চৌধুরি বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছে আবরার-ইনায়া।
আবরারের পেছনে দাঁড়িয়ে উঁকি দিচ্ছে সে। যদিও কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। পাঁচ ফিট এগারো উচ্চতার আবরারের পেছনে পাঁচ ফিট চারের ইনায়া চুনোপুঁটি বই কিছুই না। তবুও পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে আবরারের পিঠ চেপে উঁকি দিচ্ছে সে।
আবরার কয়েকবার তাকে বললেও পাশে আসেনি সে। পেছনেই লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভয় করছে ইনায়ার। ভয়ে তার হাত-পা অসাড় হয়ে আসছে। এতোদিন পর দেখা সবার সাথে। কি হবে? বড় আব্বু মেনে নিবে তাদের নাকি মুখ ও দেখতে চাইবে না।
আরেকবার পেছনে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে ইনায়াকে পাশে আসতে বললো আবরার:-
--" প্লিজ বেলি ফুল পাশে এসে দাঁড়াও। এভাবে পেছনে লুকিয়ে আছো কেন?"
--" আমার ভয় করছে আবরার ভাই।"
--" আমি পাশে থাকতেও তোমার ভয় লাগছে বেলি?"
আবরারের কথায় ধীর পায়ে ওর পাশে এসে দাঁড়ায় ইনায়া। বা'হাতে খামছে ধরে রেখেছে আবরারের শার্টের পেটের অংশ।
সামনে দাঁড়িয়ে আছে চৌধুরি পরিবারের সবাই। স্থির দৃষ্টিতে ওদের দু'জনের ফিসফিস করা দেখছে।
আর অপেক্ষা করতে না পেরে মাহমুদা আর আয়েশা বেগম এগিয়ে আসেন। ইনায়াকে টেনে বুকে জড়িয়ে নেয় আয়েশা বেগম। বুকে জড়িয়ে কেঁদে উঠেন তিনি। দুহাতে মেয়ের গাল চেপে কপালে গালে চুমু খেলেন। কান্না চোখে আবরারের দিকে তাকিয়ে হাতের সাহায্যে তাকে ও ডাকলেন। মায়ের হাত ছাড়িয়ে মামনির কাছে এসে ইনায়া কে সহ ওনাকে জড়িয়ে নেন বুকে। দুজনের মাথায় চুমু খায় আবরার। শক্ত করে কিছুক্ষণ বক্ষবিভাজনে বন্দি করে রাখলো তাদের। তারপর ছেড়ে দিয়ে ধীর পায়ে তিহু আর মেঘা বেগমের কাছে গিয়ে আলতো হাতে দুজনকে জড়িয়ে নেয় ।
কিছুটা দূরে ইরফান আর তানভীর দেওয়ালের সাথে ঢেল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সবার কান্না দেখে ঘাড়ে হাত ডলতে ডলতে এগিয়ে আসে তানভীর। ফিচেল হেসে বললো:-
--" হ্যাঁ আমি আর ইরফান তো খালের পানিতে ভেসে এসেছি। চল ইরফান আমরাও ঢাকা চলে যাই। তবে যদি কারো চোখে পড়ি।"
--" হ্যাঁ ভাই চলো। আমরা তো আর ওনাদের কেউ না।"
তানভীর আর ইরফানের কথার ভঙ্গি দেখে কান্না চোখে হেসে ওঠে সবাই। আবরার এগিয়ে এসে দুইভাইকে জড়িয়ে নেয় বুকে।
জড়িয়ে ধরে ওদের উদ্দেশ্যে কাতর কন্ঠে বললো:-
--" খুব মিস করেছি আমার ভাইয়েরা।"
--" আমরাও।"
একসাথে হেসে উঠে চৌধুরি বাড়ির তিন রাজপুত্র। ওদের সাথে যেনো হেসে উঠে বাড়ির দেওয়াল গুলো। ফুরফুরে হয়ে উঠে সারা চৌধুরি বাড়িময়।
আশতাফ চোধুরি সোফায় বসে আছেন। আশরাফ চৌধুরি তার পাশেই। আফতাব রাজশাহী গেছেন অফিসের কাজে। আজ বা কাল ফিরতে পারেন। কি নিয়ে যেনো ঝামেলা বেঁধেছে কর্মচারীদের মধ্যে। সেটাই মিটমাট করতে আফতাব চৌধুরি গতকাল রাতে রাজশাহীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে ছিলেন।
ইনায়া মাহমুদা বেগমের সামনে এসে ওনাকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে গেলে উনি আটকে বুকে জড়িয়ে নেন। কতোদিন পর মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরেছেন তিনি।
ওনার প্রিয় আর বুকের দুটো সম্পর্ক ই যে মেয়েটার সাথে। একদিকে নিজের মেয়ে অপর দিকে একমাএ ছেলের বউ। কিছুক্ষণ জড়িয়ে ধরে বুক থেকে ছাড়িয়ে সামনে এনে চোখের ইশারায় আশতাফ চোধুরির কাছে যেতে বললেন। বেচারা যে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছেন না। না শক্ত খোলস ছেড়ে কাছে ডাকতে পারছেন। মাহমুদা বেগমের ইশারা বুঝতে ফেরে আবরারের দিকে তাকায় ইনায়া।
ইনায়ার দৃষ্টিতে দেখে তার মন পড়ে ফেলে আবরার। এগিয়ে এসে তার হাত ধরে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো আবরার। ওরা সামনে দাঁড়াতেই আশতাফ চোধুরি দাঁড়িয়ে পড়েন।
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর কান্নামিশ্রিত কন্ঠে ইনায়া ডাক দিলো আশতাফ চোধুরি কে :-
--" বড় আব্বু।"
ইনায়ার কান্নামিশ্রিত ডাকটাই যেনো যথেষ্ট ছিলো শক্ত খোলসে আবদ্ধ থাকা আশতাফ চোধুরি কে ভেঙে গুড়িয়ে দেওয়ার জন্য। ছলছল চোখে হাত বাড়ালেন ইনায়ার উদ্দেশ্যে। বড় আব্বুর সায় পেয়ে তীব্র বেগে ওনাকে জড়িয়ে ধরে ইনায়া। কান্নার তোপে বারবার শ্বাস আটকে আসছে তার। নাকের পানি চোখের পানিতে ভেসে যাচ্ছে আশতাফ চোধুরির বুক আর ইনায়ার ঘাড়ের শাড়ির অংশ। হ্যাঁ আশতাফ চোধুরি ও কাঁদছে। ওনার কান্না দেখে কেঁদে ওঠে সবাই।
----------------
আসরের আজান দিচ্ছে চারদিকে। তিহু আর ইনায়া ছাদের রেলিং এ বসে পা দুলিয়ে আমের আচার খাচ্ছে। ছাদে শুকোতে দিয়েছিলো মাহমুদা বেগম। ইনায়ার টক পছন্দ না হলেও তিহুর সাথে তাল মেলাতে একটা আচার হাতে নিয়ে বসে আছে। একটু পর পর মুখে দিচ্ছে আর চোখ - মুখ কুঁচকে নিচ্ছে। তা দেখে পাশে বসা তিহু হাসছে।
তিহু আরেক টুকরো আচার হাতে নিতেই ইরফান আসে ছাদে। ইনায়ার পাশে এসে মাথায় টোকা দিতেই অতর্কিত সে পেছন ফিরে তাকায়। সাথে তিহুও , কিন্তু ইরফান কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আবার সামনের রাস্তায় যাতায়াত করা মানুষ দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
--" কিছু বলবি ভাইয়া?"
তিহুর দিক থেকে চোখ সরিয়ে ইনায়ার দিকে তাকালো ইরফান। বোনের গলা জড়িয়ে বললো :-
--" আইসক্রিম খাবি?"
আইসক্রিমের কথা শুনে চোখ জলজল করে উঠে ইনায়ার। লাফ দিয়ে রেলিং থেকে নেমে পড়লো সে। হাসি হাসি মুখেই উত্তর দিলো ইরফানকে:-
--" তুই খাওয়াবি? সত্যিই ভাইয়া।"
--" ফ্রিজে রেখে এসেছি। তোর আর তিহুর জন্য। একটা খেয়ে আরেকটা রেখে দিস।"
--" আচ্ছা।"
ভাইয়ের থেকে আইসক্রিমের খোঁজ পেয়ে শাড়ি টা উপরে তুলে দৌড়াতে দৌড়াতে ছাদ থেকে নেমে পড়লো ইনায়া।
তিহুর পাশে ইরফান পা তুলে রেলিংয়ে বসল। ইরফান বসার সাথে সাথেই সে নেমে যাওয়ার জন্য এগোতে লাগল। ঠিক তখনই ইরফান হাত বাড়িয়ে তার কোমর টেনে নিল নিজের দিকে। হঠাৎ টানে তিহু ধপ করে গিয়ে পড়ল ইরফানের বুকের উপর।
তিহু ছাড়া পাওয়ার জন্য নড়চড় শুরু করতেই ইরফান গলা ঝেড়ে শান্ত কন্ঠে বললো:-
--" বলছিলাম কি....?"
--" আমি কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছুক নই।"
--" স্বয়ং ইরফানের সাথেও না?"
--" না।"
--" সত্যিই!"
--" হ্যাঁ।"
তিহুর কথা শেষ হতেই রেলিং থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে ইরফান। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। তা দেখে পেছন ফিরে তিহু।
তিহু পেছনে ফিরতেই তাকে অবাক করে দুপা পিছিয়ে এসে তার ডান গালে টুপ করে চুমু খায় ইরফান। চুমু খেয়ে সেকেন্ডের ভিতরেই সে উধাও। তিহু কিছু বুঝে উঠার আগেই দৌড়ে পালায় ইরফান। গালে হাত দিয়ে দ হয়ে বসে আছে তিহু।
-----------
অন্ধকারে চেয়ে আছে আবরারের ঘর। বিকেল পাঁচটা বাজে । কিন্তু রুমে মধ্য রাতের মতোই অন্ধকার। রুমময় ঘন পর্দার আড়ালে নিমগ্ন, বাইরে থেকে এক বিন্দু আলোও ভেতরে প্রবেশ করতে পারছে না। দেওয়াল হাতড়ে রুমে প্রবেশ করে ইনায়া। লাইট জ্বালাতে গিয়ে ও থেমে যায় সে। অন্ধকার হাতড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে সে। আইসক্রিম খাওয়ার সময় শাড়িতে আইসক্রিম পড়েছিলো। পানি দিয়ে পরিষ্কার করতেই আরো ভিজে যায় শাড়ির অর্ধাংশ।
উপায় না পেয়ে ইনায়া গা থেকে খুলে নেয় শাড়ি টা। হ্যাঙ্গার থেকে টাওয়াল টা নিয়ে বেরিয়ে আসে ওয়াশরুম থেকে। রুমে এসে লাইট জ্বালিয়ে কার্বাড থেকে আবরারের নতুন কেনা কলাপাতা রঙের শাড়িটা বের করলো।
আচমকা উদোম কোমরে পুরুষালি হাতের বিচরণে অবাক হয় ইনায়া। আবরারের উদোম বুকে ঠেকে ইনায়ার পিঠ। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় এক শীতল বাতাস। পেছনে ফিরতে নেয় ইনায়া। তার আগেই ঘাড়ে মাথা রেখে তাকে আটকে দেয় আবরার।
ঘুম ঘুম কন্ঠে বললো: --" বাড়ি আসার পর থেকে আমাকে ভুলে গেলে নাকি বেলি ফুল? এটা কিন্তু ভারি অন্যায়। "
--" আপনিই তো ঘুমোচ্ছিলেন। আগে তো ঘুমের ডিস্টার্ব করলে থাপ্পড় দিতেন। সেই ভয়ে আর ডিস্টার্ব করিনি।"
--" আল্লাহ , আল্লাহ্! বলে কি এই মেয়ে।"
--" ভুল কি বললাম আমি?"
ইনায়ার কথায় ফিচেল হাসলো আবরার। হাসি থামিয়ে ফিসফিসে কন্ঠে বললো:-
--" একদিনেই সব ভুলে গেলে বেলিফুল। যে আমি তোমায় কত আদর করি। সমস্যা নেই , আমি আছি তো। সব কড়ায় গণ্ডায় মনে করিয়ে দেবো। সাথে নতুন কিছু স্মৃতি ও দিবো নে। আমার আবার বড় মন।কাউকে কিছু কম দিতে পারিনা। সে যদি হয় আমার বউ তাহলে তো কথাই নেই।"