হঠাৎ নিজের র্টি-শার্টের পেটের অংশে চোখ পড়তেই আবরার দেখলো কিছুটা অংশ জুড়ে লাল তরলের অস্তিত্ব। ইনায়ার শরীর থেকেই যে এই তরল তার র্টি-শার্টে লেগেছে তা জানে আবরার। ওসবের তোয়াক্কা সে করে না। ভালোবাসলে বুঝি রাগী মানুষটাও শান্ত হাতে সব সামাল দিতে জানে?
এর মধ্যে ইনায়ার ডাক পেয়ে ছুটলো ঘরে। ইনায়াকে এনে বিছানায় শুইয়ে দেয় আবরার। কিচেন থেকে গরম পানি ভর্তি বোতলটা এনে টাওয়াল পেছিয়ে ইনায়াকে দিলো।
কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আলতো সুরে জিজ্ঞেস করে সে:-
--" বেশি কষ্ট হচ্ছে তোর বেলি? আ....আমি কি করবো আর বুঝতে পারছি না। বোতলটা দিয়ে একটু শেক দে ব্যথা কমে যাবে।"
ইনায়া আলতো হাতে আবরারের দুহাতে মুঠোয় পুরে নেয়।
--" আমি ঠিক আছি আবরার।"
ইনায়ার উত্তরে ও যেনো মন শান্ত হয় না আবরারের।
--" বাড়ি থাকতে কখনো তো এতোটা ব্যথা হতে দেখেনি তোর?"
--" তখন তো এতোটা কাছ থেকে দেখতেন না। তাই বুঝতেন না।"
কথা বলার ফাঁকে ইনায়ার চোখ পড়ে আবরারের র্টি-শার্টে। অপরাধী চোখে মিইয়ে যাওয়া কন্ঠে সুধালো :-
--" আপনার র্টি-শার্ট টা তো নষ্ট হয়ে গেছে। র*ক্তে*র দাগ তো উঠবে না।"
অমায়িক হাসে আবরার। আলতো হাতে বক্ষবিভাজনে জড়িয়ে নেয় ইনায়াকে।
--" আমি ভালোবাসি তোমাকে বেলি বউ। ভালোবাসা মানে বুঝো তো? চারটা বাক্যের একটা শব্দ নয় মাএ। ভালোবাসার মানেটা খুব বিশাল। তেমনি ভালোবাসার মানুষের কষ্ট , দুঃখ , অসুখ সব কিছুর প্রতিই ভিন্ন ভিন্ন আবেগ আর সম্মান মিশে থাকে। সেখানে এসব ছোটো খাটো বিষয় কিছুই না বউ।"
ইনায়া আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আবরার কে। যেনো বক্ষবন্ধনীতে বন্দি হওয়ার বৃথা প্রয়াস চালায়।
--" জানেন আবরার আজ আমার সবাই চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে।"
--" না বললে জানবো কিভাবে জেসমিন?"
--"--" আমি আপনাকে ভালোবাসি আবরার। এত্ত এত্ত ভালোবাসি। আজ সত্যিই আমার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে ওইদিন আমার গায়ে কলঙ্ক লেপ্টে ছিলো আর্শীবাদ হিসেবে। আল্লাহ্ কাউকে ঠকান না। আমি আপনাকে পেয়ে জিতে গেছি আবরার। আমার সবচেয়ে বড় পাওনা আপনি।"
--" আমিও তোমায় ভালোবাসি বেলি। তুমি এবার একটু শোও আমি কিচেন থেকে আসছি।"
আবরারের কথায় ওর দিকে তাকিয়ে ভাবুক দৃষ্টিতে প্রশ্ন করে ইনায়া:-
--" এখন আবার কি করবেন? এবার আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন প্লিজ।"
--" আমি তোমাকে ভালোবাসি, বউ। ভালোবাসি মানে তোমার ভালো-মন্দ, সবকিছুকেই ভালোবাসি। পাপ, পূণ্য, ব্যথা সব আমার ও। তুমি আমার বা পাঁজরের হাড়। সেই হাড়ের অংশ যদি ব্যথায় ছটফট করে, আমি হৃদপিণ্ড নিয়ে কিভাবে শান্তিতে ঘুমাই?"
আবরারের সাথে না ফেরে ক্লান্ত কন্ঠে সুধালো ইনায়া।
--" তা কি করবেন এখন শুনি?"
--" আসছি , বোতলটা তলপেটে ধর। বেশি গরম লাগছে পানিটা?"
--" একটু "
ইনায়ার উত্তর পেয়ে র্টি-শার্ট টা শরীর থেকে খুলে নেয় আবরার। বোতলটা নিয়ে র্টি-শার্টে পেঁচিয়ে ইনায়ার পেটের উপর দিয়ে কিচেনে গেলো সে।
ইনায়া অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আবরারের পথপানে। মানুষ সত্যিই পরিবর্তনশীল। দু'মাস আগেও যে মানুষটার হাতে থাপ্পড় খেয়ে ছিলো। আজ তার শরীরে নারীত্বের রক্তিম ছোঁয়ায় জড়জরিত হওয়ার পর ও কি নিদারুণ ভাবে শান্ত হাতে সব সামলাচ্ছে।
-------------
গোধূলি লগনের আলোয় আলোকিত হয়ে আছে প্রকৃতি। হালকা লাল বেগুনি রঙে রাঙিয়ে আছে আকাশ। পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে যাচ্ছে আকাশের এপাশ থেকে ওপাশে। ছাদে বসে আছে তিহু। কোমর অব্দি গড়ানো চুল গুলো হালকা হাওয়ায় পিটময় খেলা করছে।
হাতে আয়েশা বেগমের দেওয়া আমের আচারের কৌটটা। পুরো বয়াম ভর্তি আচার নিয়ে ছাদে উঠলেও এখন তা অর্ধেক ফাঁকা। হাতের আচার টা শেষ করে আঙুল গুলো চেটে চুলে হাত খোঁপা করে নেয়। কোল থেকে কৌটটা হাতে নিয়ে লাফ দিয়ে পিলার টা থেকে নেমে পড়ে।
সিঁড়ি ঘর অব্দি যেতেই ইরফানের মুখোমুখি হয় তিহু। পাশ কাটিয়ে যেতে নিতেই পথ আগলে দাঁড়ায় ইরফান। শান্ত কন্ঠে বললো:-
--" একটু দাঁড়া তিহু। তোর সাথে কথা আছে।"
উত্তর দিতে সময় নেয় না তিহু। কাঠকাঠ গলায় বললো সে:-
--" কিন্তু আমার কোনো কথা নেই আপনার সাথে। যা বলার বলে দিয়ছি।"
--" পাঁচ মিনিট সময় দে , প্লিজ।
--" পাঁচ সেকেন্ড সময় ও আমার হাতে নেই ইরফান চৌধুরি। তাই দুঃখিত , এবার আসতে পারি?"
পথ ছেড়ে দেয় ইরফান। বলবে না কথা এই বেয়াদপ মেয়ের সাথে। অসভ্য একটা ! কারণ না জেনে শুধু দোষারোপ করে চলে গেলো।
ছাদ থেকে নেমে তানভীরের ঘরে চলে যায় ইরফান। দুই ভাই আজ সন্ধ্যায় বাহিরে যাওয়ার কথা ছিলো। পুনরায় সেই কথাই মনে করাতে যাচ্ছে সে। যদিও তানভীরের ভুলার কথা না। ফিচেল হাসে ইরফান।
--------------
নুডুলস ভর্তি প্লেট হাতে নিয়ে বসে আছে ইনায়া। এটা আধো ও নুডুলস নাকি অন্য কিছু তাই বুঝতে পারছে না সে। তার সামনেই বিছানায় হাঁটু মুড়ে আবরার বসা। মুখের ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কি রান্না করেছে সে নিজেই বুঝতে পারছে না।
নুডুলস নিয়ে কি এতো গবেষণা করছে ভেবে খাওয়ার জন্য তাড়া দেয় আবরার। ইনায়াকে বোকা বোকা সুরে প্রশ্ন করে সে :-
--" কি হয়েছে বউ খাচ্ছো না কেন?"
--" কি দিয়েছেন নুডলস এ ? এমন গোলাপি রঙ ধারণ করেছে কেন?"
--" গাজর , টমেটো , বিটরুট....."
--" কি ? কি দিয়েছেন?"
--" গাজর...."
--" বিটরুট কে দেয় নুডুলস এ ভাই?"
--" বিটরুট খেলে রক্ত হয়। আর তুমি তো এমনিতে বিটরুট খাও না। তাই নুডুলস এ দিয়ে দিয়েছি। ঝটপট খেয়ে বলতো কেমন হয়েছে?"
আবরারের জোরাজুরিতে এক চামচ মুখে দেয় ইনায়া। উৎসুক দৃষ্টিতে ইনায়ার রিয়েকশন দেখতে তাকিয়ে আছে আবরার। কিন্তু মুখের টা শেষ করে আবার খেতে দেখে চওড়া হয় তার মুখের হাসি।