সে আমার পূর্ণতা

পর্ব - ২৮

🟢

" কালকে মামুনি একা ছিলো। আজকে ওর সাথে তোদের বাপ ও আছে বাচ্চারা। আজ আমরা সবাই একসাথে খেলবো।"

পেছনে থেকে পুরুষালি গমগমে কন্ঠে বলা কথা গুলোয় ভ্যাবাচ্যাকা খায় ছেলে গুলো। পেছনে ফিরতেই ওদের সামনে এসে দাঁড়ায় ইরফান। ইরফানের কথায় না চাইতেও হেসে উঠে তিহু। নিজের হাসি থামিয়ে ইরফানের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে সে।

ইরফানের জবাবে ছেলে গুলো খাবড়ে গেলেও নিজেদের স্হির রাখলো। এই ছেলেটা কি করতে পারবে ওদের? ওরা তিনজন আর ছেলেটা শুধু একা। ভয় পেলে পেয়ে বসবে।

--" আমাদের শিক্ষা দিতে সাথে নাগর নিয়ে এলে নাকি সুন্দরী?"

--" সেটা সুন্দরী কে না জিজ্ঞেস করে আমাকে বল! আমি উত্তর দিচ্ছি। তবে কি জানিস? আমার উত্তর দেওয়ার ভঙ্গিমা টা একটু আলাদা। "

--" আমাদের সাথে মাস্তানি করছিস। কানের নিচে এমন দেবো না।"

--" ওমা তাই নাকি? অনেক দিন শারীরিক ব্যায়াম করা হচ্ছে না। জিমের ট্রেডমিল ফিল ওসব আর ভালো লাগে না। চল আজ তোদের দিয়েই ব্যায়াম টা সেরে নেই।"

ইরফানের কথা শেষ করার আগেই একটা ছেলে ঘুসি বসায় তার নাক বরাবর। মারামারিতে কাঁচা হওয়ার দরুণ ঘুসিটাতে কিছুই হয়নি ইরফানের। মুচকি হেসে সানগ্লাস টা খুলে ক্যাচ ছুড়ে দেয় তিহুর হাতে।

--" এবার আমার স্টাইল দেখ।"

প্রতিদিন জিম করার দরুণ পাতি ছেলে গুলো কে হারাতে বেশি সময় লাগে না ইরফানের।

মারামারির এক পর্যায়ে হঠাৎ পকেট থেকে ছুরি বের করে ইরফানের পিঠে ছুরি চেপে ধরলো একটা ছেলে। বেখেয়ালিপনাতে নড়ে যাওয়াতে ইরফানের পিঠের পাতলা শার্ট গলে পিঠে গিয়ে লাগে ছুরির আঘাতটা।

--" আহহহহ...."

ইরফানের আর্তনাদে কেপে ওঠে তিহু। কি করবে ভেবে না পেয়ে তাড়াহুড়ো করে ইরফানের পিছনে ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটাকে তার কলেজ ব্যাগ দিয়ে বাড়ি মারলো তিহু। কিন্তু দুর্ভাগ্য বসত ছেলেটা সরে গেলে বাড়িটা গিয়ে ইরফানের পিঠের কাঁটা গাঁয়ে লাগলো।

অসহায় চোখে তিহুর দিকে তাকালো ইরফান।

--" তুই কার দলের বোন আমার?"

--" আপ....আপনার।"

--" তাহলে আমাকেই কেন মারছিস?"

--" ভু....ভুল হয়ে গেছে ভাইয়া।"

ইরফানের সাদা শার্টের পিঠের নিচের অংশে রক্তে লাল হয়ে গেছে। তা দেখে কেটে পড়ে ছেলে গুলো। রক্তারক্তি ব্যাপারে একবার থানা পুলিশ হলে আর মাস্তানি করতে হবে না।

ছেলেগুলো চলে যেতেই দৌড় দেয় তিহু। রাস্তার পাশ থেকে একধরনের সবুজ পাতা নিয়ে এসে থামে ইরফানের পেছনে। পাতা গুলো হাতের সাহায্যে কচলে নিলো সে।

--" দেখি পিঠের শার্ট তুলুন!"

--" পারবো না। এই পাতার রসে অনেক জ্বালা করে। এসব ভন্ড ডাক্তারি অন্য কারো সাথে গিয়ে কর। আমার সাথে ভুলেও না।"

--" আপনি তুলবেন না আমি তুলবো?"

--" তুলছি তুলছি। এমন নাদান অসহায় বাচ্চাকে ভয় দেখাতে তোর লজ্জা করে না?"

তিহুর চোখ পাকানোর সাথে সাথেই বিনা বাক্যে পিঠের শার্ট খানিক উপরে তুললো ইরফান। পিটের ক্ষতটাতে পাতা সহ রসটা চেপে লাগিয়ে দেয় তিহু। পাতার রস লাগানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। গভীর নেত্রে ক্ষতটা পর্যবক্ষেণ করছে তিহু।

--" ক্ষতটাকে বেশ গভীর বললে ভুল হবে। আমার ছোটোও বলা যায় না। চলুন ডাক্তারের কাছে যাবো।"

--" চল বাইকে উঠ। বাসায় গিয়ে ড্রেসিং করে দিস।"

--" কিন্তু ...."

-- " কোনো কিন্তু না। পিঠ ব্যথা করছে। জলদি বাসায় ফিরতে হবে। আর বাসায় গিয়ে কাউকে ভুলেও বলবি না একথা।"

--" ঠিক আছে। কিন্তু বাইক মতো নষ্ট হয়ে গেছে। হেঁটে যেতে হবে ভাইয়া।"

--" কিছুই হয়নি বাইকের। চল আর একটা কথাও না।"

-----------

বাড়ির মূল ফটক পেরোতেই বাইক থামায় ইরফান। বাইক থামাতেই তিহু নেমে দ্রুত পায়ে হাঁটা ধরলো।

--" এই তিহু দাঁড়া। আমার সাথে যাস।"

ইরফানের কথায় মাথা নাড়িয়ে দাঁড়ায় তিহু।

--" শুন তিহু তুই আমার পেছনে পেছনে আসবি। এই ধর ছোটো বেলায় রেলগাড়ি খেলতাম যে আমরা কিছুটা তেমন করে। যাতে আমার পিঠের রক্ত না বোঝা যায়।"

--" বড় আম্মুর , মা , বা মামনি কেউ যদি জিজ্ঞেস করে এমন ভাবে আসছি কেন?"

--" সেটা আমি বলবো। তুই বোকা মুখ খুলবি না।"

------------

ইরফান - তিহু সদর দরজা পেরিয়ে সিঁড়ির কাছে যেতেই আয়েশা বেগম ডাক দিলেন।

--" কিরে তোরা দু'ভাই বোন একসাথে ফিরলি যে? তিহু না কলেজে গেছে।"

--" একটা কাজে বাহিরে গিয়েছিলাম। আসার সময় তিহুকে কলেজ থেকে নিয়ে এসেছি।"

--" ওহ ..... তা এভাবে হাঁটছিস কেন দুজনে?"

--" অনেক দিন রেলগাড়ি রেলগাড়ি খেলি না। তাই আরকি দুজনে একটু প্র্যাকটিস করছিলাম। তাই না তিহু?"

ডান হাতে তিহুকে নিজের সাথে জড়িয়ে চোখে ইশারা করে ইরফান। ইরফানের সাথে তাল মেলালো তিহুও।

--" জ্বি জ্বি মামুনি।"

--" ছোটা আপা তুমি ও না ওই পাগল দুটোর কথা শুনছো কেন এতো মনোযোগ দিয়ে। দেখ গিয়ে মাথায় আবার কোনো নতুন ভূত চেপেছে।"

--" আম্মু......"

--" থাক না মেঘা। ছেলে মেয়ে গুলো ভালো থাকলেই তো আমাদের শান্তি। দুটো তো বাড়ি ছেড়েছে। একজনের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন ওরা তিনজনই তো আছে শুধু ।"

--" তোমরা কথা বলো আমরা গেলাম।"

কথা শেষ করে আগের মতো করে আবার হাঁটা দেয় তারা। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই সস্হির থম পেললো ইরফান।

ইরফান কে দাঁড়াতে দেখে নিজের ঘরে যেতে নেয় তিহু। ভ্রু কুঁচকে তিহুর গতিবিধি লক্ষ্য করছে ইরফান। কোথায় যাচ্ছে এই মেয়ে। তার তো তাকে পিটে ব্যান্ডেজ করে দেওয়ার কথা ছিলো। এইটুকু সময়েই ভুলে গেছে?

বড় পায়ে এগিয়ে গিয়ে তিহুর কাঁধের ব্যাগ খামছে ধরে ইরফান। ব্যাগটা ধরে টানতে টানতে তিহুকে তার ঘরে নিয়ে যায়। রুমের দরজা লক করে তারপর ছাড়লো ব্যাগ টা।

--" এখানে আনলেন কেন?"

--" বাসর সারতে।"

কথা শেষে তিহুর আরেকটু কাছে ঘেঁষে ইরফান। তা দেখে দুপা পিছিয়ে যায় তিহু। ইরফান আরেকটু আগালো। তিহু পিছনে যেতেই ওয়ারড্রবের সাথে ধাক্কা খেলো। ভয়ে ধরধর করে খামছে তিহু। ঘেমে নেয়ে এক অবস্থা ফোঁটা ফোঁটা ঘাম কপাল বেয়ে গলায় এসে নামছে। গোলাপের পাপড়ির নেয় মসৃণ ওষ্ঠ জোড়া তিরতির করে কাঁপছে তিহুর। পরণের কলেজ ড্রেসটা খামছে নেয় দুহাতে।

তিহুর কাঁপাকাঁপিতে ঢোক গিলে ইরফান। তার কাঁপছে তার। এতক্ষণ খিচেঁ ধরা পিটের ব্যথা টাও এখন উধাও। ইরফান মুচকি মুচকি হাসছে। ঠোঁটের কোণে এক দুষ্টু হাসি। যেনো সর্বনাশের ধারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তারা।

Story Cover