। দিগন্ত ভাই নিশ্চয় এগুলোও দেখে নিয়েছে।

ছি ছি!! কি বাজে একটা ঘটনা। তার একজীবন বোধ হয় দিগন্ত ভাইয়ের সামনে নানান অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়ে লজ্জ্বা পেতেই পেতেই কেটে যাবে।

দিগন্ত ইশিকে হঠাৎ এমন স্তম্ভিত হয়ে যেতে দেখে তার দৃষ্টি যেদিকে, সেখানে তাকায়। বিছানার দিকে তাকালে সে বিষয়টা বুঝতে পারে।

আবার ইশির দিকে তাকায়, এখনো জমে আছে মেয়েটা। সে মৃদু হাসে।

ইশি এই মুহূর্তে মনে মনে কি ভাবতে পারে তাও দিগন্ত আন্দাজ করতে পারছে। সে হঠাৎ বলে উঠে -

"ইশিকা সরোয়ার.. ঠিক ধরেছিস। সারাটাজীবন তোকে ড. দিগন্ত সরোয়ারের সামনে নানান অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়ে লজ্জ্বা পেতে পেতেই কাঁটাতে হবে। এর মাঝে কোনো একদিন দেখবি, তোর সব লজ্জ্বা আমি ভাঙ্গিয়েও দেবো। কিন্তু তাও পরের বার থেকে তুই আবার লজ্জ্বা পাবি।"

কথাটা বলে দিগন্ত চলে গেলো। কিন্তু ইশি পাথরের মতো জমে আছে তার কথা শুনে। দিগন্ত কিসের ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছে তা সে কোথাও না কোথাও বুঝতে পারছে। কিন্তু মানতে চাচ্ছেনা।

কিংবা হয়তো নিজেকে আশকারা দিতে চাচ্ছেনা।

——————

পরদিন বিকেলে প্রাণেশা কিচেনে সবার জন্য চা বসাচ্ছে। এ বাড়ির সবাই প্রাণেশার বানানো চা খেতে পছন্দ করে। তার হাতে নাকি জাদু আছে। বিশেষ করে তার দাদী শ্বাশুড়ি আর দুই শ্বশুরের মতে। তারা চা প্রেমী মানুষ। এ বাড়িতে প্রথম যেদিন চা বানিয়েছিলো তারপর থেকে সময়ে অসময়ে তাদের চা খাওয়ানোর দায়িত্বটা প্রাণেশারই। সে এই কাজটা খুব আন্তরিকতার সাথে করে।

নানীর কাছে প্রশংসা শুনে মাহাদও আবদার করেছে তাকে এক কাপ চা খাওয়ানোর। তাই সে ভাবলো সবার জন্যই বানানো যাক।

সে বানানো শেষে ড্রয়িংরুমে সবার কাছে ট্রেতে করে নিয়ে আসে। সবাই এখানেই আছে। আলাদা করে কাউকে দিয়ে আসতে হবেনা। চা-টা খেয়ে মাহাদ খুব প্রশংসা করলো।

মাহাদের মা-ও কিছু না বলে পারলোনা। কারণ আসলেই সে খুব ভালো চা বানায়।

"নানী তো ঠিক-ই বলেছে... ভাবির হাতে আসলেই জাদু আছে। সেদিন দেখলাম খুব ভালো আর্ট করে। আর আজকের এই কামাল কি চায়। আহ..বিলিভ মি অর নট! মনটা ভরে গেলো।" — মাহাদ

"আরে মাহাদ ভাই। তুমিও দেখেছ? আসলেই ভাবি খুব ভালো আর্ট করে। আমি আগে জানতামনা। রং-টং কিনিয়েছিল একবার অবশ্য আমাকে আর ইশিকে দিয়ে। কিন্তু তখনো জানতামনা ভাবি এতো ভালো আর্ট করে। কাল আমি আর ইশি ভাবির রুমে পিকনিকের ড্রেস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিলাম। ওমা দেখি আমাদের দেখে কি লুকাচ্ছে। তারপর রহস্য উদ্ধার করতে গিয়ে দেখি এই এই ঘটনা।"

দিথীর কথা শুনে তার ফুফু ভ্রু কুচকায়। প্রাণেশার দিকে তাকিয়ে ভারী স্বরে জিজ্ঞেস করে,

"এখানে লুকানোর কি আছে? আঁকো তা ভালো কথা। লুকানোর তো কিছু দেখছিনা।"

প্রাণেশা উনার কথা শুনে ভয় পেয়ে তাকায়। মেহেরিন আপুর মা-টা তাকে বোধ হয় তেমন একটা পছন্দ করেনা কোনো কারণে। কেমন গম্ভীর গম্ভীর মুখ করে কথা বলে সবসময়।

বাকিরাও উনার দিকে তাকায়। ওরা দেখতে পায় প্রাণেশা কেমন ভয় পেয়ে আছে। কি বলবে বা বুঝাবে তা বুঝে উঠতে পারছেনা।

দিথী পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হঠাৎ বলে উঠে,

"আমি আর ইশি তো একটা করে পেইন্টিং নিয়েওছি মাহাদ ভাই ভাবির কাছ থেকে, তুমিও চাইলে নিতে পারো। আরও অনেক আছে ওখানে।"

দিথীর কথা শুনে মাহাদ আর অয়ন্তি খেয়ে ফেলবে লুক নিয়ে তাকায়। পাগলটা পরিস্থিতি ঠিক করতে গিয়ে আরো বিগড়ে দিচ্ছে।

তাদের ফুফু আবার বলেন,

"সে যখন তোদের নিজের পেইন্টিং দেখাতে চাইছেনা, সেখানে তোরা আবার একটা করে নিতে গেলি কেনো? নিশ্চয় দেখলে তোরা নিতে চাইবি বলেই দেখাতে চায়নি। বুদ্ধি নেই তোদের?"

দিথী একথা শুনে মুখ ফ্যাকাশে করে তার ফুফুর দিকে তাকায়। তারপর ভাই বোনদের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে সবাই তার উপর ক্ষেপে আছে। সে আর কিছু বললোনা। মুখে কুলুপ এঁটে বসে রইলো। এ বাড়িতে বাক স্বাধীনতা নেই। কিছু বললেই জনগণ ক্ষেপে যায়।

প্রাণেশার শ্বাশুড়িরও ব্যাপারটা ভালো লাগলোনা। সে প্রাণেশাকে জিজ্ঞেস করলো —

"তুমি ওদের কাছে লুকাচ্ছিলে কেন প্রাণেশা? তুমি কি কোনোভাবে ওরা তোমার পেইন্টিং নিয়েছে এই ব্যাপারটা পছন্দ করছোনা।"

প্রাণেশা শ্বাশুড়ি মায়ের কাছে এমন কথা আশা করেনি। এই বাড়িতে একমাত্র এই মানুষটাই তাকে শুরু থেকে আগলে রেখেছে। অবশ্য বাকিরা অবহেলা করেছে বা দূরছাই করেছে এমন না। কিন্তু এই মানুষটাকে তার খুব আপন আপন লাগে শুরু থেকে। প্রাণেশার সাথে কেমন মায়া নিয়ে কথা বলে, সুবিধা অসুবিধা জানতে চায়। সেও খুব মানে তার শ্বাশুড়িকে। তার শ্বাশুড়ি মা তাকে ভুল বুঝছে বুঝতে পেরে তার খারাপ লাগলেও সে বুঝানোর চেষ্টা করলো, যে মামা বাড়িতে থাকতে তার মামী তার এই আঁকাআঁকি তেমন একটা পছন্দ করতোনা। এসব করা মানে সময় নষ্ট, এর চেয়ে হাতে হাতে তাকে কাজ এগিয়ে দিলেও বাড়ির কিছুটা কাজে আসবে। এমনটা বলতো সে। তাই সে ভেবেছিলো এই বাড়িতেও হয়তো তার আঁকাআঁকি করার বিষয়টা তেমন একটা কেউ পছন্দ করবেনা। যদি তাকে আঁকাআঁকি ছেড়ে দিতে বলে এই ভয়ে সে কাউকে দেখাতে চাইতোনা।

কিন্তু তার এই সাইন ল্যাংগুয়েজ কেউ তেমন একটা বুঝতে পারলোনা। তাই সে আবার নিজের ফোনে টাইপ করে বিষয়টা সংক্ষেপে লিখলো,

"আমার মামী এসব তেমন একটা পছন্দ করতোনা। আঁকাআকিঁ ছেড়ে দিতে বলতো। তাই আমি ভেবেছিলাম আপনারাও হয়তো পছন্দ করবেননা। আঁকাআঁকি ছেড়ে দিতে বলবেন ভেবে দেখাতে চাইনি। আমি খুব দুঃখিত। আমি বুঝতে পারিনি আপনাদের এতো ভালো লাগবে। আর আমি ইশি আপু, দিথী আপু পেইন্টিং নিয়েছে বলে মোটেও রাগ হইনি। বরং আমার খুব ভালো লেগেছে উনাদের আমার পেইন্টিং পছন্দ হয়েছে বলে। আপনারা আর কেউ যদি আমার পেইন্টিং নিতে চান তাহলে নির্দ্বিধায় জানাতে পারেন। আমার কাছে আপনাদের সবাইকে একটা করে দেওয়ার মতো পেইন্টিং না থাকলেও আমি বানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবো। আমি এটা করতে কখনো বিরক্তবোধ করিনা। এটা আমার সবচেয়ে শখের কাজ।"

লেখাটা পড়ে ফুফু নরম চোখে তাকালেন প্রাণেশার দিকে। তার মনে হচ্ছে ছোট ভাবি সেদিন ঠিকই বলেছিলো। মেয়েটার মধ্যে খুব সরল আর নিষ্পাপতার একটা ছোঁয়া অনুভব করছেন তিনি। প্রাণেশার শ্বাশুড়ি লেখাটা পড়ে সন্তুষ্ট হলো,

"ঠিক আছে। আমাদের সবার জন্য বানাতে হবেনা। তুমি মাহাদ আর মেহেরিনকে একটা করে দিও। আর আমরা কেউ তোমাকে আঁকাআঁকি ছেড়ে দিতে বলবোনা। তাই নির্ভয়ে আঁকতে পারো।"

"হ্যাঁ। বড় বউমা ঠিকই বলেছে, আমরা তোমাকে আঁকাআঁকি বন্ধ করতে বলবোনা। কিন্তু দেখো আবার মানুষের আর জীবজন্তুর ছবি-টবি এঁকে বাড়িতে টাঙ্গিয়ে রেখোনা। ওসব বাড়িতে রাখলে আল্লাহ্‌ নারাজ হবেন।" - দাদী

প্রাণেশা দ্রুত ফোনে কিছু একটা টাইপ করে দাদীকে দেখাতে চাচ্ছিলো। কিন্তু এখানে আরেক সমস্যা। দাদী ফোনের লেখা দেখতে পায়না।

সে অয়ন্তির দিকে অনুরোধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে লেখাটা পড়ে শুনাতে বোঝায়। অয়ন্তি ফোনটা নিলে মাহাদ এক টান দিয়ে ওর থেকে সেটা নিয়ে নেই। আর বড় বড় করে ছোটবেলায় স্কুলে যেমন বাচ্চারা রিডিং করে সেভাবে টেনে টেনে পড়ে শুনায়,

"যদিইও আমি সবরকম চিত্রই আঁকিই। কিন্তু আপনিই চিন্তা করবেননাহ, দাদী। অ্যাই ধরঅণের ছবি আমি টাঙ্গিয়ে রাখিনা। মামীর...ও বারণ ছিল আগে থেকেই... তাই এই ধরণের ছবি কখনোই টাঙ্গিয়ে রাখা হইয়য়না।" - সে লেখাটা পড়ে সবার দিকে তাঁকায়। তার দিকেই তাকিয়ে আছে ওরাও, কেমন কপাল কুচকে বিকৃত মুখে। যেন চোখের সামনে অবাঞ্ছিত কিছু দেখছে।

অয়ন্তি ওর থেকে কেড়ে নিয়েছিল বলে বিরক্ত ছিল খুব। মাহাদ ভাইয়ের স্বভাব আর বদলালোনা। সে ওভাবেই বললো,

"মাহাদ ভাই, তোমার চেয়ে কিন্ডারগার্ডেন এর বাচ্চারাও সুন্দর করে রিডিং করতে জানে। তোমার রিডিং স্কিলের এই নমুনা এই মুহূর্তে সবাইকে দেখানোর খুব দরকার ছিল কি? সিরিয়াস একটা কনভার্সেশন ছিল।"

"তুই চুপ কর। সিরিয়াসনেসের কি বুঝিস? সেদিনের মেয়ে।" তারপর শাইনা বেগমের দিকে তাকিয়ে বললো, — "নানী, তোমার নাতবউ খুব বাধ্য বুঝেছো? নাহয় আজকাল এসব কে মানে। বলছি...অন্তিক ভাইয়ের মতো কোনোভাবে আমাকেও কট খাইয়ে বিয়ে দেওয়া যায়না? আমিও একটা লক্ষী বউ পেতাম আরকি। আমার কথায় উঠবে বসবে এরকম।"

"তোমার কথায় উঠবে বসবে এরকম? তাহলে আর বউ বলছো কেন? ওটাতো হবে চাক/রানী।" — দিথী

"আসছে আরেক তোঁতা। তোকে কথা বলতে বলেছি? বড়দের মাঝে ঢুকবিনা। আর আমার জন্য সে চাক/রানী হোক, তাতে কি। দুনিয়ার সামনে দেখবি রাজরানী করে রাখবো। একবার বিয়েটা হতে দে শুধু।"

"তার মানে তুমি বলতে চাইছো সবার সামনে রাজরানী বানিয়ে বাড়ির ভেতর কাজের মেয়ের মতো রাখবে। ছি ছি। তোমার কাছে এসব আশা করিনি।" — ইশি

"তোরা দেখছি বিয়ের আগেই আমার সংসার ভাঙার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিস। দাড়া তোদের তিনবোনকেই একসাথে শ্বশুর বাড়ি পাঠাবো। আর তোদের জামাইদের বলে দেবো যাতে এমুখো আর হতে না দেই। ভাইদের সুখে থাকতে দিবিনা তোরা।"

"আশ্চর্য!! আমি কি করেছি? তিনজনকেই বলছো কেন?" — অয়ন্তি

"আচ্ছা তোকে আমার কাছে রেখে দেবো যা।" — মাহাদ

প্রাণেশা সবার দিকে বোকা চোখে তাকিয়ে আছে। মাহাদ ভাইয়া তার লেখাটা অমনভাবে পড়ে সার্কাস বানিয়ে দিয়েছে। আবার এরা নিজেদের মধ্যে লেগেছে। বড়োরা ওদের ফাজলামো দেখে কখন যে চলে গিয়েছে এরা কেউ তা খেয়ালও করেনি।

শেষে সবাই একে অপরকে দোষ দিতে দিতে যে যার যার রুমে চলে গেলো।

প্রাণেশাও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের জন্য বরাদ্ধ রুমের উদ্দেশ্যে গেলো।

মৌনপ্রেম পর্ব ১৩ গল্পের ছবি