মৌরি অতিথিদের মাঝে একরাশ দ্বিধা, সংকোচ আর সুপ্ত অপরাধবোধ নিয়ে নত মস্তকে বসে আছে। পাত্রের মা তাকে নিজের পাশেই বসিয়েছেন। পরিবারের সম্মানের কথা ভেবে অতিথিদের সামনে আসলেও তার ভেতরটা অপরাধবোধ আর অনুশোচনার ঝড়ে উলট পালট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যখন নিজের উপর কারো মুগ্ধ দৃষ্টি অনুভব করছে তখন কোথাও অদৃশ্য হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে তার। কারো সাথে অন্যায় করছে সে। না… মেজর তো আছেই। কিন্তু মেজর ছাড়াও অন্য কারো সাথে অন্যায় হচ্ছে।
মৌরিকে পাত্রপক্ষের পছন্দ হয়েছে, অবশ্য মৌরির পরিবার থেকে সম্মতি পেলে ওকেই যেভাবে হোক বাড়ির বউ বানাবে ঠিক করে রেখেছিল তারা। আগে থেকে খোঁজখবর নিয়ে ওকে বেশ মনে ধরেছিল কি না!! তাই তাদের দিক থেকে সবকিছু বেশ সক্রিয়।
_”বলছিলাম… খাওয়া-দাওয়া, গল্প-গুজব সব তো হলো। এবার আসল কথায় আসি। মৌরি মাকে আমাদের আগে থেকেই পছন্দ। তাই আমাদের দিক থেকে বিয়ের জন্য সতস্ফূর্তভাবে সম্মতিসূচক মত আছে। আপনারা যদি আপনাদের দিকটা জানান, তাহলে আমাদের বুঝতে সুবিধা হয়। আমি আসলে আজ ওকে আংটি পড়িয়ে দিতে চাইছিলাম আমার ছেলের নিশান হিসেবে।” পাত্রের মা নিজের কথাগুলো রাখেন।
উনার কথা শুনে মৌরির বাবা-চাচ্চু নড়েচড়ে বসেন। বাবা গলা ঝেড়ে কিছু বলতে চাইবেন, তার আগে ছেলের চোখের ইশারা দেখে কিছুটা থেমে যান। অর্ণব কিছু বুঝালো। তার বাবা কতটুকু কি বুঝলো জানা নেই। তবে সময় নিয়ে বলেন,
_”আমাদেরও কোনো সমস্যা নেই। সব দেখে শুনেই আপনাদের আসতে বলা। তবে বিয়ে হবে দুটো মানুষের মধ্যে, আপনারা মৌরিকে জেনে শুনে এসেছেন। কিন্তু আমার মেয়ে আজই প্রথম দেখছে ছেলেকে। আমাদের নিজেদের মেয়ের ভালো-খারাপ মতামত নিতে হবে। তারপর এগোতে চাইছি। আশা করি আপনারা বুঝতে পারছেন কি বলতে চাইছি। একটু সময় দরকার। আমি আমার মেয়েকে একটু সময় দিতে চাইছি নিজের অনুভূতি আর উপলব্দি বুঝতে। আশা করি কিছু মনে করবেন না।”
_”না না, কোনো সমস্যা নেই। আমাদেরই ভুল। ওকেও বুঝতে সময় দেওয়া দরকার আসলে। আপনারা মৌরির মতামত পেলে তখন আমাদের জানাবেন, আমরাও নাহয় তখনই আংটি পড়িয়ে দেবো।” পাত্রের বাবা
_”হ্যাঁ, বাবার কথাগুলো ঠিক। তবে আমার মনে হয় ওদের নিজেদের মধ্যে একবার কথা বলার সুযোগ দেওয়া উচিত। তাহলে মৌরির পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হতো।”
পাত্রের বড় বোনের কথাটা শুনে সাথে সাথে মৌরি চোখ তুলে ভাইয়ের দিকে তাকায়। তার চোখ বলছে সে আলাদাভাবে কথা বলতে অনিচ্ছুক। অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
_”আ… বলছিলাম, মৌ কিছুটা অন্তর্মুখী স্বভাবের। প্রথম দেখাতেই কারো সাথে আলাদাভাবে কথা বলাতে আরাম পায়না সে। সময় সুযোগ বুঝে আরেকদিন নাহয় ওদের দেখা করার ব্যবস্থা করে দেবো আমি। ততদিনে মৌও নিজেকে প্রস্তুত করুক অপরিচিত কারো সাথে দেখা করার জন্যে। কিছু মনে করবেন না প্লিজ। অন্তর্মুখী স্বভাবীদের অপরিচিতদের সাথে হঠাৎ কথা বলতে নানানরকম সমস্যা হয় জানেনই তো।”
অর্ণবের কথায় তাদের মনে কিছুটা দ্বিধা ঢুকে। পাত্রও হতাশ হয়। তবে বেশি পাত্তা দেয়না। মেনে নেয়।
মৌরিকে রুমে পাঠানো হয়েছে। আরও কিছুক্ষণ আলাপ-আলোচনা আর গল্পগুজব করে পাত্রপক্ষ বিদায় নেয়। মৌরি ভেতরে থেকেই তারা চলে যাচ্ছে টের পায় সকলের কথাবার্তায়। সে থম মেরে বসে আছে বিছানায়। ঠিক হলোনা একটুও। যা হয়েছে, একেবারেই ঠিক হয়নি।
তারা চলে গেছে এমনটাই ভেবেছিল মৌরি, কিন্তু আবার অপরিচিত কারো কণ্ঠস্বর কানে আসলো বাইরে থেকে। এটা পাত্রপক্ষের কারো আওয়াজ ছিল বলে মনে হলোনা। তবে স্বয়ং পাত্র হলেও হতে পারে। তার কণ্ঠ শুনেনি সে, তাই অপরিচিত লাগছে হয়তো। মৌরি তেমন পাত্তা দেয়না, বিরক্তি তার চোখে। মাথা ঝুকিয়ে বসেছিল বিছানায়। কিন্তু বাইরে ঐ কণ্ঠস্বর এবার একটু বেশি কানে বাজছে। পুরুষালি গমগমে এই কণ্ঠস্বর তার গাঁয়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। এটাই সেই অতি আকাঙ্ক্ষিত স্বর। তার চিনতে ভুল হলোনা। পুরোটা মাস যার সামান্য দেখা পাওয়ার জন্য তড়পেছে, এটা সে -ই। তীব্র বেগে স্পন্দিত হয় তার হৃদয়খানি। ধীর পায়ে উঠে; বের হয় রুম থেকে। এগিয়ে যায় বসার ঘরের উদ্দেশ্যে। তার কল্পনা নয়তো? সরাসরি বাড়িতে পরিবারের সম্মুখে আসবে? আগে তার সাথে দেখা করে পরিস্থিতি না বুঝেই? সবাইকে কি বলবে?
অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন নিয়ে আরেকটু এগোতেই আকল্পনিত দৃশ্য চোখে পরে। মেজর উমরান তাওসিফ; সে বসে আছে সোফায়। বাবা-চাচ্চু, ভাইয়া-দীপ্ত ভাইয়া, আপু, মা-চাচী প্রত্যেকে ওখানে। মেজরের সাথে কথা বলছে। মৌরি ঘোরে আছে, বুঝতে পারছেনা আদৌ ঠিক দেখছে নাকি তার চোখের ভ্রম। ঘন পাপড়িযুক্ত ময়ূরাক্ষীর ন্যায় নয়নে পলক ফেলে তাকায় সে। মাথার সামনে থেকে কপালের দুপাশে এনে দেওয়া সরু চুলগুলো চোখের পাপড়ির সাথে লাগছে, আতাশ করার কথা। অথচ সে অনুভবই করতে পারছেনা সেসব কিছু। মৌরি ঢোক গিলে। তূর্ণা আর মৃন্ময় অতিথিদের বেঁচে যাওয়া ভালো খাবারগুলো নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে করতে যাচ্ছে পাশ দিয়ে।
সে বহু কষ্টে দুটো শব্দ উচ্চারণ করে,
_”তূর্ণা, মৃন্ময়……”
বোনের ডাকে তাকায় তারা,
_”বলো আপু, কি হয়েছে?”
_”বাড়িতে কে এসেছে?”
_”জানিনা, ওরা চলে যাওয়ার পর পরই দেখি আরেকটা গাড়ি এসে থামে বাড়ির সামনে। দুটো লোক এসেছে। দেখতে খুব সুন্দর জানো? সাদা কাগজ ফুলগাছটার নিচে গাড়ি থামিয়েছিল, যখন নামে তখন হিরোর মতো লাগছিল। ক্রাশ খেয়েছি। ঐ যে দেখা যায়? ঐ লোকটা আর অন্য একজন। উনার পাশেই আছে, দেখা যাচ্ছেনা এখান থেকে।” তূর্ণা
বোনের কথা শুনে তাও মনে হচ্ছে সে এখনো কোনো বিভ্রমে আছে। ঢোক গিলে আবার জানতে চাই,
_”উ উনি কে? কি কথা বলছে, কিছু জানিস তোরা?”
_”না আপু, উনাকে তুলি আপু আর দীপ্ত ভাইয়া চেনে শুধু। তবে ওরাও জানতনা লোকগুলো আসবে। এমনটাই তো বুঝলাম। তারপর কাউকে নিতে নাকি দিতে এসেছে বললো। এরপর আর শুনিনি, মা পাঠিয়ে দিয়েছে ওখান থেকে।” মৃন্ময়
_”আচ্ছা, তোরা যা।” তূর্ণা আর মৃন্ময় চলে যায়। তাদের সাথে সাথে তোহা-তানিমকেও দেখা যাচ্ছে। এতক্ষণ খাবার নিয়ে ভাইয়ে বোনে টানাটানি করলেও, ভাগ্নি-ভাগিনাকে দেখে নিজেদের ভাগেরটুকুও ত্যাগ দিলো স্বস্নেহে।
মৌরি আঁখি মেলে আবার তাকায় মেজর পানে। কপালে ভাঁজ লোকটার, কিছু বলছে সবাইকে। চোখে-মুখে গাম্ভীর্য স্পষ্ট। লোকটার কথা বলার ভাবভঙ্গিতে অদ্ভুদ এক আত্মবিশ্বাস থাকে। সামান্য কথাও সম্মুখ মানবের আকর্ষণ আর মনোযোগ কেঁড়ে নিতে সক্ষম। যখন সাধারণ কোনো মত রাখে, তখন মনে হয় অদৃশ্য আদেশ করেছে। যা উপেক্ষা করা অসম্ভব। তাই হয়তো মৌরিও পারেনি সেদিন মেজরকে উপেক্ষা করতে। যার পরিণতি আজ সওদাগর বাড়ির বসার ঘরে মেজরের এই উপস্থিতি।
কথা বলতে বলতে অকস্মাৎ থেমে গিয়ে লোকটি এদিকে তাকায়, দুই মানব মানবীর আঁখিতে আঁখিতে মিলন ঘটে। মৌরির অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন হঠাৎ থেমে গেলো। জমে গেলো ভেতরটা। কয়েক মুহূর্ত স্থায়ী হয় দুজনের চক্ষু মিলন। তারপর মেজর চোখ ফিরিয়ে নিয়েছে। মৌরি তাতে অব্যক্ত এক অভিমান টের পেলো। অনুশোচনায় হৃদয়টা ছলাৎ করে উঠলো তার। আর সামনে পা বাড়াতে পারেনা সে, পা দুটো পিছোচ্ছে আপনা আপনি। পিছাতে পিছাতে রুমে চলে যায় সে, জমিয়ে রাখা শ্বাস বের করে দেয়। দরজা লাগিয়ে তাতে পিঠ ঠেকায়। তীব্র শ্বাস-প্রশ্বাসে সমগ্র দেহের কম্পন স্পষ্ট।
——
_”আশা করছি আমার কথা বুঝতে পেরেছেন প্রত্যেকে।”
_”আজই নিয়ে যেতে চাইছেন?” অর্ণব
_”জি আজই। আর এক দিনও সময় নষ্ট করতে চাইছিনা আমি। আর আপনাদের সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ, আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো আপনাদের প্রতি।”
_”কৃতজ্ঞতা দিতে হবেনা, আমাদেরই মেয়ে। আপনার আমানত আপনি নিয়ে যাবেন ঠিক আছে, তবে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে দেবেন না অনুরোধ রইলো। খুব ভালোবাসি মেয়েটাকে, আমাদের মেয়েকে আমাদের মেয়ে হিসেবেই রাখবেন। অনুরোধ করছি।” বাবা
_”এভাবে বলবেন না আঙ্কেল, আপনাদের মেয়ে আপনাদেরই থাকবে। আপনাদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কেঁড়ে নেওয়ার প্রশ্নই আসেনা। আমি শুধু আমার অধিকারটুকু বুঝে নিচ্ছি।”
তুলি গেলো মৌরিকে আনতে। মৌরি আসলো, সে জানেনা এখানে কি কথা হয়েছে না হয়েছে। কি নিয়ে আলোচনা হয়েছে, মেজর এসে নিজের কি পরিচয় দিয়েছে, তাকে কিভাবে চেয়ে নিয়েছে -এসবের কিছু জানেনা সে। তবু কেমন নিশ্চিন্ত লাগছে। কিছুটা
কৌতূহল থাকলেও আগের মতো অস্থির ভাবটা নেই মনে। মৌরি বসার ঘরে সবার মাঝে এসে তার স্বামী আর সেদিন বিয়েতে উপস্থিত থাকা বাকি দুই পুরুষের একজনকে দেখতে পেলো। একপলক তাদের পানে চেয়ে আর তাকায়না। দাড়িয়ে থাকে বোনের পাশে।
_”আপনাদের ওর সাথে কোনো কথাবার্তা থাকলে সেরে নিন প্লিজ, আমাদের এবার উঠতে হবে।” উমরান তাওসিফ হাত ঘড়িতে একবার চোখ বুলিয়ে তাড়া স্বরে বলেন।
মৌরি তা শুনে কৌতূহলী বদনে বাড়ির সকলের পানে তাকায়। কিন্তু প্রত্যেকের মুখ অন্ধকার দেখে ভেতরটা মুচড়ে উঠে। বোনকে দেখে, জিজ্ঞাসু তার দৃষ্টি। কি হয়েছে জানতে চাইছে।
তুলি কিছু বলেনা, তার মা এগিয়ে আসে। চোখে অশ্রু মায়ের।
_”কি হয়েছে মা, কাঁদছ কেন তুমি?” মৌরির বিচলিত কণ্ঠে তার মা অশ্রুসিক্ত চোখে মৃদু হাসেন।
_”কিছুনা মা, মাকে ভুলে যাবিনা কেমন? আমার মেয়ে তুই। খুব ভালোবাসি তোকে। মাকে ভুলে যাসনা মৌ, তুই আমার মৌ।” মৌরির মা তার গালে মাথায় হাত বুলিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে কথাগুলো বলেন। মায়ের চোখে পানি দেখে মৌরি খুব চিন্তিত। কি হলো মায়ের? মেজর কি বলেছে সবাইকে?
_”মা, কি বলছ এসব? কাদছ কেন? আমি তোমাদের ভুলতে যাবো কেন? আর এভাবে কথা বলছ কেন? আমার ভালো লাগছেনা।”
_”মৌ বাবার কাছে এসো।” বাবার ডাকে তার দিকে ফেরে মৌরি, এগিয়ে যায়।
তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলেন,
_”শুনো মা, উনাদের দেখতে পাচ্ছ? উনি মেজর, মেজর উমরান তাওসিফ। তোমাকে আজ উনার সাথে যেতে হবে। শুধু আজ না, এবার থেকে তুমি উনার কাছেই থাকবে। এটা তোমার বাবার বাড়ি, তোমারও বাড়ি। তবে আজ থেকে তুমি উনার সাথে উনার বাড়িতে থাকবে। উনিই তোমার অভিভাবক।”
_”কিন্তু বাবা…”
_”আর কোনো প্রশ্ন নয় মৌ। তুমি আজ উনার সাথে যাবে। আমরা ছাড়া, আজ একটু আগের অতিথিদের বিষয়টাসহ আর কোনোকিছুর দিকে পেছন ফিরে তাকাবেনা। আজ উনার সাথে যেখানে যাবে, সেখানেই সবকিছু তোমার। কেন যাবে সেসব প্রশ্নের উত্তর নেই এখন বাবার কাছে। শুধু বাবার কথা শুনো। ঠিক আছে?”
মৌরির এবার চিন্তা হয়। মেজর কি বলেছে সবাইকে? বিয়ে করে নিয়েছে তারা, এ কথা-ই কি? কিন্তু তাই যদি বলে তাহলে তো সবার তার উপর নারাজ থাকার কথা। বাড়ির কারো চোখে তো তার জন্য রাগ বা নারাজগি দেখতে পাচ্ছেনা, বরং একরাশ মন খারাপি আর তার জন্য স্নেহ, ভালোবাসা দেখতে পাচ্ছে।
মৌরি ভেবে নিলো মেজর তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দেখিয়ে বিয়ের বিষয়টা জানিয়েছে। তাই সবার মন খারাপ, আর অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তার সাথে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে সবার আফসোস আর মায়া হচ্ছে।
অর্ণব এগিয়ে আসে বোনের দিকে,
_”শুন মৌ, আজ উনার সাথে যেতে হবে তোকে। ওখানেই থাকতে হবে এখন থেকে। বাড়ির কথা মনে পরলে, আমাদের কথা মনে পরলে সাথে সাথে ফোন দিবি। বাবা বা চাচ্চু যাবে, আমি থাকলে আমি যাবো। নাহয় মেজরকে বলবি, উনি সময় করে তোকে নিয়ে আসবে। ঠিক আছে?” মৌরি মাথা নাড়ায়। অর্ণব তার মাথায় চুমু একে দেয়। তুলি কাঁঁদতে কাঁঁদতে বোনকে জড়িয়ে ধরে। মাকে কাঁঁদতে দেখে তানিম-তোহাও কাঁদছে। তূর্ণা-মৃন্ময়ও বুঝতে পারে তাদের মৌ আপুকে একটু আগে আসা সুদর্শন পুরুষটা নিয়ে যাচ্ছে নিজের সাথে। মন খারাপ তাদের, তুলি আপুর সাথে চোখের পানি ফেলছে। মা-চাচী অনেক কিছু বোঝায় মৌরিকে। ওখানে ঠিকভাবে থাকতে, ঠিক সময়ে খেতে, অসুস্থ লাগলে, মাথা ব্যাথা করলে মেজরকে জানাতে -আরও অনেক কিছু। শেষে বাবা-চাচ্চু আরও কিছু বুঝিয়ে মেজরকে বলে তাকে নিয়ে যেতে। পরিবারের সকলের কান্না দেখে মৌরিও তখন হেঁচকি তুলে কাদঁছে। উমরান তাওসিফ এসে তার নরম হাতখানা ধরে। মৌরি তখন বাবার বুকে। নিজের উষ্ণ হাতে মেজরের শীতল হাতের ছোঁয়া অনুভব করে সর্বাঙ্গ শিরশির করে উঠে।
———
_”আপনি আমার পরিবারকে কি বলেছেন?”
অপরপক্ষ হতে জবাব আসেনা। মৌরি কিঞ্চিৎ উৎকণ্ঠা নিয়ে তার সাথে যেতে যেতে বলে,
_”কি হলো কিছু বলছেন না কেন? বাবা-মা, চাচ্চু, ভাইয়ারা -সবাইকে কি কক্সবাজার থাকতে বিয়ে হয়েছিল একথা জানিয়ে দিয়েছেন?”
এবারও উত্তর আসেনা অপরপক্ষ হতে। মৌরির একহাত মেজরের হাতে আবদ্ধ। তাকে নিয়ে যাচ্ছে নিজের সাথে। কিন্তু মৌরির করা প্রশ্নের জবাব দিলনা।
_”আপনি আমার সাথে কথা বলছেন না কেন? আমার উপর রেগে আছেন?”
_”কি কথা বলবো আপনার সাথে?” মেজর উমরান নিজেকে যথাসম্ভব দমিয়ে প্রশ্নখানা রাখে মৌরির উদ্দেশ্যে।
_”আমি যে প্রশ্ন করলাম?”
_”নেই আপনার কোনো প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে। আর কিছু জানতে চাইবেন না। আর আপনার পরিবারকে কি জানিয়েছি, কতটুকু জানিয়েছি সেসব আপনার না জানলেও চলবে। আপনি আপনার আসল ঠিকানায় যাচ্ছেন, এটুকু অব্দি থাকুন।”
_”এভাবে কথা বলছেন কেন আমার সাথে?”
_”আর কিভাবে কথা বলবো আপনার সাথে শ্রে… মৌরি?” মেজরের অন্য একটা নাম মুখে আসছিল। হয়তো আপন কারো নাম। তবে সামলে নেয়।
_”আপনি তো নিজেই আমাকে নিতে আসেন নি।”
_”একটু অপেক্ষা করা যেতনা?”
_”করেছি তো!”
_”আচ্ছা? আমি আসার আগে বাড়িতে কারা ছিল?” মেজরের চোয়ালখানা শক্ত দেখালো।
_”আমি আর কি করতাম? উনারা অতিথি ছিলেন, সামনে না গেলে অসম্মান হতো।”
_”আর আমি? আমার কথা কি একটুও মাথায় আসেনি? ওদের অসম্মান রুখতে আমার স্ত্রী হয়ে নিজেকে অন্য কারো জন্য সেজে গুজে প্রদর্শন করলেন?” মৌরির হাত ছেড়ে বাহু ধরে রুক্ষভাবে। কাছে টেনে নেয়।
_”আম আমি দুঃখিত, শুধু আমার কথা হলে যেতাম না কিছুতেই। কিন্তু বাবার সম্মান জড়িয়ে ছিল।”
_”বিয়ের জন্য শুরুতে মান করে দেওয়া উচিত ছিলনা?”
_”কি বলে মানা করতাম আমি?” প্রশ্নটা শুনে মেজরের চোখ মুখ কুচকে গেলো। লেইম বাহানা মনে হলো তার। মৌরি তখন অসহায় হয়ে দাড়িয়ে আছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে মেজর কিছুটা শান্ত করতে চায় নিজেকে। শেষে তাকে অস্থির দেখায় কিঞ্চিৎ। গভীর এক
শ্বাস টেনে না পেরে বলে,
_”আমার মাথায় আগুন জ্বলছে শ্র… মৌরি, আমাকে শান্ত করুন প্লিজ। নাহয় আপনার সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলবো।”
মৌরি অসহায় নেত্রে তাকায়,
_”কিভাবে শান্ত করবো?”
মেজর অকস্মাৎ মৌরির বরাবর হয়। নয়ন মাঝে নয়ন মেলায়। দুজনার শ্বাস-প্রশ্বাসের উষ্ণতা মিশে যাচ্ছে।
_”চুমু খান।” মেজরের মধ্যে কোনো অনুভূতি দেখা গেলনা। বরং কথাখানা বলেও কঠোর নেত্রে চেয়ে আছে মৌরি পানে।
_”ক কি বলছেন?”
_”চুমু খান।” মৌরির ভেতরটা নুইয়ে পরে। দুর্বল নেত্রে গাড়ির ভেতর বসে থাকা মানবটার পানে তাকায়। মেজরের সাথে এসেছে সে।
_”আমরা এখানে সঙ্গম শুরু করলেও সে এদিকে ফিরবেনা।”
মৌরির ঘাড় তখনও ওদিকে ফেরানো ছিল। অতি নিকটে থাকা মেজরের কণ্ঠে কথাখানা শুনে চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো। শ্বাস যেন উপর থেকে ভেতরে ভেতরে ঘূর্ণিবেগে নিচে নামলো। কেপে উঠলো সমগ্র দেহ। পুরোপুরি নুইয়ে গেছে সে। গাড়ির সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়। মেজরের মুখে এমন কিছু শুনবে কল্পনার অতীত ছিল।
_”কি হলো?”
নিভু নিভু দৃষ্টিতে সে তাকায়। মেজরের চোখ মুখ তখনো অনুভূতিহীন, শক্ত। মৌরি আবার ঘাড় ফিরিয়ে গাড়ির ওপাশে বাড়ির দিকে তাকাতে চাই।
_”ওখান থেকে কেউ দেখবেনা। আমরা গাড়ির এপাশে আছি।”
মৌরি বুঝে নেয় লোকটা যেটা করতে বলেছে তা করা ছাড়া উপায় নেই। কেমন অনড় হয়ে আছে নিজের কথায়। সে কোনোভাবে সামনে ফিরে তার চোখে চোখ রাখে। ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর প্রয়াসে। সময় নিয়ে মাথা এগিয়ে মেজরের চিবুক বরাবর ডানপাশে কানের সামনে সামান্য অধর ছোঁয়ায়।
_”উহু, এভাবে না। ঠোঁটে চুমু খান।” তখনো শক্ত তার কণ্ঠস্বর, মৌরির ভেতরটা পুরোপুরি নাজেহাল করে দিয়ে কি নির্ভীকচিত্তে চেয়ে আছে লোকটা!!
যেমনটা একটু আগেও উপলব্দি করেছিল বাড়িতে থাকতে - মেজরের সামান্য কথায়ও সে অদৃশ্য আদেশ টের পায়; তাই হচ্ছে। মৌরি এটাও মানলো। এগিয়ে নিলো বদনখানি। আস্তে করে মিলিয়ে দিলো কম্পমান অধরজোড়া। অনুভূতিহীন মেজর হঠাৎ আগ্রাসী হয়ে উঠলো। একহাতে মৌরির মাথা চেপে ধরে তার অধরযুগলে আধিপত্য চালালো কিছুপল। শেষ হলে মৌরি মাথা নামিয়ে নেয়। জোরে জোরে শ্বাস টানে। মেজর ডানহাতে ঠোঁট মুছে। হাঁপাতে থাকা মৌরির পানে তাকায়। এবার নরম তার দৃষ্টি। মৌরির অধরসুধা পান করে তার ভেতর অনুভূতি এলো বুঝি!!
_”আপ… আপনি সিগারেট খান…”
_”সবসময় না, রেগে থাকলে নিয়ন্ত্রণের জন্য নিই। আজ এখানে আসার আগে মাথা গরম ছিল। গাড়িতে বসে টেনেছিলাম একটা।”
মৌরি বুঝে নেয়, তাকে দেখতে আসার খবর শুনেই মাথা গরম ছিল মানবের।
ফোনের রিংটোন ভেসে উঠতেই মৌরির পানে নিজের সেই নমনীয়, সম্মোহনী দৃষ্টি রেখেই মেজর ধীরে প্যান্টের পকেট থেকে মোবাইল বের করে। স্ক্রিনে কার নাম দেখলো কে জানে, এক মুহূর্তে তার মুখভঙ্গি বদলে গেল। চোখে-মুখে আদর, স্নেহ আর গলে-যাওয়া মমতার ছাপ ফুটে উঠলো। পরিবর্তনটা মৌরির চোখ এড়াল না, তবুও সে বিশেষ গুরুত্ব দিল না।
_”হ্যালো!!”
_”......”
_”ওর কানে ধরো ফোন।”
_”...” ওপাশ থেকে সাড়া মিলতেই মেজরের কণ্ঠ আরও নরম হয়ে এলো,
_”কলিজা… এই তো সোনা আসছি পাপা।”
_”......” ওপাশ থেকে ছোট্ট অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শোনা গেল।
মেজর আদুরে স্বরে বলেন,
_”কাঁদেনা মা, মাই ব্রেভ গার্ল, ডোন্ট ক্রাই। আম কামিং টু ইউ না!! প্লিজ ডোন্ট ক্রাই মাম্মা, পাপা কামিং ভেরি সুন।”
_”......”
মেজরের গলা আরও নরম হয়ে এলো, কাউকে শান্ত করার মতো,
_”পাপা ফিল হার্ট মাম্মা, প্লিজ ডোন্ট ক্রাই!!” নমনীয় কণ্ঠে, আদর মিশিয়ে আরও কিছু কথা বলেন মেজর। বাচ্চাদের যেভাবে বলে শান্ত করতে হয়, ঠিক তেমন। মৌরি বুঝলো ওপাশে কোনো বাচ্চা-ই আছে। মেজরের ভাই/বোন কিংবা পরিবারের কারো বাচ্চা হবে হয়তো।