মৌনপ্রেম

পর্ব - ১১

🟢

ব্যস্ত কোর্ট প্রাঙ্গণ। চারদিকে দেখা যাচ্ছে সাদা শার্ট, কালো কোট কিংবা সাদা শাড়ী, কালো কোট এবং সাদা ব্যান্ড আর হাতে ফাইল নিয়ে ব্যস্ত আইনজীবীদের। সাথে যুবক-যুবতি থেকে মধ্যবয়স্ক বা পূর্ণবয়স্ক নানান পুরুষ-মহিলা। তাদের মধ্যে হয়তো কেউ ভুক্তভোগী আর তাদের স্বজন কিংবা অভিযুক্ত বা আসামীদের স্বজন। কেউ ন্যায়বিচার চাই তো কেউ অন্যায় করে পার পেতে চাই।। কিংবা কেউ বিনা অপরাধে শাস্তি পাওয়া থেকে মুক্তি চাই। মাথার উপর সুর্যের উত্তাপ।

মাঝেমধ্যে কোর্টের ভেতর থেকে হাতুড়ির ঠকঠক শব্দ শোনা যায়। পিয়নরা কাগজপত্র হাতে এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে দৌড়াচ্ছে। পুলিশদের কড়া নজর। কোর্ট প্রাঙ্গণের ভেতরে আসামিদের আনা-নেওয়ার জন্য লকআপের দিকে চলাচল চলছে।

চায়ের দোকানে ভিড় জমেছে। গরম চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে, কোর্ট রিপোর্টাররা ছোট নোটবুকে দ্রুত কিছু লিখছে।

ব্যস্ত এই কোর্ট প্রাঙ্গণে নীলয়কে দেখা গেলো তার সহকর্মী অন্য এক আইনজীবীর সাথে জরুরী কথা বলতে বলতে বাইরে আসতে। সে হাঁটতে হাঁটতেই কথা শেষ করে এক পর্যায়ে লোকটার সাথে হ্যান্ডশেক করে অন্যদিকে চলে আসে। আর ফোন বের করে কাউকে কল দিয়ে কিছু বলতে বলতে কোর্ট প্রাঙ্গণের বাইরে একটি খোলামেলা টং দোকান থেকে পানি খায়।

অন্তিক দাড়িয়ে আছে কোর্ট প্রাঙ্গণেরই বাইরে সামান্য দুরত্বে একটি জায়গায়। গাড়িতে হেলান দিয়ে তার হাতেও একটা খোলা ফাইল। সামনে অন্য এক জুনিয়র আইনজীবীর সাথে ফাইলের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কথা বলছে। নীলয় ততক্ষণে এখানে চলে এসেছে।

অন্তিকের সাথে আলোচনা শেষ হলে লোকটা ফাইল নিয়ে চলে যায়। আর অন্তিক গাড়ির ভেতর থেকে লা/ই/টা/র আর সি/গা/রে/ট বের করে আ/গু/ন ধরিয়ে মুখে দেই।

একটা ফুঁ দিয়ে বলে —

"কি বুঝলে নীলয়?"

"বুঝলামতো অনেক কিছুই স্যার। গভীর জলের মাছ এই তৃণা মেয়েটা। বেশ চালাক।"

অন্তিক সিগা/রেট টেনে একটা ফুঁ দিয়ে একদিকে তাকিয়ে মনোযোগ দিয়ে কিছু ভাবছে।

"স্যার। মি. সাহিলের সাথে একবার কথা বলতে পারলে ভালো হতো না??"

"এক্সাক্টলি। আমিও সেটাই ভাবছি। মি. সাহিলের সাথে একবার মিট করা দরকার। এই তৃণা মেয়েটা মি.সাহিলকেও যথেষ্ট ঘোল খাইয়েছিল।"

"কিন্তু স্যার, উনি কি দেখা করতে চাইবেন? মানে দেখাও নাহয় করলেন। কিন্তু তৃণার ব্যাপারে মুখ খুলবে বলে তো মনে হয়না।"

"মনে না হওয়ার কারণ?"

"না মানে উনার পলিটিকাল ইমেজ তো বলতে গেলে সেবার ডেস্ট্রয় করেই দিয়েছিলো তৃণা। সাংগঠনিকভাবে ব্যাপারটা মিটমাট হলেও মি. সাহিলের কিন্তু ঐ ভাইরাল রেকর্ডিং এর পর পুনরায় জনগণের মাঝে আগের ইমেজে ফিরে আসতে যথেষ্ট কসরত করতে হয়েছে। এর মধ্যে কি উনি আবার তৃণা জড়িত ঘটনায় মুখ খুলতে চাইবেন?"

অন্তিক এবার সিগারেট শেষ করে অবশিষ্ট অংশ পায়ে পিষে ফেলে। পকেট থেকে মেটাল টিনের এলটইড বের করে একটা মিন্ট মুখে দিল। সেটা চিবুতে চিবুতে নীলয়কে বলে -

"অলরেডি চেয়ে ফেলেছে। মি. সাহিলের সাথে কথা হয়েছে আমার। আর এখন তার সাথেই মিট করতে যাচ্ছি। গাড়িতে উঠো।"

———————

অন্তিক আর নীলয় গণ অধিকার পরিষদ এর তরুণ সভাপতি সাহিল ফারদিনের সাথে দেখা করতে এসেছে।

বর্তমান সময়ের বেশ আলোচিত সমালোচিত একজন রাজনীতিবিদ সে। কিছুমাস আগে এই তরুণ নেতার সাথে তাদেরই দলের অন্য এক নারীর কল রেকর্ডিং ভাইরাল হয়েছিলো সোশ্যাল মিডিয়ায়। যেখানে সাহিল ফারদিন ঐ মেয়ের প্রতি বাজে ইঙ্গিতে কথা বলেছে এমন বলতে শুনা যায়। অডিওটিতে মেয়েটা এই কথা কয়েকবার জিজ্ঞেস করছিলো যে তুমি এই ধরণের মেসেজ আমাকে কিভাবে দিতে পারো। আর সাহিল ফারদিন তা অস্বীকার করেনি। বরং ব্যাপারটার সাফাই দেওয়ার জন্য দেখা করতে বলে তাকে সরাসরি। যার ফলে পুরো ব্যাপারটা অন্য মাত্রায় যায়। আর সোশ্যাল মিডিয়া সামান্য কোনো ব্যাপারকেও অন্য একটা অল্পনীয় মাত্রা এনে দিতে উস্তাদ। সেখানে একজন উদীয়মান তরুণ নেতার বিষয়ে একটা সুতো যখন পেয়েছে তখন বিরোধী দলও নিশ্চয় আঙ্গুল চুষেনি বসে বসে।

এই ঘটনার আগে তরুণ আর নবীন এই নেতার খুব নিট-ক্লিন একটা ইমেজ ছিল জনগণের মাঝে। যেটা ঐ রেকর্ডিং এর দরুন পুরোপুরি বরবাদ হয়ে যায়। বেশ কিছুদিন সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে এই ঘটনা হট টপিক ছিল।

পরে অবশ্য দলীয়ভাবে ব্যাপারটার সমাধান হয়।

কিন্তু সাহিল ফারদিনের জীবনে ঘটনাটা একটা ট্রাজেডি হয়ে থাকবে। তবে এমন না যে সাহিল ফারদিনকে এক্সপোজ করে মেয়েটা নিজে সবার কাছে সিম্প্যাথি পেয়েছে।

বরং নেটিজেনদের কিছু অংশ মনে করেছে ঐ মেয়েরই পরিকল্পিত ছিল সব। দেশের নিউজ মিডিয়ার কিছু প্রভাবশালী সহ সোশ্যাল মিডিয়ারও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি তখন সাহিল ফারদিনের পাশে দাড়ায়। তারা ঐ মেয়েটার অর্থাৎ মিস তৃণার অতীত ঘেটে তারও কিছু কুকীর্তি ফাঁস করে।

অন্তিক এই নারী রাজনীতিবিদ মিস তৃণার বিরুদ্ধেই একটা কেস লড়ছে।

বর্তমানে সে আর নীলয় একটা রেস্টুরেন্টে বসে আছে। এসে ২/৪ মিনিট পরই সাহিল ফারদিনকে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে দেখা যায়। সাদা পাঞ্জাবী আর পাজামা পরনে। নেতাদের জাতীয় পোশাক। সাথে মুখে মাস্ক আর চোখে চশমা। দেখে চেনার উপায় নেই। তবে নীলয় ঠিকই চিনে নিলো।

তারা বসে আছে ভি.আই.পি জোনে। বাইরে থেকে কিছু দেখা যায়না। তাই সাহিল ফারদিনকে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে দেখে নীলয় টেক্সট করে ভি.আই.পি জোনে চলে আসতে বললো।

—————

"হ্যালো মি.সরোয়ার। অপেক্ষা করালাম বোধ হয়।" — সাহিল

"ফাইব মিনিট। বাট নট আ প্রব্লেম। প্লিজ সিট।" — অন্তিক

"শিউর" — সাহিল

"আশা করি বুঝতে পারছেন আজকের এই মিটিং এর কারণ।" — অন্তিক

"তা একটু আন্দাজ করতে পারছি। তবে আপনার মুখ থেকে শুনলে বুঝতে সুবিধা হবে নিশ্চয়।" — সাহিল

"অবশ্যই। তার আগে কিছু অর্ডার করে নেই?" — অন্তিক

"শিউর।"

নীলয় ওয়েটারকে ডেকে তিনজনের জন্য ল্যাম্ব চপ্সের সাথে হালকা লেমন বাটার, স্পার্কলিং মিনারেল ওয়াটার আর কোল্ড কফি অর্ডার করলো।

"তো পয়েন্টে আসি। তৃণা তালুকদারকে চেনেন নিশ্চয় মি. ফারদিন।"

সাহিল হালকা হেসে বললো — "চিনবোনা? মেমোরিতে গেঁথে আছে একদম।"

অন্তিক আর নীলয়ও মৃদু হাসে তার বলার ধরণ দেখে।

"তৃণা তালুকদারের বিরুদ্ধে বর্তমানে একটা কেস লড়ছি। এই কারণে আপনার সাথে তার বিষয়ে কিছু কথা বলতে চাই।"

"হ্যাঁ, আপনি বলুন কি জানতে চান। আমি প্রস্তুতি নিয়েই এসেছি। অবশ্য তৃণা যে নতুন করে আবার ঝামেলায় জড়িয়েছে তা শুরুতেই কানে এসেছিলো। তখনই বুঝতে পেরেছিলাম আমার ডাক যেকোনো সময় পড়বেই।"

অন্তিক মৃদু হেসে বললো — "বাহ। আপনার আন্দাজ শক্তি তো দারুণ।"

ওর বলার ধরণ দেখে সাহিল নিজেও মাথা নাড়িয়ে হালকা হাসে। — "শুনলাম SAOS Arbitration African Survey তে এসিস্ট্যান্ট রিসার্চার হিসেবে কাজ করেছেন সম্প্রতি। অভিনন্দন। একের পর এক অর্জন করেই যাচ্ছেন।"

অন্তিক তাকে ধন্যবাদ জানায়।

"তো দেশে আসলেন কবে? দেশেই থাকার প্ল্যান নাকি আবার অন্য গবেষণায় উড়াল দেবেন?"

"৫ মাস হলো এসেছি। দেশেই থাকবো। এখানেই কাজ আর রিসার্চ করবো। তবে নতুন কিছু এক্সপ্লোর করতে হলে যেকোনো সময় উড়াল অবশ্যই দিতে হবে।"

"বাহ। ভালো প্ল্যান। তো এবার উকিল সাহেবের জিজ্ঞাসাবাদে আসা যাক।"

"অবশ্যই। তবে জিজ্ঞাসাবাদ না। জিজ্ঞাসাবাদ তো বাদী-বিবাদী, সাক্ষী আর সন্দেহবাজনকে করি। আপনি আপাদত একটাও নন। তবে সাক্ষী হলেও হতে পারেন সামনে। আশা করি কো-অপারেট করবেন।"

ততক্ষণে ওয়েটার খাবার নিয়ে চলে এসেছে। সাহিল সবার আগে কফিতে এক চুমুক দেই। তারপর বলে — "হ্যাঁ, শুরু করুন। আমি আছি সাক্ষী হওয়ার চেষ্টায়।"

"তো যেটা জানতে চাচ্ছি — আপনার তৃণা তালুকদারের সাথে পরিচয়, সম্পর্ক, আর মেইনলি ঐ ভাইরাল রেকর্ডিং— এগুলো সম্পর্কে আগেপিছে ঘটনা গুলো জানতে চাই।"

সাহিল একটা নিঃশ্বাস ফেলে চেয়ারে হেলান দেই গাঁ এলিয়ে। তারপর বলতে শুরু করে।

"তৃণার সাথে আমার পরিচয় সে রাজনীতিতে আসার পর থেকেই। আমার দলেরই যেহেতু একজন সদস্য তাই সেরকমই একটা সম্পর্ক ছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় খুব সক্রিয় ছিল সে। তাই বিশ্বস্ত মনে করতাম তাকে।

আর ফোনালাপের ব্যাপারে যদি জানতে চান, তাহলে বলবো মেয়েটা ভীষণ দূরন্ধর। ও কোনো বিশেষ দলের স্পাই হবে এমনটা সন্ধেহ হচ্ছিলো। কারণ আমার দলে থাকলেও বিভিন্ন কাজকর্মে মনে হচ্ছিলো স্যাভোটেজ করছে। তাই সন্ধেহ জাগে। মেয়েটা ঠাণ্ডা মাথায় খুব কনফিডেন্স এর সাথে যে কাউকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রাখে। যেটা অনেক আগেই লক্ষ্য করেছি। সাথে ওর ম্যারিটাল ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কেও কিছু কথা কানে এসেছিলো। তারপর ওকে ওর পদ্ধতিতেই খোলাসা করতে চেয়েছিলাম। বলতে পারেন ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিলাম।

কিন্তু তখনও বুঝতে পারিনি ও আমার উপরেই চাল চালছে। সিরিয়াস রিলেশনের নাটক করবো এমনটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলোনা, তাই ভেবেছিলাম লিম্বো টাইপ একটা সম্পর্কের নাটক হলেও করি, আর আসল তথ্য বের করবো। তৃণাও যথেষ্ট সায় দিতো এসবে। চারবার কথা হয়েছিলো ফোনে। যার মধ্যে দুইটারই অডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় যায়। আর বাকি দুইটাই ফর্মাল কথাবার্তা, সাথে দলীয় কিছু কথাবার্তা ছিল।

আর দুই পক্ষ থেকেই কিছু ফ্লার্টি কথাবার্তাও ছিল। এইটুকুই।

আর মেইনলি যে কথাটাকে কেন্দ্র করে ব্যাপারটা অন্য পর্যায়ে যায়, সেটা যদি ক্ল্যারিফাই করতে যায় তো খুব লেইম মনে হবে কারণটা। বিশ্বাস নাও করতে পারেন। তাই জনগণের মাঝে ঐ কারণ দর্শীয়ে আর নিজেকে মিমিক্রি ম্যাটেরিয়াল বানাইনি।"

"সেই লেইম কারণটা শুনতে চাচ্ছি। আপনার নিজের দলের কর্মীকে হঠাৎ কি এমন কারণে এ ধরণের আপত্তিকর কথা বলার প্রয়োজন পড়তে পারে। যে কারণ আপনার নিজের কাছেই লেইম মনে হচ্ছে।"

"ওয়েল। তো ঘটনা হচ্ছে, সেদিন একটা ক্লাবে ছিলাম। নাইট ক্লাব। মাঝেমধ্যেই ওখানে যাওয়া হতো আমার। তো ক্লাবে আমার একজনের সাথে বন্ধুত্ব হয়। বন্ধুত্ব না ঠিক। পরিচয় হয় আরকি। দুজনেই মাঝেমধ্যে ওখানে যেতাম। হ্যাংআউট করতাম। তাই সেভাবেই পরিচয়। আমরা একসাথেই খেতাম ওখানে। একসময় একটা কল আসলে কথা বলে ফোনটা টেবিলেই রেখে দেই সেভাবে। আর আমার হ্যাংওভার হয়ে গিয়েছিলো। তাই তেমন কিছুই খেয়াল করতে পারিনি। ঐ শালা-ই সেদিন নিজের ফোন মনে করে আবোল তাবোল বকতে বকতে টেবিল থেকে আমার ফোন নিয়ে তৃণাকে ঐ টেক্সট পাঠায়।

এখন কাকে পাঠাতে গিয়ে তৃণাকে পাঠিয়ে দিয়েছে সেটা জানিনা। জানতে চেয়েছিলাম অবশ্য। কিন্তু শুনেছি ঐ শালা নে/শা/খো/র নাকি কোন মেয়ের সাথে কি কাণ্ড ঘটিয়ে রিহ্যাবিটেশনে গিয়েছে। বাড়িতেও খোঁজ নিতে লোক পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু দারোয়ান বলেছে বাড়িতে নাকি কেউ নেই। ছেলেটার পরিবার বলতে আছে বাবা। যে অসুস্থ হয়ে হসপিটালে এডমিট তখন।

এখন এই ঘটনাটা মিডিয়াতে বলার মতো তো না। কিংবা পুরো ঘটনা স্কিপ করে শুধু একজন আমার ফোন থেকে ভুলে অন্য কাউকে টেক্সট পাঠাতে গিয়ে ওকে পাঠিয়ে দিয়েছে, এটাও বলার মতো বা বিশ্বাস করার মতো না। বাকি যেটুকু সম্মান ছিল তাও যেতো নিশ্চিত। ঐ শালা নে/শাখো/রের বাচ্চার জন্য পুরো একটা মাস আমার জীবনে ট্র্যাজেডি হয়ে ছিল।

আর এসব কিছু বুঝিয়ে বলবো বলে তখন ফোনে ঐ বে/শ্যাটাকে দেখা করতে বলেছিলাম সরাসরি। কিন্তু শা/লি রেকর্ড করে সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে দেই। তবে সবকিছুর মধ্যে হাস্যকর ব্যাপার হচ্ছে এতোকিছু করেও কারো কাছে বিন্দুমাত্র সিম্প্যাথি পেলোনা। তার হয়েতো কেউ বললোনাই, আমাকে ট্রল করেছিলো যারা তাদের কাছেও সহানুভুতি পেলোনা। উল্টো নিজের কীর্তি ফাঁস হলো।" — কথাটা বলে সাহিল হালকা হাসলো, যেন খুব মজা পেয়েছে তৃণার ব্যাপারটায়।

তারপর আবার বলে উঠলো — "এন্ড বাই দা ওয়ে। এক্সকিউজ মাই ল্যাংগুয়েজ প্লিজ।"

"আচ্ছা, যে ছেলেটার জন্য এতোকিছু হলো আপনার তাকে সন্ধেহ হয়নি কখনো? যে সেও তৃণার লোক হতে পারে। বা এটাও কোনো ষড়যন্ত্র।"

"উহুম। খোঁজ নিয়েছিলাম। এমন হওয়ার চান্স নেই। পুরোদস্তুর ব্যবসায়িক ফ্যামিলি থেকে বিলং করে। রাজনৈতিক এসব ক্যাচালে একেবারেই নেই। আর তাছাড়া ছেলেটার নিজের জীবন বলতেই ছিল ওসব নেশা-পানি আর নানান ধরণের ড্রা/গ। বলতে পারেন একপ্রকার লাইফলেস। আর ডিপ্রেশন-ফ্রাস্ট্রেশন এসব তার নিত্যসঙ্গী ছিল। এই ধরণের ছেলে অন্যের হয়ে কাজ করে কারো ক্ষতি করবেনা। এরা নিজেদের যা ইচ্ছে হয় তাই করে। যেমন ঐদিন করেছিলো আমার ফোন থেকে। সাইকো একটা।"

এ পর্যায়ে অন্তিক আর নীলয় দুজনে একসঙ্গে একে অপরের দিকে তাকায়। মনে হলো যেন তারা দুজনে একসঙ্গে কিছু একটা ধরতে পেরেছে।

"উম.. সব বুঝলাম। কিন্তু পুরো ঘটনায় তৃণার বিরুদ্ধে কাজে আসবে এমন কিছু তো পেলামনা।"

"আরে আরে! উকিল সাহেবের এতো অধৈর্য হলে চলবে? এখনো তো আসল কথা বলা বাকি।"

অন্তিক ভ্রু কুচকে তাকায়। নীলয়ও আগ্রহী চোখে তাকাচ্ছে। এভাবে সাহিল দুজনকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে বলে —

"রিল্যাক্স। এতো জুহুরি চোখে তাকানোর কিছু নেই ব্রাদার্স। মনে হলো আপনাদের জন্য ইনফরমেটিভ এমন কিছু বলা এখনো বাকি।

সো.. মে আই?"

অন্তিক কুচকানো ভ্রু-জোড়া সোজা করে বলে —

"প্লিজ.."

"তো ব্যাপারটা হচ্ছে, এই যে এতকিছু আপনাদের বললাম। কি কারণে এমন অপ্রীতিকর কথা তৃণাকে বলা হয়েছে, এর পেছনের কারণ। এসব তৃণা জানতো। ইভেন ওর সাথে আমার পুরো ব্যাপারটা সোশ্যাল মিডিয়ায় যাওয়ার আগেই কথা হয় সামনা-সামনি। সবকিছু আমি ওকে খুলে বলেওছিলাম। তাও ও কি কারণে জিনিসটা পাবলিক করেছে তা এখন আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। ও যে স্পাই ছিল সেটা এখন কমবেশি প্রায় সবাই জানে।

মোটকথা ও ইচ্ছে করেই এসব করেছে। এখন এই কথাগুলো কখন, কোথায়, কিভাবে কাজে লাগাতে হবে বা কাজে আসবে সেটা উকিল সাহেব ভালো জানবেন নিশ্চয়।"

"হুম, বুঝলাম। আপনারা কোথায় মিট করেছেন সেটার এক্স্যাক্ট লোকেশন আমাকে টেক্সট করে পাঠিয়ে দিবেন কাইন্ডলি।"

"শিউর। এখন-ই পাঠিয়ে দিচ্ছি।" — এটা বলে সাহিল পাশ থেকে ফোন নিয়ে অন্তিককে টেক্সট করে পাঠিয়ে দেই সাথে সাথে।

অন্তিক লোকেশনটা দেখে নিয়ে বলে —

"আপনার দেওয়া তথ্যগুলো সামনের সপ্তাহে কোর্টের রায় বদলাতে অনেক সহায়তা করবে। থ্যাংক্স ফোর কো-অপারেটিং আস্।"

"মাই প্লেশার।"

"এবার তাহলে উঠি। আশা করি সামনে কখনো আবার দেখা হবে।"

"শিউর।"

—————————

প্রাণেশা তার কলেজের নতুন বান্ধবীর সাথে একটা আইস্ক্রিম ভ্যানের পাশে দাড়িয়ে আইস্ক্রিম খাচ্ছে। একটু আগে পাশের ঐ ফুচকা স্টল থেকে দুজনে ফুচকা খেয়েছিল। সে কি ঝাল। চোখ-মুখ লাল হয়ে পানি এসে গিয়েছিলো দুজনের।

তাই তাড়াতাড়ি আইস্ক্রিম ভ্যানের কাছে এসে আইসক্রিম নিয়েছে আবার।

প্রাণেশার নতুন বান্ধবীর নাম মেহা। বাান্ধবীও নতুন, সাথে কলেজও নতুন। প্রাণেশা আগে যে কলেজে পড়তো সেখান থেকে তার শাশুড়ি মা তাকে এখানে ট্রান্সফার করিয়ে এনেছে। এটা কলেজসহ একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি। ইশিও এখানে পড়ে। দুজনে একসাথেই আসা-যাওয়া করে, যদি না কেউ একজন কলেজে না এসে থাকে। আজকেও ইশির সাথে এসেছে। কিন্তু তার ক্লাস আগে শেষ হয়ে যাওয়ায় সে মেহার সাথে চলে এসেছে। মেহাই কে ভুজুং-ভাজুং বুঝিয়ে নিয়ে এসেছে। আশেপাশে আরো কয়েকজন ছেলে মেয়ে দেখা যাচ্ছে কলেজসহ ভার্সিটিরও।

এখন দুজনে আইসক্রিম খেতে খেতে গল্প করছে। মেহা প্রাণেশার সাইন ল্যাংগুয়েজ বুঝতে পারে। তাই তাদের গল্প করতে অসুবিধা হয়না। প্রাণেশার গল্প করতে করতেই হঠাৎ মনে হলো কেউ তাকে গভীরভাবে পরখ করছে। তার অস্বস্তি হলো। আশেপাশে চোখ ঘুরিয়ে তাকালে তেমন কাউকে খুঁজে পেলোনা। কিন্তু তার অস্বস্তি কাটছেনা। মনে হচ্ছে কেউ তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। সে হঠাৎ উড়না ঠিকঠাক করে গাঁয়ে মেলে দিলো।

আগেও অবশ্য ঠিক-ই ছিল। কিন্তু মেয়েদের সিক্স সেন্স তাদের কিছু কিছু ক্ষেত্রে আগাম ইঙ্গিত দেই। প্রাণেশার ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম হলোনা।

———————

নীলয় আর অন্তিক গাড়িতে আছে এখন। নীলয় গাড়ির লুকিং গ্লাসে পেছনে থাকা অন্তিকের দিকে তাকালো।

গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো —

"স্যার, মি. ফারদিনের মুখে ভাইরাল অডিওর কথা শুনে আপনারো কি তাই মনে হচ্ছে যেটা আমি ভাবছি?"

"ভাবার কিছু নেই। ওটা ইরফানই ছিল। ওর দ্বারাই এসব সম্ভব।"

"ভাগ্যিস মি. ফারদিন ইরফান স্যারের দিক থেকে ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে। নাহলে যদি তাকে ভুল বুঝে প্রতিশোধপরায়ন হয়ে উঠতো তাহলে আমাদের জন্য ব্যাপারটা সামলানো টাফ হয়ে যেতো। যথেষ্ট বিত্তবান পরিবার তাদের, নামডাক তো আছেই। তারউপর রাজনীতিতে আসার পর থেকে সাহিল ফারদিনের হাত লম্বা।"

"সেসব ব্যাপার না। সামলানো যেতো। ক্ষমতা আর টাকার চেয়ে ট্রিক্স জীবনকে বেশি সহজ করে। আমি ভাবছি অন্য কথা। তোমার কি মনে হয়নি সাহিল ফারদিনের সাথে কারো একটা চেহারা খুব মিলে? "

"চেহারার মিল? কার সাথে স্যার?"

"সেটাতো আমিও বুঝতে পারছিনা। কিন্তু কারো একটার সাথে খুব মিলে। মাথায় আনতে পারছিনা আপাদত।"

মৌনপ্রেম পর্ব ১১ গল্পের ছবি