সে আমার পূর্ণতা

পর্ব - ১০

🟢

তারপর ইনায়ার হাতটা শক্ত করে ধরে হাঁটা দেয় ঘরের বাহিরে, অপেক্ষারত আবরারের কাছে।

আয়েশা বেগম ইনায়াকে নিয়ে ঘর থেকে বের হতেই দেখে আবরার বারান্দার রেলিং এ হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবরার কে ডাক দেন। অন্যমনস্ক থাকায় আবরার তার ডাক শুনতে পায় নি।

আয়েশা বেগম ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আবরারের পাশে দাঁড়িয়ে আবরারকে ডাক দেন।

--" আবরার আব্বা?"

--" জ্......জ্বি মামনি ? বলো "

--" ইনায়া"

--" ওহ ইনায়া তৈরি হয়ে গেছে?"

--" তুই ঠিক আছিস আব্বা? আমি জানি তুই ভুল সিদ্ধান্ত নিবি না। তাও আরেক বার ভেবে দেখ আব্বা।"

--" না মামনি। আমার সিদ্ধান্তের আর কোনো বদল হবে না। যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে থাকার কোনো প্রয়োজন নেই। আর কাল তাসপির বিয়ে নানান লোক আসবে , নানান কথা হবে আমি চাইনা অন্বিতা তাতে কষ্ট পাক।"

--" সাবধানে থাকিস তোরা দুজনে। কখনো কোনো দরকার পড়লে মামনিকে বলবি। "

--" আসি মামনি।"

তাদের কথা শেষে আবরার ইনায়ার কাছে আসে। ইনায়ার দৃষ্টি মেঝেতেই সীমাবদ্ধ। এক রাতেই মেয়েটার চেহারার কি দশা হয়েছে। চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। মুখ শুকিয়ে এতোটুকু হয়ে গেছে। চুল গুলো উষ্কখুষ্ক হয়ে গেছে। ইনায়ার পা থেকে মাথা অব্দি একবার পরোখ করে ইনায়ার হাতটা শক্ত করে ধরে হাঁটা দেয় সিঁড়ির দিকে। তাদের জন্য ঢাকার বাসের দুটো টিকেট সে আগে থেকেই কেটে রেখেছে।

-----------

--" দাঁড়াও আবরার।"

সিঁড়ি পেরিয়ে ড্রয়িং রুমের মাঝামাঝিতে আসতেই আশতাফ চৌধুরি আবরার আর ইনায়াকে পেছন থেকে ডাক দেয় , দু'জনে দাঁড়িয়ে পড়ে। পিছনে তাকিয়ে দেখে তিনি সোফায় বসা। তার ডাকে ইনায়া আবরার তার দিকে ফিরে দাঁড়ায়।

--" কোথায় যাচ্ছ?"

--" যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে থাকার কোনো প্রয়োজন আমি মনে করি না।"

--" তোমার যাওয়ার তুমি যাও। তুমি কোন সাহসে নিজের সাথে ইনায়াকে নিয়ে যাচ্ছো?"

--" সাহস? কি হ্যসকর না আব্বু। আপনি মনে হয় ভুলে যাচ্ছেন যে এক ঘণ্টা আগেই সেই সাহস এবং অধিকার আপনারা আমাকে দিয়ে দিয়েছেন।"

--"তাতে কি হয়েছে? ও আমাদের বাড়ির মেয়ে ওর ভালো খারাপ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আমাদের আছে।"

-- " আপনাদের শুধু বাড়ির মেয়ে! এন্ড ইউ নো আই আম হার হ্যাজবেন্ড।"

--" স্বামী বলে কি জোর খাটাবে ওর উপর? ও যেতে চায় কিনা সেটা জিজ্ঞেস করেছো?"

আবরারের গলার আওয়াজ খানিকটা ক্ষীণ হয়ে যায় বাবার এই প্রশ্নে। সত্যিই তো সে তো ইনায়াকে জিজ্ঞেস করেনি যাবে কিনা?এখন যদি ইনায়া না করে দেয় আবরার কে। যদি বলে ওর সাথে যাবে না ! তাহলে তখন কি করবে আবরার। ওর যে মায়ের পর ইনায়া ছাড়া কেউ নেই আপন বলতে। ইনায়ার যে সবাই আছে , ও কাকে নিয়ে বাঁচবে ওই একলা শহরে? ও যে বাসের ও দুটো টিকেট কেটেছে ; তবে কি তাকে খালি হাতে যেতে হবে।

আবরার চুপ করে আছে দেখে আশতাফ চৌধুরি মুখ খুললেন।

--" কি হলো , কথা বলছো না কেন?"

নিজেকে সামলায় আবরার। না , না এমন কিছুই হবে না। সে শুধু শুধুই বেশি চিন্তা করছে। নিজের চিন্তাকে একপাশে রেখে ঠান্ডা স্বরে বাবাকে বললো;-

--" জিজ্ঞেস করো ওকে। ও যদি যেতে না চায় তবে থাকুক।"

কথাটা নিজের মনের উপর এক প্রকার জোর খাটিয়েই বললো আবরার। তার কথায় আশতাফ চোধুরি ইনায়ার সামনে এসে তার মাথায় হাত রেখে সুধায় ।

--" তুমি কি আবরারের সাথে যাবে আম্মু?"

বাবা করা প্রশ্নটায় আবরারের থড়ের প্রাণ পাখিটা ঝাপটানো শুরু করে।অসহায় চোখে ইনায়ার দিকে তাকায়। যেনো চোখ দিয়েই বলছে প্লিজ ইনায়া আমাকে " ফিরিয়ে দিওনা অন্বিতা। শেষবারের মতো একটু বিশ্বাস করে হাতটা ধরো।" এবার যদি ইনায়া তাকে না করে দেয়। কি করবে সে ? কাকে দেখাবে এই কষ্ট ; তার যে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে " অন্বিতা আমার হাতটা ছাড়িস না দয়া করে। আমি শেষ হয়ে যাবো। নিজের মনে মনে বার বার আল্লাহ কে স্মরণ করছে আবরার। এমন কিছু শোনার আগে তার মৃত্যু হোক। নিজেকে শক্ত করে সে ; দুচোখ বন্ধ করে পুরো মুখে একবার হাত বুলায়।

--" যাবো , আমি যাবো আববার ভাইয়ের সাথে।"

" যাবো" কথাটা কর্ণগোচর হতেই চট করে চোখ খুলে ফেলে আবরার। কি শুনলো সে এইমাএ? ইনায়া তার সাথে যাবে বলেছে ; আহ শান্তি। ইনায়ার উত্তর পেতেই নিজের আগের রুপে ফিরে আসে আবরার। দু'হাত একবার চুলের ফাঁকে গলিয়ে আশতাফ চৌধুরি কে বললো:-

--" শুনেছেন তো? ও যাবে বলেছে , আমার সাথেই যাবে বলেছে।"

ইনায়ার কথায় তখনি নিজের হাতটা ইনায়ার মাথা থেকে সরিয়ে ফেলে। আবরারের গা জ্বালানো কথায় জেনো নিজেকে নিজেরই গাল-গল্প দিতে ইচ্ছে হচ্ছে তার । কি জন্য জিজ্ঞেস করতে গেলো।

--" হ্যাঁ, হ্যাঁ শুনেছি।"

--" তাহলে নিশ্চয়ই এখন আর আমাদের উপপস সরি অন্বিতা কে আটকানোর কোনো কারণ নেই। আসছি , ভালো থাকবেন ।"

--"ভাইয়া প্লিজ যেও না। কাল আমার বিয়ে । সারাজীবনের জন্য চলে যাবো এই বাড়ি থেকে। তোমাদের ছাড়া কিভাবে আমি বিদায় নেবো?"

তাসপির কথায় ওর কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আবরার।

--" দূর পাগল। আমি কি দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছি নাকি তোর বোনকে নিয়ে। বিয়ের পর তোর জামাইকে নিয়ে আমাদের বাসায় যাবি নে।"

কথা শেষ করেই একজোড়া নবদম্পতি বেরিয়ে গেলো চৌধুরি বাড়ির চৌকাঠ মাড়িয়ে। তাদের আটকানোর সাধ্য কারো ছিলো না। তাদের সাথে যেনো হাসি , আনন্দ গুলোও তলপি-তলফা গুছিয়ে চৌধুরি বাড়ি ছাড়া হলো। রেখে গেলো দুই মায়ের চোখে পানি; আর চার ভাই-বোনের মনে হাহাকার।

Story Cover