সকালের সূর্যোদয় না হতেই সূর্য তার তাপ ছড়াচ্ছে প্রকৃতিতে। সকাল নয়টা বাজে। চৌধুরি বাড়ির গৃহিনীরা উঠে পড়েছে বেশ খানিকক্ষণ আগেই। এখন কিচেনের সকালের নাস্তার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখনি চৌধুরি বাড়ির দরজা দিয়ে প্রবেশ করে আবরার।
সকালে উঠেই ওয়ার্ক আউট করে সে। তার পর হাঁটতে বেরোয় আবরার। ফিরেছে মাএ। ঘাড়ের তোয়ালে দিয়ে গলা সহ মুখের ঘাম মুছে নিচ্ছে সে। ড্রয়িং রুম ফেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলো আবরার। সিঁড়ি দিয়ে উঠলেই ইরফানের ঘর , ইরফানের পাশের ঘর টা তাসপি আর তিহুর । তার পরের টা ইনায়া তার পাশেই তানভীরের ঘর। সবার শেষে আবরারের ঘর। তাই সবকটার ঘর পার করেই নিজের ঘরে যেতে হয় তাকে। হঠাৎ তানভীরের রুম পেরিয়ে ইনায়ার রুমের সামনে থামে আবরার। সবার রুমের দরজা কিঞ্চিত মিলিয়ে রাখা হালকা আলো আসছে। যাতে বোঝা যাচ্ছে সবাই উঠে পড়েছে। কিন্তু ইনায়ার রুমে দরজা এখনো বন্ধ। রুম টাও আঁধারে ডেকে আছে।
নয়টা বাজে এখনো মহারানির উঠার নাম নেই । দরজায় ধাক্কা দিতেই খুলে গেলো। ইনায়ার ভূতে ভয় আছে বলে দরজা খোলা রেখেই ঘুমায়। যাতে তাকে ভূত তাড়া করলে সহজেই পালাতে পারে। এই কথাটা বাড়ির সবার জানা।
তার মধ্যে ইনায়ার শোয়া ভালো না বলে তাসপি বা তিহু কেউই তার সাথে ঘুমায় না । অগত্যা সে রুমের দরজা অর্ধ বুজেই ঘুমায়। সেই সুযোগটায় আবরার কাজে লাগায়। যখন মাঝ রাতে খুব বেশি মনে পড়ে তার প্রেয়সীর আদুরে মুখখানা। তখন ছুটে এসে দেখে যায় তাকে। মাঝে মধ্যে হাতের অপর পিষ্ঠে চুমু আঁকে দেয়।
সকল জল্পনা কল্পনা একপাশে রেখে আস্তে করে রুমে ঢুকে আবরার। রুমে অন্ধকার থাকায় প্রথমে কিছু না দেখলেও আসতে আসতে চোখ সয়ে যায়। তখনি চোখ পড়ে বিছানায়। তার প্রেয়সীর ঘুমন্ত আদুরে মুখে।
হাত পা বাঁকা করে বন্দুক শেপে ঘুমিয়ে আছে ইনায়া। পরনের জামাটা সরে তার শরীরের নিষিদ্ধ জায়গা স্পষ্ট। অযত্ন- অবহেলায় বুকের ওড়নাটা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আবরার ওড়নাটা বিছানায় উঠিয়ে রাখে। সাথে মনে মনে এক গাদা বকা দিতেও ভুলে না সে তার প্রেয়সীকে।
--"এতো অগোছালো হলে কিভাবে হবে? সামান্য বুকের ওড়নাখানা সামলাতে হিমশিম খেলে আস্ত একটা বুকের মানুষ কীভাবে সামলাবে তুমি? তোমায় দেখলে যে আমি বড্ড বেপরোয়া হয়ে যায় সরোজনী। তুমি কি তা বোঝো না? কবে বুঝবে এই আমিটাকে। কখন তোমাকে নিজের করে পাবো।"
ইনায়ার ওড়না খানা বিছানায় রাখতে রাখতে কথা গুলো নিজের মনে মনে ভাবে আবরার। ওড়না টা বিছানায় রাখতে গিয়ে চোখ পড়ে বন্দুক শেপে ঘুমানো ইনায়ার দিকে। ইনায়ার পোশাকের এ অবস্থা দেখে আবরারের যেনো দম বন্ধ হয়ে আসে। ঢোক গিলে বেহায়া চোখ দুটোকে বহু কষ্টে টেনে হিচড়ে ফিরিয়ে আনে ইনায়ার থেকে। যাওয়ার আগে ইনায়ার চোখ বরাবর থাকা জানালার পর্দা টা সরিয়ে নেয় আবরার। পর্দা সরাতেই মিষ্টি রোদ এসে মেঝে জুড়ে বিছিয়ে গেলো। তারপর যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই বেরিয়ে পড়ে ইনায়ার দরজা হালকা বুজে। এখানে বেশিক্ষণ থাকলেই আজ কোনো অনর্থ ঘটে যাবে। কলঙ্ক লেগে যাবে তার চরিত্রে। ভুল হয়েছে শুধু তার না তাদের চরিত্রে। তা কিছুতেই আবরার সজ্ঞানে হতে দেবে না।
--------
সকাল আটটায় নাশতা সেরে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েছে বাড়ির তিন কর্তা। তিন জা রান্না ঘরে রান্না করছেন আর টুকটাক গল্প করছেন। তখনি নিচে নেমে আসে ইনায়া।
সাড়ে নয়টা বাজে। আবরার তার ঘর থেকে আসার সময় পর্দা টা সরিয়ে নেওয়ায় মুখ ভেঙে গেছে তার। এতেই মেজাজ বিগড়ে গেছে ইনায়ার। কার এতো বড় সাহস তার ঘরের পর্দা সরায়। নিচে এসে ডাইনিং টেবিলে গিয়ে বসলো ইনায়া। তাকে আসতে দেখে বাটি থেকে মাংস নিয়ে পরোটা তুলে দেন প্লেটে। মায়ের হাত থেকে খাবার নিয়ে খেতে বসে পড়ে ইনায়া। খাওয়ার মাঝেই ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে সে। হঠাৎ পিঠে কেউ জোরে থাপ্পড় দেওয়ায় পিছে ফিরে ইনায়া।
পেছনে তাকাতেই ইনায়ার মাথায় রাগ চড়ে গেলো। মুখে শয়তানি হাসি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিহু। তিহু কে দেখে মূহুর্তেই ইনায়ার সকালের রাগ আবার মাথা নাড়া দিয়ে উঠে।চেয়ার থেকে উঠেই তিহুকে দাওয়া করা শুরু করে। তিহু সিঁড়ি বেয়ে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয়। বেচারি ইনায়া দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গিয়ে পা মচকে যায়। পা মচকাতেই চোখ খিচেঁ বন্ধ করে ফেলে। পা মচকানোর মিনিট দেড়েক পর ও না পড়ায় এক চোখ টিপে চোখ খোলে ইনায়া। চোখ খুলতেই দেখতে ফেলো সে হাওয়ায় ভাসছে। তা দেখে অবাক হয়ে দুচোখ খুলতেই দেখলো সে আবরারের বাহুতে বন্দি। আর আবরার তার দিকেই তাকিয়ে আছে। একদম শান্ত চোখ। ওই চোখে না আছে রাগ না আছে দুঃখ। তা দেখে ভড়কে যায় ইনায়া। তাড়াহুড়ো করে দাঁড়াতে গিয়ে আবার পড়ে যেতে নেয় সে। এবার যেনো তরতর করে আবরারের রাগ বেড়ে গেলো। এতোক্ষণ শান্ত থাকলেও এবার তার রাগ হচ্ছে। হ্যাঁচকা টানে ইনায়াকে দাঁড় করিয়ে দেয়। তারপর বড় বড় পা পেলে নিচে চলে যায় সে । এদিকে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া। কি হলো এটা , আবরার তাকে বকা দিলো না কেন ? ভাবতে ভাবতেই নিচে এসে বাকি নাশতা টুকু শেষ করে সে।
বিকেল পাঁচটা বাজে । ইনায়া আর তিহু কোচিংএ। চারটা থেকে তাদের দুজনের কোচিং। সামনে টেস্ট পরীক্ষা থাকায় এখন একটু বেশিই কড়া দিচ্ছে কোচিং এ।
বাড়ির গিন্নিরা যে যার ঘরে । আবরার নিচে এসে দেখে আয়েশা বেগম ড্রয়িং রুমে বসে তার প্রিয় সিরিয়াল দেখছে। গভীর মনোযোগ দিয়ে টিভির স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। দিন দুনিয়ার কিছুর দিকে তার এখন মন নেই।
--"মামনি এক কাপ কফি দিবে।"
আয়েশা বেগম কে কথাটা বলতেই তিনি উত্তর দিলেন।
--" তুই বস বাবা আমি পাঁচ মিনিটেই দিচ্ছি।"
আবরার সোফায় গিয়ে বসে। পকেট থেকে ফোনটা নিয়ে নিজের আইডি লগইন করে। তার পাঁচ মিনিটের মাথায় আয়েশা বেগম আবরার কে কফি দিয়ে যায় । কফিতে চুমুক দিতে দিতে ফোন স্ক্রল করছে আবরার। ঠিক তখনি ইনায়া আর তিহু বাসায় আসে। সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই দুজনে সোফার দিকে হাঁটা দেয়। ইনায়া এসেই মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়ে। আর তিহু সোফায় বসে পড়ে।
--"মা একটু পানি খাওয়াবে।"
ইনায়া কথাটা বলতেই আয়েশা বেগম উঠে যায়। আয়েশা বেগম পানি আনতে আনতে মাহমুদা বেগম আর মেঘা বেগম ও বের হয়ে আসে তাদের ঘর থেকে। তার মধ্যে আয়েশা বেগম ফ্রিজ থেকে ঠান্ডা পানি নিয়ে এসেছে তাদের দুজনের জন্য। পানিটুকু খেয়ে উঠে পড়ে তারা। তারপর ব্যাগ নিয়ে স্টাডি রুমে রেখে উপরে চলে যায়।
আবরার কফি শেষ করে উপরে চলে আসে। এখন তার মায়েরা নিজেদের গাল-গল্প করবে। আবরার সামনে থাকলে তারা মন খুলে কথা না ও বলতে পারে। তাই সে নিজের ঘরের দিকে চলে যায়। উপরে উঠে ইনায়ার রুমের সামনে এসে থামে আবরার। দরজা হালকা বিজিয়ে রাখা। আবরার দরজায় নক করে। ইনায়া খাটে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে ওড়না ডিভাইনের উপর , তিহু এসেছে ভেবে ইনায়া আসতে বলে।
--"অন্বিতা ।"
কিন্তু তিহুর পরিবর্তে আবরারের ডাকে লাফ দিয়ে উঠে ইনায়া। ইনায়ার গায়ে ওড়না নেই দেখে আবরার ও অপ্রস্তুত হয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। তা দেখে জলদি করে হাত বাড়িয়ে ডিভান থেকে ওড়নাটা নিয়ে নেয় ইনায়া। ওড়না নিয়েই ঠিকঠাক ভাবে পরে নেয় সে। ওড়না পরে পেছনে ফিরে ইনায়া। তারপর আবরার ডাকে।
--" কিছু বলবেন ভাইয়া।"
ইনায়ার ডাকে ইনায়ার দিকে ফেরে আবরার। ইনায়ার মাথা থেকে পা অব্দি একবার পরোক্ষ করে। সব ঠিক আছে দেখে বড় করে একটা শ্বাস নেয়।তারপর যা বলে তা শুনে ইনায়ার দেহ থেকে প্রাণ পাখি যায় যায় দশা ,,,,,,,,,,,