এক নিকষ কালো রাতের সমাপ্তি ঘটে রৌদ্রজ্বল দিনের সূচনা হয়েছে। আজ সময়ের আগেই ভেঙে গেছে তিহুর ঘুম। ঘুম ভাঙলেও এখনো বিছানা থেকে নামেনি সে। বড্ড মাথা ধরে আছে কাল রাতের কান্নার ফলে। কিছুক্ষণ কপালে হাত বুলিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ে তিহু।
শাওয়ার নিলে মাথা ধরাটা কমতে পারে ভেবে কলেজ ড্রেস নিয়ে একসাথে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। আয়নার সামনে দাঁড়াতেই দেখতে ফেলো চোখ - মুখের বাজে অবস্থা। ফুলে লালচে হয়ে আছে। একরাতেই চোখের নিচে ডার্কসার্কেল বসে গেছে। ফর্সা গাল দুটোতে ব্রণের ছোঁয়া।
নিজেকে পরোখ করা শেষে ট্যাপ ছেড়ে বেশি করে পানি দিয়ে মুখটা ধুয়ে নেয় তিহু। আর মনে মনে পণ করলো:-
--" আর কাঁদবে না । সেও দেখবে এই বিয়ে কতোদূর অব্দি গড়ায়। না দূর্বল হবে কারো সামনে। ইরফান যদি তার সাথে নীরবতার খেলায় মত্ত হয়! তবে সে নিজেও কম কিসে? তার শরীরেও একই রক্ত বইছে।"
মনে মনে কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই ওয়াশরুম থেকে বেরোয় তিহু। চুল গুলো থেকে তোয়ালে ছাড়াতে ছাড়াতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই চোখাচোখি হয় বাগানে দাঁড়িয়ে ফোনে কারো সাথে কথা বলা ইরফানের সাথে।
পরণে সাদা শার্ট আর গলায় আইডি কার্ড। বা"হাতে কালো ফিতের ঘড়িটা। যেটা তিহুই তাকে উপহার দিয়েছিলো গতবারের জন্মদিনে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ইরফান ভার্সিটিতে যাওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছে।
তিহুকে দেখে একমুহূর্তের জন্য থমকে যায় ইরফানের হ্দপিন্ড। একরাতে কি হাল হয়েছে মেয়েটার চেহারার। অপরাধ বোধে মিইয়ে যায় ইরফান।চোখ নামিয়ে নেয় সে। তা দেখে বারান্দা থেকে চলে আসে তিহু ও।
একসাথে তৈরি হয়ে সিঁড়ি বেয়ে নামছে তিহু। মেঘা বেগম ড্রাইনিং টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন। মেয়েকে স্বাভাবিক ভাবে নামতে দেখে বুকের উপর চাপা ভারি পাথর টা নেমে যায় মেঘা বেগমের। কাল সারারাত দু"চোখের পাতা এক করতে পারেননি তিনি। দু'বার গিয়ে দেখেও এসেছিলেন মেয়েকে। তখন ঘুমে ছিলো বোধ হয়। বাতি জালাননি তাই জানেন না তিনি। নিচে এসে মেঘা বেগম কে স্বাভাবিক কন্ঠে নাশতা দিতে বললো তিহু।
--" আম্মু নাশতা দাও , কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
মেয়ের কথায় কিচেনে ছুটলেন মেঘা বেগম। পরোটা সেকছেন আয়েশা বেগম তার কাছ থেকে ইরফান আর তিহুর জন্য প্লেট ভরে পরোটা নিয়ে এলেন। এর মধ্যেই তানভীর ও অফিসের জন্য তৈরি হয়ে উপর থেকে নেমেছে। বোনের পাশের চেয়ারে বসতে বসতে একবার অবলোকন করে নেয় বোনকে। কাল রাতে তিহুর কান্না দেখে ভয় পেয়েছিলো সে। আবার এটাও জানতো তার বোন বোকা না। ভেবেচিন্তেই সিদ্ধান্ত নেয়।
তানভীর বসতেই তার সামনের চেয়ারে এসে বসলো ইরফান। ইরফান কে ভার্সিটির জন্য তৈরি দেখে প্রশ্ন করলো তানভীর।
--" ক্লাসে যাবি নাকি আজ?"
--" হ্যাঁ "
--" তিহু ও কলেজে যাবে। তিহু কে তোর সাথে নিয়ে যাস।"
কথা শেষে চোখ দিয়ে ইরফানকে ইশারায় আচ্ছা বলতে বলে তানভীর। তার কথায় সায় জানায় ইরফান নিজেও।
যাকে নিয়ে তাদের মধ্যে কথোপকথন চলছে তার কোনো খেয়ালই নেই এসবে। পরোটা ছিঁড়ে মাংসের সাথে খাচ্ছে তিহু। খাওয়া শেষ হতেই বেসিন থেকে হাত ধুয়ে কাঁধে ব্যাগটা নিয়ে মেঘা বেগমের উদ্দেশ্যে বিদায় জানিয়ে চলে যেতে নেয়। কিন্তু বাঁধ সাধে তানভীর।
--" তিহু দাঁড়া, ইরফানের সাথে যাস!"
--" না ভাইয়া, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
--" ও বাইক দিয়ে কলেজের সামনে নামিয়ে দেবে।"
--" প্রয়োজন নেই , আসি।"
আর একমুহূর্ত ও না দাঁড়িয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায় সে।
----------------
ধরনীর বুক ছিঁড়ে সন্ধ্যা নেমেছে। এখনো বাহিরে ঝিরঝিরে ফোঁটায় বৃষ্টি হচ্ছে। বর্ষাকালে এই এক সমস্যা যখন তখন আকাশ ছিঁড়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। দিনের অধিকাংশ সময় বৃষ্টি থাকার দরুন জনজীবন হয়ে উঠে অস্হির , বিপর্যস্ত। হঠাৎ আসা এক পশলা বৃষ্টিতে মাটি হয়ে থাকে কর্দমাক্ত আর শ্বেতশেথে।
রান্নাঘরে চায়ের কাপে চামুচ দিয়ে টুং টাং শব্দ তুলে চা বানাচ্ছে ইনায়া। দুধ চা টা খুব ভালোই বানায় সে। অবশ্য শুধু দুধ চা বললে ভুল হবে! সব চা ই সে ভালো বানাতে পারে।
যার দরুণ চা না পান করা আবরার ও এখন চা পান করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। ট্রে করে দু-কাপ চা আর বিস্কুট নিয়ে আবরারের পাশে এসে বসলো ইনায়া। বুকের উপর হাত বেঁধে টান টান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে আবরার। হাতে ফোনটা নিয়ে কি যেনো মনোযোগ দিয়ে দেখছে।
ইনায়া পাশে এসে বসতেই সে উঠে বসলো। কোলে বালিশ নিয়ে গালের নিচে হাত দিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকায় ইনায়া দিকে। চায়ের ট্রে টা রেখে পানি আনতে গিয়েছে ইনায়া। কালো শাড়ির আঁচলটা কোমরে গোঁজা। শুভ্র উদরের মধ্যেভাগ স্পষ্ট।
কানে , গলায় আর নাকে একজোড়া সোনার ঝুমকো , ছোটো কাজের একটা হার , আর নোজপিন। যেগুলো আজ বিকেলে ফেরার পথে আবরার কিনে দিয়েছিলো ; বাড়ি ফেরার উপলক্ষে। তার সাথে আরো কিছু পোশাক ও নিয়েছিলো দুজনের জন্য। আবরারের একাউন্টে দুলক্ষ টাকার মতোন জমা ছিলো। সেগুলো দিয়েই কেনাকাটা গুলো করেছে। আর যাইহোক কেউ যাতে এটা না বলতে পারে যে তার বউয়ের কিছুর অভাব আছে। বা তারা সুখে নেই। যদিও সমাজ বা মানুষের কথার ধার ধারে না আবরার। কিন্তু এভাবে খালি গলায় সে ইনায়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে না।
--" এভাবে কি দেখছেন শুনি?"
ইনায়ার কথায় ওর চোখে চোখ রাখে আবরার। ছোটো করে ঢোক গিলে বললো:-
--" দেখছি আমার বালিকা বধু কিভাবে সংসারী হয়ে উঠছে!"
--" পাম দিচ্ছেন নাকি?"
--" না "
--" আজকাল আপনি কখন যে কি বলেন বুঝতেই পারি না।"
--" কিন্তু আমি বুঝে গেছি।"
আবরারের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে প্রশ্ন করলো ইনায়া। বালিশ টা পাশে রেখে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে উত্তর দেয় আবরার।
--" আমার ছোট্ট অন্বিকে পৃথিবীতে আনার জন্য আমার বউ প্রস্তুত।"
আবরারের কথায় চোখ পাকিয়ে ওর চোখের দিকে তাকালো ইনায়া। ইনায়ার তাকানোর ভঙ্গি দেখে দুজনে একসাথে হেসে উঠে। ওদের হাসির শব্দ ঝমঝমিয়ে উঠে রুম জুড়ে। আসবাব গুলো যেনো বোবা ভাষায় বলছে :-
--"ভালোবাসা সুন্দর , হৃদয়ের মিল না থাকলে সেখানে ভালোবাসা সৃষ্টি হয় না। একসাথে থাকলেই বড়জোর সংসার হয় , কিন্তু ভালোবাসা না। ভালোবাসা হওয়ার জন্য প্রয়োজন দুটো পবিত্র হৃদয়। মনে মনে মিললেই ভালোবাসা হয়ে যায়। প্রকৃতির সৃষ্টির কাল থেকে এই নিয়মেই যে ধরনী বয়ে চলেছে।"
---------------
রাত সাড়ে বারোটা বাজে। বিছানায় শুয়ে একবার এপাশ হচ্ছে তো আরেকবার ওপাশ হচ্ছে ইনায়া। কিছুতেই ঘুম আসছে না তার।
আবরার ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই ডাকতেও পারছে না। এদিকে তলপেটের ব্যথায় বারবার কুঁকড়ে উঠছে ইনায়া। ব্যথা টা এতোই তীব্র যে মনে হচ্ছে কোমর সহ তলপেট ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। ইনায়ার এপাশ থেকে ওপাশ ফেরাতে কেঁপে কেঁপে উঠছে বিছানা।
বিছানার কম্পনে জেগে যায় আবরার। ঘুম ভাঙার পর ভূমিকম্প হচ্ছে কিনা তা বোঝার চেষ্টা করে সে।
কিন্তু তেমন কিছু না দেখে পেছন ফিরে ইনায়ার দিকে তাকালো। ব্যথায় নীল হওয়া চোখ মুখ দেখে অবাক হয় আবরার। লাফ দিয়ে উঠে পড়ে সে।
ইনায়ার দু"গাল ধরে প্রশ্ন করলো:-
--" কি হয়েছে।"
পেট চেপে ধরে ইনায়া বললো।
--" প্রচন্ড পেটে ব্যথা করছে!"
--" মিন পিরিয়ড?"
সংকোচে নাক মুখ কুঁচকে উত্তর দেয় ইনায়া। কিছু একটা ভাবলো আবরার। তারপর বিছানা থেকে নেমে গায়ে জড়িয়ে নেয় র্টি-শার্ট টা।
আবার ইনায়ার কাছে এসে কপালের চুল গুলো সরিয়ে দিতে দিতে টপাটপ কপালে কটা চুমু খেয়ে বললো।
--" আরেকটু কষ্ট কর জান! আমি এখনি আসছি।"
ইনায়ার উত্তরের অপেক্ষা না করে বেরিয়ে পড়ে আবরার। বাসা থেকে একটু দূরে ফার্মিসি। তাই দৌড়েই যায় সে। কালো ব্যাগে মোড়ানো প্রয়োজনীয় জিনিসটা আর ওষুধ নিয়ে টাকা মিটিয়ে। আবার দৌড়েই ফিরলো আবরার।
বাসায় ফিরে ওষুধ গুলো নিয়ে ব্যাগ টা বাড়িয়ে দিলো ইনায়াকে।
--" উমমম ....চেন্জ করে আয়। "
দরদর করে ঘামছে আবরার। কপালের পাশ দিয়ে কয়েক ফোঁটা ঘাম নেমে এসেছে গাল জুড়ে। ইনায়া তার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দাঁড়াতে নেয়। কিন্তু তীব্র ব্যথার ফলে দাঁড়াতে অক্ষম হয়।
তা দেখে কোমল কন্ঠে আবরার সুধায়:-
--" দাঁড়া দাঁড়া,, আমি দিয়ে আসছি।"
আবরার কোলে তুলে নেয় ইনায়াকে। ওয়াশরুমের দরজায় নামিয়ে দরজাটা হালকা মিলিয়ে দিলো।
--" তুই কাজ শেষ কর। আমি কিচেন থেকে আসছি। "
--" আচ্ছা "
কিচেনে এসে পাতিলে করে গরম পানি বসায় । "হট ওয়াটার ব্যাগ" না থাকায় একটা সেভেন আপ এর বোতল নিলো পানি শেক দেওয়ার জন্য। পানি গুলো বোতলে ঢালতেই গরম পানি ছিটকে এসে হাতে পড়ে আবরারের। তা তোয়াক্কা না করে বাকি পানিটুকু ভরে নেয়।
হঠাৎ নিজের র্টি-শার্টের পেটের অংশে চোখ পড়তেই আবরার দেখলো কিছুটা অংশ জুড়ে লাল তরলের অস্তিত্ব। ইনায়ার শরীর থেকেই যে এই তরল তার র্টি-শার্টে লেগেছে তা জানে আবরার। ওসবের তোয়াক্কা সে করে না। ভালোবাসলে বুঝি রাগী মানুষটাও শান্ত হাতে সব সামাল দিতে জানে?
এর মধ্যে ইনায়ার ডাক পেয়ে ছুটলো ঘরে।