সে আমার পূর্ণতা

পর্ব - ২৫

🟢

দুপুরে একসাথে বের হয়েছিলো আবরার ইনায়া। পাশে একটা হোটেল থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে তারপর বাকি জিনিসগুলো কেনার উদ্দেশ্যে বাজারে যায়। তাদের বাসা থেকে বাজারের দূরত্ব মিনিট চল্লিশের।

কেনাকাটা শেষে এখন ফিরছে দুজনে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। কর্মব্যস্ত শহরের মানুষ গুলো কর্মক্ষেএ থেকে একে একে বাড়ি ফিরছে। কারো প্রতি কারো খেয়াল নেই। যে যার কাজে ব্যস্ত। কেউ নিজস্ব যানবাহনে ফিরছে তো কেউ রিকশা , সিএনজি করে।

এতো যানবাহন একসাথে চলাচলের দরুণ যানজট বেঁধেছে রাস্তায়। আধঘন্টা ধরে এক জায়গায় রিকশা থেমে। মিনিট দশেক পর পর এক ইন্ঞি করে সামনে এগোচ্ছে। তো আবার থেমে যাচ্ছে । ভ্যাপসা গরমে ছন্নছাড়া প্রকৃতি। গাছের পাতা গুলোর কোনো নড়চড় নেই। যানজটে পড়ে অস্হির জনজীবন। বসে থাকতে থাকতে কোমর ব্যথা হয়ে গেছে আবরার - ইনায়ার। ইনায়ার সিল্কের শাড়িটা ঘামে চুপচুপে আছে। আবরারের পরণের কালো র্টি-শার্ট টা ভিজে গেছে।

দুজনের দুহাতে হাড়ি-পাতিল , বালিশ , বিছানা কাভার সহ আর কিছু টুকিটাকি জিনিস। আবরার আড়চোখে ইনায়াকে দেখে। যেকিনা শাড়ির আঁচল টা টেনে - টুনে মাথায় দিচ্ছে। লাল শাড়িটাতে সত্যিই ইনায়াকে বউ বউ লাগছে। বউ ,,,, শব্দটা নিজের মনে মনে কয়েকবার উচ্চারণ করে আবরার। তার বউ ইশশশ ভাবতেই কি ভালো লাগছে আবরারের।

ইনায়ার নাকের একরত্তির একটা নাকফুল ; গলা খালি। হাতে আজ বিকেলে আবরারের কিনে দেওয়া সোনালি চুড়ি জোড়া। কাঁচা হলুদে রঙের শরীরে সোনালী চুড়ি জোড়া যেনো আরো একধাপ সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে ইনায়ার হাতের। সতেরো পেরিয়ে কয়েকদিন পর আঠারোতে পা দেবে মেয়ে টা। কিন্তু শাড়ি পরায় তাকে এখন মোটেই ছোটো লাগছে না। কি মিষ্টি লাগছে।

--" খিদে লাগছে তোর অন্বি?"

--" না।"

--" বিরক্ত লাগছে?"

--" না।"

--" তাহলে মন খারাপ ? বাড়ির কথা মনে পড়ছে।"

এত্তক্ষণ রাস্তায় জ্বলা রং বেরঙের বাতি গুলো দেখা থেকে চোখ ফিরিয়ে আবরারের দিকে শান্ত চোখে তাকায় ইনায়া। আবরারকে ধাতস্থ করে বললো।

--" না , বসে থাকতে থাকতে শুধু একটু কোমর ব্যথা করছে। আর কতক্ষণ লাগবে আবরার ভাই।"

--" দশ মি...

আবরারের কথা শেষ করার আগেই রিকশা টা চলতে শুরু করলো। রিকশা চলতেই ঠান্ডা বাতাস এসে শরীর জুড়িয়ে দেয়। আগের থেকে এখন কিছুটা গরম কমে এসেছে। মন ফুরফুরে হয়ে ওঠে ইনায়ার। রিকশা করে ঘুরাটা তার অনেক দিনের ইচ্ছে তার। বেশ কয়েকবার মাকে জানিয়েছিলো ও সে। কিন্তু আয়েশা বেগম নাকোচ করে দিয়েছিলেন।

দূর থেকে শ্যাওলা পড়া তিনতলা বিশিষ্ট বাড়িটা চোখে পড়তেই আনন্দে নেচে উঠে ইনায়ার মন। খুশির তোপে রিকশা না থামতেই লাফ দেয় ইনায়া। আবরার তাদেখে ইনায়াকে ধরতে যাওয়ার আগেই পড়ে যায় ইনায়া। ফলস্বরূপ পা মুচকে পড়ে গেছে তার।

ইনায়াকে পড়তে দেখে তাড়াহুড়ো করে জিনিসগুলো নামায় আবরার। বামহাতে জিনিসগুলো নিচে রেখে। ডান হাতে রিকশাওয়ালা মামার ভাড়া মিটিয়ে ঘুরে এসে ইনায়াকে ধরে সে।

বিরক্ততে মুখ তিতে হয়ে উঠে আবরারের। মনে মনে নিজেকেই দোষারোপ করে আবরার। তার আগেই বোঝা উচিত ছিলো একটুলাই দিলেই মেয়েটা মাথায় উঠে যাবে। মুখ গম্ভীর করে কটা কঠিন কথা শুনাতে নেয় কিন্তু ইনায়ার চিৎকার সেটাও পারলো না আবরার।

--" আহহহহ "

--" কে বলেছিলো তোকে রিকশা থেকে লাফ দিতে? যেকিনা শুকনো জায়গাতে দিনে দশবার পড়ে । তিনি এসেছেন চলন্ত রিকশা থেকে লাফ দিতে।"

--" প্রথম কথা হলো রিকশা থামার পরেই পা বাড়িয়েছি। দ্বিতীয় কথা আমি লাফ দেইনি।"

--" বেশি কথা না বলে আমার ঘাড়ে হাত দিয়ে উঠার চেষ্টা কর বেয়াদব মহিলা।"

--" আমাকে মহিলা বলছেন কোন দুঃখে?"

--" বেশি কথা বললে তোকে রাস্তায় ফেলে আমি বাসায় চলে যাবো কিন্তু!"

ধমক খেয়ে কাঁপা কাঁপা হাত আবরারে ঘাড়ে হাত রাখে ইনায়া। ইনায়া হাত রাখতেই তাকে কোলে তুলে নিলো আবরার। হঠাৎ কোলে নেওয়াতে কেঁপে ওঠে ইনায়ার সারা শরীর। ঢাল সামলাতে না পেরে পড়তে পড়তে খামছে ধরে আবরারের বুকের র্টি-শার্টটা। ইনায়াকে কোলে তুলে হাঁটা শুরু করে আবরার। বেলিফুলের গাছটার কাছে এসে থামে আবরার দুপা। ইনায়ার পিঠের পেছন থেকে হাতটা সরিয়ে বেলিফুল গাছ থেকে কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে ইনায়ার হাতে ধরিয়ে দিলো।

আবরারদের ফ্ল্যাটের সামনে আসতেই নামতে যায় ইনায়া। কিন্তু তাকে নামতে না দিয়ে পকেট হাতড়ে চাবিটা বের করে ইনায়ার হাতে দিয়ে দরজা খুলতে ইশারা করে আবরার। কয়েকবারের চেষ্টার পর তালা খুলতে সক্ষম হয় ইনায়া। তার মধ্যেই বেজে উঠল আবরারের ফোন। ইনায়াকে দরজার সাথে ঢেল দিয়ে দাঁড় করিয়ে ফোন রিসিভ করে কানে ধরে আবরার।

কথা শেষে কলটা কেটে দেয় আবরার। দোকানে কিনে রাখা ফার্নিচার গুলো চলে এসেছে।

--" তুই কিচেনে গিয়ে দাঁড়া। আর ঘোমটা টা টেনে রাখবি। এদিকে ভুলেও পা বাড়াবি না। আমি নিচে যাচ্ছি।"

-----------

মাহমুদা বেগম তিহুর চুলে চুমু খেয়ে মাথা মুছে প্লেট গুলো গুছিয়ে কিচেনে চলে যায়। সবাই যেতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে দেয় তিহু। বেসিনে হাত ধুতে থাকা ইরফানে কানে লাগে তার ফুঁপিয়ে করা কান্নার আওয়াজ। কাঁদতে কাঁদতে প্লেট হাত ধুয়ে উপরে চলে যায় তিহু।

টলমলে চোখে দৌড়াতে গিয়ে সিঁড়িতে হোঁচট খেল। পড়তে পড়তে বেঁচে যায় তিহু। হোঁচট খেয়ে পড়ার আগেই ইরফান পেছনে থেকে দুহাতে পেঁচিয়ে ধরে তিহুর কোমর। ইরফানের শীতল দুহাতের স্পশে কেঁপে ওঠে তিহু। চোখের পানি মুছে ইরফানের দিকে তাকায় তিহু।

যেকিনা বর্তমানে তিহুর চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে। কেঁদে কেটে চোখ মুখ ফুলে লাল হয়ে আছে তিহুর। দু'চোখে এখনো পানিতে টলমল করছে। একটু হাওয়া এলেই যেনো গড়িয়ে পড়বে পানির ফোঁটা গুলো। ইরফান হালকা ফু দিলো তিহুর মুখে। হাওয়া পেতেই জমে থাকা পানি ফোঁটা গুলো ঝরঝর করে গড়িয়ে পড়লো তিহুর গাল বেয়ে। নিষ্ফলক চোখে তা উপভোগ করে ইরফান।

ইরফানের অবাধ্য মনস্কামনা গুলো জেগে উঠে। ইচ্ছে করে কামড়ে খেয়ে ফেলতে তিহুকে। বিশেষ করে লাল হয়ে থাকা গাল দুটো। তার কাছে তিহুর মুখটাকে ঠিক পাঁকা টমেটোর মতোই ঠেকছে। যেনো একটু চাপ দিলেই ভর্তা হয়ে যাবে। আর ইরফান তা এক প্লেট ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত দিয়ে তৃপ্তি সহকারে খেয়ে ফেলবে। ইরফানের দৃষ্টি বুঝতে পেরে চোখ সরিয়ে নেয় তিহু। আস্তে করে ইরফানের বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তিহুকে দাঁড়াতে দেখে ছেড়ে দেয় ইরফান। ইরফান থেকে ছাড়া পেয়ে দৌড়ে পালায় তিহু।

পেছনে রেখে গেলো একজোড়া কাতর চক্ষু। নির্নিমেষ চেয়েরয় সেই দুচোখ। কাল রাতের পর থেকে মেয়েটা তার সাথে ঠিক মতো একটু কথাও বলছে না। দেখা হলেও এড়িয়ে গিয়েছে।

Story Cover