জমজমাট হয়ে আছে চৌধুরি বাড়ির ড্রয়িংরুম। তাসপি , সায়র , সায়েম , তানভীর , তিহু , ইরফান সবাই একসাথে বসে আড্ডা দিচ্ছে। মাহমুদা বেগম আর আয়েশা বেগম রাতের রান্না করছে। মেঘা বেগম গেস্টদের নাশতা দিয়ে উপরে গেছে এশার নামাজ আদায় করতে।
বাড়ি ফিরেই অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেন আশরাফ চৌধুরি আর আফতাব চোধুরি। ম্যানেজার ফোন দিয়ে ছিলো। আশতাফ চোধুরি নিজের ঘরে। মোটামুটি সবার মন এখন ভালো। বাড়ির ফেরার পর পর ই আবরারের সাথে কথা হয় তানভীরের। তারা বাসা পেয়েছে জানিয়েছে বাড়িতে। তা শুনেই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে সবাই।
ঢাকা শহরে সাধ্যের মধ্যে বাসা পাওয়া চারটি খানি কথা না। আবরারের তানভীরের সাথে কথা শেষে বাড়ির সবার সাথে একে একে কথা বলে ইনায়া। মায়ের সিরিয়াল আসতেই কেঁদে উঠে সে। তা দেখে বুঝায় আবরার। কথা শেষে কল কাঁটার পর থেকে স্বাভাবিক হয়েছে মাহমুদা বেগম আর আয়েশা বেগম। প্রেশার টাও কমে এসেছে।
-------------
--" তেহজিব তুমি কিসে পড়ো?"
সায়েমের কথায় তার দিকে অবাক চোখে তাকায় তিহু। তিহুকে তেহজিব বলায় কপাল কুঁচকে যায় ইরফানের। কপালের চারপাশের রগ গুলো ফুলে ফেঁপে ওঠে। কিছু কঠিন কথা বলতে মুখ খুলেও নিজেকে সামলে নিলো। নতুন আত্মীয়র সাথে এমন ব্যবহার করা ঠিক হবেনা ভেবে নিজেকে সামলে নিলো। দোতলা থেকে নামতে গিয়ে কথাটা শুনতে পায় ইরফান। আড্ডার মাঝে জরুরি ফোন আসায় ঘরে যায় সে। এসেই কথাটা শোনে ইরফান।
তিহুর পুরো নাম তেহজিব চৌধুরি তিহু। বাড়ির মানুষ ছাড়া তিহু কে তেহজিব খুব কেউ একটা বলেও না আর নামটা জানেও না কেউ। কিন্তু সায়েম ছেলেটা তাসপির থেকে নামটা জেনেছে।
তিহু উত্তর দেওয়ার আগেই ইরফান এগিয়ে আসে।
--" তুমি হয়তো জানো না তিহু কে আমরা ছাড়া অন্য কেউ তেহজিব বলে না। আর ওর নামটা এতো সহজে বলবে ও না।"
--" ইরফান ভাইয়া কি যে বলেন।আমরা তো এখন বেয়াই - বেয়ান তাই এই নামটা আমি বলতেই পারি। তাই না মিস তেহজিব?"
সায়েমের প্রশ্নে তিহু নিজের দু'হাত কচলাতে শুরু করে। এই ছেলে কি শুরু করেছে। তাকে কেন টানছে ওনার আর ইরফান ভাইয়ার কথার মাঝে।
--" ঘরে যা তেহজিব। সামনে পরীক্ষা ঘরে গিয়ে পড়তে বস। তোকে যেনো আমি আর ড্রয়িং রুমের আশেপাশে না দেখি।"
তিহুর দিকে তাকিয়ে শান্ত চোখে ইরফানের দেওয়া ধমকটাতে কেঁপে ওঠে তিহু। কথা গুলো সবার কাছে শান্ত কন্ঠে বলা মনে হলেও তিহুর কেন যেনো মনে হলো ওই কন্ঠে কিছু ছিলো।
সে আর সোফায় বসে থাকতে পারে না। দাঁড়িয়ে পড়ে তিহু। তাকে উঠতে দেখে সুরটানে সায়েম।
--" আরে কি করছেন কি তেহজিব। ভাইয়া মজা করে বলেছে। এখন কি পড়তে বসবেন আপনি!"
--" ঘরে যা তেহজিব। দ্বিতীয় বার যাতে বলা না লাগে।"
ইরফানের শেষের কথাটুকু শুনে আশেপাশে না তাকিয়েই সিঁড়ির দিকে চলে যায় তিহু। শুধু শুধু ঘুমন্ত সিংহ কে জাগিয়ে লাভ নেই।
তিহু উঠে যেতেই সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায় ইরফান। এত্তক্ষণের সব ঘটনার নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে তানভীর, তিহু। এখানে তাদের কিছু বলার নেই। এমনিতেও ভাইদের রাগকে প্রচুর ভয় পায় তাসপি।
------------
আকাশে গোলকার থালার মতো চাঁদ উঠেছে। চারপাশ চিকচিক করছে চাঁদের আলোয়। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া। তার মনে হলো আজ বোধহয় পূর্ণিমা। চাঁদের আলোয় কি সুন্দর লাগছে চারপাশ। বেলিফুলের সুভাষে মৌ মৌ করছে পুরো বাড়ি।
আবরার ওয়াশরুমে শাওয়ার নিচ্ছে। এই সুযোগে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছে ইনায়া। চাঁদ দেখতে তার বেশ ভালোই লাগে। বাড়িতে থাকতেও পড়ার মাঝে
মাঝে এসে সে চাঁদ,তারা দেখতো। তার জন্য কম বকা ও খায়নি মায়ের কাছে।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে রুমে চোখ বুলায় আবরার। ইনায়াকে ঘরে না দেখতে পেয়ে বারান্দার দরজায় এসে দাঁড়ায় সে। পেছন ঘুরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে তার প্রেয়সী। তা দেখে ইনায়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায় আবরার। নিজের পেছনে কারো অস্তিত্ব বুঝতেই বুঝে যায় মানুষ টা কে।
সদ্য শাওয়ার নিয়ে আসা আবরারের শরীর থেকে এক মিষ্টি সুভাষ ভেসে আসছে। সাবান - শ্যাম্পুর মিক্সড ঘ্রাণ।নাক টেনে সুভাষ টা ভেতরে টেনে নেয় ইনায়া। কি মিষ্টি সেই সুভাষ ,,, ইনায়ার অবাধ্য মনে ইচ্ছে জাগে একবার আবরারের বুক থেকে ঘ্রাণ টা নিতে। ইচ্ছে করছে তার উদোম বুকে নিজের মুখ টা দাবিয়ে দিতে। ইনায়ার ভাবনার মাঝেই আবরারের চুলের পানি গুলো ফোঁটায় ফোঁটায় এসে তার ঘাড়ে পড়ে। কিছু ফোঁটা পানি আবরারের কানের পাশ বেয়ে ঘাড়ের তোয়ালেতে গিয়ে বিলীন হচ্ছে। ভ্রম কাটে ইনায়া। কথা গুলো ভাবতেই তওবা করে সে। ছিঃ ছিঃ একদিনেই কি হলো তার? নাউযুবিল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ।
শান্ত প্রকৃতির মাঝে দু'জন মানব - মানবী নিশ্চুপ হয়ে পূর্ণিমা বিলাস করছে। কি অদ্ভুত এই প্রেমিক যুগল।একজন মনে মনে শুকরিয়া করছে তার প্রিয়তমাকে পাওয়ার জন্য। অন্য জন তওবা করছে মনের কুইচ্ছে গুলোর জন্য।