একজোড়া নবদম্পতি বেরিয়ে গেলো চৌধুরি বাড়ির দরজা দিয়ে। তাদের সাথে যেনো হাসি , আনন্দ গুলোও তলপি-তলফা গুছিয়ে বাড়ি ছাড়া হলো।
ইনায়ার পরা ছিলো নিজের সদ্য হওয়া স্বামীর উপহার দেওয়া একখানা লাল সিল্কের শাড়ি। আর আবরারের পরনে ছিলো সাদা পাঞ্জাবি। তাদের একসাথে কি সুন্দর যে লাগছিলো তা কেবল চৌধুরি বাড়ির ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ গুলো দেখেছিলো।
যার সাথে কিছুক্ষণ আগেও শুধু চাচাতো ভাই - বোনের সম্পর্ক ছিলো , যেই সম্পর্কের জের ধরে এতো ঝড় ঝাপটা গেলো। তাদের চরিত্রহীন অপবাদ দেওয়া হলো , তারা এখন হালাল সম্পর্কে মোড়ানো একজোড়া দম্পতি। এখন আর পৃথিবীর কারো শক্তি নেই ওদের গায়ে কলঙ্ক লেপ্টানোর। তিন বাক্যর কবুল শব্দটার এতো জোর। সামান্য একটু কলমের কতো জোর গোঁটা সমাজের মুখ বন্ধ করে দিলো।
বাড়ি থেকে বেরোতেই একটা রিকশা দেখে দাঁড় করায় আবরার। ইনায়াকে আগে উঠতে সাহায্য করে নিজেও উঠে বসে। রিকশা চলতে শুরু করে।
--" কোথায় যাইবাম মামা?"
--" বাসস্ট্যান্ড এ যান।"
--" আচ্ছা।"
আবরারের কথায় ইনায়া আবরারের হাত খামছে ধরে। তা দেখে আবরার নিজের হাতের মুঠোয় ইনায়া হাত জোড়া নিয়ে নিজে থেকেই বলে উঠে।
--" বিশ্বাস করে যখন হাত ধরেছিস তখন এইটুকু বিশ্বাস রাখ যে আমি যাই করবো আমাদের ভালোর জন্যই করবো।
ইনায়া চুপ করে থাকে। কি বলবে সে ? কিছুই বলার নেই তার। এখন শেষ ভরসা আবরার। ও ছাড়া কেউ নেই যাকে ইনায়া বিশ্বাস করবে। পরিবার ছেড়ে সে নিজেই তো আবরারের হাত ধরে বেরিয়ে এসেছে। যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই তা ইনায়া নিজেও মানে। এতোদিনে ও তার বড় আব্বু , বাবা কেউ তাকে বিশ্বাস করলো না। রিকশাটা বাসস্ট্যান্ড এ আসতেই ভাড়া মিটিয়ে রিকশা থেকে নেমে পড়ে তারা।
------------
বাস আসতে দেরি আছে আধ ঘন্টা। কাউন্টারে বসে আছে আবরার-ইনায়া। আকাশে ডাক দিচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া বইছে চারদিকে। বৈশাখ মাসের বৃষ্টির বিশ্বাস নেই যেকোনো সময় আকাশ ছিঁড়ে বৃষ্টি নামতে পারে। তার আগেই বাস এলে ভালো না হয় দু'জনেই ভিজে যাবে। নিজের ভিজে যাওয়া নিয়ে চিন্তা নেই আবরারের। তার সব চিন্তা তো এখন ইনায়াকে নিয়ে। গায়ে সামান্য একটা সিল্কের শাড়ি। যদি বৃষ্টি তে ভিজে যায় তাহলে শরীরের বিভিন্ন অংশ প্রতীয়মান হবে। যা আবরার বেঁচে থাকতে হতে দিতে পারে না। নিজের মনে মনে কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই ইনায়ার দিকে তাকায় আবরার। তার পাশেই বসা , দৃষ্টি বাহিরে রাখা। যেনো কতো কি ভাবছে। রাত থেকে কিছু না খাওয়ার ফলে মুখটা এতোটুকুন হয়ে গেছে।
--" কিছু খাবি? রাত থেকে তো কিছু খাসনি।"
--" না ভাইয়া, শুধু একটু পানি খাবো।"
--" তুই এখানে বস আমি যাবো আর আসবো। কোথাও যাবি না , আমি আসা ছাড়া !"
--"ঠিক আছে ।"
----------------
আকাশ ছিঁড়ে ধরনীতে বৃষ্টি নেমেছে ঘন্টা খানেক আগে। ভোর হতে আর এক ঘণ্টা বাকি। হাইওয়ে রোডে বাস চলছে নিজের গতিতে। মাঝে মাঝে কিছু কার,বাস এসে ওভারটেক করে যাচ্ছে।
আবরার চোখ জানালার বাইরে নিবদ্ধ। ইনায়া ঘুমিয়ে আছে তার বক্ষবিভাজনে। আবরার এক হাতে আগলে রেখেছে তাকে। সে ইনায়াকে পেতে চেয়ে ছিলো তবে এভাবে তো পেতে চায় নি। এই ঘটনা ইনায়ার মনে কতটুকু প্রভাব ফেলেছে তা এখনো বুঝতে পারছে না আবরার। বাড়ি থেকে আসার পর থেকে খুব সীমিত কথাই সে বলেছে। যেটুকু আবরার জিজ্ঞেস করেছে বা বলা প্রয়োজন হয়েছে ততোটা।
ঢাকা পৌঁছে আগে থাকার একটা জায়গা খুঁজতে হবে। আবরার অফিসের কাজে ঢাকায় আসলে তাদের ঢাকার বাসায় ই থাকতো। এখন তো আর তা হবে না। ইনায়াকে বড় মুখ করে বাড়ি থেকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। এখন তাকে ভালো রাখার সম্পূর্ণ দায়িত্ব তার। এসব ভাবতে ভাবতেই চোখটা লেগে আসে আবরারের।
----------
ফজরের আজান হয়েছে আধা ঘণ্টা আগে। নামাজ পড়ে অতিথিরা যে যার জায়গায় ঘুমিয়ে পড়লেও বাড়ির সবার চোখের ঘুম পালিয়েছে।
আশতাফ চোধুরি নিজের ঘরের ইজি চেয়ারে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। মাহমুদা বেগম আর আয়েশা বেগম এখনো কেঁদেই চলেছেন। ফজরের নামাজ আদায় করে দুজনে ইনায়ার ঘরে এসেছিলো। মেঘা বেগম তাদের সামলানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেন না।
ইরফান , তানভীর নিজেদের ঘরে শুয়ে আছে। আদরের বোনের শোকে সবার অবস্থা খারাপ।
সবে আঠারোতে পা দিয়েছে ইনায়ার। সংসারের কিছুই বুঝে না মেয়েটা । আবরার ও ছেলে মানুষ। দুজনে মিলে কি করবে না করবে আল্লাহ্ ভালো জানে।
তিহু সেই রাত থেকে কেঁদেই চলেছে। তাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে তাসপি। মেঘা বেগম বার বার তাসপিকে একটু ঘুমাতে বলে গেছে। কিন্তু তারা ঘুমাতে পারছে না। আদরের ভাই - বোন গুলোকে দূরে যেতে দিতে হবে ভাবতে পারেনি কেউই।