আজ তাসপির বৌ-ভাত। সকাল থেকে মন মরা হয়ে আছে চৌধুরি পরিবার। আয়েশা বেগম ফজরের নামাজ আদায় করে রান্না ঘরে এসে দেখেন মেঘা বেগম রুটির আটা করছে। আর এক চুলায় চায়ের পানি বসিয়েছেন। রহিমা খালা সবজি কাটছে মেঝেতে বসে। সিতারা বেগম ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে আছে। কাছের আত্মীয় স্বজন সবাই বিয়ে শেষে চলে গেছে। যাদের বাড়ি দূরে তারা এখন ও আছে। বৌ-ভাত শেষে একেবারে বাড়ি ফিরবে।
আয়েশা বেগম কে রান্নাঘরে ঢুকতে দেখে সিতারা বেগম পেছন থেকে ডেকে উঠলেন।
--" ও ছোডো বউ! এদিকে আউও তো একবার।"
সিতারা বেগমের কথায় থমকে দাঁড়ায় আয়েশা বেগম। সিতারা বেগমের কন্ঠ কানে লাগতেই মনে পড়ে যায় পরশু রাতের ঘটনা। তাতেই জেনো ওনার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। সিতারা বেগমের ডাক উপেক্ষা করে পা বাড়ায় রান্নাঘরের দিকে। দরজায় পা রাখতেই আবার চেঁচিয়ে উঠেন সিতারা বেগম।
--" কানে কি তুলা দিছো ছোডো বউ? ডাকতাছি হুনো না।"
আবার ডাক দেওয়াতে নিজের রাগ সামলে পেছন ফিরে থাকান তিনি। তারপর রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়েই উত্তর দিলেন।
--" বলেন ফুফু আম্মা।"
--" ওই হানে খাঁড়াইয়া থাকলে কই কেমনে? এম্বে আহোও।"
রান্না ঘরের দরজা থেকে দু'পা এগিয়ে ডাইনিং টেবিলের কাছে আসেন আয়েশা বেগম। তা দেখেই মরা কান্না জুড়ে দিলো সিতারা বেগম।
--" পোলা মাইয়া দুইডা কেমন আছে। কোনো খোঁজ খবর পাইছো? আমার কাইলকার দিনটা যে কেমনে কাটছে কি যে কমু বউ। রাইত্তে ও শান্তিতে ঘুমাইতে পারি নাই।"
--" হ্যাঁ দাদু । এই জন্যই তো আপনার নাক ডাকার কারণে আমি আর ইরফান সারারাত ঘুমাতে পারিনি।"
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতেই কথাটা বললো তানভীর। এতেই মুখ কালো হয়ে যায় সিতারা বেগমের। নিজের সুতির ওড়নায় মুখ ঢেকে গুনগুনিয়ে উঠলেন। হাক ছেড়ে রান্নাঘরে অবস্থানরত মেঘা বেগমকে ডেকে বললেন।
--" দেখছো মাইজ্জা বউ। তোমার পোলায় আমারে অপমান করে কেমনে? আমার নাক ডাকার লাইগ্গা নাকি সে ঘুমাইতে পারে নাই।"
--" তানভীর চুপ কর। বড়দের সাথে একদম বেয়াদপি করবি না।"
--" বুড়ো বয়সে এক পা কবরে রেখে কুটনামি করলে কি সালাম করবো।"
সিতারা বেগমের কথায় তানভীর কে ধমকে উঠেন মেঘা বেগম। মেঘা বেগমের ধমকের পরোয়া না করেই মুখ বাঁকিয়ে কথাগুলো বলেই সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যায় তানভীর। তাদের কথোপকথনের মাঝেই ঘর থেকে বেরোয় মাহমুদা বেগম। তাকে দেখে থেমে যায় সিতারা বেগম। চোখ মুখ কুঁচকে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে হাঁটা দেয়। তা দেখে হাঁপ ছেড়ে বাঁচে মেঘা বেগম আর আয়েশা বেগম।
--" কি বানাচ্ছিস?"
--" পরোটা , সবজি আর চা। এই টুকু আমি আর রহিমা খালা করে নিতে পারবো। তোমরা ঘরে যাও।"
--" তোমার প্রেশার কমেছে ভাবি?"
মেঘা বেগমের কথায় দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মাহমুদা বেগম। আয়েশা বেগমের চোখ ছলছল করে ওঠে। নিজের মেয়েটার কোনো খোঁজ খবর নেয় আজ দুদিন হতে চললো। যতোই আবরারকে ভরসা করুক। ছেলেটা এতো আত্মসম্মান নিয়ে জন্মেছে যে প্রয়োজনে রাস্তায় থাকবে। তবুও ঢাকার নিজেদের ফ্ল্যাটটাতেও উঠবে না। কি করবে দুজনে কিছুই বুঝতে পারছে না আয়েশা বেগম।
--" কমেছে রে ছোটো। কিন্তু ছেলে-মেয়ে দুটোর চিন্তায় দু'চোখের পাতা এক করতে পারছি না। ইনায়াটা যে এখনো ছোটো। আবরার টাও রাগী। কি করবে না করবে দু'জনে।"
--" চিন্তা করো না ভাবি। আবরার কিন্তু ইনায়ার ব্যাপারে খুব সচেতন। ওর অযত্ন নিবে না আমার জানা মতে।"
মেঘা বেগমের কথায় মাথা নাড়ায় মাহমুদা বেগম নিজেও। একথাটা সত্যিই। ছেলেটা যতোই রাগী হোক না কেন ইনায়ার ব্যাপারে সে পুরোই অন্য রকম। সামনে মেয়েটাকে বকাঝকা করলেও পেছনে তার প্রত্যেক টা বিষয়ে খেয়াল রাখে। মেঘা বেগমের কথায় নিজের চিন্তা জগত থেকে বেরোয় মাহমুদা বেগম।
--" তাসপির হলুদের দিন দেখোনি।"
তাসপির হলুদের দিন। সবার জন্য শাড়ি কেনা হলেও একটা শাড়ি কম পড়ে যায়। তানভীর আর ইরফান কে বললেও তারা কেটে পড়ে। তার পর কোনো রাস্তা না পেয়ে আবরার কে জানায় মাহমুদা বেগম। প্রথমে অন্য শাড়ি পরতে বলে সে। তারপর যখন তিনি ইনায়ার কথা বলে ! কোনো কথা ছাড়াই বিছানা ছেড়ে বাইকের চাবিটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে আবরার।
--" এই জন্যই বলছি তোমরা চিন্তা করো না। ওরা ভালো থাকবে। এবং শুধু ভালো না খুব ভালো। দেখো"
মেঘা বেগমের অভয়ে কিছুটা চিন্তা কমে মাহমুদা বেগম আর আয়েশা বেগমের। হালকা হেসে উঠলেন দুজা। তা দেখে মেঘা বেগম আর রহিমা খালাও হাসে।
তারপর তিনজা হাত লাগায় নাশতার কাজে। নাশতা সেরে আবার তাসপির শশুর বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরোনো লাগবে।