ঘড়িতে তখন ভোর ৫টা ৪৭। শহরটা এখনো ঘুমিয়ে, কিন্তু জিমের দরজার ওপাশ থেকে ভেসে আসছে ডাম্বেল পড়ার মৃদু আওয়াজ। ঘামের গন্ধ, একটানা শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ, আর ওয়েটলিফটিং-এর ছন্দে একটা কড়া সকাল শুরু করেছে অন্তিক।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, কালো স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে, চকচকে ঘামে ভেজা চিবুকটা মুছে নিচ্ছে। পেছনের জানালা দিয়ে হালকা রোদ ঢুকছে। চোখদুটো গভীর মনোযোগী, তবে ক্লান্তির আভাস নেই।
পাশের ছোট্ট একটি টেবিল থেকে সে পানির বোতলটা তুলে নিয়ে চুমুক দেয়, তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে যায় ট্রেডমিলের দিকে। ট্রেডমিল চালু করার আগেই হঠাৎ কারও উপস্থিতি টের পেয়ে পেছনে তাকায়।
জিমের দরজার কাঁচের ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল দিগন্ত। অন্তিকের কাজিন। কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত ছিল সে। দরজার পাশে দাঁড়াতেই অন্তিক ওর উপস্থিতি টের পায়। আটাশ বছরের সুদর্শন দিগন্ত ভাই-এর ডাকে ভেতরে প্রবেশ করে। সে অন্তিকের মতো ততোটা স্বাস্থ্য সচেতন নয় বলে তেমন একটা আসে না জিমে।
তাই অন্তিক ওকে হঠাৎ এখানে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলো—
"কি ব্যাপার, এখানে চরণধূলি পড়লো আপনার। হঠাৎ শরীরচর্চা করার মতো সুবুদ্ধির উদয় হলো কি কারণে?" খানিকটা হেয়ালি করে বললো অন্তিক।
"ভাই, তোমার সাথে জরুরী কথা আছে। আমার এক বান্ধবী আছেনা মেঘলা? একসাথে কলেজে পড়তাম আমরা। ওর ব্যাপারে কিছু কথা ছিল।"
"বল।"
"ভাই, মেঘলার তো বিয়ে হয়েছিল আমরা ভার্সিটিতে উঠেই নতুন নতুন। ওর বিয়েটা হয়েছিল পারিবারিকভাবে। বিয়ের দুই বছর পর ওর বাবা মারা যায়। তাই আর্থিকভাবে আর মানসিকভাবেও ওর পরিবার দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তখন থেকেই ওর শ্বশুরবাড়ির লোকজন ওকে নানান রকম কথা শুনানো থেকে শুরু করে আরও বিভিন্নভাবে অপমান, অপদস্থ করতে থাকে। এভাবে অনেক বছর কেটে যায়। ওর কোনো সন্তানও হয়নি, আর এটা নিয়েও পরিবারে নানা রকম অশান্তি তৈরি হয়। এখন তো ওকে রীতিমতো শারীরিক নি র্যা ত নের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আমাদের তো তেমন যোগাযোগ ছিল না ওর সঙ্গে, তাই এত কিছু জানতাম না। কিছুদিন আগে রাজিবের সঙ্গে হঠাৎ মেঘলার দেখা হয়। তখনই এসব জানতে পারি। আমরা এখন চাই ওকে ওর শ্বশুরবাড়ি থেকে নিয়ে আসতে। আর ওর স্বামীকেও যথাযথ শাস্তি দিতে। তুমি যদি ব্যাপারটা একটু দেখতে....."
কথা শেষ করে অন্তিকের দিকে তাকায় দিগন্ত। অন্তিক ওর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
বোতল থেকে আবার পানি খেয়ে বোতল আগের জায়গায় রেখে অন্তিক বলে—
"ঠিক আছে আমি নীলয়কে বলে দিবো ওর ব্যাপারটা মিটমাট করে দিতে। তুই নিশ্চিন্তে থাক।"
দিগন্ত জানতো তার ভাই নীলয়কেই দিয়েই এসব ব্যাপার মিটমাট করতে পারবে। নীলয় হলো অন্তিকের পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট, বলা যায় ওর বাম হাত। অন্তিকের সবরকম খুঁটিনাটি গোপন খবর নীলয়ের কাছেই পাওয়া যাবে। বিশ্বস্ত একজন সঙ্গী সে।
অন্তিকের আশ্বাস পেয়ে দিগন্ত নিশ্চিন্তে ফিরে যায়। যদিও দিগন্ত নিজেও পারতো সবকিছু সামলে নিতে। কিন্তু তারও ইদানীং হসপিটালে খুব ব্যস্ততার সাথে দিন কাটছে। নাহয় ড. দিগন্ত সরোয়ারের ক্ষমতাও নেহাৎ কম নয়। সরোয়ার পরিবারের ছেলে সে। সময় থাকলে সে নিজেই ঐ কা পু রুষ আযাজ খান (মেঘলার স্বামী) কে দেখে নিতে পারতো।
মূলত অন্তিক একজন আইনজীবী। অন্তিক সরোয়ার। সে তরুণ এবং অভিজ্ঞ একজন আইনজীবী। কিন্তু এখনও অনেকটা পথ বাকি। বয়স ত্রিশ পার করলো, উচ্চতা প্রায় ছ’ফুট, গায়ের রং হোয়াইটিশ, কিন্তু ঘামের ছাপ লেগে সবসময় যেন রোদে পোড়া চকচকে একটা আভা থাকে ত্বকে। শরীরটা জিমে গড়া, তবে ওভারশো না। দৃঢ়, ছিমছাম। কাঁধ চওড়া, চোখদুটো গভীর। কথা কম বলে, কিন্তু একবার মুখ খুললে চারপাশ থেমে যায়। খুব কম মানুষ আছে যার সামনে অন্তিক মাথা নত করে। সে বরং নিজের চোখ দিয়ে লোকের মন পড়ে নিতে পারে। চুলগুলো খুব সুন্দর করে কাটা। মাঝে মাঝে একটু এলোমেলো হয়ে যায় যখন কাজের চাপে রাত জেগে থাকে।
তার এই ৩১ বছরের জীবনে আর কয়েক বছরের এই পেশায় সে যথেষ্ট নাম কামিয়েছে।
অন্তিক ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে দেখল কেউ উঠেনি ঘুম থেকে। যদিও সে জানতো এমনটাই হবে। কারণ গতরাতে সবাই এক আত্মীয়ের বাড়ি জন্মদিনের পার্টি এটেন্ড করতে গিয়েছিল। তাই আজ সকাল সকাল নিচে কারও দেখা না পাওয়াতে তেমন একটা অবাক হলোনা। বাইরে কোন রেস্টুরেন্ট থেকে ব্রেকফাস্ট করে নিবে এই ভেবে বেরিয়ে গেলো।
গাড়িতে সামনে ড্রাইভারের পাশে আছে নীলয়। পেছনে বসে অন্তিক তার বর্তমান কেইসের ফাইল দেখছিল। মাঝে মাঝে নীলয় থেকে কিছু না জানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জেনে নিচ্ছে।
নীলয় বললো,
"স্যার, তোশা ম্যাডাম আসবে সামনের মাসে। টিকিট কেটে ফেলেছে। আপনাকে কাল রাতে বার বার কল দিচ্ছিল, আপনি হয়তো বিজি ছিলেন। আপনাকে না পেয়ে আমায় জানালো।"
"ওহ। কাল রাতে পার্টিতে বিজি ছিলাম। অতিরিক্ত সাউন্ডের কারণে হয়তো শুনতে পায়নি। আমি কল করে নেবো ফ্রি হয়ে। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই কেইসের জড়িত প্রত্যেকের পাস্ট হিস্ট্রি বের করো নীলয়।"
"ওকে স্যার।"
----------------
"প্রাণো চল আজ। বাকিটা কাল করিস। সন্ধ্যা হয়ে এলো। যেতে যেতে অন্ধকার হয়ে আসবে। গুছিয়ে নে সব। বেশি দেরি হলে মা বকবে।"
প্রাণেশা শুনলো বোনের কথা। যতটুকু হয়েছে তাতেই সব গুছিয়ে নিলো। বোনকে ইশারায় জানালো তার হয়ে গিয়েছে।
"কাল আবার আসবো তোকে নিয়ে। কালও ইউনিভার্সিটি অফ। তখন বাকিটা কমপ্লিট করিস, কেমন?"
প্রাণেশা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তারপর দুজনে এটা সেটা নিয়ে গল্প করে করে বাড়ি পৌঁছালো। যদিও প্রাণেশার বোন আরশি-ই বকবক করলো সারাক্ষণ আর প্রাণেশা শুধু শুনলো।
আধঘণ্টা পর ওরা বাড়ি পৌঁছালো। বাড়ি গিয়েই দুবোন ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ এলো বিকালের নাস্তা সারতে। যদিও বিকেল নেই, সন্ধ্যা হয়ে এলো প্রায়। নিচে এসে দেখলো আরশির ছোট ভাই আরিভ সোফায় উপুড় হয়ে শুয়ে সামনে বই নিয়ে কিছু একটা পড়ছে। সবার হয়তো হালকা নাস্তা খাওয়া শেষ এই ভেবে সে গিয়ে সোফায় বসলো।
আর তাদের ফুফাতো বোন প্রাণেশা গেলো কিচেনে, আরশি আর নিজের জন্য নাস্তা আনতে। কিচেনে গিয়ে বুঝলো কেউই নাস্তা সারেনি এখনও। হয়তো ওরা এলে প্রাণেশা নাস্তা বানাবে, তারপর খাবে এই আশায়। প্রাণেশা মলিন হাসলো। সে জানতো এমনটাই হবে। জানবেনা কেন? হয়েই তো আসছে এমনটা। সে যে অহেতুক পড়ে আছে এই বাড়িতে।
এমনি এমনি তো তাকে পেলে পুষে বড় করবেনা। কিছু ক্ষেত্রে তো কাজে আসতেই হবে মামা-মামির। যদিও তারা মুখে কোনো কটু কথা বলেন না। তবে সে বুঝতে পারে সবকিছু। এতটাও অবুঝ সে নয়, যে বাস্তবতা বুঝবে না।
প্রাণেশার মা ছিলেন তার মামার পালিত বোন। তার মামা আজমান আহমেদ-এর বাবা মা আয়েশা সুলতানা ও জিয়াউর আহমেদ, তাদের কোনো কন্যা সন্তান না থাকায় তার মা আলিজা আহমেদ কে দত্তক নিয়েছিলেন কোন এক হসপিটাল থেকে। জিয়াউর আহমেদ ও আয়েশা সুলতানা দম্পতির কন্যা সন্তানের খুব শখ ছিল। তাই আজমান আহমেদের ১২ বছর বয়সে ঐ দম্পতির আর কোন সন্তান না হওয়ায় একটি কন্যা সন্তান দত্তক নেন।
ভালোই ছিলেন আলিজা আহমেদ ঐ পরিবারে। খুব সুখে ছিলেন। বাবা মা আর ভাইয়ের আদরের ছিলেন খুব।
কিন্তু তার বিয়ে হয় একজন বিপত্নিক পুরুষের সাথে, ১৯ বছর বয়সে। যার ঘরে ছিল একটি ১১ বছরের পুত্র সন্তান। সে এক অন্য কাহিনী। আলিজা আহমেদের বিয়েতে পরিবারের কেউ খুশি ছিলেন না। তাদের এত আদরের সুন্দরী কন্যার এমন জীবনে। তাই অভিমান করে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন হয়তো খুব সুখে আছে শ্বশুর বাড়ি। কিন্তু কে জানতো তার সুখের পরিণতি এমন হবে। এরপর আলিজা আহমেদ মেয়ে প্রাণেশা গর্ভে থাকা অবস্থায় তার বাবার বাড়ি চলে আসেন।
সব শুনে মেয়েকে আবার আপন করে নিয়েছিলেন। কিন্তু একদিন এক এক্সিডেন্টে জিয়াউর আহমেদ, আয়েশা সুলতানা, আলিজা আহমেদ তিন জনই প্রাণ হারান।
আর রেখে যায় ৪ বছরের ছোট্ট শিশু প্রাণেশা কে। সেই থেকে মামা-মামীর সংসারে আছে প্রাণেশা। যদিও জন্ম থেকেই এই বাড়িতে আছে সে। তার নানা-নানী আর মামার সাথে তার মা এই বাড়িতে চলে এসেছিল প্রাণেশা মায়ের গর্ভে থাকতেই। তার মামা আর মায়ের শৈশব কেটেছে চট্টগ্রামে। এখন তারা আছে ঢাকায়।
এসব ভাবতে ভাবতে প্রাণেশা নুডলস ভেজে নেই। তারপর সবার জন্য বাটিতে বেড়ে ট্রেতে করে ড্রয়িং রুমে নিয়ে যায়। ততক্ষণে বাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও সোফায় এসে বসেছে। আর এটা সেটা নিয়ে গল্প করছে। প্রাণেশা সবাইকে নুডলস সার্ভ করে নিজেও নিয়ে আরিভের পাশে বসে পড়ে।
হঠাৎ প্রাণেশার মামা আজমান আহমেদ মেয়ে আরশিকে বলেন,
"আরশি, সময় করে প্রাণোকে নিয়ে শপিং এ যাবে। আর কি কি দরকার গিয়ে কিনে নিয়ে আসবে। তোমার মায়ের থেকে নিয়ে নিও টাকা। দুজনের জন্যই দিয়েছি।"
"কেন বাবা? হঠাৎ শপিং? আমার তো এখন তেমন কিছুর দরকার নেই।"
"তোমার দরকার নেই, প্রাণোর থাকতে পারে। এই মাসের শেষের দিকে আমার এক বন্ধুর মেয়ের বিয়ে। খুব বড় পরিবারে বিয়ে দিচ্ছে। নামি দামি মানুষ আসবে। আমরা সবাই যাবো। তাই তোমরা দুজন গিয়ে কি কি লাগবে নিয়ে এসো। প্রাণো কেউ দেখে শুনে জামা জুতো সহ দরকারি যা যা লাগবে কিনে দিবে।"
প্রাণেশা তাকালো সবার দিকে এক পলক। বড় বাড়ির বিয়ে। ওসব বিয়েতে পড়ার মতো তেমন কোন জামা নেই তার কাছে। তাই হয়তো মামা তাকে শপিং করে দিতে বলছে। তার খুব ভালো লাগলো। মামাটা হয়তো তার মধ্যে বোনকে খুঁজে পান মাঝেমাঝে। সুবিধা অসুবিধার খেয়াল রাখে। মামা উঠে যেতেই সে সবার খাওয়া শেষে বাটি গুলো ধুতে নিয়ে গেলো।
এসে আবার বসতেই আরশি বললো,
"কাল যাবি? নাকি পরের অফ-ডে তে যাবি?"
প্রাণেশা হাতের ইশারায় বোঝাল পরের অফ-ডে তে যাবে। তার মামি হঠাৎ বললো,
"প্রাণো তো এমনিতেই সুন্দর। বেশি সেজেগুজে গেলে আবার নজর না লেগে যায় কারও। আরশি তুই বরং বেশি কিছু না নিয়ে ওকে একটা ভালো জামা কিনে দিস। এতেই দেখবি ওকে পরীর মতো লাগবে। শুধু শুধু অতো টাকা খরচ করে তো লাভ নেই। ঐ টাকা বরং আরিভের সামনের মাসের টিউশন ফি তে দিয়ে দিস।"
মামীর কথা শুনে প্রাণো তাকালো। আরশি আপুর মতো তারও অনেক সুন্দর জামা থাকতো। মামা তো দে-ই টাকা তাকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য। তবে মামী এভাবেই নানান অজ্ঞাত দরকার বের করে বসে প্রত্যেকবার। আর এভাবেই গেলো এতগুলো বছর। আজও ব্যতিক্রম হলো না। আরশিও শুনলো। তবে কিছু বললো না। সে এসব নিয়ে তেমন মাথা ঘামায় না। মায়ের দিকে একপলক তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে আবার ফোনে নজর দিলো।
প্রাণেশা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মামীর কথায় সম্মতি জানালো।