সে আমার পূর্ণতা

পর্ব - ২

🟢

দুপুরের কড়া রোদে শরীর জ্বলসে যাওয়ার দশা। প্রয়োজন ছাড়া কেউই এই মূহুর্তে ঘর থেকে বের হয় না । এই গরমেও ফুচকা দোকানে বসে আছে ইনায়া আর ঈশিতা। ক্লাস শেষ হয়েছে মিনিট বিশেক আগে। পুরো ক্লাসে ও মন মরা ছিলো ইনায়া। তা দেখে ঈশিতার ও মন খারাপ হয়ে যায়। তাই ঈশিতা জোর করে ইনায়াকে ধরে ফুচকা খেতে নিয়ে এসেছে। ফুচকা দোকানের ছেলেটাকে ডেকে অর্ডার ও দিয়েছে। এখন দোকানে বসে অপেক্ষা করছে ফুচকার জন্য।

মুখ কালো করে ফুচকা দোকানের পাশে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে চেয়ে আছে ইনায়া। এপ্রিল মাসের এই সময়টা কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া ভুলের জন্যই ইনায়ার ভালো লাগে। পৃথিবীতে এত ফুল থাকতে তার কৃষ্ণচূড়া ফুলটাই ভালো লাগে। যার কারণ এখনো ইনায়ার নিজের ও অজানা। ইনায়াকে অন্যমনস্ক দেখে হালকা ধাক্কা দিলো ঈশিতা। ঈশিতার ধাক্কাতেও ইনায়ার ভাবনার শেষ হলো না। তাই গলা পরিষ্কার করে ইনায়াকে ডাকে ঈশিতা।

--" এই ইনু।"

--" ইনু ! শুনতে পাচ্ছিস?"

ঈশিতার জোর করে দেওয়া ডাকে ধরফরিয়ে উঠে ইনায়া। বুকে হাত দিয়ে তাকায় ঈশিতার দিকে।

--" কি ..... কি হয়েছে?"

--" আগে তুই বল তোর কি হয়েছে!"

ঈশিতার প্রশ্নে আবার মুখে অন্ধকার নামে ইনায়ার। আবরারের মুখটা কল্পনায় ভেসে উঠে। সাথে এটাও ভেসে উঠে যে সে আবরারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আর আবরার তার কানের নিচে থাপ্পড় দিয়ে কান ফুলিয়ে দিয়েছে। নিজের চিন্তা কে একপাশে রেখে ঈশিতাকে বললো।

--" ওইদিন আবরার ভাইকে ফেইক আইডি থেকে নক দিয়েছিলাম।"

--" হ্যাঁ তো? ফেইক আইডি থেকে নক দিয়েছিস তো কি হইছে?"

--" শুধু নক দি নাই। সাথে বেয়াদপ ছেলে বলেছি। এখন কি হবে? আবরার ভাই আমাকে ধরতে পারলে আমার খবর আছে।"

ইনায়ার কথায় চোখ বড় বড় করে ফেলে ঈশিতা। তারপর কপাল কুঁচকে কিছু একটা ভাবলো। এবং সে সমাধান ও পেয়ে গেলো।

--" তুই বাড়ি ফিরে আবরার ভাইয়ার সামনে যাবি না। দু'একদিন না দেখলে কাজের ব্যস্ততায় ভুলে যাবে।"

--" সত্যিই বলছিস? তুই সিউর?"

--" সত্যিই বলছি ভাই। হ্যান্ডেড পার্সেন্ট সিউর।"

ঈশিতার কথায় খানিক শান্ত হয় ইনায়া। নিজেকে কিছুটা সামলে নিলো। মনে মনে পণ করে আর বান্দরামি করবে না সে। প্রমিস!

তাদের কথার মাঝেই ফুচকা নিয়ে আসে ছেলেটা। ফুচকা খাওয়া শেষে টাকা দিয়ে রিকশায় চড়ে বসে দুজনে।

পর্ব-২

বাড়ি ফিরেই নিজের ঘরে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে ইনায়া । আয়েশা বেগম খাওয়ার জন্য ডাকলে পরে খাবে বলায় আর কেউ তাকে বিরক্ত করেনি। ইনায়ার সেই ঘুম ভাঙে মাগরিবের ঠিক আগ মূহুর্তে। ঘুম ভাঙতেই মাথা ব্যথা শুরু হয় তার। হুট হাট মাথা ব্যথার কারণে নিজের উপর নিজেই বিরক্ত ইনায়া। বর্তমানে সে ছাদের দোলনায় বসে আছে। নীল আকাশ দেখছে। পাখিরা আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে। আবার দল ছাড়া হচ্ছে। তা দেখে আপন মনে হাসছে ইনায়া। নিজের মাথা ব্যথার কথাও যেনো বেমালুম ভুলে গেলো সে।

এই দিকে সারা বাড়ি খুঁজে ও তাকে না পেয়ে ছাদে আসে তিহু , আর তাসপি। তাসপি এবার অর্নাস দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে । আর তিহু ইনায়ার সাথে। দুজন বোন কম বান্ধুবী বেশি। চৌধুরি বাড়ির কর্তাদের প্রাণ তাদের মেয়েরা। ইনায়াকে ছাদের দোলনায় বসে থাকতে দেখে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে তারা দু'জনে। এই মেয়ে দু'টোকে নিয়ে আর পারে না তাসপি। তার হয়েছে যতো জ্বালা। নিজেকে সামলে তিহুর সাথে এগিয়ে যায় ইনায়ার পেছনে।

--" কিরে ইনায়া তোকে সেই কখন থেকে খুঁজে মরছি আমরা। আর তুই এখানে।"

কথাটা তাসপি আর তিহু একসাথেই বলে উঠলো । হুট করে কথা বলায় চমকে উঠে ইনায়া। আকাশের দিক থেকে চোখ সরিয়ে পেছনে দাঁড়ানো তাসপি , তিহুর দিকে তাকালো সে। তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইনায়া উত্তর দেয়।

--" ভালো লাগছিলো না তাই ছাদে এসেছিলাম।"

--" আরো কিছুক্ষণ বসবি?"

--" না এখন চল একটু পর আজান দিয়ে দিবে।"

ইনায়ার কথায় আকাশের দিকে তাকালো তাসপি , তিহু। আকাশের রঙ গাড়ো বেগুনী হয়ে এসেছে। বোঝাই যাচ্ছে কিছুক্ষণের মধ্যেই আজান পড়বে।তার কথা মতো তিনজনই ছাদ থেকে নেমে পড়ে। ইনায়া নিজের ঘরে চলে গেলেও তাসপি আর তিহু ড্রয়িং রুমে দিকে যায়।

মা , চাচি কি করছে তা দেখে দুবোন আবার উপরে এসে ওযু করতে গেলো।

-------

চোধুরি তিন গিন্নি মিলে সন্ধ্যার নাস্তা তৈরি করে ট্রি-টেবিলে সাজাচ্ছে। প্রতিদিনের তুলনায় আজ আরো এক দু পদ বেশি। বাড়ির বড় ছেলে আজ সাত দিন পর কাজ সেরে বাড়ি ফিরেছে কিনা তাই।

সন্ধ্যার নাশতার জন্য সবাই নিচে নেমে এসেছে আবরার আর ইনায়া বাদে । আবরারের মা মাহমুদা বেগম ডেকে এসেছে দুজনকে । কিন্তু কারো নামার খবর নেই ।

মাএ রুম থেকে বের হয়েছে আবরার । ডান হাতে ফোন স্ক্রল করতে করতে সিঁড়ি দিকে যাচ্ছিলো । হঠাৎ বুকের সাথে কিছুর ধাক্কা খেয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। নিচে তাকিয়ে দেখে কপালে হাত দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে মেঝেতে বসে আছে ইনায়া। তার আর বুঝতে বাকি নেই যে তার সাথে ধাক্কা খেয়েই বর্তমানে মেঝেতে লুটোপুটি খাচ্ছে ইনায়া। হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে পড়ে চিৎকার দিয়ে উঠে ইনায়া ।

--"চোখ কি হাতে নিয়ে হাঁটেন আবরার ভাই। আমার মতো জলজ্যান্ত একটা মানুষ কে দেখতে পান না। "

ইনায়ার কথায় অবাকে চূড়ান্ত পর্যায়ে আবরার। কারণ ইনায়াই তার ঘর থেকে দৌড়ে বেরোতে গিয়ে আবরারের সাথে ধাক্কা খায়।আবরার অবাক হয়ে বললো;-

--" তুই ছোটাছুটি করে পড়লি! আবার আমাকেই বলছিস আমি অন্ধ? গতবারের চড়টা বোধহয় ভুলে গেছিস তাই না অন্বিতা। বুঝলাম না চড়টাতে কি একটু বেশিই মধু মেশানো ছিলো। যে নিজের শাস্তির পরিমাণ নিজেই সেধে সেধে বাড়াচ্ছিস।"

ইনায়ার পুরো নাম অন্বিতা চৌধুরি ইনায়া। সবাই ইনায়া বলে ডাকলেও আবরার অন্বিতা বলেই ডাকে। মাঝে মধ্যে ভুলে চুকে ইনায়া বলে ডাকা হয় তার।আবরারের কথা গুলোর মানে বুঝতেই ব্রেণের মধ্যে গত পরশুর কথা গুলোর ধাক্কা লাগে ইনায়ার। তার মধ্যে গত পনেরো দিন আগের চড়ের কথা মনে পড়তেই আপনাআপনি গালে হাত চলে যায় ইনায়ার। অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখলে এখনো চড়টার দাগ পাওয়া গেলো ও যেতে পারে। তাই আর বেশি কথা না বাড়িয়ে সুরসুর করে সিঁড়ির দিকে চলে যায় সে। এখন বেশি সেয়ানা সাজতে গিয়ে থাপ্পড় খাওয়ার ইচ্ছে ইনায়ার নেই। তাতে কি তার ও দিন আসবে হুহ। সে কি কম বুদ্ধিমান নাকি থুড়ি বুদ্ধিমতি নাকি। মনে মনে নিজেকে বাহবা দিলো।

Story Cover