সে আমার পূর্ণতা

পর্ব - ৯

🟢

রাত বাজে একটা । যেখানে আজ বিয়ে বাড়ি হিসেবে আনন্দ করার কথা ছিলো সবার। সেখানে আজ নিজেদের পরিবারের সম্মান বাঁচানোর যুদ্ধে নেমেছে চৌধুরি পরিবার। অপরাধী ও পরিবারের দুই সন্তানই। সবার বড় পুএ আর সবার কনিষ্ঠা কন্যার গায়ে আজ একে অপরকে নিয়ে কলঙ্কে লেপ্টেছে।

--------

আবরারের ঘরের দরজা ঠেলে ঢুকেই আবরার আর ইনায়াকে মেঝেতে অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখে ফেলেন সিতারা বেগম। ইনায়ার শরীরের নিষিদ্ধ জায়গা স্পষ্ট বিদ্যমান। শাড়ির যাচ্ছে তাই অবস্থা; আবরার উদোম গায়ে তার পাশেই বসা। এই দৃশ্য দেখতেই রাগে চিল্লিয়ে সারা বাড়ি মাথায় উঠান তিনি। সবাই এসে জড়ো হয় আবরারের ঘরে। কিছু দূর সম্পর্কের আত্মীয় নিজেদের মধ্যে কানা-ঘুষা শুরু করেন। এতে কিছুর মাঝে ইনায়া এখনো অবাক চোখে সব দেখে যাচ্ছে। তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হচ্ছে না। আবরার বাবা-চাচাদের বোঝানোর চেষ্টা করছে যে তারা যা ভাবছে বিষয়টা তা না। সে মাএ শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। তখনি অন্বিতা খাবার নিয়ে আসে আর ও পায়ে শাড়ি পেঁচিয়ে পড়ে যাওয়ায় শাড়ির কুঁচি গুলো খুলে যায়।

মূহুর্তেই কানাঘুষা শুরু হয়ে গেলো খবর ছড়িয়ে পড়ে সারা বাড়িময়। কয়েকজন রং চং মাখিয়ে বর্ণনা করলো আবরার আর ইনায়া বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর সেই সুযোগে আবরারের ঘরে আকাম - কুকাম করছিলো। তখনি সিতারা বেগমের হাতে ধরা খায়।

ইনায়ার ব্যাপারটা বুঝতে কিছুটা সময় লাগলো। বুঝতে পেরেই হতভম্ব হয়ে যায়।

পৃথিবীর সব ভাষা যেনো আবরারের কাছে এসে নির্বাক হয়ে গেলো।এই ঘৃণ্য অপবাদের জবাব আবরার কি করে দিবে।আবরারের মাথা কাজ করলো না হঠাৎ করেই।

আয়েশা বেগম মুখে আচঁল গুঁজে কেঁদে চলেছেন; মেঘা বেগম তাকে সামলানোর চেষ্টা করছেন। মাহমুদা বেগম বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

ঠিক তখনি ঘরে বোম পড়ার মতো বিস্ফোরণ ঘটায় আবরারের বা গালে দেওয়া আশতাফ চৌধুরির চড়টা। আবরার গালে হাত দিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে নিজের বাবার দিকে।

--" বাবা "

--" চুপ করো বেয়াদব ছেলে । আমি তোমার কোনো কথা শুনতে চাই না। এই দিন দেখার জন্য আমি আর তোমার মা বেঁচে ছিলাম? আমার চোখের সামনে থেকে দূর হও।বেরিয়ে যাও বাড়ি থেকে।"

বাবার বলা কথাটায় চুপ হয়ে যায় আবরার। কাকে বিশ্বাস করাবে যেখানে নিজের বাবা ই বিশ্বাস করছে না তাকে। আশতাফ চৌধুরি কথায় তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ও সোফায় বসে থাকা আশরাফ আর আফতাব চৌধুরি চমকে উঠেন। আশরাফ চৌধুরি বলে উঠলেন;-

--" ভাইজান মাথা ঠান্ডা করো তুমি । কি বলছো এসব তুমি ।"

তাদের কথার মাঝে আবরার বলে উঠে।

--" ঠিক আছে! তোমরা যা সিদ্ধান্ত নিবে তাতেই আমি রাজি।"

তখনি সিতারা বেগম গর্জে উঠে বলেন।

--"পাপ করে আবার বড় বড় কথা। এই পাপ মোচন একমাত্র বিয়ে দিয়াই করতে পারবা। কাজি ডাকো হগ্গলে।"

কাজি ডাকো কথাটা ইনায়ার কর্ণগোচর হতে ডুকরে কেঁদে ওঠে সে। মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে বড় আব্বুর পা ছড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে ইনায়া বললো।

--" উপওয়ালার কসম বড় আব্বু আমরা কোনো পাপ করিনি। আমি আর আবরার ভাই নির্দোষ।"

ইনায়ার কথায় ও আশতাফ চোধুরির কোনো নড়চড় না দেখে আবরার এগিয়ে আসে।

এসে ইনায়ার ডান হাতের কনুই চেপে ধরে মেঝে থেকে তুলে বুকে জড়িয়ে নেয়। আবরার ইনায়াকে জড়িয়ে ধরতেই ওর কান্নার গতি বাড়তে লাগলো। আবরারের পিঠের শার্ট খামছে চিৎকার করে বলে উঠলো।

--" ওরা কেন আমাদের বিশ্বাস করছে না আবরার ভাই। তবে এটাই কি সবার আসল রুপ ? আমি আর পারছি না ভাইয়া।"

--" দেহো দেহো হগ্গলে দেহো হগ্গলের সামনেই যেমনে ডলাডলি করতেছে ! না জানি বন্ধ ঘরে কি করছে।"

--" চুপ...... আর একটা কথাও কেউ বলবে না অন্বির চরিএ নিয়ে। ও এখনো পবিএ ফুল ই আছে যেই ফুলে কারো ছোঁয়া নেই । একদম পবিএ ,নিষ্পাপ।"

--" এতো দিন হুনছি চোরের মায়ের বড় গলা। এখন দেখি চোরের ও বড় গলাই হয়। এক ঘরে ওরে শাড়ি খোলা আর তোমারে উদোম গায়ে দেখছি। কি কইতে চাও আমি কি অন্ধা?"

সিতারা বেগমের কথায় বাকি আত্মীয় - স্বজনরাও স্বায় জানালো তাদের এই কুরুচিপূর্ণ কথায় আবরার নিজের দুচোখ বন্ধ করে ফেলে। চোখ খুলে নিজেকে শক্ত করে একটা সিদ্ধান্ত নেয় সে।তারপর সবার উদ্দেশ্য বলে;-

--" হ্যাঁ আপনি সত্যিটা দেখেননি। সে জন্য আপনি অন্ধ ই।"

--" দেখ রে আশতাফ তোর পোলায় আমারে অপমান করতেছে।"

--" আবরার মুখ সামলে কথা বলো। বেয়াদব ছেলে।"

--" ওকে ,,,, বিশ্বাস করছো না তো আমাদের? ঠিক আছে কাজি ডাকো আমি অন্বি কে বিয়ে করবো , এখনি করবো । ওর গায়ে কোনো কলঙ্ক আমি লাগতে দিবো না। যে কলঙ্ক আমার জন্য লেগেছে সেই কলঙ্ক আমিই মুছবো।"

কথাটা বলেই ইনায়ার অগোছালো চুল গুলো কানের পেছনে গুঁজে ইনায়ার চোখের পানি মুছে দেয়। অসহায় চোখে ইনায়ার ফোলা চোখ আর রক্তজবার ন্যায় লাল নাক - মুখের দিকে তাকিয়ে বলে;-

--" আর একটু অপমান সহ্য করে নে ! তারপর তোকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো আমি। সব ঠিক করে দিবো অন্বিতা।"

--" তানভীর কাজি কে কল করো। এখনি ওদের বিয়ে হবে।"

--" ঠিক আছে বড় আব্বু।"

বড় আব্বুর কথায় তানভীর কাজিকে কল দিতে দিতে বাড়ির বাইরে চলে যায়।

--------

কিছুক্ষণ আগেই কাজি ডেকে আনে তানভীর। সবার উপস্থিতিতেই আবরার আর ইনায়ার বিয়ে সম্পূর্ণ হয়। কবুল বলে কাবিন নামায় সিগনেচার করেই জ্ঞান হারিয়েছে ইনায়া। তাকে বর্তমানে তার ঘরে শুইছে রেখেছে তানভীর , ইরফান, তাসপি আর তিহু মিলে। বিয়ের কাজ শেষ করেই নিজের বাইক নিয়ে বেরিয়েছে আবরার।

ইনায়ার পরনে এখনো আবরারের দেওয়া ওই সিল্কের লাল শাড়ি টা। শাড়িটা এখন আর আগের মতো সুন্দর নেই কুঁচকে , পেঁচিয়ে একাকার হয়ে আছে। যেনো বহুদিন ধরে কোনো বস্তায় কুঁচকানো অবস্থায় পড়ে ছিলো।

এই পুরো বিচার সভায় ছেলে মেয়েদের কোনো কথাই কেউ পাত্তা দেয় নি। বরং সবাইকে বড়দের মুখে মুখে তর্ক না করার জন্য নিষেধ করেন আশতাফ চৌধুরি। বড় আব্বুর মুখের উপর কথা বলার সাহস কারোই নেই । তাই চুপচাপ সব মেনে নিয়েছে সবাই। দোষ না করেও দোষী হয়েছে ওরা । এ যেনো দোষী যে রাজ্যে ও তার এই নীতির বিচার।

---------

ইনায়ার জ্ঞান ফিরেছে একটু আগে। চোখ মেলেই চোখের সামনে মায়ের ক্রন্দনরত মুখটা দেখতে পায় সে। উঠে মাকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠে ইনায়া। আর বারবার এক কথায় ই আউড়ায়।

--" আমরা কোনো পাপ করিনি আম্মু। তুমি ও যদি বিশ্বাস না করো তাহলে মৃত্যু ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না আমার।"

--" এমন কথা বলতে নেই আম্মু। আমি জানি আমার মা আর আবরার আব্বা কোনো পাপ করতে পারে না । কিন্তু!"

--" কিন্তু কি আম্মু?"

--" সমাজ যে তোদের গায়ে কলঙ্ক লেপ্টে দিয়েছে মা । আজ যদি তোদের দু'জনের বিয়ে না দিতো তোর আব্বু আর বড় ভাইজান তাহলে সমাজ তোকে বাঁচতে দিবে নারে মা। ছেলেদের যে কলঙ্ক হয় না , সব কলঙ্ক তো মেয়েদের ।"

আয়েশা বেগম কথা গুলো বলতে বলতেই বুক থেকে ইনায়া মাথাটা তুলে দু'চোখ মুছে দিতে দিতে বললো।

--" আমার বিশ্বাস আবরার তোকে কখনো অবহেলা করবেনা মা। যা হয় সব ভালোর জন্যই হয় আম্মু।

ওনাদের কথার মাঝেই ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে ইনায়ার ঘরে ঢোকে আবরার।

--" অন্বিতা চোখে মুখে একটু পানি দিয়ে নে। আমি বাহিরে অপেক্ষা করছি , তুই ফ্রেশ হয়ে আয়।"

আবরারের কথায় আবরারের দিকে চোখ তুলে চায় ইনায়া। আবরারের কথা শুনে আয়েশা বেগম তাকে জিজ্ঞেস করলো।

--" এই রাতে কোথায় যাবি আব্বা?"

--" জানি না মামনি তবে , আমি অন্বি কে নিয়ে আর এক মূহুর্ত এই বাড়িতে থাকতে চাই না মামনি। আমাদের আটকিও না প্লিজ। কষ্ট করে ওকে শাড়ি টা ঠিক করে পরিয়ে দিও।"

কথাটা বলেই ইনায়ার দিকে অসহায় চোখে চেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় আবরার । ইনায়া এখনো অবাক চোখে আবরারের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ যা হচ্ছে সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।

আয়েশা বেগম কথা না বাড়িয়ে ইনায়াকে ধরে বিছানা থেকে নামিয়ে শাড়ি টা ঠিক ভাবে পরিয়ে ওয়াশরুম থেকে চোখে মুখে পানি দিয়ে আনে। তিনি জানেন আবরার কখনো ইনায়াকে কষ্ট পেতে দিবে না।তারপর দোয়া পড়ে মেয়ে কে ফুঁ দিয়ে কপালে চুমু খায়। এতেই যেনো ইনায়ার আবার কান্নার বাঁধ ভাঙলো।

--" কাঁদে না বোকা মেয়ে। আবরারের সাথে খুব সুখী হ মা। আমার দোয়া সবসময় তোদের সাথে আছে।"

তারপর ইনায়ার হাতটা শক্ত করে ধরে হাঁটা দেয় ঘরের বাহিরে, অপেক্ষারত আবরারের কাছে। তার আমানত তার হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।

Story Cover