এত্তক্ষণের হালকা মেঘলা আকাশ টা ঘন কালো মেঘে ঢেকে গেছে এখন। দূর থেকে হালকা বাতাস বয়ে আসছে, সঙ্গে মাটির সোঁদা গন্ধ। হঠাৎই এক ঝটকায় শুরু হয়ে যায় টিপটিপ বৃষ্টি। ইনায়ার গাউনের নিম্ন ভাগ বৃষ্টির ছাঁটে ভিজে জবুথবু হয়ে গেছে। দোকানের ছাউনির নিচে আসতে গিয়েই এতোটা ভিজেছে। যদিও দু’জনেরই শরীর অর্ধেক ভিজে গেছে ততক্ষণে। তবুও সবে ইনায়া জ্বর থেকে উঠায় আবরার তাকে ভিজতে দেয়নি।
রাস্তার পাশের এক টং দোকানের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে আছে আবরার-ইনায়া। হাতে দু'কাপ ধোঁয়া উঠা আদা দেওয়া লেবু চা। কিছুক্ষণ পর পর ফুঁ দিয়ে চা থেকে চুমুক নিচ্ছে তারা। বৃষ্টির ছাঁট বাড়তেই ছাউনির নিচ থেকে বাহিরে হাত বাড়িয়ে দেয় ইনায়া। সদ্য আকাশ থেকে পতিত হওয়া ফোঁটা গুলো ভিজিয়ে দেয় ইনায়া দুহাত। শরীর শিরশির করে উঠে ইনায়ার।
পাশে দাঁড়িয়ে তার বাচ্চামো গুলো অপলক দৃষ্টিতে পরোখ করছে আবরার। সব এতো সহজ আর সুন্দর হবে তার জীবনে একমাস আগেও আবরার তা ভাবতে পারেনি। ওই রাতটা আর্শীবাদ সরুপ ধরা দিয়েছে আবরারের জীবনে। পরিবার থেকে দূরত্ব সৃষ্টি হলেও প্রিয় মানুষটা তার পাশে। পাশাপাশি বালিশটা এখন আর ইনায়া নামক ফুলের অপেক্ষা করা লাগে না। ওই বালিশটা এখন তার নামেই বরাদ্দ। আর বিধাতা ছাড়া এই বরাদ্দতা কেউ খন্ডাতে পারবে না। তা আবরার জানে এবং মনে প্রাণে মানে।
ইনায়ার সেই প্রথম রাতের কথা মনে পড়ে যায়। যেইদিন তারা প্রথম ঢাকায় এসে ছিলো। কিছু স্মৃতি কষ্টদায়ক হলেও তার সাথেও সুখ মিশ্রিত থাকে। হাসি - আনন্দ, সুখ - দুঃখ নিয়েই মানুষের জীবন ঘটিত। তাই দুইকে ভালোবেসে জীবনে বেঁচে থাকতে শিখে গেলে আর কোনো দুঃখ থাকে না জীবনে।
ওদের এই সুন্দর ভাবনাময় মূহুর্তে ভিলেন হিসেবে এন্ট্রি নেয় আবরারের ফোনটা। বিচ্ছিরি শব্দে বেজে উঠে। পকেট হাতড়ে ফোনটা বের করতেই ভ্রুদ্বয় কুঁচকে যায় আবরারের। ভুল দেখেছে কিনা তা সিউর হওয়ার জন্য ফোনের স্কিনটা হাত দিয়ে মুছে আরেকবার নামটা পড়লো। না সে ঠিকই দেখেছে।
আব্বু দিয়ে সেভ করা নাম্বাটা থেকে পায় একমাস পর আজ ফোন এসেছে। আবরার খুশি হবে না অবাক হবে তা ই ভেবে পাচ্ছে না সে। দেখতে দেখতেই কল টা কেটে যায়।
কল না ধরে ফোন নিয়ে আবরারের এমন ভাব দেখে বিরক্তের শ্বাস ফেলে ইনায়া। দিন দিন আবরার ভাই ও স্টার জলসা নাটকের টিপিক্যাল শাশুড়ি গুলোর মতো হয়ে যাচ্ছে। ফোন হাতে নিয়ে এমন ঢং করে কে? আরেকবার কল আসতেই বিরক্ততে ভ্রু জোড়া কুঁচকে নেয় ইনায়া। এবার তার অসহ্য লাগছে।
--" ফোনটা ধরছেন না কেন? নষ্ট মোবাইলের মতো এমন হ্যাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কল না ধরে।"
--" কে কল দিয়েছে তা দেখলে তোর ও সেইম দশা হবে।"
কথা শেষে আবরার ফোনটা বাড়িয়ে দেয় ইনায়ার দিকে। বড় বড় চোখে ফোনের দিকে তাকিয়ে ইনায়া বললো।
--" বড় আব্বু?"
--" হ্যাঁ।"
--" ধরেন ধরেন দেখি কি জন্য কল দিয়েছেন।"
--" পারবো না , তুই রিসিভ কর।"
--" আমি?"
--" হ্যাঁ , লাউড স্পিকার দিবি।"
অজ্ঞাত ইনায়া ফোন হাতে নিয়ে কলটা রিসিভ করে। শান্ত কন্ঠে সালাম দিলো।
--" আসসালামু অলাইকুম ব..বড় আব্বু।"
কিছুক্ষণ নীরবতার পর অপর পাশ থেকে উত্তর এলো। কোমল গলায় আশতাফ চোধুরি উত্তর দিলেন।
--" ওয়ালাইকুম সালাম আম্মু। কেমন আছো তুমি ?"
--" আ..আলহামদুলিল্লাহ ভালো।"
--" ফোনটা তোমার সাথে থাকা অজাতের বাচ্চাটাকে দাও আম্মু।"
--" আবরার ভাইকে দেবো?"
ইনায়ার মুখে আবরার কে এখনো ভাই সম্বোধন করা দেখে হালকা কেঁশে উঠলেন আশতাফ চোধুরি। তারমানে অজাত টা এখনো ইনায়াকে বকা ঝকা করে। আর বউয়ের সম্মান ও দেয়নি।
ইনায়া ফোনটা এগিয়ে দেয় আবরারের দিকে। চোখের ইশারায় ফোনটা সরাতে বলে আবরার। করুণ চোখে আবরারের হাত ধরে ফোনটা ওর হাত ধরিয়ে দেয় ইনায়া।
--" আসসালামু অলাইকুম।"
আবরার ফোন কানে নিয়ে সালাম দিতেই চড়াও হোন আশতাফ চোধুরি। গমগমে কন্ঠে বললো:-
--" তুমি আর মানুষ হলে না। তোমার বউ তোমাকে ভাই ডাকছে। আর তাতে তুমি নির্লজ্জের ন্যায় সায় দিচ্ছো।"
--" এই কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছেন? তাহলে এবার রাখতে পারেন।"
--" চুপ করো বেয়াদপ। আজ রাতের ট্রেনেই ইনায়াকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে।"
আশতাফ চোধুরির কথায় অবাক চোখে ইনায়া আবরারের দিকে তাকালো।
--" কি বললেন? শুনতে পাইনি আমি।"
আবরারের এমন নাটকীয় ভঙ্গিমার কথায় দাঁতকিড়মিড় করে উঠলেন। এটা কি আদোও উনার ছেলে? মাহমুদা কে আজই জিজ্ঞেস করতে হবে। নিজেকে সামলান তিনি। রাগ হলে চলবে না। নেহাত ঠেকায় পড়েছেন না হলে আবরারের কে ও কল দিতেন না আশতাফ চোধুরি।
--" ইনায়াকে নিয়ে আজ রাতের ট্রেনেই বাড়ি ফিরবে দুজনে।"
--" কেন কেন?"
--" প্রয়োজন আছে , এতো কথা বলতে পারবো না।"
--" আমার জানামতে আমার তো কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা ফিরবো না বাড়ি।"
ছেলের কথায় চুপসে গেলেন আশতাফ চোধুরি। বাবা ছেলের এই নিরব যুদ্ধে অসহায় ইনায়া কি করবে বুঝতে পারছে না। তবুও সাহস করে আবরারের হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলো। শান্ত কন্ঠে জানালো তারা যাবে।
--" আমরা যাবো বড় আব্বু।"
--" আমি যাবো না।"
--" আমরা যাবো বড় আব্বু। পরে কথা বলি।"
কল কাটতেই গম্ভীর কন্ঠে সুধালো আবরার।
--" ওইদিনের অপমানের পর ও তোর বাড়ি যেতে ইচ্ছে করছে?"
--" দেখুন ওইদিন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিলো। হয়ত নিয়তিও আমাদের বিপক্ষে ছিলো। সব কিছু তো আর প্ল্যানিং করে করা সম্ভব না। কিছু জিনিস প্রকৃতি নিজে ঠিক করে দেয়। তাই ভুলে যান ওইদিনের কথা।"
সানগ্লাস টা ঠিক করতে করতে আবরার কাঠ কাঠ কন্ঠে সুধালো :-
--" পারবো না ভুলতে। তবে এক শর্তে যেতে রাজি হতে পারি।"
--" কি?"
--" এদিকে আয় , বলি।"
ইনায়ার যেতেই আবরার কানে কানে কিছু একটা বলে। আবরারের কথায় তার দিকে চোখ ছোটো ছোটো করে তাকালো ইনায়া।
--" অসভ্য "
--" আমি কিন্তু বাড়ি ফিরবো না!"
--" ওহ রাজি , আপনার শর্তে আমি রাজি।"
--" চলো তাহলে বাসায় যাই। যত তাড়াতাড়ি শর্ত পূরণ হবে তত তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে পারবেন ম্যাম।"
--" নির্লজ্জ লোক , আমার ও দিন আসবে।"
--" সমস্যা নেই , তুমিও দিতে চাও এমন শর্ত? আমি আগেই বলে দিচ্ছি আমি রাজি।"
--" আমি আর কথাই বলবো না।"