সে আমার পূর্ণতা

পর্ব - ১৯

🟢

রাতের খাবার খেতে বসেছে বাড়ির সবাই। আয়েশা বেগম আর মেঘা বেগম সবাইকে খাবার বেড়ে দিচ্ছেন। সায়র আর সিয়ামের জন্য আজ বাহারি রকমের আয়োজন করেছেন তারা। দু'পদের মাংস , তিন পদের মাছ , সবজি , পোলাও। সন্ধ্যা থেকে সব আয়োজন করেছেন তিনজন মিলে।

খাবার টেবিলে সবাই থাকলেও মাহমুদা বেগম নেই। ওনার শরীর খারাপ থাকায় রান্না শেষে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়েছেন।

------------

আশতাফ চোধুরি কর্ণারের চেয়ারটাতে বসেছেন। ওনার দুপাশে দুই ভাই। গম্ভীর মুখে সবাইকে পর্যবক্ষেণ করে খাবারে মনোযোগ দিলেন তিনি।

ওনার দেখা দেখি চুপ করে নিজেদের খাবার খাওয়ায় মনোযোগ দেয় সবাই। আবরার ইনায়া যাওয়ার পর থেকে আরো গম্ভীর হয়ে আছেন আশতাফ চোধুরি। প্রয়োজন ছাড়া একটা শব্দ ও মুখ থেকে গলাচ্ছেন না তিনি।

একমাএ আদরের ছেলে আর নিজের কলিজার টুকরো ইনায়া কে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে তিনি ও ভালো নেই। তা বুঝতে পারছে বাড়ির সবাই। সেদিন রাগের মাথায় ওনার বলে ফেলা কথাটাকে ; সত্যি ধরে বাড়ি থেকে আবরার ইনায়াকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় নিজেকেই দুষছেন তিনি।

সবাইকে এমন চুপ করে খেতে দেখে মুখ কুঁচকে নেয় সায়েম।তার এমন শান্ত পরিবেশ ভালো লাগে না। তাদের বাড়িতে খেতে বসলে সবাই কতো মজা করে।

প্রত্যেকের মুখে একবার করে নজর বুলায় সায়েম। সবার শেষে তিহুর মুখে এসেই নজর আটকায় সায়েমের। তিহুর বরাবর সামনা সামনি বসেছে সে। তার পাশের চেয়ারে তানভীর।

তিহুর পাশের চেয়ারে ইরফান। যেকিনা মাথা নামিয়ে প্লেটের দিকে তাকিয়ে মন দিয়ে নিজের খাবার খাচ্ছে। তার ভাবখানা এমন যেনো আশেপাশে তাকালেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে। মুখ বাঁকায় সায়েম।

মাথা ঝুঁকিয়ে ও ইরফান স্পষ্ট বুঝতে পারছে তিহুর দিকে তাকিয়ে আছে সায়েম। রাগে মাথার ভেতর দপ দপ করছে তার। যখন থেকে এই সায়েম তিহুকে দেখেছে আঠার মতো পেছনে লেগে আছে। শত চেষ্টা করেও পিছু ছাড়াতে পারছে না। তা দেখে রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে তার। কুটুম বাড়ি বলে কিছু বলতেও পারছে না। ছেলেটাকে একদম সহ্য হচ্ছে না ইরফানের।

--" তেহজিব আমাকে মাছের বাটিটা দিন তো!"

সায়েমের কথায় চোখ তুলে তাকায় ইরফান। তিহু নিজের কোল থেকে হাত উঠাতেই নিজের বাম হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নেয় ইরফান। দাঁত চেপে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করে। তারপর বা হাতে তিহুর হাঁটু চেপে ধরে সে। ইরফানের ইরাশায় আবারো নিজের হাত গুটিয়ে নিলো তিহু। চোখ নামিয়ে খাবারে মনোযোগ দেয়।

তিহু কে থামিয়ে মেঘা বেগম কে ডাক দিলো ইরফান। ইরফানের ডাকে ঘাড় ফিরিয়ে তার দিকে তাকায় মেঘা বেগম।

--" মামনি সায়েম কে মাছ দেও। তিহু নিজের খাবার টা তাড়াতাড়ি শেষ কর।"

--" আরে বাবা আমাকে বললেই তো পারতে। দাঁড়া ও আমি তোমাকে মাছ দিচ্ছি।"

ইরফানের কথায় মুখ চুপসে যায় সায়েমের। যতোবার সে তেহজিবের আশেপাশে যেতে চাইছে যতো বার এই ছেলে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটু বেশিই করছে ইরফান। সায়েম হাসে! সে ও দমে যাবার পাএ নয়। দেখবে কতোদূর যায় এই খেলা। নিজের অসন্তোষ ভাব ঢেকে ঘাড় বাঁকায় সায়েম। দুপাশে ঘাড় বাঁকিয়ে উত্তর দেয় ।

--" কিন্তু ইরফান ভাইয়া মাছের বাটিটা তো তেহজিবের সামনে। তাই উনি দিলেই ভালো হতো। শুধু শুধু আন্টি কেন কষ্ট করবেন।"

--" তিহু মাছের বাটিটা এগিয়ে দে তো মা।"

মায়ের কথায় গাইগুই করে সায়েমের দিকে মাছের বাটিটা এগিয়ে ধরে তিহু। বাটিটা হাতে নিতে গিয়ে তিহুর হাতের উপরিভাগ স্পর্শ করে সায়েমের বাহাতের আঙুল গুলো।অস্বস্তিতে জলদি করে হাত সরিয়ে নেয় তিহু।

--" রে রে সরি তেহজীব।"

সায়েমের কথায় অপ্রস্তুত হাসে তিহু। ছেলেটা ইচ্ছে করেই যে তার হাত ধরেছে তা ভালোই বুঝেছে তিহু। বিষয়টা ইরফানের ও বুঝতে সময় লাগে না। নিজের প্লেটটা সামনের দিকে ঠেলে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে ইরফান। এখানে বেশিক্ষণ থাকলে সে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারবে না। ঠান্ডার মাথায় কাজ করা ইরফানের বোকামি করা মানায় না। তা খুব ভালো করেই জানে ইরফান। অযথা ঝামেলা বাড়াতে চায় না সে।

--" কিরে আব্বা এভাবে না খেয়ে উঠে পড়লি যে?"

--" আমার খাওয়া শেষ আম্মু।"

মায়ের প্রশ্নের জবাব দিয়ে কিচেনের পাশের বেসিং এ হাত ধুতে চলে যায় ইরফান। তার যাওয়ার পরপর উঠে পড়ে তিহু।

মেঘা বেগম এবার খানিক কড়া গলায় তিহুকে জিজ্ঞেস করলেন:

--" কি সমস্যা তিহু? তোদের দুজনেরই কি খাওয়া শেষ?"

--" পেট ব্যথা করছে আম্মু। আর খাবো না।"

মেয়ের অসুস্থতার কথা শুনে থেমে যান মেঘা বেগম। মেয়েলি কোনো সমস্যা হতে পারে ভেবে মাংসের বাটিটা নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যান।

-------------

--" আবরার ভাই জানেন!"

--" হুমমম।"

--" আমার না পূর্ণিমার রাতের খোলা আকাশের নিচের হাঁটার খুব শখ ছিলো। কিন্তু তখন তো আপনি অনেক কড়া ছিলেন তাই কখনো হাঁটা হয়নি।"

ইনায়ার কথায় দাঁড়িয়ে পড়ে আবরার। দুহাত পকেটে গুঁজে নেয়। মুখের মধ্যে গম্ভীরতা টেনে প্রশ্ন করলো:-

--" যেমন?"

--" যেমন... কথায় কথায় থাপ্পড় দিতেন! রাতের বেলায় বারান্দায় যেতে দিতেন না! বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে যেতে দিতেন না।

ইনায়ার অভিযোগ করা দেখে হাসে আবরার। নিজের চুলে একবার হাত চালিয়ে রাস্তার থেকে ফুটপাতের পাশে গিয়ে বসলো। তার পাশে এসে বসে ইনায়া।

--" আমার উপর কি খুব রাগ তোর?"

--" না।"

--"কেন? তোকে কতো বেড়াজালে আটকে রেখেছিলাম। কতো কি করতে দেয়নি। শেষে দেখ তোর পরিবার থেকে ও তোকে আলাদা করে দিলাম।"

আবরারের কথায় মুখটা ছোটো হয়ে আসে ইনায়ার। কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেলেছে সে। দূর এখনতো আবরার ভাই কষ্ট পেয়েছে। নিজের কপাল চাপড়ে মনে মনে কথা গুলো আওড়ায় ইনায়া।

--" দূর ,,,,, কি যে বলেন আবরার ভাই। এটা নিয়ে রাগ করার কি আছে । আর পরিবার থেকে আলাদা হলাম কই? আপনি তো আছেন আমার সাথে!"

ইনায়ার কথায় আবরারের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠে। কি বললো তার বোকা ফুল? আবরার তার পাশে আছে। এটা তে সে খুশি ! তার কোনো অভিযোগ নেই? সে ভুল শুনে নি তো? নিজের ছন্নছাড়া ভাব ঢেকে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ইনায়াকে আবার জিজ্ঞেস করলো।

--" মাএ কি বললি তুই?"

--" কত কিছুই তো বললাম। কোন কথাটা জিজ্ঞেস করছেন?"

--" ওই আমি তোর পাশে আছি নাকি কি?"

--" আচ্ছা! বলেছি আপনার প্রতি আমার কোনো রাগ অভিমান কিচ্ছু নেই আবরার ভাই। আর পরিবার থেকে আলাদা হলাম কই আপনি তো আছেন আমার সাথে।"

খুশিতে বার বার গলা কেঁপে উঠছে আবরারের। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে তার। ইনায়া কি তার হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে? এতো জোরে লাফাচ্ছে কেন হৃদয় টা। নিজেকে আজ সুখি মানুষ মনে হচ্ছে তার। ইনায়া তাকে উপলব্ধি করছে।

--" বাসায় যাবো ভাইয়া।"

দুচোখ ডলছে ইনায়া। মেয়েটার ঘুম আসবে বোধহয়। সারাদিনের ক্লান্তি তে আবরারের শরীরটাও ব্যথা করছে। রাতের খাবার খেতে বেরিয়ে ছিলো দুজনে।

বাসায় এখনো কিছুই কেনাকাটা করেনি আবরার। সন্ধ্যায় বাসা পাওয়ার পর শরীর ক্লান্ত থাকায়। আর ইনায়া একা বাসায় থাকবে বলে রাতে বেরোয়নি সে। আজ রাতটা মেঝেতেই ঘুমাতে হবে দুজনের। কাল সকালে বেরোতে হবে। সামনের সপ্তাহে কয়েকটা ইন্টারভিউ আছে আবরারের।

পরশু বাড়ি থেকে বেরোনোর আগেই রিমঝিম কে বলে ছিলো কয়েকটা কোম্পানিতে যেনো অ্যাপ্লেকেশন করে দেয়। তার কাছে কম্পিউটার না থাকায় রিমঝিম কে বলা।

Story Cover