ছোটো পরিসরেই তিহুর কাবিনের অনুষ্ঠান টা হচ্ছে।
পরিবারের সদস্যরা আর কাছের কিছু আত্মীয় স্বজন এসেছে। নিজের ঘরে বসে আছে তিহু। তার পাশেই ওর কিছু খালা , চাচি , মামি আর মামাতো , খালাতো কাজিন গুলো বসে গল্প করছে। রুম জুড়ে মানুষে গিজগিজ করছে। সবার হাসির আওয়াজে মাথা টনটন করছে তিহুর।
বিছানায় মাঝ বরাবর ঘোমটা টেনে বসে আছে তিহু। তিহুর মনে হচ্ছে তার বুকের ভেতর কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে। যেনো টান দিয়ে বুকটা বের করে আনার মিথ্যে প্রয়াস চালাচ্ছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না।
কোনো অনুভূতিই হচ্ছে না তার। মাথার ভেতর কেমন ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে।
ইনায়া টাও পাশে নেই। একটু আগে ছেলের মা নাকি চাচি কে যেনো তিহুকে গয়না গুলো পরিয়ে দিয়ে গেছে। শাড়ি গহনার ভারে গরমে অসহ্য লাগছে তিহুর। শরীরটা যেনো আর চলছে না। দুপুরে ইনায়ার হাতে শুধু দু'নলা খাবার খেয়েছিলো সে।
ঘড়ির কাঁটায় কয়টা ফেরিয়েছে তা জানা নেই তিহুর।
তবে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সেই বিকেল থেকে একই ভাবে বসে আছে সে। ঝিম ধরে গেছে দু'পায়ে। কোমর শরীর থেকে পায়ের পাতা অব্দি টনটন করছে।
সারাদিন কান্নার দরুণ মাথাটা ভারী হয়ে আছে। চোখে ঘোলা ঘোলা দেখছে সব। মন আর শরীরের কষ্টে আশে পাশের সবার হাসি ঠাট্টা গুলোই এখন বিরক্ত লাগছে তিহুর। ইচ্ছে করছে সব ছেড়ে ছুড়ে কোথাও পালিয়ে যেতে। বিধাতা কি তাকে দেখছে না? তুলে নিতে পারছেন না এই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে।
----------------
সকাল থেকে মাএ দু'বার ইনায়ার সাথে দেখা হয়েছিল আবরারের। সারা দিনের ব্যস্ততায় তার বউটার সাথে একটু কথাও হয়নি তার।
বিকেলে দেখেছিলো পুতুল সেজে সারা বাড়িময় ছুটোছুটি করছে। এই মেয়ে পারেও বটে। একটু পা পিছলে গেলেই আবার তার যত সমস্যা হবে। এমনিতেই আজ একসপ্তাহ ধরে বউটাকে "ভিটামিন আদর" দিতে পারছে না। না সে নিজে নিতে পারছে। এই জন্যই এখন ক্লান্ত ক্লান্ত লাগছে শরীরটা।
ভালো লাগে না এসব আবরারের, দূর।
আনমনে বকবক করতে করতে টাওয়াল কাঁধে ঝুলিয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরোলো আবরার। বিছানার উপর রাখা কালো পান্জাবি টা পড়ে নিলো সে। ততক্ষণে ঘরে এসেছে ইনায়া।
তার পরণে মেরুন শাড়ি। গা ভর্তি গয়না। পার্লার থেকে আসার পরপরই মাহমুদা বেগম ওনার ঘরে ইনায়াকে ডেকে গয়না গুলো পরিয়ে দিয়েছিলেন।
--" কোথায় ছিলে সারা দিন?"
আবরারের কথায় ওর দিকে ঘুরে দাঁড়ায় ইনায়া। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আবরারের সামনে থামলো।
চুল গুলো পেছনে সরাতে সরাতে বললো:-
--" তিহুর সাথে। গলার সেটটা একটু খুলে দেন তো। কি ভারি।"
--" আমি কোথায় ছিলাম বলো?"
--" আজব তো বাড়িতেই তো ছিলেন।"
--" তাহলে খবর নাও নি কেন?"
--" আপনি কাজ করছিলেন তাই বিরক্ত করিনি।"
--" হ্যাঁ এখন তো আমি পুরনো হয়ে গেছি। থাকবেই বা কেন আমার সাথে?"
আবরারের গাল ফুলিয়ে বলা কথা গুলো শুনে হেসে উঠে ইনায়া।
--" সত্যিই বলছেন! আমার এবার একটা নতুন আবরার কে চাই।"
প্রথমে ইনায়ার কথার মানে না বুঝলেও কিছুক্ষণ পর বুঝতেই আবরার চোখ তুলে ইনায়ার দিকে তাকালো। অবাক চোখে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো সে যা ভাবছে তাই কি বুঝিয়েছে ইনায়া! ইনায়া মাথা নাড়ালো। ইনায়ার স্বায় পেয়ে আবরার তার কোমর জড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো বিছানায়।
ফিচেল হেসে মিনমিনে কন্ঠে বললো:-
--" শুভ কাজে দেরি করতে নেই বেলি বউ। আমার পছন্দ না।"
আবরারে এমন ছন্নছাড়া ভাব দেখে খিলখিলিয়ে হেসে ইনায়া বললো:-
--" আবরার আমার সাজ নষ্ট হয়ে যাবে কিন্তু।"
ইনায়ার গলায় মুখ ডুবিয়ে নেশাক্ত কন্ঠে আবরার বললো:-
--" চুলোয় যাক , আমার বউ এমনিতেই সুন্দর।"
-------------
জ্বলমলে আলোয় আলোকিত হয়ে আছে চৌধুরি বাড়ির ড্রয়িং রুম। লাল নীল বাতির পাশাপাশি শুভ্র বাতি ও জ্বলছে। চারদিকে মানুষের গিজগিজ। সন্ধ্যা হতেই তা আরো বাড়লো। বেশি মানুষের আয়োজন না করলেও আত্মীয় স্বজন সব মিলিয়ে মানুষ দেড়েক হয়েছে।
ড্রয়িং রুমের মেঝেতে তোশক পেতে বিয়ে পড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সামনা সামনি দুটি তোশক পাতা হয়েছে। এক পাশে তিহুকে অপর পাশে ছেলে কে বসানো হলো। দরদর করে ঘামছে তিহুর শরীর। হাত গুলো ঘেমে চুপচুবে হয়ে গেছে।
রুম জুড়ে এসি চলছে । তবুও অস্বস্তিতে গা গুলোচ্ছে তার। কাজি আসতেই বিয়ে পড়ানোর তোড়জোড় শুরু করে দিলেন। এতেই জেনো মাথা ঘুরোনোটা বেড়ে যায় তিহু।
নিজেকে কিছুটা সামলাতেই কাজি বললেন:-
--" আফতাব চৌধুরির একমাত্র ছেলে ইমতিয়াজ ....."
--" কি ? কি ? "
কাজি বাকি কথা শেষ করার আগেই চেঁচিয়ে বললো তিহু। পাশে বসা ইনায়ার দিকে তাকাতেই সে হেসে উঠলো। ইনায়ার হাসির অর্থ বুঝতে কিঞ্চিত সময় লাগে তিহুর। সামনে তাকাতেই দেখলো শেরয়ানী পরিহিত ইরফান বসে আছে।
কাজি আবারো বললেন:-
--" আফতাব চৌধুরির একমাত্র পুএ ইমতিয়াজ চৌধুরি ইরফানের সাথে....."
--" কবুল , কবুল , কবুল।"
খুশির তোপে কাজির আগেই কবুল বলে দেয় তিহু। কবুল বলা শেষে ইরফানের দিকে তাকিয়ে ইনায়ার কোলেই ঢলে পড়ে সে।
তিহুর অজ্ঞান হলেও বাকি বিয়ে টা আগে পড়ানো হলো। তারপর ইরফান উঠে এসে তিহুকে কোলে তুলে তিহুর ঘরে শুইয়ে দিয়ে আসলো।
অতিরিক্ত দুঃখের মাঝে হঠাৎ অনাকাঙিক্ষত কিছু পেয়ে খুশিতে নার্ভাস হয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে তিহু।
------------
জ্ঞান ফিরেছে তিহুর।
চোখ পিটপিট করে তাকাতেই দেখলো সে তার ঘরে শুয়ে আছে। ড্রিম লাইটটা জ্বলছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো ইরফান তার মাথার পাশেই বসা। ফোন স্ক্রল করছে। রাগে গজগজ করতে করতে উঠে পড়ে তিহু।
উঠেই ইরফানের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বিছানায় ছুঁড়ে মেরে তার পান্জাবির কলার চেপে ধরলো তিহু। রাগী কন্ঠে বললো:-
--" আপনি আমার সাথে চিট করেছেন। আগে কেন বলেন নি যে বিয়ে আপনার সাথেই! আপনি জানেন , আমি কতো কষ্ট পেয়েছি?"
গা ছাড়া ভঙ্গিতে জবাব দেয় ইরফান:-
--" একলাইন বেশি বুঝো যে তাই বলতে পারিনি। দুই, দুই দিন গিয়েছিলাম বলতে! একদিন ও সুযোগ দাওনি।"
চুপসে যায় তিহু। হাতে ধরা পান্জাবির কলার টা ছেড়ে দিতেই ইরফান তিহুর কোমর চেপে ধরলো।
কোমর জড়িয়ে উল্টো ঘুরিয়ে তিহুকে বলিষ্ঠ হাতে চেপে ধরলো বিছানার সাথে। ফিচেল হেসে অদ্ভুত কন্ঠে বললো:-
--" এবার তোমাকে আমার হাত থেকে কে বাঁচাবে সুন্দরী?"
--" মা...নে?"
--" বুঝতে পারছো না? প্র্যাকটিক্যালি বোঝাচ্ছি দাঁড়াও বেইবি।"