আজ তাসপির বিয়ে। বিয়ে বাড়ির সব আনন্দ চাপা পড়ে আছে সবার মন খারাপের আড়ালে। সবাই কেমন রোবটের ন্যায় চলছে। হাসি মুখে বেদনার চাপ। বুকে লুকায়িত গোপন ব্যথা।
আয়েশা বেগম সকাল থেকে ঘরে দরজা আটকে বসে আছেন। একমাএ মেয়েকে কখনো চোখের আড়াল করেনি কিনা তাই সহ্য করতে পারছেন না।
আবরারের ফোনে কল দিয়েছিলো কিন্তু ফোন বন্ধ। বাবা এভাবে তাদেরকে অবিশ্বাস করায় সে এখনো মেনে নিতে পারেনি ব্যাপারটা। সবচেয়ে কাছের মানুষের কাছ থেকে পাওয়া কষ্ট মানুষ সহ্য করতে পারে না। কলিজাতে লাগে কষ্ট টা।
আশতাফ চোধুরি ও নিজের ঘরে দরজা দিয়ে বসে আছেন। আশরাফ চৌধুরি আর আফতাব চোধুরি দু'জনে ডেকে ও ঘর থেকে বের করতে পারেনি। একমাএ ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে বাবা কীভাবে সুখে থাকবে। সেই কথা চিন্তা করেও আর কেউ ডাকেনি। সকাল থেকে কিছুই মুখেও নেন নি পরিবারের কেউ।
মেঘা বেগম আর মাহমুদা বেগম একা সাথে সব সামলাচ্ছেন। সিতারা বেগম ড্রয়িং রুমে বসে পান চিবুচ্ছেন। আর সবাইকে বলছেন কাল কিভাবে ওদের পাপাচার করার সময় হাতে-নাতে ধরেছেন তিনি। সত্যি কথা , মিথ্যা কথা , সব একসাথ করে রঙ চং মাখিয়ে আরো কিছু আত্মীয় স্বজন তাকে বাহবা দিচ্ছে। এ যেনো চৌধুরি বাড়ির মানসম্মান ডোবানোর প্রতিযোগিতা চলছে। কে কার থেকে বেশি চৌধুরিদের নিচে নামাতে পারে।
এসব দূর থেকে চৌধুরি গিন্নিরা দেখছে আর গোপনে অশ্রু বিসর্জন দিচ্ছেন। স্বামীর বাধ্য স্ত্রী হয়ে ও বিপদে পড়েছেন তারা। বাড়ির ছেলে - মেয়ে দুটোর নামে এমন কুৎসা রটানো দেখে ও হজম করতে হচ্ছে।
-----------
আবরার ইনায়াকে নিয়ে ঢাকায় চলে এসেছে। ইনায়ার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না তার বিয়ে হয়ে গেছে আবরার ভাইয়ের সঙ্গে। যার ভয়ে সারাদিন তটস্থ হয়ে থাকতো ইনায়া। আজ সেই আবরার ভাইয়ের হাত ধরেই নাকি সে বাড়ি ছেড়েছে।
কেনো এমন হলো তার সাথে? সে তো আবরার ভাইয়ের জন্য খাবার নিয়ে গিয়েছিল। তাও ছোট মা বলেছে বলে।তবে ওরা কেন তাদের নামে খারাপ কথা রটালো। আবরার ভাই কেমন মানুষ তা তো বাড়ির প্রতিটা মানুষ জানে।তাও তারা কেন প্রতিবাদ করলো না ? কেন আবরার ভাইয়ের জীবন টা এভাবে শেষ করে দিলো।
আবরার ইনায়ার হাত শক্ত করে মুঠোয় পুরে বললো, " অন্বিতা !"
ইনায়া চমকে উঠলো। তারপর জবাব দিলো আবরারের ডাকের।
আবরার জিজ্ঞেস করলো, "ভয় লাগছে তোর?"
ইনায়া কেঁদে উঠলো। তার কেমন বুক ধড়ফড় করছে। আবরার ইনায়ার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,
"আমাকে তুই চিনিস না অন্বি?মনে কর আমি তোর বন্ধু। আগে বকা - ঝকা যা করতাম সব তোর ভালোর জন্যই। এবং কেন বকতাম সেটাও একদিন বুঝতে পারবি ইনশাল্লাহ। শুধু ভুল বুঝে দূরে চলে যাস না। সব সহ্য করতে পারলেও এই একটা বিষয় আমাকে ভেঙে চুরমার করে দেয় অন্বি।"
ইনায়া কেঁদে উঠে বললো
--" আমার কারণে আপনার সুন্দর জীবন নষ্ট হয়ে গেছে। তখন আমি ওই ঘরে না গেলে তো এমন হতো না।"
ইনায়ার কথায় কপাল কুঁচকে যায় আবরারের।
--" কে বলেছে তোকে যে আমার জীবন নষ্ট হয়ে গেছে?"
--" আপনি তো আমাকে পছন্দ ই করেন না। সারাদিন বকা বকি করেন। সেখানে এখন আমাদের বিয়েই হয়ে গেছে।"
ইনায়ার কথায় আবরারের কপালের ভাঁজ শীতল হয়ে আসে। ইনায়ার কথা শুনে তার ইচ্ছে করছে নিজের কপালে নিজেই একটা বাড়ি মেরে ফাটিয়ে দিতে।নিজেকে সামলে আবরার সুধায়:-
--" বকলেই মানুষ অপছন্দের হয়ে যায়?"
--" আমার তাই মনে হয়।"
আবরার কথাটা শুনে কিছুই বললো না , শুধু হাসলো। বকাবকির করার পেছনে যে এই মেয়ের জন্য কতটা ভালোবাসা লুকানো আছে। তা তো আর জানে না ইনায়া। জানলে অন্তত এভাবে বলতে পারতো না। সময়েই সব বলে দেবে। সময় হোক সব বুঝবে সে।
----------
খুব সাদামাটাভাবে তাসপির বিয়ে হলো। বিয়েতে কোনো সানাই বাজে নি,কেউ কান্না করে নি। তাসপি বিয়েতে একটুও কাঁদে নি।পুরোটা সময় রোবটের মতো ছিলো অনুষ্ঠানে।
আশতাফ চোধুরি বের হলো তাসপির বিদায়ের সময়। তাসপি সবার থেকে বিদায় নিয়ে আগে হেঁটে গিয়ে গাড়িতে বসে পড়ে।
তাসপি চলে যাওয়ার পর থেকে সবাই আবরার আর ইনায়ার বিষয় কথা বলছে ড্রয়িং রুমে বসে। আশতাফ চোধুরি আবার ঘরে দোর দিয়েছেন।
আয়েশা বেগম নিরবে কেঁদে চলেছেন।ছেলেটার তো এমনিতেই কপাল পোড়া এখন সেই সাথে জুটেছে নিজের মেয়ের কপাল।
ইনায়া যে বড় অবুঝ, সে কিভাবে সংসার করবে?
আবরার কোথায় আছে এখন ? সবাই কল দিয়েছে কিন্তু ফোন বন্ধ ছিলো আবরারের।