চাঁদের আলো - আঁধারিতে ছাদের মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে আছে এক পুরুষ অবয়ব। ট্রাউজারের পকেটে দুহাত রাখা। পরণে সাদা টি-শার্ট। চোখে কাঁচের চারকোণ ফ্রেমের চশমা।
তার দৃষ্টি ওই দূর আকাশে আবদ্ধ। মুখে গম্ভীরতার ছাপ স্পষ্ট। পেছনে এসে দাঁড়ালো এক নারী অবয়ব।
মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে ইরফানের পেছনে এসে দাঁড়ালো তিহু। তিহুর উপস্থিতি টের পেয়ে ও আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে ইরফান।
তখন হাত ধুয়ে নিজের রুমে চলে যায় তিহু। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর বন্ধ রুম থম আটকে আসায় বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় তিহু।
তিহু বারান্দায় দাঁড়ানোর কিছুক্ষণ পর তার ঘরে আসে ইরফান। তাকে ছাদে যেতে বলে চলে যায় সে। তারপর এতক্ষণ অপেক্ষা শেষে মা - মামনির চোখ ফাঁকি দিয়ে ছাদে আসায় সফল হয়েছে তিহু।
তার এই নীরবতা ভয় ধরিয়ে দিচ্ছে তিহুর মনে। ইরফান যখন কোনো কারণ নিয়ে খুব বেশি রেগে যায় তখন এমন চুপ হয়ে যায়। ইরফানের নির্লিপ্ততা ভাব দেখে তিহু এগিয়ে গিয়ে তার পাশে দাঁড়ায়।
--" ইরফান ভাই?"
--" দেখুন .... ওই ছেলেটার সাথে আমি একটা বার ও আগ বাড়িয়ে কথা বলিনি ! এমনকি আম্মু না বললে তখন মাছের বাটিটা এগিয়ে দিতাম না।"
--" আচ্ছা ।"
--" আপ.... আপনি শুধু শুধু রা..."
তিহু পুরো কথা শেষ করার আগেই ইরফান পেছনে যায়। তিহুকে উল্টো ঘুরিয়ে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে ইরফান। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠে তিহু। হাত ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা চালায়। তাকে বুকের সাথে চেপে ধরে নীরবতা ভাঙে ইরফান।
--" শুধু শুধু রাগ করছি? সত্যিই তোমার এটা মনে হচ্ছে যে আমি শুধু শুধু রাগ করছি? ওই বার্স্টাড টা তোমার হাত ধরেছে তেহজিব!যেই হাত শুধু আমার ধরার কথা।"
--" লা....লাগছে ইরফান ভাই। ছা....ছাড়ুন।"
--" আমি ছুঁলেই তোর লাগে তাই না ? কই ওই বার্স্টাড যখন তোর আঙুল ছুঁয়ে ছিলো তখন তো কিছু বলিস নি।"
কথা গুলো বলেই আরো জোরে তিহুর হাতটা চেপে ধরে ইরফান। ইরফানের বলিষ্ঠ হাতের চাপে তিহুর হাতের হাড় গুলো ভেঙে যাওয়ার উপক্রম। কিছুতেই ছাড়ছে না ইরফান। আর সহ্য করতে না পেরে কেঁদে উঠে তিহু।
--" আপনার এমন বেপরোয়া আচরণে আমি ক্লান্ত ইরফান। মুক্তি দিন আমাকে!"
তিহুর কথায় ইরফানের হাতের বাঁধন ছুটে যায়। ইরফানের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে হাত ধরে মেঝেতে বসে পড়ে তিহু। ভীষণ জ্বালা করছে তার হাত। আরেকটু হলেই ভেঙে যেতো বোধহয়।
তিহুর হাত দু'পা পিছিয়ে যায় ইরফান। দুহাতের তালুতে মুখ ঢেকে উপর নিচ কয়েকবার ঘষে নেয়। মুখ থেকে হাত নামাতেই মাথা ঘুরিয়ে উঠে ইরফানের। মাথা চেপে তিহুর পাশে মেঝেতে বসে পড়লো সে।
ইরফান কে বসতে দেখেই তিহুর পৃথিবী ঘুরে উঠে। নিজের ব্যথা ভুলে হামাগুড়ি দিয়ে ইরফানের পাশে এসে বসে। ইরফানের মাথা চেপে ধরা দুহাত টেনে নিজের সামনে আনতেই বুক ধড়ফড় করে উঠে তিহুর।
--" র*ক্ত! না না ,,,, আল্লাহ্ এ আমি কি বলে ফেললাম। ইরফান ভাই ? এই ইরফান ভাই কথা বলুন।"
নাক দিয়ে র*ক্ত ঝরছে ইরফানের। নিজের মধ্যে নেই সে। তিহুর কথায় ইরফানের প্যানিক আট্যাক হয়েছে। অতিরিক্ত চিন্তা বা কষ্ট ফেলে ইরফানের প্যানিক আট্যাক হয়। পরিবারের সবাই তা জানে। তখন মাথা ঠিক থাকে না তার। উন্মাদের মতো আচরণ করে ইরফান।
------------
মেঝেতে যথেষ্ট দূরত্ব রেখে পাশাপাশি শুয়ে আছে আবরার ইনায়া। রুমের জানালা গুলো খোলা। ভ্যাপসা গরমে ঘুম আসছে না কারোই।
চাঁদের হালকা আলো আর বেলিফুলের সুভাষের রুমটাকে আবরারের কাছে এক রহস্যময় জগত মনে হচ্ছে। যেই জগতের বাসিন্দা শুধু তারা দুজন। অদ্ভুত সুন্দর সেই জগত খানা।
নিজের বাহাতের উপর মাথা রেখে শুয়েছে আবরার। ইনায়ার মাথার নিচে তার ভাঁজ করা শাড়ি গুলো। কপালে হাত ঠেকিয়ে শুয়ে আছে সে।
বাহির থেকে এসে গামছা ভিজিয়ে মেঝে মুছে নিয়েছিলো আবরার। কিছু মনে পড়তেই উঠে বসে সে। তাকে উঠতে দেখে পাশ ফিরে তাকায় ইনায়া।
--" কষ্ট করে উঠ তো অন্বি।"
--" কেন?"
--" উঠ না ! তারপর বলছি।"
আবরারের জোরাজুরিতে উঠে বসে ইনায়া। ইনায়া উঠতেই শাড়ির ব্যাগ টা নিয়ে নেয় আবরার। ব্যাগ টা খুলে শাড়ির ডিজাইনের কাগজ গুলো নিয়ে আবার জায়গা মতো ব্যাগ গুলো রেখে দেয় সে।
--" এবার শুয়ে পড়।"
বিনা বাক্যে শুয়ে পড়ে ইনায়া। তার পাশে আবরার ও শুয়ে পড়লো। কাগজ গুলোকে একসাথে মুড়িয়ে ডান হাতে বাতাস শুরু করে আবরার।
মেঝের হালকা ঠান্ডা আর আবরারের বাতাস করায় কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে ইনায়া।
ইনায়াকে ঘুমিয়ে পড়তে দেখে কাগজ গুলো পাশে রেখে দুজনের মধ্যেকার দূরত্ব কমিয়ে ইনায়াকে নিজের বুকের উপর নিলো আবরার। অপর হাতে শাড়ির ব্যাগ গুলো নিয়ে নিজের মাথার নিচে দিয়ে শক্ত করে ঝাপটে ধরে ইনায়াকে।
অবশেষে নিজের প্রেয়সীকে বুকে নিয়ে শান্তিতে ঘুমের দেশে পাড়ি জমায় আবরার।