অতীত চলমান…
চারদিন কেটে গেছে, দমবন্ধ করা লেখাপড়া করেছে এতদিন শ্রেয়সী। সামনে বোর্ড পরীক্ষা কি না! সে ঘরবন্ধি হয়ে লেখাপড়া করতে করতে হাপিয়ে গেছে। তাই চঞ্চলাবতীর একটু খোলামেলা হাওয়ার প্রয়োজন, বাইরের পরিবেশ প্রয়োজন।
আশ্রমে এসে দুটো বাচ্চা সাথে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল সে। তার ঘুরার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই। কোথায় যাবে, কেন যাবে, গিয়ে কি করবে- কিছুই না। কারনে অকারনে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াবে সে। তার বিষয়গুলো অনেকটা “যে পাখি ঘর বুঝেনা, উড়ে বেড়ায় বন বাদাড়ে” গানের সাথে মিলে যায়।
পাহাড়ি উচু নিচু রাস্তা বেয়েই পুরো এলাকা চষে বেড়িয়ে বাচ্চাদের নিজেই আবার দিয়ে আসে আশ্রমে। আজও তাই করেছে। আজ আবার আশ্রমের প্রধান রাধুনি সবার জন্য ক্ষীর রেধেছিল। শ্রেয়সী তা পেটপুরে খেয়েছে। দীদুনের জন্যও টিফিন করে নিয়ে যাবে। এদিকে দীদুন এক ঘণ্টা সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বলেছিল, সে আড়াই ঘণ্টারও বেশি কাটিয়ে ফেলেছে। নির্ঘাত বকুনি পড়বে আজ।
_”খালা, তাড়াতাড়ি দাও। এমনিতেও অনেক দেরি হয়ে গেছে। এত্ত এত কথা শুনাবে আজ বুড়ি।”
_”হয়েছে, আর একটু। বক্সে পলিথিনটা ভালো করে মুড়িয়ে না দিলে তো সারা পথ নাচতে নাচতে যাওয়ার সময় সব ফেলে দেবে। তখন?”
_”আমি কি সবসময় ধেয় ধেয় করি নাকি আজব?”
_”সে নাহয় করো না। কিন্তু শান্তভাবে, ঠিকভাবে হাঁটাচলা করো?”
_”উফ, তোমরা খালি আমার ভুল ধরো। আমার ভুল ধরতে ধরতেই জীবনের অর্ধেক সময় চলে যাবে তোমাদের। এখন তাড়াতাড়ি বক্সটা দাও।”
খালা ঠিকঠাক পলিথিন খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সবগুলোই ফুঁটো, নাহয় টিফিনবক্স তুলনায় ছোট। অবশেষে ঠিকঠাক একটা পেয়ে সুন্দর করে মুড়িয়ে দেন, গিট্টু লাগিয়ে দেন। তারপর অধৈর্য শ্রেয়সীর হাতে ধরিয়ে বলেন,
_”এই নাও, সাবধানে যাবে। আর বেশি লাম্পজাম্প করবেনা। উষ্ঠা খেয়ে না আবার পা ভেঙে বসে থাকো পরীক্ষার আগে।”
শ্রেয়সী খালার গালে একটা আদুরে চুমু এঁকে দিয়ে বাচ্চাদের বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পরে।
চাইলেই গাড়িতে যাওয়া যাবে। ছোট ছোট পাহাড়ি জিপগুলোতে সাচ্ছ্যন্দে যাওয়া যায়। কিন্তু শ্রেয়সী ভেতর ভেতর দিক থেকে চা বাগান পার করে শর্টকাট পথ ধরে যাবে। শর্টকাটে কিভাবে যাওয়া যায়, না যায়- সব জানা তার। তাই গাড়ির দরকার পড়েনা। দীদুন অবশ্য রাস্তা বেয়ে জিপে করে আসতে বলে দেয় প্রত্যেকবার, কিন্তু সে শুনলে তো?
সময়টা বিকেল। বসন্তের নরম হাওয়া গাল বেয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। দূর পাহাড়গুলো হালকা নীলাভ আবছায় মিশে আছে আকাশের কোণে। শ্রেয়সী আপনমনে গুণগুণ করে গান গাইতে গাইতে নিজ গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। পেট অব্দি সাদা হাফ স্লিভ টপ্স, আর হালকা স্কার্টে তাকে কোমল দেখাচ্ছে। পায়ে পায়ে বসন্তের রেশ।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎই পেছনে কারও অস্তিত্বের টের পেল সে। তাকিয়ে দেখে সেদিনের সেই লোকটা। যে তাবাসসুমকে ভয় পাইয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিল। শ্রেয়সী তেমন পাত্তা দিল না। মুখ ফিরিয়ে হাঁটতে থাকে।
উমরান তখন ফোনে মনোযোগ দিয়ে হাঁটছিলেন। পাশের রাস্তা বেয়ে এই পথটিতে আসা। রুটিনের ফাঁকে একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা। ট্র্যাক প্যান্ট, সাধারণ টি-শার্ট, আর্মি কাট চুল আর সুগঠিত দেহখানা -সব মিলিয়ে তার পুরুষালি ব্যক্তিত্বে এক ধরনের কঠোর আর সংযত সৌন্দর্য। বান্দরবানে আসার পর আশপাশটা চিনে উঠা হয়নি সেভাবে। সেই ইচ্ছাতেই বের হওয়া। সাথে থাকা অন্য এক অফিসার দরকারি কাজে ফিরে গেছেন।
শ্রেয়সীকে তখনও চোখে পরেনি। কিন্তু তার গুণগুণ করে গান গাওয়ার শব্দ কানে যেতেই কুঁচকানো কপালখানা নিয়ে ফোন থেকে চোখ তুলে তাকান হাঁটতে হাঁটতে। পেছন থেকে দেখেও শ্রেয়সীকে চিনতে কিঞ্চিৎ অসুবিধা হয়না। কিছুপল সেই ভঙ্গিতেই তাকিয়ে হাঁটেন। তারপর আস্তে করে ফোন পকেটে ঢুকান, হাতও ঢুকানো হয়, তারপর গভীরভাবে ওকে দেখতে দেখতেই হাটা হয়। পাশাপাশি চলছে এখন; কিছুটা দূূরত্ব রেখে। তেরচা চোখে শ্রেয়সীকে খেয়াল করলেও তাকে বুঝতে দেওয়া হয়না। দুজনেই আনমনে হাটছে।
_”নাম কি?”
কিছু সময় যেতেই গম্ভীর, স্বচ্ছ কণ্ঠে কথাখানা কানে আসে শ্রেয়সীর। এতক্ষণ লোকটার দিকে তেমন মনোযোগ দেয়নি সে। তবে আগের মতো হেলেদুলে না হেঁটে একটু মনোযোগ দিয়েছিল রাস্তায় -এটুকুই তফাৎ। অচেনা কারো সামনে না আবার উষ্ঠা খায়। সে নিজের মতো চলছিল। নিরিবিলি এই পাহাড়ি রাস্তাটায় যদিও তারা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই, তাও আদৌ লোকটা তাকেই জিজ্ঞেস করেছে কি না বুঝতে তার দিকে তাকায়।
_”তোমাকেই বলছি।”
শ্রেয়সীর লোকটার ঐ গমগমে স্বর শুনতেই মাথায় রাগ চাপে। ভয় দেখায় খালি। তার এই কণ্ঠে ভয় লাগে, হৃদয় কাপে। সে উত্তর দেয়না। মুখ ফিরিয়ে নেয়। গাল বাকিয়ে একটু ভেংচিও কাটলো বোধ হয়।
উমরানের মেয়েটার বাচ্চাবাচ্চা কাণ্ডখানা দেখে হাসি পায়। তবে তা প্রকাশ করেননা। গাম্ভীর্য ধরে রেখে বলেন,
_”নাম বললে কি জাত চলে যায়? নাকি তুমি নাম বললেই আমি তোমার সাথে খারাপ কাজ করার সুযোগ পেয়ে যাবো? সেনাবাহিনীদের তো আবার সুযোগ পেলেই মেয়েদের সাথে বাজে কাজ করার স্বভাব তাইনা?”
শ্রেয়সীর রাগের মাত্রা বাড়লেও এই পর্যায়ে কিছুটা দমেও যায়। তাদের নিয়ে বদনাম করেছে, আবার শুনেও নিয়েছে। শাস্তি দিলে? ভেবে চুপচাপ থাকে সে।
_”ভয় পাচ্ছো?”
_”আমি ভয় পাইনা।” শ্রেয়সী তৎক্ষণাৎ জবাব দেয় দৃঢ় কণ্ঠে।
উমরান মাথা কাত করে হাঁলকা হাসেন।
_”বেশ তো, সাহসী মেয়ে। তা কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”
_”আপনাকে কেন বলবো?”
_”আমায় বললে সমস্যা?”
শ্রেয়সী জবাব দেয়না।
_”আশ্রমে তো অনেকদিন আসোনি।”
_”চারদিন” কোণা চোখে তাকিয়ে জবাব দেয় সে।
_”হু। আসোনি যে?”
_”পরীক্ষা সামনে।”
_”S.S.C দেবে?”
_”হ্যাঁ”
_”প্রস্তুতি ভালো?”
_”হ্যাঁ”
মৃদু মাথা নেড়ে উমরান গম্ভীর চেহারায় সন্তোষ প্রকাশ করেন। কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে আসে। কেবল বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ।
রাস্তার ধারে নাগ চাঁপার একটি গাছ দেখা যায়। হলুদ ফুলে ভরে আছে। বসন্তের প্রশান্ত রং। হাঁটতে হাঁটতে শ্রেয়সী আনমনে একটি ফুল ছিঁড়ে নেয়। হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে।উমরান সবটা খেয়াল করেন।
_”ফুল হাতে নিলে যে? ফুল তো হাতে মানায়না।”
শ্রেয়সী তার কণ্ঠে পাশ ফিরে তাকায়, কি বলেছে খেয়াল হতেই বুঝে নেয় ফুলটা গাছ থেকে ছি ‘ড়ে নিয়েছে বলে বলেছে কথাটি। গাছেই মানায় ফুল, তা সেও জানে। কিন্তু চোখের সামনে দেখে আনমনে নিয়ে নিয়েছে, এতকিছু মাথায় আনেনি।
_”ফুঁল মানায় দুই জায়গায়, কোথায় কোথায় জানো?”
_”হ্যাঁ, গাছেই। আর……” আর কোথায় মানায় দ্বিধায় পড়ে যায় শ্রেয়সী। আবার বলে,
_”না, দুই জায়গায় কিভাবে মানায়? গাছেই তো…” সে পুরো কথা শেষ করতে পারেনা। তার আগে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতেই তার কাছে চলে আসেন উমরান। হাত থেকে হলুদ রঙা নাগ চাঁপা ফুলটা নিয়ে নেন। শ্রেয়সী থেমে যায়, উমরান ফুলটা অকস্মাৎ তার কানে গুজে দিয়ে চোখে চোখ রেখে বলেন,
_”ফুল মানায় গাছে, আর নারীর চুলের ভাঁজে। তোমায় নাহয় কানেই গুজে দিলাম।”
শ্রেয়সী কি হলো বুঝে উঠতে পারেনি। চেয়ে থাকে লোকটার দিকে। উচ্চতায় তার চেয়ে বেশি হওয়ায় মাথা উচিয়ে তাকাতে হচ্ছে। পেখম-রাঙা ঐ দৃষ্টি মেজর উমরান চোখ ভরে দেখেন। সম্মোহিত হয়ে পড়েন নিষ্পাপ কিশোরি নয়নদুটোতে। অনেকটা কাছে এসে পড়েন শ্রেয়সীর। বসন্তের হাওয়ার সুরের সাথে সাথে মিশে যাচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাসের উষ্ণতা। অতি নৈকট্যে দুজনার মুখখানা। মেজর শ্রেয়সীর চোখ দুটো দেখতে দেখতে নাক, ঠোঁট -সহ পুরো চেহারায় চোখ বুলিয়ে নেন। আনমনে ঠোঁট দুটোর দিকে তাকিয়ে মুখটা আরেকটু কাছে এগিয়ে নেবে, ওমনি বুকে আকস্মিক এক নরম কোমল হাতের ধাক্কা অনুভব করেন। শ্রেয়সী তাকে ধা ‘ক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এতেই থামেনি, ধা ‘ক্কা দিয়ে সে দৌড়াতে শুরু করে। মেজর বুঝতে পেরে তার হাত ধরে থামাতে চায়, কিন্তু নাগাল পায়না।
_”নামটা তো বলে যাও মেয়ে।” সামান্য গলা উচিয়ে বলে উঠেন মেজর।
_”বলবো না।” শ্রেয়সী ছুটতে ছুটতে জবাব দেয়।
_”বলবো না? এটা নাম হয়?” বুঝেও ইচ্ছাকৃত কথাখানা বলেন।
_”আপনি আফ্রার বলা ঐ খারাপ সেনাবাহিনীদের মধ্যে পড়েন আমি বুঝে গেছি। যারা মেয়েদের সাথে বাজে কাজ করতে চাই সুযোগ পেলে। আমার কাছে আসার চেষ্টা করলে সামনে থেকে, তাহলে আমি কর্নেল আঙ্কেলকে বলে দেবো, তাহলে আর আপনার চাকরি থাকবেনা।”
চঞ্চলাবতী শ্রেয়সী ততক্ষণে অনেক দূরে চলে গেছে। তবে তাও তার চিল্লিয়ে বলা কথাখানা দুর্গম পাহাড়ি রাস্তায় চারদিকে বারি খেয়ে ঠিকই মেজরের কানে আসে। হেসে উঠেন সে কিশোরির হুম ‘কি শুনে।
___
_”নে, দুধটা খেয়ে নে। তারপর বাকি পড়া শেষ করিস।”
শ্রেয়সী দীদুনের কথা অমান্য করেনা। দুধ তার বেশি পছন্দও না, আবার অপছন্দও না তেমন। তাই বেশি জ্বালায়না দীদুনকে। খেয়ে নেয় চুপচাপ। তারপর আবার বইয়ে মনোযোগ দেয়। ঠোঁটের কিনারায় লেগে আছে এক ফোটা সাদা তরল। দীদুন নিজের পড়নের সাদা শাড়িটার আঁচল দিয়ে তা মুছে দেন। তারপর তাকে পড়তে দিয়ে চলে যান।
সময়টুকু কেটে যায়। রাত তখন ১১ টার ঘর পার করেছে, শ্রেয়সী তখনও পড়ছে। এই নিয়ে বকা শুনতে হয়েছে তাকে। তখন বাড়ি ফিরতে দেরি করলো, এসে ঘুমিয়ে যে পড়েছিল। তারপর উঠেছে বেশ দেরি করে। দীদুনের কতবার যে ডাকতে হয়েছে তাকে। উঠবে উঠবে করে আবার ঘুমিয়ে পড়ে। বাইরে সময় বেশি কাটিয়ে এসেছে বলে এখন রাত জেগে পড়তে হচ্ছে। তারপর কালও উঠতে দেরি হয়ে যাবে। এ কদিনে তৈরি হওয়া রুটিন ভেঙে যাবে, পড়াতেও পিছিয়ে যাবে। তাই দীদুনের বকা শুনেছে আজ খুব। সে সাধারণত রাত সাড়ে ৯টা অব্দি পড়ে। আর ১০ টা অব্দি টিভি দেখে। এর মধ্যে খেয়েও নেয়। তারপর দাদী-নাতনি গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ে। সামনে পরীক্ষা বলে এখন টিভি দেখা বন্ধ। দুজনে খেয়ে নিয়েছে রাতের খাবার। কিন্তু সাড়ে ১০টায় ঘুমিয়ে পড়ার কথা। এই মেয়ে এখনো পড়ছে, দাদী বিছানা থেকে জানালার পাশে টেবিলে টেবিলল্যাম্প নিয়ে পড়তে থাকা শ্রেয়সীর উদ্দেশ্যে বলে,
_”পরীক্ষার আগে আর অদরকারে বের হলে ঠ্যাং ভেঙে দেবো। আমাকে ফুঁসলিয়ে ফাঁঁসলিয়ে অনুমতি নিয়ে আজ চলে গেলি। আর রাজ্য চষে আসতে আসতে দিন পার করে দিলি। এখন এতদিন ধরে তৈরি হওয়া নির্দিষ্ট সময়টা এদিক ওদিক হয়ে গেলনা? রুটিন অনুযায়ী সিলেবাস শেষ করতে না পারলে পরীক্ষায় ডাব্বা মেরে আসতে হবে। পাসটাও করিস কিনা সন্ধেহ এখন।”
_”উফ, ঘুমাও দীদুন। বিরক্ত করোনা।”
_”হ্যাঁ, আমি কিছু বললেই বিরক্ত। কাল যদি একবারের চেয়ে দুইবার ডাকার দরকার পরে ঘুম থেকে উঠতে, তাহলে আমি পানি মেরে তুলবো দেখে নিস।”
_”আচ্ছা দিও। আমার শান্তি কেঁড়ে নিয়ে তোমার শান্তি। সতীন কোথাকার।”
শ্রেয়সী বিরবিরিয়ে বলে। দীদুনের কানে যায়নি। তবে তার বকবকানি জারি। শ্রেয়সী সেসবেতে পাত্তা দেয়না। মনোযোগ দিয়ে পড়তে চাইছে সে। দীদুন ঠিক বলেছে। পুরো সিলেবাস রিভাইস দেওয়ার রুটিনটা এদিক ওদিক হয়ে গেলো। আর পরীক্ষার আগে আগে সামান্য সময়ও খুব মূল্যবান। প্রেশার বেড়ে গেলো পড়ার।
সব দোষ ঐ আজ্রাইল কণ্ঠের মালিক, আর রাওফান গু ‘ন্ডাটার। অর্ধেক সময় আজ্রাইল কণ্ঠের মালিক নিয়ে নিলো, আর বাকি সময় ল ‘ম্প ‘ট ছেলে রাওফানটা।
নতুন অফিসারটা তাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে পটাতে চেয়েছে তখন। সে খুব বুঝতে পেরেছে। ঐ লোকের মতলব ভালো না। আরেকটা রাওফান জুটলো বোধ হয় তার কপালে।
রাওফানের নামটা মাথায় এসতেই আজ বিকেলের ঘটনা মনে পড়ে। সে নতুন অফিসারটাকে ধা ‘ক্কা দিয়ে চলে তো এসেছিল। কিন্তু কিছুদূর এগিয়ে আবার রাওফানের দেখা পাই। লোকটা সৈন্য নামের ক ‘ল ‘ঙ্ক। কোনো ব্যক্তিত্ব নেই। শ্রেয়সীকে বিরক্ত করে সবসময়। তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়, তাকে নাকি ভালোবাসে। বিয়ে করতে চাই। আরও কতো কি!!
শ্রেয়সী কতবার যে প্রত্যাখ্যান করেছে তার ইয়াত্তা নেই। কিন্তু রাওফান ছেলেটা তার পিছুই ছাড়েনা। পথে, ঘাটে সুযোগ পেলেই বিরক্ত করে। আজও এসেছিল পথ আঁটকে প্রেমের প্রস্তাব দিতে। তবে আজ একটু বাড়াবাড়ি করেছিল। তাই আসতে দেরি হয়ে যায়। আনমনে তখনকার কথা মনে করে সে।
‘শ্রেয়সী তখন মেজর উমরানকে পেছনে ফেলে দৌড়ে দৌড়ে অনেক দূর চলে গেছে। আর আসার সুযোগ নেই বুঝতে পেরে যখন একটু দম নেয়, তখন বুঝতে পারে কেউ তার সামনে এসে দাড়িয়েছে। সে মেজর ভেবে শুকনো ঢোক গিলে। যদিও এখানে অনেক লোকজন আছে। কিন্তু বুকে ধাক্কা দিয়ে এসেছে বয়সে অতো বড় একটা লোককে। ভয় পাবেনা?
_”শ্রেয়সী? এভাবে হাপাচ্ছো কেন? দৌড়ে এসেছ নাকি? এই নাও সোনা পানি খাও।”
ভয়ের মাত্রা বাড়ে তার, তবে গা-টাও গুলিয়ে উঠলো পরিচিত কণ্ঠে সম্বোধনটা শুনে। বুঝতে পারে ঐ লোকটা নয়, বরং আরেক বিপদ তার সামনে দাড়িয়ে। তাকে এড়িয়ে চলে যাবে ভেবেছিল, কিন্তু সম্বোধনটা ঘৃণা লাগছে তার। মাথা তুলে যথাসম্ভব শক্ত গলায় বলে,
_”আমি আপনাকে বার বার বলেছি এসব আজে বাজে নামে আমাকে ডাকবেন না। আমার পছন্দ না। তাও বারবার এমন করেন কেন?” কিছুটা অসহায়ও শুনায় তার কণ্ঠ।
নির্লজ্জের মতো মাথা চুলকে হাসে রাওফান। তা দেখে শ্রেয়সী আবার বলে,
_”আপনাকে কিভাবে বললে আপনার গাঁয়ে লাগবে আমার কথাগুলো একটু বলিয়েন তো। কোনো কথায় কেন গাঁয়ে লাগেনা আপনার? কিসের চামড়া আপনার শরীরে?”
_”শখের রমণীর সব কথা গাঁয়ে লাগাতে হয়না শ্রেয়ু। বরং তুমি যখন আমাকে মানা করো? তখন আমার মনে হয় যেন আরও বেশি করে ঐ নামে ডাকতে বলছ।”
শ্রেয়সী ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেয়। ফালতু ছেলেটার জগন্য কথাবার্তা তার শুনতে বিরক্ত লাগে।
_”পথ ছাড়ুন প্লিজ, আমি বাড়ি যাবো।”
_”পানি খাও আগে। দৌড়া দৌড়ি করে এসেছ, হাপিয়ে গেছো তো! এই নাও হাঁ করো আমি খাইয়ে দিচ্ছি। তারপর তোমাকে পৌঁছে দেবো।” কথাটা বলে বোতল নিয়ে শ্রেয়সীর দিকে এগিয়ে আসতে নেয়। সে তৎক্ষণাৎ পিছিয়ে যায়। ভয়ার্ত দৃৃষ্টিতে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,
_”আমাকে ছুলে কিন্তু এবার আমি কর্নেল আঙ্কেলকে বলে দেবো সরাসরি। এতদিন ভয় দেখিয়েছি। কিন্তু আমাকে স্পর্শ করারও চেষ্টা করবেন না। নাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে।”
শ্রেয়সীকে ভয় পেয়ে রেগে যেতে দেখে রাওফান থেমে যায়,
_”রিল্যাক্স! এত হাইপার হওয়ার কিছু নেই। তুমি নিজেই খাও। আর আমি দেখি তোমার পানি গলাধকরন করা ঐ কণ্ঠনালির নৃত্য।”
শ্রেয়সী নিজেকে দমাতে পারেনা আর। পানির বোতলটা টেনে নিয়ে রাওফানের গাঁয়ে পানি ছুড়ে দিয়ে চলে আসে। রাওফান তাও তার পিছু নিতে চেয়েছিল। কিন্তু কোথা থেকে সিভিল ড্রেসে তাদের সেনানিবাসের একজন সৈন্যকে উদয় হতে দেখে থেমে যেতে হয়। শ্রেয়সী আর পেছন ফিরেও তাকায়নি। ইতোমধ্যে যা দেরি হওয়ার হয়ে গেছে তার।