চোধুরি বাড়ির কানায় কানায় আজ আলোয় জ্বলমল করছে। বাড়ির বড় মেয়ের আজ গায়ে হলুদ ; জমজমাট এলাহী আয়োজন । বাড়ির চারপাশে ঝুলছে লাল আর নীল রঙের আলো। একতলা থেকে শুরু করে ছাদ পর্যন্ত দপদপ করছে রঙিন বাতির ছটা। গেট থেকে মূল বাড়ি পর্যন্ত টানা হয়েছে আলোয় মোড়া পথ।
বাড়ির পেছনের বাগানে বানানো হয়েছে হলুদের জন্য বিশেষ স্টেজ। পাকা মেঝেতে কার্পেট পাতা, চারপাশ ঘেরা পর্দা আর পিছনের দেয়ালে হলুদ রঙের ব্যাকড্রপ। স্টেজের সামনে রাখা হয়েছে বসার চেয়ার, যেখানে আত্মীয়-স্বজন বসবে অনুষ্ঠানের সময়।
ইনায়ার বাবা - চাচ্চু আর তানভীর রান্নার দিক দেখছেন। ইরফান আর আবরার বাসা ডেকোরেশনের দিক সামলাচ্ছে।
বাড়ির তিন গিন্নি কিচেন সামলাচ্ছেন। দূরের আত্মীয় স্বজন সবাই এসে পড়েছেন। তাদের নাশতা পানি সব দিক দেখতে হচ্ছে ওনাদের। সবকিছুর সাথে আবার যোগ হয়েছে এক রাগী ফুফু শাশুড়ি ; যশোর থেকে এসেছেন তিনি ওনার দেখাশোনা করায় বিশেষ তদারকি করতে হচ্ছে চৌধুরি গিন্নিদের।
--------
ধরনীতে সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে। পশ্চিম আকাশে রঙ বদলেছে সোনালি থেকে কমলা, তারপর গাঢ় বেগুনি। বাতাসে এক ধরনের শীতলতা—দিনের উত্তাপকে ধুয়ে-মুছে নিঃশব্দে জায়গা করে নিচ্ছে রাতের ছায়া। পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে ফিরছে নীড়ে, তাদের ডানার ঝাপটানিতে যেন শেষ দিনের কথাগুলো লেখা হচ্ছে আকাশে।
দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আযানের ধ্বনি, যা পুরো পরিবেশটাকে আরও মোহনীয় করে তুলেছে। পাশের গাছের পাতায় বাতাসের ছোঁয়ায় এক ধরনের মৃদু কাঁপন—ঠিক যেন প্রকৃতি নিজেই এক নিঃশব্দ গান গাইছে।
সারাদিন কাজ করে ঘেমে নেয়ে নিজের ঘরে এসেছে আবরার। সাদা শার্টের পিঠের অগ্রভাগ ঘামে ভিজে ছিপছিপে হয়ে আছে। নিজেকে আয়নায় দেখে আবরারের নিজেরই যেনো গা গুলিয়ে উঠছে। কার্বাড থেকে তোয়ালে আর ট্রাউজার নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে আবরার।
--" আবরার ভাই? বড়মা আপনার জন্য কফি পাঠিয়েছে। আমারই যত ঠেকা পড়ছে নিজের রুপ চর্চা করা বাদ দিয়ে সবার ঘরে ঘরে কফি বিলাতে হচ্ছে, হুহ।"
--" কে বলেছে তোকে আমার কফি আনতে ? আমি বলেছি?"
তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরোতেই ইনায়ার কথা গুলো আবরারের কর্ণপাত হয়। এতেই চটে যায় সে এবং উপরোক্ত কথাগুলো আওড়ায়। আবরারের গমগমে কন্ঠের কথাগুলো শুনে জিভে কামড় দেয় ইনায়া। কি করলো সে ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে দিয়েছে ; এবার কি করবে ? থাপ্পড় আজকে সিউর খাবে ; কফির কাপটা টেবিলে রেখে দৌড়ে আবরারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ইনায়া। তারপর জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বললো;-
--" আরেএএ ভাইয়া আপনার কাজ করে দিতে তো আমার কোনো সমস্যা নেই ; আমি তো সবার কথা বলেছি।"
ইনায়ার পাশ কাটিয়ে কার্বাড থেকে নিজের র্টি-শার্ট টা নিয়ে মাথা গলিয়ে পরে নেয় সে। এমন ভাব করে যেনো সে ছাড়া এই ঘরে আর কেউ নেই। এতেই যেনো ইনায়ার প্রেক্টিজে আঘাত লাগে। বকবক থামিয়ে দরজার দিকে ফিরে যেতে আবরারের ডাক পড়ে;-
--" দাঁড়া ........"
--" বিছানার উপরের শপিং ব্যাগটা নিয়ে যা।"
বিছানার দিকে তাকিয়ে শপিং ব্যাগটা দেখে খুশিতে চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে ইনায়ার। তার আবরার ভাই কত ভালো শুধু শুধু সে কথা শোনায় ; এবার থেকে ভদ্র হয়ে চলবে । তার জন্য কি উপহার আনলো তা আগে দেখতে হবে ; যেই ভাবা সেই কাজ লাফিয়ে গিয়ে ব্যাগ টা ধরেই ব্যাগের ভেতরে হাত চালান দিলো। ব্যাগের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো সিল্কের একটা লাল শাড়ি , পাড়ে সোনালী সুতো দিয়ে কাজ করা। শাড়ি টা টান দিয়ে বের করে নিজের গায়ে জড়ায় ইনায়া। ইনায়ার হুটোপুটি দেখে একপশলা হেসে নিলো আবরার। তারপর নিজ মনে কিছু একটা ভেবে একটা শয়তানি হাসি দিয়ে ইনায়ার উদ্দেশ্যে বলে উঠে;-
--" সাবধানে তাসপির শাড়ি নষ্ট হলে তোর খবর আছে ।"
কথাটা কর্ণপাত হতেই শাড়িটা হাত থেকে নিচে ফেলে দিলো ইনায়া। উল্টো ঘুরে দরজার দিকে যেতে যেতে বলে উঠলো ;-
--" আপুর শাড়ি তো আপুকে এসে নিয়ে যেতে বলবেন। আমি কারো ফরমায়েশ খাটতে আসিনি।"
--" ছিঃ অন্বিতা তুই কি হিংসুটে ! নিজের ভেবে প্রথমে শাড়িটাকে কি সুন্দরে বুকে জড়িয়ে নিলি। যেই শুনলি শাড়িটা তোর না ওমনি নিচে ফেলে দিলি?"
আবরারের কথায় পাত্তা না দিয়ে তার রুম থেকে বের হওয়ার জন্য ডান পা টা বাড়াতেই ইনায়ার হাতে টান পড়ে। চোখ মুখ কুঁচকে পেছনে ফিরে ইনায়া। আবরারের হাতের মুঠোয় নিজের হাতটা বন্দি দেখে আবরারের দিকে একপল চেয়ে হাতটা টান দেয় ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য।
--" আরে বোকা শাড়ি টা তো নিয়ে যাবি!"
--" পারবো না ।"
--" এতো ঘুরে শাড়িটা এনেছি তোর জন্য তাও নিবি না ?"
আবরারের কথায় ভ্রু জোড়া কুঁচকে যায় ইনায়ার। নিজের কৌতূহল দমিয়ে না রেখে জিজ্ঞেস করলো :-
--" শাড়িটা আমার ?"
আবরার মুচকি হেসে উপর নিচ মাথা নাড়ায় ; এতেই ইনায়ার কপালের ভাঁজ শীতল হয়ে মুখে ফুটে ওঠে হাসির রেখা। তা দেখে ইনায়ার হাতটা ছেড়ে দেয় আবরার ; আবরারের থেকে ছাড়া পেয়ে বিছানার সামনে থেকে শাড়িটা তুলে আবরারকে ধন্যবাদ জানিয়ে দৌড়ে চলে যায় নিজের ঘরে। তার যাওয়ার পানে চেয়ে আবরার মাথার পেছনে খানিক চুলকে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠে।
---------
হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে। তাসপিকে স্টেজে প্রথমে আশতাফ চৌধুরি আর মাহমুদা বেগম হলুদ লাগিয়ে মিষ্টি মুখ করিয়ে অনুষ্ঠান শুরু করে। তারপর একে একে সবাই তাসপিকে হলুদে রাঙিয়ে মিষ্টি মুখ করিয়েছে।
এখন স্টেজের সামনে সবাই সাউন্ড বক্স এ গান চালিয়ে নাচ করছে। তিহু আর ইরফান ও সবার সাথে তাল মিলিয়েছে। নাচ না পারার দরুণ চেয়ারে বসে আছে ইনায়া।
তার পরনে আবরারের তখনকার দেওয়া সোনালী পাড়ের লাল শাড়িটা। হাতে লাল রঙের মেহেদী, ঠোঁটে গাড়ো খয়েরি লিপস্টিক, চুলে খোঁপা করে গাজরা লাগানো । এ যেনো জ্যান্ত পুতুল চৌধুরি বাড়ির কর্তাদের বাগানে বসে আছে।
হাতের কাজ শেষ করে ইনায়ার পাশে এসে বসে আবরার। ইনায়ার কাজল টানা দু'চোখ অনুষ্ঠান দেখতে ব্যস্ত। পাশে গোটা একটা মানুষ বসেছে যে তার ও খবর নেই তার।
--" অন্বিতা...... শাড়িটা পছন্দ হয়েছে তোর?"
--" খুব। জানেন আমি ঠিক করেছিলাম এমন একটা শাড়ি কিনবো। কিন্তু ওইদিন তো আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই আর নেওয়া হয়নি।"
--" আচ্ছা ...!!"
অনুষ্ঠান শেষ হয়েছে খানিকক্ষণ আগে। তাসপি , তিহু , ইনায়া সবাই এক ঘরে ঘুমাবে আজ তাই তিন জন একসাথে বিছানায় বসে গল্প করছে। হঠাৎ কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে আর্তনাদ করে উঠে ইনায়া।
--" ইশশ রে আবরার ভাইকে তো ধন্যবাদ ই দেওয়া হয়নি।"
ইনায়ার কথায় তাসপি তিহু একেঅপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো। কি বলছে এই আবরার ভাইকে ধন্যবাদ দিবে? মাথা ঠিক আছে ওর! নাকি অতিরিক্ত খুশিতে বকছে।
--" বাবাহ....কিজন্য ধন্যবাদ দিবি শুনি?"
--" এই সুন্দর শাড়িটা উপহার দেওয়ার জন্য।"
--" কিইইইইই?"
তিহুর চিৎকারে কানে হাত চেপে ধরে ইনায়া । বিরক্তি ভঙ্গিতে মুখ বাঁকায়।
--" আস্তে বইন। একটু হলে এখনি কালা হয়ে যেতাম!"
--" কাহিনী কি খুলে বল।"
রুমের দরজা দিয়ে বেরোতে বেরোতো জবাব দেয় ইনায়া।
--" ফিরে এসে বলছি।"
পিটময় খোলা চুল দোলাতে দোলাতে হাঁটা দেয় আবরারের ঘরের দিকে। আবরারের দরজার সামনে এসে কড়া নাড়তেই ভেতরে যেতে বলে আবরার।
ঘরে ঢুকে আবরারকে উদোম গায়ে দেখেই কোনো রকমে চোখটা নিচে নামিয়ে উল্টো দিকে ঘুরে যায়।
--" ভুল সময় আসার জন্য দুঃখিত, পরে আসে। এখন যাই।"
--" ঠিক আছে , যা ।"
যেই দরজার দিকে ফিরে হাঁটা দিবে তখনি ঘটে বিপত্তি ! শাড়ি তে পা পেঁচিয়ে মেঝেতে পড়ে যায় ইনায়া। তা দেখে উদোম গায়ে ই ইনায়ার দিকে এগিয়ে আসে আবরার ; দুর্ভাগ্য বশত কারেন্ট ও চলে যায়। আবরার হাতরে সামনে এগিয়ে গিয়ে ইনায়াকে তোলে ; পায়ে শাড়ি আটকার দরুণ শাড়ির সবগুলো কুঁচি খুলে গেছে।
আশতাফ চোধুরির ফুফু আম্মা করিডোর পার হওয়ার সময় কারেন্ট যাওয়ার কারণে আবরারের ঘরের সামনেই দাঁড়িয়ে পড়েন তিনি । এতে করে ইনায়ার মৃদ্যু চিৎকার তার কানে ও যায় ; ততক্ষণে জেনারেটর চালু হওয়ায় আবরারের ঘরের দরজা খুলে ইনায়া আর আবরারকে একসাথে ওই অবস্থায় মেঝেতে দেখতে পান তিনি। আর এটাই যেনো যথেষ্ট ছিলো চৌধুরি বাড়ির দুই ছেলে-মেয়ের গায়ে কলঙ্ক লেপ্টে দেওয়ার জন্য । তবে বিধাতা কি এই লিখেছিলো তাদের কপালে?