দুপুর একটা বাজে। চারদিকের প্রকৃতিতে শান্তির ছিটেফোঁটা নেই। সকাল থেকে সূর্য তেজ নিয়ে মাথার উপর উঠেছিলো। এখন দুপুরে তার তাপ দ্বিগুণ হয়েছে। হালকা বাতাস থাকলেও শরীরে লাগার আগেই রোদের তাপে তা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
কড়া রোদে ঢালাই করা রাস্তা গুলো তেতে আছে। জুতো সহ হাঁটতেই কষ্ট সাধ্যি। গাড়ি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কলেজ থেকে হেঁটে বাড়ি ফিরছে তিহু। দুপুরের মধ্য ভাগ হওয়াতে রিকশা - সিএনজি গুলো ও উল্টো পথে যেতে রাজি হচ্ছে না। অগত্যা না দাঁড়িয়ে থেকে রাস্তার পাশ ধরে হাঁটা দেয় সে।
ছিমছাম গড়নের তিহুর গায়ে জড়ানো আকাশি রঙের কলেজ ড্রেস টা রোদ পড়ে চিক চিক করছে। চুল গুলোতে খোঁপা করা। চোখে - মুখে লেপ্টে আছে একরাশ বিরক্তি। রোদের তোপে চোখ খোলাও দায়। কয়েকবার চোখ পিট পিট করে আবার চোখ খোলে তিহু।
দুপুরের সময় হওয়াতে চারপাশে জনমানব নেই বললেই চলে। মোড় ঘুরার আগে যে কজন পথচারী ছিলো মোড় ঘুরতে তারা ও এখন নেই।
কিছুটা সামনে তিন চারটা ছেলে বাইকে ঢেল দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কি নিয়ে যেনো কথা বলছে আর হাসছে। ছেলেগুলো কে তিহু চিনে। পাড়ার মোড়ে , গালর্স স্কুল - কলেজের সামনে অনেকবার দেখেছিলো।
চারপাশে আরো একবার চোখ বুলোয় তিহু। আশেপাশে তেমন মানুষ নেই বললেই চলে। মাথার হিজাব টেনে জামা ঠিক করে দ্রুত পায়ে হাঁটা দিলো সে। মনে মনে পড়ছে বড় খতমের দোয়া। কোনো বিপদ যাতে না হয়। ছেলেগুলোর সামনে আসতেই কথা বন্ধ করে পথ আগলে ধরে একটা ছেলে।
তাদের সাথে থাকা লিডারের মতো দেখতে ছেলেটা দু' আঙুলের দ্বারা শিস বাজিয়ে গান ধরলো। কি নোংরা সেই গানের সুর আর কন্ঠ। ঘিন ঘিন করে উঠে তিহুর শরীর। ইচ্ছে করে এক ঘুষিতে ছেলেটার নাক ফাটিয়ে দিতে।
--" উদাস দুপুর বেলা সখি আসবে কি একেলা নদীর ঘাটেতে? দেখতে তোমায় মন চাইছে।"
ছেলেটা পথ আটকাতেই তার দিকে অগ্নি চোখে তাকায় তিহু। তিহুর তাকানো দেখে ছেলেটা ভয় পাওয়ার ভান ধরে বুক চেপে ধরলো।
--" কি ম্যাডাম ? এমন সুন্দর চোখ কি কাউকে ভয় পাওয়াতে পারে বলেন। যদি আপনি হ্যাঁ বলেন তাহলে আমি ডরাইছি।"
ওই ছেলেটার দেখাদেখি বাকি দুজন এসে ছেলেটার পাশে দাঁড়ালো। লিডারের মতো দেখতে ছেলেটা এখনো দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ; হাতে একটা সিগারেট। তিহুর দিকে তাকিয়ে বিচ্ছরি হেসে সিগারেটের আগুনে পোড়া কালো দু ঠোঁটের মাঝে চেপে ধরে সিগারেট টা। সুখটান দিয়ে আবার মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লো সে।
ছেলেগুলো সামনে এসে দাঁড়াতেই অন্তরআত্না কেঁপে ওঠে তিহুর। ছোট্ট শরীরটা বারকয়েক কেঁপে উঠলো। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। প্যানিক আট্যাক হচ্ছে।
সে একা এতোগুলো ছেলের মাঝে কিছুই করতে পারবে না। মারামারি তো না ই ; তাই সে বোকামি তিহু করবে না।চিৎকার করে ও লাভ হবে না। আসে পাশে কেউ নেই যে তিহুকে বাঁচাতে আসবে বা সাহায্য করবে। অগত্যা পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নেয় তিহু। এবার বাইকে ঢেল দেওয়া লাল র্টি-শার্ট পরা ছেলেটা পা দিয়ে সিগারেট টা মাড়িয়ে উঠে এলো। তিহুর সামনে এসে দুহাত দু"পাশে বাড়িয়ে পাখির মতো করে দাঁড়িয়ে পড়লো।
--" এতো তাড়া কিসের সুন্দরী? একটু দাঁড়িয়ে যাও না।"
দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয় তিহু। ছেলেটার রগরগে বলা কথাটা আগুনের ফুলকির মতো লাগে তিহুর শরীরে। সে শক্ত কন্ঠে বললো।
--" অসভ্যতামি বন্ধ করে পথ ছাড়ুন। আমাকে যেতে দিন।"
--" কি বলে রে সান্টু আমি নাকি অসভ্যতামি করেছি? অসভ্যতামির দেখেছো কি সুন্দরী?"
কথাটা বলেই দাঁত বের করে হাসলো ছেলেটা। পাশের ছেলে গুলো খিলখিলিয়ে হেসে উঠে। একটা ছেলে বললো।
--" দিবো তো যেতে। শুধু আমাদের সাথে একটু ওই চিপায় চলো।"
কথা বলতে বলতে ছেলেটা তিহুর বা"হাত চেপে ধরলো। হাতে চাপ লাগতেই হাত টান দেয় তিহু। ছেলেটা আরো জোরে তিহুর হাতটা চেপে ধরলো। পাশে থাকা ছেলেগুলো ছেলেটার আর তিহুর মধ্যকার ধস্তাধস্তি দেখে হাসছে। বেটক্করে ঘড়ির উপর হাত চেপে ধরায় টান লাগে তিহুর রগে। ব্যথায় টনটনিয়ে উঠে হাত।
চোখ খিচেঁ ডান হাত তুলে চড় মারলো তিহু। হঠাৎ নিজের করা কাজে নিজেই হতভম্ব তিহু। গালে চড় লাগায় ঢিলে হয়ে আসে ছেলেটার হাত। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় তিহু। ছেলেগুলোকে দুদিকে ধাক্কা মেরে দৌড় দেয় সে। পেছন থেকে ছেলেগুলো এগোতে নিয়ে ও থেমে গেলো। তা দেখে আরো জোরে পা চালায় তিহু।
চৌধুরি বাড়ির নেমপ্লট টা চোখে পড়তেই থামে তিহু। বুকে হাত দিয়ে নিজেকে স্থির করলো। দুহাতের সাহায্যে মুখের ঘাম আর চোখের পানি মুছে নেয়। বাগান পেরিয়ে দরজা দিয়ে ঢুকতেই ইরফানের মুখোমুখি হয় তিহু।
ফোন স্ক্রল করতে করতে দরজার দিকেই আসছে সে। তিহুর দিকে একবার তাকিয়ে আবার হাঁটা শুরু করে ইরফান। স্বস্তির শ্বাস নেয় তিহু। ইরফানের কাছে ধরা পড়েনি এই অনেক। মনে মনে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করে ব্যাগ রাখতে স্ট্যাডি রুমে গেলো।
-----------
পড়া শেষ করে মাএই স্ট্যাডি রুম থেকে রুমে এসেছে তিহু। ওড়না টা পাশে রেখে চোখের সামনে বা'হাত টা তুলে ধরলো। এখনো ফর্সা হাতে কালসিটে দাগ হয়ে আছে। দুপুরে খাবার সময় ওড়না দিয়ে ঢেকে রেখেছিলো হাতটাকে সে। মা - মামনির চোখে পড়লেই শেষ। এখনো শরীর শিরশির করছে তার। বড্ড কান্না পাচ্ছে ; ইনায়া থাকলে ওর কাছে বলতে পারতো। আজ একসপ্তাহ হতে চললো ইনায়া আবরার বাড়ি ছাড়ার। কিন্তু মনে হচ্ছে কতোদিন ধরে ওদের দেখে না তিহু। তিহুর বুকে চাপা কষ্ট গুলো দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে আসে।
সব কথা এখন নিজের কাছে চেপে রাখতে দম বন্ধ হয়ে আসছে তিহুর। এমন কালো স্মৃতি তার জীবনে নেই বললেই চলে। হঠাৎ এমন খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ে দুপুর থেকে বহু কষ্টে নিজেকে সামলেছে সে।
তিহুর ভাবনার মাঝেই নিচ থেকে মায়ের গলা পায়। ঘাগড়া টা ঠিক করে ওড়নাটা সুন্দর করে মাথায় পরে হাত পেঁচিয়ে নিলো। নিচে এসে ইরফানের সামনা সামনি চেয়ারে বসে পড়ে তিহু। তাসপিরা আজ সকালে চলে গেছে। আশতাফ চোধুরিরাও ব্যবসার কাজে বাড়িতে নেই। আশতাফ চৌধুরি রাজশাহী গেছে। আশরাফ চৌধুরি আর আফতাব চোধুরি গাজীপুর গিয়েছেন। তাই বাড়িটা আজ ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
বাড়িতে মানুষ কম থাকায় সবাই একসাথে খেতে বসে পড়ে। তিনজা খাবার খাচ্ছেন আর নিত্যদিনের সংসারের গল্প করছেন। ইরফান মনোযোগ দিয়ে নিজের খাবার খাচ্ছে। তার এই দিকে মন নেই। খাবার ফাঁকে ফাঁকে কয়েকবার চোখ তুলে তিহুকে দেখেছে। মেয়েটার চোখ গুলো ফুলে লাল হয়ে আছে। দুপুরে কলেজ থেকে আসার পর থেকে ইরফান লক্ষ্য করেছে তিহু চুপচাপ হয়ে আছে। এমনকি সন্ধ্যায় নাশতাও করেনি মেয়ে টা। খটকা লাগে তার। তবুও কিছু না বলে নিজের খাবার খাচ্ছে ইরফান।
গলায় খাবার আটকে যাওয়াতে কেঁশে উঠে তিহু। চট জলদি তার দিকে পানি এগিয়ে দেন মাহমুদা বেগম। বা হাত বাড়িয়ে গ্লাস টা নিতে গেলে হাত থেকে ওড়নার বাঁধন টা খুলে গিয়ে দাগ টা স্পষ্ট হয়। কালসিটে দাগটা চোখে পড়তেই হায় করে উঠেন মাহমুদা বেগম।
--" কিরে আম্মু হাতে ব্যথা পেলি কি করে? কতবার বলি সাবধানে চলেফেরা করবি! হাতে কি হয়েছে তোর?"
ওনার কথায় সবাই চোখ আটকায় তিহুর হাতে। ফোন স্ক্রল করা রেখে গভীর নেত্রে তিহুর হাতটা পর্যবেক্ষণ করে ইরফান। মাহমুদা বেগমের সাথে যোগ হোন আয়েশা বেগম। মেঘা বেগম উঠে এসে বামহাতে কান টেনে ধরে তিহুর। মায়ের হাতের কানটানা খেয়ে হাতের ব্যথা আর মনের ব্যথায় গলা রোধ হয়ে আসে তিহু। চোখের দিকে তাকিয়েই তিহুর মনের কথা পড়ে নেয় ইরফান। থমথমে মুখে গম্ভীর গলায় মেঘা বেগমকে উদ্দেশ্যে করে বললো:
--" কাকিমনি আগে শুনো কি হয়েছে। তারপর না হয় কান টা টেনো। এখন ছাড়ো ও কে বলতে দাও কি হয়েছে।"
ইরফানের কথায় থতমত খেয়ে তিহুর কানটা ছেড়ে দেন মেঘা বেগম।কোনো রকমে নিজেকে সামলে নেয়। ঢোক গিলে মনে মনে কথা সাজায়।
--" শাওয়ার জেল এ ফিচলে পড়ে গিয়েছিলাম বড় আম্মু - মামনি। এতো টেনশন করো না। আমি ঠিক আছি।"
--" দেখেছেন ভাবি! এই মেয়ে কে আমি বারবার বলি দিংগীপনা ছেড়ে ভদ্র হতে। আমার কথা শুনবেন কেন উনি? আমি কোথাকার কে।"
বকতে বকতে রান্না ঘরে চলে যান মেঘা। ওনার পিছু পিছু আয়েশা বেগম ও গেলেন জা কে ঠান্ডা করতে। ইরফান শান্ত চোখে কিছুক্ষণ তিহুর দিকে তাকিয়ে হাত ধুতে উঠে যায়। মনে মনে তিহুর বলা কথা গুলো ভাবে ইরফান। তার কেন যেনো বিশ্বাস হচ্ছে না তিহুর কথা গুলো। যাইহোক সবার আড়ালে ওকে চেপে ধরে সত্যিটা সে জেনে নিবে ব্যাপার না।
মাহমুদা বেগম তিহুর চুলে চুমু খেয়ে মাথা মুছে প্লেট গুলো গুছিয়ে কিচেনে চলে যায়। সবাই যেতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে দেয় তিহু। বেসিনে হাত ধুতে থাকা ইরফানে কানে লাগে তার ফুঁপিয়ে করা কান্নার আওয়াজ। কাঁদতে কাঁদতে প্লেট হাত ধুয়ে উপরে চলে যায় তিহু।