জলমলিয়ে রোদ উঠেছে।ফজরের পর থেকে বৃষ্টি থেমে রোদ উঠেছিলো। মেঘা বেগম আর মাহমুদা বেগম সারাবাড়ি ছুটোছুটি করে সব কাজ শেষ করছে। তানভীর , ইরফান আর তিহু নিজেদের ঘরে তৈরি হচ্ছে বের হওয়ার জন্য। মেঘা বেগম সবাইকে সকাল থেকে তাড়া দিচ্ছেন। যোহরের আযান পড়বার আগে বের হওয়া লাগবে। সবাই যাতে জলদি তৈরি হয় । কিন্তু মন ভালো না থাকায় সবাই এখনো তৈরি হয়নি।
হাতের কাজ শেষ করে শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে রান্নাঘর থেকে বের হলেন মেঘা বেগম। ড্রয়িং রুমের বড় দেয়াল ঘড়িটাতে একবার চোখ বুলিয়ে সময় দেখে নিলেন। সাড়ে এগারোটা বাজে। তারপর পা বাড়ালেন আয়েশা বেগমের ঘরের দিকে।
নাশতা সেরে তিনি আবার ঘরে এসে শুয়ে পড়েছিলেন। ইনায়ার জন্য বুকটা খা খা করছে ওনার। মেয়েটা কতো খুশি ছিলো তাসপির বিয়ে নিয়ে। ভাবতেই বারবার চোখের পাতা ভিজে উঠছে আয়েশা বেগমের। সারাদিন বাড়ি মাথায় করে রাখা মেয়েটা আজ দুদিন বাড়িতে নেই। যেনো কতো শত যুগ কেটে গেছে তিনি ইনায়াকে দেখেনি।
-------------
হোটেল থেকে চেকআউট করে সবে বেরিয়েছে আবরার ইনায়া। সকালের নাস্তাটা হোটেলের রেস্টুরেন্ট সাইডেই সেরেছে দুজনে। কিছুটা এসে একটা গাছের ছায়ার নিচে দাঁড়ালো আবরার।
ডান হাতের মুঠোয় ইনায়ার হাত আর বাম হাতে তাদের পোশাকের শপিং ব্যাগ গুলো। ইনায়ার হাতটা ছেড়ে পকেটে হাত চালায় আবরার। ফোনটা বের করে সময় টা দেখে নিলো। তারপর ঢুকলো ম্যাসেজে, বর্তমানে ব্যাংক একাউন্টে কতো টাকা আছে তা জানা নেই আবরারের। ম্যাসেজে ঢুকে ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত ম্যাসেজ টা চেক করলো। সত্তর হাজার টাকা দেখে খানিক চিন্তা মুক্ত হয় আবরার । সাত হাজার বা আট হাজারের মাঝে যদি বাসা পেয়ে যায় তবে টুকিটাকি দরকারি কিছু জিনিস পএ কিনে ও হাজার ত্রিশের মতো টাকা বাঁচবে। ভাবনা চিন্তা শেষে আবার ফোনটা পকেটে রেখে দিলো সে। তারপর ইনায়ার হাতটা আবার সযত্নে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নেয়।
এতক্ষণ আবরারের করা কাজ গুলো পূর্ণ মনোযোগে পর্যবক্ষেণ করে ইনায়া। গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে ও ঘেমে গেছে আবরার। ফর্সা মুখ রোদের তাপে লাল হয়ে উঠেছে। কপালের রগ গুলো ফুলে ফেঁপে উঠেছে। সেই রগ গুলো ছাড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে এক ফোঁটা ঘাম। আবরারের জেল ছাড়া চুল গুলো কপালে এসে খেলা করছে। কি মোহনীয় সেই দৃশ্য। ইনায়ার হঠাৎ কি হলো কে জানে? নিজের বাম হাতের সাহায্য কালো শাড়ির আচঁলটা তুলে আবরারের কপালের পাশ বেয়ে নামা ঘামের ফোঁটা গুলো মুছে দেওয়ার বৃথা চেষ্টা চালালো। আবরারের বুক সমান ইনায়া পা উচিয়ে ও আবরারের কপাল ছুঁতে পারলো না। হাত নামিয়ে নিতে উৎসুক হলো ইনায়া। তা দেখে কিঞ্চিত ঝুকলো আবরার। নিজের প্রেয়সীর বাম হাতখানার উপর নিজের হাতটা টা চেপে ধরে। তারপর নিজের কপালের ঘামটা মুছে নেয়।
--" কষ্ট হচ্ছে?"
আবরারের প্রশ্নে তার চোখে চোখ রাখে ইনায়া। শান্ত,সুন্দর সেই চাহনি। মুখে কিছু না বলেও ইনায়ার চোখ যেনো কতো কি বলছে। আর তা আবরার বুঝতে পারছে। বুঝতে পেরে ও খানিক অবুঝের নেয় তাকিয়ে থাকে আবরার। কিছু সময় প্রিয় মানুষের চোখের ভাষা বুঝলেও সেই কথা গুলো প্রিয় মানুষদের মুখ থেকে শুনতে যেনো একটু বেশিই ভালো লাগে।
--" চল তোকে রিমঝিমদের বাসায় রেখে আসি। তারপর বাসা পেলে আবার নিয়ে আসবো।"
কথাটা বলেই হাত নাড়িয়ে রিকশা থামাতে নেয় আবরার।
--" আমি কোথাও যাবো না। গেলো একেবারে বাসায় চলে যাবো।"
ইনায়ার অভিমান নিয়ে বলা কথাটা বুঝতে পেরে মনে মনে হাসে আবরার। তার ভালোই লাগে ইনায়ার অধিকার খাটানো কথা গুলো শুনতে। ইনায়াকে আরেকটু রাগিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে হলো তার।
--" অন্বি তোর কি কোনো ভাবে মনে হচ্ছে যে আমার সাথে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে তুই ভুল করেছিস?"
আবরারের কথাটা কর্ণগোচর হতেই রেগে যায় ইনায়া। ছলছল চোখে আবরারের দিকে তাকায়। তারপর আবার চট করে চোখ সরিয়ে নিলো।
--" হ্যাঁ,,, ভুল মনে হচ্ছে দিয়ে আসেন আমাকে বাসায়। থাকবো না আপনার সাথে। আমাকে তাড়াতে পারলেই আপনি খুশি। আমাকে একটু ও দেখতে পারেন না আপনি।"
কথা গুলো বলতে বলতেই ফুঁপিয়ে কেঁদে দেয় ইনায়া। তার কান্না দেখে বুকে জ্বালা শুরু করে আবরারের। ইশশশ,,,, কি করলো সে। মেয়েটাকে আবার কাঁদিয়ে দিয়েছে। শিট.....
--" এই অন্বি .... দূর আমি তো তোকে রাগানোর জন্য কথাটা বলেছি। আর তুই সত্যিই ভেবে নিয়েছিস। তোকে যদি বাসায়ই রেখে আসার হতো তাহলে কি আব্বুর সাথে ঝামেলা করে আমার সাথে নিয়ে আসতাম? কোথাও রাখবো না তোকে। সত্যিই প্রমিস! আর একবারো বলবো না এমন কথা।"
নিজের কানে ধরে কথাগুলো বলে আবরার। তারপর ইনায়ার চোখ মুখ মুছে দেয়।
-----------
সন্ধ্যা নামছে ধীরে ধীরে। আকাশের রঙ একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। হালকা নীলটা যেন লালচে কমলার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে কোথাও। গাছের পাতায় হালকা বাতাস লেগে নড়ছে। পাখিরা দলে দলে ফিরছে, কেউ ছাদের কার্নিশে বসছে, কেউ গাছের ডালে। আলো-অন্ধকার মিশে একটা নরম ধূসর ছায়া তৈরি করছে চারপাশে।
চৌধুরি বাড়ির দরজায় এসে তিনটে গাড়ি থামে। তার পর পর ই আসে আরেকটা গাড়ি। প্রথম গাড়িটাতে আশতাফ চৌধুরি, আয়েশা বেগম আর আশরাফ চৌধুরি। দ্বিতীয়টাতে আফতাব চৌধুরি,আয়েশা বেগম, আর মেঘা বেগম। তৃতীয়টায় তানভীর, ইরফান, তিহু। শেষেরটাতে তাসপি, সায়র, আর সায়েম। তাসপির জামাইয়ের নাম সায়র। সায়রের ছোটো ভাই সায়েম। তাসপির শশুর বাড়ি থেকে ওকে আজ নিয়ে এসেছে আশরাফ চৌধুরি। মেয়ে কে ছাড়া একটা দিন ই যেনো বছর সমান গেছে আশরাফ চোধুরি। তাই বন্ধুকে বলে অনুষ্ঠান শেষে নিজের মেয়ে কে সঙ্গে করে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। এক মেয়েকে বুকে করে আনতে পারলেও অন্য মেয়ে আর ছেলে কোথায় তা কেউ জানে না।
গাড়ি থামতেই তাড়াহুড়ো করে বড়রা সদর দরজা পেরিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ে। বাকিরা তাসপিদের নিয়ে আসে। মাহমুদা বেগমরা বাড়িতে ঢুকেই রান্না ঘরে ছুটলেন । সবার জন্য রাতের খাবারের পাশাপাশি সন্ধ্যার নাশতার আয়োজনকরা লাগবে।
----------
সারাদিন রোদে পুড়ে ঘেমে নেয়ে মাগরিবের পর একটা বাসা পায় আবরার।
তিনতলা বিশিষ্ট একটা বাড়ি। শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা ভেতরে। বাড়ির বাহিরে শেওলা পড়া। সাদা রঙটা জ্বলে গেছে। বাড়ির সামনে একটা বেলি ফুল গাছ। বর্ষার সিজন হওয়ায়তে গাছটা ফুলে ভরে আছে। বাড়ির সামনে দাঁড়াতেই বেলি ফুলের মিষ্টি সুভাষ এসে ধাক্কা লাগে নাকে। মনোরম পরিবেশ সাথে ভাড়া ও সাধ্যির মধ্যে , আট হাজার। দুই রুম রুম গুলো মাঝারি সাইজের। কিচেন , এক বারান্দা , ওয়াশরুম। বাড়ির মালিক অগ্রীম দু'মাসের ভাড়া নিয়েছে। তা পরিশোধ করে বাসা খালি থাকায় আবরার ইনায়া আজই উঠে পড়েছে।