রাত তিনটা বাজে। পূর্ণিমা রাত। পূর্ণিমার চাঁদের পূর্ণ রুপোলি আলোতে আলোকিত হয়ে আছে প্রকৃতি। আকাশের তারা গুলো ঝলমল করে দ্যুতি ছড়াচ্ছে চারদিকে। সাথে হালকা মিষ্টি বাতাস। বেলি ফুলের সুভাষে মৌ মৌ করছে আবরার-ইনায়ার ঘর।
ওয়াশরুমে শাওয়ার নিচ্ছে ইনায়া। টাওয়াল পরিহিত অবস্থায় ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকাচ্ছে আবরার। চুল গুলো ভালো করে শুকানো শেষে ড্রায়ার টা রেখে দেয়।
থুতনি ধরে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে মুখ টা পরোখ করে আবরার। চোখ জোড়া গলার কাছটায় এসে থামে। কিছু অবাঞ্ছিত দাগ। দাগ গুলো খানিক টেনে আসলেও পুরোটা এখনো শুকিয়ে আসেনি।
হাত বাড়িয়ে ওয়ারড্রবের প্রথম ড্রয়ার থেকে দুটো ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ নিয়ে দাগ গুলোতে লাগিয়ে নেয়।
--" হ্যাঁ এবার ঠিক আছে।"
আরেকটু ক্ষণ আয়নাতে নিজের প্রতিবিম্বে চোখ বুলোয় আবরার। একটা বিষয় সে বুঝতে পারছে না।
--"আগের থেকে কি একটু সুন্দর হয়েছে সে? নাকি অসুন্দর! কে জানি"
ভাবতে ভাবতেই ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা একটা কৌটা থেকে খানিকটা ক্রিম তুলে দু’হাতের সাহায্যে চুলে মেখে নিল। অন্য হাতে লিপসিরাম নিয়ে আলতো করে ওষ্ঠে বুলিয়ে দেয়। বা হাতে সিলভার ঘড়িটা পরে। সবশেষে উদোম শরীরে ডিওর সোভাজ পারফিউম টা স্প্রে করে নেয়।
ততক্ষণে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে পড়েছে ইনায়া। দরজার ছিটকিনির আওয়াজ শুনে চওড়া হয় আবরারের ওষ্ঠের হাসি। মাথা চুলকে ফিচেল হাসলো সে। ছোটো ছোটো পায়ে আবরারের থেকে দুহাতের দূরত্বে এসে থামে ইনায়ার পা জোড়া। তার পরণে দু'কাপড়। বুক সহ উদোরের কাছটায় টাওয়াল দিয়ে ঢাকা।
লজ্জায় বার বার এদিক ওদিক তাকাচ্ছে ইনায়া। ঘনিষ্ঠ মূহুর্তে দু'জন খুব কাছাকাছি গেলেও এমন খোলা মেলা ভাবে আবরারের সামনে ইনায়ার প্রথম দাঁড়ানো। অস্বস্তিতে অবশ হয়ে আসছে ইনায়ার সর্বাঙ্গ।
ইনায়া শাওয়ারে যাওয়ার আগে আবরার কড়া গলায় বলেছিল, শাড়িটা সে-ই নিজ হাতে পরিয়ে দেবে ইনায়াকে। ইনায়া যদি শাড়ি পরে ওয়াশরুম থেকে বেরোয়, তবে সে বাড়ি ফিরবে না। আবরারের শান্ত দৃঢ় কণ্ঠের সেই হুমকি শুনে, ইনায়া এখন এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে।
হাসি হাসি মুখে ধীর পায়ে বিছানার পাশে গিয়ে বিছানার উপর ভাঁজ করে রাখা মেরুন কাতান টা হাতে তুলে নেয় আবরার। গাড়ো খয়েরি রঙের শাড়িটার পুরোটা জুড়ে সোনালী সুতোয় কাজ করা। শাড়ির আচঁলের অংশে ছোট ছোট পাথর বসানো। গহনা গুলোর সাথেই শাড়িটা কেনা। আবরার আলতো হাতে ভাঁজ খুলতে খুলতে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে থামে ইনায়া সামনে।
চোখ টিপ্পনী কেটে দুষ্ট হেসে ইনায়ার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করে সে :-
--" আজ ও কি চোখে কাপড় বাঁধতে হবে বেলি ফুল? তুমি চাইলে আমার কোনো সমস্যা নেই।"
আবরারের কথার মানে বুঝতেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠে ইনায়া। কি মিষ্টি আর প্রাণবন্ত সেই হাসি। সেই হাসির দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়েরয় আবরার।
হাসি হাসি মুখে ইনায়ার উদ্দেশ্যে আওড়ায়:-
--" জানো বেলি বউ তোমার এই হাসির জন্য আমি আবরার আমার জীবনটাও দিয়ে দিতে পারি।"
উত্তর দেয় না ইনায়া। ডাগর ডাগর আঁখিতে তাকিয়ে থাকে আবরারের চোখের দিকে। তার যে জানা নেই এমন আদুরে কথার উত্তর। হয়তো আবরার কে সে ভালোবাসে। কিন্তু আবরারের মতো ওতটা তো আর বাসতে পারিনি। নাকি পেরেছে । কে জানে!
শাড়ি পরানো শেষ আবরারের। পেটে কুঁচি গুলো গুঁজে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ায় সে। নিজের ঘাড় থেকে শাড়ির আচঁলটা নিয়ে গুছিয়ে ইনায়ার পিঠে সেফটিপিন দিয়ে আটকে দেয়। সব শেষে পিঠের নরম মাংসপিন্ডে আলতো চুমু খায় সে। কেঁপে কেঁপে ওঠে ইনায়া।
আবরার ইনায়ার কানে কানে মোহাচ্ছন্নের ন্যায় আওড়ায় কিছু কথা :-
--" জানো বউ, আমার এখন মোটেও বাসা থেকে বেরোতে ইচ্ছে করছে না। নিজের হাতে তোমাকে পুতুলের মতো সাজিয়েছি। কোথায় ফুল দিয়ে ঘরটা সাজিয়ে দ্বিতীয় বার বাসর করার প্রস্তুতি নেবো। তা না এখন জোর করে বাড়ি ফিরতে হবে!"
আবরারের কথার টোন বুঝতে পেরে তার কাছ থেকে সরে আসে ইনায়া। ঝাঁঝালো কন্ঠে আবরারের উদ্দেশ্যে বললো:-
--" ইহকালে আপনার মুখ থেকে আর ভালো কথা বেরোবে না।"
মুখ কালো করে নেয় আবরার। শুভ্র শার্টটা গায়ে জড়িয়ে নিতে নিতে বলে:-
--" আমি সব সময় ভালো কথাই বলি। দেখো ! তুমি লজ্জা পাও , আমিও যদি লজ্জা পাই। তাহলে আমার বংশে আর বাত্তি মানে প্রদীপ চলবে না। বউয়ের হাত ধরতে ধরতেই আমার দাঁত পড়ে যেত।"
--" আপনার বকবক শেষ হলে এবার রেডি হোন প্লিজ। দেরি হয়ে গেলে বাস মিস হয়ে যাবে।"
--" তো?"
--" বড় আব্বু বোকা দিবে কিন্তু!"
--" তুই জানিস অন্বি ! তোর বড় আব্বু আমার ভালো দেখতে পারে না। যেই দেখেছে বউ নিয়ে একটু শান্তিতে আছি ওমনি বাড়ি ফিরতে তাড়া দিচ্ছে।"
গজগজ করতে করতে আবরারের পিঠ খামছে ধরে ইনায়া।
--" আবরার ভাই ।"
--" আসছে বড় আব্বুর এজেন্ট! তুই আমার বউ! আল্লাহ্ বানিয়েছে আমার পাঁজরের হাড় দিয়ে। থাকবি আমার পক্ষে। তা না করে সারাদিন শশুরের দলে ভিড়িস। আমার ও দিন আসবে।"
--" তো?"
--" তো আর কি ? যত দোষ আবরার ঘোষ।"
--" আচ্ছা "
হঠাৎ কিছু মনে পড়ার ভঙ্গিতে আর্তনাদ করে উঠে আবরার :-
--" তুমি তোমার শর্ত পূরণ করোনি বউ! আমি কিন্তু ফিরবো না বাড়ি।"
আববারের কথায় ভাবুক কন্ঠে প্রশ্ন করে ইনায়া :-
--" কি শর্ত?"
--" কি বলেছিলাম ওইদিন?"
--" মনে পড়ছে না।"
--" থাক , বাদ দাও।"
কথা শেষ করে ব্যাগ গুলো হাতে নিতে উদ্যত হতেই গালে ছুঁয়ে যায় শীতল একজোড়া ওষ্ঠ। পাথর হয়ে যায় আবরার। গালে হাত দিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় ইনায়ার দিকে। যেকিনা পাশে দাঁড়িয়েই হাসছে।
----------------
বাসে জানালার পাশের সিটে বসেছে ইনায়া। ঠান্ডা হাওয়া বইছে চারদিকে। শো শো বাতাসের ঝাপটায় উড়ে যাচ্ছে ইনায়ার মাথায় বাঁধা হিজাবের বাড়তি অংশ টুকু। জানালা টা খোলা থাকায় বাতাসটা এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে ইনায়ার মন - মস্তিষ্ক। তার দৃষ্টি আকাশের সৌন্দর্যে নিবদ্ধ।
অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে ইনায়ার মনে। একপাশে অনেক দিন পর বাড়ি ফেরার আনন্দ। সবার সাথে দেখা হবে ; আয়েশা বেগমকে জড়িয়ে ধরবে। কতোদিন পর মায়ের আচঁলের গন্ধ পাবে সে।
তো অপর পাশে ওই দিন রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো পর পর ভেসে উঠছে। ওমন মিথ্যা কথা গুলো সবাই কেন বিশ্বাস করলো? একবার ও কি ওদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন মনে হয়নি কারো? এতোটাই বিশ্বাসের অযোগ্য তারা দু'জনে। উত্তর মিলে না ইনায়ার মনে।
ইনায়ার ভাবনার মাঝেই আবরার তার ঘাড়ে মাথা রাগে। পূর্ণ দৃষ্টিতে আবরারের দিকে তাকাতেই নিমিষে সব চিন্তা দূর হয়ে যায় ইনায়ার মাথা থেকে।
--" সে মানে আল্লাহ্ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। এটাও হয়তো কোনো ভালোর শুরু ছিলো।"
আবরারের দিকে ঘুরে দু'হাতে তার কোমর আকড়ে বুকে মাথা গুঁজে নেয়। ইনায়ার উপস্থিতি টের পেয়ে আবরার ও দু'হাতে বক্ষবন্ধনীতে আকড়ে ধরে তাকে।
--------------
ফজরের নামাজ আদায় শেষে কোরআন শরীফ পড়ে জায়নামাজ থেকে মাএ উঠেছেন মাহমুদা বেগম। বাহিরে সোনালী আলো ফুটেছে খানিকক্ষণ। দুচোখ জ্বলছে মাহমুদা বেগমের। ছেলে আর ছেলের বউ বাড়ি ফেরার খুশিতে গতরাতে দু চোখের পাতা এক করতে পারেননি তিনি। একই অবস্থা যে পাশে শুয়ে থাকা আশতাফ চোধুরির ও হয়েছে তা ঢের ভালোই বুঝেছেন মাহমুদা।
মানুষ টা শক্ত খোলসে আবদ্ধ হওয়াতে কাউকে কিছু বলতেও পারছে না। না সইতে পারছেন।
মাহমুদা বেগম তাও কষ্ট হলে কাঁদতে পারেন। ছেলে মেয়ে কে কল দিয়ে কথা বলতে পারেন। কিন্তু আশতাফ চোধুরি তাও পারছেন না। শুধু মাঝ রাতে উঠে গিয়ে আবরারের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন।
মাঝে মধ্যে বিকেলে লুকিয়ে ছাদে গিয়ে ইনায়ার ফুল গাছ গুলো তে পানি দেন। আগাছা গুলো পরিষ্কার করেন। মাহমুদা সব দেখেও চুপ করে থাকতেন। যা হোক একটা কিছু করে অনন্ত ভালো থাকুক মানুষ টা।
ঘর থেকে বেরিয়ে আবরারের রুমের সামনে আসতেই মেঘা আর আয়েশা বেগমের হাসির শব্দে দাঁড়িয়ে পড়ে মাহমুদা বেগম। দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি দিতেই দেখলেন দু'জা কাজ করছে আর হাসছে।
বেড কভার থেকে শুরু করে পর্দা সব পাল্টে পেলেছেন দু'জনে। প্রতিদিন পরিষ্কার করার পর ও আজ আবার সব পাল্টেছেন দু'জনে । ইনায়ার ঘর থেকে ইনায়ার কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস ও এনেছে তারা।
মাহমুদা বেগম কে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ডাক দেন মেঘা বেগম:-
--" ভাবি এদিকে এসো। বলো তো ঘর সাজানো টা কেমন হয়েছে?"
অমায়িক হাসেন মাহমুদা। মাধুরী মেশানো কন্ঠে সুধালেন তিনি :-
--" তোরা দুজনে মিলে যেহেতু সাজিয়েছিস। ভালো না হয়ে যাবে কোথায় বল তো?"
--" সত্যিই?"
--" হ্যাঁ সত্যিই ।"
--" ভাবি।"
যেতে নিয়ে ও মেঘা বেগমের ডাকে আবার দাঁড়ান মাহমুদা।
--" আবরার ইনায়া আসতে আর কতক্ষণ লাগবে ?"
বয়সের ছাপ পড়া ফর্সা দু'গাল এলিয়ে হেসে উত্তর দিলেন:-
--" সাড়ে চারটার বাসে উঠেছিলো। যদি জ্যামে না পড়ে তাহলে আর ঘন্টা তিনেক লাগতে পারে ওদের।"
--" যাক আলহামদুলিল্লাহ।"
--" আচ্ছা, তোরা থাক এখানে। আমি নিচে গিয়ে রান্নার সব গুছিয়ে নেই বরং।"
---------------
গন্তব্যে এসে মাএ বাস থেমেছে। বাস থামতেই নেমে পড়ে আবরার-ইনায়া। ক্লান্ত চোখে তাকায় চারপাশে। আহহ,, চেনা শহর। আজ পাক্কা একমাস পর তারা পা রেখেছে এই শহরে। রাস্তা থেকে একটা রিকশা ঠিক করে উঠে পড়ে তারা।
মেইন রোড থেকে চৌধুরি বাড়ি যেতে দশ কি পনেরো মিনিট সময় লাগে। রাস্তা ফাঁকা হলে দশ মিনিটেই চলে যাওয়া যায়।