সে আমার পূর্ণতা

পর্ব - ৩৩

🟢

১ম অংশ



রাত আটটা বাজে। চৌধুরি বাড়ির বড় ছোটো সবাই ড্রয়িং রুমে উপস্থিত। বড়রা সোফায় বসা। আশতাফ চোধুরির মুখে গম্ভীরতার রেশ ফুটে উঠেছে। যেনো খুব অপ্রিয় কোনো কাজ ওনার দ্বারা করানো হচ্ছে। ইরফান সোফার সাথে ঢেল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আর তানভীর কার্পেটের ওপরে বসা। তিহু তানভীরের পাশে।

সবার উদ্দেশ্য গলাঝেড়ে বলা শুরু করলেন আশতাফ চোধুরি।

--" আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সিদ্ধান্তটা আমার একার বললে ভুল হবে। বড়দের সবার মতামতেই নেওয়া।"

আশতাফ চোধুরির এমন রহস্যময় কথা শুনে প্রশ্ন করলো তানভীর।

--" কি সিদ্ধান্ত বড় আব্বু?"

--" আমরা তিহুর বিয়ে ঠিক করেছি।"

আশতাফ চোধুরির কথায় চোখ বড় বড় করে সবার দিকে তাকালো ইরফান। যেনো চোখ দিয়েই আশতাফ চৌধুরির কথা গুলো ভষ্ম করে দেবে। আড় চোখে মেঝেতে বসা তিহুর দিকে তাকালো সে। তিহুর দৃষ্টি ও ইরফানের দিকে। চোখে জল চিকচিক করছে। যেনো এই মূহুর্তেই কেঁদে দেবে।

রুম জুড়ে পিনপতন নীরবতা। এই নীরবতা সহ্য হয় না ঘাড় ত্যাড়া তানভীরের।

মেঝে থেকে দাঁড়িয়ে পড়ে তানভীর। দাঁত কিড়মিড় করতে করতে প্রশ্ন করলো নিজের বাবাকে।

--" আব্বু , বড় আব্বু নিশ্চয়ই মজা করছে! আমার মতে এই মজার কোনো মানেই হয় না।"

--" তানভীর এটা কি ধরণের কথা?

--" ছোটো আম্মু তানভীর ভাইয়া ঠিকই বলেছে। হুট করেই কারো বিয়ে বললেই তো বিয়ে হয়ে যায় না তাই না?"

মেঘা বেগম নিজের স্বামীর দিকে তাকিয়ে চুপ করে গেলেন। আশতাফ চোধুরি আবার বললেন।

--" নিছক মজা করার সর্ম্পক তোমাদের সাথে আমার নিশ্চয়ই নেই? সোমবার এনগেজমেন্ট , আগামী শুক্রবার তিহুর বিয়ে।"

--" ছেলে কে পরিচয় কি তার ?"

ইরফানের প্রশ্নে ওর দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন আশতাফ চোধুরি। বড় আব্বুর সাথে চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নেয় ইরফান। আর যাইহোক আশতাফ চোধুরির সাথে কেউ বেয়াদপি করা কথা ভাবতে ও পারবে না। কিছুক্ষণ শান্ত চোখে তাকিয়ে থাকলেন তিনি :-

--" ছেলের পরিচয় জেনে কি দু"ভাই মিলে আবার গুন্ডামি করতে যাবে নাকি?"

--" তিহু তুমি উপরে যাও। ইরফান আর তানভীর থাকো।"

আশতাফ চোধুরির আদেশে প্রথমে উঠতে না চাইলেও পরে মায়ের চোখ রাঙানিতে উপরে চলে যায় তিহু। যাওয়ার আগে আরেকবার করুণ চোখে তাকায় ইরফানের দিকে।

--------------

মাএ অফিস থেকে ফিরেছে আবরার। সে কলিং বেল বাজাতেই ইনায়া দরজা খুলে দিলো। আবরারের হাতে অফিসের কালো ব্যাগটার পাশে অন্য আরেকটা ব্যাগ দেখে অবাক হলো ইনায়া। তার জানামতে আজ তো কোনো শপিং করার কথা ছিলো না আবরারের। তাহলে এই ব্যাগটাতে কি? ওর ভাবনার মাঝেই আবরার ইনায়ার হাতে ব্যাগ টা ধরিয়ে দেয়।

--" জলদি তৈরি হয়ে নাও বেলি বউ। আমি জাস্ট ফাইভ মিনিটেই শাওয়ার নিয়ে আসছি।"

--" কোথায় যাবেন?"

--" সারপ্রাইজ , কথা না বলে রেডি হয়ে নেও প্লিজ।"

--" আরেকটা কথা , আমি শাওয়ার নিয়ে এসে খাবো। খুব খিদে পেয়েছে।"

--" ঠিক আছে । কিন্তু এই ব্যাগে কি আছে?"

--" আমার শুভ্র বেলির জন্য শুভ্র একটা গাউন।"

কথা শেষে ইনায়ার কপালের মধ্য ভাগে চুমু খায় আবরার। অফিসের ব্যাগটা টেবিলে রেখে টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।

ইনায়া শপিং ব্যাগ গুলো বিছানার উপর রেখে কিচেনে চলে যায় আবরারের জন্য খাবার বাড়তে। প্রতিদিন দুপুরে ক্যান্টিনেই খেয়ে নেয় আবরার। যাতে ইনায়ার বাড়তি ঝামেলা পোহাতে না হয়। কিন্তু আজ কেন খায় তা ইনায়ার জানা নেই।

প্লেটে সুন্দর করে ভাত বেড়ে একপাশে তরকারি তুলে নেয়। গ্লাস ভর্তি করে পানি নিয়ে রুমে আসলো ইনায়া। ততক্ষণে আবরার বেরিয়ে পড়েছে শাওয়ার নিয়ে।

উদোম গায়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে চুল শুকাচ্ছে আবরার। এতোই মনোযোগ সহকারে চুল গুলো শুকোচ্ছে যেনো একটু অমনোযোগী হলেই তার ফাঁসি কার্যকর। কোমরে টাওয়ালে পেঁচানো। চুলের পানি গুলো টুপ টুপ করে পড়ে আবরারের বুক বেয়ে নেমে তোয়ালের নিচে হারিয়ে যাচ্ছে। ইনায়া ঘরে ঢুকতেই আয়নাতে একবার চোখ বুলিয়ে তা দেখে নেয় আবরার। ফের নিজের কাজে মনোনিবেশ করে।

--" আপনার খাবার টা।"

--" খাইয়ে দাও।"

--" কি ?"

--" এক কথা বারবার রিপিট টেলিকাস্ট করতে ভালো লাগে না বেলি।"

ইনায়া কথা বাড়ায় না। সে জানে আরেকবার জিজ্ঞেস করলে দেখা যাবে আবরার আর খাবেই না। গ্লাস টা টেবিলে রেখে প্লেট টা হাতে তুলে নিলো।

মাংস টুকরো থেকে ছাড়িয়ে ভাতের নলা তুলে ধরে আবরারের মুখে। কিন্তু উচ্চতার পার্থক্যের জন্য গাল অব্দি তা পৌঁছাতে পারে না ইনায়া।

--" তাল গাছের মতো এভাবে না দাঁড়িয়ে থেকে একটু ঝুঁকতে ও তো পারেন। তাই না?"

--" এক সেকেন্ড দাঁড়া।"

কথা শেষ করেই বলিষ্ঠ হাতে খাবারের প্লেট সমেত ইনায়ার কোমর জড়িয়ে উপরে উঠিয়ে নেয় আবরার। ভয়ের তোপে প্লেট পড়ে যেতে নেয় ইনায়ার হাত থেকে। অপর হাতে তা ধরে ফেলে আবরার। বড় বড় করে শ্বাস নিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে ইনায়া। হুটহাট আবরার কোলে নিতে গিয়ে কবে যে তাকে ফেলে কোমর ভেঙে দেয় সেই ভাবনাই মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ইনায়ার।

--" এটা আবার কেমন ভাত খাওয়ার স্টাইল?"

--" এভাবেই দাও।"

--" পারবো না নামান আমাকে।"

--" নামিয়ে দিলে আর এক সেকেন্ড ও এই রুমে থাকতে পারবে না। রাজি থাকলে নামিয়ে দিতে পারি।"

--" প্রয়োজন নেই। শক্ত করে দরুণ যাতে পড়ে না যাই।"

--" ডাউট আছে নাকি?"

--" হা করুন "

লক্ষী ছেলের মতো হা করে আবরার। ইনায়া নলা তুলে দেয় তার মুখে। তৃপ্তি সহকারে নলাটা চিবিয়ে খায় সে। খাওয়া শেষে আবার মুখ খোলে আবরার।

--" জানো বেলি ! তোমাকে যখন তোমার ছোটো ছোটো আঙুল গুলো দিয়ে ইরফান , তানভীরদের খাইয়ে দিতে দেখতাম তখন আমার খুব হিংসে হতো।"

--" ওমা কেনো?"

--" আমার বেলি বউয়ের হাতে আমি কোনো দিন খাইনি। ওই শালা দুটো খাবে কেন? ইচ্ছে করতো দু'টোর মুখ ভেঙে দেই।"

--" বউ?"

--" হ্যাঁ বউ ই তো।"

--" এতো সিউর কিভাবে ছিলেন যে আমি আপনার বউ হবো?"

--" তোমার কি মনে হয় আমাকে টপকে চৌধুরি বাড়িতে এসে অন্য কেউ তোমাকে নিতে পারতো? তাও আবার বউ বানিয়ে? যেখানে আজ পর্যন্ত কেউ তোমাকে প্রেমের প্রস্তাব পর্যন্ত দিতে পারেনি। সত্যিই এটা সম্ভব ও হতো আমি বেঁচে থাকতে? মনে হয়।"

--" জানি না , হা করুন।"

--" কিন্তু আমি জানি। উপওয়ালা ছাড়া আমার বেলি বউকে আমার থেকে কেউ আলাদা করতে পারবে না , ইনশাল্লাহ।"

ইনায়ার কপালে কপাল ঠেকায় আবরার। আবরারের গরম শ্বাস গুলো উপচে পড়ছে ইনায়ার চোখে - মুখে। কথা বলতে বলতে আবরার যে অন্য গ্রহে হারিয়ে যাচ্ছে বুঝে ইনায়া। আবরার কে স্বাভাবিক করতে সে তাড়া দিয়ে বললো:-

--" বলেছিলেন না কোথাও যাবেন?"

--" ওহ শিট ভুলেই গিয়েছিলাম। আর খাবো না , গিয়ে রেডি হয়ে নাও।"

--" বকবক করতে করতে তো শুধু এক নলা ই খেয়েছেন।"

--" ব্যাপার না।"

আবরারের ডোন্ট কেয়ার ভাব দেখে ভেঙছি কাঁটে ইনায়া। এসেছেন লাট সাহেব রে। ততক্ষণে কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছে আবরার। এঁটো হাতে প্লেট নিয়ে আবরারের গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে কিচেনে যায় ইনায়া।

--" তার হয়েছে যত জ্বালা। সমাজের চোখে মি. পারফেক্ট তিনি। যতো যাতনা , পুতনা আছে সব অন্বির জন্য বরাদ্দকৃত শয়তান বেডা। আর জীবনেও তোকে খাইয়ে দিবো না। দিলে আমার নাম ও ইনায়া না হুহ।"

হাত ধুয়ে এসে শপিং ব্যাগটা খোলে ইনায়া। ভেতর থেকে একটা সুন্দর শুভ্র গাউন আর বেলি ফুলের দুটো গাজরা বেরোলো। জামাটা পাশে রেখে গাজরা জোড়া হাতে নিয়ে শুঁকে ইনায়া।

কি মিষ্টি সুভাষ। যদি পৃথিবীর যেকোনো দামী সুগন্ধের সাথে বেলি ফুলের সুভাষের তুলনা করা হয়। নিদ্বির্ধায় বেলি ফুলের সুভাষকেই নাম্বার দেবে ইনায়া।

২য় অংশ



ফজরের আজান দিচ্ছে মসজিদে। সারারাত কেঁদে কেটে মাএ দুচোখের পাতা এক করেছে তিহু। রাতে সবার হাজার ডাকাডাকিতেও সে খাবার খেতে যায়নি। চোখ - মুখ ফুলে যাচ্ছে তাই অবস্থা।

কিঞ্চিত শব্দ করে খুলে যায় তিহুর রুমের দরজাটা। আলো আঁধারিতে রুমে প্রবেশ করে এক পুরুষালি ছায়া। অন্ধকারের মাঝে হাতরে তিহুর বিছানার পাশে হাঁটু ভেঙে বসলো সে।

এলোমেলো ভঙ্গিতে বালিশ আঁকড়ে ধরে শুয়ে আছে তিহু। হালকা রঙিন বাতির আলোতে আবছা দেখা যাচ্ছে ওর মুখটা।

আলতো হাতে মুখের উপরে পড়ে থাকা চুল গুলো কে সরিয়ে দেয় ইরফান। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে তার একান্ত ভালোবাসার নারীর দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে কপালে শব্দ করে চুমু খায় সে।

তারপর যেভাবে এসেছিলো সেভাবেই ধীর গতিতে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। যাওয়ার আগেই হাতে টান পড়ে ইরফানের। পেছনে না তাকিয়ে ও বুঝে নেয় তিহু তার বাহু আকড়ে ধরেছে দু"হাতে।

ইরফান কে ঘুরতে না দিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো তিহু। তিহুর ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দে ঘরটাকে কেমন ভুতুড়ে ঠেকছে ইরফানের নিকট। দাঁতে দাঁত চেপে দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয় সে।

বহু কষ্টে তিহু কান্না থামিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো কিছু কথা:-

--" আমি এই বিয়ে করতে পারবো না ইরফান ভাই। আমি আপনাকে ভালোবাসি। বুঝেও কেন এমন করছেন?"

--" ছেলে পক্ষকে বড় আব্বুর আর চাচ্চু কথা দিয়ে ফেলেছে তিহু। এই বিয়ে ভাঙা কিছুতেই সম্ভব না।"

--" আপনি কিছু করুন না ইরফান।"

--" তুই ই বল কি করবো ?"

--" চলেন পালিয়ে যাই । না হলে , না হলে , আমাদের কথা বাসায় জানিয়ে দিই?"

তিহুর আটকে আটকে বলা কথা গুলো তীরের মতো গিয়ে বুকে বিঁধে ইরফানের। কিন্তু তার কিছুই করার নেই। তার হাত পা বাঁধা। সে কথা দিয়েছে বাবা - মায়েদের।

বুক থেকে তিহুর দু'হাত ছাড়িয়ে নেয় ইরফান। পেছনে ফিরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো তিহুর। কোমল গলায় বললো:-

--" বোঝার চেষ্টা কর প্লিজ এসব কিছুই সম্ভব না। শুধু শুধু কাঁদিস না প্লিজ। ভোর হয়ে এসেছে তিহু ঘুমিয়ে পড়।"

ইরফানের কথায় রাগ উঠে যায় তিহুর। ঝাটকা দিয়ে মাথা থেকে সরিয়ে দেয় ইরফানের হাত। রাগে , দুঃখে , কান্নায় রোধ হয়ে আসে তার গলা। দু'হাতে চেপে ধরে ইরফানের র্টি-শার্টের কলার বহু কষ্টে বলে :-

--" কি বলছেন এসব? মাথা ঠিক আছে আপনার? পারবেন আমাকে ছেড়ে থাকতে?"

তিহুর কথার প্রতিউত্তর করে না ইরফান। হাতের সাহায্যে ছাড়িয়ে নেয় তিহুর হাত। তারপর ধীর পায়ে রুম থেকে প্রস্থান করার জন্য পা বাড়ায় ইরফান। অবিশ্বাস্য চোখে ইরফানের কাজ গুলো দেখে তিহু।

তার এসব বিশ্বাস হচ্ছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। হায় আল্লাহ্ সে এতোদিন কাকে ভালোবেসেছিলো? অবিশ্বাস্য কন্ঠে সুধালো তিহু।

--" তার মানে এতোদিন সব নাটক ছিলো ইরফান চৌধুরি? সব সব , আমার মন , ভালোবাসা নিয়ে আপনি খেলেছিলেন? কিভাবে পারলেন ? একটুও বুক কাঁপলো না আপনার।"

ইরফানের এমন নির্লিপ্ততা গভীর ভাবে আঘাত করে তিহুর বুকে। বুক চেপে ধরে কান্না করতে করতে আবারো মুখ খোলে সে।

--" চৌধুরিদের সম্মানের কাঁথায় আগুন লাগুক। ধ্বংস হোক এই ভাব-গাম্ভীর্য। ওরা ভালোবাসা বোঝে না। আমার ভাই-বোন দুটোকে একবার বাড়ি ছাড়া করে ছিলো। এবার আমাকে পৃথিবী ছাড়া করতে চায়। আল্লাহ্ বিচার করুক।"

এত্তক্ষণ তিহু আর ইরফানের বলা প্রত্যেক টা কথা দরজার পাশথেকে শুনে ছিলো তানভীর। বাইকের হেলমেট আর চাবি নিয়ে রাতের শহরে লং ড্রাইভে বেরোনোর প্রস্তুতি নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ছিলো সে। কিন্তু ভাইবোনের কথা গুলো তার পদ জোড়া আটকে দেয়।

ভাই হিসেবে তানভীরের তিহুর জন্য বড্ড কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কিছু কিছু কষ্ট মানুষের জীবনে অন্ধকার দূর করে আলো বয়ে আনে। তা ভালোই জানে বুঝদার তানভীর। ওদের কথায় আর কান না দিয়ে নিচে চলে যায় সে।

-----------

আবরারের সামনে মেঝেতে বসে আছে ইনায়া। অনেকক্ষণ ধরে আবরার বেণুনি পাকানোর চেষ্টা করে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে। আধা ঘন্টা পেরিয়েছে উল্টে পাল্টে আবরার বেণুনি করার চেষ্টা করছে। নিজে না পারলেও ইনায়াকে সে হাত লাগাতে দিচ্ছে না। বিরক্তিতে মাথা ঝিম ঝিম করছে ইনায়ার। নিজের বিরক্তি ধরে না রাখতে পেরে অবশেষে মুখ খোলে সে। কাঠ কাঠ কন্ঠে বলে উঠলো:-

--" আমাকে দিন না আমি করে নিচ্ছি। গাজরা টা আপনি লাগিয়ে দিয়েন।"

--" প্রয়োজন নেই , আমি পারবো।"

--" সব সময় জেদ করলে ভালো লাগে না আবরার ভাই।"

ইনায়ার কথার উত্তর না দিয়ে তাকে উঠিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়া করিয়ে দিলো আবরার। নিজের বেণুনির দিকে তাকিয়ে নিজেই অবাক হয় ইনায়া। কাঁদো কাঁদো মুখে প্রশ্ন করে আবরারকে:-

--" শাড়ি পরানো , বেণুনি করা এসব আপনি শিখেছেন কিভাবে সত্যিই করে বলেন?"

--" আগে একটা সংসার করেছি যে সেখান থেকে।"

--" আবরার ভাই , আমি কিন্তু যাবো না আপনার সাথে।"

--" ওলে আমার আদুরে বেলি। সব তোমার জন্যই আমার শেখা।"

--" মানে?"

--" আমাদের বিয়েটা যদি স্বাভাবিক ভাবে হতো। তাহলে তো আমাদের ফাস্ট নাইট ও হতো! তোমার মনে আছে শেষ বার আমি ঢাকা থেকে ফেরার সময় আম্মুদের সবার জন্য জামদানি শাড়ি নিয়ে ছিলাম।"

--" হ্যাঁ "

--" তখন অনেক খুঁজে তোমার জন্য ও দুটো শাড়ি নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম ফাস্ট নাইটে তোমাকে নিজের হাতে পরিয়ে দেবো। কিন্তু তা আর হলো কই? বাদ দাও , তুমি রেডি তো?"

খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠে ইনায়ার চোখ। খুশিতে গদগদ হয়ে আবরারের দিকে ফিরে প্রশ্ন করলো:-

--" কি রঙের ছিলো শাড়ি গুলো?"

--" লাল , কালো।"

--" শাড়ি গুলো এখন কোথায়?"

--" আমার কার্বাডে পোশাকের ভাঁজে লুকানো।"

ফের তাড়া দেয় আবরার। ইনায়ার হাত ধরে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা ঝুলিয়ে দেয়।

আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছে।বিকেল সাড়ে পাঁচটা বাজে। আজ জলদি অফিস থেকে ফেরার পর ও দুজনে রেডি হতেই দেরি হয়ে গেছে।

আবরারের পরণে শুভ্র শার্ট আর কালো জিন্সের প্যান্ট। ইনায়ার পরণে আবরারের দেওয়া শুভ্র গাউন। চুলে বেণুনির মধ্যে বেলি ফুলের গাজরা গুলো লাগানো। বা'হাতে চিকন কালো ফিতের ঘড়ি।

বাসা থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়াতে রিকশা পেয়ে যায় তারা। ভাড়া ঠিক করে রিকশায় উঠে পড়ে তারা। এখান থেকে আধ ঘন্টার রাস্তা। ইনায়ার এখনো জানা নেই তারা যাচ্ছে টা কোথায়।

--" আমরা কোথায় যাচ্ছি আবরার ভাই?"

--" তোকে বেঁচে দিবো। দেখছিস না নিজের হাতে ভালো করে সাজিয়ে গুছিয়ে এনেছি!"

আবরারের ত্যাড়া উত্তরে কোনো কথা না বলে মুখ বাঁকিয়ে অন্য দিকে ফিরে তাকায় ইনায়া। ঢাকাতে আসার পর এই নিয়ে তাদের একসাথে তিনবার বের হওয়া। প্রথম দুবার কাজের উদ্দেশ্যে হলে ও এবার বিষয়টা ভিন্ন

চারপাশ মেঘলা হয়ে আছে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে চারদিকে। ইনায়ার ভালোই লাগছে মূহুর্তটা। তার ভাবনার মাঝেই আবরার পেছন থেকে বা'হাতে জড়িয়ে ধরে ইনায়ার কোমর। একবার তাকিয়ে কিছু বলে না ইনায়া।

রিকশা এসে থামে একটা নদীর পাশে। ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়ে দুজনে। আবরার নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় পুরে নেয় ইনায়ার হাতটা। নদীর পাড়ের ঘাসের ওপর এসে বসলো ওরা দুজনে।

চারপাশ জুড়ে নীরবতা, শুধু নদীর ঢেউয়ের টুপটাপ শব্দ আর বাতাসের শোঁ শোঁ ধ্বনি। আকাশজুড়ে কালো আর ধূসর রঙের মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছে ধীর গতিতে। সূর্য তার আলো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে রেখেছে। কিছুক্ষণ পর পর ঝাঁক বেঁধে পাখিরা উড়ে নদীর এপাড় থেকে ওপাড়ে যাচ্ছে।

ইনায়াকে গভীর মনোযোগে আকাশের দিকে তাকাতে দেখে পাশ থেকে উঠে পড়ে আবরার। ধীর পায়ে হেঁটে কিঞ্চিত দূরত্বে অবস্থিত ফুলের দোকান থেকে একটা সাদা গোলাপের স্টিক নিলো। চোখের সানগ্লাস টা খুলে পকেটে গুঁজে নেয়। ইনায়া পেছনে এসে হাঁটু গেড়ে বসে আবরার। কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আলতো সুরে বলে উঠে কিছু কথা:-

--" আই লাভ ইউ জ্যাসমিন। আমি তোমাকে ভালবাসি বেলি। দিন ,ক্ষণ, সময় , কাল দেখে তোমার প্রতি আমার এই ভালোবাসা সৃষ্টি হয়নি। যখন প্রথম তোমাকে ভালোবেসে ছিলাম! তখন এক বালিকা রূপে ভালোবেসে ছিলাম। দ্বিতীয় তে নব যৌবনা এক ষোড়শীর প্রেমে। এবং সর্বোপরি আমার প্রিয়তমা স্ত্রীর রূপে। প্রতিবার আমি তোমার নতুন রূপে মুগন্ধ , বিমোহিত হই। আমার হৃদয়ে বয়ে যায় শান্তির স্রোত।তুমিও কি আমাকে ভালবাসবে বউ?"

আবরারের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ইনায়া। কি বলবে সে ভেবে পাচ্ছে না। প্রিয় মানুষের মুখ থেকে ভালোবাসা কথা শুনতে এতো শান্তি? এতোটা মধুর শোনায় কথা গুলো! ইনায়া মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানায়। আলতো হাতে ফুলের স্টিকটা নেয় আবরার হাত থেকে।

ফুলগুলো ইনায়া ধরতেই আবরার প্যান্টের পকেট হাতড়ে বের করে ছোট্ট একটা বক্স বের করলো। বক্সটা খুলে একটা শুভ্র পাথরের রিং বের করলো আবরার। বাম হাতের সাহায্যে ইনায়ার হাতটা হাতের তালুতে নিয়ে অনামিকা আঙুলে আংটিটা পরিয়ে দিলো। সব শেষে দাঁড়িয়ে শক্ত আলিঙ্গনে বুকে জড়িয়ে নেয় নিজের প্রিয়তমা সঙ্গীনিকে।

এই সুন্দর সময়টাতে বাগড়া দেওয়ার জন্য ইনায়ার হাতে ফুটে যায় গোলাপে কাঁটা। ব্যথায় খামছে ধরে আবরারের পিঠে শার্ট। হাতটা সামনে এনে কাঁটা টা টান দিলো আবরার। অন্য হাতে আবরারকে শার্টের বুকের অংশে খামছে ধরে ইনায়া। কাতর কন্ঠে বললো:-

--" ব্যথা লাগছে আবরার।"

--" আর একটু সহ্য করো বেলী। এখনি হয়ে যাবে।"

কাঁটা টা ডেবে গেছে আঙুলে। আবরারের হাতের নখ গুলো ছোটো হওয়াতে ধরতেও পারছে না চিকন কাঁটা টা। ব্যথায় আরেকটু কুঁকড়ে উঠে ইনায়া। ছলছল চোখে তাকিয়ে বললো:-

--" পারবো না , ছেড়ে দিন প্লিজ।"

Story Cover