উমরান তাওসিফ চৌধুরী; ডক্টর ওলিউল্লাহ চৌধুরি এবং তাহুরা চৌধুরির একমাত্র পুত্রসন্তান। ডক্টর ওলিউল্লাহ চৌধুরি হলেন দেশের নামকরা একজন নিউরোসার্জন। ভীষণ কঠোর এবং ন্যায়পরায়ণ একজন মানুষ তিনি। আর মমতাময়ী মা তাহুরা চৌধুরি- একজন গৃহিণী।
ছোট থেকেই উমরান ছিল আলাদারকম। তার বয়সী ছেলেরা যেখানে খেলাধুলা-দুষ্টুমি নিয়ে পড়ে থাকতো, সেখানে বইয়ের পাতায় তার সময় কাটত বেশি। যা করত, মন দিয়ে করত।
তুচ্ছ বিষয়ে হাসাহাসি করা তার স্বভাবে ছিলনা কোনোকালে। তার মায়ের মতে, হাসলে তার ছেলের ট্যাক্স দিতে হয় সরকারকে।
উমরান ছোটবেলা থেকে খুব মেধাবী। ক্লাসে কখনো ফার্স্ট হওয়ার জন্য লড়াই করত না, তাও তাকে টেক্কা দেওয়া অসম্ভব প্রায় ছিল।
মাধ্যমিক পাশ করে যখন কলেজে ভর্তি হয়, সেনাবাহিনীতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তখনই তার মাথায় পোক্ত হয়ে বসে। দেশের জন্য কিছু করার দৃঢ় বাসনা তার ভেতরে নীরবে জন্ম নিচ্ছিল তখন।
উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেই উমরান আবেদন করে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে। প্রথমবারেই টিকে যায় কঠোর বাছাই পরীক্ষায়। শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা আর আত্মনিয়ন্ত্রণ- সব মিলিয়ে সে তৈরিই ছিল।
BMA-তে তার জীবন ছিল ছকে বাঁধা। ভোরের কুয়াশায় দৌড়, রক্তিম সূর্যের নিচে অস্ত্রচর্চা, আর গভীর রাতে কৌশলগত পাঠ - এই ছিল তার নতুন জীবন। অনেকেই ক্লান্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিলেও উমরান কখনো দেয়নি। বরং দিনে দিনে নিজেকে আরও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছে, আরও আত্মবিশ্বাসী হয়েছে এবং নিজেকে তৈরি করেছে দেশের জন্য।
বিশ বছর বয়সে সে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে যোগ দেয়। সেদিন ইউনিফর্ম পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেই যেন নিজেকে নতুন করে চিনেছিল। এবং একজন ছেলে থেকে পুরুষে রূপান্তরিত হচ্ছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পদ বাড়তে থাকে। দায়িত্ব আর মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে বাইশ বছর বয়সে লেফটেন্যান্ট পদে যোগ দেয়। আর অভিজ্ঞতার পরিধি বাড়ার সাথে সাথে চব্বিশ বছর বয়সে এসে কৌশল আর মানুষের জীবন রক্ষার গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে ক্যাপ্টেন পদে আসীন হয়।
ক্যারিয়ারের এই পুরো জার্নিটির পাশাপাশি সে সম্পন্ন করে ট্যাকটিক্যাল কমান্ড ট্রেনিং এবং জুনিয়র স্টাফ কোর্স। তার অসাধারণ শৃঙ্খলা ও নেতৃত্বগুণের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে পাঠানো হয় দক্ষিণ কোরিয়ার গ্লোবাল মিলিটারি লিডারশিপ এন্ড স্ট্রেটেজিক কমান্ড প্রোগ্রাম নামের একটি বিশেষ লিডারশিপ প্রোগ্রামে।
সেখানে সে বহুজাতিক সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যৌথ প্রশিক্ষণে অংশ নেয়, যেখানে শেখানো হয় আধুনিক যুদ্ধকৌশল, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং উচ্চপর্যায়ের সামরিক নেতৃত্ব। প্রযুক্তিনির্ভর কোরিয়ান সামরিক শৃঙ্খলা ও কঠোর অনুশাসন লাভ করে এসে তার ব্যক্তিত্ব আরও দৃঢ় ও সংযত হয়ে উঠলো যেন।
এবং অবশেষে সবরকম অভিজ্ঞতা নিয়ে ঊনত্রিশ বছর বয়সে এসে ক্যাপ্টেন পদ থেকে উন্নতি লাভ করে হয়ে ওঠেন মেজর; মেজর উমরান তাওসিফ চৌধুরী।
বুদ্ধিকাল থেকে এই অব্দি উমরান তাওসিফের জীবনে কোনো নারীসঙ্গ ছিল না। দায়িত্ব আর কর্তব্যের চাপে ব্যক্তিগত বিশেষ কোনো অনুভূতি সে তেমন অনুভব করে উঠতে পারে নি, কিংবা হয়তো তেমন কোনো মানুষের আবির্ভাবই ঘটেনি কখনো তার জীবনে। বহু নারীর তরফ থেকে ইঙ্গিত পেলেও আগ্রহ অনুভব করেননি ভেতর থেকে। কঠোর দায়িত্ববোধ আর আত্মসংযম নিয়ে কাটিয়েছেন জীবনের ঊনত্রিশটি বছর।
সেই কঠোর, দৃঢ়মনা এবং আত্মসংযমপূর্ণ মানুষটি কিনা আজ নিজের তুলনায় নিতান্তই বাচ্চা একটি মেয়ের ভেতর নিজেকে খুইয়ে ফেলেছিল কয়েক মুহূর্তের জন্য। একটি কিশোরি মেয়ের চোখের গভীরতায় পড়ে নিজের এত বছরের সংযমের বলি দিয়ে দিতে যাচ্ছিলেন। এতটাই মোহাগ্রস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে ঠিক-ভুল আর নিজের ব্যক্তিত্ব ভুলে বসেছিলেন এক মুহূর্তে। অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে ফেলেছেন একটি বাচ্চা মেয়েকে। যে হয়তো তার কাছে এখন নিজেকে আনসেইফ ভাবতেও দ্বিধাবোধ করবেনা।
মেয়েটি তাকে তখন আঘাত করে কোনোভাবে পালিয়েছে। এটা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? উমরানের নিজেরই তো বিশ্বাস হচ্ছেনা। জাগতিক সবকিছু ভুলে একটি মেয়েতে সে এতটাই ডুবে গিয়েছিল? শ্রেয়সী চলে যাওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরেই তার হুশ ফিরেছে, আর নিজেকে চিনতে এত অসুবিধা হচ্ছে।
সময়টা সেদিনই গভীর রাতে,
চারপাশ নিস্তব্ধ, শুধু ট্যাবের পানির টুপটাপ শব্দ আর নিজের তীব্রগতির শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতিধ্বনি। হাত বাড়িয়ে বেসিনের ট্যাব ঘুরাতেই ঠাণ্ডা পানি গড়িয়ে পড়ল সাদা সিরামিকের গায়ে। উমরান দু’হাত ভরে পানি তুলে মুখে ঝাপটা দিলেন।
একবার নয়, দুইবার নয়- বারবার। যেন ঠাণ্ডা পানির সংস্পর্শে নিজেকে একটু স্বস্তি দেওয়ার প্রয়াস।
আয়নার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে সে। পুরুষালি চোয়ালের পেশি বরাবরের ন্যায় শক্ত, কপালে জমে থাকা পানিবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। জোরে পানি ঝাপটা দেওয়ায় সম্মুখের চুলগুলোও ভিজে গেছে। ধীরে ধীরে মুখ তুলে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকালেন উমরান তাওসিফ। চোখে চাপা অস্থিরতা, তাও গাম্ভীর্যটুকু স্পষ্ট।
আয়নায় নিজের দিকে চেয়ে সে কিছু ভাবছে। উহু ভাবছেনা, মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। কিন্তু কাজ হলোনা বোধ হয়।
আয়নায় আবার নিজের প্রতিবিম্বের পাশে দৌড়াতে থাকা এক মেয়েকে দেখা যাচ্ছে। সিংকে হাতের ঠেস দিয়ে মাথা নিচু করে থাকা উমরান তেরচা চোখে তাকান বিকেলের দৃ্ৃশ্যটি হতে সৃষ্ট ঐ কাল্পনিক রুপপানে।
তখনো গম্ভীর তার চেহারা। সেভাবেই দৃৃশ্যটি দেখতে দেখতে চোখ বন্ধ করে ফেলেন। বিরক্তির রেশ দেখা গেলো বোধ হয় অল্প একটু। কিন্তু চোখ বুজেও ক্ষান্ত নেয় তার মস্তিষ্ক। দৌড়াতে দৌড়াতে বলে যাওয়া ঐ সুরেলা শব্দগুলো কানে বাজছে। মেয়েটি তাকে হুম ‘কি দিচ্ছে যেন তার কাছে না যায় সামনে থেকে। বন্ধ চোখেই ভ্রু কুঁচকে যেতে দেখা যায় মেজরের। মাথাটা কাত করে আরেকটু বিরক্তি ফুঁটিয়ে তুললেন চেহারায়।
প্রথম দিন থেকে অদ্ভুদ অদ্ভুদ ঘটনা ঘটছে তার সাথে। চারদিকে এই মেয়ে। সেদিন যখন প্রথমবার তার চেহারাটা দেখলো। তখনই হৃদয়ের কোথাও একটা কম্পন অনুভব করেছিল সে। মাথা তুলে কৌতূহলী নেত্রে তাকেই দেখছিল মেয়েটি। মুখের উপর এলোমেলো হয়ে কিছু চুল সেটে ছিল। চুলের কারণে কিছুটা বিরক্তি, আর চোখে উমরানকে নিয়ে কৌতূহল। উমরানের চোখে অসম্ভব নান্দনিক একটি দৃশ্য ছিল তা। তখনই বোধ হয় যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেছে। শুধু উমরান উপলব্দি করতে পারেননি।
সেসব গেলো,
এইতো কিছুদিন আগে বিকেলে রুটিনের ফাঁকা সময়ে সেনানিবাসের বাইরে খোলামেলা জায়গায় হাটছিলেন সে। হাঁটতে হাঁটতে কারো সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল। আশ্রমের বাচ্চাদের দেখা যায় সেখানে খেলতে। পাশ দিয়ে যখন একটি হাওয়ায় মিঠাই ওয়ালা দেখা যায়, তখন উমরান বাচ্চাদের দিকে একপলক তাকিয়ে হাওয়ায় মিঠাই ওয়ালাকে দাড়াতে বলেন। আর বাচ্চাদের ডেকে প্রত্যেককে কিনে দেন। বাচ্চাদের সে কি উচ্ছাস। তখন বেশ অনেকক্ষণ উমরানের তাদের সাথে গল্প করা হয়। বাচ্চারা কথায় কথায় নিজেরাই শ্রেয়সীর কথা তুলে।
এভাবে সে-ই তাদের এটা ওটা কিনে দেয় প্রত্যেকবার। আজ মেজর দিয়েছে, তাই ধন্যবাদ জানায়। কিন্তু শ্রেয়সীকে নিয়ে কথা বলায় উমরান তার সম্পর্কে জেনেও সে কে জানতে চায়।
ব্যাস, বাচ্চারা আর যথোপযুক্ত কিই বা উত্তর দেবে। তারা শ্রেয়সী তাদের খেলার সাথী, এখানে ওখানে যায়। তাদের ম্যাজিক গার্ল - এসব জানায়। আরও কতশত কথা শ্রেয়সীকে নিয়ে। এত উৎফুল্ল হয়ে তার সম্পর্কে বলছিল যে, উমরানের মনে হচ্ছিল তাদের মেয়েটিকে নিয়ে কথা আজ শেষই হবেনা। কিন্তু শুরু থেকে শেষ অব্দি শ্রেয়সীকে তারা পরী বলেই সম্বোধন করেছে। নাম নেয়নি। উমরান তো ভেবেছিলেন মেয়েটির নাম পরী। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কথায় কথায় জানতে পারেন, পরী তারাই ডাকে। ম্যাজিক গার্লকে পরী নাম দিয়েছে তারা। আসল নাম এটা নয়। তবে আত্মসংকোচে আর জিজ্ঞেস করা হয়না তার আসল নাম।
এই... ঠিক এভাবে সেদিন থেকে চারপাশটা, চারপাশের মানুষগুলো তার মাথায় ঐ বাচ্চা মেয়েটিকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আনমনে তাকে নিয়ে আগ্রহ জেগেছে এত এত কথা শুনে মেয়েটির সম্পর্কে।
আবার আজ মেয়েটির কাছ থেকে ফিরে নিজেকে বুঝতে চাইছিল, এমন সময় এক সেনাকে বলতে শুনলো, তাদেরই আরেক অফিসার; ক্যাপ্টেন রাওফান- সে নাকি হামিদ নেওয়াজের মেয়েকে পছন্দ করে, অথবা বিরক্ত করে - এমন কিছু। আজ বিকেলেও রাওফানকে তার আশেপাশে দেখা গেছে। কিন্তু শ্রেয়সীর দায়িত্বরত সৈন্যরা একথা কর্নেল সাহেবের কানে তুলতে ভয় পাচ্ছে। যদি দুপক্ষ থেকেই পছন্দ থেকে থাকে, তাহলে শ্রেয়সীর সুস্থ জীবন-যাপন আর বেড়ে উঠায় তাদের হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়, আর নাতো তার অভিভাবককে এভাবে গিয়ে জানিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু আবার যদি বিরক্ত হয়ে থাকে, তাহলে? মূলত তারা দ্বিধায় আছে কি করবে।
উমরান তাদের এসব কথোপকথন শুনেছেন। বুঝেছেন তার কাছ থেকে পালানোর পর দেখা গেছে রাওফান আর মেয়েটিকে একসাথে। তখন থেকেই মনটা অন্যরকম অস্থির ছিল। কি জন্য, আর কিসের এই অস্থিরতা সে কিছুই জানেনা।
মেজর উমরান কিশোরি একটি মেয়েকে নিয়ে উল্টাপাল্টা ভাবতে চাইছেনা আর। এসব তার সাথে যায়না। আর না তো ঐ মেয়েটির সাথে সে যায়।
____
দুদিন পর,
_“উমরান, তুমি কি নিশ্চিত? নাকি এটা শুধু সন্দেহ বা অনুমান?”
_”স্যার, গত তিনটি রিপোর্টেই তথ্যের গরমিল আছে। আর সবগুলোই কর্নেল সুলেমান স্যারের অফিস দিয়ে পাস হয়েছে। আজ আবার উনার গাড়ি সীমান্ত এলাকার দিকে গেছে। অথচ তার কোনো অফিসিয়াল ভিজিট শিডিউল ছিল না। এটা কাকতালীয় কিভাবে হয়?”
কর্নেল আফজাল কিবরিয়া নীরব। বুঝতে পারছেন পরিস্থিতির গভীরতা। কিয়ৎপল পর নীরবতা ভেঙে বলেন,
_“আমি জানতাম। রিপোর্টগুলো মিলছে না। ইন্টেলিজেন্স বলছে শত্রুপক্ষের সাথে ভেতরের কারো যোগাযোগ আছে। কিন্তু কর্নেল সুলেমান সাহেবের নাম কোনোভাবেই মাথায় আসেনি।” কর্নেল
_“আমি কোনো সিনিয়রের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই না, স্যার। কিন্তু যদি আমরা চোখ বন্ধ রাখি, তাহলে এর মাশুল দিতে হবে পুরো ইউনিটকে… “
এক মুহূর্ত থামলেন মেজর,
_“তাই যতক্ষণ আমরা নিশ্চিত না হচ্ছি, আমাদের পরিকল্পনাগুলো সীমিত আকারেই আলোচনা করতে হবে। শুধু বিশ্বাসযোগ্য লোকজনের মধ্যেই।”
ঘড়িতে রাত আটটা। সেনানিবাসের স্ট্র্যাটেজিক কন্ট্রোল রুমে হালকা নীল আলো জ্বলছে। যেখানে মেজর উমরান তাওসিফ আর কর্নেল আফজাল কিবরিয়া উপস্থিত আছেন, আলোচনা করছেন। দেয়ালের বড় স্ক্রিনে একটি পাহাড়ি এলাকার মানচিত্র, লাল মার্কারে চিহ্নিত একটি নির্দিষ্ট লোকেশন। মেজর উমরান তা সামনে রেখে কর্নেল আফজাল কিবরিয়াকে কিছু দেখিয়ে কথাগুলো বলছিলেন। তার কথা শুনে কর্নেল ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন,
_”মিশন হেড তুমি উমরান, তোমার নেতৃত্বেই চলবে। সুতরাং তুমি যখন মনে করছ এই নিয়ে আলোচনায় মানুষ বুঝে বসতে হবে, তখন তাই হোক। তবে আগের বিষয় আগে ভাবতে হবে। এটার আগে আমাদের অন্য মিশন আছে, সেটা ফোকাসে রেখো। আর দুয়েকদিন মাত্র। তোমার নেতৃত্বে প্রথম মিশন হতে চলছে। আগে ওটা সম্পন্ন করে এদিকে মনোযোগ দেবে।”
থেমে আবার বিচলিত কণ্ঠে বলেন,
_”আচ্ছা তোমার কি এই মিশনেও যা সন্ধেহ করছ তার প্রভাব পড়বে মনে হচ্ছে নাকি?”
_”নো স্যার, আমি খতিয়ে দেখেছি। এটাতে কোনোরকম ইনভল্ভমেন্ট দেখতে পাইনি।”
কর্নেল কিছুটা স্বস্তি পেলেন।
দুজনের একান্ত মিটিং শেষ হয়। রাত ততক্ষণে নয়টার কাছাকাছি। মেজর উমরান বাকি আরও কিছু কাজ সেরে তবেই বেরোন। বাইরে গিয়ে কর্নেল কিবরিয়া স্যারকে নিজের গাড়ির পাশে দাড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে যান।
_”কোনো সমস্যা স্যার?” উমরানের কণ্ঠ শুনে কর্নেল সাহেব পেছন ফিরে তাকান।
_”আর বলো না, গাড়ি স্টার্ট হচ্ছেনা। ইঞ্জিনে কি সমস্যা নাকি…” কর্নেল সাহেবের মুখে বিরক্তি দেখা যায়।
উমরান চেহারায় গাম্ভীর্য টেনে দেখে নেন ড্রাইভারের পাশে দাড়িয়ে। এদিক ওদিক দেখে বলেন,
_”স্যার, আই থিংক সময় লাগবে। আপনি চাইলে আমার জিপটা নিতে পারেন। আমার সমস্যা হবেনা।”
_”আ… তুমি কি কোয়ার্টারে ফিরবে?”
_”না, একটু বাজার যাবো। কিছু দরকারি কেনাকাঁটা আছে।”
_”তাহলে তো ভালোই হলো। আমিও বাজারেই যাবো। কেনাকাঁটা আছে আমারও। চলো তাহলে একসাথেই যায়।”
জিপ টান দিয়ে দুজনে চলে যায় বাজারের দিকে। কর্নেল সাহেব উমরানের বাবার পূর্ব পরিচিত। তেমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক না হলেও মুটামুটি জানা শুনা আছে। বিশেষ করে উমরানের বাবার সাথে। পারিবারিক নানান কথা হয় যেতে যেতে। কথায় কথায় উমরান জানতে চান,
_”স্যার, আপনি এখান থেকে বাজার করেন সবসময়? না মানে এখান থেকে এসব বাড়ি নিয়ে যেতে যেতে তো অনেক সময়। তাছাড়া আপনাদের ওখানকার বাজারে আরও ভালোমানের পাওয়া যায় সবকিছু।”
_”না না, আমি বাড়ির জন্য। মানে বলতে চাইছি স্ত্রীর জন্য নিচ্ছিনা। হামিদ নেওয়াজকে তো জানো, আমার বন্ধু হয়। তার মেয়ে আর আমার মা এখানে থাকেন। হামিদের বাড়িতেই, এই তো দশ/পনেরো মিনিটের দূরত্ব। তাদের জন্য করবো বাজার। অবশ্য সবসময় বাজার করে দেওয়া আমার সম্ভব হয়ে উঠেনা। তোমার সৈন্য শাহিন, সেই করে দেয়। আজ আমি মা আর মেয়েটাকে দেখতে যাবো, অনেকদিন যাওয়া হয়না ব্যস্ততায়। তাই কিছু দরকারি জিনিসপত্র, বাজার সাঁঁজার নিয়ে তবেই যাবো ভাবছি।”
উমরানের চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলো বোধ হয়। যদিও তাতে তার ভেতর ঠিক কি চলছে বুঝা মুশকিল। বেশি কিছু বলেন নি আর। শুধু ছোট্ট করে জবাব দেন,
_”জি বুঝতে পেরেছি।”
এরপর কর্নেল সাহেব নিজে নিজেই বলতে শুরু করলেন,
_”মেয়েটার পরীক্ষা বুঝলে? এবার S.S.C দেবে। পড়ালেখার বিষয়ে খুব উদাসীন থাকে সারাবছর। এখন নিশ্চিত দিনরাত এক করে পড়ছে। একটু মনোবল বাড়িয়ে না আসলে পরে বলবে তার কর্নেল আঙ্কেল তাকে ভালোবাসেনা। বাচ্চা থেকে গেছে এখনো মেয়েটা।” নিজেই বলে হালকা হেসে উঠেন।
_”মেয়েটাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তায় থাকি। আমার ইচ্ছে ছিল লেখাপড়া করিয়ে বড় কিছু তৈরি করবো। কিন্তু এসব দুনিয়াবি বিষয় আর বাস্তবতা সম্পর্কে বুঝ কম তার। নরম স্বভাবের, খুব আবেগী। ওকে দিয়ে হবেনা যা ভেবেছি তা। উচ্চ মাধ্যমিক পর একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দেবো। কিন্তু বুঝেছ উমরান? এতেও আমার চিন্তার শেষ নেই। বন্ধু আমার কারি কারি প্রপার্টি রেখে গেছে, এই প্রপার্টির লোভেই বাচ্চা মেয়েটাকে ইতোমধ্যেই কতজন যে চেয়ে বসে আছে আমার কাছে। আমার ভীষণ ভয় হয়, কখন না জানি এই নিয়ে মেয়েটাকে বিপদে পড়তে হয়। কর্নেল সুলেমান সাহেবের ছেলে, রাওফান; ঐ যে ক্যাপ্টেন পদে আছে ছেলেটা? সে প্রতিনিয়ত মেয়েটাকে বিরক্ত করে এই প্রপার্টির লোভেই। মেয়ে এসব আমাকে জানায়না, হয়তো জানলে ভালো ছেলে ভেবে রাওফানের সাথে বিয়ে দিয়ে দেবো - এই নিয়ে ভয় পায়। পাগলি, নিজে নিজে অনেকরকম চিন্তা করে।” কিছুটা হেসে উঠেন।
_“আমার একটা ছেলে সন্তান থাকলে এত চিন্তা থাকতোনা। নিজের বাড়িতেই তুলে ফেলতাম সারাজীবনের জন্য। কিন্তু ছেলে দুইটা বেশ দেরি করে দুনিয়ায় এলো।” রসিকভাবে আফসোসের সহিত বলেন তিনি। তার একপক্ষের ঘরে দুজন মেয়ে, আর অপরপক্ষের ঘরে দু ছেলে, এক মেয়ে আছে। তবে জমজ ছেলে দুটো শ্রেয়সীর ছোট। উমরান আর তার পরিবার যেহেতু কর্নেল সাহেবের পূর্ব পরিচিত। তাদের সম্পর্কে জানা আছে। বিশ্বস্ত মানুষ তারা। উমরানকেও আর্মিতে জয়েন করার পর থেকেই দেখে আসছেন। তার প্রতি সবসময় অন্যরকম আস্থা কাজ করে। তাই এসব গোপন কথাগুলো বলতে সামান্যও দ্বিধাবোধ করলেন না বোধ হয়।
_”তা তুমি কবে বিয়ে করছ? ওলিউল্লাহ সাহেবের তো বয়স হচ্ছে। বউমা এনে দাও তাদের। নাতি নাতনির স্বাদ পাক, এটাই তো উপযুক্ত সময়।”
উমরানের হাতের চাপ বেড়েছে বেশ আগেই। এ পর্যায়ে দৃঢ় হাত দুটো দেখে নিজের ভেতর অনুভূতি দমাচ্ছে মনে হলো। চেহারার ভাবভঙ্গিও অন্যরকম। চেপে দেওয়া অনুভূতি কেউ টেনে তুলতে চাইছে বলে অত্যধিক গাম্ভীর্য দেখাচ্ছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে কিছুটা সংবরন করলেন নিজেকে। সেকেন্ড কয়েক সময় নিয়ে অল্প শব্দে বলেন,
_”এখনো তেমন কিছুই ভাবিনি স্যার।”
এরপর বেশ অনেকক্ষণ কেটে যায়। ততক্ষণে বাজারে ঢুকছে আর্মি জিপটা। নীরবতা বেদ করে অকস্মাৎ কর্নেল সাহেব উমরানের উদ্দেশ্যে আজীব একটা প্রশ্ন করেন।
_”তোমার বয়স কতো উমরান? আটাশ না?”
উমরান গাড়ি থামিয়ে কর্নেল স্যারের দিকে দৃষ্টিপাত করেন। তার মনে হচ্ছিল বেশ সময় ধরেই স্যার তার দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবছেন। হঠাৎ এই প্রশ্নের হেতুও বুঝতে পারছেনা সে। তাও জবাব দেন,
_”না স্যার, ঊনত্রিশ চলছে।”
কর্নেল স্যারের চেহারা দেখে উমরানের মনে হলো তার বয়স আরেকটু কম হলে এই মুহূর্তে স্যার সন্তুষ্ট হতেন। তবে তাও কর্নেল সাহেবকে তার দিকে ভিন্ন নজরে তাকাতে দেখা গেলো। হঠাৎ অভিজ্ঞ চোখ দুটো তাকে পরখ করছে। উমরান বুঝেও আর কিছু জানতে চাইলেন না। ততক্ষণে দুজনে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। হাঁটতে হাঁটতে আবার কর্নেল স্যারের কণ্ঠ শুনেন,
_”ওলিউল্লাহ সাহেবের ব্যক্তিগত নাম্বারটা একটু দিও তো। আমার সেদিন ফোনে ফ্ল্যাশ দিতে হলো। সব নাম্বার চলে গেছে। একটু মেইল করে পাঠিয়ে দিও। অনেকদিন কথা হয়না উনার সাথে।”
বিচক্ষণ উমরান অনেক কিছুই আন্দাজ করে ফেললেন। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মাথা নাড়লেন। হাঁটতে হাঁটতে ঘাড়ে হাত বুলান। শাক সবজির দোকানগুলোর দিকে পা চালান দুজনে।