সে আমার পূর্ণতা

পর্ব - ৩৯

🟢

সূর্যের তীর্যক রশ্নি জানালার কাঁচ ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করে ইনায়ার চোখে পড়তেই হালকা হয়ে আসে তার ঘুম। আড়মোড়া ভেঙে নড়তে চাইলে ও নড়তে পারলো না সে। বুকের উপর ভারী কিছুর জন্য নড়তে পারছে না ইনায়া। বহু কষ্টে চোখ জোড়া খুললো।

চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করলো সে কোথায়। নিজের বাড়িতে আবরারের ঘরে নিজেকে আবিষ্কার করতেই বুঝলো ভারী বস্তুটা আসলে কি!

আলতো হাতে সরিয়ে দেয় আবরারের কপালের অগোছালো চুল গুলো। মায়াবী চোখে পরোখ করে আবরারের মুখের প্রতিটি রেখা। বাম গালে একটা ব্রণ উঠেছে। ফর্সা মুখে তা লালচে বর্ণ ধারন করেছে। ইনায়ার হিংসে হলো ব্রণটাকে। শুধু তার অধিকার এই সুন্দর মুখের উপর। এই শরীরের উপর। সে চুমু খাবে কামড় খাবে। যা ইচ্ছে তাই করবে। সব সব অধিকার তার। তাহলে ব্রণটা কেন অধিকার বোধ নিয়ে তার আবরারের গালে রাজত্ব করছে? কোন অধিকারে!

আলতো হাতে ব্রণটাতে চাপ প্রয়োগ করে ইনায়া। লাল ব্রণটা আরেকটু গাড়ো লাল বর্ণ ধারণ করে উঠলো। ইনায়ার হালকা চাপে আহ.... শব্দ করে উঠে আবরার।

আঁতকে উঠে ইনায়া। ফু দিতে দিতে আবরার কে জিজ্ঞেস করলো:-

--" ঠিক আছেন আপনি?"

ঘুম জড়ানো কন্ঠে আবরার সুধালো :-

--" আমার বউ যদি মৃত ভেবে আমাকে শেষ গুডবাই কিস করতে আসে তাহলে আমি কিভাবে ঠিক থাকতে পারি বেলীফুল।"

ইনায়া আলতো হাতে বক্ষবিভাজন থেকে ধাক্কা দিলো আবরার কে। দড়মড়িয়ে উঠে বসতে বসতে বললো:-

--" কি...স কই করলাম?"

--" ওহ করোনি? আমি তো ভেবেছি করেছিলে। তাহলে চুপ করে ঝুঁকে টুপ করে একটা কিস করো তো। ফাস্ট ফাস্ট , গালে ব্যথা করছে এখানে এই যে ঠোঁটের পাশে।"

বিছানা থেকে নেমে পড়ে ইনায়া। এই নির্লজ্জ লোক কি বলছে এসব? পরণের শাড়ি ঠিক করতে করতে ইনায়া বললো:-

--" আপনি না দিন দিন ঠোঁট কাঁটা হয়ে যাচ্ছেন আবরার ভাই।"

বুকের নিচ থেকে বালিশটা নিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে গলা ছেড়ে গান ধরে আবরার।

--" কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে? মন্দ করেছে আমাকে ওই দুটো চোখে!"

সোফার কুশন টা হাতে নিয়ে আবরারের দিকে ছুঁড়ে মারে ইনায়া। বালিশ টা কেচ ধরে ফেললো আবরার। ইনায়াকে আরেকটু লজ্জা দিতে শব্দ করে হেসে উঠলো সে। তার হাসির শব্দে ঝুমঝুম করে উঠে ইনায়ার হৃদয় আর ঘর। কি মিষ্টি সেই হাসির শব্দ।

মিনমিন কন্ঠে "অসভ্য" শব্দটা উচ্চারণ করে কার্বাড থেকে শাড়িটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো ইনায়া।

ইনায়ার যাওয়ার পথে চেয়ে রয় আবরার। তার মনের কোণে উঁকি দেয় একটা প্রশ্ন:-

--" মেয়েটা যদি তার বউ না হতো? ওইদিন যদি ইনায়ার জায়গায় তিহু থাকতো? তাহলে কি এতো সুন্দর হতো ভোর গুলো? সব চেয়ে বড় কথা সে বেঁচে থাকতো কিভাবে! মরে যেতো , নাকি মরার মত বেঁচে থাকতো?"

উত্তর মেলে না আবরারের প্রশ্ন গুলোর। কিছু প্রশ্নের কোনো আলাদা উত্তর হয়না। প্রশ্ন গুলোই ঘুরে ফিরে উত্তর রুপে হয়ে ধরা দেয়।

--" তবে সে জানে। সে একটা রোগে আক্রান্ত হতো। ইনায়া নামক রোগ। যার প্রতিষেধক ও ইনায়া।"

----------------

নাশতার টেবিলে হাজির হয়েছে চৌধুরি বাড়ির সবাই। মাহমুদা আর মেঘা বেগম টেবিল সাজাচ্ছেন। কিচেনে আয়েশা বেগম সবার জন্য চা , কফি বানাচ্ছেন। সবার শেষে টেবিলে উপস্থিত হয় আবরার আর তানভীর। দুই ভাই এসে পাশাপাশি চেয়ারে বসে পড়ে।

ওরা আসতেই পরোটা , ডিম আর মাংস বাটিতে নিয়ে প্লেট সাজিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে দেন মেঘা বেগম। ততক্ষণে কিচেন থেকে চা-কফি ভর্তি ট্রে নিয়ে হাজির হয়েছেন আয়েশা বেগম।

আশতাফ চোধুরির দিকে কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে আশরাফ চৌধুরিকে চায়ের কাপটা দিলেন। ইরফান চা - কফি কিছুই খায় না। তাই ও কে বাদ দিয়ে তানভীর কে তার কফির কাপটা বাড়িয়ে দেন। সবশেষে আবরারকে কফির কাপটা দিতেই সে নাকোচ করে দিলো।

--" না মামনি আমি চা খাবো।"

আবরারের কথায় অবাক হলেন সবাই। শুধু অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়া বাদে। তার ওষ্ঠে দেখা দিলো এক প্রাপ্তির হাসি।

অবাক হয়ে আয়েশা বেগম জিজ্ঞেস করলেন:-

--" কফি খাবি না তো কি খাবি?"

ওনার কথা কেড়ে নিলেন মাহমুদা বেগম :-

--" সেটাই তো আবরার। তুই তো চা খাস না।"

কৃতজ্ঞাপূর্ণ চোখে হাসে আবরার। আড়চোখে অদূরে দাঁড়ানো ইনায়ার দিকে একবার তাকিয়ে বললো:-

--" সেই মেয়েটাকে ধন্যবাদ যে আমাকে চা খাওয়া শিখিয়েছে।"

আবরারের উত্তরে দীর্ঘ হয় সবার ওষ্ঠের হাসি।

আয়শা বেগমের চোখ চিকচিক করে উঠলো পানিতে।

ওনার কান্না পাচ্ছে। খুশির কান্না , আজ থেকে তিনি নিশ্চিত হলেন। যে ছেলে - মেয়ে দুটো একসাথে সুখে আছে। তার মেয়ে টা ভালো আছে। দুজন দুজনকে বুঝতে পারছে। রাগী , গম্ভীর ছেলেটাও কিভাবে বদলে গেছে। আঁচলের সাহায্যে চোখ মুছে

নেন আয়েশা বেগম। হাসি হাসি মুখে আবরারের দিকে বাকি থাকা চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলেন তিনি।

---------------

সবার দুপুরের খাওয়া শেষ হলেও তিহুর এখনো খাওয়া হয়নি। মেঘা আর আয়েশা বেগম দু'বার ডেকে গিয়েছিলো। কিন্তু আরেকটু ঘুমোবে বলে ওনাদের চলে যেতে বলেছিলো। তাই কেউ আর বিরক্তি করেনি তাকে।

তিহু মেঝেতে শুয়ে আছে। হাতে নিজের ফোনটা। গ্যালারিতে ঢুকে ইরফানের ছবি বের করলো।

দম আটকে আসা কষ্ট নিয়ে নিজের মনে মনে আওড়ায় কিছু শব্দ :-

--" আপনার দুঃখে আমি মরি যাচ্ছি না কেন ইরফান? আম....আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে কিন্তু মরে যাচ্ছি না। কেন বলুন তো ইরফান? আমি বাঁচতে চাই না এই পৃথিবীতে আপনাকে ছাড়া। আম...আমার আ...আমার আপনাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে কিন্তু পারছি না। "

একটু থেমে ফের দম আটকে আটকে আবারো বললো সে। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। শ্বাস কষ্ট টা আবার বাড়ছে। মেডিসিন গুলো কন্টিনিউ করা হচ্ছে না।

কথা গুলোও আটকে আসছে মুখে।

--" আমি হারিয়ে ফেলছি আপনাকে। কেন ভালোবাসলেন না আমায় ইরফান?"

দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে তড়িঘড়ি করে উঠে বসলো তিহু। দু'হাতে চোখ মুছে নেয়। ওড়নাটা ঠিক করে দরজা খুললো। কেউ নেই ? তাহলে নক করলো কে! রেলিং এ চোখ পড়তেই আরেক দফা অবাক হয় তিহু। বাড়ি সাজানো হচ্ছে। রুম থেকে বেরিয়ে একটু এগিয়ে ড্রয়িং রুমের চোখ রাখে। কিছু মেহমান ও আসা শুরু করেছে? কি বার আজ ! সোমবার ? না না এ হতে পারে না। কেউ তাকে কিছু বললো না। একবার ও বলার প্রয়োজন ও মনে করলো না? সোজা বাড়ি সাজানো শুরু করেছে।

ইরফান কোথায়? কান্না গুলো দলা পাকিয়ে গলায় এসে বিঁধে তিহুর। মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো তার। পড়তে পড়তেও সে রেলিং ধরে সামলে নেয় নিজেকে। বিরবির করে উঠে তিহু।

--" তাহলে সত্যিই বিয়েটা হচ্ছে? তুমি কিচ্ছু করলে না বিয়েটা ভাঙার জন্য ইরফান? আমিই বোকা ছিলাম। ছলনাকে ভালোবাসা ভেবে তোমার জন্য কষ্ট পাচ্ছিলাম। ছিঃ লজ্জা হচ্ছে আমার নিজের জন্য।"

বিরবির করার মাঝেই ঘাড়ে কারো হাতের ছোঁয়ায় কেঁপে ওঠে তিহু। দু'হাতে চোখ মুছে নিজেকে স্বাভাবিক করে পেছনে ফিরলো সে।

ইনায়া দাঁড়িয়ে আছে। পরণে একটা কালো শাড়ি। কাঁধ ব্যাগটা হাতে নেওয়া। দেখেই মনে হচ্ছে বাহিরে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে।

কান্না দমিয়ে প্রশ্ন করে তিহু:-

--" কো....কোথাও যাবি ইনু?"

কিঞ্চিত হেসে মাথা নাড়ায় ইনায়া। ধীর কন্ঠে বললো:-

--" পার্লারে যেতে হবে চল। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠান। আজ এনগেজমেন্টের সাথে কাবিনটাও হবে।"

কথাটা শোনা মাএই যেনো মাথায় আসমান ভেঙে পড়ে তিহুর। দু'পা পিছিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে:-

--" কি ? এমন তো কথা ছিলো না। কথা ছিলো শুধু এনগেজমেন্ট হবে। তাহলে কাবিন ! কাবিনের কথা আসলো কোথা থেকে?"

--" ছেলের বাবা মা চাইছে না দেরি করতে। তারা তাদের ছেলের বউকে জলদি ঘরে তুলতে চাইছে। আর বেশি কথা বললে দেরি হয়ে যাবে। জামাটা পাল্টে আয় , আমি নিচে অপেক্ষা করছি।"

দুর্বল পায়ে ঘরে চলে যায় তিহু। তিহু যেতেই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ইনায়া।

--" সে জানে তার বোনের কতটা কষ্ট হচ্ছে। তবুও চুপচাপ মুখ বুঝে সব সহ্য করে যাচ্ছে। "

------------------

অনেকক্ষণ ধরে চেষ্টা করেও তিহুকে সাজাতে ব্যর্থ পার্লারের মেয়ে গুলো। ফাউন্ডেশন ইউজ করতেই চোখের পানিতে সব গলে যাচ্ছে। ব্যর্থ হয়ে মেয়ে গুলো ইনায়ার দিকে তাকালো।

একটা মেয়ে ইনায়ার উদ্দেশ্যে বললো:-

--" ম্যাম ওনাকে সাজানো যাচ্ছে না। চোখের পানিতে সব গেঁটে যাচ্ছে।"

--" তাহলে লিপস্টিক আর একটু কাজল লাগিয়ে মাথাটা বেঁধে দেন। এমনিতেও আমার বোন সুন্দর।"

মেয়ে গুলো তাই করলো। দীর্ঘ তিন ঘন্টার চেষ্টায় তিহুকে তৈরি করতে সফল হয় তারা। ইনায়ার সামনে তিহুকে দাঁড় করাতেই অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে।

লাল শাড়িতে কি মিষ্টি লাগছে তিহুকে। একেবারে পরির মতো। মুখে নেই কোনো কৃত্রিম প্রসাধনী। ঠোঁটে লিপস্টিক আর মাথায় খোঁপা ভর্তি লাল গোলাপের সমাহার। এতেই যেনো অপ্সরী লাগছে।

Story Cover