বাবা চাচ্চুর কাছে অর্ণব আর দীপ্তর চেয়ে নেওয়া দুটো দিন কিভাবে যেন কেটে গেলো। তারা মৌরিকে দেখতে চাওয়া পাত্রের সবরকম খোঁজখবর নিয়েছে। পরিবার, ছেলে -সবটাই ভালো লেগেছে তাদের। না করার মতো তেমন কোনো ত্রুটি পায়নি। তাই পরদিনই তার বাবা মা তাকে ডেকে এই বিষয়ে কথা তুলে। মৌরি ভয়ে-দ্বিধায় হ্যাঁ না কিছু বলতে পারেনি। তার বাবা-মা তার নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিয়ে পাত্রপক্ষকে মেয়ে দেখানোর জন্য রাজী তা জানিয়ে দেয়।
ব্যাস তারা মেয়ে দেখাবে যখন বলেছে আর দেরি করতে চায়না। বিকেলেই আসতে চাইছে। মধ্যস্ততাকারী আত্মীয়; এককথায় ঘটক তা জানালে, শুনে মৌরির বাবা বলেন,
-“দেখুন মেয়ে দেখতে অকস্মাৎ চলে আসা সহজ পাত্রপক্ষের জন্য। কিন্তু মেয়েপক্ষের নানানরকম প্রস্তুতির দরকার পরে। আজ বললেই কি সম্ভব? আমাদের আয়োজনেরও তো একটা ব্যাপার আছে।”
-“একথা আমিও উনাদের জানিয়েছি সওদাগর সাহেব। কিন্তু তারাই তো অতিরিক্ত আয়োজনের জন্য মানা করে দিলো। দেরি করতে চাইছেনা। জানেনই তো ছেলে দেশের বাইরে চলে যাবে বউ নিয়ে। যাওয়ার ডেট আসছে বললো, তাই তারা দেখাদেখিতেও দেরি করতে চাইছেনা।”
তাদের তাড়াহুড়ো, আর কম আয়োজনে সমস্যা নেই শুনে মৌরির বাবা আর মানা করেন না। তবু আপ্যায়নের যথাসাধ্য ব্যবস্থা করবেন মনস্থির করে মেনে নেন।
মৌরি তখন ভাগিনা-ভাগিনি আর দুই ছোট ভাই বোনকে নিয়ে বাড়ির পেছনের দিকে ছিল। বাচ্চারা খেলছে, আর সে ওখানে থাকা বসার বেঞ্চিটাতে বসে বসে তাদের খেলা দেখছে, হাতে ফোন। অনামিকার সাথে চ্যাটিং করছে। কখনো বাচ্চারা বেশি হইহল্লা, চিৎকার চেচামেচি করলে বকে। পরে বোনের ডাক পরলে সবাইকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। বাচ্চারা দৌড়ে দৌড়ে সেখানেও খেলছে। মৌরি বোনকে জিজ্ঞেস করে,
-”কি হয়েছে আপু? এমন করে চিল্লাচিল্লি করছ কেন? কিছু বলবে?”
তুলি বাচ্চারা মানা করা সত্ত্বেও দৌড়া দৌড়ি করছে দেখে বলে,
-”আর বলবো না একটাকেও। দৌড়ে দৌড়ে খেল তোরা, তারপর ব্যাথা পেয়ে আমাকে দেখাতে আসলে আমি তার উপর আরও কয়েক ঘা দেব বলে দিলাম।”
কথাগুলো বলে বোনের দিকে তাকায়।
-”রুমে চলতো মৌ, কথা আছে।” বোনের কথায় মৌরি টাক ফুঁটিয়ে জলপাই খেতে খেতে তার পেছন পেছন যায় রুমে। বিছানায় গিয়ে বসে। তুলিও আসে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে অতীব জরুরী কোনো কথা বলবে। এতক্ষণ নিশ্চিন্তে হেলেদুলে থাকলেও এবার কিছু আন্দাজ করতে পেরে মৌরির থেমে যায়, নড়েচড়ে বসে।
-“শোন মৌ, বাবা চাচ্চুর কাছে তোর জন্য যে একটা প্রস্তাব এসেছে বলেছিল? ওটা আমাদের সবার ভালো লেগেছে। তাই বাবা আজ বাড়ি আসতে বলেছে তাদের। মানে বিকেলেই আসবে তোকে দেখতে। বুঝতে পারছিস আমার কথা?”
মৌরি স্থির হয়ে বসে থাকে। কেমন জমে আছে সে।
-”মৌ… বাবা চাচ্চু, তোর দুলাভাই, অর্ণব সবাই সবরকম খোঁজখবর নিয়েছে। ছেলে ভালো, ইঞ্জিনিয়ার; পরিবারও ভালো। আজই আসবে বুঝেছিস? সবাই আমাকে পাঠিয়েছে তোকে জানাতে। তুই মেন্টালি প্রিপ্যেয়ার হয়ে থাক। বিকেলেই আসবে।”
বাবা-মা যখন বিয়েতে অমত আছে কিনা জানতে চেয়েছিল তখনই বুঝে গিয়েছিল মৌরি, যে তাকে দেখাতে চাইছে। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি ভাবেনি। অন্তত আর চার/পাঁচটা দিন পর আসলে আসবে ভেবেছিল। ততদিনে হয়তো মেজর কিছু একটা করলো, বা আসলো। এই ভেবে কিছুটা নিশ্চিন্ত ছিল সে। কিন্তু আজই দেখতে আসবে ভাবেনি। তার ভেতরটা হঠাৎ অস্থির হয়ে উঠে। সে কি করবে? অন্য কারো সামনে নিজেকে প্রদর্শন করতে চায়না মৌরি। মেজর বার বার করে বলেছিল যেন মেজরের জন্য নিজেকে সুরক্ষিত রাখে সে; মৌরি এখন মেজরের আমানত। তার পরিচয় সে উমরান তাওসিফের স্ত্রী। কিন্তু কিভাবে সে দেখাদেখি বিষয়টা আটকাবে? কোনো উপায় তো নেই। মেজর কি বুঝতে পারছেনা তার স্ত্রী বিপদে আছে। এবার তার পরিবারের কাছে এসে তাকে চেয়ে নেওয়ার সময় হয়েছে!!
মৌরির মাও আসে দুই মেয়ের মাঝে। মা, বোন দুজনেই তাকে এই বিষয়ে জানায়, আশ্বস্ত করে। তুলি মায়ের কথায় পাত্রের একটা ছবি বের করে দেখালো। এতক্ষণ তার মনে ছিলনা। মায়ের কথায় মনে পরে। মৌরি দেখে ছবিখানা। সুদর্শন দেখতে ছেলে। বাবা চাচ্চুরা যখন বলছে- ছেলে, ছেলের পরিবার নিশ্চয় ভালোই হবে। কিন্তু মৌরির তো আর ভালো কোনো পুরুষ লাগবেনা! সে অন্য কারো স্ত্রী এখন। মৌরি কি করবে না করবে তা ভেবে দ্বিধা, সংকোচ আর ভয়ে অস্থির হয়ে উঠেছে। মা বোন চলে গেলে অনামিকাকে ফোন দেয়, অনেক শলা-পরামর্শ করে দুজনে। তাও কোনো সমাধানে আসতে পারেনা। মেজরের উপস্থিতি ছাড়া কোনোকিছুই সম্ভব নয়।
সারাটাদিন অস্থিরতায় কাটে, এমন দুটানায় পড়তে হবে কখনো ভাবেনি সে। কান্না পাচ্ছে তার। কি করবে বুঝতে পারছেনা।
দেখতে দেখতে বিকেল হয়ে গেলো। মেহমানরা এসে পড়েছে, ড্রয়িং রুমে তাদের আপ্যায়ন আর গল্পগুজব চলছে বাড়ির লোকেদের সাথে।
তুলি এসে বোনকে সাজিয়ে গুছিয়ে দিলো। শাড়ি পড়ায় নি। ধূসর বাদামী বর্ণের লং এমব্রয়ডারি কাজ করা পাকিস্তানি কামিজ সেট পড়িয়েছে। কামিজের পুরো অংশ জুড়ে অফ-হোয়াইট থ্রেড এমব্রয়ডারি কাজ করা। ফুলের নকশাগুলো অত্যন্ত নিখুঁত, আর জরজেট কাপড়ের উপর সেগুলো দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। হাতার দিকেও একই ধরনের সূক্ষ্ম ফুলেল কাজ আছে। দুপাট্টা একই রঙের অর্গাঞ্জা ধরনের হালকা কাপড়ের তৈরী। এর উপর ছোট ছোট ফুলের দানা ও সুতোর কাজ। দুপাট্টাটি খুব নরম ও ফ্লোয়ি হওয়ায় এটা মৌরির পুরো সাঁজ পোষাকে অভিজাত ভাব এনে দিলো। কামিজের নিচে এক রঙা সাাদামাটা জরজেট কাপড়ের লেহেঙ্গা। হালকা মেকআপ সহ সব সাঁজ শেষ হলে তুলি দুপাট্টাটি আস্তে করে তার মাথায় তুলে দেয়। মৌরি তখন অনবরত ঘামছে, ঢোক গিলছে।
হাতের তালুর ঘাম, আর আঙ্গুলগুলোর একটার সাথে অন্যটার ঘর্ষন বলে দিচ্ছে তার ভেতরটা খুব অস্থির আর দ্বিধান্বিত। তুলি তা বুঝতে পেরে তার চিবুকে হাত দিয়ে নিজের দিকে ফেরায়। কপালের দুদিকে এনে দেওয়া সরু চুলের অংশ দুটো হালকা সরিয়ে বলে,
-”এমন অস্থির হচ্ছিস কেন? প্রথম প্রথম সবারই একটু আদটু ভয় লাগে। এত অস্থির হওয়ার তো কিছু নেই। ঘেমে নেয়ে কেমন হয়েছিস দেখ।” বলে নিজের উর্ণাটা দিয়ে কপাল মুছে দেয়।
-”আপু, আমি পাত্রপক্ষের সামনে যাবো না। আমি বিয়ে করবোনা।” অবশেষে আর সইতে না পেরে মৌরি বলেই ফেললো।
তুলি বোনের কথা শুনে থমকে যায়। মৌরির মাথার উর্ণা ঠিক করে দিচ্ছিল সে। অরগাঞ্জা ধরণের হওয়ায় খুব ফ্লোয়ি, বারবার পড়ে যাচ্ছে। ওখানেই হাত রেখে বোনের চেহারাখানা দেখে। তুলি মুছে দিয়েছে, তাও বারবার ঘামছে সে। চোখের পলক ফেলছে বারবার, অস্থির চঞ্চলা পাখির মতো লাগছে। চোখের পাপড়িগুলো খুব ঘন তার, যেন ময়ূরাক্ষী। বারবার ঢোক গিলছে, গোলাপের পাপড়ির ন্যায় অধরদুটোও কাঁপাকাঁপা। মোহিত হয়ে তাকায় সে। একটা মানুষ এত স্নিগ্ধ কি করে দেখতে হয় সে জানেনা। কার মতো দেখতে হয়েছে কি জানি!! বোনের ভেতরটা পড়তে চায় তুলি।
-”কেন? ভয় লাগছে? এমন আমারও হয়েছিল মৌ। অস্থিরতায় আর ভয়ে পাত্রপক্ষের সামনে গিয়ে সালাম দিতেই ভুলে গিয়েছিলাম। নেহাৎ আমার শ্বশুর, শাশুড়ি ভালো মানুষ বিধায় কিছু মনে করেন নি। উল্টো আমার অস্বস্তি বুঝতে পেরেছিলেন। এই ছেলেটার পরিবারও খুব ভালো। তুই ভালো থাকবি। আর তাছাড়া আমরা তো সবাই আছি। এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই।”
মৌরির অস্থিরতা মেয়ে হিসেবে এমন সময়ে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে তুলি তাকে সান্ত্বনাবাণী দিয়ে আশ্বস্ত করে, সাহস দেয়। কিন্তু মৌরির ভেতর চলছে অন্য কিছু। তার অস্থিরতা কমছেনা, বরং বাড়ে। সে কিছুতেই পাত্রপক্ষের সামনে যাবেনা। উমরান তাওসিফের বউ সে।
মৌরি বারবার না করছে, তার অতিরক্ত দুনোমনা দেখে তুলি চিন্তায় পড়ে যায়। মেয়েটা তো শেষ মুহূর্তে এসে গণ্ডগোল করবে মনে হচ্ছে। বাবার কানে তোলা যাবেনা একথা। মা বুঝালেও কাজ হবেনা। অর্ণবই পারবে ওকে যা বুঝানোর বুঝাতে। তুলি চাচ্চুর মেয়ে তূর্ণাকে পাঠায় অর্ণবকে ডেকে পাঠাতে। মিনিট কয়েক পরেই আসে অর্ণব। অথিতিদের রেখে এসেছে তাই তাড়াহুড়া তার কণ্ঠে।
-”কি হয়েছে? ডাকছিস কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?”
-”মৌরিকে বোঝা। ও বেকে বসেছে। পাত্রপক্ষের সামনে যাবেনা বলছে। আমি অনেক বুঝিয়েছি।” তুলির চিন্তিত কণ্ঠ
বোনের কথায় অর্ণবের কপালে ভাঁজ পরে। প্রস্তুত মৌরি বিছানার এক কোনে থম মেরে বসে আছে। তাকে দেখেই অর্ণব তুলি ভুল কিছু বলছেনা বুঝে গেলো। সে যাবেনা ভেবেই রেখেছে তা তার মুখভঙ্গিতে স্পষ্ট। অর্ণব তুলিকে ইশারায় সরতে বলে মৌরির কাছে যায়।
-”কি হয়েছে মৌ? কোনো সমস্যা?”
-”আমি বিয়ে করবোনা ভাইয়া, ওদের সামনেও যাব না। তোমরা প্লিজ ওদের মানা করে দাও, আমি কারো সামনে যাবো না।” মৌরির কাতর কন্ঠ
-”এর কারণ?”
-”বুঝতে পারছিনা, আমি কিছু বুঝতে পারছিনা। কিন্তু আমি কারো সামনে যাবোনা। আমার ভেতর কিছু একটা হচ্ছে। এসব ভালো লাগছেনা। ওদের সামনে গেলে ভুল হয়ে যাবে।”
অর্ণব শান্ত দৃষ্টি রেখে বোনকে পরখ করে। ওর অস্থির মুখভঙ্গি, ঘর্মাক্ত কপাল -সবটা দেখে।
-”কেমন লাগছে তোর?”
-”বুঝতে পারছিনা তো, কিন্তু ভুল হবে। আমি এটা করতে পারবো না। কারো সামনে যাবনা।”
-”বাবা মা তোকে জিজ্ঞেস করেছিল, তখন বিয়েতে আপত্তি আছে জানালিনা কেন?”
-”আমি জানিনা ভাইয়া, ভুল হয়ে গেছে। আমি বিয়ে করবোনা।” মৌরির কাদো কাদো কণ্ঠ
-”কাঁদছিস কেন? ভাই মেরেছি নাকি বকেছি?”
মৌরি ভাসা ভাসা চোখে তাকায়।
অর্ণব দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে মৌরি রাজী হয়েছে এতেই অবাক হয়েছিল। তার মনেই হচ্ছিল বোনের কাছে নির্দিষ্ট কারণ না থাকলেও বিয়েতে আপত্তি করবে। অদৃশ্য টানে আপত্তি করবে। বাবা মৌরিকে আবার কোনো পাত্রপক্ষ দেখতে চাইছে, সাথে এবার কিছু একটা ভাবতে চাইছে ওর বিয়ে নিয়ে - তা জানালে সে আর সময় নষ্ট না করে মেডিক্যাল থেকে চলে এসেছে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তারপর বাবার সাথে অনেক আলোচনা করে মৌরিকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তে এসেছিল তারা।
বাবা-মা যখন জানতে চাইছিল তখনও আপত্তি করেনি মৌরি, তুলি যখন সকালে আজ দেখতে আসার কথা বলেছিল তখনো আপত্তি করেনি। তাই অর্ণব ধরেই নিয়েছিল মৌরি এখনো কিছুই অনুভব করতে পারছেনা। খুশিই হয়েছিল, বোনের জীবন একটা পর্যায়ে গিয়ে দাড়াবে, সংসার হবে। কিন্তু অবশেষে তার দ্বিধা সত্য প্রমাণিত হলো। মৌরি বিয়ে করবেনা। তার মনে হচ্ছে এটা হলে ভুল হবে।
অর্ণব তার মাথায় হাত রাখে,
-”মৌ, তোর সব কথা বুঝতে পারছি। বিয়ে তোর মন থেকে যতদিন করতে ইচ্ছে করবেনা ততদিন হবেনা আমি কথা দিচ্ছি। কিন্তু আজ মেহমানদের সামনে যেতে হবে। পরিবারের সম্মান জড়িয়ে, তোর সম্মান জড়িয়ে। মেয়ে দেখাতে ডেকে, যদি না দেখায়। তাহলে সেটা তাদেরও অসম্মান, আমাদেরও অসম্মান, সাথে তোরও। নানান কথা রটবে। বুঝতে পারছিস আমার কথা? পরের সব বিষয় আমি সামলে নেব। শুধু আজকে মেহমানদের সসম্মানে বিদায় করি।”
মৌরি ভীষণ অসহায় বোধ করে। ভাই ঠিক বলছে। ওদের সামনে না গেলে খুব অসম্মান হবে বাবার-চাচ্চুর। কিন্তু মেজরের কথা কি করে উপেক্ষা করবে সে? তাছাড়া, তার মনও বলছে এটা ভুল হবে।
কিন্তু ভাইয়ের কথাও ফেলতে পারবেনা সে। পরিবারের সম্মানটা গুরুত্বপূর্ণ।