দিগন্ত নিজের আর ইশির কিছু মুহূর্ত কেটে পুরো ব্যাপারটা ওদের জানায়। মাহাদ, নীলয়সহ অন্তিকের ফুফু ও শুনে পুরো ঘটনাটা। সব শুনে মাহাদ বলে -
"তাহলে শেষ পর্যন্ত অন্তিক ভাই কট খেয়ে বিয়ে করলো। ইন্ট্রেস্টিং!!"
একথা শুনে দিগন্ত ওর মাথায় একটা ঘাট্টা মারে।
কিন্তু নীলয় খুব কনফিউজ্ড। স্যার ম্যাডামকে প্রথমে বিয়ে করতে চাইনি কেন? স্যার তো খুব মরিয়া হয়ে খুঁজছিল তাকে।
সেদিন যখন অন্তিক নীলয়কে প্রাণেশার ব্যাপারে খোঁজ নিতে বলে তখন নীলয় ঐদিনই ভার্সিটিতে গিয়েছিলো খোঁজ নিতে। কিন্তু ওখানে গিয়ে সবার থেকে জিজ্ঞেস করেও কোনো লাভ হয়নি।
মেয়েটার ব্যাপারে কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেনি। ভেবেছিলো পরদিনই সকাল সকাল এসে আশেপাশের সিসিটিভি ফুটেজ চেক করবে। কারণ ভার্সিটিতে যে পাশে ওরা ধাক্কা খেয়েছিল সে পাশের সিসিটিভি নাকি নষ্ট। আর বাকি ফুটেজ গুলোতে কোথাও প্রাণেশাকে দেখা যায়নি। কি আর করা। তাই পরদিন আবার আশেপাশের ফুটেজ চেক করবে এই ভেবে সেদিন চলে গেলো।
কিন্তু তা আর হয়ে উঠেনি।
কারণ সংশোধনাগারে ইরফানের অবস্থা খুব খারাপ হচ্ছে খবর আসে। তাকে যেহেতু হুট করে ড্রা/গ/স নেওয়া ছাড়তে হয়েছিলো তাই এমনিতেও নানান রকম সমস্যা হতো কিছুদিন পর পর। কিন্তু সেবার ইরফানের শরীর মারাত্মক খারাপ হতে থাকে। তখন নিজের সবরকম কাজ ছেড়েছুড়ে অন্তিকের তাকেই সময় দিতে হয়েছে। ইরফানের সব দায়িত্ব তাকেই নিতে হয়েছে। কারণ ইরফানের পরিবার বলতে আছে তার বাবা। মা নেই। তিনি লন্ডনে নিজের বর্তমান স্বামীর সাথে ব্যাস্ত।
ইরফান খুব ছোট থাকতেই তার বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়। কিছুদিন বাবার সাথে তো কিছুদিন মায়ের সাথে, এভাবেই চলছিলো তার। কিন্তু কোর্ট থেকে ইরফানের কাস্টাডি তার বাবার কাছে গেলে তখন থেকেই তার আর বাবার একার সংসার। ইরফানের বাবা ইরফানকে খুব ভালোবাসে। কিন্তু লোকটা টাকার পেছনে ছুটতো বেশি। সারাটাজীবন বিজনেস আর এই অফিস সেই অফিস করেই কাটিয়েছেন। কাজের ব্যস্ততার দরুন নিজের একমাত্র ছেলেটা যে বিপথে যাচ্ছে তা টের ও পেতেন না।
যখন আস্তে আস্তে ছেলের বেপরোয়া জীবন আর উচ্ছন্ন, উগ্র স্বভাব তার সামনে প্রকাশ পেতে থাকে তখন তার আর কিছু করার থাকেনা।
তারপর ও নানান ভাবে চেষ্টা করেছেন ছেলেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে, নিজের মতো কাজে ডুবাতে। কিন্তু পারেননি।
শেষে যখন অঘটনটা ঘটায় তখন মানুষটা ধাক্কা সামলাতে না পেরে স্ট্রোক করে বসেন। যদিও বিপদ কাটিয়ে উঠেছে, তবে এখন আর একা হাতে আগের মতো সব সামলাতে পারেন না। শরীর সায় দেইনা। তাই ইরফানের সবকিছু অন্তিককেই সামলাতে হয়।
অন্তিক এসব কারণে তখন খুব ব্যস্ত হয়ে পড়ে। নিজের সব কাজ নীলয়ের হাতে তুলে দেই।
এমনকি অন্তিকের ঐ সপ্তাহে পারিবারিক ব্যবসার কাজে মালেশিয়া যাওয়ার কথা ছিল বিধায় সেখানেও নীলয় কেই যেতে হয়।
তাই প্রাণেশার ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়াটা পিছিয়ে যায়।
নীলয় তো দেশেই এসেছে বিয়ের ঘটনার আগের দিন। সে দেশে এসেই প্রাণেশার সব খুঁটিনাটি তথ্য বের করে ফেলে। আর সবকিছু যে ফাইলে ছিল সেটা সহ প্রাণেশার ছবিও অন্তিকের ব্যক্তিগত ফ্ল্যাটে পাঠিয়ে দিয়েছিলো তার পরদিন, যেহেতু অন্তিক ইরফানকে নিয়ে সেখানেই ছিল তাই।
তাহলে অন্তিক তার কাঙ্খিত মেয়েটাই প্রাণেশা ছিল, এটা জানার পরও বিয়েতে আপত্তি করলো কেন? নীলয় তো ভেবেই নিয়েছিলো অন্তিক সেই মেয়েটা অর্থাৎ প্রাণেশাকে ভালোবেসে ফেলেছে বলেই এতো ডেস্পারেট হয়ে হঠাৎ তার খোঁজ নিতে বলেছে।
এমনকি সে মালেশিয়া থাকতেও ইরফানকে নিয়ে এতো ব্যস্ততার মাঝে তাকে ফোন দিয়ে জানতে চাচ্ছিল মেয়েটার ব্যাপারে কোনো তথ্য জোগাড় করতে পেরেছে কিনা।
তাহলে ওকে বিয়ে করতে না চাওয়ার কারণ?
তাহলে কি মেয়েটা বাক প্রতিবন্ধী জেনেই তার হঠাৎ বদলে যাওয়া?
নীলয় এতোক্ষণ খুব কনফিউজড ছিল অন্তিকের প্রাণেশাকে বিয়ে না করতে চাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে। কিন্তু মেয়েটা বাক প্রতিবন্ধী, এটা মাথায় আসতেই সে থমকে গেলো। তাহলে স্যার এই কারণেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে?
মাহাদ, নীলয় আর দিগন্ত তখনও ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে। নীলয় গভীর ভাবনায় মগ্ন। আর মাহাদ, দিগন্ত গল্প করছে কিছু নিয়ে। এর মধ্যে হঠাৎ দরজা দিয়ে প্রণেশাকে বাইরে থেকে দৌড়ে আসতে দেখা যায়। মনে হচ্ছে কারো থেকে পালিয়ে আসছে মেয়েটা। তবে চোখে মুখে লজ্জ্বা লজ্জ্বা ভাব, যা তারা কেউ খেয়াল করলোনা। ওরা একে অপরের দিকে তাকালো। কোনো বিপদ হলোনা তো, এই ভেবেই দিগন্ত উঠে বাইরে দেখতে যাচ্ছিলো। এর মধ্যে দেখা যায়,অন্তিকও প্রাণেশা যেদিক থেকে এসেছে সেদিক থেকে ভেতরে আসছে। ওকে দেখে আর ব্যাপারটা ঘাটালোনা দিগন্ত। স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপার হয়তো, ওর মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই।
নীলয় বাইরে ওদের ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখে এসেছিলো। যদিও ঝগড়া করছিলো। কিন্তু তিক্ত ঝগড়া যেহেতু ছিলনো। বরং মিষ্টি ঝগড়া ছিল, তাই নীলয় ভাবছে স্যার নিজেও হয়তো এখনও কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারছেননা ম্যাডামকে নিয়ে।
হঠাৎ করে বিয়ে হয়েছে বলে সবঠিক হতে একটু সময় লাগবে। এই ভেবে নীলয় উঠলো সেখান থেকে। মাহাদ আর দিগন্তকে বিদায় জানিয়ে যে ফাইলটা নিতে এসেছিলো সেটা নিয়ে চলে গেলো সে।
_______
অন্তিকের ফুফু এখন বসে আছেন অন্তিকের দাদী শাইনা বেগমের রুমে। সেখানে অন্তিকের মা আর চাচীও রয়েছেন।
অন্তিকের ফুফুর মেজাজ খারাপ। তিনি ভাবতে পাঢ়ছেননা একটা চক্রান্তে পড়ে তার ভাতিজাকে একটা বাক প্রতিবন্ধী মেয়ের সাথে কিভাবে বিয়ে দেই এরা। মানছে মেয়েটা সুন্দরী, তাই বলে বোবা-কালা যে কাউকে ধরে এনে তার ভাতিজার গলায় ঝুলিয়ে দেবে?
যেখানে ঐ পুরো ঘটনাটা যে একটা পূর্ব পরিকল্পিত নাটক তা এখন স্পষ্ট সেখানে এই বিয়ের মানে কি?
"এখন কি করবে সিদ্ধান্ত নিয়েছ ভাবি? রাখবে ঐ মেয়েটাকে অন্তিকের বউ হিসেবে?"
"অন্তিকের বউ-ই তো মেয়েটা। রাখা না রাখার প্রশ্ন আসবে কেন?"
"তুমি একথা বলছো? আমাদের অন্তিক আরো অনেক ভালো মেয়ে ডিজার্ব করে ভাবি।"
অন্তিকের মা খানিকটা নরম সুরে বললেন -
"বিয়েটা যেভাবেই হোক। হয়েছে তো!! তাহলে এখন আমাদের আপত্তি করার দরকার কি?
একথা শুনে অন্তিকের ফুফু বিরক্তি সুরে বললেন -
"আমাদের আপত্তি না শুধু, অন্তিকও বিয়েটা করতে চাইনি। ভুলে যাচ্ছো?"
"বিয়ে যখন হয়েছে তখন আস্তে আস্তে ঠিক মেনে নেবে। তাছাড়া স্বাভাবিক বিয়ে যেহেতু ছিলোনা তখন সময় লাগবে, তাই নয় কি?" - দাদী
"হ্যাঁ। তাছাড়া কথা বলতে পারেনা এটা ছাড়া আর কোনো কমতি নেই মেয়েটার মধ্যে। খুব ভালো।" - চাচী
"তোমাদের সব কথা বুঝলাম। কিন্তু মেয়েটার জন্ম পরিচয় নিয়ে ভেবেছ? তোমরাই তো বললে বাবার পরিচয় নেই। তাহলে? দেখো আদো মেয়েটা জায়েজ কিনা।" - ফুফু
"কথা বুঝে শুনে বলিস মার্জিয়া। তাছাড়া এমন কিছু যদি হয়েও থাকে তাহলে এতে মেয়েটার কোনো দোষ দেখছিনা। দোষ ওর বাবা-মার। আর ওর মা মৃত। তাই এসব কথা মুখে আনিসনা।" - দাদী
এবার কিছুটা রাগী সুরে অন্তিকের ফুফু বললেন -
"আমি আশ্চর্য হচ্ছি তোমাদের কথা শুনে। অন্তিকের কথা কি তোমরা একটুও ভাবছোনা? ওর কি চাওয়া থাকতে পারেনা একতট সয়ংসম্পূর্ণা মেয়ে ওর জীবনসঙ্গী হবে এমনটা? সৃষ্টিকর্তার দেওয়া কমতি নিয়ে কিছু বলছিনা যাও। কিন্তু ওন্তিকই তো বিয়েটা মানছেনা। তাহলে তোমরা কেন ছেলেটার সাথে ঐ মেয়েকে বেধে দিতে চাচ্ছো আমি তা বুঝতে পারছিনা। ডিভোর্স করিয়ে দিলেই তো পারো।"
"তোমার অন্তিককে নিয়ে চিন্তা করাটা আমি বুঝতে পারছি। কিন্তু ডিভোর্স এর কথা বলোনা, আল্লাহ্ নারাজ হবেন।" - অন্তিকের মা।
"হ্যাঁ। আর তাছাড়া এমন না যে মেয়েটার কোনো বাজে স্বভাব আছে বা চরিত্র খারাপ। তাই এসব ছাড়াছাড়ির কথা না বলায় ভালো। আল্লাহ্ নারাজ হবেন। একটা সুযোগ দেওয়াই উচিত আমাদের বিয়েটাকে। তাও যদি কোনো গতি না আসে তাহলে নাহয় পরে এ বিষয় নিয়ে ভাবা যাবে।" - দাদী
"বেশ। তাহলে তাই হোক।" - ফুফু
————
প্রাণেশা দৌড়ে রুমে এসে দরজা একদম বন্ধ করে বসে আছে। তার অদ্ভুদ অনুভুতি হচ্ছে। লোকটা আবার তার সাথে অসভ্যতামি করলো।
কিন্তু এবার আর আগের মতো গাঁ ঘিনঘিন করছেনা। স্বামী বলেই হয়তো। কিন্তু অসহ্যকর এক অনুভুতি হচ্ছে তার। ছিঃ ছিঃ! আবার কেমন করে কাছে টানলো তাকে লোকটা। হয়তো সেদিনের মতোই চুমু টুমু খাওয়ার মতলব ছিল।
কিন্তু তাকে তো বউ হিসেবে মানেনা এমন ভাব করে থাকে। শুধু ভাব কি? মুখেও বলেছে। তার রুমে অব্দি টাই দেইনি প্রাণেশাকে। তাহলে এখন এসবের মানে কি?
বউ মানবেনা অথচ চাহিদা থাকবে। ছিঃ!!তার এ কথা ভাবতেই ঘৃণা লাগছে।
সেদিনও যখন শ্বাশুড়ি মায়ের কথায় লোকটাকে কফি দিতে গিয়েছিলো রুমে, তখনও তাকে মুখের উপর বউ হিসেবে মানেনা বলে এসব অধিকার কিংবা দায়িত্ব পালনের নাটক না করতে বলেছিল।
একথা শুনে তার রাগ যেমন হয়েছিলো তেমনই মন খারাপও হয়েছিলো। তাই মন খারাপি নিয়েই চলে যাচ্ছিলো প্রাণেশা।
কিন্তু হঠাৎ তাকে পেছন ডেকে অন্তিক বলে উঠে যাতে সে সামনের বার থেকে মাথায় সহ বুকে, পিঠে উড়না রেখে তার সামনে আসে।
একথা শুনে প্রাণেশা অবাক। কি বলে লোকটা। মাথায় নাহয় উড়না রাখতে বললো, কিন্তু বুকে পিঠেও মানে?
তার পোশাক-আশাক কিংবা উড়না পড়ার ভঙ্গি কোনোদিনও অশালীন নয়। তাহলে বুক পিঠ ডাকতে বলার মানে কি?
তাকে অভদ্র অশালীন বুঝাতে চাচ্ছে? কখনো না। বরং ঐ লোকের-ই দৃষ্টি বাজে। তার পোশাক-আশাকে কোনো সমস্যা নেই। আর এমনও না যে এই বাড়ির অন্য মেয়েরা প্রাণেশার চেয়েও বেশি পর্দা করে।
তাহলে দাড়ায়, এই লোকের-ই দৃষ্টি বাজে।
প্রাণেশা তখন পাশ থেকে খাাতা কলম নিয়ে লিখে জানিয়েওছিল একথা। তারপর চলে যেতে নিলে অন্তিক তাকে হাত ধরে আটকায়। তারপর কাছে টেনে এনে বলে -
"কি বললে তুমি? আমার দৃষ্টি বাজে? বেয়াদব মেয়ে মাথায় কাপড় দিতে বলেছি কারণ তোমার চুল থেকে গন্ধ আসে। অসহ্যকর গন্ধ। এই দেখো। এখনো আসছে।" - হালকা কাছে এসে শুকে নিয়ে বলে সে।
তারপর আবার -
"আর আমি খুব ভালো করে জানি তুমি আমাকে সিডিওস করার জন্য সবসময় আমার সামনে আসো। তাই বুকে পিঠে কাপড় রাখবে।"
প্রাণেশা তখন অবাক হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে। সে লোকটার সামনে আসে সবসময়? মাথা বোধ হয় পুরোই গিয়েছে। বিরক্তি নিয়ে অন্তিকের দিকে তাকিয়ে সে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেই। আর খাতায় লিখে -
"আপনাকে সিডিওস করুক আমার জুতো। আর আমার চুল গন্ধ? হ্যাঁ। গন্ধ-ই। গন্ধ তাই আমিও আর আপনার সামনে আসবোনা, আপনিও কথায় কথায় আমার কাছে আসবেননা। প্রব্লেম সল্ভ।"
এরপর সে ওখান থেকে চলে এসেছিলো।
প্রাণেশা ভাবছে সেদিনও লোকটা তাকে বউ হিসেবে মানেনা বলেছিলো। আবার তার চুলেও নাকি গন্ধ। আর আজকে এই চুলেই একদম মুখ ডুবিয়ে ছিলো।
আর তো আর তাকে আবার কাছে টানতে চাচ্ছিলো।
প্রাণেশার মন অন্তিকের প্রতি একরাশ বিতৃষ্ণায় ভরে উঠলো।