চারদিকে ফজরের আজান হচ্ছে। আজানের সুমধুর ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে আছে চারপাশ। পাখিরা জেগে উঠেছে। বাসা থেকে বেরিয়ে গাছের ডালে ডালে বসে ডাকছে। পাখির কলকল ধ্বনিতে প্রকৃতিও যেনো জেগে উঠছে। এখনো বাহিরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। মধ্যরাত থেকে বৃষ্টির ছাঁট আরো বেড়েছে। বৃষ্টির শব্দে মুখরিত হয়ে আছে প্রকৃতি। আজো সারাদিন বৃষ্টি থাকতে পারে।
আবরারের ঘুম ভেঙে গেছে। রাত একটায় ঘুমানোর কারণে এখনো ঘুমের জন্য চোখ খুলতে পারছেনা। মূলত পেটের উপর ভারি কিছুর চাপ অনুভব হওয়াতেই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। দু'হাতে চোখ কচলে নিজের পেটের দিকে তাকাতেই দেখতে পায় ইনায়ার ঘুমন্ত মুখ। দু'হাতে আবরারের পেট জড়িয়ে বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে সে। আবরারের এতোক্ষণের সকল বিরক্তি , ভ্রু কুঁচকে রাখা সব যেনো নিমেষেই গায়েব হয়ে গেলো। চোখে মুখে এসে ভর করলো একরাশ মুগ্ধতা। রাতে গুটি - শুটি মেরে বিছানার বা-পাশে শুলেও। ঘুমের ঘোরে ঘড়ির কাঁটার মতো চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে আবরারের বুকে উপর এসেই স্হির হয় ইনায়া।
প্রকৃতিও যেনো এটাই বোঝাতে চাইছে। যে অন্বিতা চৌধুরি ইনায়ার একমাত্র আশ্রয়স্থল অরিন্দম চৌধুরি আবরারের বক্ষবন্ধনী। ঘুরে ফিরে তাকে আবরারের কাছেই আসতে হবে। এটাই যে পবিত্র বন্ধনের জোর।
কিছুক্ষণ ইনায়ার দিকে চেয়ে নিজের দু'হাতের সাহায্যে যত্নে ইনায়াকে বুকের উপর থেকে নামায় আবরার। এভাবে শুয়ে থাকলে মেয়েটার ঘাড়ে ব্যথা হয়ে যাবে। ইনায়াকে নিজের বক্ষবন্ধনী থেকে বিছানায় রেখে উঠে বসে আবরার। ভালো করে তাকাতেই চোখে পড়ে আলুথালু ইনায়ার অবস্থা। শাড়ি পরার অভ্যাস না থাকায় শাড়ির যাচ্ছে তাই অবস্থা। হাঁটুর উপরে শাড়ি উঠে ইনায়ার ফর্সা পা দুটো উন্মুক্ত হয়ে আছে। কালো রঙের শাড়ির ভেতরে ইনায়ার পা দুটো জ্বলজ্বল করছে যেনো। বক্ষবিভাজনের শাড়ি নেমে উদোর সহ শরীরের বিভিন্ন অংশ স্পষ্ট বিদ্যমান। নিজেকে এভাবে আবরারের সামনে দেখলে অপ্রস্তুত হতে পারে বিদায় আবরার ওর শাড়ি ঠিক করে গায়ে কম্পোটার জড়িয়ে দিলো। এসির পাওয়ার বাড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লো সে। হালকা ড্রিম লাইটের নীলচে আলোয় আলো আঁধারে খেলা করছে ঘরটা। ওয়াশরুমে ঢুকে ওযু করে আসে আবরার। তাওয়াল দিয়ে হাত - মুখের বাড়তি পানিটুকু মুছে নেয়। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে যায় বিছানার পাশে। বিছানায় বসে ইনায়ার মাথায় হাত রাখলো। গভীর চোখে চেয়ে ধীর-স্হিত গলায় নিজের সহধর্মিনীর নাম উচ্চারণ করে আবরার।
--" অন্বিতা!"
--" এই অন্বিতা!"
ইনায়ার চুলে হাত বুলাতে বুলাতে কাল রাতের কথা মনে পড়ে যায় আবরারের। কথাগুলো ভাবতেই তার গোলাপি ওষ্ঠ জড়ায় একরাশ হাসি খেলে গেলো। হাসির কারণে গালের টোলটা আরো গাড়ো হয়। কাল রাতের সময় টা কোনো মন্ত্রমুগ্ধ চেয়ে কম কিছু না আবরারের কাছে।
তার বোকা ফুল শাড়ি পরতে না পারায় শেষমেশ তাকেই শাড়ি পরিয়ে দিতে হয় মেয়েটাকে। নিজে পরতে পারবে বলে ওয়াশরুমে ঢুকলেও শাওয়ার শেষে দু'কাপড়ের উপর ছোটো বাচ্চাদের মতো করে শাড়ি জড়িয়ে বেরিয়ে আসে ইনায়া। তার শাড়ি পরার ধরন দেখে আকাশ থেকে পড়ে আবরার।
--" শাড়িটা এভাবে পেঁচিয়েছিস কেন?"
--" পেঁচাই নি তো! পরেছি।"
ইনায়ার কথায় কপাল কুঁচকে যায় আবরারের। কপাল চেপে এদিক ওদিক চেয়ে আবার প্রশ্ন করলো:-
--" এভাবে কাকে শাড়ি পরতে দেখেছিস তুই?"
--" আম্মু , বড়মা আর মামনিকে।"
--" আচ্ছা আচ্ছা ? তা আমাকে একটু হেঁটে দেখা তো!"
--" এমা এ আর এমন বড় কি কাজ? এটা তো ইনায়া তুড়ি মেরে করতে পারবে। আমি বরং আপনাকে দৌড় দিয়ে দেখাই।"
আবরারের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই আবরারের দিকে দৌড় দেয় ইনায়া। আর তখনি যা অঘটন ঘটার ঘটে যায়। পায়ের সাথে শাড়ি পেঁচিয়ে ঠাস করে মেঝেতে পড়ে যায় ইনায়া। তার হঠাৎ পড়ে যাওয়া দেখে হতভম্ব হয়ে যায় আবরার।
--"এটা কি হলো?"
--" আমি কি জানি!"
ইনায়া মেঝেতে পড়ে বড়বড় চোখে আবরারের দিকে চেয়ে প্রশ্নটা করে। বহু কষ্টে পেট চেপে নিজের হাসি আটকে জবাব দেয় আবরার। ইনায়ার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে আবরার এতোক্ষণে হেসে মেঝেতে বসে পড়তো। কিন্তু ইনায়ার সামনে তা করলে নির্ঘাত আবরারের ফাঁসি মঞ্জুর। নিজেকে সামলে ইনায়ার সামনে গিয়ে তার হাত ধরে উঠিয়ে বিছানায় বসায় আবরার।
--" আমি শাড়ি পরতে পারি না। এখন কি হবে? কাল তো তিহু পরিয়ে দিয়েছিলো।"
--" আমি একবার চেষ্টা করবো?"
ভয়ে ভয়ে প্রশ্নটা করে আবরার। তার প্রশ্নে ইনায়া অবাক চোখে আবরারের দিকে তাকালো।যেনো চোখ দিয়েই আবরার কে গিলে নেবে।
--" আপনি কিভাবে শাড়ি পরাবেন। জীবনে পড়াশোনা ছাড়া আর কিছু করেছেন নাকি?"
--" কাউকে সুযোগ না দিয়ে তার দক্ষতা বিচার করা উচিত না ম্যাম।"
আবরারের মুখে ম্যাম ডাকটা শুনে দু'হাতে নিজের কান চেপে ধরে ইনায়া।
--" নাএএএএএএএএ,,, এটা হতে পারে না। আমাকে চিমটি কাটুন আবরার ভাই। আমি কানে ভুল শুনছি। পারলে একটা থাপ্পড় ও কানের নিচে বসিয়ে দেন।"
ইনায়ার কথার মানে বুঝতে কিঞ্চিত সময় লাগে আবরারের। কপাল কুঁচকে চেয়ে থাকে ইনায়ার দিকে । ইনায়ার মুখের ভঙ্গিমায় কথার মানে বুঝতে বাকিরয় না তার।
আবরারের মুখের অবস্থা দেখে পেট চেপে খিলখিলিয়ে হেসে উঠে ইনায়া। তার হাসির সাথে তাল মেলায় আবরার নিজেও। ইনায়ার ফাজলামি শেষে আবরার নিজের চোখে ইনায়ার শাড়ির আচঁল বেঁধে নেয়। তারপর নিজের মাপ মতো ইনায়াকে শাড়িটা পরিয়ে দেয়। তা দেখে ও কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে ইনায়া।
রাতের কথা গুলো মনে পড়তেই অজানা এক ভালো লাগায় চেয়ে যায় আবরারের মন। তার মনের চারদিকে যেনো বসন্তের আগমনী ঘন্টা বেজে উঠলো। প্রিয় মানুষকে নিজের করে পাওয়ার মাঝে এতোটা সুখ ইনায়া আবরারের না হলে আবরার তা জানতো না।
সব চিন্তা কে একপাশে রেখে আবার ইনায়াকে ডেকে তোলায় মনোনিবেশ করে আবরার।
--" অন্বিতা ম্যাম ! প্লিজ উঠুন।"
আবরারের ডাকে পিটপিট করে দু'চোখ মেলে ইনায়া। ঘুম ঘুম চোখে নিজের পাশে আবরার কে দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের জামা ঠিক করতে। যখন দেখলো আগে থেকেই সব ঠিক। তখন দু'হাতে চোখ কচলে আবার তাকালো আবরারের দিকে। ইনায়ার এমন ভঙ্গিমায় তাকানো দেখে মুখ খোলে আবরার।
--" রিলাক্স ম্যাম ! এভাবে তাকাবেন না। হার্টবিট মিস হয়ে যাবে। আর এটা আপনার বাবার রাজ্য না। এটা আপনার ভাগ্যবান স্বামীর অস্হায়ী রাজ্য। তাই আপনার অস্হায়ী রাজ্যর স্হায়ী বাসিন্দা আমিও আপনার সাথেই আছি।"
বুকে হাত দিয়ে ইশারা করে কথাগুলো বললো আবরার। আবরারের পুরো কথা চোখ মুখ কুঁচকে শুনে হেসে উঠে ইনায়া।
--" সামান্য প্রজা হয়ে ও মহারানীর পাশে বসে আছেন?"
--" রাজকুমারী থেকে মহারানীতে পদোন্নতি কিন্তু সামান্য প্রজার জন্যই হয়েছেন মাই কুইন্স।"
মাথা ঝুঁকিয়ে দুহাত সামনে এনে কথাগুলো বলে আবরার। তা দেখে আবারো হাসে ইনায়া। কি মিষ্টি সেই হাসি। ইনায়ার হাসির দিকে গভীর চোখে চেয়ে থাকে আবরার। প্রতিদিন সকালে এই হাসি পার্মানেন্ট ভাবে দেখার জন্যই এতো কিছু।এতো লড়াই! বিদ্রোহ। ইনায়ার হাসি ক্ষীণ হয়ে আসতেই আবরার তাকে উঠিয়ে ওয়াশরুমে ওযু করতে পাঠিয়ে দেয়। ওযু করে মাথায় শাড়ির আচঁল টেনে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে ইনায়া।জায়নামাজ না থাকায় সাদা তোয়ালে বিছিয়ে নেয় আবরার। ইনায়া আসতেই একসাথে নামাজে দাঁড়ায় দু'জনে। নামাজ শেষ করে আবার ঘুমিয়ে পড়ে তারা।