দুসপ্তাহ হয়েছে আবরার-ইনায়ার বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার। এর মধ্যে সবার সাথে ওদের কথা হলেও আশতাফ চোধুরির সাথে হয়নি।
রিমঝিমের আবেদন করা অফিসের ইন্টারভিউতে সিলেক্ট হয়েছে আবরার। প্রাইভেট কোম্পানি। নতুন জয়েন অনুযায়ী বেতন মোটামুটি ঠিক আছে।
প্রতিমাসে বিশ হাজার করে বেতন। ছয়মাস যাওয়ার পর কাজের মান অনুযায়ী বেতন বাড়বে। এই সংকটে বিশ হাজার টাকাও অনেক মূল্যবান আবরারের কাছে। ইনায়াকে টেস্ট পরীক্ষাটাও দেওয়াতে হবে। তারপর বেতন রেজিস্ট্রেশন হয়ে গেলে বাকি টাকায় ভালো ভাবেই তাদের সংসার চলে যাবে।
প্রতিদিন অফিসে যাওয়ার আগে ইনায়ার সাথে সকালের নাশতার কাজে সাহায্য করে সে। তারপর একসাথে নাশতা সেরে অফিসে যায় আবরার।
অফিসে যাওয়ার আগে দরজাতে বাহির থেকে তালা দিয়ে তারপর অফিসে যায় আবরার। তা এ কয়দিনে অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে ইনায়ার।
রান্নাঘরে কোমরে শাড়ির আচঁল গুঁজে রুটি বেলছে ইনায়া। সকাল থেকে গুড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। তার মধ্যে ইলেকট্রিসিটি নেই। এখন বাজে সকাল আটটা। নয়টার মধ্যেই অফিসের উদ্দেশ্যে বেরোতে হবে আবরারকে।
শাওয়ার নিচ্ছে আবরার। তার মধ্যেই নাশতা বানানো শেষ করতে হবে ইনায়াকে। প্রথম চুলোতে ইনায়া আলু ভাজি বসিয়েছে। তা প্রায় হয়ে এসেছে। অপর চুলায় চায়ের পানি ফুটতে শুরু করেছে। পানিতে চা পাতা দিয়ে ভাজিটা নামিয়ে রুটি সেঁকতে বসালো ইনায়া।
এইটুকু সময়ের মধ্যেই ডাক দিলো আবরার। চুলার আচঁ কমিয়ে ঘরে ছুটলো সে।
--" অন্বিতা ..... এইইই অন্বি।"
--" বলেন বলেন আবরার ভাই। কি হয়েছে?"
--" আমার ঘড়িটা কই? অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি পাচ্ছি না।"
বালিশের পাশ থেকে বিরক্তির সাথে আবরারের ঘড়িটা নিয়ে আবরার কে দিলো ইনায়া। ঘড়িটা দিয়ে অভিযোগের কন্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে সে
--" আপনি দিন দিন বড্ড অলস হয়ে যাচ্ছেন আবরার ভাই। বাড়িতে থাকতে তো নিজের কোনো জিনিসে কখনো হাত লাগাতে দেন নি।"
ইনায়ার অভিযোগ শুনে মিটমিটিয়ে হাসে আবরার। কি ভালো লাগছে তার। তার বউ রাগ করছে , অভিযোগ করছে। মানে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরছে ইনায়া। ইনায়াকে আরেকটু রাগাতে উতলা হয়ে উঠে আবরারের মনপ্রাণ। কোনো উত্তর না দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় সে। তার পেছন পেছন অগ্রসর হয় ইনায়া। তা দেখেও না দেখার বান করে চুলে ব্যাকব্রাশ করছে আবরার।
নিজেকে রাগে নিয়ন্ত্রণ হারায় ইনায়া। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে নিজের দিকে ফেরায় আবরার কে। ঘুরিয়ে পায়ের দু আঙুলে ভরদিয়ে এলো মেলো করে দিলো আবরারের ব্রাশ করা চুল গুলো। মনে মনে হাসে আবরার। আয়নাতে তাকিয়ে আরেকবার ব্রাশ করলো চুল গুলো। এবার সহ্যর সর্বোচ্চ সীমা পেরিয়ে যায় ইনায়া।
আবরার কে না ঘুরিয়ে নিজে ঘুরে এসে দাঁড়ায় আবরারের সামনে। চুল গুলো অগোছালো করতে পা উঁচু করতেই পানিতে পিছলে পড়তে পড়তে আবরারের শার্টটা ধরে বেঁচে গেলো ইনায়া। ইনায়ার টেনে ধরা শার্টের বুকে অংশে চির চির শব্দ হতেই তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলো শার্টটা। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে এখানেই আবরারের শার্টটা ছিঁড়ে গেছে। সাদা শার্টটার বুকের মাঝবরাবর আড়াআড়ি ভাবে ছিঁড়েছে। ইনায়ার টানের ভার সইতে না পেরে অকালেই প্রাণ হারায় শার্ট টা।
তা দেখে বৌকা বোকা হাসলো ইনায়া। কি করবে ভেবে না পেয়ে হাত মুচড়া মুচড়ি শুরু করলো।
--" হি হি ..... ঘড়ি তো পেয়ে গেছেন। এবার আমি গেলাম । চুলোতে রুটি পুড়ে গেছে মনে হয়।"
--" এই দাঁড়া।"
--" না না এখন দাঁড়ালে চলবে না। অনেক কাজ পরে দেখা হবে টা টা।"
একদমে কথাগুলো বলে রান্নাঘরে ছুটলো ইনায়া। তার যাওয়ার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে আবরার। --" তার কিছুই বলার নেই এই মেয়ে।
ইনায়া যেতেই কপাল চাপড়ায় আবরার।
--"কোন কুক্ষণে এই মেয়ে কে সে ডাকতে গেলো। আজ আর অফিসে যাওয়া লাগবে না। দুটো সাদা শার্ট ছিলো ! একটা ধুতে দিয়েছে। অপরটা ছিড়ে গেলো। কি কপাল তার। বিয়ে করে বউয়ের ভালোবাসার ফিল কম বাচ্চার ফিল বেশি পাচ্ছে।"
দৌড়ে রান্নাঘরে আসতেই আরেকবার বাজ পড়ে ইনায়ার মাথায়। রুটি পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। জলদি তাওয়া টা নামিয়ে রুটিটা ফেলে দিলো জানালা দিয়ে। বাকি রুটি গুলো বেলে ছ্যাঁকে নিলো।
রুমে এসে ছেঁড়া শার্ট টা পাল্টে নিয়েছে আবরার। র্টি - শার্ট টা পরেই ফোন টা হাতে নিলো। অফিসের মেইলে একটা ছুটির ই-মেইল লিখে পাঠিয়ে দিলো সে। কাজ শেষে ফোনটা বালিশের পাশে ছুঁড়ে মারলো।
-------------
কিচেনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কাজ করছে আবরার-ইনায়া। আবরার মাছ কাটছে আর ইনায়া রান্নার সবজি গুলো। আবরারের মাছ কাটা প্রায় শেষের দিকে।
--" আবরার ভাইইইইই।"
হঠাৎ ইনায়ার ধাক্কা আর চিৎকারে ভ্যাবাচ্যাকা খেলো আবরার। কপাল কুঁচকে তার দিকে তাকাতেই ছোটো একটা সবজির পোকা দেখালো ইনায়া।
--" এই ছোট্ট পোকাকে এত ভয় পাওয়ার কি আছে?"
--" জানি না ফেলে দাও ওটা। আমার ভয় করছে ইইইইই।"
চপিং বোর্ডে চুরি টা রেখে হাত ধুয়ে নিলো আবরার। হাত ধুয়ে বা হাতে সবজির পোকা সহ সবজি টা ডাস্টবিনে ফেলে দিলো। এদিক ওদিক তাকাতেই আবরারের হাতে চোখ পড়লো ইনায়ার। ডান হাতের মাঝের আঙুল থেকে রক্ত ঝরছে।
--" আল্লাহ্ .... আবরার ভাই আপনার আঙুল কেটে গেছে। আল্লাহ্ রক্ত বের হচ্ছে তো।"
--" সমস্যা নেই। অভ্যাস আছে।"
আবরারের উত্তরে মন ভরলো না ইনায়ার। নিজের আঁচলে হাত মুছতে নিতেই আত্মা শুকিয়ে আসে আবরারের। এই মেয়ে কি এখন সিনেমার মতো নিজের শাড়ি ছিঁড়ে তার আঙুলে বেঁধে দিবে নাকি?
--" এইই তুই কি নিজেকে নাইকা মনে করিস? ভুলেও যদি শাড়ি ছিঁড়িস তোর একদিন কি আমার!"
--" কে বলেছে আপনাকে যে আমি শাড়ির আচঁল ছিড়বো?"
--" তাহলে আচঁল ধরেছিস কেন? ছাড় ছেড়ে দে আচঁল টা।"
--" আমি নাইকা না মানলাম ! আপনি নায়ক নাকি যে আপনার হাত কাটার দুঃখে আমি শাড়ির আচঁল ছিড়ে ফেলবো?"
--" তা তোর মোটা মাথায় ঠুকবে না। আমি নায়ক নাকি ভিলেন!ওয়ারড্রবের প্রথম ড্রয়ারে ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ আছে গিয়ে নিয়ে আয়।"