রাত একটা বাজে। সারাদিনের বিয়ের ঝামেলা শেষে নিজের ঘরের সামনে সটান দাঁড়িয়ে আছে আবরার। তাসপি , তানভীররা তাকে ঘরে ঢুকতে দিচ্ছে না।
তাসপি, তানভীর আর সায়র মিলে রুমের দরজা বাহিরে থেকে আটকে দরজার সামনে তিনজন দাঁড়িয়ে আছে। সাথে আবরার কেও দাঁড় করিয়ে রেখেছে। টাকা না দেওয়া পর্যন্ত ছাড়বে না এই পণেই দাঁড়িয়ে আছে তিনজনে। ইরফানের ঘরের সাথে আবরারের ঘরটাও নাকি তারা সাজিয়েছে। আবরার সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বললো:-
--" এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন সবাই?"
আবরারের কথায় তাসপি আগ বাড়িয়ে বললো;-
--" টাকা দাও ঘরে যাও।"
--" কোন দুঃখে তোদের টাকা দিতে যাবো শুনি?"
ফিচেল হেসে তানভীর বলে উঠলো:-
--" দুঃখে না ভাই , খুশিতে। তোর জন্য কতো কষ্টে বাসর ঘর সাজিয়েছি। সেই খুশিতে টাকা দিবি।"
আবরার দু'পা পিছিয়ে বুকে হাত বেঁধে দাঁড়ালো। গা ছাড়া ভঙ্গিতে জবাব দিলো:-
--" আমি বলেছি ফুল কিনে টাকা নষ্ট করতে। এখন আবার আমার কাছে টাকা চাইছিস!"
তানভীর এগিয়ে এসে আবরারের ঘাড় জড়িয়ে কানে মুখে বললো:-
--" ইনায়াকে সাজিয়েছে তাসপি। ভেবে দেখ ! টাকা না দিলে বউ আর ঘর দুটোর কথাই ভুলতে হবে আজ রাতের জন্য।"
তানভীরের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থেকে কিছু একটা ভাবলো আবরার। ও কে ভাবতে দেখে খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠে তানভীরের চোখ। তার কথায় কাজ হয়েছে তার মানে। শান্ত কন্ঠে আবরার জিজ্ঞেস করলো:-
--" কতো টাকা লাগবে তোদের?"
--" কাঁচা ফুলে খরচ এসেছে পাঁচ হাজার। আমাদের সময় গিয়েছে তিন ঘন্টা। সব মিলিয়ে ওই মোটামুটি ত্রিশ দে তাহলেই হবে।"
তাসপির আর সায়র ও তাল মিলিয়ে হ্যাঁ বললো। ওদের কথায় আবরার পকেট থেকে চারটা দশ টাকার নোট বের করে তানভীরের দিকে এগিয়ে দিলো।
--" যা একটা বেশিই দিলাম। বোনাস হিসেবে , এবার দরজা ছাড়।"
তাসপি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বললো:-
--" আবরার ভাইয়া এটা কিন্তু ঠিক না।"
--" কি ঠিক না? তোরাই তো বললি ত্রিশ টাকা দিতে। আমি তাও দশ টাকা বাড়িয়ে চল্লিশ টাকা দিয়েছি।"
--" আমি ত্রিশ হাজার বুঝিয়েছি। ত্রিশ টাকা না।"
--" আমার নতুন বিয়ে হয়নি। যে আমাকে টাকার জন্য ধরেছিস। ইরফান থেকে কত টাকা নিয়েছিস সেটা বল আগে।"
ইরফানের কথা জিজ্ঞেস করতেই চুপসে যায় তাসপি, তানভীর নিজের ছোটো বোনের বাসর ঘর সাজিয়েছে এই অনেক। আবার টাকার জন্য দরজা আটকানো অতিরিক্ত বেয়াদপি হয়ে যায়। তানভীর ভোঁতা মুখে বললো:-
--" এক পয়সা ও না।"
--" তাহলে আমাকে ধরেছিস কেন? সর ঘুম আসছে।"
আবরারের ধমকে তাসপি , তানভীর আর সায়র তিনজনই সরে যায় দরজার সামনে থেকে। আবরার এগিয়ে গিয়ে দরজা খুললো। ঘরের ভেতরে মোমবাতির আলোতে আলোকিত হয়ে আছে।
আবরার কোনো দিকে না তাকিয়ে গিয়ে কার্বাড থেকে একহাজার টাকার দুটো বান্ডিল বের করলো। এক বার গুনে ফিরে এসে তানভীরের দিকে ছুঁড়ে দিলো।
--" দশ দশ করে বিশ হাজার আছে। ঘর সাজানো বেশি একটা সুন্দর হয়নি তাই দশ কম দিয়েছি।"
আবরারের কথায় হেসে উঠে তিনজনে। তানভীর বান্ডিল দুটো পকেটে চালান করে বললো;-
--" এতেই চলবে বস!"
টাকা গুলো নিয়ে চলে যায় ওরা। আবরার ঘরে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বিছানার সামনে থামলো। ইনায়া বিছানার মাঝ বরাবর বসে আছে। পুরো বিছানা জুড়ে ফুলের সমারোহ। রক্তিম গোলাপ, সাথে রজনীগন্ধা আর বেলি। তিন রকমের ফুলের সুভাষ একত্রিত হয়ে অদ্ভুত সুভাষ ধারণ করেছে রুমজুড়ে।
লাল দোপাট্টায় ঢাকা ইনায়ার মুখ অব্দি। বিছানার সাইট টেবিল থেকে সাউন্ড বক্সের রিমোট টা নিয়ে " Aaj phir" গানটা চালু করে আবরার হাঁটু গেড়ে বসলো ইনায়ার পাশে।
আবরার পাশে বসতেই অস্হির চিত্তে ধড় ফড় করে উঠে ইনায়ার হৃদয়। সে ঘোমটার আড়ালে থেকেও দেখতে পাচ্ছে আবরার নেশাক্ত চোখে অবলোকন করছে তাকে।
Aaj phir tum pe pyaar aaya hai,
Aaj phir tum pe pyaar aaya hai,
Behad aur bepanah aaya hai....
Aaj phir tum pe pyaar aaya hai,
Aaj phir tum pe pyaar aaya hai,
Behad aur bepanah aaya hai......
আবরার আলতো হাতে ইনায়ার ঘোমটা টা তুললো। মোমবাতির নিভু নিভু আলোতে আবরারের চোখের সামনে দৃশ্যমান হলো এক শুভ্র সুন্দর বালিকার মুখাবয়ব। যা কিনা লজ্জায় , ভয়ে হালকা ঘেমে উঠেছে।
ইনায়ার মুখে নেই কোনো কৃত্রিম প্রসাধনীর ছোঁয়া।ঠোঁটে মেরুন লিপস্টিক। পরণে বেলি ফুলের গহনা। আবরার খেয়াল করলো ঘরময় পানি ভর্তি বাটিতে বেলি ফুল ছড়ানো। বেলি ফুলের সুভাষ আর গানের লাইন গুলোতে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আবরারের মস্তিষ্ক।
সামনে ইনায়া মেরুণ শাড়িতে বসা। সাউন্ড প্রুফ রুমটাতে ফুল সাউন্ডে "aaj phir" গানটা চলছে। প্রতিটি লাইন যেনো আবরারের সায়ু , অঙ্গ , প্রত্যঙ্গ গ্রাস করে নিয়েছে।
আবরার আরেকটু এগিয়ে নিজের বলিষ্ঠ হাতের মুঠোয় পুরে নিলো ইনায়ার কোমল দুই হাত। মন্ত্রমুগ্ধ কন্ঠে একশ্বাসে আওড়ায় কিছু শব্দ;-
--" আজ যদি একটু বেশিই অসভ্য হই তুমি কি রাগ করবে বেলি বউ?"
আবরারের নেশাক্ত কন্ঠে বলা প্রতিটা শব্দে অবশ হয়ে আসে ইনায়ার কোমর থেকে পা অব্দি। আবরার কে এতোটা উতলা হতে আগে কখনো দেখেনি ইনায়া। আগে আরো একবার তাদের খুব ঘ*নি*ষ্ঠ মূহুর্ত হলেও এতোটা উতলা আবরার হয়নি।
ইনায়ার উত্তরের অপেক্ষা না করে এগিয়ে আসে আবরার। দুহাতে ইনায়ার পিঠ জড়িয়ে চেপে ধরলো বিছানায়। ততক্ষণের ইনায়ার ওষ্ঠাধর তার দখলে নিয়ে নিয়েছে। আবরারের হাতের অবাধ্য ছোঁয়ায় জড়জরিত হয়ে ছটফট কর ওঠে ইনায়া। কিন্তু ছাড়া না পেয়ে প্রিয় পুরুষের অবাধ্যতায় স্বায় দিলো ইনায়া নিজেও। কোমল দু'হাতে জড়িয়ে ধরে আবরারের পিঠ।
বারান্দার সাথে লাগোয়া খোলা জানালা টা দিয়ে ধমকা হাওয়া এসে নিভিয়ে দেয় মেঝে জুড়ে জ্বলা মোমবাতি গুলো। সাথে অস্হির হয় আবরারের আচরণ।
ইনায়ার কানে কানে মিনমিনে কন্ঠে আবরার সুধালো:-
--" কবুল আমার ভালোবাসা কে। কবুল আমার অষ্টাদশী কে। আমার সঙ্গিনী প্রিয়তমা স্ত্রীকে।"
তার সাথে তাল মিলিয়ে ইনায়া ও আওড়ায়:-
--" আমি কবুল করলাম আমার নিয়তি কে। কবুল করলাম আমার পৃথিবীকে। আমাকে সামলানো দুহাতের মালিককে।"
ভালোবাসা অসম্ভব সুন্দর।