হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি

পর্ব - ৭

🟢

সময়কাল: ২ বছর ৭ মাস পূর্বে

স্থান: বান্দরবান সেনানিবাস

_“শোন তাবাসসুম, ঐসব ফাঁদে পা দিসনা। এই যে নানান বাহিনী থাকেনা? সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী- আরও কতো কি! এরা দেশের প্রতি লয়্যাল হলেও, পার্টনারের প্রতি নাকি এক্কেবারেই হয়না। আমি শুনেছি। তুই ঐ লেফটেন্যান্টকে পাত্তা দিসনা।” আফ্রাহ

_”মানে? তোকে কে বলেছে এসব?” শ্রেয়সী

_”আমরা নাইনে থাকতে ক্লাস টেনের আমাদের নুহা আপু ছিলনা? সিনিয়র? উনাদের আমি বলতে শুনেছিলান, এদের বেশিরভাগের নাকি খারাপ কাজ করে।” আফ্রাহ

_”খারাপ কাজ বলতে? নিরপরাধ মানুষ মা ‘রে?” শ্রেয়সী

_”না না, ঐরকম না।” আফ্রাহ

_”তাহলে?” তাবাসসুম

_”তোরা কাউকে বলবি না তো?” আফ্রাহ

_”বলবনা, ওরা কি খারাপ কাজ করে আমাদের বল?”

তাবাসসুমের কৌতূহলে তার বান্ধবী আফ্রাহ সতর্ক ভঙ্গিতে নিচু স্বরে দুজনকে বলে,

_”এরা নাকি মেয়েদের সাথে বাজে কাজ করে, ঐ যে ছেলে-মেয়ে মিলে খারাপ কাজ করে না? ঐরকম।”

_”ছেলে মেয়ে মিলে খারাপ কাজ মানে… ঐ যে…” তাবাসসুম

_”হ্যাঁ, সেটাই।” আফ্রাহ

_”কি বলছিস? তোকে এসব কে বলেছে, নুহা আপু? তোকে এসব বললো? আর সে কিভাবে জানে রে?” চরম কৌতূহল শ্রেয়সীর কণ্ঠে।

_”বলছি তো আমাকে সরাসরি বলেনি। আমি শুনে নিয়েছিলাম। কিন্তু খারাপ কাজ মানে ওটাকেই বুঝিয়েছে আমি জানি। নুহা আপুকে তখন ডিফেন্সের লোকগুলো মেয়েদের সাথে সুযোগ পেলেই বাজে কাজ করে বলতে শুনেছিলাম, সে তো বড় আমাদের। অনেক কিছু জানে, চেনে। সেভাবে এটাও জানে আরকি! কিন্তু খারাপ কাজ যে ওটাই তা আমি শিউর হয়েছি কদিন আগে। কিভাবে জানিস?”

_”জানি না তো, আমাদের বল।” তাবাসসুম

_”বলবো, কিন্তু শোন। তুই সত্যি সত্যি ঐ লেফটেন্যান্টকে পাত্তা দিবিনা কেমন? আমি প্রমাণ পেয়েছি এরা খারাপ হয়।” আফ্রাহ

_”আচ্ছা পাত্তা দেবনা, এমনিতেও আমার ঐ ছেলেটাকে ভালো লাগেনা। তার উপর মা এসব জানলে পিঠের উপর দেবে। কিন্তু তুই কিভাবে খারাপ কাজ মানে ওটা শিউর হয়েছিস বললি না তো।” তাবাসসুম

_”শ্রেয়াকে যে বিরক্ত করে? ক্যাপ্টেন রাওফান? ঐ ক্যাপ্টেনকে আমি আমার ফুফাতো বোনের সাথে খারাপ কাজ করতে দেখেছি। আমার ঐ ফুফাতো বোন তো রাওফানের উপর ফিদা; অনলাইনে নাকি পরিচয় হয়েছিল। সত্যি বলতে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু রাওফান লোকটা ওকে ভালোবাসেনা, সময় ন ‘ষ্ট করতে ওর সাথে কথা বলে। এগুলোকে টাইম পাস বলে আরকি। তো দেখ, রাওফান লোকটা আমার সেই ফুঁফাতো বোনের সাথে প্রেম করে। আবার শ্রেয়াকেও বিরক্ত করে, ওকে নাকি ভালোবাসে। তাহলে? একসাথে দুইজনকে ভালোবাসা যায়? আমি আমার ফুফাতো বোনের ফোনে ওদের দুজনের খারাপ খারাপ ছবিও দেখেছি।”

_”বাপ্রে!! এসব বাজে কাজ করে? আমি ভাবতাম এমনি টি ‘জ করা অব্দি ক্যাপ্টেনের দৌড়, কিন্তু এ তো দেখি অন্যরকম বের হলো।” তাবাসসুম

_”তো আর বলছি কি? আমি তো কাল এসব জেনেই তোদের দুজনের সাথে একা কথা বলতে চাইছিলাম সাবধান করতে। আজ সুযোগ পেয়ে চলে আসলাম তোদের সাথে। আমার ফুফাতো বোনকেও আমি বলেছিলাম, যে ঐ রাওফান শ্রেয়াকেও প্রেমের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ও বিশ্বাস করেনি আমাকে। তোরাও যদি না করিস, তাহলে দেখবি ঠকে যাবি।”

_”আমি বিশ্বাস করেছি আফ্রাহ।” তাবাসসুম

_”তোকে ধন্যবাদ, তবে আমরা কেউ কোনো সেনাবাহিনী টাহিনীর ফাঁদে পা দিচ্ছিনা। তুই নিশ্চিন্ত থাক।” শ্রেয়সী

দুই বান্ধবীর নিশ্চয়তা পেয়ে আফ্রাহ নামের মেয়েটি চলে যায়। সে নিজ চোখে এসব বাজে জিনিস দেখেছে। ক্যাপ্টেন রাওফান কি মিথ্যুক দেখেছে। বোন নাহয় বিশ্বাস করলোনা, তাই বলে দুই বান্ধবীকে সতর্ক না করলে হয়?

স্থানটা নিরিবিলি। সেনানিবাস এরিয়ার ভেতরে। সাধারণ মানুষের চলাচল এখানে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। বাইরে থেকে প্রবেশ করার কোনো সুযোগ নেই; সাঁড়াশি রাস্তাগুলো শুধুমাত্র সেনা আর অনুমোদিত যানবাহনের জন্য। ক্যাম্পের চারপাশের পাহাড়ি ঢাল ও বনাঞ্চল, ছোট ঝরনা-খোলা জায়গাগুলো দর্শনীয়।

ঢালের ওপরে ঘন বন আর পাহাড়ি লতা। গাছের মাঝে ফুটে আছে ড্যান্ড্রোবিয়াম অর্কিড, বেগুনি অর্কিড, লাল রোডোডেনড্রন এবং ট্রোম্বোন্থার ছোট ফুল। এই বিরল ফুঁলগুলো পাহাড়ি এলাকাতেই মুটামুটি পাওয়া যায়, দেশের অন্যান্য জায়গায় দুর্লভ। হালকা বাতাসে ফুলের সুগন্ধ মিশছে। পাখির কূজন আর ঢালের নিচে সেনাদের কর্মপরিবেশ -এক সঙ্গে মিলেমিশে শান্ত-রঙিন দৃশ্য তৈরি করছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই সব দেখতে পায় না। কারণ পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণাধীন এবং অনুমোদিত বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত।

শ্রেয়সী, তাবাস্সুম আর আফ্রাহ সেনাবাহিনীদের এই নিষিদ্ধ জায়গাতেই দাড়িয়ে এতক্ষণ তাদের বদনাম করছিল। আফ্রাহ চলে যায়। রয়ে গেলো শ্রেয়সী আর তাবাসসুম।

_”আফ্রাহ যা বলে গেলো। আমার এখনো বিশ্বাস হচ্ছেনা।” শ্রেয়সী

_”আরেহ বিশ্বাস না করার কিছু নেই। আমিও শুনেছিলাম, এরা নাকি দিনের পর দিন বাড়িঘর থেকে স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকে বলে চরিত্র খারাপ হয় বেশিরভাগের। আর এখনকার, মানে জোয়ান সৈন্যগুলো বেশি হয় এমন। তোর গণ্ডি তো আশ্রম আর স্কুল অব্দি, তাই জানিসনা। আমি আমার কাজিনদের থেকে শুনেছি।” তাবাসসুম

_”যা-ই বল, সবাই নিশ্চয় এক নয়!” শ্রেয়সী

_”হ্যাঁ, তবে সবাই এক না হলেও ঐ রাওফান খালেদ তো এমনই, এতটুকু নিশ্চিত।” তাবাসসুম

_”ঐ লোকের চাহনিতেও আমার অস্বস্তি হয়। কেমন কু-ন ‘জর।” শ্রেয়সী

দুজনে চুপ করে যায়, আনমনে যা করতে এসেছে তা করতে থাকে। আস্তে আস্তে বীজসহ তুলতে থাকে একটা ড্যান্ড্রোবিয়াম অর্কিড চারার। তার বাগানে এখানে থাকা সব ফুল গাছই আছে। কিন্তু সেদিন কি যে হলো! ড্যান্ড্রোবিয়াম অর্কিডটা নেতিয়ে যায়, তারপর আস্তে আস্তে ম ‘রে গেছে পুরো চারাটা। তাই আরেকটা নিতে এসেছে। রোপণ করবে সে। এখানে সৈন্যরা নিয়মিত পরিচর্যা করে, আর নানান রকমের চারা লাগায়। মাঝে মধ্যে সে আসে, সৈন্যরা নতুন কোনো প্রজাতির বীজ এনেছে কি না দেখে, ঘুরে ফেরে।

বসন্তের শুরুর সময়। নরম বাতাস গাছের পাতায় আস্তে আস্তে গা এলিয়ে দিচ্ছে। গাছের পাতায় হাওয়ার ছোঁয়া। চারদিকটা ফুলের গন্ধে মিশে আছে। সেনানিবাসের এই নিষিদ্ধ জায়গাটিসহ আরও এমন তুলনামূলক কম বিপ ‘দজনক জায়গাগুলো শ্রেয়সীর জন্য উন্মুক্ত। তাই নির্দ্বিধায় আসতে পারে সে। তাবাসসুম আশপাশটা দেখছিল। আর শ্রেয়সী মন দিয়ে সাবধানে মাটি সরাচ্ছে।

_”এখান থেকে এভাবে চারা তুলছেন কার অনুমতি নিয়ে? আর ভেতরে আসলেন কিভাবে?”

আকস্মিক কারও গমগমে কণ্ঠে শ্রেয়সী, তাবাসসুম -দুজনে মৃদু কেঁপে উঠে। তাবাসসুম তৎক্ষণাৎ পেছন ফিরে তাকায়। শ্রেয়সী নিচে বসেছিল। মাথা ঝুকিয়ে মাটি সরাচ্ছে। বসন্তের নরম বাতাস মৃদু শিহরণ দিচ্ছে, এর মধ্যে এমন গাঁয়ে কাঁটা দেওয়া ভারী কণ্ঠ শুনে সে ওভাবেই মাথা তুলে সম্মুখে দাড়িয়ে থাকা মানবপানে তাকায়। অমনি যেন বসন্তের হাওয়ার কোমল ছোঁয়া শরীর স্পর্শ করে গেলো। চুলগুলো হালকা হাওয়ায় দুলে উঠে মুখের উপর এসে পড়েছে, সেটে যায় সেথায়। হাত কাদামাটিযুক্ত হওয়ায় সরাতেও পারছেনা। তাই ওভাবেই তাকায় অপরিচিত কণ্ঠের মালিকের দিকে।

_”আপনি কে?”

সেনানিবাসের নিয়ন্ত্রানাধীন জায়গায় একজন বহিরাগত দাড়িয়ে একজন মেজরকে জিজ্ঞেস করছে সে কে! মেজর উমরান তাওসিফের ললাটে কিঞ্চিৎ ভাঁজ পরে। কিশোরিপানে তাকায়। অল্পবয়সী একটা মেয়ে। শ্রেয়সী তখনও তার দিকে চেয়ে আছে। মেজর আপাদমস্তক মেয়েটিকে দেখে বলেন,

_”আমার পরিচয়ের চেয়ে এই মুহূর্তে আপনার পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, এখানে কি করছেন? আর ভেতরে এসেছেন কার পারমিশন নিয়ে? আপনি কি জানেননা এই জায়গাটি সাধারণের জন্য নিষিদ্ধ?” মেজরের বয়সের তুলনায় মেয়েটি নিতান্তই বাচ্চা, দেখেই তা বোঝা যাচ্ছে। তাও প্রফেশনালিজম মেন্টেইন করে আপনি সম্বোধন করেন তিনি।

শ্রেয়সী কাদামাটিযুক্ত হাতের উপরিভাগ দিয়ে কোনোমতে মুখের উপর এসে থাকা চুলগুলো সরাতে চাই। হাওয়া তখনো চলমান, তাই কষ্ট হচ্ছে তার। কোনোভাবে সরিয়ে চারাটা সাবধানে রেখে উঠে দাড়ায় সে।

_”কর্নেল আফজাল কিবরিয়ার অনুমতিপ্রাপ্ত আমরা… মানে আমি। এখানে আসার পারমিশন তিনিই দিয়েছেন। বিশেষ কোনো কারণে যদি আমার এখানে আসা বিপদজনক হয়ে থাকে কখনো, তাহলে প্রবেশদ্বারে সৈন্যরা আমাকে তা জানিয়ে দেয়।”

মেজর উমরান কিশোরির আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে কিঞ্চিৎ কপাল কুচকে তাকান। কর্নেলের অনুমতিপ্রাপ্ত!! তাকে আপাদমস্তক দেখে বলেন,

_”একজনের প্রবেশের অনুমতি নিয়ে দু-তিনজন আসার কারণ?”

তাবাসসুম ভয় পেয়ে যায়, তাকে না আবার গু ‘লি মে ‘রে উড়িয়ে দেয় বিনা অনুমতিতে আসার অপরাধে। দেখে তো মনে হচ্ছেনা মায়া দয়া আছে বলে, যে ছোট মানুষ দেখে ছেড়ে দেবে।

_”আমি দুঃখিত, আসলে আমি এখানে তেমন একটা আসিনা। আজ কোচিং থেকে ওই জোর জবরদস্তি করে নিয়ে এলো। বললো একা ভয় পাচ্ছে, আর কখনো অনুমতি ছাড়া আসবো না। এবারের মতো ক্ষমা করে দিবেন হ্যাঁ? আ... আমি বরং আসছি।” তারপর শ্রেয়সীর দিকে একপলক তাকিয়ে,

_”আমি যাচ্ছি রে।” কথাখানা বলে চলে যায় তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে। শ্রেয়সী হতবম্ব হয়ে দেখলো পল্টিবাজ বান্ধবীকে। কেমন চলে গেলো, একটু আগেই তো সেনাবাহিনীগুলো খারাপ হয় এই বিষয়ে আলোচনা করছিল। এখন সেই খারাপ একটা মানুষের কাছে একা রেখে চলে গেলো?

সে মেজরের দিকে ফেরে,

_”শুনুন, আমি এখানে প্রায় সময় আসি। আপনি নতুন কোনো সেনা বা অফিসার হবেন নিশ্চয়, তাই আমাকে চিনতে পারছেন না। আর আমার সাথে আমার এক/দুইটা বান্ধবী থাকে মাঝে মধ্যে, আশ্রমের বাচ্চারাও থাকে বেশিরভাগ সময়। বান্ধবীদের প্রবেশদ্বারে চেক করে তবেই ঢুকতে দেয়। এমন আজ্রাইলের মতো গলা নিয়ে আর কাউকে ভয় দেখাবেন না সামনে থেকে। তাবাসসুম ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলো আমায় একা রেখে।”

মেজর উমরান মন দিয়ে মেয়েটির কথা শুনেন। বুঝলেন সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত মেঘের বাড়ি আশ্রমের(কাল্পনিক নাম) সাথে কোনোভাবে সম্পর্কিত এই মেয়ে। নয়তো কোনো সিনিয়র অফিসারের মেয়ে, নাতনি কিছু হবে। তাই অনুমতিপ্রাপ্ত এখানে আসার। কিন্তু তাও সন্ধেহ থেকে যায়। কোনো অফিসারের মেয়ে-নাতনি হলে নিশ্চয় একটু আগে যে বিষয়ে গসিপ করছিল তা করতো না।

_”কর্নেল আফজাল কিবরিয়ার কি হও?”

_”কিছুনা।”

মেজর সন্তুষ্ট নয় কিশোরির জবাবে, তবু দ্বিতীয় বার আর জিজ্ঞেস করেন না। মেয়েটি কি কি করছে নীরবে দেখেন।

মাটি আগেই সরিয়ে ফেলেছিল শ্রেয়সী। সুন্দর করে একটা পলিথিনে সাবধানে চারাটি নেয় এবার। ভীষণ যত্ন তার প্রতিটি স্পর্শে, যেন একটুও ব্যাথা লাগতে দেওয়া যাবেন চারাটিকে।

কাজ শেষ হলে তাড়া কণ্ঠে বলে,

_”আ… আমি আসছি। আমার কাজ শেষ।” কিন্তু পেছন ফিরে দুকদম এগোতেই কানে আসে সেই গাঁয়ে কাঁটা দেওয়া গমগমে কণ্ঠ,

_”সামনে থেকে সেনানিবাসের এরিয়ায় দাড়িয়ে যেন বান্ধবীদের সাথে মিলে সেনাদের নামে বদনাম করা না হয়।”

শ্রেয়ার পা দুটো থেমে যায়। জমে যায় মুহুূর্তেই। ধ্রাম করে উঠে ভেতরটা। লোকটা তাদের ওসব কথা শুনে নিয়েছে?

___

সেনানিবাস থেকে প্রায় ৮–১০ মিনিটের হাঁটার দূরত্বে, পাহাড়ি ঢালে ছোট্ট অনাথ আশ্রমটি দাঁড়িয়ে। এটি পরিচালনা করতেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, যিনি মা ‘রা গেছেন চার বছর আগে। কর্নেল আফজাল কিবরিয়ার পরম মিত্র। চার বছর আগে একটি জ /’ঙ্গি নিধন অপারেশনে ১৭ জন সৈন্যকে বাচাতে একজন সিভিলিয়ান হয়ে প্রা ‘ণ দিয়েছিলেন নিজের। সেই থেকে উনার গড়া আশ্রমটি সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত হয়ে আসছে। যাবতীয় দেখাশুনা, নিয়মকানুন, নিরাপত্তা -সবকিছু সেনাদের অধীনে। উমরান তাওসিফের বান্দরবান সেনানিবাসে সদ্য পোস্টিং হয়েছে মেজর পদে। দুদিন হয়েছে জয়েন করার। ব্রেকফাস্ট শেষে সৈন্যদের বিশ্রাম ও হাইড্রেশন নিশ্চিত করে এদিকটা দেখতে দেখতে হাটছিলেন। ঠিক নয়টায় যুদ্ধ কৌশল ও দলগত প্রশিক্ষণ শুরু করবেন সেনাদের নিয়ে।

কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মেয়েলী ফিসফিস কণ্ঠ শুনে সতর্ক ভঙ্গিতে শব্দের উৎস অনুসরণ করে এদিকটাই চলে আসেন। কোনো গোলমেলে আছে ভেবে মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে এসেছিলেন। কিন্তু তিনটে মেয়েকে দেখে ভ্রু কুচকে তাকান। তার উপর দূর থেকে বাচ্চা মনে হচ্ছিল। কিছুপল ঘটনা বুঝার চেষ্টা করেন। আনমনে কদম ফেলে কাছে আসতেই বুঝতে পারেন অল্পবয়সী তিনটে রমণী; রমনী বললেও ভুল হবে, কিশোরি। কিন্তু কিশোরিদের কথাবার্তার বিষয়বস্তু শুনে কিছুপল থেমে যেতে হয়।

_____

প্যারেড গ্রাউন্ডে সৈন্যদের দলগত অনুশীলন করানো শেষ পর্যায়ে। মেজর তাদের নেতৃত্ব আর দিকনির্দেশনা দিয়ে আজকের প্রশিক্ষণ শেষ করলেন। পাহাড়ি ঢালুতে তখনও বাতাস নরমভাবে বইছে, বসন্তের নরম নীল আকাশে শুভ্র-রঙা মেঘপুঞ্জ ভেসে চলছিল। আকাশের নীল রঙের সঙ্গে মিশে চারপাশকে উজ্জ্বল করে তুলেছে।

সাড়ে ১১ টায় ফায়া ‘রিং রেঞ্জ কার্যক্রম শুরু হবে। অল্প সময় বাকি। সময়টুকুতে মেজর উমরান তাওসিফ আর তার এক জুনিয়র অফিসার রান ওয়্যের একপাশের অবশস্থানরত একটি টং দোকানে যান চা খেতে।

নানান বিষয়ে আলোচনা পর্যালোচনা করছিলেন দুজনে। শ্রেয়সী তখন আশ্রম থেকে বের হয়েছে বাড়ির উদ্দেশ্যে। সে তখন বাড়ি না ফিরে চারাটি নিয়ে আশ্রমে গিয়েছিল। তার সামনে এস.এস.সি পরীক্ষা, তাই এখানে তেমন একটা আসা যাওয়া হচ্ছেনা ইদানিং; লেখাপড়ার চাপে।

কিন্তু ফুঁল নিয়ে আপোষ নেই তার, তাই চলে এসেছে ড্যান্ড্রোবিয়াম অর্কিড চারাটি সংগ্রহ করতে। সেনানিবাস এরিয়ায় এসেছে আর আশ্রমে ঢুকবেনা, এমন কি হয়? বাচ্চাদের সাথে দেখা করে, সময় কাটিয়ে এখন বের হয়েছে সে।

পাহাড়ি ঢালু রাস্তা বেয়ে নামছে। চায়ের দোকান থেকেই তাকে স্পষ্ট দেখা যায়। মেজর উমরান ওয়ান টাইম চায়ের কাপটিতে চুমুক দিতে দিতে মনোযোগ সহকারে দেখেন আনমনে রাস্তা বেয়ে নামতে থাকা কিশোরিকে।

_”মেয়েটি কে?”

অন্য বিষয় নিয়ে কথার মধ্যে আকস্মিক অসঙ্গত প্রশ্নে পাশে বসে থাকা জুনিয়র অফিসারটির কপালে ভাঁজ পরে। কার কথা বলছে বুঝতে তার দৃষ্টি অনুসরন করে তাকায়। শ্রেয়সীকে দেখে সেই কপালের ভাঁজ আবার মিলিয়েও যায়।

_”ওর কথা বলছেন? বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হামিদ নেওয়াজকে তো চেনেন? তার একমাত্র কন্যা।”

মেজর উমরানের কপালে ভাঁজ পরে,

_”শহিদ হামিদ নেওয়াজ? আশ্রমটির প্রতিষ্ঠাতা।”

_”ঠিক ধরেছেন, উনার কন্যা।”

উমরান মনে মনে কিছু ভাবেন। হামিদ নেওয়াজ মানুষটি একজন শহিদ।

চার বছর আগে কর্নেল আফজাল কিবরিয়ার নেতৃত্বে একটি বড়সড় জ /’ঙ্গি নিধন অপারেশন হচ্ছিল। সেই অপারেশনের জেরে কর্নেলের পরম মিত্র বলে হামিদ নেওয়াজকে অপহরন করা হয়, কর্নেলকে দমাতে। উনাকে উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সেনারা জ /‘ঙ্গিদের পাতানো ফাঁদে পা দিয়ে দেয়, যেখানে হামিদ নেওয়াজকে বাচাতে গেলে তাদের মর ’ণ নিশ্চিত। এই বিষয়টা বুঝতে পেরে যখন প্রত্যেকের জীবন-মর ‘ণ পরিস্থিতি। তখন হামিদ নেওয়াজ নিজেই বো ‘মের মাঝে আত্মহুতি দেন সেনাদের বাঁচিয়ে।

এসব ঘটনা জানে উমরান। তখনকার হট নিউজ ছিল। তারা সেনাবাহিনীরা শহিদ হামিদ নেওয়াজের প্রতি চির কৃতজ্ঞ। রাষ্ট্রীয় সম্মানে দাফন করা হয়েছিল শহিদ হামিদ নেওয়াজকে। উনার পরিবার বলতে আগে পরে একটি কন্যাসন্তান আছে মাত্র, আর কেউ নেই। কেননা তিনি নিজেই অনাথ ছিলেন। বাবা ছোট বেলায় মা ’রা গিয়েছিল। মা-ছেলে ফুঁটপাতে থাকতেন। একদিন সেই মাও মারা যায়। আত্মীয়-স্বজনের হদিস নেই। হামিদ নেওয়াজ লেখাপড়া করেছেন অভাবের মধ্যেও সংগ্রাম করে। বুয়েট থেকে ইঞ্জিনিয়ার হয়ে বের হয়েছেন। কিছু বছর ইঞ্জিনিয়ারিং করলেও পরে পরে ব্যবসায়ী হয়ে উঠেন, এবং এত সফলতা আসে যে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী যুক্ত হয় নামের আগে। এসব সফলতার কারণে পুরো জীবদ্দশায় বেশ কয়েকবার হট নিউজ হয়েছেন সারাদেশে। স্ত্রী মারা গিয়েছিল সন্তান প্রসবের সময়।

এসব কথা জানেন উমরান। শুধু তিনি নন, দেশের প্রায় কম বেশি সচেতন নাগরিকের এসব জানার কথা। বিশেষ করে শাহাদতবরণ করার পর উনার পুরো জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে অনেক নিউজ হয়েছে, তাই নতুন প্রজন্মেরও উনার যৌবনকালের সফলতা জানতে অসুবিধা হয়নি। তবে হামিদ নেওয়াজ যখন মৃ ‘ত্যু বরণ করেন, তখন তার কন্যাটি বেশ ছোট ছিল। উমরানের জানা মতে, তখন ১০/১১ বছর বয়স ছিল শহিদ হামিদ নেওয়াজের কন্যার। এখন তো দেখা যাচ্ছে বড় হয়েছে অনেকটা। পরিপূর্ণ কিশোরি; চোখে পড়ার মতো। কর্নেল আফজাল কিবরিয়া শহিদ মিত্র কন্যার দায়িত্ব নিয়েছেন, এমনটাই ধারণা ছিল এতদিন। কিন্তু কর্নেলের দায়িত্বে থাকলে সে এখানে সেনানিবাস, আশ্রম -এসব জায়গায় কেন ঘুরঘুর করছে?

_”মেয়েটা কোথায় থাকে? আই মিন, অভিভাবক কে তার?”

_”নিজের বাড়িতেই থাকে, মানে বাবার বাড়িতে।”

_”একা?” উমরান ভ্রু কুচকে জানতে চান। কারণ হামিদ নেওয়াজের আগে পরে এই মেয়েটি ছাড়া কেউ নেই। উমরান ভেবেছিলেন, কর্নেল স্যারের দায়িত্বে আছে সে। কিন্তু যদি বাবার বাড়িতেই থেকে থাকে, তাহলে সাথে কে আছে? একলা একটা কিশোরি মেয়ে থাকে পুরো বাড়িতে?

_”না, কর্নেল স্যারের মা থাকেন।”

_”কর্নেল স্যারের মা? বুঝলাম না ঠিক।”

_”এখানে একটু ঝামেলা আছে। কর্নেল স্যার মেয়েটির দায়িত্ব নিয়ে তাকে নিজের পরিবারের সাথে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না,কর্নেল স্যারের দুজন স্ত্রী। একজন নিজের সংসারে শাশুড়িকেও ঠায় দেয়নি। অন্যকারো মেয়েকে দেবে তো দূরের কথা।

অপরজনের শাশুড়িকে নিয়ে সমস্যা না থাকলেও পরের মেয়ে নিয়ে সমস্যা আছে। এদিকে কর্নেল স্যারের মা শহিদ হামিদ নেওয়াজকে পুত্রসম দৃষ্টিতে দেখেন। তিনি হামিদ নেওয়াজের মেয়েকেও খুব ভালোবাসেন।

যে সংসারে উনার আপনপুত্রসম ছেলের একমাত্র কন্যার ঠায় হচ্ছেনা, সে সংসারে তিনিও থাকতে চান না। তাই কর্নেল স্যারের মা হামিদ নেওয়াজের কন্যাকে নিয়ে হামিদ নেওয়াজের বাড়িতেই থাকেন। কর্নেল স্যার অবশ্য দেখাশুনা করেন মা, আর মিত্রকন্যার। আসা যাওয়াও আছে সেখানে। আর সৈন্যরা শহিদ হামিদ নেওয়াজের নিকট চির কৃতজ্ঞ। তাই তার কন্যার সব রকম নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখে। মেয়েটির আত্মীয়-স্বজন, পরিজন -কিছুই নেই। তাই আসা যাওয়া বলতে কেবল পিতার প্রতিষ্ঠিত করা এই আশ্রমটাতেই। সাথে পুরো সেনানিবাসের তুলনামূলক কম বিপদজনক স্থানগুলো তার জন্য উন্মুক্ত রাখা আছে। বলতে গেলে সেনানিবাস, আশ্রম আর আশপাশের দুয়েক কিলোমিটার অব্দি তার এমন মুক্তপাখির ন্যায় অবাধ চলাফেরা চলে। যদিও এরিয়াটি এমনিতেও সুরক্ষিত। তবে এর বাইরেও ওর যেকোনো নিরাপত্তায় সেনারা সোচ্চার থাকে। তবে ভরনপোষণের দায়িত্ব কাউকে নিতে হয়নি। হামিদ নেওয়াজ যা অর্থ-সম্পদ রেখে গেছেন তাতে তার মেয়ের দুই জীবন কেটে যাবে।”

ফায়া ‘রিং রেঞ্জ কার্যক্রমের সময় হয়ে এসেছ। তাই দুজনে উঠে পরে।

মেজর উমরানও মন দিয়ে তার কথা শুনেন, আর ভাবতে ভাবতেই হাঁটতে থাকেন। কৌতূহল বাড়ছে তার মেয়েটির প্রতি। যেতে যেতে দূর পাহাড়ি রাস্তায় ঝাপসা দেখা যাওয়া কিশোরিপানে তাকান। রাস্তাটি নিচ থেকে উপর দিকে উঠেছে। মহাকর্ষ বলের বিপরীতে হওয়ায় কিশোরির পথ যেন ফুরোচ্ছেইনা। তবে অভ্যাস আছে বলে কষ্ট হয়না।

হাওয়ার সুরে ভেসে আসা তুমি পর্ব ৭ গল্পের ছবি